Tuesday, July 1, 2025

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ মহররম সংখ্যা

           

আরবি: মহররম, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির হোসেন গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖



     আযাদারী : আদব ও নিয়মাবলী

আযাদারী : কবুল হওয়ার কয়েকটি শর্ত

কারবালার আদর্শ থেকে যুব সমাজের শিক্ষা

মহররম মাস – আহলে বাইতের প্রেমিকদের শোক ও বিষাদের মাস

কেন ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালাতে তাঁর পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন?

এক নিঃসঙ্গ আজাদারের খোঁজে...

       আযাদারির সৌন্দর্য 
          ✍️  রাজা আলী 

      মহাররাম ও ইমামে যামানা
           ✍️ আব্বাস আলী

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পেয়গাম (অনুবাদ)


📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

       শহীদের স্মরণে

                আযাদারী 
          ✍️  রাজা আলী 

     হে কুফাবাসী… (অনুবাদ)
          ✍️ মইনুল হোসেন

জিয়ারতের শোক সুরে আজাদারী


__________________________________________
__________________________________________

                   সম্পাদকীয়

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। কারবালার শোক মানে শুধু অতীতকে স্মরণ নয়—এ এক জাগরণ, এক আত্মগত শিক্ষা। আজাদারি কেবল কান্না নয়, বরং তা হুসাইন (আ.)-এর পথে নিজেকে গড়ে তোলার শুদ্ধতম উপায়।

এই সংখ্যায় আমরা আলোকপাত করেছি আজাদারির সৌন্দর্য, আদব ও মূল উদ্দেশ্যের উপর। আলোচনা করেছি—কীভাবে আজাদারি হতে পারে হুসাইনির অনুসরণ, আর কীভাবে আমাদের শোক সুর মিলাতে পারে ইমামে জামানার (আ.ফা.) শোকের সাথে। কারবালা আমাদের শিখিয়েছে পর্দা, দিয়েছে যুব সমাজকে আদর্শের শিক্ষা, আর আমাদের রেখে গেছে এক চিরন্তন প্রশ্নের সামনে—তুমি হুসাইনের পক্ষে, না বিপক্ষে? আসুন, এ মহররমে আমরা শোককে করি আত্মশুদ্ধির সোপান, এবং প্রতিজ্ঞা করি—ইমাম মাহ্দি (আ.ফা.)-এর প্রতীক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত করব, এক হুসাইনি আজাদার হয়ে।

                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


আযাদারী : আদব ও নিয়মাবলী
✍️ কবির আলী তরফদার কুম্মী।

ইমাম রেযা (আ.) বলেন:
 "يَا ابْنَ شَبِيبٍ! إِنْ سَرَّكَ أَنْ تَكُونَ مَعَنَا فِي الدَّرَجَاتِ الْعُلَى مِنَ الْجِنَانِ، فَاحْزَنْ لِحُزْنِنَا، وَافْرَحْ لِفَرَحِنَا، وَعَلَيْكَ بِوِلَايَتِنَا، فَلَوْ أَنَّ رَجُلًا تَوَلَّى حَجَراً لَحَشَرَهُ اللَّهُ مَعَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ."
 “হে ইবনে শাবীব! যদি তুমি আমাদের সঙ্গে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে চাও, তবে আমাদের জন্য দুঃখ করো, আমাদের আনন্দে আনন্দিত হও এবং আমাদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো। কারণ কেউ যদি একটি পাথরকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন তার সাথেই হাশর করবেন।”

(উয়ুন আখবার আল রেযা,শায়খ সাদূক, খণ্ড ১, হাদিস ৪৪)

 ভূমিকা:
ইসলামে ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদাত ও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি ঈমান, ত্যাগ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকার এক চিরন্তন দর্শন। আশুরার দিনে শোক পালন, কালো পোশাক পরিধান, জিয়ারত পাঠ, সমবেদনা জানানো এবং অন্যান্য আমল শুধু রীতিনীতি নয় এগুলো হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহ ও আহলে বাইত (আ.) এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ। এই লেখায় আশুরার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল ও আদবসমূহ কুরআন-হাদিস ও ইমামগণের বাণীর আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে আমরা এই পবিত্র দিনটিকে যথার্থভাবে ইবাদত ও শোকার্তচিত্তে পালন করতে পারি।

১. কালো পোশাক পরিধান করা:
ফিকহি দৃষ্টিকোণে কালো পোশাক পরিধান করা মাকরুহ, কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) ও অন্যান্য মাসুম ইমামগণের (আ.) শোক পালনের ক্ষেত্রে এটি একটি ব্যতিক্রম। কারণ এটি শোক ও দুঃখের প্রকাশ এবং ইসলামী চেতনা ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন।

২. সমবেদনা প্রকাশ:
ইসলামে কারো ওপর কোনো দুঃখ-মুসিবত আসলে, তাকে সমবেদনা জানানো মুস্তাহাব।  

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো মুসিবতগ্রস্তকে সমবেদনা জানায়, সে তার সমান সওয়াব পাবে।"
(সাফিনাতুল বিহার, খণ্ড ২, পৃ. ১৮৮)

শিয়াদের মধ্যে এই সুন্নাত প্রচলিত, এবং তারা পরস্পরকে "أَعْظَمَ اللهُ أُجُورَكُمْ" (আল্লাহ তোমাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করুন) বলে সমবেদনা জানায়।  

ইমাম বাকির (আ.) বলেন:
"যখন শিয়ারা একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন তারা ইমাম হুসাইন (আ.) এর মুসিবতে এই দোয়া পাঠ করবে:
''أَعْظَمَ اللهُ أُجُورَنَا بِمُصَابِنَا بِالْحُسَيْنِ (ع) وَجَعَلَنَا وَإِيَّاكُمْ مِنَ الطَّالِبِينَ بِثَارِهِ مَعَ وَلِيِّهِ الْإِمَامِ الْمَهْدِيِّ مِنْ آلِ مُحَمَّدٍ (ع)"
 "আল্লাহ আমাদের ইমাম হুসাইন (আ.) এর শোকে আমাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করুন এবং আমাদের ও আপনাদেরকে তাঁর রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারী হিসেবে তাঁর ওলী ইমাম মাহদী (আ.) এর সাথে মিলিত করুন।"
(মুসতাদরাকুল ওয়াসাইল, খণ্ড ২, পৃ. ২১৬)

৩. আশুরার দিনে কাজ বন্ধ রাখা:
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি আশুরার দিনে কাজ বন্ধ রাখে অর্থাৎ জীবিকা অর্জনের জন্য বের হয় না এবং বনি উমাইয়াদের চক্ষুশূল হওয়ার জন্য (যারা আশুরাকে পবিত্র দিন মনে করত) যদি কেউ তার দৈনন্দিন জীবিকা অর্জনেও ব্যস্ত না হয়, তাহলে আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবেন। আর যে ব্যক্তি আশুরার দিনকে শোক ও দুঃখের দিন হিসেবে পালন করে, কিয়ামতের দিন যখন সবার জন্য ভয় ও আতঙ্কের দিন হবে, সেদিন তার জন্য হবে আনন্দের দিন।"
(আমালী শেখ সাদুক, পৃ. ১২৯)

 ৪. জিয়ারত পাঠ:
আলকামা ইবনে হাজরামী (রা.) ইমাম বাকির (আ.) কে বললেন:
"আমাকে এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দিন, যা আমি আশুরার দিনে ঘরে বসে বা দূর থেকে পাঠ করতে পারি।"

ইমাম (আ.) বললেন:
"হে আলকামা! যখনই তুমি ইচ্ছা করবে, দুই রাকাত নামাজ পড়ে এই জিয়ারত (জিয়ারতে আশুরা) পাঠ করবে।"

ইমাম আরও বললেন:
"যদি তুমি এই জিয়ারত পাঠ করো, তাহলে ফেরেশতারা হুসাইন (আ.) এর জিয়ারতকারীর জন্য যে দোয়া করে, তুমিও তা পাবে। আল্লাহ তোমার জন্য এক লাখ মর্যাদা লিখে দেবেন এবং তুমি এমন হবে যেন হুসাইন (আ.) এর সাথে শাহাদাত বরণ করেছ, যাতে তুমি তাদের মর্যাদায় শরীক হতে পার। তুমি শুধুমাত্র সেই শহীদদের মধ্যে গণ্য হবে, যারা তার সাথে শাহাদাত বরণ করেছে। আর প্রত্যেক নবী ও রাসূলের জিয়ারতের সওয়াব এবং হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের পর থেকে যারা তাকে জিয়ারত করেছে, তাদের সওয়াবও তোমাকে দেওয়া হবে।"
(মিসবাহুল মুতাহাজ্জিদ, পৃ. ৭১৪)

যদি সম্ভব হয়, বিখ্যাত জিয়ারতে আশুরা (১০০ লা‘নত ও ১০০ সালাম সহ) পড়ুন। যদি সময় না থাকে, তবে অপ্রচলিত জিয়ারতে আশুরা (যা মুফাতীহুল জানান-এ আছে) পড়ুন, যার সওয়াব একই।

৫. ক্রন্দন করা :
 হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা হযরত মূসা (আ.) কে বলেন:
"হে মূসা! যে বান্দা মুস্তাফার (সা.) সন্তানের শাহাদাতের দিন (আশুরা) কাঁদবে বা কান্নার ভান করবে এবং নবীর নাতির শোকে শোক প্রকাশ করবে, আমি তাকে জান্নাতে স্থান দেব।"
(মুসতাদরাক সাফিনাতুল বিহার, খণ্ড ৭, পৃ. ২৩৫)

৬. শোক মজলিসের আয়োজন:
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"আমি তোমাদের মজলিসকে ভালোবাসি। তোমরা তোমাদের মজলিসে আমাদের বিষয়কে (আমাদের পথ ও আদর্শ) জীবিত রাখো। আল্লাহ তার উপর রহম করুন, যে আমাদের বিষয়কে জীবিত রাখে।"
(ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ১০, পৃ. ২৩৫)

৭. আশুরার দিনে যোহরের জামাত নামাজ:
সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.) ও তার অনুসারীরা নামাজের পথে শাহাদাত বরণ করেছেন। তাই জিয়ারতে মুলকা-তে আমরা তাকে লক্ষ্য করে বলি:
"আশহাদু আন্নাকা কাদ আকামতাস সালাত..."
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নামাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যাকাত দিয়েছেন, ভালো কাজের আদেশ দিয়েছেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেছেন।"

৮. স্বাদ-আনন্দ থেকে বিরত থাকা:
জীবনের কিছু স্বাদ যেমন খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো এবং আনন্দদায়ক কথা বলা ত্যাগ করতে হবে (যদি না প্রয়োজন হয়)। ধর্মীয় ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ বন্ধ রাখতে হবে এবং এই দিনটিকে কান্না ও শোকের দিন হিসেবে পালন করতে হবে, যেন কারো পিতা বা সন্তান মারা গেছে।

ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"আশুরার দিনে আনন্দের কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং শোকের রীতি পালন করতে হবে। সূর্য ঢলে না যাওয়া পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে, তারপর শোককারীদের মতো সাধারণ খাবার খেতে হবে।"
(মীযানুল হিকমাহ, খণ্ড ৮, পৃ. ৩৭৮৩)

৯. ইখলাসের(একনিষ্ঠতা) প্রতি যত্নবান হওয়া:
শোক পালনকে শুধুমাত্র রেওয়াজ বা অভ্যাস হিসেবে করবেন না, বরং সঠিক নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন এবং ইখলাসের ক্ষেত্রে সত্যবাদী হোন। কারণ, ছোট আমল যদি ইখলাসের সাথে হয়, তা অনেক বড় আমল থেকেও উত্তম,এমনকি যদি তা হাজার গুণ বেশি হয়। হযরত আদম (আ.) ও শয়তানের ইবাদত থেকে এটি বোঝা যায়। শয়তানের হাজার বছরের ইবাদত তাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারেনি, কিন্তু হযরত আদম (আ.) এর একটি তওবা তার ভুলকে মাফ ও মর্যাদা ফিরে পেতে সহায়ক হয়েছিল।

আমল করার সময়ও সতর্ক থাকুন, যেন মানুষের প্রশংসা পাওয়ার লোভ বা রিয়া(লোক দেখানো) আপনার নিয়তে প্রবেশ না করে।

১০. জিয়ারতে তাসলিয়াত পাঠ:
আশুরার দিনের শেষে জিয়ারতে তাসলিয়াত পড়ুন এবং আশুরার দিনকে সুযোগ হিসেবে নিন। আপনার অবস্থার উন্নতি, শোক গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং আপনার ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

শোক পালনকে শুধুমাত্র রেওয়াজ বা অভ্যাস হিসেবে করবেন না, বরং উত্তম নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন।
(১-৭ সোগনামায়ে আশুরা, পৃ. ৬৭-৮০; ৮-১০ তারিখে মারাকিবাত, পৃ. ৪৭-৫৩)

উপসংহার:
আশুরার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদেরকে শুধু শোকই শেখায় না, বরং তা অন্যায়ের মুখে দাঁড়ানোর সাহস, সত্যের পথে অবিচলতা এবং ঈমানের দৃঢ়তা শিক্ষা দেয়। ইমাম হুসাইন (আ.) এর স্মরণে পালিত প্রতিটি আমল, জিয়ারত, কান্না, সমবেদনা বা কাজ বন্ধ রাখা সবই আমাদের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। এই দিনটিকে ইখলাসের সাথে পালন করে আমরা যেমন ইমাম (আ.) এর পথের অনুসারী হতে পারি, তেমনি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কারবালার শিক্ষা বুঝে জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর জহুরের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য দান করুক।  


__________________________________________


আযাদারী : কবুল হওয়ার কয়েকটি শর্ত
✍️ মাওলানা রেজাউল হক্ব কুম্মী

আযাদারী একটি উত্তম মুস্তাহাব এবাদাত। সুতরাং আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত এই উত্তম এবাদাত আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবারে যেনো গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।কেমন ভাবে আজাদারি করলে আমরা মাওলা ইমাম হুসাইন (আ:) এর অনুসারী হতে পারব,সেই বিষয়টির উত্তর খুব সংক্ষেপে দেওয়ার চেষ্টা করবো।

    কারবালা তে ইমাম হুসাইন (আ:) এর আদর্শ কি ছিল?ইমাম হুসাইন (আ:) আদর্শ ছিল খুব ই মহান।সত্য এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি আল্লাহ র পথে আত্মোৎসর্গ করেন। 

মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ ইমাম হুসাইন আ বলেছেন: 
ان اجود الناس من اعطی من لا یرجوه، 
 "শ্রেষ্ঠ ও উত্তম দাতা ওই ব্যক্তি যে দান করে কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়"। 

    ইমাম হোসাইন আঃ এর শাহাদাত স্মরণে পালিত শোকানুষ্ঠান ই আযাদারী। এই আযাদারী কবুলের কতকগুলি শর্ত হলো-

১/ পবিত্র মন-প্রাণ দিয়ে মহারম পালন করতে, নিষ্ঠা মন প্রাণ তৈরী করতে গেলে প্রথম চিন্তা ভাবনা করে আল্লাহ তায়ালা কে চিনতে হবে, তাঁর পর মজলিসে বসলে আসল আজাদারী করা হবে। 

২/ মজলিসে বসে মন প্রাণ দিয়ে মজলিস শুনতে হবে এবং তাঁর উপর আমল করতে হবে।

৩/ আত্ম ত্যাগ ও স্বার্থ ত্যাগ করা কারবেলার ইতিহাস ও মাওলা ইমাম হুসাইন (আ:) এর ব্যবহার থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

৪/ দীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকল প্রকার দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হবে।

৫/ সকলের সাফল্যের জন্য দুয়া দানি করতে হবে ও আমল করতে হবে।

কেননা ইমাম আলী (আ:) বলেছেন:
۱/ کونوا للظالم خصما وللمظلوم عونا (الحدیث امام علی ع).  
এই হাদীসটির অর্থ হলো অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও ,আর যার উপর অত্যাচার হচ্ছে তাঁকে সাহায্য করো, যদিও তোমার ক্ষতি হয়।

 ওয়াসাল্লামু আলিইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

_________________________________________

কারবালার আদর্শ থেকে যুব সমাজের শিক্ষা
✍️ সুজা উদ্দিন মাশহাদী
                           
কারবালা আমাদেরকে বহু গভীর শিক্ষা দেয়, যা শুধু ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, মানবিক, নৈতিক ও আত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই:

১. সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ়তা
ইমাম হোসাইন (আ.) কারবালার ময়দানে নিজের জীবন ও পরিবারকে উৎসর্গ করেছেন অন্যায়, অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে। তিনি স্পষ্টভাবে জানতেন যে তাঁর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তবুও তিনি অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। এটি আমাদের শেখায় — সত্যের পথে দৃঢ় থাকতে হয়, যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।

২. ধর্ম ও মূল্যবোধের প্রতি ভালোবাসা
কারবালার ঘটনা ইসলামের প্রকৃত রূপকে সংরক্ষণের সংগ্রাম। ইয়াজিদের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে হোসাইন (আ.) দেখিয়েছেন যে ধর্ম শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি জীবনের আদর্শ ও সংগ্রামের উৎস।

৩. আত্মত্যাগ ও ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত
ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবার-পরিজনের আত্মত্যাগ ও কষ্ট সহ্য করার ধৈর্য, বিশেষত তাঁর বোন জয়নাব (আ.)-এর ভূমিকায় আমরা দেখি কীভাবে মানুষ দুঃখ-কষ্টে অবিচল থাকতে পারে। এটি আমাদের শেখায় — ধৈর্যই প্রকৃত শক্তি।

৪. সংখ্যা নয়, আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ
কারবালায় ইমাম হোসাইনের সৈন্যসংখ্যা ছিল খুবই কম (প্রায় ৭২ জন), আর ইয়াজিদের পক্ষে ছিল হাজার হাজার সৈন্য। কিন্তু ইতিহাস মনে রেখেছে কারা ন্যায়ের পক্ষে ছিল। এই ঘটনা আমাদের শেখায় — সংখ্যা বড় কথা নয়, আদর্শই চূড়ান্ত।

৫. নারীর সাহস ও ভূমিকা
কারবালার পরবর্তী ঘটনাগুলোতে হজরত জয়নাব (আ.)-এর সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তা প্রমাণ করে যে নারীর ভূমিকাও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারবালার আদর্শের মূল শিক্ষা:

1. সত্য ও ন্যায়বিচারের জন্য আপোষহীনতা: 
ইমাম হুসাইন (আ.) অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যা যুব সমাজকে শেখায় কখনো মিথ্যা বা অবিচারের সাথে আপোষ না করতে।
2. কোরবানীর গুরুত্ব: 
নিজের জীবন, স্বাচ্ছন্দ্য ও সাফল্যের পথ বন্ধ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত, যা যুব সমাজকে দেশ ও সমাজের উন্নতির জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলে।
3. ধৈর্য ও স্থিরতা: 
কারবালার ঘটনায় দেখা যায়, কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে থাকা ও আদর্শে অটল থাকা কতটা জরুরি।
4. মানবতা ও অন্যায়ের প্রতিবাদ:
 কারবালা মানবাধিকার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিক্ষা দেয়, যা যুব সমাজকে ন্যায়পরায়ণ ও মানবতাবাদী করে তোলে।

যুব সমাজের শিক্ষার বিস্তারে করণীয়:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কারবালার আদর্শ অন্তর্ভুক্ত করা: কারবালার ইতিহাস ও আদর্শ নিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরি করা উচিত।

সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও কর্মশালা: 
যুব সমাজের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন করা।
সাহিত্য ও মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার: নাটক, কবিতা, গল্প ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কারবালার শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেওয়া।

নেতৃত্ব গঠন: 
কারবালার আদর্শ অনুসরণ করে নেতৃত্ব গড়ে তোলা, যারা সমাজে ন্যায় ও সৎ আচরণ প্রতিষ্ঠা করবে।
__________________________________________

 মহররম মাস – আহলে বাইতের প্রেমিকদের শোক ও বিষাদের মাস
✍️  মজিদুল ইসলাম শাহ


মহররম হলো সেই শোক ও বেদনার মাস, যা নবী (সা.) ও আলী (আ.)-এর অনুসারীদের অন্তরকে যুগ যুগ ধরে বিষণ্ন করে রেখেছে। হিজরি ৬১ সালের মহররম থেকে আজ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ এই মাসে হুসাইন (আ.) ও তাঁর সাথিদের মর্মান্তিক শাহাদাতের কারণে শোক পালন করে আসছেন। এক ভয়াবহ বিপর্যয়, যার বর্ণনা করাও অসম্ভব! কী দুঃখের বিষয়—যে হুসাইন (আ.) নবীর দৌহিত্র, আলী (আ.)-এর সন্তান, নবীর উত্তরসূরি, জামাতা ও খলিফা ছিলেন, তাঁকে নবীর ওফাতের মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে কারবালার প্রান্তরে হত্যা করা হলো—তা-ও সেইসব লোকদের দ্বারা যারা নিজেদের নবীর উম্মত বলে দাবী করত!

ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) এ বিষয়ে বলেছেন: 
أَمْسَتِ الْعَرَبُ تَفْتَخِرُ عَلَى الْعَجَمِ بِأَنَّ مُحَمَّداً مِنْهَا وَ أَمْسَتْ قُرَیْشٌ تَفْتَخِرُ عَلَى الْعَرَبِ بِأَنَّ مُحَمَّداً مِنْهَا وَ أَمْسَى آلُ مُحَمَّدٍ مَخْذُولِینَ مَقْهُورِینَ‏ مَقْبُورِینَ.
“আরবরা আজ গর্ব করে যে, মুহাম্মদ (সা.) তাদের মধ্য থেকে ছিলেন; কুরাইশ গর্ব করে যে, মুহাম্মদ (সা.) তাদের গোত্র থেকে ছিলেন; অথচ আজ আলে মুহাম্মদ (সা.) লাঞ্ছিত, নির্যাতিত ও শহীদ অবস্থায় শায়িত।”

এই কারণেই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের শোক কখনও ফুরায় না। মহানবী (সা.) বলেছেন:
 إِنَّ لِقَتْلِ الْحُسَیْنِ حَرَارَةً فِی‏ قُلُوبِ‏ الْمُۆْمِنِینَ لَا تَبْرُدُ أَبَدا.
 "নিশ্চয়ই হুসাইনের শাহাদাতে মুমিনদের অন্তরে এমন এক উত্তাপ রয়েছে, যা কখনও শীতল হবে না।"

কারবালা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং এক চিরন্তন আদর্শ—যা গত চৌদ্দ শতাব্দীতে অসংখ্য মানুষকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে গড়ে তুলেছে। এমন অনেকেই আছেন, যারা মহররমের মজলিসে অংশ নিয়ে নিজের জীবনধারা বদলে ফেলেছেন।

কারবালা ও মহররম মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। মহররম মানুষকে জীবনের উদ্দেশ্য গভীরভাবে অনুধাবন করায়, জীবনে প্রকৃত অর্থ যোগ করে। এটি হলো তাওবার মাস—আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার মাস, সত্য খুঁজে পাওয়ার মাস, সঠিকভাবে জীবন ও মৃত্যু শেখার মাস। মহররম শেখায় কিভাবে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচা যায় এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে দুনিয়াকে বিদায় জানানো যায়।

মহররম ও কারবালা নৈতিকতার শিখর। এটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে আমাদের নৈতিকতা, ভালোবাসা, মুক্তি ও সম্মানের পাঠ শেখায়।

এই কারণেই আশ্চর্যের কিছু নেই যে মহররম এক রাতে এমনকি তার চেয়েও কম সময়ে মানুষকে বদলে দিতে পারে। অনেক পাপগ্রস্ত ব্যক্তি, যারা গুনাহের অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, এই মাসের সম্মানে সেই অভ্যাস ত্যাগ করেন। তাই মহররম এক "অঙ্গীকারের মাস"—আল্লাহর অবাধ্যতা ত্যাগ করার অঙ্গীকার, নৈতিক উৎকর্ষ অর্জনের অঙ্গীকার, আর এক কথায়—বন্দেগির অঙ্গীকার।

বন্দেগির অঙ্গীকার

আল্লাহর প্রকৃত ইবাদতের সূচনা হয় সেই স্থান থেকে, যেখানে মানুষ তাঁর নিষিদ্ধকৃত কাজগুলো ত্যাগ করে। এই পরিত্যাগের সূচনা হলো তওবা। কারবালার উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত হলো—হুর ইবনে ইয়াজিদের তওবা ও ইমাম হুসাইনের (আ.) পক্ষে এসে শহীদ হওয়া।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় আছে—আশুরার দিন, হুর বুঝতে পারেন যে ওমর ইবনে সাদের বাহিনী ইমামের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন সঠিক পথের। তিনি বলেন: "আল্লাহর কসম! আমি নিজেকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে দেখছি। আমি জান্নাত বেছে নিচ্ছি, যদিও সে জন্য আমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হোক বা পুড়িয়ে দেওয়া হোক!"

এরপর তিনি ঘোড়াকে স্পর্শ করে ইমামের দিকে এগিয়ে আসেন এবং বলেন: "হে রাসূলের পুত্র! আমিই সেই ব্যক্তি যে আপনাকে পথরোধ করেছিলাম, আমি জানি আমার কাজ ভুল ছিল। এখন আমি তওবা করে আপনার সহযোগিতায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই। আপনি কি আমার এই তওবা গ্রহণ করবেন?"

ইমাম হুসাইন (আ.) উত্তরে বলেন: "হ্যাঁ, আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করুন। তুমি যেমন তোমার মা তোমার নাম রেখেছিলেন ‘হুর’ (স্বাধীন), ইনশাআল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তুমিও একজন মুক্ত মানুষ থাকবে।"

এইভাবেই হুর আল্লাহর বন্দেগির অঙ্গীকার করেন এবং মানব ও দানব শয়তানদের দাসত্ব থেকে মুক্তি পান।

আত্মমর্যাদা (عزت نفس)

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সম্মানিত করেছেন, তাকে সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ রূপে গড়ে তুলেছেন এবং সমগ্র সৃষ্টিকে মানুষের জন্য নিয়োজিত করেছেন। এমন একজন মানুষ কখনোই দুনিয়ার মোহে বা অন্য মানুষের দাসত্বে লিপ্ত হতে পারে না। এমনকি মৃত্যু হলেও সে তার সম্মান বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নয়।

এইজন্যই ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন:
 فَإِنِّی لَا أَرَى‏ الْمَوْتَ‏ إِلَّا سَعَادَةً وَ الْحَیَاةَ مَعَ الظَّالِمِینَ إِلَّا بَرَما.
 “আমি মৃত্যুকে সফলতা ছাড়া কিছু দেখি না এবং জালিমদের সঙ্গে জীবনকে অপমান ছাড়া কিছু মনে করি না।”

এই হলো আশুরার শিক্ষা—যে কোনো অনুরোধ বা দাবী, যা মানুষের সম্মানে সামান্যতম আঘাত হানে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
এই শিক্ষাই সকল হুসাইনপ্রেমীদের কথা ও আচরণে প্রতিফলিত হওয়া উচিত—বিশেষত ইসলামি দেশের শাসকদের মধ্যে, যেন তারা ইসলামবিরোধী শক্তির মুখোমুখি হলে সম্মানের সঙ্গে অবস্থান নেন এবং মুসলমানদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আমাদের রাজনীতি হওয়া উচিত হুসাইনির আদর্শে গঠিত—যার ভিত্তি হবে আত্মমর্যাদা, ঈমানের শক্তি ও দ্বীনের গৌরব।

জীবনের মূল্যায়ন

জীবনের মূল্য কোথায়? জীবনের লক্ষ্য কী? কেন আমরা বাঁচতে চাই? নিজের ও চারপাশের দুনিয়াকে সাজানো কতদূর পর্যন্ত যৌক্তিক?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে দুটি বড় দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়—
১. জাগতিক (ম্যাটেরিয়ালিস্টিক)
২. আধ্যাত্মিক/ঈশ্বরকেন্দ্রিক (থিওকেন্দ্রিক)

যদি মানুষ কেবল দুনিয়াকে চিন্তা করে এবং আখেরাতকে ভুলে যায়, তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি হবে নিছক বস্তুবাদী। তখন সে দুনিয়াকে শুধু দুনিয়ার জন্য চায় এবং জীবনের সব প্রচেষ্টা কেবল আরাম-আয়েশের জন্যই নিবেদিত হয়। এমন এক জীবনযাপন যার শেষ নেই—শুধু শূন্যতা!

কিন্তু যদি কেউ দুনিয়াকে আখেরাতের পরিপ্রেক্ষিতে দেখে এবং চিরস্থায়ী জীবনের সাফল্যকে ক্ষণস্থায়ী সুখের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়, তবে সে জীবনকে যেকোনো মূল্যে গ্রহণ করবে না। কারবালার ময়দানে যে অল্প কিছু মানুষ এমন উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইমাম হুসাইনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তারাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম শিক্ষাদাতা।

অন্যদিকে, যারা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল এবং রাসূলের (সা.) দৌহিত্রের রক্ত ঝরাতে দ্বিধা করেনি, তারা শুধু তাদের নিজের আরাম-আয়েশ ও পারিবারিক স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তাদের জন্য দুনিয়ার সুখই সব কিছু ছিল।

মহররম আমাদের শেখায়—জীবনে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নয়

মহররম শিক্ষা দেয়—

ক) জীবন গঠনের ক্ষেত্রে কেবল দুনিয়াবি লক্ষ্য নয়, বরং আখেরাতকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

খ) পরিবারের গঠন যেন শুধু আর্থিক দিক বিবেচনায় না হয়

গ) সন্তান জন্ম দেওয়া যেন শুধুই ভোগবিলাসের চিন্তা থেকে না আসে

ঘ) বিবাহ অনুষ্ঠান যেন কেবল আড়ম্বর ও খরচের প্রতিযোগিতা না হয়ে দাঁড়ায়

আর যদি এসবই নিছক দুনিয়াবি চিন্তা থেকে করা হয়, এবং তারপরও দাবি করা হয়—"আমরা ইসলামের অনুসারী", তবে আমাদের কথা ও কাজের মধ্যে বিরাট অসামঞ্জস্য থেকে যায়।

সারকথা:

আশুরা ও কারবালা আমাদের শেখায়—সম্মান ও আত্মমর্যাদা ছাড়া জীবন মূল্যহীন। হুসাইন (আ.) দেখিয়েছেন যে, জীবন শুধু বেঁচে থাকার নাম নয়, বরং মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা, এবং প্রয়োজন হলে সেই মর্যাদা রক্ষায় মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করা, এটাই প্রকৃত জীবনের শিক্ষা।
__________________________________________

কেন ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালাতে তাঁর পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন?
        ✍️  মইনুল হোসায়েন

কারবালার ঘটনা একটি নজিরবিহীন আত্মত্যাগের ঘটনা। আশুরার দিনে (১০ মহরমে) সকলে শহীদ হওয়ার পরেও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বেঁচে থাকা পরিবার ও আত্মীয়দের উপর কঠিন অত্যাচার ও নিপীড়ন চালানো হয়। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন ওঠে যে, যখন ইমাম হুসাইন (আ.) ভালোভাবেই জানতেন যে, তাঁর ও ইয়াজিদ বাহিনীর মধ্যে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং সেই যুদ্ধে তাঁর শাহাদাত হবে এবং তাঁর পরিবারের অসহায়ত্বের সুযোগে তাঁদেরকে বন্দী করা হবে ও নির্যাতন চালানো হবে - তাহলে কেন ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারকে কারবালায় নিয়ে এসেছিলেন? কেন তিনি তাঁর পরিবারকে এই বিপজ্জনক সফরে সঙ্গী করলেন?

        ইসলামি গবেষকরা উক্ত প্রশ্নের বিভিন্নভাবে উত্তর দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি মত হলো, তৎকালীন আরবদের মধ্যে এটি একটি প্রচলিত প্রথা ছিল যে, তারা তাদের পরিবার ও স্ত্রীদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে সঙ্গে করে নিয়ে যেত। কিন্তু এই উত্তরটি আমাদের কাছে অবাস্তব বলে মনে হয়। কারণ এটি অন্যান্য অনেক প্রশ্ন জন্ম দেয়। যেমন আরবরা কেন তাদের পরিবারকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসত? এমনকি যদি এটি সত্য হয় যে, এই প্রথা আরবদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের পরিবারকে নিয়ে আসার কী কী সুবিধা থাকত? ইমাম হুসাইন (আ.) কি আরবদের প্রথা ও সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণ বা অনুকরণ করতেন? ইমাম হুসাইন (আ.) কি আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করেননি যখন তিনি তাঁর পরিবার ও শিশুদের (যাদের মধ্যে নবজাতকও ছিল) যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে এসেছিলেন?

