আরবি: রমজান, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: মার্চ, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________
সম্পাদক :
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী
প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন এবং মুন্তাজির গাজী
অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন
প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী
বকচরা,মিনা খাঁন,উত্তর ২৪ পরগণা
__________________________________________
সূচিপত্র
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড : সম্পদ বা ক্ষমতা নয়, খোদা ভিতিই কাম্য -- মাওলানা কবির আলি তরফদার কুম্মী
ইমাম হাসান আঃ এর পরিচয় ও শিক্ষা মূলক বাণী -- মাওলানা মহম্মদ সুজাউদ্দিন মাসহাদী
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)
ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা, ঈশ্বরকে জানার পথ এবং সৃজনশীল যুক্তি: একটি বিশদ পর্যালোচনা -- মাওলানা রিপন মন্ডল ইস্পাহানী
মাহে রমজান ও রোজার মাহাত্ম্য -- মইনুল হোসেন
মোমিন ব্যক্তিদের রোজা -- মিনহাজউদ্দিন মন্ডল
ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত:মানব মুক্তির চাবিকাঠি -- রাজা আলী
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
আল-কুদস :-- মইনুল হোসেন
তাক্বওয়াপূর্ণ জীবন :--মিনহাজউদ্দিন মন্ডল
আত্মনাদ :-- মো: মুনতাজির হোসেন গাজী
ইমাম আসবে তাই :-- রাজা আলী
__________________________________________
__________________________________________
সম্পাদকীয়
আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের বরকতে প্রকাশিত হলো আল হুজ্জাত পত্রিকার (অনলাইন) দ্বিতীয় সংস্করণ। পবিত্র রমযান মাস উপলক্ষে প্রকাশিত এই সংখ্যায় রমযান এবং ইমাম মাহদী আঃ বিষয়ক কিছু আলোচনা স্থান পেয়েছে। রমযান মাসের গুরুত্ব অশেষ।এই গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে এবং যুগের হাদী ইমাম মাহদী আঃ এর নাম প্রচারের উদ্দেশ্যে রমযান সংখ্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই ছোট্ট খেদমতকে তাঁর দরবারে কবুল করুন। এবং যুগের ইমাম আঃ এর ওছিলায় পত্রিকা প্রকাশে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার তৌফিক দান করুন।
ওয়াস সালাম
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
__________________________________________------------------------------------------------
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড : সম্পদ বা ক্ষমতা নয়, খোদা ভিতিই কাম্য
اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ ۚ وَفَرِحُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مَتَاعٌ
“আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা সংকীর্ণ করেন। তারা দুনিয়ার জীবনে আনন্দিত হয়, অথচ দুনিয়ার জীবন পরকালের তুলনায় কেবল সামান্য ভোগমাত্র।” — (সুরাহ আর-রাদ: ২৬)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, সম্পদ ও দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য চূড়ান্ত সম্মান বা শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়; বরং এগুলো সাময়িক এবং প্রকৃত মর্যাদা নির্ভর করে তাকওয়া ও সৎকর্মের ওপর।
এখানে একটি প্রশ্ন হচ্ছে,
ধন-সম্পদই কি শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি?
