আরবি: মহররম, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________
সম্পাদক :
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী
প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির হোসেন গাজী
অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন মন্ডল
প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা
__________________________________________
সূচিপত্র
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
আযাদারী : আদব ও নিয়মাবলী
আযাদারী : কবুল হওয়ার কয়েকটি শর্ত
কারবালার আদর্শ থেকে যুব সমাজের শিক্ষা
মহররম মাস – আহলে বাইতের প্রেমিকদের শোক ও বিষাদের মাস
কেন ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালাতে তাঁর পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন?
✍️ মইনুল হোসেন
এক নিঃসঙ্গ আজাদারের খোঁজে...
আযাদারির সৌন্দর্য
✍️ রাজা আলী
মহাররাম ও ইমামে যামানা
✍️ আব্বাস আলী
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পেয়গাম (অনুবাদ)
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
শহীদের স্মরণে
আযাদারী
✍️ রাজা আলী
হে কুফাবাসী… (অনুবাদ)
✍️ মইনুল হোসেন
__________________________________________
__________________________________________
সম্পাদকীয়
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। কারবালার শোক মানে শুধু অতীতকে স্মরণ নয়—এ এক জাগরণ, এক আত্মগত শিক্ষা। আজাদারি কেবল কান্না নয়, বরং তা হুসাইন (আ.)-এর পথে নিজেকে গড়ে তোলার শুদ্ধতম উপায়।
এই সংখ্যায় আমরা আলোকপাত করেছি আজাদারির সৌন্দর্য, আদব ও মূল উদ্দেশ্যের উপর। আলোচনা করেছি—কীভাবে আজাদারি হতে পারে হুসাইনির অনুসরণ, আর কীভাবে আমাদের শোক সুর মিলাতে পারে ইমামে জামানার (আ.ফা.) শোকের সাথে। কারবালা আমাদের শিখিয়েছে পর্দা, দিয়েছে যুব সমাজকে আদর্শের শিক্ষা, আর আমাদের রেখে গেছে এক চিরন্তন প্রশ্নের সামনে—তুমি হুসাইনের পক্ষে, না বিপক্ষে? আসুন, এ মহররমে আমরা শোককে করি আত্মশুদ্ধির সোপান, এবং প্রতিজ্ঞা করি—ইমাম মাহ্দি (আ.ফা.)-এর প্রতীক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত করব, এক হুসাইনি আজাদার হয়ে।
ওয়াস সালাম
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
সম্পাদক
আল-হুজ্জাত পত্রিকা
__________________________________________------------------------------------------------
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
আযাদারী : আদব ও নিয়মাবলী
✍️ কবির আলী তরফদার কুম্মী।
ইমাম রেযা (আ.) বলেন:
"يَا ابْنَ شَبِيبٍ! إِنْ سَرَّكَ أَنْ تَكُونَ مَعَنَا فِي الدَّرَجَاتِ الْعُلَى مِنَ الْجِنَانِ، فَاحْزَنْ لِحُزْنِنَا، وَافْرَحْ لِفَرَحِنَا، وَعَلَيْكَ بِوِلَايَتِنَا، فَلَوْ أَنَّ رَجُلًا تَوَلَّى حَجَراً لَحَشَرَهُ اللَّهُ مَعَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ."
“হে ইবনে শাবীব! যদি তুমি আমাদের সঙ্গে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে চাও, তবে আমাদের জন্য দুঃখ করো, আমাদের আনন্দে আনন্দিত হও এবং আমাদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো। কারণ কেউ যদি একটি পাথরকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন তার সাথেই হাশর করবেন।”
(উয়ুন আখবার আল রেযা,শায়খ সাদূক, খণ্ড ১, হাদিস ৪৪)
ভূমিকা:
ইসলামে ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদাত ও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি ঈমান, ত্যাগ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকার এক চিরন্তন দর্শন। আশুরার দিনে শোক পালন, কালো পোশাক পরিধান, জিয়ারত পাঠ, সমবেদনা জানানো এবং অন্যান্য আমল শুধু রীতিনীতি নয় এগুলো হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহ ও আহলে বাইত (আ.) এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ। এই লেখায় আশুরার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল ও আদবসমূহ কুরআন-হাদিস ও ইমামগণের বাণীর আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে আমরা এই পবিত্র দিনটিকে যথার্থভাবে ইবাদত ও শোকার্তচিত্তে পালন করতে পারি।
১. কালো পোশাক পরিধান করা:
ফিকহি দৃষ্টিকোণে কালো পোশাক পরিধান করা মাকরুহ, কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) ও অন্যান্য মাসুম ইমামগণের (আ.) শোক পালনের ক্ষেত্রে এটি একটি ব্যতিক্রম। কারণ এটি শোক ও দুঃখের প্রকাশ এবং ইসলামী চেতনা ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন।
২. সমবেদনা প্রকাশ:
ইসলামে কারো ওপর কোনো দুঃখ-মুসিবত আসলে, তাকে সমবেদনা জানানো মুস্তাহাব।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো মুসিবতগ্রস্তকে সমবেদনা জানায়, সে তার সমান সওয়াব পাবে।"
(সাফিনাতুল বিহার, খণ্ড ২, পৃ. ১৮৮)
শিয়াদের মধ্যে এই সুন্নাত প্রচলিত, এবং তারা পরস্পরকে "أَعْظَمَ اللهُ أُجُورَكُمْ" (আল্লাহ তোমাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করুন) বলে সমবেদনা জানায়।
ইমাম বাকির (আ.) বলেন:
"যখন শিয়ারা একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন তারা ইমাম হুসাইন (আ.) এর মুসিবতে এই দোয়া পাঠ করবে:
''أَعْظَمَ اللهُ أُجُورَنَا بِمُصَابِنَا بِالْحُسَيْنِ (ع) وَجَعَلَنَا وَإِيَّاكُمْ مِنَ الطَّالِبِينَ بِثَارِهِ مَعَ وَلِيِّهِ الْإِمَامِ الْمَهْدِيِّ مِنْ آلِ مُحَمَّدٍ (ع)"
"আল্লাহ আমাদের ইমাম হুসাইন (আ.) এর শোকে আমাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করুন এবং আমাদের ও আপনাদেরকে তাঁর রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারী হিসেবে তাঁর ওলী ইমাম মাহদী (আ.) এর সাথে মিলিত করুন।"
(মুসতাদরাকুল ওয়াসাইল, খণ্ড ২, পৃ. ২১৬)
৩. আশুরার দিনে কাজ বন্ধ রাখা:
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি আশুরার দিনে কাজ বন্ধ রাখে অর্থাৎ জীবিকা অর্জনের জন্য বের হয় না এবং বনি উমাইয়াদের চক্ষুশূল হওয়ার জন্য (যারা আশুরাকে পবিত্র দিন মনে করত) যদি কেউ তার দৈনন্দিন জীবিকা অর্জনেও ব্যস্ত না হয়, তাহলে আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবেন। আর যে ব্যক্তি আশুরার দিনকে শোক ও দুঃখের দিন হিসেবে পালন করে, কিয়ামতের দিন যখন সবার জন্য ভয় ও আতঙ্কের দিন হবে, সেদিন তার জন্য হবে আনন্দের দিন।"
(আমালী শেখ সাদুক, পৃ. ১২৯)
৪. জিয়ারত পাঠ:
আলকামা ইবনে হাজরামী (রা.) ইমাম বাকির (আ.) কে বললেন:
"আমাকে এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দিন, যা আমি আশুরার দিনে ঘরে বসে বা দূর থেকে পাঠ করতে পারি।"
ইমাম (আ.) বললেন:
"হে আলকামা! যখনই তুমি ইচ্ছা করবে, দুই রাকাত নামাজ পড়ে এই জিয়ারত (জিয়ারতে আশুরা) পাঠ করবে।"
ইমাম আরও বললেন:
"যদি তুমি এই জিয়ারত পাঠ করো, তাহলে ফেরেশতারা হুসাইন (আ.) এর জিয়ারতকারীর জন্য যে দোয়া করে, তুমিও তা পাবে। আল্লাহ তোমার জন্য এক লাখ মর্যাদা লিখে দেবেন এবং তুমি এমন হবে যেন হুসাইন (আ.) এর সাথে শাহাদাত বরণ করেছ, যাতে তুমি তাদের মর্যাদায় শরীক হতে পার। তুমি শুধুমাত্র সেই শহীদদের মধ্যে গণ্য হবে, যারা তার সাথে শাহাদাত বরণ করেছে। আর প্রত্যেক নবী ও রাসূলের জিয়ারতের সওয়াব এবং হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের পর থেকে যারা তাকে জিয়ারত করেছে, তাদের সওয়াবও তোমাকে দেওয়া হবে।"
(মিসবাহুল মুতাহাজ্জিদ, পৃ. ৭১৪)
যদি সম্ভব হয়, বিখ্যাত জিয়ারতে আশুরা (১০০ লা‘নত ও ১০০ সালাম সহ) পড়ুন। যদি সময় না থাকে, তবে অপ্রচলিত জিয়ারতে আশুরা (যা মুফাতীহুল জানান-এ আছে) পড়ুন, যার সওয়াব একই।
৫. ক্রন্দন করা :
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা হযরত মূসা (আ.) কে বলেন:
"হে মূসা! যে বান্দা মুস্তাফার (সা.) সন্তানের শাহাদাতের দিন (আশুরা) কাঁদবে বা কান্নার ভান করবে এবং নবীর নাতির শোকে শোক প্রকাশ করবে, আমি তাকে জান্নাতে স্থান দেব।"
(মুসতাদরাক সাফিনাতুল বিহার, খণ্ড ৭, পৃ. ২৩৫)
৬. শোক মজলিসের আয়োজন:
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"আমি তোমাদের মজলিসকে ভালোবাসি। তোমরা তোমাদের মজলিসে আমাদের বিষয়কে (আমাদের পথ ও আদর্শ) জীবিত রাখো। আল্লাহ তার উপর রহম করুন, যে আমাদের বিষয়কে জীবিত রাখে।"
(ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ১০, পৃ. ২৩৫)
৭. আশুরার দিনে যোহরের জামাত নামাজ:
সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.) ও তার অনুসারীরা নামাজের পথে শাহাদাত বরণ করেছেন। তাই জিয়ারতে মুলকা-তে আমরা তাকে লক্ষ্য করে বলি:
"আশহাদু আন্নাকা কাদ আকামতাস সালাত..."
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নামাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যাকাত দিয়েছেন, ভালো কাজের আদেশ দিয়েছেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেছেন।"
৮. স্বাদ-আনন্দ থেকে বিরত থাকা:
জীবনের কিছু স্বাদ যেমন খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো এবং আনন্দদায়ক কথা বলা ত্যাগ করতে হবে (যদি না প্রয়োজন হয়)। ধর্মীয় ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ বন্ধ রাখতে হবে এবং এই দিনটিকে কান্না ও শোকের দিন হিসেবে পালন করতে হবে, যেন কারো পিতা বা সন্তান মারা গেছে।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"আশুরার দিনে আনন্দের কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং শোকের রীতি পালন করতে হবে। সূর্য ঢলে না যাওয়া পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে, তারপর শোককারীদের মতো সাধারণ খাবার খেতে হবে।"
(মীযানুল হিকমাহ, খণ্ড ৮, পৃ. ৩৭৮৩)
৯. ইখলাসের(একনিষ্ঠতা) প্রতি যত্নবান হওয়া:
শোক পালনকে শুধুমাত্র রেওয়াজ বা অভ্যাস হিসেবে করবেন না, বরং সঠিক নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন এবং ইখলাসের ক্ষেত্রে সত্যবাদী হোন। কারণ, ছোট আমল যদি ইখলাসের সাথে হয়, তা অনেক বড় আমল থেকেও উত্তম,এমনকি যদি তা হাজার গুণ বেশি হয়। হযরত আদম (আ.) ও শয়তানের ইবাদত থেকে এটি বোঝা যায়। শয়তানের হাজার বছরের ইবাদত তাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারেনি, কিন্তু হযরত আদম (আ.) এর একটি তওবা তার ভুলকে মাফ ও মর্যাদা ফিরে পেতে সহায়ক হয়েছিল।
আমল করার সময়ও সতর্ক থাকুন, যেন মানুষের প্রশংসা পাওয়ার লোভ বা রিয়া(লোক দেখানো) আপনার নিয়তে প্রবেশ না করে।
১০. জিয়ারতে তাসলিয়াত পাঠ:
আশুরার দিনের শেষে জিয়ারতে তাসলিয়াত পড়ুন এবং আশুরার দিনকে সুযোগ হিসেবে নিন। আপনার অবস্থার উন্নতি, শোক গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং আপনার ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
শোক পালনকে শুধুমাত্র রেওয়াজ বা অভ্যাস হিসেবে করবেন না, বরং উত্তম নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন।
(১-৭ সোগনামায়ে আশুরা, পৃ. ৬৭-৮০; ৮-১০ তারিখে মারাকিবাত, পৃ. ৪৭-৫৩)
উপসংহার:
আশুরার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদেরকে শুধু শোকই শেখায় না, বরং তা অন্যায়ের মুখে দাঁড়ানোর সাহস, সত্যের পথে অবিচলতা এবং ঈমানের দৃঢ়তা শিক্ষা দেয়। ইমাম হুসাইন (আ.) এর স্মরণে পালিত প্রতিটি আমল, জিয়ারত, কান্না, সমবেদনা বা কাজ বন্ধ রাখা সবই আমাদের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। এই দিনটিকে ইখলাসের সাথে পালন করে আমরা যেমন ইমাম (আ.) এর পথের অনুসারী হতে পারি, তেমনি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কারবালার শিক্ষা বুঝে জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর জহুরের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য দান করুক।
__________________________________________
আযাদারী : কবুল হওয়ার কয়েকটি শর্ত
✍️ মাওলানা রেজাউল হক্ব কুম্মী
আযাদারী একটি উত্তম মুস্তাহাব এবাদাত। সুতরাং আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত এই উত্তম এবাদাত আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবারে যেনো গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।কেমন ভাবে আজাদারি করলে আমরা মাওলা ইমাম হুসাইন (আ:) এর অনুসারী হতে পারব,সেই বিষয়টির উত্তর খুব সংক্ষেপে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
কারবালা তে ইমাম হুসাইন (আ:) এর আদর্শ কি ছিল?ইমাম হুসাইন (আ:) আদর্শ ছিল খুব ই মহান।সত্য এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি আল্লাহ র পথে আত্মোৎসর্গ করেন।
মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ ইমাম হুসাইন আ বলেছেন:
ان اجود الناس من اعطی من لا یرجوه،
"শ্রেষ্ঠ ও উত্তম দাতা ওই ব্যক্তি যে দান করে কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়"।
ইমাম হোসাইন আঃ এর শাহাদাত স্মরণে পালিত শোকানুষ্ঠান ই আযাদারী। এই আযাদারী কবুলের কতকগুলি শর্ত হলো-
১/ পবিত্র মন-প্রাণ দিয়ে মহারম পালন করতে, নিষ্ঠা মন প্রাণ তৈরী করতে গেলে প্রথম চিন্তা ভাবনা করে আল্লাহ তায়ালা কে চিনতে হবে, তাঁর পর মজলিসে বসলে আসল আজাদারী করা হবে।
২/ মজলিসে বসে মন প্রাণ দিয়ে মজলিস শুনতে হবে এবং তাঁর উপর আমল করতে হবে।
৩/ আত্ম ত্যাগ ও স্বার্থ ত্যাগ করা কারবেলার ইতিহাস ও মাওলা ইমাম হুসাইন (আ:) এর ব্যবহার থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
৪/ দীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকল প্রকার দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হবে।
৫/ সকলের সাফল্যের জন্য দুয়া দানি করতে হবে ও আমল করতে হবে।
কেননা ইমাম আলী (আ:) বলেছেন:
۱/ کونوا للظالم خصما وللمظلوم عونا (الحدیث امام علی ع).