ইমাম হুসাইন (আ.) জানতেন যে, তাঁর কাঁধে একটি মহান ঐশী দায়িত্ব অর্পিত ছিল। এই দায়িত্ব ছিল, মুসলিম উম্মাহকে জাগ্রত করা। এই দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করতে হতো। এর একটি পর্যায় শাহাদাতের মাধ্যমে পূরণ হবে এবং অন্য একটি পর্যায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের পরে পূরণ হবে। ইয়াজিদ কর্তৃক ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবারের উপর যে জুলুম চালানো হয়েছিল তার বর্ণনা করা জরুরী ছিল। এই দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকাশের মাধ্যমেই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ঐশী দায়িত্ব সম্পূর্ণ হতো। ইয়াজিদ চেয়েছিল ইমাম হুসাইনকে হত্যা করে নিজ ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখা। তাই সে মিথ্যা দাবি করেছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল।

        ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) এবং জনাবে জয়নাব (সা.)-এর নেতৃত্বে কারবালার বন্দীদের দেওয়া বক্তৃতার মাধ্যমেই ইয়াজিদের জুলুম ও অপরাধ উন্মোচিত হয়েছিল। এই অপরাধগুলো বন্দীদের দ্বারা প্রকাশ্যে ফাঁস হওয়ার কারণেই ইয়াজিদ তার অশুভ উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারেনি। ইমাম হুসাইন (আ.) খুব ভালো করেই জানতেন যে, যদি তিনি এবং তাঁর সমস্ত সন্তান ও সঙ্গীরা শহীদ হন এবং তাঁর পরিবারের কিছু সদস্য তাঁর শাহাদাতের সাক্ষী হিসাবে না থাকেন, তাহলে কেউ তাঁর উপর সংঘটিত জুলুমের কথা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করবে না। পরিবারের কিছু সদস্যের জীবিত থাকা এবং বন্দী হওয়া প্রয়োজন ছিল যাতে তাঁরা তাঁর উপর সংঘটিত জুলুম প্রকাশ করতে পারেন, অন্যথায় প্রবাহিত সমস্ত রক্ত ব্যর্থ হতো। এই কারণেই ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারের নারীদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন এবং এই কাজটিকে অপরিহার্য বলে মনে করেছিলেন। 
এর সাথে সাথে একদল গবেষক এই ঘটনার মানবিক ট্র্যাজেডির উপরও আলোকপাত করেছেন। তাঁরা জোর দিয়েছেন যে, ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াজিদের আসল রূপ উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন। এই কারণেই ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারের সকল সদস্য, নারী ও শিশুসহ সবাইকে নিয়ে এসেছিলেন। যদিও তিনি জানতেন ইয়াজিদ তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাথে কী আচরণ করবে, তবুও ইমাম হুসাইন (আ.) তাদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন ইয়াজিদ ও তার সরকারের প্রকৃতি ও পরিচয় উন্মোচিত করার জন্য। এইভাবে তিনি প্রমাণ করতে চাইছিলেন যে ইয়াজিদ মুসলিম উম্মাহর খলিফা হওয়ার যোগ্য ছিল না।

      এই প্রশ্নের সম্ভবত আরও একটি ভালো উত্তর হলো, ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারের নারী ও শিশুদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন কারণ তিনি তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। যদি ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সময় একা যেতেন এবং তাঁর পরিবারকে মদিনায় রেখে আসতেন, তাহলে এই আশঙ্কা ছিল যে খিলাফতের অনুসারীরা তাঁদের গ্রেফতার করে কারাবন্দী করতে পারত।

       ইমাম (আ.) এটিকে উপযুক্ত কারণ হিসাবে দেখেছেন যে, তিনি তাঁর পরিবারকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাবেন, যাতে একদিকে তিনি তাঁদের নিজের সুরক্ষায় রাখতে পারেন এবং অন্যদিকে তাঁরা বিশ্বনবী (সা.)-এর আহলে বাইত (আ.)-এর উপর সংঘটিত জুলুম প্রকাশ করার মাধ্যমে হুসাইনী মিশন চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ইয়াজিদের শাসনের ধরণ বিচার করলে দেখা যায়, আহলে বাইত (আ.)-কে গ্রেফতার করা তার নিকট অসম্ভব কিছু ছিল না। তৎকালীন মদিনার গভর্নর ছিল আমর ইবনে সাইদ আশদাক। যখন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মৃত্যুর খবর তাঁর কাছে পৌঁছায়, তখন সে আনন্দিত হয়। সমগ্র মদিনা যখন শোকে আচ্ছন্ন ছিল এবং সবাই কাঁদছিল ও দুঃখ প্রকাশ করছিল, তখন সে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য শোকাহত মদিনাবাসীদেরকে তিরস্কার করছিল। যদি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পরিবার মদিনায় থেকে যেতেন, তাহলে এমন একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তি তাদের সাথে কী আচরণ করত তা সহজেই অনুমান করা যায়। সে অবশ্যই তাঁদেরকে গ্রেফতার করে কারাবন্দী করত এবং তাঁদের উপর নির্যাতন করত। মদিনার গভর্নর আমর ইবনে সাইদ আশদাক ছিল সেই ব্যক্তি যে, বনি হাশিমের সকল বাড়িঘর ধ্বংস করার আদেশ দিয়েছিল এবং সে ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি তার শত্রুতা ও ঘৃণার কারণে অত্যাচারী হয়ে উঠেছিল।
কারবালার পরবর্তী ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, নিজ পরিবারকে সঙ্গে আনার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না। বস্তুত তাঁরাই কারবালার হুসাইনী মিশনের বার্তাকে বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন এবং তাঁদেরই জন্য কেয়ামত অবধি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট হয়। ইসলামের বেশে থাকা ইয়াজিদের মত শাসকদের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হয় এবং কেয়ামত অবধি সত্যসন্ধানী মানুষের জন্য কারবালা ও ইমাম হুসাইন একটি সত্য পথের সন্ধান দেয়। সত্য ও মিথ্যার সংগ্রামে ইয়াজিদের মত শাসকদের সমর্থনের পরিবর্তে সমূলে উৎপাটন ঘটানোর শিক্ষা কারবালাই আমাদেরকে শিখিয়েছে। বলা বাহুল্য এই সকল শিক্ষাগুলিই ঢাকা পড়ে যেত যদি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পরিবার কারবালাতে না থাকতেন এবং সেই বার্তাগুলি প্রচার না করতেন।
__________________________________________

এক নিঃসঙ্গ আজাদারের খোঁজে...
        ✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

মুহাররম এলেই আমাদের অন্তরে জেগে ওঠে এক গভীর শোকের অনুভব। আমরা মজলিস করি, মাতম করি, হুসাইনের (আ.) নাম স্মরণ করে চোখ ভিজাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই কান্না, এই মাতম কতটা গভীরভাবে সম্পর্কিত সেই ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর শোকের সঙ্গে, যিনি আজও পর্দার অন্তরাল থেকে হুসাইনের জন্য কাঁদেন?

আমাদের আজাদারী কতটা তাঁর আজাদারীর মতো? আমরা কি কেবল একটি আচার পালনের জন্য শোক প্রকাশ করি, নাকি আমাদের কান্না সত্যিই ইমামের কান্নার অংশীদার হতে চায়?

 ইমামের আজাদারী: নিঃসঙ্গতা ও প্রস্তুতির প্রতীক

ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) কেবল একজন আজাদার নন—তিনি হচ্ছেন কারবালার শহীদদের উত্তরসূরি এবং প্রতিশোধপ্রত্যাশী। তিনি তাঁর নানা হুসাইন (আ.)-এর জন্য প্রতিদিন শোক প্রকাশ করেন। তবে তাঁর শোক আমাদের মত প্রকাশ্য নয়। তিনি বলেন, "আমি অশ্রুর বদলে রক্ত ঝরাব।" এটি কোনো অলঙ্কার নয়, বরং এক বাস্তব অনুভূতি।

আমরা যখন সময়সীমাবদ্ধভাবে মজলিসে বসি, তখন তিনি শহীদদের কবরের ধারে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমরা জিয়ারতের জন্য বইয়ের পৃষ্ঠা ব্যবহার করি, আর তিনি করেন হৃদয়ের ক্ষত নিয়ে। আমাদের কান্না অনেক সময় পারিবারিক রীতি, সামাজিক দায়িত্ব বা সংস্কৃতির অংশ; কিন্তু ইমামের কান্না—এটি দায়িত্ব, প্রেম এবং প্রতিজ্ঞার মিশ্রণ।

 আমাদের আজাদারী: দায়িত্ব না দৃষ্টি?

আমরা প্রায়ই নিজেদের আজাদার বলে পরিচয় দিই। কিন্তু আজাদার হওয়া মানে শুধু শোক পালন নয়, বরং এক প্রস্তুতির অংশ হওয়া—ইমামের লক্ষ্য ও অভিযাত্রায় সঙ্গী হওয়া। যদি আজাদারী হয় কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ, তবে তা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু যদি সে আজাদারী হয় দায়িত্ববোধ ও চেতনার জাগরণ, তবে তা হয় সমাজ বদলের শক্তি।

হুসাইন (আ.) আমাদের জন্য কোরবানি দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর রক্তপাতের পূর্ণ প্রতিশোধ এখনও হয়নি। ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-ই সেই প্রতিশোধের সকাল। আমাদের আজাদারী যদি তাঁর আগমনের প্রস্তুতি না হতে পারে, তবে তা পরিপূর্ণ নয়।

আজকের শোকের মূল প্রশ্ন হলো—আমরা কি কেবল অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ? না কি আমরা তা কাজে রূপ দিচ্ছি? ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) আমাদের শোকের মাঝে কি খুঁজে পান সেই চেতনা, যা তিনি চান? আমাদের কান্না কি তাঁকে সান্ত্বনা দেয়, নাকি তিনি কাঁদেন আমাদের নিরুত্তরতার কারণে?

 উপসংহার

আজ আমাদের দরকার এমন এক আজাদারী, যা হবে হৃদয় থেকে উৎসারিত, কিন্তু দায়িত্ববোধে পরিচালিত। ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর শোক এক গভীর আত্মিক প্রস্তুতি—যা শুধু কান্নায় নয়, বরং প্রতিজ্ঞায় প্রকাশ পায়। আমাদের উচিত সেই শোকের শরিক হওয়া, যার ফলশ্রুতি হবে ইমামের ডাকে সাড়া দেওয়া।

সত্যিকার আজাদারীর মানে শুধু মাতম করা নয়,
বরং সেই প্রস্তুতি নেওয়া— যাতে ইমাম (আ:) আমাদের দেখে বলেন, "তোমরা আমার সহযাত্রী, আমার শোকের সাথী।"
__________________________________________

আযাদারির সৌন্দর্য 
        ✍️ রাজা আলী 

আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর সৃষ্ট পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়কে এক এক প্রকার সৌন্দর্য দান করেছেন।এই সৌন্দর্য মানুষের উপভোগ্য।অনুরূপ মানুষের দ্বারা প্রচালিত প্রত্যেক জিনিসেরও রয়েছে 
সুনির্দিষ্ট সৌন্দর্য।আর সৌন্দর্য সৃষ্টির কাজে মানুষ কে উৎসাহিত হতে হয় ও উদ্যোগ নিতে হয়।প্রত্যেকটি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারলেই তা মানুষের মনে তীব্র আবহ ও আবেগ তৈরি করে।

     আমাদের শীয়া মাযহাবের অন্যতম এবাদাত হলো মূলত মুহাররম সফর মাসে পালিত আযাদারী ।এ সময় কারবালা র মসীবতকে স্মরণ রেখে আমরা শোকের আবহের মধ্যে থাকার চেষ্টা করি। সুতরাং সাধারণ সময় ও পরিবেশ থেকে আযাদারীর সময় ও পরিবেশ সম্পূর্ণ পৃথক ও ভিন্ন।তাই আযাদারীর পরিবেশ আমাদের তৈরি করে নিতে হয়।এই পরিবেশ তৈরির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আযাদারীর সৌন্দর্য।

      আমরা যদি আযাদারির এই কয় মাস ভিন্ন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারি বা আযাদারির মধ্যে সৌন্দর্য আনতে পারি ,তবে তা আমাদের নিকট আবেগ সঞ্চারী হয়ে উঠবে;আর অন্য মাযহাবের নিকট গ্রহণযোগ্যও হতে পারে।সেই কারণে আযাদারীর সৌন্দর্যের প্রতি আমাদের সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।এই সৌন্দর্য কে দুই ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে।
     ১.বাহ্যিক সৌন্দর্য বা বাইরের সৌন্দর্য,
     ২.অভ্যন্তরীন সৌন্দর্য বা ভিতরের সৌন্দর্য।

বাহ্যিক সৌন্দর্য:
প্রথমত, যে কোনো অনুষ্ঠানকে সৌন্দর্য মন্ডিত করার গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হলো সময় সচেতনতা। অনুষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময়ে শুরু করে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে হবে। অনুষ্ঠান কতটা সময় ধরে চালানো হবে ,সেটা বড়ো কথা নয়;বড়ো কথা হলো সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠান পরিচালিত হবে।
দ্বিতীয়ত, এমন ভাবে বক্তব্য পরিবেশিত হবে,যাতে ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এর নীতি আদর্শ, কারবালা যাওয়ার উদ্দেশ্য , আহলে বাইত আঃ এর গুণাবলী ইত্যাদি পরিষ্কার বক্তাদের সামনে ফুটে ওঠে এবং আযাদারির প্রতি মানুষের আবেগ তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, মাতমের ক্ষেত্রে বাইরের জৌলুস থেকে বাইরের সংহতি ও মনের দুঃখানুভূতি প্রকাশিত হতে হবে।
চতুর্থত, আযাদারির পরিবেশ যেনো কোনো ভাবেই তর্কাতর্কি বা কোনো রকম বিবাদের মাধ্যমে কলুষিত না হয়,সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
পঞ্চমত, আযাদারির অনুষ্ঠানের শুচি ও পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য নানা রকম ব্যবস্থা করতে হবে।যেমন ,পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা আলাদা বসার জায়গা, মহিলাদের পর্দা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা ।
ষষ্ঠত, তাবারুক পরিবেশন বা বন্টনকে কেন্দ্র করে অহেতুক মূল শোকানুষ্ঠানের আবেগকে নষ্ট না করা,ইত্যাদি।

অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য:
আযাদারির অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য তৈরি করতে আযাদারদের হৃদয়ের শুচি -শুভ্রতা প্রয়োজন। প্রত্যেক আহলে বাইত প্রেমিক মানুষ কে সুস্থ ও সুন্দর বিদ্বেষ বিহীন,প্রশস্ত হৃদয় নিয়ে ফারসে আযাতে বসতে হবে।
ইমাম হোসাইন আঃ এর শোককে অন্তরে গভীর ভাবে অনুভব করে নিজ নিজ হৃদয়ে দুঃখের আবহ রচনা করতে হবে। বাহ্যিক পরিবেশের নানা জাল ও জটিলতা যেনো কোনো ভাবেই অন্তরের শোকানুভূতির মালা ও মাত্রাকে কমাতে না পারে ,সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। এককথায়,নিজ নিজ হৃদয়াভ্যন্তরে নিজের মতো করেই আযাদারীর সৌন্দর্য তৈরি করতে হবে। 
       পরিশেষে বলতে হয়,আযাদারির সৌন্দর্য বিষয়ে আমাদের সচেতনতা ই সব থেকে বড়ো কথা।যদি এ বিষয়ে আমরা গুরুত্ব না দিই বা অমনোযোগী থাকি তবে আমরা কখনোই আযাদারির সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করতে পারবো না। মানুষের বোধ বুদ্ধি আর সচেতনতা কে কাজে লাগিয়ে দায়বদ্ধতা কে সঙ্গী করে সকলে মিলেই আজাদারির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে হবে।