কুরআন ও হাদীস আমাদের এই প্রশ্নের কি উত্তর দেয়,আসুন নিম্নে কয়েকটি আয়াত ও হাদীসের আলোকে উত্তর নেওয়ার চেষ্টা করি।
ভূমিকা:
সমাজে আমরা প্রায়ই দেখে থাকি যে ধনী ব্যক্তিদের কথাই বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়, তারা অধিক সম্মানিত হয় এবং তাদের মতামতকেই শেষ কথা হিসেবে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন, যার বেশি সম্পদ রয়েছে, সেই-ই উত্তম। কিন্তু কুরআন ও আহলুল বায়েত (আ.)-এর হাদিস কি এই ধারণাকে সমর্থন করে? বরং আল্লাহর বাণী ও আহলুল বায়েতের শিক্ষায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া, চারিত্রিক গুণ ও আমলের ভিত্তিতে, ধন-সম্পদের ভিত্তিতে নয়।
# কুরআনের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড:
১. তাকওয়া—আসল শ্রেষ্ঠত্ব:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা স্পষ্টভাবে বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
(হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান (পরহেজগার)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।) — (সুরাহ হুজুরাত: ১৩)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কুরআনের দৃষ্টিতে ধন-সম্পদ, বংশ, জাতি বা সামাজিক অবস্থান নয়; বরং তাকওয়াই (আল্লাহভীতি ও ন্যায়পরায়ণতা) প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড।
২. ধনী হওয়া কখনোই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়:
অনেকে মনে করেন, যার কাছে প্রচুর সম্পদ আছে, সে নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে প্রিয়। কিন্তু কুরআন এই ধারণাকে নাকচ করে বলে:
وَمَا ٱلْمَالُ وَلَا ٱلْبَنُونَ بِٱلَّتِى تُقَرِّبُكُمْ عِندَنَا زُلْفَىٰٓ إِلَّا مَنْ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحًا فَأُو۟لَٰٓئِكَ لَهُمْ جَزَآءُ ٱلضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا۟ وَهُمْ فِى ٱلْغُرُفَٰتِ ءَامِنُونَ
(তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকট সান্নিধ্য লাভ করাবে না; বরং যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তারাই দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবে এবং তারা জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষসমূহে নিরাপদে থাকবে।) — (সুরাহ সাবা: ৩৭)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে বোঝায় যে সম্পদ কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে না, বরং ঈমান ও সৎকর্মই প্রকৃত মূল্যবান।
# আহলুল বায়েত (আ.)-এর হাদিসে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড:
১. ইমাম আলী (আ.)-এর শিক্ষা:
ইমাম আলী (আ.) ধনীদের অহংকার ও দারিদ্র্যের প্রতি সমাজের তাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন:
"ধনীরা যদি দান না করতো এবং দরিদ্ররা ধৈর্য ধারণ না করতো, তবে এই সমাজ ধ্বংস হয়ে যেতো।"
— (নাহজুল বালাগা, হিকমাহ ২০৯)
অর্থাৎ, ধনীদের উচিত অহংকার না করে সম্পদকে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা এবং দরিদ্রদেরও ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখা উচিত।
২. ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর শিক্ষা:
এক ব্যক্তি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "মানুষ কি তার ধন-সম্পদের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে?"
তিনি উত্তর দিলেন:
"ধন-সম্পদ মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড নয়; বরং তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতাই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।" — (আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২৩)
হাদিসটি এটা স্পষ্ট করে দেয় যে, আহলুল বায়েত (আ.)-এর দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে চারিত্রিক গুণাবলির ওপর, সম্পদের ওপর নয়।
৩. ইমাম হাসান (আ.)-এর শিক্ষা:
ইমাম হাসান (আ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি তার সম্পদের কারণে অহংকারী হয়, সে আসলে নিজেকেই ধোঁকা দেয়। কেননা, সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ভালো চরিত্র ও আমল চিরস্থায়ী।" — (মিজানুল হিকমাহ)
এই হাদিস থেকে এটা বোঝা যায় যে, সম্পদ একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু সৎকর্ম ও ভালো চরিত্রই মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।