এই হাদীসটির অর্থ হলো অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও ,আর যার উপর অত্যাচার হচ্ছে তাঁকে সাহায্য করো, যদিও তোমার ক্ষতি হয়।
ওয়াসাল্লামু আলিইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
_________________________________________
কারবালার আদর্শ থেকে যুব সমাজের শিক্ষা
✍️ সুজা উদ্দিন মাশহাদী
কারবালা আমাদেরকে বহু গভীর শিক্ষা দেয়, যা শুধু ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, মানবিক, নৈতিক ও আত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই:
১. সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ়তা
ইমাম হোসাইন (আ.) কারবালার ময়দানে নিজের জীবন ও পরিবারকে উৎসর্গ করেছেন অন্যায়, অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে। তিনি স্পষ্টভাবে জানতেন যে তাঁর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তবুও তিনি অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। এটি আমাদের শেখায় — সত্যের পথে দৃঢ় থাকতে হয়, যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।
২. ধর্ম ও মূল্যবোধের প্রতি ভালোবাসা
কারবালার ঘটনা ইসলামের প্রকৃত রূপকে সংরক্ষণের সংগ্রাম। ইয়াজিদের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে হোসাইন (আ.) দেখিয়েছেন যে ধর্ম শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি জীবনের আদর্শ ও সংগ্রামের উৎস।
৩. আত্মত্যাগ ও ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত
ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবার-পরিজনের আত্মত্যাগ ও কষ্ট সহ্য করার ধৈর্য, বিশেষত তাঁর বোন জয়নাব (আ.)-এর ভূমিকায় আমরা দেখি কীভাবে মানুষ দুঃখ-কষ্টে অবিচল থাকতে পারে। এটি আমাদের শেখায় — ধৈর্যই প্রকৃত শক্তি।
৪. সংখ্যা নয়, আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ
কারবালায় ইমাম হোসাইনের সৈন্যসংখ্যা ছিল খুবই কম (প্রায় ৭২ জন), আর ইয়াজিদের পক্ষে ছিল হাজার হাজার সৈন্য। কিন্তু ইতিহাস মনে রেখেছে কারা ন্যায়ের পক্ষে ছিল। এই ঘটনা আমাদের শেখায় — সংখ্যা বড় কথা নয়, আদর্শই চূড়ান্ত।
৫. নারীর সাহস ও ভূমিকা
কারবালার পরবর্তী ঘটনাগুলোতে হজরত জয়নাব (আ.)-এর সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তা প্রমাণ করে যে নারীর ভূমিকাও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারবালার আদর্শের মূল শিক্ষা:
1. সত্য ও ন্যায়বিচারের জন্য আপোষহীনতা:
ইমাম হুসাইন (আ.) অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যা যুব সমাজকে শেখায় কখনো মিথ্যা বা অবিচারের সাথে আপোষ না করতে।
2. কোরবানীর গুরুত্ব:
নিজের জীবন, স্বাচ্ছন্দ্য ও সাফল্যের পথ বন্ধ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত, যা যুব সমাজকে দেশ ও সমাজের উন্নতির জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলে।
3. ধৈর্য ও স্থিরতা:
কারবালার ঘটনায় দেখা যায়, কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে থাকা ও আদর্শে অটল থাকা কতটা জরুরি।
4. মানবতা ও অন্যায়ের প্রতিবাদ:
কারবালা মানবাধিকার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিক্ষা দেয়, যা যুব সমাজকে ন্যায়পরায়ণ ও মানবতাবাদী করে তোলে।
যুব সমাজের শিক্ষার বিস্তারে করণীয়:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কারবালার আদর্শ অন্তর্ভুক্ত করা: কারবালার ইতিহাস ও আদর্শ নিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরি করা উচিত।
সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও কর্মশালা:
যুব সমাজের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন করা।
সাহিত্য ও মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার: নাটক, কবিতা, গল্প ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কারবালার শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেওয়া।
নেতৃত্ব গঠন:
কারবালার আদর্শ অনুসরণ করে নেতৃত্ব গড়ে তোলা, যারা সমাজে ন্যায় ও সৎ আচরণ প্রতিষ্ঠা করবে।
__________________________________________
মহররম মাস – আহলে বাইতের প্রেমিকদের শোক ও বিষাদের মাস
✍️ মজিদুল ইসলাম শাহ
মহররম হলো সেই শোক ও বেদনার মাস, যা নবী (সা.) ও আলী (আ.)-এর অনুসারীদের অন্তরকে যুগ যুগ ধরে বিষণ্ন করে রেখেছে। হিজরি ৬১ সালের মহররম থেকে আজ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ এই মাসে হুসাইন (আ.) ও তাঁর সাথিদের মর্মান্তিক শাহাদাতের কারণে শোক পালন করে আসছেন। এক ভয়াবহ বিপর্যয়, যার বর্ণনা করাও অসম্ভব! কী দুঃখের বিষয়—যে হুসাইন (আ.) নবীর দৌহিত্র, আলী (আ.)-এর সন্তান, নবীর উত্তরসূরি, জামাতা ও খলিফা ছিলেন, তাঁকে নবীর ওফাতের মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে কারবালার প্রান্তরে হত্যা করা হলো—তা-ও সেইসব লোকদের দ্বারা যারা নিজেদের নবীর উম্মত বলে দাবী করত!
ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) এ বিষয়ে বলেছেন:
أَمْسَتِ الْعَرَبُ تَفْتَخِرُ عَلَى الْعَجَمِ بِأَنَّ مُحَمَّداً مِنْهَا وَ أَمْسَتْ قُرَیْشٌ تَفْتَخِرُ عَلَى الْعَرَبِ بِأَنَّ مُحَمَّداً مِنْهَا وَ أَمْسَى آلُ مُحَمَّدٍ مَخْذُولِینَ مَقْهُورِینَ مَقْبُورِینَ.
“আরবরা আজ গর্ব করে যে, মুহাম্মদ (সা.) তাদের মধ্য থেকে ছিলেন; কুরাইশ গর্ব করে যে, মুহাম্মদ (সা.) তাদের গোত্র থেকে ছিলেন; অথচ আজ আলে মুহাম্মদ (সা.) লাঞ্ছিত, নির্যাতিত ও শহীদ অবস্থায় শায়িত।”
এই কারণেই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের শোক কখনও ফুরায় না। মহানবী (সা.) বলেছেন:
إِنَّ لِقَتْلِ الْحُسَیْنِ حَرَارَةً فِی قُلُوبِ الْمُۆْمِنِینَ لَا تَبْرُدُ أَبَدا.
"নিশ্চয়ই হুসাইনের শাহাদাতে মুমিনদের অন্তরে এমন এক উত্তাপ রয়েছে, যা কখনও শীতল হবে না।"
কারবালা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং এক চিরন্তন আদর্শ—যা গত চৌদ্দ শতাব্দীতে অসংখ্য মানুষকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে গড়ে তুলেছে। এমন অনেকেই আছেন, যারা মহররমের মজলিসে অংশ নিয়ে নিজের জীবনধারা বদলে ফেলেছেন।
কারবালা ও মহররম মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। মহররম মানুষকে জীবনের উদ্দেশ্য গভীরভাবে অনুধাবন করায়, জীবনে প্রকৃত অর্থ যোগ করে। এটি হলো তাওবার মাস—আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার মাস, সত্য খুঁজে পাওয়ার মাস, সঠিকভাবে জীবন ও মৃত্যু শেখার মাস। মহররম শেখায় কিভাবে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচা যায় এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে দুনিয়াকে বিদায় জানানো যায়।
মহররম ও কারবালা নৈতিকতার শিখর। এটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে আমাদের নৈতিকতা, ভালোবাসা, মুক্তি ও সম্মানের পাঠ শেখায়।
এই কারণেই আশ্চর্যের কিছু নেই যে মহররম এক রাতে এমনকি তার চেয়েও কম সময়ে মানুষকে বদলে দিতে পারে। অনেক পাপগ্রস্ত ব্যক্তি, যারা গুনাহের অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, এই মাসের সম্মানে সেই অভ্যাস ত্যাগ করেন। তাই মহররম এক "অঙ্গীকারের মাস"—আল্লাহর অবাধ্যতা ত্যাগ করার অঙ্গীকার, নৈতিক উৎকর্ষ অর্জনের অঙ্গীকার, আর এক কথায়—বন্দেগির অঙ্গীকার।
বন্দেগির অঙ্গীকার
আল্লাহর প্রকৃত ইবাদতের সূচনা হয় সেই স্থান থেকে, যেখানে মানুষ তাঁর নিষিদ্ধকৃত কাজগুলো ত্যাগ করে। এই পরিত্যাগের সূচনা হলো তওবা। কারবালার উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত হলো—হুর ইবনে ইয়াজিদের তওবা ও ইমাম হুসাইনের (আ.) পক্ষে এসে শহীদ হওয়া।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় আছে—আশুরার দিন, হুর বুঝতে পারেন যে ওমর ইবনে সাদের বাহিনী ইমামের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন সঠিক পথের। তিনি বলেন: "আল্লাহর কসম! আমি নিজেকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে দেখছি। আমি জান্নাত বেছে নিচ্ছি, যদিও সে জন্য আমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হোক বা পুড়িয়ে দেওয়া হোক!"