__________________________________________

        মহাররাম ও ইমামে যামানা
           ✍️ আব্বাস আলী

ইসলামি বছরের প্রথম মাস মহরম শুধু একটি নতুন বছরে সূচনাই নয়, বরং তা ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক ইতিহাস গাথা।এই মাসে আমরা ইমাম হোসাইন (আ:)ও তার সঙ্গীদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করি।যারা সত্য-ন্যায় ও ইসলাম রক্ষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।তাই মহরম মাস শুধু শোকের মাস নয়,বরং এটি হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বের এক নজির বিহীন উদাহরণ। 
      মোহররম এমন এক মাস,৬১ হিজরীতে এই মাসেই ইমাম হোসাইন (আ:) ৭২ জন সাথী সহ দাঁড়িয়েছিলেন তখনকার জালেম শাসক ইয়াজিদের বিরুদ্ধে। তিনি দুনিয়ার আরাম-ক্ষমতা বা রাজনীতি নয় ;বরং ইসলামের মূল আকিদা ন্যায়ের মূলনীতি রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। ন্যায় ও ইনসাফের জন্য কারবালার প্রান্তরে জালিম ইয়েজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইন(আ:) এক মহান আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি বলেন-
"আমি ইসলামের সংস্কারের জন্য বার হয়েছি,এবং আমি চাই আমার নানার উম্মতের মধ্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা হোক"।

 তিনি আরো বলেন-
"নিজের মাথাকে কাটাতে হয় কাটাবো। নিজের শাহাদাত দেব তবুও অপমানের সাথে জীবন যাপন করবো না"।
ইমাম হোসাইন আঃ কীভাবে বাতিল কে দূরে ঠেলে দিয়ে ইজ্জাতের সাথে জীবন যাপন করতে হয়,তা আমাদের ৬১ হিজরী র মোহররম মাসে শিখিয়েছেন।

 ইমাম মেহেদী আঃ কারবালার উত্তরাধিকারী

 ইমাম মেহেদী আঃ একাদশ ইমাম ইমাম হাসান আসকারী আঃ সন্তান এবং ইমাম আলী আঃ ও হযরত ফাতেমা (সা আ) বংশধর। তিনি ইমাম হুসাইন (আ)এর উত্তরসূরী। তিনি সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তি যিনি জুলুমে ভরে ওঠা পৃথিবীতে সম্পূর্ণ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। মহরমের শিক্ষা হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও আল্লাহর পথে আত্মত্যাগ। এবং এই গুলোই হল ইমাম মেহেদীর মিশনের ভিত্তি। তিনি কারবালার চেতনার সম্পূর্ণ বাস্তবায়নকারী হবেন।

 কারবেলা থেকে শিক্ষা ও ইমাম মেহেদির অপেক্ষার প্রস্তুতি
আমরা যারা ইমাম হোসাইন (আ)কে ভালবাসি এবং ইমাম মেহেদী আঃ এর আগমণের জন্য প্রতিক্ষা করি,তাদের অনেকগুলি করণীয় রয়েছে।মোহররমের আদর্শের ভিত্তিতে নিজের জীবন যাপনের মধ্যে ইনসাফ ও সততা এবং সত্যকে আঁকড়ে ধরতে হবে।
সমস্ত রকম জুলুম দুর্নীতি ও ফেতনা-ফাসাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। এবং 
নিজের আত্মশুদ্ধি ও ইসলামিক জ্ঞান চর্চা করতে হবে।
     এই সমস্ত বিষয়গুলো আমরা হিজরি সন ৬১ সালে কারবালা থেকে পেয়ে থাকি। যা ইমাম হোসাইন আঃ এবং তার সাথী সঙ্গীরা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।

 মহররম ও ইমাম মেহেদী আঃ

মোহররম এবং ইমামে মেহেদী (আ) এই দুটি বিষয়ই ইসলামে অতি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই একদিকে কারবালার স্মৃতি যেমন আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়;ঠিক তেমনি অন্যদিকে ইমাম মেহেদীর প্রতীক্ষা আমাদের আশাবাদী করে তোলে।
তাই আজকে আমাদের করণীয় কারবালার চেতনায় জেগে ওঠা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।ও সত্যের পথে অটল থাকা এবং ইমাম মেহেদীর আগমনের জন্য ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করা ||

__________________________________________

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পেয়গাম (অনুবাদ)
   ✍️ মাওলানা কাজিম আলি


ইমাম মাহ্দী (আঃ) থেকে একাধিক পেয়গাম শীয়াদের কাছে পৌঁছেচে। এই পেয়গামগুলির মধ্যে বেশির ভাগ ই  প্রশ্নের উত্তর স্থান পেয়েছে। বিভিন্নি সময় 'নওয়াবে আরবাআ'রা' মানুষের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা নিয়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলে ইমাম (আঃ) একটি লেখা নকশা তৈরী করেন। আর ঐ লেখা নকশাটি কামালুদ্দিন শেখ ছোদুক (৩৮১ হিজ্বরী) এবং ইহুতেজাজে শেখ ত্বাবরেসীর (৫৮০ হিজ্বরী) পুস্তকে স্থান পেয়েছে। ঐ লেখাগুলি ছাড়াও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর একাধিক উক্তি ও কথা পাওয়া যায়--যা হয়ত শীয়াদের কাছে পৌঁছেচে তাঁর শিশু বয়সে সাক্ষাতের মাধ্যমে কিম্বা গাইবাত কালে সাক্ষাতের মাধ্যমে। ইমাম মাহদী (আঃ)-এর তাওহীদ ও তাফসীরে কোরআন বিষয়ে, ইমামত এবং আহলেবায়েতের স্থান বিষয়ে, বেদ্বীন ও পথভ্রষ্টদের আক্বীদার পরিবর্তন বিষয়ে, ইমাম মাহ্দী হওয়ার মিথ্যাদাবীকারী ও প্রতিনিধি হওয়া বিষয়ে, বিভিন্ন মাসলা-মাসায়েলের ইমাম (আঃ) কতৃক ব্যাখ্যা বিষয়ে, দোয়া ও যিকির বিষয়ে, চরিত্র ও ফিক্বহ্ বিষয়ে যে সমস্ত আদেশ-আশ্বাস, কথা ও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তা শীয়া মাযহাব সম্পর্কে পরিচিত হবার অতুলনীয় সম্পদ স্বরূপ। 

         বর্তমান নিবন্ধে ইমাম মাহদী আঃ এর কতকগুলি উপদেশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি--

(ক) মানুষকে নিরর্থক সৃষ্টি করা হয়নিঃ-

" কোনো সন্দেহ নেই, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সৃষ্টিকুলকে বেকার সৃষ্টি করেনি। আর কোনো উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা ব্যতীত পৃথিবীতে ছাড়েনি” (অনুবাদ)।

(খ) প্রত্যেকটি যুগে আল্লাহ্ প্রতিনিধি প্রয়োজনঃ

"কখনও জমীন আল্লাহ্ হুজ্জাত ব্যতীত শুন্য থাকবে না-তা সেটা প্রকাশ্যে থাক অথবা গোপনে"।

(গ) ইমামতের অধিকারঃ

"হক্ক আমাদের সঙ্গে; আর আমাদের ব্যতীত কেউ দাবী করলে সে মিথ্যাবাদী"।

(ঘ) গাইবাতের যুগে মানুষের উপকারঃ

"আমার গাইবাতের যুগে আমার থেকে মানুষ উপকৃত হবে, এটা নিশ্চিত। যেমন সূর্য মেঘের আড়ালে অন্তর্হিত হওয়ার পরেও সূর্য থেকে মানুষ উপকৃত হয়"।

(ঙ) সর্বশেষ ওছীঃ

"আমি ওছীগণদের মধ্যে শেষতম ওছী। আল্লাহ্ আমার থেকে আমার বংশ এবং শীয়াদের উপর থেকে বালা মছীবত দূরে রাখবে"।

(চ) আহলে বায়েত ই যথার্থ জ্ঞানের ভান্ডারঃ

আহলেবায়েতের পথ ব্যতীত অন্য কোনো পথে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা আহলেবায়েতকে অস্বীকার করা।

(ছ) অনুসন্ধিৎসু হওয়াঃ

যদি তোমরা হেদায়েতের অন্বেষণ কর, তবে হেদায়েত পাবে; আর যদি হক্কের অন্বেষণ কর, তবে হক্ক পাবে।

(জ) মাহ্দী (আঃ)-এর সাক্ষাৎ না পাওয়ার কারণঃ আমাকে আমার শীয়াদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাদের খারাব আমল। কারণ, খারাব আমল আমার অপছন্দ; আর আমি তাতে অসন্তুষ্ট।

(ঝ) গাইবাতের যুগে শীয়াদের দায়িত্বঃ

তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এমন আমল করা, যাতে তোমরা আমার নিকটবর্তী হতে পার। আর ঐ সমস্ত আমল থেকে দূরে থাকা-যা আমার নিকট অপছন্দ।

(ঞ) নামাজের ফজীলাতঃ

সমস্ত প্রকার আমলের মধ্যে নামাজ হল সর্ব শ্রেষ্ঠ আমল। এই আমলের ফলে শয়তান লজ্জিত হয় ও অপমানিত হয়।

(ট) ইমাম (আঃ)-এর সম্পদঃ

যে ব্যক্তি আমাদের সম্পদ থেকে (হক্ক ব্যতীত) কিছু খেলো, সে জাহান্নামের আগুন দিয়ে পেট ভরালো।

হে আল্লাহ্ আমাদের আপনার পুস্তক, দ্বীন এবং ওলী (আঃ)-কে বেশি থেকে বেশি পরিচিতি করান এবং অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন ইয়া রব্বুল আ'লামীন।

বর্তমান নিবন্ধে র সংক্ষিপ্ত বিষয়

ইমাম মাহ্দী (আঃ) আমাদেরকে কিছু কিছু আদেশ দিয়েছেন। যেমন,-

১.মানুষকে নিরর্থক সৃষ্টি করা হয়নি।
২ জমিন কখনও খোদার হুজ্জাত ব্যতীত খালি থাকবে না।
৩.শুধুমাত্র ইমাম (আঃ)-দের অনুসরণ করেই হক্কের কাছে পৌঁছান সম্ভব। ইমাম মাহ্দী (আঃ) গাইবাতের যুগে আমাদের কাছে মেঘে ঢাকা সূর্যের মতো।
__________________________________________------------------------------------------------




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
                   শহীদের স্মরণে 
        ✍️মো: মুন্তাজির হোসেন গাজী

কুফা তে হজরত আলীর শহিদ
হৃদয় জখম করে আছে,
এই বেদনা ভরা স্মৃতি আজও ভাসে
ইমাম এ যামানার কাছে।।

ফাতেমা জাহরার পাজর ভাঙ্গার
ব্যাথা অন্তর কে কাঁদায়,
বিচার হয়নি আজও
আছি মোরা বিচারের অপেক্ষায়।।

দাফন করিতে দেয়নি 
তির মেরেছে জানাযায়,
ইমাম হাসানের শহিদের আর্তনাদ
পর্দার অন্তরালে শোনা যায়।

কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে
আজও কারবালায়,
শহিদ হুসায়েনের বদলার জন্য
শেষ হুজ্জাত আছেন অপেক্ষায়।

কাউকে কয়েদখানায়  
কাউকে শহিদ করেছে বিষ দিয়ে,
ইমামে জামানার রক্ত অশ্রু
আজও ঝরছে অঝরে।

ইমাম জাফর সাদিক মাটিতে
লুটিয়ে পড়তো যার শোকে,
না জানি কেমন দুঃখে আছেন তিনি
হে! রব সমাপ্ত করে তার দুঃখ কে।।

__________________________________________


আযাদারী 
 ✍️ রাজা আলী

চারিদিকে পোশাকের বাহার
কালোয় কালো
মিষ্টি কথা শুনলে মনে হবে
এর চেয়ে নেই ভালো।

আমরা ,হ্যাঁ,আমরা ই
শিয়া বলে করি জোর গর্ব
অথচ আমলের ভাড়ার শূন্য
হৃদয়ে জায়গা দাও ধর্ম।

আযাদারী আনুষ্ঠানিকতা নয়,চেতনা
মনে রেখো না কোনো ফেতনা
চোখ বুজে চ'লো না পথ
চালাও শুভ চেতনার মনোরথ

কী করছি একবার ভাবো
ইমাম আঃ দেখছেন সব
আমাদের গোনাহ তাঁকে কাঁদায় 
জেনে রাখো,ছাড় দেবেন না রব।
__________________________________________
হে কুফাবাসী…
                মূলঃ আল্লামা ইকবাল
অনুবাদঃ মইনুল হোসেন

আমাকে কুফাবাসী মুসাফির ভেবো না
আমি নিজে আসিনি, আমাকে ডাকা হয়েছে... 

মেহমান বানিয়ে আমাকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, 
আমি কাঁদিনি, আমাকে কাঁদানো হয়েছে...

খোদা জানেন, কেমন এই মেহমানদারি, 
বাহাত্তর পিপাসার্তের জন্য পানি বন্ধ; 
তকদিরে আছে হাউজে কাউসার পান করা, আমি তৃষ্ণার্ত নই, 
আমাকে পান করানো হয়েছে...

যে মাথা আল্লাহর দরবারে নত হয়েছিল, 
সেই মাথা কারবালায় কাটা হয়েছে; 
শাহাদাতের মঞ্জিল আমি পেয়েছি, 
আমি মৃত নই, আমাকে জীবিত করা হয়েছে...


আমাকে কুফাবাসী মুসাফির ভেবো না, 
আমি নিজে আসিনি, আমাকে ডাকা হয়েছে...
_________________________________________


     জিয়ারতের শোক সুরে আজাদারী
          ✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

আমাদের আজাদারী হোক জিয়ারাতে আশুরার ন্যায়—
যেমন প্রতিটি "সালাম" এক প্রেমিকের নিঃশব্দ উচ্চারণ,
আর প্রতিটি "লানত" এক নির্ভীক প্রতিবাদের আগুন।

যেখানে কান্না হয় রক্তজবা, নয় কেবল জলের রেখা—
যেখানে শোক নয় ক্লান্তি, বরং প্রস্তুতির দীপ্ত প্রতিশ্রুতি।
আমাদের মাতম হোক ইমামের কাতরের প্রতিধ্বনি,
আমাদের কণ্ঠে ফুটে উঠুক মাহ্দীর প্রতীক্ষার রোদ্দুর।

আজাদারী হোক আত্মবোধের দীপ্ত শিখা—
যা কারবালার মরুভূমিতে নয়, জ্বলে উঠে আমাদের বুকে।
হোক সে কান্না, যেখানে ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) বলেন—
“তোমরা কাঁদছো আমার মতোই,
এসো—আমার প্রতিশোধে সঙ্গী হও।”
------ _____------_____------______------______------

   

Saturday, June 14, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ জিলহজ্জ সংখ্যা

           

আরবি: জিলহজ্জ, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির হোসেন গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖



নূরের মিলন : আলী ও ফাতেমার (আ.) বিবাহ

শোকের প্রকৃত অর্থ ও ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর শোক

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আছহাব

ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফতের স্বীকৃতি

হযরত আলী (আ.)-র মনোনয়ন দ্বারা দ্বীন পূর্ণতা লাভ করেছে

ঈদে গাদীর - বিদআত নাকি সুন্নাত?

জিলহজ্জে ঝরে পড়া এক মহব্বতের তারা

ইমাম মাহদী আঃ কে চেনার গুরুত্ব এবং কীভাবে তা সম্ভবপর
          ✍️  রাজা আলী 

                    ওয়াদা
           ✍️ আব্বাস আলী



📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

গাইবাতের আর্তনাদ

             
                মারেফাত 
          ✍️  রাজা আলী 

শুধু একবার, হে মাহ্দী!