উপসংহার
কুরআন ও আহলুল বায়েত (আ.)-এর শিক্ষা স্পষ্টভাবে বলে যে, ধন-সম্পদ কখনোই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়। বরং তাকওয়া, ঈমান, ন্যায়পরায়ণতা, চারিত্রিক গুণ এবং সৎকর্মই মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে।
আজকের সমাজে আমাদের উচিত ধনীদের( যাদের মধ্যে তাকওয়া,ঈমান,ন্যায়পরায়ণতা,সুন্দর চরিত্র এবং সৎকর্ম নেই) তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ না করে, বরং সৎ ও তাকওয়াবান ব্যক্তিদের মর্যাদা দেওয়া। তাহলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ প্রকৃত অর্থে সম্মানিত হবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথের উপর পরিচালিত করুন।
__________________________________________
ইমাম হাসান আঃ এর পরিচয় ও শিক্ষা মূলক বাণী
মহান আল্লাহ তাঁর (ইমাম হাসান মুজতাবা) মাধ্যমে আমার উম্মতের মধ্যে দু'দলকে সন্ধি করাবেন এবং তারা তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ অস্তিত্বের মাধ্যমে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও শান্তি লাভ করবে।' রাসূলুল্লাহ (সা.) (মশহুর হাদীস)
জন্ম : ৩য় হিজরির ১৫ রমযান, মঙ্গলবার অথবা বৃহস্পতিবার, পবিত্র মদীনা নগরী।
নাম : হাসান (তাওরাতে শুব্বার এবং ইনজীলে তাব)
কুনিয়াত : আবু মুহাম্মাদ
লকব : মুজতাবা, তাইয়্যেব, সাইয়্যেদ, ওয়ালী, তাকী, হুজ্জাত,
কায়েম, ওয়াযির, আমীন।
প্রহরী: দু'ব্যক্তি মহান ইমামের প্রহরী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। একজনের নাম সাফিনা (রাসূলুল্লাহ সা.-এর গোলাম) এবং অন্যজনের নাম কায়েস ইবনে আবদুর রহমান।
ইমামত কাল: প্রায় ১০ বছর (৪০ হিজরির ২১ রমজান শুক্রবার তাঁর ইমামতকাল শুরু হয়)
মানব জীবনের জন্য ইমাম হাসান (আ.) হতে বর্ণিত কতিপয় অমীয় বাণী 👇👇👇👇👇👇👇👇
সালামের গুরুত্ব:
ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি সালাম প্রদানের পূর্বে কথা শুরু করে তার কথার উত্তর দিও না'।
জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব:
তিনি (আ.) বলেছেন: 'নিরবতা, ত্রুটি গোপন রাখে এবং সম্মান রক্ষা করে। যে এ গুণের অধিকারী সে সর্বদা প্রশান্তিতে থাকে এবং তার সহচর ও তার সাথে ওঠাবসাকারীরাও তার হতে নিরাপদে থাকে।'
শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য ও কল্যাণ:
তিনি (আ.) বলেছেন: 'যে কল্যাণের মাঝে কোন মন্দ থাকে, তা হল নেয়ামতের বিপরীতে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও বিপর্যয়ের সময় ধৈর্য ধারণ করা।'
বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতা:
তিনি (আ.) বলেছেন: 'জনগণের সাথে উত্তম ব্যবহার, বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতার পরিচয়'।
ওয়াজিবের জন্য মুস্তাহাব কর্ম ত্যাগ করা:
তিনি (আ.) বলেছেন: 'যখন মুস্তাহাব ইবাদাত ও কর্মসমূহ, ওয়াজিব ইবাদাত ও কর্মসমূহের ক্ষতিসাধন করে তখন তা ত্যাগ করো।'
*আধ্যাত্মিক বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান*
তিনি (আ.) বলেছেন: 'আমি ঐ সকল ব্যক্তিদের বিষয়ে আশ্চর্য হই,যারা নিজেদের শরীরের খাদ্যের বিষয়ে চিন্তা করে;কিন্তু আধ্যাত্মিক বিষয়াদি ও আত্মার খাদ্যের বিষয়ে চিন্তা করে না। ক্ষতিকর খাদ্য থেকে নিজের পেটকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু যে সকল নোংরা চিন্তা তার অন্তরকে দূষিত করে তা হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে না।'
আত্মীয়তার বিষয়:
জনৈক ব্যক্তি ইমাম হাসান (আ.) এর উদ্দেশ্যে বললেন: আমার একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা রয়েছে, কেমন ব্যক্তির সাথে তার বিবাহ দেব? ইমাম হাসান (আ.) বললেন: এমন ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে দাও, যে তাকাওয়াকারী ও পরেজগার। কেননা তাকওয়াবান ব্যক্তি যদি তাকে ভালবাসে তবে তাকে সম্মান করবে। আর যদি তাকে ভাল নাও বাসে তবে অন্তত তার উপর অত্যাচার করবে না।'
ইমামের দৃষ্টিতে রাজনীতি:
জনৈক ব্যক্তি ইমাম (আ.) কে সিয়াসাত তথা রাজনীতির অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন: 'রাজনীতি হল, আল্লাহর অধিকার এবং আল্লাহর জীবিত ও মৃত বান্দাদের অধিকার মেনে চলার নাম। অতঃপর তিনি ব্যখ্যা ঞদিতে গিয়ে বলেন: 'আল্লাহর অধিকার হল, যা কিছু মহান আল্লাহ্ বাস্তবায়নের নির্দেশ ও আঞ্জাম দিতে নিষেধ করেছেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা'। আল্লাহর জীবিত বান্দাদের অধিকার হল, নিজের দ্বীনি ভাইয়ের বিষয়ে তোমার কর্তব্যকে পালন করা, তোমার দ্বীনি ভাইয়ের সেবা দানের ক্ষেত্রে বিলম্ব না করা এবং ইসলামি সমাজের নেতার বিষয়ে, যতক্ষণ সে জনগণের বিষয়ে একনিষ্ঠ থাকে ততক্ষণ তুমিও তার প্রতি একনিষ্ঠ থেকো, আর যখন সে সত্য পথ হতে বিভ্রান্ত হয়ে যায়,তখন তার প্রতিবাদ জানাও'। আর আল্লাহর মৃত বান্দাদের অধিকার হল; 'তাদের উত্তম কর্মসমূহকে স্মরণ করা এবং তাদের মন্দ কর্মসমূহকে গোপন করা।
__________________________________________
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)
মূল লেখক: ড. হাদী ক্বান্দেহারী
" ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের সুখবর আসমানী পুস্তকগুলির মধ্যে আছে। আর সমস্ত ওলীগণ ও আম্বীয়াগণ ঐ দিনের অপেক্ষা করছে। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই গাইবাত কতদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে; আর আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ইমাম মাহদী (আঃ)-কে কোন্ দিন আবির্ভাবের অনুমতি দেবেন, তা তিনি ছাড়া আর সকলেরই অজানা। তাই ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আবির্ভাবের নির্ধারিত দিন যদি কেউ ঘোষণা করে, তাহলে সে মিথ্যাবাদী। এপ্রসঙ্গে ইমাম মাহ্দী (আঃ) একটি পত্রে লিখেছেনঃ
أما ظهور الفرج فإنه إلى الله وكزب الوقاتون “ আবির্ভাবের হুকুম (আদেশ) আল্লাহর হাতে ; আর যারা আবির্ভাবের জন্য সময় নির্ধারণ করবে, তারা মিথ্যাবাদী” (অনুবাদ)।
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর গাইবাতের যুগ শীয়াদের প্রকৃত সমাস্যার সময়। এই যুগ সমাপ্ত হওয়া ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভূত হওয়া মানুষের দোয়া ও মোনাজাতের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন বানী ইস্রাইলদের দোয়া ও কান্না-কাটিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের চার শ' বছরের আযাবকে হাল্কা করে দেয়, আর ১৭০ বছরের আযাবকে ক্ষমা করে দেয়। আর হজরত মুসা (আঃ)-কে তাদের আম্বিয়া হিসাবে পাঠিয়ে ফিরআউনের জঘন্য কার্যকলাপ থেকে পরিত্রাণ দেয়। এই কারণেই জাফর সাদিক (আঃ) মুসলমানদের বিশেষ ভাবে বলেছেন 'ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের জন্য আল্লাহ্ দরবারে বানি ইস্রাইলদের মতো দোয়া প্রার্থনা ও কান্না-কাটি করো'।
ইমাম মাহ্দী (আঃ) ক্বাবা ঘরের নিকট হাজ্বরে আসওয়াদ নামক স্থান থেকে আবির্ভূত হবেন। সেই সময় সেখানে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ৩১৩ জন আসহাব থাকবে। আবির্ভাবের পর জিব্রাইল ক্বাবা ঘরের ছাদ থেকে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের ঘোষণা করবেন। এই ঘোষণার স্বর এবং উদ্দেশ্য সমগ্র পৃথিবীর মানুষ শুনতে এবং বুঝতে পারবে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থান থেকে মোমেনীনরা তাঁর বায়াত গ্রহণ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে। হজরত ঈসা (আঃ) চতুর্থ আসমান থেকে আসবেন। আর ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর বায়াত গ্রহণ করে তাঁর সৈন্যদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবেন। এবং তাঁর পিছনে নামাজ আদায় করবেন। যে সমস্ত মোমেনীন ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশা রাখত, অথচ জীবদ্দশায় সাক্ষাৎ করতে পারেনি; আল্লাহ্ তাদেরকেও পুনরায় জীবিত করবেন। আর তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পক্ষ থেকে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।
এই ধারাবাহিকতায় ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের সংখ্যা যখন দশ হাজারে পৌঁছাবে, তখন তিনি 'ক্বেয়াম' করবেন। প্রথমে মক্কা জয় করে মদীনা; আর সেখান থেকে কুফা পৌঁছাবেন । কুফাকেই সমগ্র পৃথিবীর রাজধানী নির্বাচন করে, সেখান থেকেই গোটা পৃথিবী শাসন করবেন। ক্রমান্বয়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাছাড়াও ফারিসতারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আদেশ পালন করতে থাকবে। আর শত্রুরা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যবাহিনী দেখে ভয় পাবে। তাদের সামনে কোনো ভাবেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। তারা একের পর এক জয়ী হবে, কখনো পরাভূত হবে না। কয়েকটি কারণে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যদলের সামনে শত্রুরা নত হবে। কারণগুলি হ'ল, -