এরপর তিনি ঘোড়াকে স্পর্শ করে ইমামের দিকে এগিয়ে আসেন এবং বলেন: "হে রাসূলের পুত্র! আমিই সেই ব্যক্তি যে আপনাকে পথরোধ করেছিলাম, আমি জানি আমার কাজ ভুল ছিল। এখন আমি তওবা করে আপনার সহযোগিতায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই। আপনি কি আমার এই তওবা গ্রহণ করবেন?"
ইমাম হুসাইন (আ.) উত্তরে বলেন: "হ্যাঁ, আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করুন। তুমি যেমন তোমার মা তোমার নাম রেখেছিলেন ‘হুর’ (স্বাধীন), ইনশাআল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তুমিও একজন মুক্ত মানুষ থাকবে।"
এইভাবেই হুর আল্লাহর বন্দেগির অঙ্গীকার করেন এবং মানব ও দানব শয়তানদের দাসত্ব থেকে মুক্তি পান।
আত্মমর্যাদা (عزت نفس)
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সম্মানিত করেছেন, তাকে সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ রূপে গড়ে তুলেছেন এবং সমগ্র সৃষ্টিকে মানুষের জন্য নিয়োজিত করেছেন। এমন একজন মানুষ কখনোই দুনিয়ার মোহে বা অন্য মানুষের দাসত্বে লিপ্ত হতে পারে না। এমনকি মৃত্যু হলেও সে তার সম্মান বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নয়।
এইজন্যই ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন:
فَإِنِّی لَا أَرَى الْمَوْتَ إِلَّا سَعَادَةً وَ الْحَیَاةَ مَعَ الظَّالِمِینَ إِلَّا بَرَما.
“আমি মৃত্যুকে সফলতা ছাড়া কিছু দেখি না এবং জালিমদের সঙ্গে জীবনকে অপমান ছাড়া কিছু মনে করি না।”
এই হলো আশুরার শিক্ষা—যে কোনো অনুরোধ বা দাবী, যা মানুষের সম্মানে সামান্যতম আঘাত হানে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
এই শিক্ষাই সকল হুসাইনপ্রেমীদের কথা ও আচরণে প্রতিফলিত হওয়া উচিত—বিশেষত ইসলামি দেশের শাসকদের মধ্যে, যেন তারা ইসলামবিরোধী শক্তির মুখোমুখি হলে সম্মানের সঙ্গে অবস্থান নেন এবং মুসলমানদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আমাদের রাজনীতি হওয়া উচিত হুসাইনির আদর্শে গঠিত—যার ভিত্তি হবে আত্মমর্যাদা, ঈমানের শক্তি ও দ্বীনের গৌরব।
জীবনের মূল্যায়ন
জীবনের মূল্য কোথায়? জীবনের লক্ষ্য কী? কেন আমরা বাঁচতে চাই? নিজের ও চারপাশের দুনিয়াকে সাজানো কতদূর পর্যন্ত যৌক্তিক?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে দুটি বড় দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়—
১. জাগতিক (ম্যাটেরিয়ালিস্টিক)
২. আধ্যাত্মিক/ঈশ্বরকেন্দ্রিক (থিওকেন্দ্রিক)
যদি মানুষ কেবল দুনিয়াকে চিন্তা করে এবং আখেরাতকে ভুলে যায়, তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি হবে নিছক বস্তুবাদী। তখন সে দুনিয়াকে শুধু দুনিয়ার জন্য চায় এবং জীবনের সব প্রচেষ্টা কেবল আরাম-আয়েশের জন্যই নিবেদিত হয়। এমন এক জীবনযাপন যার শেষ নেই—শুধু শূন্যতা!
কিন্তু যদি কেউ দুনিয়াকে আখেরাতের পরিপ্রেক্ষিতে দেখে এবং চিরস্থায়ী জীবনের সাফল্যকে ক্ষণস্থায়ী সুখের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়, তবে সে জীবনকে যেকোনো মূল্যে গ্রহণ করবে না। কারবালার ময়দানে যে অল্প কিছু মানুষ এমন উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইমাম হুসাইনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তারাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম শিক্ষাদাতা।
অন্যদিকে, যারা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল এবং রাসূলের (সা.) দৌহিত্রের রক্ত ঝরাতে দ্বিধা করেনি, তারা শুধু তাদের নিজের আরাম-আয়েশ ও পারিবারিক স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তাদের জন্য দুনিয়ার সুখই সব কিছু ছিল।
মহররম আমাদের শেখায়—জীবনে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নয়
মহররম শিক্ষা দেয়—
ক) জীবন গঠনের ক্ষেত্রে কেবল দুনিয়াবি লক্ষ্য নয়, বরং আখেরাতকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
খ) পরিবারের গঠন যেন শুধু আর্থিক দিক বিবেচনায় না হয়
গ) সন্তান জন্ম দেওয়া যেন শুধুই ভোগবিলাসের চিন্তা থেকে না আসে
ঘ) বিবাহ অনুষ্ঠান যেন কেবল আড়ম্বর ও খরচের প্রতিযোগিতা না হয়ে দাঁড়ায়
আর যদি এসবই নিছক দুনিয়াবি চিন্তা থেকে করা হয়, এবং তারপরও দাবি করা হয়—"আমরা ইসলামের অনুসারী", তবে আমাদের কথা ও কাজের মধ্যে বিরাট অসামঞ্জস্য থেকে যায়।
সারকথা:
আশুরা ও কারবালা আমাদের শেখায়—সম্মান ও আত্মমর্যাদা ছাড়া জীবন মূল্যহীন। হুসাইন (আ.) দেখিয়েছেন যে, জীবন শুধু বেঁচে থাকার নাম নয়, বরং মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা, এবং প্রয়োজন হলে সেই মর্যাদা রক্ষায় মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করা, এটাই প্রকৃত জীবনের শিক্ষা।
__________________________________________
কেন ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালাতে তাঁর পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন?
✍️ মইনুল হোসায়েন
কারবালার ঘটনা একটি নজিরবিহীন আত্মত্যাগের ঘটনা। আশুরার দিনে (১০ মহরমে) সকলে শহীদ হওয়ার পরেও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বেঁচে থাকা পরিবার ও আত্মীয়দের উপর কঠিন অত্যাচার ও নিপীড়ন চালানো হয়। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন ওঠে যে, যখন ইমাম হুসাইন (আ.) ভালোভাবেই জানতেন যে, তাঁর ও ইয়াজিদ বাহিনীর মধ্যে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং সেই যুদ্ধে তাঁর শাহাদাত হবে এবং তাঁর পরিবারের অসহায়ত্বের সুযোগে তাঁদেরকে বন্দী করা হবে ও নির্যাতন চালানো হবে - তাহলে কেন ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারকে কারবালায় নিয়ে এসেছিলেন? কেন তিনি তাঁর পরিবারকে এই বিপজ্জনক সফরে সঙ্গী করলেন?