__________________________________________
__________________________________________

                   সম্পাদকীয়

আল্লাহর অশেষ রহমতে ‘আল-হুজ্জাত’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে জিলহজ্জ্ব সংখ্যা প্রকাশিত হলো। জিলহজ্জ্ব হলো ত্যাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। এই মাস আমাদের শেখায়, কুরবানি মানে শুধু পশু জবাই নয়—নিজের খারাপ ইচ্ছা, অহংকার আর আরামপ্রিয়তাকে ত্যাগ করাও এক ধরনের কুরবানি। ইব্রাহিম (আ.)-এর আজ্ঞাবহতা, ইসমাঈল (আ.)-এর রাজি হওয়া, আর হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত—এই তিনটি ঘটনাই জিলহজ্জ্বকে পূর্ণ করে তোলে।

এই সংখ্যায় আমরা স্মরণ করেছি সেই সব মানুষকে, যারা ঈমানের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন। প্রতিটি লেখার ভেতরেই রয়েছে একটি বার্তা—ইমাম মাহ্দি (আ.)-এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার ডাক।

আসুন, এই জিলহজ্জ্ব মাসে আমরা অন্তর থেকে আল্লাহকে বলি, ‘লাব্বাইক’—আমি হাজির, হে আল্লাহ!
                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

নূরের মিলন : আলী ও ফাতেমার (আ.) বিবাহ
✍️ কবির আলী তরফদার কুম্মী।

رسول الله (ص):
«لَوْ لَمْ يَخْلُقِ اللَّهُ عَلِيّاً، لَما كانَ لِفاطِمَةَ كُفْءٌ»
"যদি আল্লাহ আলীকে সৃষ্টি না করতেন, তবে ফাতেমার কোনো যোগ্য বর থাকত না।"

ভূমিকা:
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর প্রভাব শুধু ঐতিহাসিক নয়, বরং চিরন্তন শিক্ষার উৎস। তেমনি এক শুভ, মোবারক ও মহিমান্বিত ঘটনা হলো হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) ও হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.) এর বিবাহ। এ বিবাহ কেবল দুটি মানুষের নয়, বরং দুটি আধ্যাত্মিক মহত্ত্বের মিলন, যার মধ্য দিয়ে নবীজির পবিত্র আহলে বাইতের উত্তরসূরি বিশ্বে আবির্ভূত হয়।

ফাতেমা (আ.) এর জন্য প্রস্তাবনা:
হযরত ফাতেমা (আ.) ছিলেন মহানবী (সা.) এর প্রিয় কন্যা, যিনি তাকওয়া, পবিত্রতা, জ্ঞান ও খোদাভীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। বহু বিশিষ্ট সাহাবি তাঁর বিবাহের প্রস্তাব দেন যেমন আবু বকর ও ওমর। কিন্তু রাসূল (সা.) সবারকেই বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন, এ বলে:
"আমি অপেক্ষা করছি আল্লাহর আদেশের জন্য।"
(সূত্র: ইবনে মাজাহ, কিতাবুন নিকাহ)

আসমানী নির্দেশ ও আলীর(আঃ) প্রস্তাব:
ইমাম আলী (আ.) এর হৃদয়ে ফাতেমা (আ.) এর প্রতি গভীর সম্মান ও ভালোবাসা ছিল, কিন্তু তিনি তার দারিদ্র্যের কারণে প্রস্তাব দিতে লজ্জিত ছিলেন। রাসূল (সা.) নিজে তাঁকে উৎসাহ দিলেন এবং আলী (আ.) যখন প্রস্তাব দিলেন, তখন রাসূল (সা.) খুশিতে বললেন:
"হ্যাঁ আলী, আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যে ফাতেমার বিবাহ আমি তোমার সঙ্গেই করিয়ে দেই।"
(সূত্র: ইবনে আসাকির, তারীখ দামিশক)

নিকাহ ও মেহর:
রাসূল (সা.) নিজে এ মহান নিকাহ সম্পাদন করেন। হযরত আলী (আ.) তাঁর যুদ্ধের সময়ে ব্যবহৃত একটি বর্ম বিক্রি করে দেন, যা ছিল তাঁর মূল সম্পদ। সে অর্থই ছিল ফাতেমা (আ.) এর মেহর।
মেহর : আনুমানিক ৫০০ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা)।
রাসূল (সা.) সেই অর্থ দিয়ে কনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনলেন, যা ছিল অত্যন্ত সাধারণ, বিনয়পূর্ণ ও নূরানী।

ওলীমা ও বিবাহোত্তর উৎসব:
শাইখ তূসী “আল-আমালী” গ্রন্থে যে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন, তার ভিত্তিতে, রাসূল (সা.) ও হযরত আলী (আ.) অনেক সংখ্যক সাহাবিকে ওলীমার (বিবাহোত্তর ভোজ) জন্য দাওয়াত দিয়েছিলেন। রাসূল (সা.) মাংস ও রুটি সরবরাহ করেন এবং আলী (আ.) খেজুর ও তেল নিয়ে আসেন।
ওলীমার পর রাসূল (সা.) ফাতেমা (সা.)-এর হাত আলী (আ.)-এর হাতে রাখেন এবং তাঁদের জন্য দোয়া করেন। তিনি বলেছিলেন:

"হে আলী! ফাতেমা একজন উত্তম স্ত্রী।"
আর ফাতেমাকে বলেছিলেন:
"হে ফাতেমা! আলী একজন উত্তম স্বামী।"

এরপর তিনি তাঁদের নিজ ঘরে পাঠান এবং তাঁদের কাছে গিয়ে দোয়া করেন, যেন আল্লাহ তাঁদের বংশধারা বরকতময় করেন। 

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতেমা (সা.) এর ঘর বিবাহের কিছু সময় পর নবী (সা.) এর প্রতিবেশী হিসেবে সাহাবি হারিসা ইবনে নোমান এর ঘরে স্থানান্তরিত করা হয়। কারণ, ফাতেমার দূরত্ব রাসূল (সা.) এর জন্য সহনীয় ছিল না। 

এ বিবাহের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব:
এ বিবাহ কেবল সামাজিক নয়, আধ্যাত্মিক ও আসমানীভাবে নির্ধারিত।

রাসূল (সা.) বলেছেন:
"যদি আলী না থাকত, তবে ফাতেমার জন্য যোগ্য কোনো বর থাকত না।"
(সূত্র: মুসনাদ আহমাদ, খাসায়েসে নাসাঈ)

ফাতেমা(আঃ)ও আলীর(আঃ) দাম্পত্য জীবন:
তাঁদের সংসার ছিল প্রেম, শ্রদ্ধা, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির অনন্য এক উদাহরণ।
হযরত ফাতেমা (আ.) কখনো আলীর (আ.) প্রতি কোনো অভিযোগ করেননি। আর আলী (আ.) ফাতেমা (আ.) কে সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা দিতেন।
তাঁদের ঘর থেকেই জন্ম নিয়েছেন ইমাম হাসান (আ.), ইমাম হুসাইন (আ.), জয়নাব (সা.) ও উম্মে কুলসুম (সা.) আহলে বাইতের মহান সদস্যগণ।

উপসংহার:
ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতেমা (আ.) এর বিবাহ আমাদের শেখায়:
দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হচ্ছে তাকওয়া, ভালোবাসা ও ইখলাস।
মোহ, ধন-সম্পদ, চাকচিক্য নয়; বরং পবিত্রতা ও চরিত্র প্রধান।
একটি পরিবার গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমানদার দুইটি হৃদয়ের মিলন।

এই বিবাহ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং যুগে যুগে মুসলিম সমাজের জন্য একটি আদর্শ। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন এমন এক জীবন গঠনের, যেখানে ফাতেমা (আ.) ও আলী (আ.) এর নূরানী পথ অনুসরণ করতে পারি।
__________________________________________

 শোকের প্রকৃত অর্থ ও ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর শোক
✍️ মাওলানা রিপন মন্ডল ইস্পাহানী

ভূমিকা

শিয়া সংস্কৃতিতে শোক পালন কেবলমাত্র আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি প্রতিরোধ, সচেতনতা ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক। এই পরিপ্রেক্ষিতে কারবালার শহীদ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য শোক পালন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই বিপ্লবের অন্যতম উত্তরাধিকারী ও বার্তাবাহক ছিলেন ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) যিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের সাথে আশুরার বার্তা সংরক্ষণ করেন।

শোকের প্রকৃত অর্থ শিয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে

আহলে বাইতের (আ.) দৃষ্টিতে শোক পালন কেবল কান্নাকাটি নয়; এটি হচ্ছে একটি চেতনা জাগানোর মাধ্যম, যা ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ করে এবং আহলে বাইতের উপর যে জুলুম হয়েছে তা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই শোক যদি জ্ঞান ও উপলব্ধির সাথে যুক্ত হয়, তবে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এবং ন্যায় ও মর্যাদার বার্তা বহন করে।

ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর শোক সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন

চতুর্থ শিয়া ইমাম, ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.), কারবালার ট্র্যাজেডির পরে বন্দী হয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে আশুরার সত্য প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি শোককে একটি সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিবাদের রূপে পরিণত করেন।

১. নিয়মিত কান্না ও স্মরণ: ইমাম (আ.) সারাজীবন কারবালার স্মরণে কাঁদতেন। এমনকি তিনি যখন পানি দেখতেন, তখন পিতার (ইমাম হুসাইন আ.) তৃষ্ণার কথা স্মরণ করতেন।

২. দোয়া ও সমাজচিন্তা: তাঁর বিখ্যাত কিতাব সহিফা সাজ্জাদিয়া শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক দোয়া নয়, বরং এতে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তাও আছে। এই দোয়াগুলো ছিল আশুরার শোকের একটি চিন্তাশীল রূপ।

৩. প্রকাশ্য বক্তব্য ও প্রচার: ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ইবনে জিয়াদ ও ইয়াজিদের সভায় ভাষণ দিয়ে শোককে প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দেন। দামেস্কে তাঁর খুতবা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল।


     ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর শোকের বার্তা

আশুরার পরিচয় সংরক্ষণ: উমাইয়া শাসকদের মিথ্যা প্রচারের বিপরীতে তিনি সত্যকে তুলে ধরেন।

জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: শোক ছিল নীরব প্রতিবাদের একটি মাধ্যম।

সচেতন প্রজন্ম গঠনের চেষ্টা: তাঁর দোয়া, ভাষণ ও কান্না একটি প্রতিবাদী ও সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলে।


উপসংহার

ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর দৃষ্টিতে শোক পালন একটি সচেতনতা ও প্রতিবাদের প্রতীক। তিনি কেবল কান্না নয়, দোয়া ও ভাষণের মাধ্যমে আশুরার সত্যকে ইতিহাসে অমর করে রাখেন। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি—শোক যদি হিকমাহ, ধৈর্য ও সচেতনতার সাথে পালন করা হয়, তবে তা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিবাদের রূপ নিতে পারে।
__________________________________________

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আছহাব
   ✍️ মাওলানা কাজিম আলি


فسوف ياتى الله بقوم يحبهم ويحبونه اذلة على المومنين اعزة على الكافرين يجاهدون في سبيل اللهو لا يخافون لومة لائم

“ খুব শীঘ্র আল্লাহ্ এমন মানুষদেরকে আবির্ভূত করবে; যাদেরকে আল্লাহ্ ভালোবাসে। আর তারা ভালোবাসে ঈমানদারদের। আর কাফিরদের বিরোধীতা করবে, আল্লাহর পথে জেহাদ করবে। আর কোনো সমালোচনা কারীর সমালোচনার মূল্য দেবে না"(অনুবাদ)।

প্রথম দিকে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহায্যকারীদের সংখ্যা বদর যুদ্ধের সৈন্যদের মতো নগন্য হলেও ক্রমান্বয়ে তা দশ হাজারে পরিণত হবে। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই আসহাবদের এমন উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হয়েছে যে, আম্বিয়াগণ ও আউলীয়াগণও এই সম্মান প্রত্যাশা করতো।ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। তিনি বলতেনঃ- “যদি আমি ইমাম মাহ্দীর যুগকে পেতাম, তাহলে সমগ্র জীবন আমি তাঁর সাহায্যার্থে অতিবাহিত করতাম"(অনুবাদ)।

তাই আমাদের পাঠ করা দোয়াগুলিতে আমরা প্রতিনিয়ত আল্লাহর নিকট ঐ উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানীয় স্থানের আকাঙক্ষা করে থাকি।

        বিভিন্ন রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহাবীদের কিছু গুণাবলী নিম্নে তুলে ধরা হ'লঃ-

ক। এবাদাত ও পরহেজগারীতাঃ-

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীরা প্রবল এবাদাতকারী ও পরহেজগার হবে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ

"তারা রাতে জেগে জেগে খোদার এবাদাত করবে। নামাজের সময় তাদের আওয়াজ মৌমাছির বিন বিন আওয়াজের ন্যায় হবে। তাদের কপালে সেজদার চিহ্ন থাকবে। আর দিনে তারা বাঘের ন্যায় হবে "(অনুবাদ)।

খ। শক্তি ও অনুসন্ধানঃ-

আমীরুল মোমেনীন (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ

"মাহ্দীর সৈন্য-সাহাবারা যুবক আছে, তাদের মাঝে কেউ বুড়ো নেই”।

প্রকৃত প্রস্তাবে যুবক হওয়া, শক্তিশালী হওয়া, শত্রুদের অনুসন্ধান করা, তাদের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়ান ইত্যাদি হ'ল প্রকৃত সৈন্যদের বৈশিষ্ট্য। আর ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সৈন্যদের এমন সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে, যে কাজগুলিতে সফলতা অর্জন করা শক্তি-সাহস ও বাহাদুরিতা ছাড়া কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ

"তাদের মধ্যে প্রত্যেকে ৪০ জন ব্যক্তির ন্যায় শক্তিশালী হবে। আর তাদের অন্তর লৌহ খন্ডের মতো হবে। যদি তারা লোহার পাহাড়ের ওপর দিয়েও যায়, তবে তা খন্ড খন্ড হয়ে যাবে। আর তারা লোহার তলোয়ারকে ঐ সময় পর্যন্ত নেয়াম বন্দী (তলোয়ার রাখার খাপ) করবে না, যতক্ষণ না খোদা সন্তুষ্ট হবেন” (অনুবাদ)।

        অপর একটি রেওয়ায়েতে ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেছেনঃ

“যদি তাদের উপর কোনো শহরকে ধ্বংস করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে তারা ঐ সময় পর্যন্ত শান্ত হবে না, যতক্ষণ না শহরটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হবে” (অনুবাদ)।

গ। ঈমানঃ-

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীগণ একই সাথে পরিপূর্ণ ঈমানদার এবং জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান হবে। তাদের হৃদয়ে আল্লাহর মারেফাত থাকবে, আর কোনো প্রকার সন্দেহ থাকবে না। তারা নিজেদের মারেফাতের রাস্তা অন্য কোনো পথে নয়; সর্বদা কোরআন ও মাছুমীন (আঃ)-দের হাদীস থেকে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করবে। দ্বীন ইসলামের মধ্যে তাদের স্থান ফক্বীহগণদের মধ্যে গণ্য করা হবে। আর জ্ঞানের বিষয়ে তারা ঐ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসাবে পরিগণিত হবে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেছেনঃ 

“ঐ মোমেনীন, যাদের মাঝে আল্লাহ্ মাহ্দীকে পাঠাবে; তারা নির্ধারিত হবে, শাসক ও বিচারক হওয়া একমাত্র তাদেরই মানাবে। আর দ্বীনে ইসলামে তারা ফক্বীহগণদের মধ্যে গণ্য হবে” (অনুবাদ)।

ঘ। মহব্বত ও অনুসরণকারীঃ

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর প্রতি তাঁর সাহাবীদের সীমাহীন মহব্বত থাকবে। তাঁদের অন্তর শুধুমাত্র ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর মহব্বতে পরিপূর্ণ হবে। তাই প্রত্যেকটি কাজ তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আদেশ মতোই করবে। সর্বদা তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সামনে মাথা নত করে থাকবে।কোনো প্রকার মূল্যতে তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সঙ্গ ছাড়বে না। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ

“যে ব্যক্তি ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হতে চায়, তার উচিত প্রতীক্ষা করা, পরহেজগার হওয়া, মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার করা। তার চরিত্র ও ব্যবহার এমন হবে যাতে এটা বোঝা যায় যে সে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর অপেক্ষায় আছে” (অনুবাদ)।

 বর্তমান অধ্যায়টি আমি ইমাম রিযা (আঃ)-এর দোয়া দিয়ে সমাপ্ত করছিঃ-

হে আল্লাহ্! আমাদের ঐ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত কর, যাদের মাধ্যমে তোমার দ্বীনের মদত হয়; আর এই মদতের মাধ্যমে তুমি যাকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছো। আর আমাদের স্থানে আমাদের পরিবর্তে অপর কাউকে যেন স্থান দিওনা” (অনুবাদ)।

বর্তমান অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

১.ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারীরা এমন উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী যে, ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)ও তাঁর সাহায্যকারী হওয়ার আকাঙক্ষা প্রকাশ করেছেন।

২.আমরা দোয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহর দরবারে ইমাম মাহ্দী (আঃ) কে সাহায্য করার ইচ্ছা পোষণ করে থাকি।

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের কিছু গুণাবলী নিম্নে তুলে ধরা হ'ল,--