(ক) মোজেযা ও খোদায়ী চিহ্নের নিদর্শন।
(খ) ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর অন্তরজয়ী আলাপ ও কথাবার্তা।
(গ) ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তাঁর সৈন্যদের আচার-আচরণ,
মানুষ্যত্ববোধ ও আন্তরিকতা ইত্যাদি। ইসলাম বিরোধী ইহুদী ও আহলেবায়েতের শত্রুদের সমস্ত রকম বিরোধীতাকে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যরা কঠোর ভাবে প্রতিরোধ করবে। মাত্র আট মাসের মধ্যেই পূর্ব ও পশ্চিম দিক ব্যাপী ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই শাসনের একটি উদ্দেশ্য হল জালিম ও অত্যাচারীদের থেকে অসহায় মানুষদের হক্ক বুঝে দেওয়া এবং কাফির ও মুশরিকদের (ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের পরেও যদি কাফির থেকে যায়) হত্যা করা। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসনে আহলেবায়েতের শত্রুরা অপমানিত ও লজ্জিত হবে । ফাসাদকারী ও বিরোধীতাকারীরা উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহর সমস্ত শত্রুদের হত্যা করা হবে। সমস্ত পৃথিবীতে ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তার অনুসারীদের সুশাসন চলবে। এবং পৃথিবীর বুকে সঠিক দ্বীন প্রচারিত হবে। হে আল্লাহ্, ঐ দ্বীনের আবির্ভাবকে দ্রুত ত্বরান্বিত করুন। আমীন।
__________________________________________
ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা, ঈশ্বরকে জানার পথ এবং সৃজনশীল যুক্তি: একটি বিশদ পর্যালোচনা
ভূমিকা:
ঈশ্বর পরিচয় একটি মৌলিক বিষয়,যা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্ম, দর্শন এবং বিজ্ঞান আলোচনা করে আসছে। ঈশ্বরকে চেনা এবং তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানমূলক এবং আধ্যাত্মিক দায়িত্ব। এই প্রবন্ধে আমরা তিনটি প্রধান বিষয় বিশদভাবে আলোচনা করব।
1. ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা- কেন মানুষকে ঈশ্বরকে জানতে হবে?
2. ঈশ্বরকে জানার পথ – ঈশ্বরকে জানার বিভিন্ন উপায় কী?
3. সৃজনশীল যুক্তি – বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে শৃঙ্খলা ও নিয়ম রয়েছে, তা কীভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ?
1.ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা:
১.১. মানুষের প্রকৃতি ও ঈশ্বরের অনুসন্ধান: মানুষের প্রকৃতিতে সবসময়ই একজন উচ্চ সত্তার সন্ধান করার প্রবণতা রয়েছে। প্রতিটি যুগে মানুষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং তার অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করেছে এবং কিছু মৌলিক প্রশ্ন করেছে। যেমন-
ক।আমি কে?
খ।আমার সৃষ্টিকর্তা কে?
গ।আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?
এই প্রশ্নগুলি আমাদের ঈশ্বরের পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়। কুরআনও এই স্বাভাবিক অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে:
"অতএব তুমি একনিষ্ঠ ভাবে নিজেকে সত্য ধর্মের দিকে স্থাপন কর—এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা রূম ৩০)
১.২. নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রয়োজন:
যদি ঈশ্বরকে অস্বীকার করা হয়, তবে ন্যায়-অন্যায়ের কোনও চূড়ান্ত মানদণ্ড থাকে না। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস থাকার কারণেই নৈতিকতার ভিত্তি শক্তিশালী হয়। যদি কোনও সৃষ্টিকর্তা এবং পরকাল না থাকে, তবে একজন মানুষ কোনও অপরাধ করার পরেও কোনও উচ্চ আদালতের ভয় ছাড়াই জীবন যাপন করতে পারে।
১.৩. মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক চাহিদা:
ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস মানুষের মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। অনেক মানুষ যখন কঠিন সময়ের মধ্যে পড়ে, তখন প্রার্থনা এবং আল্লাহর স্মরণ তাদের প্রশান্তি দেয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"সাবধান! আল্লাহর স্মরণেই অন্তর শান্তি পায়।" (সূরা রাদ ২৮)
১.৪. বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রয়োজন:
বিজ্ঞান উন্নতির পরও অনেক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ:
ক।বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কীভাবে সৃষ্টি হল?