ইসলামি গবেষকরা উক্ত প্রশ্নের বিভিন্নভাবে উত্তর দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি মত হলো, তৎকালীন আরবদের মধ্যে এটি একটি প্রচলিত প্রথা ছিল যে, তারা তাদের পরিবার ও স্ত্রীদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে সঙ্গে করে নিয়ে যেত। কিন্তু এই উত্তরটি আমাদের কাছে অবাস্তব বলে মনে হয়। কারণ এটি অন্যান্য অনেক প্রশ্ন জন্ম দেয়। যেমন আরবরা কেন তাদের পরিবারকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসত? এমনকি যদি এটি সত্য হয় যে, এই প্রথা আরবদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের পরিবারকে নিয়ে আসার কী কী সুবিধা থাকত? ইমাম হুসাইন (আ.) কি আরবদের প্রথা ও সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণ বা অনুকরণ করতেন? ইমাম হুসাইন (আ.) কি আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করেননি যখন তিনি তাঁর পরিবার ও শিশুদের (যাদের মধ্যে নবজাতকও ছিল) যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে এসেছিলেন?
ইমাম হুসাইন (আ.) জানতেন যে, তাঁর কাঁধে একটি মহান ঐশী দায়িত্ব অর্পিত ছিল। এই দায়িত্ব ছিল, মুসলিম উম্মাহকে জাগ্রত করা। এই দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করতে হতো। এর একটি পর্যায় শাহাদাতের মাধ্যমে পূরণ হবে এবং অন্য একটি পর্যায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের পরে পূরণ হবে। ইয়াজিদ কর্তৃক ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবারের উপর যে জুলুম চালানো হয়েছিল তার বর্ণনা করা জরুরী ছিল। এই দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকাশের মাধ্যমেই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ঐশী দায়িত্ব সম্পূর্ণ হতো। ইয়াজিদ চেয়েছিল ইমাম হুসাইনকে হত্যা করে নিজ ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখা। তাই সে মিথ্যা দাবি করেছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) এবং জনাবে জয়নাব (সা.)-এর নেতৃত্বে কারবালার বন্দীদের দেওয়া বক্তৃতার মাধ্যমেই ইয়াজিদের জুলুম ও অপরাধ উন্মোচিত হয়েছিল। এই অপরাধগুলো বন্দীদের দ্বারা প্রকাশ্যে ফাঁস হওয়ার কারণেই ইয়াজিদ তার অশুভ উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারেনি। ইমাম হুসাইন (আ.) খুব ভালো করেই জানতেন যে, যদি তিনি এবং তাঁর সমস্ত সন্তান ও সঙ্গীরা শহীদ হন এবং তাঁর পরিবারের কিছু সদস্য তাঁর শাহাদাতের সাক্ষী হিসাবে না থাকেন, তাহলে কেউ তাঁর উপর সংঘটিত জুলুমের কথা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করবে না। পরিবারের কিছু সদস্যের জীবিত থাকা এবং বন্দী হওয়া প্রয়োজন ছিল যাতে তাঁরা তাঁর উপর সংঘটিত জুলুম প্রকাশ করতে পারেন, অন্যথায় প্রবাহিত সমস্ত রক্ত ব্যর্থ হতো। এই কারণেই ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারের নারীদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন এবং এই কাজটিকে অপরিহার্য বলে মনে করেছিলেন।
এর সাথে সাথে একদল গবেষক এই ঘটনার মানবিক ট্র্যাজেডির উপরও আলোকপাত করেছেন। তাঁরা জোর দিয়েছেন যে, ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াজিদের আসল রূপ উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন। এই কারণেই ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারের সকল সদস্য, নারী ও শিশুসহ সবাইকে নিয়ে এসেছিলেন। যদিও তিনি জানতেন ইয়াজিদ তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাথে কী আচরণ করবে, তবুও ইমাম হুসাইন (আ.) তাদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন ইয়াজিদ ও তার সরকারের প্রকৃতি ও পরিচয় উন্মোচিত করার জন্য। এইভাবে তিনি প্রমাণ করতে চাইছিলেন যে ইয়াজিদ মুসলিম উম্মাহর খলিফা হওয়ার যোগ্য ছিল না।
এই প্রশ্নের সম্ভবত আরও একটি ভালো উত্তর হলো, ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারের নারী ও শিশুদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন কারণ তিনি তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। যদি ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সময় একা যেতেন এবং তাঁর পরিবারকে মদিনায় রেখে আসতেন, তাহলে এই আশঙ্কা ছিল যে খিলাফতের অনুসারীরা তাঁদের গ্রেফতার করে কারাবন্দী করতে পারত।
ইমাম (আ.) এটিকে উপযুক্ত কারণ হিসাবে দেখেছেন যে, তিনি তাঁর পরিবারকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাবেন, যাতে একদিকে তিনি তাঁদের নিজের সুরক্ষায় রাখতে পারেন এবং অন্যদিকে তাঁরা বিশ্বনবী (সা.)-এর আহলে বাইত (আ.)-এর উপর সংঘটিত জুলুম প্রকাশ করার মাধ্যমে হুসাইনী মিশন চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ইয়াজিদের শাসনের ধরণ বিচার করলে দেখা যায়, আহলে বাইত (আ.)-কে গ্রেফতার করা তার নিকট অসম্ভব কিছু ছিল না। তৎকালীন মদিনার গভর্নর ছিল আমর ইবনে সাইদ আশদাক। যখন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মৃত্যুর খবর তাঁর কাছে পৌঁছায়, তখন সে আনন্দিত হয়। সমগ্র মদিনা যখন শোকে আচ্ছন্ন ছিল এবং সবাই কাঁদছিল ও দুঃখ প্রকাশ করছিল, তখন সে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য শোকাহত মদিনাবাসীদেরকে তিরস্কার করছিল। যদি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পরিবার মদিনায় থেকে যেতেন, তাহলে এমন একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তি তাদের সাথে কী আচরণ করত তা সহজেই অনুমান করা যায়। সে অবশ্যই তাঁদেরকে গ্রেফতার করে কারাবন্দী করত এবং তাঁদের উপর নির্যাতন করত। মদিনার গভর্নর আমর ইবনে সাইদ আশদাক ছিল সেই ব্যক্তি যে, বনি হাশিমের সকল বাড়িঘর ধ্বংস করার আদেশ দিয়েছিল এবং সে ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি তার শত্রুতা ও ঘৃণার কারণে অত্যাচারী হয়ে উঠেছিল।
কারবালার পরবর্তী ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, নিজ পরিবারকে সঙ্গে আনার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না। বস্তুত তাঁরাই কারবালার হুসাইনী মিশনের বার্তাকে বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন এবং তাঁদেরই জন্য কেয়ামত অবধি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট হয়। ইসলামের বেশে থাকা ইয়াজিদের মত শাসকদের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হয় এবং কেয়ামত অবধি সত্যসন্ধানী মানুষের জন্য কারবালা ও ইমাম হুসাইন একটি সত্য পথের সন্ধান দেয়। সত্য ও মিথ্যার সংগ্রামে ইয়াজিদের মত শাসকদের সমর্থনের পরিবর্তে সমূলে উৎপাটন ঘটানোর শিক্ষা কারবালাই আমাদেরকে শিখিয়েছে। বলা বাহুল্য এই সকল শিক্ষাগুলিই ঢাকা পড়ে যেত যদি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পরিবার কারবালাতে না থাকতেন এবং সেই বার্তাগুলি প্রচার না করতেন।
__________________________________________
এক নিঃসঙ্গ আজাদারের খোঁজে...
✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল
মুহাররম এলেই আমাদের অন্তরে জেগে ওঠে এক গভীর শোকের অনুভব। আমরা মজলিস করি, মাতম করি, হুসাইনের (আ.) নাম স্মরণ করে চোখ ভিজাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই কান্না, এই মাতম কতটা গভীরভাবে সম্পর্কিত সেই ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর শোকের সঙ্গে, যিনি আজও পর্দার অন্তরাল থেকে হুসাইনের জন্য কাঁদেন?