ক। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীগণ রাত জেগে এবাদাত করবে।

খ। তাঁরা একদিকে যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি অপর দিকে অনুসন্ধিৎসু হবে।

গ। তাঁরা ঈমানদার হবে।

ঘ। তাঁরা ইমাম (আঃ)-এর প্রতি প্রবল মহব্বতকারী এবং তাঁর উপর জীবন উৎসর্গকারী হবে।

ঙ। তাঁরা পরহেজগার ও সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হবে।

চ। আমাদের আল্লাহর দরবারে দোয়া করা উচিত যে, তিনি যেন আমাদেরকে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব কে যেন দ্রুত ত্বরান্বিত করেন।
             
_________________________________________

ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফতের স্বীকৃতি
✍️ সুজা উদ্দিন মাশহাদী
                           
উসমান (রা.)-এর মৃত্যু 
উসমান (রা.)-এর শাসনামলে কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আত্মীয়দের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে মুসলিম সমাজে অসন্তোষ দেখা দেয়। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে (৩৫ হিজরি) মিসর, কুফা ও বসরার কিছু বিদ্রোহী মদিনায় এসে উসমান (রা.)-এর বাড়ি অবরোধ করে। দীর্ঘ অবরোধের পর, বিদ্রোহীরা তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তাকে হত্যা করে 
ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফতের স্বীকৃতি ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অধ্যায়।


খেলাফতের গ্রহণ:
উসমান (রা.)-এর মৃত্যুর পরে মদিনায় এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সাহাবিদের বড় একটি অংশ এবং সাধারণ জনগণ ইমাম আলী (আঃ)-কে খেলাফতের জন্য আহ্বান জানান। তাদের অনেক অনুরোধে তিনি খেলাফত গ্রহণ করেন (25 জিলহিজ্জ 35 হিজরি)


প্রাথমিক স্বীকৃতি:
মদিনার অধিকাংশ মুসলমান, সাহাবি ও গুরুত্বপূর্ণ শহর যেমন কুফা ও বসরার মানুষ তাঁর খেলাফতকে স্বীকৃতি দেন। বিশেষত আনসার ও মুহাজিরদের অনেকেই তাঁর পক্ষে ছিলেন।


বিরোধিতাকারী গোষ্ঠী:

কিন্তু সবাই স্বীকৃতি দেয়নি। বিশেষত শামের গভর্নর মু'আবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান উসমান (রা.)-এর হত্যার বিচার দাবি করে খেলাফত মানতে অস্বীকার করেন। আয়েশা (রা.), তলহা ও যুবাইরও শুরুতে বিরোধিতা করেন, যার ফলে "যমল যুদ্ধ" হয়।


                    পরিণতি:

এই বিরোধিতা ও গৃহযুদ্ধের কারণে তাঁর খেলাফতকাল (প্রায় ৫ বছর) নানা সংঘর্ষে জর্জরিত ছিল। তবে বহু বড় সাহাবি এবং দ্বীনদার মানুষ তাঁকে প্রকৃত খলিফা ও হকপন্থী নেতা হিসেবে মানতেন।


মাযহাবে ইমামীয়ার দৃষ্টিতে ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফত

ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফত শরিয়তের দৃষ্টিতে পূর্ণ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ছিল, তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও পূর্ববর্তী হত্যাকাণ্ডের জের ধরে তার খেলাফত সর্বত্র শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।মাযহাবে ইমামীয়া তাঁকে সরাসরি রাসুল (সা.)-এর পর উত্তরসূরি হিসেবে মানেন কারণ,,,,,,
ঈদে গাদীর (عيد الغدير) ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা মূলত মাযহাবে ইমামীয়া দের কাছে ঈদের সমতুল্য মর্যাদা পায়। এটি হিজরি ১৮ জিলহজ্জে সংঘটিত হয়।


           ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
হজ্বুল বিদা (শেষ হজ) শেষে, রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদীর খুম নামক স্থানে দাঁড়িয়ে লাখো সাহাবির সামনে ঘোষণা দেন:
"من كنت مولاه فهذا علي مولاه"
"যার আমি (মাওলা), আলী তার (মাওলা)।"
এই ঘোষণার মাধ্যমে রাসূল (সা.) ইমাম আলী (আ.)-কে তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি ও উম্মতের নেতা হিসেবে নিযুক্ত করেন।


           মাযহাবে ইমামীয়া দৃষ্টিতে:

- এটিকে ইমামত ও ওলায়াত প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
- এই দিনে ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি নবীর (সা.) নেতৃত্ব হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়।
-মাযহাবে ইমামীয়া এই দিনটিকে  বড় ঈদ হিসেবে পালন করে থাকেন।

 উপসংহার:
প্রকৃত পক্ষে ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফত হজ্বুল বিদা (শেষ হজ) শেষে, রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদীর খুম নামক স্থানে দাঁড়িয়ে লাখো সাহাবির সামনে ঘোষিত হলেও কিছু সাহাবি সেটা মেনে নিতে পারেন নি ।
ঈদে গাদীর আমাদের শেখায় নেতৃত্বের গুরুত্ব, সত্যের অনুসরণ, ও আহলে বাইতের প্রতি আনুগত্য। এটি শুধুই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং ইসলামী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষার পবিত্র দিন।
__________________________________________

 হযরত আলী (আ.)-র মনোনয়ন দ্বারা দ্বীন পূর্ণতা লাভ করেছে
✍️  মজিদুল ইসলাম শাহ


ইমাম আলী (আ.)-কে মনোনয়ন করার মাধ্যমে নবুওত বন্ধ হয়নি বা অসম্পূর্ণ থাকেনি; বরং তা তার পূর্ণতার দিকে এগিয়ে গেছে। আল্লাহ্‌ যখন আলী (আ.)-কে মুসলমানদের খলিফা হিসেবে মনোনীত করলেন-যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর সবচেয়ে শক্তিশালী, জ্ঞানী ও বিজ্ঞ মুসলিম-তখন তিনি নিজের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করলেন।

আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর সরাসরি নেতৃত্ব ও খিলাফত প্রমাণকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াতগুলোর মধ্যে গাদীর দিবসে নাজিল হওয়া আয়াতগুলো অন্যতম। যেমন-আয়াত বালাগ বা আয়াত তাবলিগ এবং আয়াত একমালে দ্বীন। এসব আয়াতের তাৎপর্য নতুনভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘতা ও পাঠকের ধৈর্যের কথা বিবেচনায় রেখে আমরা পূর্বে পৃথক একটি প্রবন্ধে "আয়াত তাবলিগ" নিয়ে আলোচনা করেছি। এবার এই আলোচনায় "আয়াত একমালে দ্বীন" নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। আশা করা যায়, এই কাজ আল্লাহ, রাসূল (সা.) ও তাঁর ন্যায্য উত্তরাধিকারীর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক হবে।
আয়াত একমালে দ্বীন:
আল্লাহ্‌ সূরা মায়েদার ৩য় আয়াতে বলেন:
"الْیَوْمَ یَئِسَ الَّذِینَ كَفَرُوا مِنْ دِینِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ ۚ الْیَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِینَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَیْكُمْ نِعْمَتِی وَرَضِیتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِینًا..."
অর্থাৎ: আজ কাফিররা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেছে; অতএব, তাদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো! আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের ওপর সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য চিরস্থায়ী দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।

আলোচনার প্রেক্ষাপট:
এই আয়াতে এমন এক মহান ও গৌরবোজ্জ্বল দিনের কথা বলা হয়েছে যা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মোড় ঘোরানো দিন ছিল। এটি এমন এক দিন, যার বার্তা ছিল:
শত্রুর হতাশা, দ্বীনের পূর্ণতা, আল্লাহর নিয়ামতের পরিপূর্ণতা, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
আসলে এই দিনটি কী ছিল?

ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ:

দ্বীনের পূর্ণতা ও নিয়ামতের সমাপ্তি
"الْیَوْمَ یَئِسَ الَّذِینَ كَفَرُوا مِنْ دِینِكُمْ"
ইসলামের শত্রু ও কাফেররা শুরু থেকেই ইসলাম ধ্বংসের চেষ্টা করেছে। তবে প্রত্যেক ধাপে ব্যর্থ হয়ে ভবিষ্যতের আশায় ছিল। কিন্তু এই আয়াত নাজিলের সময় এমন এক ঘটনা ঘটল, যার ফলে কেবল তাদের চলতি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়নি, বরং ভবিষ্যতের আশা-ভরসাও শেষ হয়ে গেছে।
"فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ"
এই মহান বিজয়ের দিন মুসলমানরা শত্রুদের ভয় না করে একমাত্র আল্লাহকে ভয় করবে। কারণ এখন মূল হুমকি বাইরের নয়, বরং আত্মিক দুর্বলতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করা।
"الْیَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِینَكُمْ..."
এই গৌরবোজ্জ্বল দিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে দ্বীন পরিপূর্ণ হলো এবং আল্লাহর নিয়ামত পূর্ণতা লাভ করল।
"وَرَضِیتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِینًا"
আজকের দিনের গুরুত্ব এত বেশি যে, আল্লাহ ইসলামকে মানুষের চিরন্তন ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
এই দিনটি কী দিন ছিল?

এই আয়াত চারটি বৈশিষ্ট্য যুক্ত এক দিনের কথা বলছে:
১. কাফেররা হতাশ হয়,
২. দ্বীন পূর্ণ হয়,
৩. নিয়ামত পরিপূর্ণ হয়,
৪. ইসলাম চিরন্তন ধর্ম হিসেবে গৃহীত হয়।
এই চার বৈশিষ্ট্য সম্বলিত দিনটি গাদীর খুমের দিন ব্যতীত আর কোনো দিন হতে পারে না।

এই আয়াতের গভীরতা ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে দুটি পথ রয়েছে:
১. আয়াতের বক্তব্য নিজে বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি করা, বাইরের উৎস ব্যতিরেকে।
২. আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদীস ও মুফাসসিরদের মতামত দ্বারা ব্যাখ্যা করা।
উভয় পথেই স্পষ্ট হয়: গাদীরের দিনই সেই মহান দিন, যেদিন আল্লাহ ইমাম আলী (আ.)-কে মনোনীত করে দ্বীনকে পূর্ণতা দান করেন।

আয়াত ইকমাল-এর ব্যাখ্যা
এই পবিত্র আয়াতটি নবী করিম (সা.)-এর জীবনের কোন ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত?
এই প্রশ্নের উত্তরে ফখর রাজী দুটি মতামত দিয়েছেন, এবং মরহুম তাবারসী একটি তৃতীয় মত তুলে ধরেছেন।
আমরা আল্লাহর সাহায্য নিয়ে, যুক্তি ও বিবেকের আলোকে এবং পক্ষপাত ও আবেগ থেকে মুক্ত থেকে, এমনভাবে এই তিনটি মত বিশ্লেষণ করব যাতে বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যে কোনো আঘাত না লাগে।

প্রথম মত (ফখর রাজীর):
তিনি বলেন, "اليوم" শব্দটি এখানে তার প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; এটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে-অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট দিন নয়, বরং একটি সময়কাল বা যুগ বোঝাতে। যেমন বলা হয়: “গতকাল আমি যুবক ছিলাম, আজ আমি বৃদ্ধ”, এটি একটি সময়ের রূপক প্রকাশ।
উত্তর: এই ব্যাখ্যার কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বা নির্দিষ্ট রূপক নির্দেশনা নেই। রূপক অর্থ ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট প্রেক্ষাপট দরকার, যা এখানে নেই। সুতরাং, এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয় মত (ফখর রাজী):
"اليوم" শব্দটি প্রকৃত অর্থেই কোনো নির্দিষ্ট দিন বোঝাচ্ছে, আর সেই দিনটি হচ্ছে হজ্জের ‘আরাফা’ দিবস (১০ হিজরির হজ্বে বিদা)।
উত্তর: এই দিনটি আগের বছরের আরাফার দিনের থেকে কিসে ভিন্ন ছিল? যদি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেই না থাকে, তাহলে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বলা হলো? অতএব, এই ব্যাখ্যাও যুক্তি-সঙ্গত নয়।

তৃতীয় মত (মরহুম তাবারসী):
তিনি ফখর রাজীর দুটি মত প্রত্যাখ্যান করে আহলুল বায়েত (আ.)-এর ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করেন, যা সকল শিয়া মুফাসসির ও বিদ্বানদের দ্বারা সমর্থিত।

এই মতানুসারে, আয়াতে যে গৌরবময় দিনটির কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে: ১৮ জিলহজ্জ, ১০ হিজরি- গাদীর খুম দিবস।
সেদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর আদেশে হযরত আলী (আ.)-কে তাঁর উত্তরসূরি ও মুসলমানদের নেতা ঘোষণা করেন।
এই ব্যাখ্যা আয়াতের সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?
উত্তর: পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ:
১. শত্রুর হতাশা:
ইসলামবিরোধীরা সব চক্রান্তে ব্যর্থ হয়ে শেষ আশায় ছিল যে, রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর, যেহেতু তাঁর কোনো পুত্র নেই ও কোনো উত্তরসূরি ঘোষণা করেননি, তখন ইসলাম ধ্বংসের সুযোগ মিলবে। কিন্তু গাদীর দিবসে যখন রাসুল (সা.) হাজার হাজার সাহাবার সামনে হযরত আলী (আ.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করলেন, তাদের সব আশা শেষ হয়ে গেল।
২. ধর্ম পূর্ণতা পেল:
নবুয়তের পরে ইমামত দ্বারা ইসলাম পূর্ণতা পায়। হযরত আলী (আ.)-কে খলীফা নিযুক্ত করার মাধ্যমে, ইসলাম ধর্ম তার পূর্ণরূপ পেল। নবুয়ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়নি।
৩. নিয়ামত সম্পূর্ণ হলো:
রাসুলের (সা.) পর নেতৃত্ব নির্ধারিত হওয়ায় আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নিয়ামত পূর্ণ হলো।
৪. বিশ্বজনীন ধর্ম হিসেবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলো:
ইমামত ছাড়া ইসলাম একটি পূর্ণ, চিরস্থায়ী ধর্ম হতে পারে না। প্রতিটি যুগে মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে একজন নির্ভুল নেতা প্রয়োজন, যা ইমামতের মাধ্যমেই সম্ভব।


সারকথা: গাদীরের ঘটনার ভিত্তিতে আয়াতের ব্যাখ্যা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, বরং একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যা। এই ঘটনার মাধ্যমেই মুনাফিকদের আশা ছিন্ন হয় এবং আল্লাহর ধর্ম পূর্ণতা পায়।“দ্বীন পূর্ণ করলাম”-এর অর্থ কী?