খ।জীবনের মূল উদ্দেশ্য কী?
গ।মানুষের চেতনা কীভাবে বিকশিত হল?
এই প্রশ্নগুলি আমাদের ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
# ঈশ্বরকে জানার পথ:
২.১. প্রকৃতির মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:
আল্লাহ বিশ্বকে এমন এক অনন্য শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন,যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে। যেমন:
ক।সূর্য ও চাঁদের নির্দিষ্ট কক্ষপথ,
খ।পৃথিবীর সঠিক গতি ও দূরত্ব,
গ।মানবদেহের জটিল গঠন,
ঘ।উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের বিস্ময়কর ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি।
এই সমস্ত কিছু একজন মহান স্রষ্টার অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। কুরআনে বলা হয়েছে:
"নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" (সূরা আলে ইমরান ১৯০)
২.২. ওহী ও নবীদের মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:
আল্লাহ মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবী ও ওহীর ব্যবস্থা করেছেন।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর যুগে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে একত্ববাদের প্রচার করেছিলেন।
হযরত মূসা (আ.) তূর পর্বতে আল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন।
হযরত ঈসা (আ.) অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে আল্লাহর শক্তিকে প্রকাশ করেছিলেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা শেষ ওহী এবং সর্বদা ঈশ্বরের পরিচয়ের মাধ্যম।
২.৩. যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:
দার্শনিক ও পণ্ডিতরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের জন্য বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। যেমন:
1. কসমোলজিক্যাল যুক্তি – প্রতিটি জিনিসের একটি কারণ থাকে, তাই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেরও একটি কারণ থাকতে হবে, এবং সেটি হল ঈশ্বর।
2. নৈতিক যুক্তি – যদি ঈশ্বর না থাকেন, তবে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
3. নিয়ম-শৃঙ্খলার যুক্তি – বিশ্বে যে শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা রয়েছে, তা একজন মহান স্রষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
২.৪. আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:
অনেক মানুষ প্রার্থনা, উপাসনা এবং সুফিবাদের মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য অনুভব করে। সুফি সাধক ও অলিয়াগণের জীবন এ বিষয়ে সর্বোত্তম উদাহরণ।
৩. সৃজনশীল যুক্তি:
সৃজনশীল যুক্তি এই ধারণার উপর ভিত্তি করে যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি উপাদান একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার সাথে তৈরি হয়েছে, যা একজন বুদ্ধিমান স্রষ্টার উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।
৩.১. বিশ্বে বিদ্যমান শৃঙ্খলা:
সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব: যদি পৃথিবী সূর্যের কাছাকাছি হতো, তবে তা পুড়ে যেত, আর দূরে হলে ঠাণ্ডা য় জমে যেত।
মাধ্যাকর্ষণ শক্তি: এটি যদি বেশি বা কম হতো, তবে জীবন অসম্ভব হয়ে পড়ত।
অক্সিজেনের পরিমাণ: বায়ুমণ্ডলে মোটামুটি ২১% অক্সিজেন রয়েছে, যা জীবনের জন্য নিখুঁত।
৩.২. জীববৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা:
ডিএনএ কোড: মানুষের ডিএনএ একটি অত্যন্ত জটিল তথ্যভাণ্ডার, যা একটি মহান স্রষ্টার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
চোখের গঠন: মানব চোখ এতটাই জটিল যে আধুনিক বিজ্ঞান আজও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
৩.৩. মানব মস্তিষ্ক ও চেতনা:
মানব মস্তিষ্ক বিশ্বের সবচেয়ে জটিল কম্পিউটার। যদি সাধারণ একটি যন্ত্র নিজে নিজে তৈরি হতে না পারে, তাহলে এত জটিল মস্তিষ্ক কীভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হলো?