আমাদের আজাদারী কতটা তাঁর আজাদারীর মতো? আমরা কি কেবল একটি আচার পালনের জন্য শোক প্রকাশ করি, নাকি আমাদের কান্না সত্যিই ইমামের কান্নার অংশীদার হতে চায়?
ইমামের আজাদারী: নিঃসঙ্গতা ও প্রস্তুতির প্রতীক
ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) কেবল একজন আজাদার নন—তিনি হচ্ছেন কারবালার শহীদদের উত্তরসূরি এবং প্রতিশোধপ্রত্যাশী। তিনি তাঁর নানা হুসাইন (আ.)-এর জন্য প্রতিদিন শোক প্রকাশ করেন। তবে তাঁর শোক আমাদের মত প্রকাশ্য নয়। তিনি বলেন, "আমি অশ্রুর বদলে রক্ত ঝরাব।" এটি কোনো অলঙ্কার নয়, বরং এক বাস্তব অনুভূতি।
আমরা যখন সময়সীমাবদ্ধভাবে মজলিসে বসি, তখন তিনি শহীদদের কবরের ধারে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমরা জিয়ারতের জন্য বইয়ের পৃষ্ঠা ব্যবহার করি, আর তিনি করেন হৃদয়ের ক্ষত নিয়ে। আমাদের কান্না অনেক সময় পারিবারিক রীতি, সামাজিক দায়িত্ব বা সংস্কৃতির অংশ; কিন্তু ইমামের কান্না—এটি দায়িত্ব, প্রেম এবং প্রতিজ্ঞার মিশ্রণ।
আমাদের আজাদারী: দায়িত্ব না দৃষ্টি?
আমরা প্রায়ই নিজেদের আজাদার বলে পরিচয় দিই। কিন্তু আজাদার হওয়া মানে শুধু শোক পালন নয়, বরং এক প্রস্তুতির অংশ হওয়া—ইমামের লক্ষ্য ও অভিযাত্রায় সঙ্গী হওয়া। যদি আজাদারী হয় কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ, তবে তা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু যদি সে আজাদারী হয় দায়িত্ববোধ ও চেতনার জাগরণ, তবে তা হয় সমাজ বদলের শক্তি।
হুসাইন (আ.) আমাদের জন্য কোরবানি দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর রক্তপাতের পূর্ণ প্রতিশোধ এখনও হয়নি। ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-ই সেই প্রতিশোধের সকাল। আমাদের আজাদারী যদি তাঁর আগমনের প্রস্তুতি না হতে পারে, তবে তা পরিপূর্ণ নয়।
আজকের শোকের মূল প্রশ্ন হলো—আমরা কি কেবল অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ? না কি আমরা তা কাজে রূপ দিচ্ছি? ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) আমাদের শোকের মাঝে কি খুঁজে পান সেই চেতনা, যা তিনি চান? আমাদের কান্না কি তাঁকে সান্ত্বনা দেয়, নাকি তিনি কাঁদেন আমাদের নিরুত্তরতার কারণে?
উপসংহার
আজ আমাদের দরকার এমন এক আজাদারী, যা হবে হৃদয় থেকে উৎসারিত, কিন্তু দায়িত্ববোধে পরিচালিত। ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর শোক এক গভীর আত্মিক প্রস্তুতি—যা শুধু কান্নায় নয়, বরং প্রতিজ্ঞায় প্রকাশ পায়। আমাদের উচিত সেই শোকের শরিক হওয়া, যার ফলশ্রুতি হবে ইমামের ডাকে সাড়া দেওয়া।
সত্যিকার আজাদারীর মানে শুধু মাতম করা নয়,
বরং সেই প্রস্তুতি নেওয়া— যাতে ইমাম (আ:) আমাদের দেখে বলেন, "তোমরা আমার সহযাত্রী, আমার শোকের সাথী।"
__________________________________________
আযাদারির সৌন্দর্য
✍️ রাজা আলী
আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর সৃষ্ট পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়কে এক এক প্রকার সৌন্দর্য দান করেছেন।এই সৌন্দর্য মানুষের উপভোগ্য।অনুরূপ মানুষের দ্বারা প্রচালিত প্রত্যেক জিনিসেরও রয়েছে
সুনির্দিষ্ট সৌন্দর্য।আর সৌন্দর্য সৃষ্টির কাজে মানুষ কে উৎসাহিত হতে হয় ও উদ্যোগ নিতে হয়।প্রত্যেকটি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারলেই তা মানুষের মনে তীব্র আবহ ও আবেগ তৈরি করে।
আমাদের শীয়া মাযহাবের অন্যতম এবাদাত হলো মূলত মুহাররম সফর মাসে পালিত আযাদারী ।এ সময় কারবালা র মসীবতকে স্মরণ রেখে আমরা শোকের আবহের মধ্যে থাকার চেষ্টা করি। সুতরাং সাধারণ সময় ও পরিবেশ থেকে আযাদারীর সময় ও পরিবেশ সম্পূর্ণ পৃথক ও ভিন্ন।তাই আযাদারীর পরিবেশ আমাদের তৈরি করে নিতে হয়।এই পরিবেশ তৈরির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আযাদারীর সৌন্দর্য।
আমরা যদি আযাদারির এই কয় মাস ভিন্ন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারি বা আযাদারির মধ্যে সৌন্দর্য আনতে পারি ,তবে তা আমাদের নিকট আবেগ সঞ্চারী হয়ে উঠবে;আর অন্য মাযহাবের নিকট গ্রহণযোগ্যও হতে পারে।সেই কারণে আযাদারীর সৌন্দর্যের প্রতি আমাদের সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।এই সৌন্দর্য কে দুই ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে।
১.বাহ্যিক সৌন্দর্য বা বাইরের সৌন্দর্য,
২.অভ্যন্তরীন সৌন্দর্য বা ভিতরের সৌন্দর্য।
বাহ্যিক সৌন্দর্য:
প্রথমত, যে কোনো অনুষ্ঠানকে সৌন্দর্য মন্ডিত করার গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হলো সময় সচেতনতা। অনুষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময়ে শুরু করে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে হবে। অনুষ্ঠান কতটা সময় ধরে চালানো হবে ,সেটা বড়ো কথা নয়;বড়ো কথা হলো সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠান পরিচালিত হবে।
দ্বিতীয়ত, এমন ভাবে বক্তব্য পরিবেশিত হবে,যাতে ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এর নীতি আদর্শ, কারবালা যাওয়ার উদ্দেশ্য , আহলে বাইত আঃ এর গুণাবলী ইত্যাদি পরিষ্কার বক্তাদের সামনে ফুটে ওঠে এবং আযাদারির প্রতি মানুষের আবেগ তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, মাতমের ক্ষেত্রে বাইরের জৌলুস থেকে বাইরের সংহতি ও মনের দুঃখানুভূতি প্রকাশিত হতে হবে।
চতুর্থত, আযাদারির পরিবেশ যেনো কোনো ভাবেই তর্কাতর্কি বা কোনো রকম বিবাদের মাধ্যমে কলুষিত না হয়,সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
পঞ্চমত, আযাদারির অনুষ্ঠানের শুচি ও পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য নানা রকম ব্যবস্থা করতে হবে।যেমন ,পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা আলাদা বসার জায়গা, মহিলাদের পর্দা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা ।
ষষ্ঠত, তাবারুক পরিবেশন বা বন্টনকে কেন্দ্র করে অহেতুক মূল শোকানুষ্ঠানের আবেগকে নষ্ট না করা,ইত্যাদি।
অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য:
আযাদারির অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য তৈরি করতে আযাদারদের হৃদয়ের শুচি -শুভ্রতা প্রয়োজন। প্রত্যেক আহলে বাইত প্রেমিক মানুষ কে সুস্থ ও সুন্দর বিদ্বেষ বিহীন,প্রশস্ত হৃদয় নিয়ে ফারসে আযাতে বসতে হবে।
ইমাম হোসাইন আঃ এর শোককে অন্তরে গভীর ভাবে অনুভব করে নিজ নিজ হৃদয়ে দুঃখের আবহ রচনা করতে হবে। বাহ্যিক পরিবেশের নানা জাল ও জটিলতা যেনো কোনো ভাবেই অন্তরের শোকানুভূতির মালা ও মাত্রাকে কমাতে না পারে ,সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। এককথায়,নিজ নিজ হৃদয়াভ্যন্তরে নিজের মতো করেই আযাদারীর সৌন্দর্য তৈরি করতে হবে।
পরিশেষে বলতে হয়,আযাদারির সৌন্দর্য বিষয়ে আমাদের সচেতনতা ই সব থেকে বড়ো কথা।যদি এ বিষয়ে আমরা গুরুত্ব না দিই বা অমনোযোগী থাকি তবে আমরা কখনোই আযাদারির সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করতে পারবো না। মানুষের বোধ বুদ্ধি আর সচেতনতা কে কাজে লাগিয়ে দায়বদ্ধতা কে সঙ্গী করে সকলে মিলেই আজাদারির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে হবে।
__________________________________________
মহাররাম ও ইমামে যামানা
✍️ আব্বাস আলী
ইসলামি বছরের প্রথম মাস মহরম শুধু একটি নতুন বছরে সূচনাই নয়, বরং তা ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক ইতিহাস গাথা।এই মাসে আমরা ইমাম হোসাইন (আ:)ও তার সঙ্গীদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করি।যারা সত্য-ন্যায় ও ইসলাম রক্ষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।তাই মহরম মাস শুধু শোকের মাস নয়,বরং এটি হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বের এক নজির বিহীন উদাহরণ।
মোহররম এমন এক মাস,৬১ হিজরীতে এই মাসেই ইমাম হোসাইন (আ:) ৭২ জন সাথী সহ দাঁড়িয়েছিলেন তখনকার জালেম শাসক ইয়াজিদের বিরুদ্ধে। তিনি দুনিয়ার আরাম-ক্ষমতা বা রাজনীতি নয় ;বরং ইসলামের মূল আকিদা ন্যায়ের মূলনীতি রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। ন্যায় ও ইনসাফের জন্য কারবালার প্রান্তরে জালিম ইয়েজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইন(আ:) এক মহান আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি বলেন-
"আমি ইসলামের সংস্কারের জন্য বার হয়েছি,এবং আমি চাই আমার নানার উম্মতের মধ্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা হোক"।
তিনি আরো বলেন-
"নিজের মাথাকে কাটাতে হয় কাটাবো। নিজের শাহাদাত দেব তবুও অপমানের সাথে জীবন যাপন করবো না"।
ইমাম হোসাইন আঃ কীভাবে বাতিল কে দূরে ঠেলে দিয়ে ইজ্জাতের সাথে জীবন যাপন করতে হয়,তা আমাদের ৬১ হিজরী র মোহররম মাসে শিখিয়েছেন।
ইমাম মেহেদী আঃ কারবালার উত্তরাধিকারী
ইমাম মেহেদী আঃ একাদশ ইমাম ইমাম হাসান আসকারী আঃ সন্তান এবং ইমাম আলী আঃ ও হযরত ফাতেমা (সা আ) বংশধর। তিনি ইমাম হুসাইন (আ)এর উত্তরসূরী। তিনি সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তি যিনি জুলুমে ভরে ওঠা পৃথিবীতে সম্পূর্ণ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। মহরমের শিক্ষা হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও আল্লাহর পথে আত্মত্যাগ। এবং এই গুলোই হল ইমাম মেহেদীর মিশনের ভিত্তি। তিনি কারবালার চেতনার সম্পূর্ণ বাস্তবায়নকারী হবেন।
কারবেলা থেকে শিক্ষা ও ইমাম মেহেদির অপেক্ষার প্রস্তুতি
আমরা যারা ইমাম হোসাইন (আ)কে ভালবাসি এবং ইমাম মেহেদী আঃ এর আগমণের জন্য প্রতিক্ষা করি,তাদের অনেকগুলি করণীয় রয়েছে।মোহররমের আদর্শের ভিত্তিতে নিজের জীবন যাপনের মধ্যে ইনসাফ ও সততা এবং সত্যকে আঁকড়ে ধরতে হবে।
সমস্ত রকম জুলুম দুর্নীতি ও ফেতনা-ফাসাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। এবং
নিজের আত্মশুদ্ধি ও ইসলামিক জ্ঞান চর্চা করতে হবে।
এই সমস্ত বিষয়গুলো আমরা হিজরি সন ৬১ সালে কারবালা থেকে পেয়ে থাকি। যা ইমাম হোসাইন আঃ এবং তার সাথী সঙ্গীরা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।
মহররম ও ইমাম মেহেদী আঃ
মোহররম এবং ইমামে মেহেদী (আ) এই দুটি বিষয়ই ইসলামে অতি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই একদিকে কারবালার স্মৃতি যেমন আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়;ঠিক তেমনি অন্যদিকে ইমাম মেহেদীর প্রতীক্ষা আমাদের আশাবাদী করে তোলে।
তাই আজকে আমাদের করণীয় কারবালার চেতনায় জেগে ওঠা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।ও সত্যের পথে অটল থাকা এবং ইমাম মেহেদীর আগমনের জন্য ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করা ||
__________________________________________
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পেয়গাম (অনুবাদ)
✍️ মাওলানা কাজিম আলি
ইমাম মাহ্দী (আঃ) থেকে একাধিক পেয়গাম শীয়াদের কাছে পৌঁছেচে। এই পেয়গামগুলির মধ্যে বেশির ভাগ ই প্রশ্নের উত্তর স্থান পেয়েছে। বিভিন্নি সময় 'নওয়াবে আরবাআ'রা' মানুষের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা নিয়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলে ইমাম (আঃ) একটি লেখা নকশা তৈরী করেন। আর ঐ লেখা নকশাটি কামালুদ্দিন শেখ ছোদুক (৩৮১ হিজ্বরী) এবং ইহুতেজাজে শেখ ত্বাবরেসীর (৫৮০ হিজ্বরী) পুস্তকে স্থান পেয়েছে। ঐ লেখাগুলি ছাড়াও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর একাধিক উক্তি ও কথা পাওয়া যায়--যা হয়ত শীয়াদের কাছে পৌঁছেচে তাঁর শিশু বয়সে সাক্ষাতের মাধ্যমে কিম্বা গাইবাত কালে সাক্ষাতের মাধ্যমে। ইমাম মাহদী (আঃ)-এর তাওহীদ ও তাফসীরে কোরআন বিষয়ে, ইমামত এবং আহলেবায়েতের স্থান বিষয়ে, বেদ্বীন ও পথভ্রষ্টদের আক্বীদার পরিবর্তন বিষয়ে, ইমাম মাহ্দী হওয়ার মিথ্যাদাবীকারী ও প্রতিনিধি হওয়া বিষয়ে, বিভিন্ন মাসলা-মাসায়েলের ইমাম (আঃ) কতৃক ব্যাখ্যা বিষয়ে, দোয়া ও যিকির বিষয়ে, চরিত্র ও ফিক্বহ্ বিষয়ে যে সমস্ত আদেশ-আশ্বাস, কথা ও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তা শীয়া মাযহাব সম্পর্কে পরিচিত হবার অতুলনীয় সম্পদ স্বরূপ।