এই অংশের ব্যাখ্যায় তিনটি মত রয়েছে:
১. দ্বীন মানে আইন:
কেউ কেউ বলেন, “দ্বীন” বলতে ইসলামি আইন বোঝানো হয়েছে, যা ওই দিন পূর্ণতা পেয়েছে।
প্রশ্ন: যদি তাই হয়, তাহলে ওই দিনে এমন কী নতুন আইন বা বিধান নাজিল হয়েছিল, যা এত গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য?
২. দ্বীন মানে হজ্ব:
কারো মতে, আয়াতে ‘দ্বীন’ বলতে ‘হজ্ব’ বোঝানো হয়েছে।
উত্তর: ভাষাগতভাবে ‘দ্বীন’ মানে পূর্ণ জীবনব্যবস্থা-আকীদা ও আমলের সমন্বয়; হজ্ব তার একটি অংশ মাত্র। তাই এই ব্যাখ্যা ভুল।
৩. কাফেরদের পরাজয়:
কেউ বলেন, এই আয়াতের অর্থ হলো-মুসলমানরা শত্রুদের উপর বিজয় লাভ করেছিল।
প্রশ্ন: কোন শত্রু? মক্কার মুশরিকরা ৮ হিজরিতেই পরাজিত হয়েছিল, ইহুদিরা যুদ্ধের মাধ্যমে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। খ্রিস্টানরাও শান্তিচুক্তি করেছিল। তাহলে ১০ হিজরিতে নতুন করে কী ঘটল?
উত্তর নেই।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ: শিয়া মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা-গাদীরের ঘটনাই হচ্ছে দ্বীনের পূর্ণতার কারণ-সব প্রশ্নের স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত উত্তর দেয়। সুতরাং, আয়াতে ইকমালের একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যা হলো গাদীর খুম ও হযরত আলী (আ.)-এর ইমামত প্রতিষ্ঠা।
__________________________________________

ঈদে গাদীর - বিদআত নাকি সুন্নাত?
     ✍️ মইনুল হোসেন

  শিয়াদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তিগুলির মধ্যে একটি আপত্তি হলো অনেকেই বলে থাকেন যে, শিয়ারা নিজেদের জন্য একটি নতুন ঈদ উদ্ভাবন করেছে - যার নাম ঈদে গাদীর। অভিযোগকারী সম্প্রদায়ের মত হল, মুসলমানদের জন্য মাত্র দুটি ঈদ রয়েছে - ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। এই যুক্তির উপর ভিত্তি করে, তারা গাদীরের দিনে ঈদ উদযাপনকে বিদআত বলে মনে করে।

 আরবি শব্দ ‘ঈদ’ কথাটি ‘আদা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ফিরে আসা বা পুনরাবৃত্তি হওয়া। এথেকে বোঝা যায় যে ঈদের দিন প্রতি বছর ফিরে আসে। সমস্ত ঐশী ধর্মে যেকোনো ঈদ একটি স্মরণীয় উপলক্ষ বা একটি বড় অর্জন উদযাপনের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছিল। মুসলমানেরাও একই প্রথা অনুসরণ করে। 

উদাহরণস্বরূপ প্রতি বছর শাওয়ালের ১ তারিখ ঈদুল ফিতর হিসাবে পালিত হয় কারণ এটি রমজান মাসের সমাপ্তি চিহ্নিত করে এবং তাই সমস্ত রোজাদার মুসলমানদের জন্য আনন্দের কারণ হয়। ফলস্বরূপ, মুসলমানেরা এই দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদযাপন করে। একইভাবে হজ্ব সমাপ্তির দিন তথা নবী ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নত পালনের নিমিত্তে সমস্ত মুসলমান ঈদুল আযহা উদযাপন করে।

গাদীরের দিনটি কেবল মুসলমানদের ঈমানের পূর্ণতাকেই চিহ্নিত করে না বরং এটি সেই দিন যখন দ্বীনে ইসলাম ঐশী ধর্ম হিসাবে তার পরিপূর্ণতায় পৌঁছেছিল। ১০ হিজরির ১৮ই জিলহজ্ব তারিখে আল্লাহর নির্দেশে যখন মহানবী (সাঃ) সকলের সম্মুখে “আমি যার মাওলা, এই আলীও তার মাওলা” কথাটি ঘোষণা করেন, সেই মুহুর্তে মহান আল্লাআহ রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াতটি নাযিল হয়। যেখানে মহান আল্লাহ্‌ ঘোষণা করছেন, “...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করে সন্তুষ্ট হলাম…

এই আয়াতটি গাদীরের দিনে অর্থাৎ ১৮-ই জিলহজ্ব তারিখে নাজিল হয়েছিল এবং এই বিষয়টি সমস্ত মুসলমানদের দ্বারা বহুলভাবে প্রসিদ্ধ। তাহলে একজন প্রকৃত মুসলমান ব্যক্তি এমন একটি দিনকে কেন ঈদ হিসাবে উদযাপন করবে না যেদিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর মনোনীত ধর্ম ইসলামকে পূর্ণতা দান করেছেন? 

ঈদে গাদীর উদযাপনের ফযিলত
আহলে সুন্নাতের আলেম ইবনে তালহা শাফেয়ী তার কিতাব মাতালিব আল-সু’উল, পৃষ্ঠা ৭৯-এ বলেন, “আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) নিজেই তাঁর কবিতায় গাদীরে খুমের দিনটিকে ঈদ হিসাবে স্মরণ করেছেন, কারণ এই দিনে মহানবী (সা.) মুসলমানদের উপর ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়েত (অভিভাবকত্ব)-এর ঘোষণা করেছিলেন। আর এইভাবে মহানবী (সা.) তাকে অন্য সকল মানুষের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।” 

সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, আমীরুল মুমিনীন ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) নিজ জীবনে এই দিনটিকে ঈদ হিসাবে গণ্য করেছিলেন এবং গাদীরে খুমে উপস্থিত সাহাবীরাও যাঁদের মধ্যে হজরত ওমর (রা.), হজরত আবুবকর (রা.) প্রমুখ ছিলেন, তারা ইমাম আলী (আ.)-কে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উত্তরাধিকারী হিসাবে নিয়োগের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে এই অনুষ্ঠান উদযাপন করেছিলেন। তাদের কেউই এটিকে ধর্মের মধ্যে বিদআত বলে আপত্তি করেননি। প্রকৃতপক্ষে, তারা নিজেরাই সেই দিনটি উদযাপন করেছিলেন। তাহলে কেন তাদেরই অনুসারীরা ইসলামের এই শ্রেষ্ঠ ঈদকে অস্বীকার করে? এর দুটি কারণ থাকতে পারে – 

(১) হয় তারা প্রকৃত ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, যার কারণে তারা তাদের নিজস্ব নেতাদের অনুসরণ করছে না।

 অথবা (২) তারা সচেতন কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করছে এবং তাদেরকে সঠিক বেলায়েত (অভিভাবকত্ব) অর্থাৎ আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ থেকে দূরে রাখছে কিছু তুচ্ছ পার্থিব লাভ বা ক্ষমতার জন্য।

পরিশেষে সকল মুসলমানের প্রতি একটি আন্তরিক আবেদন যে – যদি আপনি আপনার ঈমান এবং ইসলামকে পরিপূর্ণ করতে চান, যদি আপনি আল্লাহর ধর্মকে তার প্রকৃত অর্থে অনুসরণ করতে চান,‌ যদি আপনি পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অমান্য করতে না চান - তাহলে ইসলামের এই শ্রেষ্ঠ ঈদকে সঠিক মূল্যায়ণসহ পালন করা উচিত। কারণ এই দিনটি উদযাপনের সওয়াব অপরিসীম। মহান শিয়া আলেম সাইয়েদ ইবনে তাউস তার কিতাব ইকবাল আল-আ’মাল, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৪-৪৬৫-এ ইমাম আলী ইবনে মূসা (আ.) থেকে একটি দীর্ঘ রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন,
...যে ব্যক্তি গাদীরের দিনে তার মুমিন ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন, তার হাজারো আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবেন, তার জন্য জান্নাতে সাদা মুক্তার একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন এবং তার চেহারা আলোকিত করবেন কারণ এটি সাজসজ্জার দিন। সুতরাং, যে ব্যক্তি গাদীরের দিনে সাজসজ্জা করবে, আল্লাহ তার করা প্রতিটি ছোট-বড় ভুল ক্ষমা করে দেবেন এবং আল্লাহ তার জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করবেন যে তার জন্য ভালো কাজ লিখবে, তার মর্যাদা বাড়াতে থাকবে পরের বছর একই দিন পর্যন্ত। যদি সে মারা যায়, সে শহীদ হিসাবে মারা যাবে এবং যদি সে জীবিত থাকে, সে সৌভাগ্যের জীবন যাপন করবে। যে ব্যক্তি একজন মুমিনকে খাবার খাওয়াবে, সে যেন সকল নবী (আ.) এবং সত্যবাদীদের খাবার খাওয়ালো। যে ব্যক্তি এই দিনে একজন মুমিনকে দেখতে যাবে, আল্লাহ তার কবরে ৭০টি আলো প্রবেশ করাবেন, তার কবর প্রসারিত করবেন এবং প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা তার কবরে এসে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেবে..."।
__________________________________________

জিলহজ্জে ঝরে পড়া এক মহব্বতের তারা
              ✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

জিলহজ্জ—তাওহীদের সুগন্ধময় মাস। এই মাসে কা'বার আঙিনায় প্রতিধ্বনিত হয় কুরবানির আহ্বান। প্রতিটি তাকবীর যেন হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে সেই স্মৃতি— ইব্রাহিম (আ.)-এর আত্মসমর্পণ, ইসমাইল (আ.)-এর নিঃশব্দ উৎসর্গ। এই পবিত্র সময়ে, ইতিহাসের ছায়া থেকে উঠে আসেন এক অন্যরকম কুরবানিদাতা—হজরত মিসাম তাম্মার (রহ.)।

তিনি ছিলেন না কোনো খ্যাতিমান রাজপুত্র, ছিলেন না কোনো ধনবান সমাজনেতা। তিনি ছিলেন একজন দাস, একজন সাধারণ খেজুর বিক্রেতা। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল এমন প্রেম, যা তাঁকে করে তোলে আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল মিনার। তাঁর জিহ্বায় জ্বলে উঠেছিল আলী (আ.)-এর ফজিলতের শিখা; তাঁর জীবনের রক্তরেখায় লেখা হয়েছিল এক অনন্ত প্রেমের ইতিহাস।

 ইতিহাসের প্রাঙ্গণে মিসামের আগমন

পারস্যের এক কোণ থেকে উঠে আসা এই গৌরবান্বিত মানুষটি ছিলেন এক নিঃস্ব দাস। কুফার রাজপথে একদিন তাঁর ভাগ্য বদলে যায়—ইমাম আলী (আ.) তাঁকে শুধু দাসত্ব থেকে নয়, বরং অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করেন।

ইমামের সান্নিধ্যে এসে মিসাম হয়ে উঠেন ‘আলিমুন বিল-আসমা’— নামের গভীরতম অর্থ বোঝা এক আত্মার অধিকারী। তাঁর হৃদয়ে অঙ্কুরিত হয় এমন এক নীরব দীপ্তি, যা তাঁকে করে তোলে সত্যের বাহক ও প্রেমের শহীদ।

 প্রেমিকের পরিণতি : ইমামের কণ্ঠে ঘোষিত

একদিন ইমাম আলী (আ.) মিসামকে ডেকে বললেন—
 “হে মিসাম! আমার শাহাদাতের পর তোমাকেও বন্দি করা হবে। তোমাকে একটি খেজুরগাছে বেঁধে রাখা হবে। তোমার জিহ্বা কেটে নেওয়া হবে, কারণ তুমি আমার কথা বলবে, নির্ভয়ে আমার প্রেম ঘোষণা করবে।”

মিসাম জিজ্ঞেস করলেন—
 “হে আমার মাওলা, সে অবস্থায় কি আমার দ্বীন নিরাপদ থাকবে?”

ইমাম শান্ত কণ্ঠে বললেন—
 “হ্যাঁ, হে মিসাম! তোমার দ্বীন অক্ষত থাকবে। এই শাহাদাত হবে তোমার ঈমানের পূর্ণতা।”

এই কথোপকথন ছিল শুধু ভবিষ্যদ্বাণী নয়—এটি ছিল একটি প্রতিজ্ঞা, এক দাস প্রেমিকের হৃদয়ে শাহাদাতের বীজ বপনের মুহূর্ত।

 চলমান মিনবারের ভাষা : মিসামের উচ্চারণ

মিসামের কণ্ঠ ছিল এক চলমান মিনবার। কুফার অলিগলি, হাটবাজার, মসজিদে—তিনি বারবার বলতেন:
 “আমি জানি, তারা আমার জিহ্বা কেটে ফেলবে। কিন্তু যতক্ষণ তা কাটা হয়নি, আমি বলব— আলী হক, আলী নূর, আলী ইমাম।”

এই ছিল তাঁর প্রেম—যা প্রতিকূলতার মাঝেও নীরব আলো হয়ে জ্বলে থাকত, বাতাসে ভেসে যেত, সময়কে স্পর্শ করে ইতিহাসে গাঁথা হয়ে যেত।

 শাহাদাতের সকাল

ইমাম আলীর (আ.) সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়ে উঠল। কুফার শাসক উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ, মুয়াবিয়ার আদেশে, মিসামকে গ্রেফতার করল। তাঁকে একটি খেজুরগাছে বেঁধে রাখা হলো। সেদিন সূর্য ছিল উজ্জ্বল, আকাশ ছিল নির্বাক। আর সেই গাছের ছায়ায় বাঁধা ছিল এক প্রেমিক, যাঁর অপরাধ ছিল শুধু একটিই—তিনি সত্য বলেছিলেন, প্রেম উচ্চারণ করেছিলেন।

তাঁর জিহ্বা কেটে নেওয়া হলো—এক নির্মম বাস্তবতা, যার পেছনে ছিল এক গভীর ভয়: সত্য যদি উচ্চারিত হয়, তবে তা জাগিয়ে তোলে অন্তর, বদলে দেয় সমাজ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—একজন প্রেমিকের জিহ্বা থামানো যায়, তবে তাঁর প্রেমের উচ্চারণ থামে না।

সেই খেজুরগাছ আজও যেন দাঁড়িয়ে আছে কুফার আকাশের নিচে, বাতাসে ভেসে আসে নীরব ঘোষণা— “সত্য রক্তে লেখা হলে, তা চিরস্থায়ী হয়।”


 মিসাম থেকে আমাদের প্রেরণা

হজরত মিসামের জীবন কেবল এক অতীত নয়—এ এক জাগ্রত প্রতিচ্ছবি, যা আমাদের শেখায়:
যে প্রেম ইমামের প্রতি নিবেদিত, তা আত্মার পরিচয় হয়ে ওঠে।
সত্য বলার মূল্য হয়তো রক্ত, কিন্তু সে সত্যই হয়ে ওঠে ঐশ্বরিক দীপ্তির আধার।
যখন এক দাস হয়ে ওঠে শহীদ, তখন আমরা—স্বাধীন মানুষ—নীরব কেন থাকব?

মিসামের কণ্ঠ যেন আমাদের হৃদয়ের দরজায় প্রশ্ন রাখে— “তোমরা স্বাধীন হয়েও নীরব কেন?”

এ প্রশ্ন শুধু ইতিহাসের নয়,
এ প্রশ্ন আজও ভেসে আসে সময়ের হাওয়ায়,
যার উত্তরের দাবি রাখে সেই এক মহাপ্রেম—
ইমামে জামানা (আ.)-এর প্রতি আমাদের অঙ্গীকার।

আমরা কি সেই কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছি—
যা তাঁর পক্ষে দাঁড়ায়?
আমরা কি সেই প্রস্তুতি গড়েছি—
যা তাঁর প্রতীক্ষাকে অর্থবহ করে?

তাই একটু ছন্দের ভাষায় বলি;-
হে মাহদি! ও গায়েব চাঁদ!      
      যাঁর আলোয় জাগে রাতের প্রাণ,
আমরা কী তবে নিরুত্তর থাকি? 
      নাকি জ্বালাই প্রেমের নিঃশব্দ দীপদান?

 উপসংহার

হজরত মিসাম তাম্মার (রহ.)—একজন নিঃশব্দ প্রেমিক, যাঁর আত্মত্যাগ ছিল দীপ্তি, যাঁর কণ্ঠ ছিল অনন্ত সত্যের ধ্বনি।

জিলহজ্জের কুরবানির মাসে, যখন আমরা আত্মত্যাগের স্মরণে অবগাহন করি, তখন মিসামের শাহাদাত আমাদের শেখায় যে, 
কুরবানি কেবল ছুরির ফলায় নয় বরং প্রেমে, পরিচয়ে, আর সত্যের উচ্চারণেই হয় আসল উৎসর্গ।

এবং আজ—
এই গায়েবাতের যুগে, যখন এক ইমাম আমাদের চেয়ে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রেমময় দৃষ্টি ছুঁড়ে দেন, তখন আমরা—মিসামের উত্তরসূরি কি প্রস্তুত হতে পেরেছি?

হে আল্লাহ!
আমাদের হৃদয় যেন আশ্রয় পায় সেই খেজুরগাছের ছায়ায়, যেখানে নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়েছিল প্রেমের পবিত্রতা।

আমাদের অন্তর যেন হয়ে ওঠে
তেমনই এক প্রেমিকের, যার প্রতিটি স্পন্দনে উচ্চারিত হয় আলী (আ.) হক, আলী (আ.) নূর, আর আলী (আ.)-এর বংশধর  মাহদি (আ.)—আমাদের আশ্রয়।

তুমি আমাদের দাও সেই সাহস,
যাতে সত্য বলায় কণ্ঠ রুদ্ধ না হয়,
আর প্রেমের ঘোষণায় ভয় স্থান না পায়।

হে প্রভু! আমাদের এমন প্রাণ দাও—যা ইমাম (আ:) এর জন্য কাঁদে, তাঁর জন্য জাগে, আর প্রয়োজনে তাঁর পথেই রক্ত ঝরায়।  আমীন... ইয়া রাব্বুল আলামিন..