উপসংহার
ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বীকৃতি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, যা জীবন সম্পর্কে গভীর প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে। বিশ্বে বিদ্যমান শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য আমাদের সৃষ্টিকর্তার পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়।আল্লাহ বলেন:
"তারা কি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর শাসন সম্পর্কে চিন্তা করে না?" (সূরা আল-আ’রাফ ১৮৫)
এই আলোচনা ঈশ্বরকে জানার গুরুত্ব, তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাসের কারণ তুলে ধরে।
__________________________________________
মাহে রমজান ও রোজার মাহাত্ম্য
✍️ মইনুল হোসেন
পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াত থেকে ইসলামে রোজার গুরুত্ব অনুমান করা যায়। উদাহরণস্বরূপ “ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই এটা বিনয়ীদের ব্যতীত অন্যদের জন্য কঠিন” (সূরা বাকারাহ, আয়াত ৪৫)। বিভিন্ন তাফসীরে ‘ধৈর্য’-কে রোজা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কারণ রোজার মধ্য দিয়ে দিনের কিছু অংশে খাওয়া-দাওয়া ও অন্য কিছু কাজ ত্যাগ করা ধৈর্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপ। মুসলমানদেরকে কঠিন সমস্যা ও বিপদের সম্মুখীন হলে রোজার আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। যদিও রোজা রমজান মাসের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত, তবুও এটি এমনই একটি ফযিলতপূর্ণ ইবাদত যা রমজানের বাইরেও পালন করা যেতে পারে - বিশেষ করে রজব ও শাবান মাসের মতো নির্দিষ্ট মাসে এবং সোম ও বৃহস্পতিবারের মতো নির্দিষ্ট দিনে রোজা রাখতে বিশেষ তাগিদ করা হয়েছে।
আল্লাহর নবী (সাঃ) এর বর্ণনা অনুযায়ী রমজান মাসঃ
শাবান মাসের শেষ শুক্রবারে মহান নবী (সাঃ) এর দেওয়া একটি বিখ্যাত খুতবায় (খুতবা-এ-শাবানীয়াহতে) তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, “হে লোকেরা! আল্লাহর মাস তোমাদের দিকে আসছে বরকত, রহমত এবং মাগফেরাত নিয়ে।” এখানে লক্ষণীয় যে, এই তিনটি ঐশী উপহার (অর্থাৎ রহমত, বরকত ও মাগফেরাত) এই মাসের শেষে দেওয়া হবে তা নয় বরং এগুলো রমজান মাসের শুরু থেকেই প্রাপ্ত হয়।
নবীকরীম (সাঃ) আরও বলেছেন, “এটি এমন একটি মাস যাতে তোমাদেরকে আল্লাহর মেহমানদারীতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।” অর্থাৎ গোটা মানবজাতিকে ‘আমন্ত্রণ’ জানানো হয়েছে। অতএব আল্লাহর এই মেহমানদারীতে প্রবেশ করার জন্য মানুষকে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। উল্লেখ থাকে যে, মহান আল্লাহর এই বিশেষ মেহমান (অতিথি) হওয়ার মর্যাদা পাওয়ার জন্য রোজা একটি শর্ত।
ঐশী মেহমান সম্পর্কে কিছু কথাঃ
১. যখন কাওকে নিমন্ত্রণ জানানো হয় তখন তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয় না। সুতরাং নিমন্ত্রণকর্তা তার অতিথিদের স্বাগত জানাবেন, অন্যথায় নিমন্ত্রণ অর্থহীন দাঁড়ায়। সেই অনুযায়ী যখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রমজানের মেহমানদারীতে আমন্ত্রণ জানান, তখন যারা আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তাদের জন্য তাঁর রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়।
২. যখন কেউ নিমন্ত্রণ স্থলে প্রবেশ করে, তখন তার সঙ্গে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করা হয়। যদিও নিমন্ত্রিত অতিথিদের প্রত্যেকেই সম্মানিত হওয়ার যোগ্য নয়, তবুও অতিথি হওয়ার সুবাদে তাদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা হয়। উপরের খুতবায় উল্লেখিত নিম্নলিখিত বাক্যটি অনুধাবনের দাবী রাখে - “এই মাসে তোমাদেরকে সেই লোকদের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে যাদেরকে আল্লাহ সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন”।