বর্তমান নিবন্ধে ইমাম মাহদী আঃ এর কতকগুলি উপদেশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি--
(ক) মানুষকে নিরর্থক সৃষ্টি করা হয়নিঃ-
" কোনো সন্দেহ নেই, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সৃষ্টিকুলকে বেকার সৃষ্টি করেনি। আর কোনো উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা ব্যতীত পৃথিবীতে ছাড়েনি” (অনুবাদ)।
(খ) প্রত্যেকটি যুগে আল্লাহ্ প্রতিনিধি প্রয়োজনঃ
"কখনও জমীন আল্লাহ্ হুজ্জাত ব্যতীত শুন্য থাকবে না-তা সেটা প্রকাশ্যে থাক অথবা গোপনে"।
(গ) ইমামতের অধিকারঃ
"হক্ক আমাদের সঙ্গে; আর আমাদের ব্যতীত কেউ দাবী করলে সে মিথ্যাবাদী"।
(ঘ) গাইবাতের যুগে মানুষের উপকারঃ
"আমার গাইবাতের যুগে আমার থেকে মানুষ উপকৃত হবে, এটা নিশ্চিত। যেমন সূর্য মেঘের আড়ালে অন্তর্হিত হওয়ার পরেও সূর্য থেকে মানুষ উপকৃত হয়"।
(ঙ) সর্বশেষ ওছীঃ
"আমি ওছীগণদের মধ্যে শেষতম ওছী। আল্লাহ্ আমার থেকে আমার বংশ এবং শীয়াদের উপর থেকে বালা মছীবত দূরে রাখবে"।
(চ) আহলে বায়েত ই যথার্থ জ্ঞানের ভান্ডারঃ
আহলেবায়েতের পথ ব্যতীত অন্য কোনো পথে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা আহলেবায়েতকে অস্বীকার করা।
(ছ) অনুসন্ধিৎসু হওয়াঃ
যদি তোমরা হেদায়েতের অন্বেষণ কর, তবে হেদায়েত পাবে; আর যদি হক্কের অন্বেষণ কর, তবে হক্ক পাবে।
(জ) মাহ্দী (আঃ)-এর সাক্ষাৎ না পাওয়ার কারণঃ আমাকে আমার শীয়াদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাদের খারাব আমল। কারণ, খারাব আমল আমার অপছন্দ; আর আমি তাতে অসন্তুষ্ট।
(ঝ) গাইবাতের যুগে শীয়াদের দায়িত্বঃ
তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এমন আমল করা, যাতে তোমরা আমার নিকটবর্তী হতে পার। আর ঐ সমস্ত আমল থেকে দূরে থাকা-যা আমার নিকট অপছন্দ।
(ঞ) নামাজের ফজীলাতঃ
সমস্ত প্রকার আমলের মধ্যে নামাজ হল সর্ব শ্রেষ্ঠ আমল। এই আমলের ফলে শয়তান লজ্জিত হয় ও অপমানিত হয়।
(ট) ইমাম (আঃ)-এর সম্পদঃ
যে ব্যক্তি আমাদের সম্পদ থেকে (হক্ক ব্যতীত) কিছু খেলো, সে জাহান্নামের আগুন দিয়ে পেট ভরালো।
হে আল্লাহ্ আমাদের আপনার পুস্তক, দ্বীন এবং ওলী (আঃ)-কে বেশি থেকে বেশি পরিচিতি করান এবং অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন ইয়া রব্বুল আ'লামীন।
বর্তমান নিবন্ধে র সংক্ষিপ্ত বিষয়
ইমাম মাহ্দী (আঃ) আমাদেরকে কিছু কিছু আদেশ দিয়েছেন। যেমন,-
১.মানুষকে নিরর্থক সৃষ্টি করা হয়নি।
২ জমিন কখনও খোদার হুজ্জাত ব্যতীত খালি থাকবে না।
৩.শুধুমাত্র ইমাম (আঃ)-দের অনুসরণ করেই হক্কের কাছে পৌঁছান সম্ভব। ইমাম মাহ্দী (আঃ) গাইবাতের যুগে আমাদের কাছে মেঘে ঢাকা সূর্যের মতো।
__________________________________________------------------------------------------------
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
শহীদের স্মরণে
✍️মো: মুন্তাজির হোসেন গাজী
কুফা তে হজরত আলীর শহিদ
হৃদয় জখম করে আছে,
এই বেদনা ভরা স্মৃতি আজও ভাসে
ইমাম এ যামানার কাছে।।
ফাতেমা জাহরার পাজর ভাঙ্গার
ব্যাথা অন্তর কে কাঁদায়,
বিচার হয়নি আজও
আছি মোরা বিচারের অপেক্ষায়।।
দাফন করিতে দেয়নি
তির মেরেছে জানাযায়,
ইমাম হাসানের শহিদের আর্তনাদ
পর্দার অন্তরালে শোনা যায়।
কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে
আজও কারবালায়,
শহিদ হুসায়েনের বদলার জন্য
শেষ হুজ্জাত আছেন অপেক্ষায়।
কাউকে কয়েদখানায়
কাউকে শহিদ করেছে বিষ দিয়ে,
ইমামে জামানার রক্ত অশ্রু
আজও ঝরছে অঝরে।
ইমাম জাফর সাদিক মাটিতে
লুটিয়ে পড়তো যার শোকে,
না জানি কেমন দুঃখে আছেন তিনি
হে! রব সমাপ্ত করে তার দুঃখ কে।।
__________________________________________
আযাদারী
✍️ রাজা আলী
চারিদিকে পোশাকের বাহার
কালোয় কালো
মিষ্টি কথা শুনলে মনে হবে
এর চেয়ে নেই ভালো।
আমরা ,হ্যাঁ,আমরা ই
শিয়া বলে করি জোর গর্ব
অথচ আমলের ভাড়ার শূন্য
হৃদয়ে জায়গা দাও ধর্ম।
আযাদারী আনুষ্ঠানিকতা নয়,চেতনা
মনে রেখো না কোনো ফেতনা
চোখ বুজে চ'লো না পথ
চালাও শুভ চেতনার মনোরথ
কী করছি একবার ভাবো
ইমাম আঃ দেখছেন সব
আমাদের গোনাহ তাঁকে কাঁদায়
জেনে রাখো,ছাড় দেবেন না রব।
__________________________________________
হে কুফাবাসী…
মূলঃ আল্লামা ইকবাল
অনুবাদঃ মইনুল হোসেন
আমাকে কুফাবাসী মুসাফির ভেবো না
আমি নিজে আসিনি, আমাকে ডাকা হয়েছে...
মেহমান বানিয়ে আমাকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে,
আমি কাঁদিনি, আমাকে কাঁদানো হয়েছে...
খোদা জানেন, কেমন এই মেহমানদারি,
বাহাত্তর পিপাসার্তের জন্য পানি বন্ধ;
তকদিরে আছে হাউজে কাউসার পান করা, আমি তৃষ্ণার্ত নই,
আমাকে পান করানো হয়েছে...
যে মাথা আল্লাহর দরবারে নত হয়েছিল,
সেই মাথা কারবালায় কাটা হয়েছে;
শাহাদাতের মঞ্জিল আমি পেয়েছি,
আমি মৃত নই, আমাকে জীবিত করা হয়েছে...
আমাকে কুফাবাসী মুসাফির ভেবো না,
আমি নিজে আসিনি, আমাকে ডাকা হয়েছে...
_________________________________________
জিয়ারতের শোক সুরে আজাদারী
✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল
আমাদের আজাদারী হোক জিয়ারাতে আশুরার ন্যায়—
যেমন প্রতিটি "সালাম" এক প্রেমিকের নিঃশব্দ উচ্চারণ,
আর প্রতিটি "লানত" এক নির্ভীক প্রতিবাদের আগুন।
যেখানে কান্না হয় রক্তজবা, নয় কেবল জলের রেখা—
যেখানে শোক নয় ক্লান্তি, বরং প্রস্তুতির দীপ্ত প্রতিশ্রুতি।
আমাদের মাতম হোক ইমামের কাতরের প্রতিধ্বনি,
আমাদের কণ্ঠে ফুটে উঠুক মাহ্দীর প্রতীক্ষার রোদ্দুর।
আজাদারী হোক আত্মবোধের দীপ্ত শিখা—
যা কারবালার মরুভূমিতে নয়, জ্বলে উঠে আমাদের বুকে।
হোক সে কান্না, যেখানে ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) বলেন—
“তোমরা কাঁদছো আমার মতোই,
এসো—আমার প্রতিশোধে সঙ্গী হও।”
------ _____------_____------______------______------
No comments:
Post a Comment