__________________________________________

ইমাম মাহদী আঃ কে চেনার গুরুত্ব এবং কীভাবে তা সম্ভবপর
        ✍️ রাজা আলী 

"যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহ অনুমোদিত য কিছু বাকী থাকবে সেটাই তোমাদের জন্য উত্তম"(সূরা হুদ:৮৬)
    সূরা হুদ এর উপরোক্ত আয়েতের 'বাকিয়াতুল্লাহ' অর্থাৎ "আল্লাহ অনুমোদিত যা কিছু বাকি"বলতে ইমাম মাহদী (আঃ) কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ঘোষণা অনুযায়ী বর্তমান যুগে মুমিন দের জন্য উত্তম হলো ইমাম মাহদী (আঃ)কে আঁকড়ে ধরা।কোনো ব্যক্তি যদি মুমিন হয় বা মুমিন হতে চায় তবে তাকে ইমাম মাহদী (আঃ) এর মারেফাত অর্জন করতে হবে বা মারেফাত অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।তবে সে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা পাবে।
     ইমাম মাহদী (আঃ) মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এমামত প্রাপ্ত হন এবং আল্লাহর রব্বুল আলামীনের ইচ্ছায় অন্তর্ধান করেন।তার এই অন্তর্ধানের যুগে তার প্রতি আক্বীদা রেখে মারেফাত অর্জন করা অনেক খানি কঠিন বিষয়। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের নির্দেশ যেহেতু রয়েছে , সেহেতু এই বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকের মনোনিবেশ করতে হবে।
    বর্তমান যুগে ইমাম মাহদী (আঃ) এর মারেফাত অর্জন, তাঁকে নিয়ে চর্চা, জ্ঞান অর্জন এবং সেই শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ খুব ই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ ।এই জন্য আমাদের প্রত্যেকেকেই ইমাম আঃ বিষয়ক বই,পত্র-পত্রিকা পাঠ করতে হবে এবং ইমাম আঃ বিষয়ে বক্তব্য শুনতে হবে। কোরান ও হাদীসে ইমাম আঃ কে চেনার গুরুত্ব,ইমাম আঃ এর জন্ম , তাঁর মারেফাত অর্জন, তাঁর শাসন ইত্যাদি বিষয় সঠিক ভাবে জানতে হবে। এবং এই চর্চা এমন একটি ধারাবাহিক নিয়মে করতে হবে,যাতে ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে এবং তাঁকে নিয়ে কিছু চিন্তা করার বা আলোচনা করার পরিস্থিতি তৈরি হয়।কাজটি আমাদের পরিবেশ অনুযায়ী কিছু টা কঠিন ও সময় সাপেক্ষ। কিন্তু সেটা বড়ো বিষয় নয় ,বড়ো বিষয় হলো যথেষ্ট প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়।যদি নিজেদের ইমাম (আঃ)কে জানার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলার ইচ্ছা থাকে ,তবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং পরিবেশ-পরিস্থিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে হবে।তবেই একমাত্র ইমাম আঃ এর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হবে বা তার প্রতি একাত্মতার অনুভব জন্মাবে।
    ইমাম মাহদী আঃ কে চিনে নেওয়াই মুমিনের মানদন্ড। আখেরাতে সফলতার সার্টিফিকেট টি যুগের ইমাম আঃ এর কাছ থেকে ই নিতে হবে।তাই আল্লাহ রব্বুল আলামীন কোরান মজীদের মধ্যে ঘোষণা করেছেন:"সেদিন আমরা প্রত্যেক মানুষ কে তার ইমাম সহ ডাকবো"(সূরা বনি ইসরাইল:৭১)। সুতরাং সেদিন ইমাম (আঃ)ই হবেন মানবের ত্রাণকর্তা।এই ঘোষণার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ইমাম আঃ কে চেনা র গুরুত্ব।
    আল্লাহ রাসূল সাঃ বলেছেন,"যে ব্যক্তি তার যামানার ইমাম কে না চিনে মৃত্যু বরণ করে ,সে মূর্খতার মৃত্যু গ্রহণ করে"। অর্থাৎ বর্তমান যুগের প্রত্যেক মানুষ কেই যুগের ইমাম আঃ সম্পর্কে অবগত হতে হবে। নতুবা মূর্খের ন্যায় পৃথিবী ছাড়তে হবে।আর এক্ষেত্রে মূর্খতার অর্থ হলো পথভ্রষ্টতা। সুতরাং সঠিক পথের সন্ধান রয়েছে ইমাম মাহদী আঃ কে চেনা এবং তাঁর মারেফাত অর্জনের মধ্যে। এ কাজে আমাদের কার্পণ্য করলে চলবে না।

__________________________________________

                    ওয়াদা
           ✍️ আব্বাস আলী
 
ওয়াদা হল একটি উর্দু শব্দ যার বাংলা অর্থ কাউকে কথা দেওয়া। আমরা আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত ওয়াদা করে থাকি,সেটা কখনো নিজের পরিবারের সাথে, কখনো নিজের বন্ধু-বান্ধবের সাথে, আবার কখনো নিজের কর্ম ক্ষেত্রে। অতএব, আমাদের প্রতিদিনের জীবন-যাপনের মধ্য অতিমাত্রায় ব্যবহারিত হয় ওয়াদা বা কাউকে কথা দেওয়া। আর ইসলাম ধর্মের মধ্য ওয়াদা রাখার ব্যাপারে অনেক সতর্ক করা হয়েছে يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ "হে ঈমানদারগণ তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো"(সুরা মায়েদা ৫:১)

সুতরাং একজন মুসলমান, মমিন ও আহলেবায়েতের মান্নেওালা হিসাবে আমাদের ওয়াদা রাখার ব্যাপারে অনেক অনেক সতর্ক থাকতে হয়। তাই আমরা যেমন দুনিয়াবি ক্ষেত্রে ওয়াদা করি ঠিক অনুরূপ কিছু ওয়াদা আমাদের যুগের ইমাম ইমামে মেহেদী আলাইহি সালামের সাথে করার প্রয়োজন আছে সেদিকে আমাদের একটু লক্ষ করতে হবে। আমরা ঠিক কিভাবে আমাদের ইমামের সাথে ওয়াদা করব বা ওয়াদা করতে পারি তার কিছু বিবরণ খুবই সংক্ষিপ্ত ভাবে নিচে উল্লেখ করা হলো। 

ঈমানের ওয়াদা 
প্রথমেই যে ওয়াদা আমাদের ইমামের সাথে করতে হবে সেটা হলো ঈমানের ওয়াদা অর্থাৎ ঈমান বজায় রাখার ওয়াদা। বর্তমান যুগে ঈমানের বিষয় অনেক সতর্ক থাকা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প রাস্তা নেই।আজকের বর্তমান সময়ে ডিজিটালাইজের মাধ্যমে দুশমন আমাদের ঈমানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে চাই, তাই তারা অনেক পথ অবলম্বন করে থাকে যেমন, তার মধ্য উল্লেখযোগ্য হল হলিউড সিনেমা। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখান থেকে তারা যুবসমাজ বা ইয়ং জেনারেশনের কাছ থেকে ইসলামী আদর্শকে কেড়ে নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে চলেছে । তাই আমাদের সর্বপ্রথম প্রয়োজন আমাদের যুগের ইমামের সাথে এই ওয়াদা করা কে, মাওলা আপনাকে কথা দিচ্ছি যে দুনিয়াবি সমস্ত রকম পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করে ইসলামী আদর্শকে ধরে রাখবো এবং আপনার জহুরের পথকে প্রশস্ত করব।

সাথী হওয়ার ওয়াদা 
নিজের ঈমানকে ঠিক করার পরেই আমাদের আরো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ইমামের সাথী হওয়া বা ইমামের আসাব হওয়া। কারণ নিজের মাযহাবের প্রতি সঠিক ঈমান রাখা ও ইমামকে চেনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়, কারণ আল্লাহ কোরআন শরীফের মধ্যে বলছেন “আমি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামসহ ডাকবো” (বনি ইসরাইল: ৭১)। তাই আমাদের যেমন প্রয়োজন ইমামকে চেনা, ঠিক অনুরূপ ইমামের প্রতি আমাদের কিছু নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে। আমরা জানি যে সন ৬১ তে ইমাম হোসাইন কারবালাতে ডাক দিয়েছিলেন কেউ আছো আমাকে সাহায্য করবে, ঠিক ওই রুপ ডাক আজ পর্দার আড়াল থেকে যুগের হোসাইন অর্থাৎ আমাদের যুগের ইমাম ইমামে মেহেদী ( আ সা) ও দিচ্ছেন, যে কেউ আছো আমাকে সাহায্য করবে। তাই আমাদের নৈতিক কর্তব্য বা দায়িত্ব যে আমরা আমাদের যুগের ইমামের ডাকে সাড়া দিয়ে লাব্বাইক বলি তাই আমাদের দরকার একবার নিজের মন থেকে বলা যে মাওলা আমরা আপনার সাথে আছি আমরা আপনার প্রতিটি কাজে সাহায্য করবো ও আপনার কথাই হবে আমাদের জন্য প্রথম ও শেষ কথা এবং প্রয়োজনে আপনার জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত আছি আজ ঠিক এই রূপ ওয়াদা আমাদের যুগের ইমামের সাথে করার প্রয়োজন আছে।

উপরে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে দুটি ওয়াদার কথা উল্লেখ করা হলো যে ওয়াদা আমরা আমাদের যুগের ইমামের সাথে করতে পারি বা করা প্রয়োজন আছে উপরিউক্ত উল্লেখিত ওয়াদার সাথে সাথে আমাদের আরো কিছু কাজ ইমামের মেহেদী ( আ সা) এর সাথে করতে পারি বা করা প্রয়োজনীয় যেমন আমাদের প্রতিটি কাজ ইমামের নাম দিয়ে শুরু করা আমাদের প্রতিটি চিন্তায় ইমামকে রাখা এমনকি আমরা সকালে ওঠার পরে ইমামকে সালাম দেওয়া ও সাদকা প্রদান করা তার সুস্থতা সালামতির জন্য এইভাবে যখন আমরা আমাদের প্রতিটি কাজেই ইমামে জমানাকে স্বরন রাখবো তখনই সাহেবুজ্জামান আমাদের থেকে রাজি ও সন্তুষ্ট হবেন । এবং মহান আল্লাহ ও আমাদের থেকে সন্তুষ্ট ও রাজি হবেন এবং তার “ হাদী এ বার হক” যাকে তিনি আজও হেফাজত করে রেখেছেন এই পৃথিবীর নেজার দাতা হিসাবে এবং সমগ্র মানবজাতির মুক্তিদাতা হিসেবে তাকে আমাদের মাঝে পাঠিয়ে দেবেন এবং দুনিয়াবী দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়ে একটি প্রত্যাশিত পরিবেশ আমাদের মধ্যে তৈরি করে দেবেন যেখানে থাকবে না কোন অত্যাচার থাকবে না কোন ভয় কোন চুরি কোন মারামারি হিংসা ও খুনখুনি।

 আর মহান আল্লাহ তখনই নিজের ওয়াদাকে সম্পন্ন করবেন জমিনের উপরে তখনই তার হাদিকে পাঠাবেন যখন আমি এবং আপনি ওয়াদা করব যে ইমামের সাথে নেক কাজ করার জন্য তাই আসুন সকলে মিলে আজ এখনই নিজের বুকে হাত রেখে ওয়াদা করি কে মাওলা এই জীবন আজ থেকে নতুন করে শুরু আজ থেকে আমি শুধু আপনার অনুগত্য করব আপনার কথা মতোই চলব নিজের জীবনকে সাজাবো আপনার সুমধুর বাক্য দিয়ে।
__________________________________________------------------------------------------------







📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
     🌹🌹গাইবাতের আর্তনাদ🌹🌹 
        ✍️মো: মুন্তাজির হোসেন গাজী

বাল্যকালে হারিয়েছে পিতামাতার ভালবাসা,,
উম্মতেরা দূরে ঠেলে দিয়েছে বোঝেনি তার 
প্রত্যাশা।

অন্তর্ধানে যেতে হয় আল্লাহের নির্দেশে,,
একাকিত্বের ধ্বনি আজও ভাসে আকাশে বাতাসে।।

নয়ন থেকে রক্তের ধারা বহিছে পূর্বপুরুষের শোকে,,
চন্দ্রের ছটায় ভাসিয়ে আনে এতিমের দৃশ্যকে।।

গাঢ় অন্ধকারের স্পর্শে এই আওয়াজ শোনা যায়,,
এক কয়েদি কয়েদখানায় আছেন বন্দি অবস্থায়।।

শিয়াদের আঘাত হানিলে তার হতাশার আগুন জ্বলে ওঠে,,
প্রখর রবির কিরণ ভাসিয়ে তোলে হুজ্জাতের আর্তনাদকে।

মোদের অপকর্ম পৌঁছাতে তার ভরসা ভেঙে ভেঙে যায়,
গাইবাতের সময়সীমা আরো বেড়ে বেড়ে যায়।

জুলফিকারে হাত দেন দুনিয়ার জুলুম- অত্যাচার দেখে ,
কিন্তু হাই! কুফার কথা মনে পড়ে যায় অবশেষে।

হে খোদা সমাপ্ত করো বেদনা ভরা সময় সীমাকে,,
ইমামে জামানা কে পাঠিয়ে দাও মোদের দিকে দিকে।।

__________________________________________


মারেফাত 
 ✍️ রাজা আলী

ঐ দেখ,ওদিকে
হাহাকার 
পীড়িত ফিলিস্তিনি 
দুঃখ ভার।

অনাহারে মারা যায়
শিশু সব 
অসহায় মানুষের 
কলরব।

গাজা আজ শ্মশানের 
অনুরূপ 
তথাকথিত মানবতা 
নিশ্চুপ ।

পৃথিবী চলছে আজ
একপেশে 
মাহদী আঃ আসবেন
অবশেষে ।

জানো এর শেষে কি
তোমারা সব?
এমামের আবির্ভাব 
করাবেন রব ।

শোনো শোনো মুমিনিন 
তৈরি হও 
এমামের অপেক্ষার 
তরী ব'ও।

"আনা বাকিয়াতুল্লাহ"র ধ্বনি 
সন্নিকটে 
সর্বদা ইমাম আঃ কে রাখো 
হৃদয় পটে।

ইমামের আবির্ভাবে 
মুক্তি 
জালিমের শেষ হবে 
শক্তি ।

প্রয়োজন এখন শুধু 
এবাদত 
হৃদয়ে আনো এমামের 
মারেফাত ।
__________________________________________

     শুধু একবার, হে মাহ্দী!
      ✍️মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

যদি আমার ইমাম, সেই আড়ালে থাকা আলো,
একদিন নাম ধরে ডাকেন,
আমি কি পারি—এই দুনিয়া আর গাফেলি ভুলে
তাঁর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে থাকতে?

আমি যেন শুনি সেই দিব্য কণ্ঠ—
"আনা বাকিয়াতুল্লাহ…"
আসমানের ভাষায়, অশ্রুজলে দ্যুতি মেখে,
সেই ডাকে আমার প্রাণ হুংকার তোলে—
"লাব্বাইকা, ইয়া সাইয়্যিদি!"
এই হৃদয়, এই হাড্ডি-মাংস, শুধু তোমারই হয়ে যাক।

সেদিন—যেদিন তুমি জুহুর ঘোষণা করবে,
অন্যায়ের ছায়া চূর্ণ করে উঠবে ইনসাফের সূর্য,
আমি চাই, আমি প্রার্থনা করি
তুমি যেন আমাকে ডেকে নাও,
তোমার সৈন্যদের কাতারে,
তোমার প্রেমে পোড়া এক সঙ্গী করে।

কিন্তু হে প্রিয় ইমাম,
তার আগেও যদি কখনো—
রাতের নিরবতায়, অথবা একাকী কোনো প্রার্থনার মূহূর্তে,
তুমি কেবল একবার…
আমার নামটি উচ্চারণ করো,
তবে আমি ধন্য হয়ে যাবো,
এই জীবনের অর্থ ফিরে পাবো।

আমি তোমার প্রতীক্ষায় রাত পোহাই,
হাত পেতে থাকি আকাশের দিকে,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমারই গন্ধ খুঁজি,

হে ইমাম!
একবার-
শুধু একবার ডাকো…

------ _____------_____------______------______------

   

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ) || রমযান সংখ্যা ||

আরবি : রমযান, ১৪৪৭ হিজরী ইংরেজি : মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ __________________________________________               সম্পাদক  :  ম...