৩. যখন কেউ কোনও নিমন্ত্রণ বাড়িতে যায়, তখন তাকে বিনামূল্যে কিছু দেওয়া হয় বা দেখানো হয়। অন্য কথায়, নিমন্ত্রিত অতিথি কোনো প্রতিদান ছাড়াই কিছু পাওয়ার আশা করে। একইভাবে রমজানের ঐশী মেহমানদারীতে আল্লাহতা’লা কেবল আমাদের কাজগুলো উদারভাবে পুরস্কৃত করেন তা নয়, বরং তাঁর অতিথিদের বিভিন্ন অনুগ্রহ দিয়ে আপ্যায়ণ করেন। এমনকি তারা বড়ধরনের তেমন কিছু না করলেও মহান আল্লাহ তাঁর অতিথিদেরকে বিশেষ বিশেষ মর্যাদা ও অনুগ্রহ দান করেন। যেমনটি একই খুতবায় আরও উল্লেখ হয়েছে - “এতে (এই রমজান মাসে) তোমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস আল্লাহর তাসবীহ এবং এতে (এই রমজান মাসে) তোমাদের ঘুম আল্লাহর ইবাদত।”
খুতবাটির অন্য জায়গাতে মহান নবী (সাঃ) আরও বলেছেন, “মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে এই মাসটি শ্রেষ্ঠ মাস, এর দিনগুলো শ্রেষ্ঠ দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘন্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘন্টা।” অর্থাৎ অন্য মাসের তুলনায় এই মাসের প্রতিটি অংশ অন্য প্রতিটি মাসের অংশের চেয়ে উত্তম।
রমজান মাসের জন্য সুপারিশঃ
উক্ত খুতবাটির অন্য একটি অংশে বলা হয়েছে, “হে মানব সম্প্রদায়! এই মাসে জান্নাতের দরজা খোলা থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি সেগুলো তোমাদের জন্য বন্ধ না করেন।"
‘জান্নাতের দরজা খোলা’ - এই বাক্যাংশের অর্থ নিমরূপ হতে পারে -
১. অন্যান্য মাসের তুলনায় এই বরকতময় মাসে জান্নাতে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জনের সম্ভাবনা বেশি।
২. জান্নাতের দরজা খোলা থাকার কারণে, জান্নাতের সমস্ত ধরণের ঐশী রহমত এই জগতে বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। জান্নাতের বাতাস এই জগতে প্রবাহিত হয়। এগুলো রমজান মাসে রোজাদারদের শ্বাস-প্রশ্বাস ও ঘুমকে জান্নাতবাসীদের মতো আল্লাহর তাসবীহ ও ইবাদতে পরিণত করে।
রমজান মাসে শয়তানের অবস্থাঃ
“এবং শয়তান শিকলবদ্ধ। সুতরাং তোমাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি তাদের তোমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না দেন।” যদিও শয়তান এবং তার সহযোগীরা এই মাসে শিকলবদ্ধ থাকে, তবে গুনাহ করার ফলে তারা মুক্তি পায়। অতএব রমজান মাস শ্রেষ্ঠ মাস হলেও একদল লোকের জন্য এই মাসটি অন্যান্য মাসের চাইতে খারাপ। ঠিক যেমনভাবে পবিত্র কুরআন “বিশ্বাসীদের জন্য নিরাময় ও রহমত; এবং এটি কেবল অত্যাচারীদের ক্ষতি বৃদ্ধি করে” (১৭:৮২)।
কেয়ামত দিবস সম্পর্কে সতর্কীকরণঃ
উক্ত খুতবায় পবিত্র নবী (সাঃ) আরও বলেছেন, “এই মাসে তোমাদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে কেয়ামতের দিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ করো।” এই পৃথিবীতেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা খুব কঠিন। তাহলে আমাদের অবশ্যই এই সত্যটি নিয়ে চিন্তা করতে হবে যে পরকালের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বছরের পর বছর বা কিছু সম্প্রদায়ের জন্য চিরকাল স্থায়ী হবে। উপরন্তু এই জগতে অসহনীয় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সমাধান হিসেবে মৃত্যুকে গণ্য করা যেতে পারে। কিন্তু পরবর্তী জগতে অনন্ত জীবন। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তারা চিৎকার করে বলবে, ‘হে মালিক! [জাহান্নামের রক্ষকের নাম] আপনার রব যেন আমাদের শেষ করে দেন!’ তিনি বলবেন, ‘নিশ্চয়ই তোমরা এখানেই থাকবে” (৪৩:৭৭)।
পবিত্র কুরআন অনুসারে, পরকালে অত্যাচারীদের জন্য কোনো মৃত্যু নেই এবং এমনকি যখন তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, তখন একটি নতুন চামড়া প্রতিস্থাপন করা হবে যাতে পরকালের শাস্তি সর্বদা নতুন করে অনুভূত হয়। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই যারা আমার নিদর্শন ও অলৌকিকতায় অবিশ্বাস করেছে, আমি তাদের আগুনে নিক্ষেপ করব। যখনই তাদের চামড়া সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যাবে, আমরা তাদের জন্য অন্য চামড়া পরিবর্তন করব যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৪:৫৬)।
পরকালের কথা স্মরণ করানোর পাশাপাশি রমজান মাসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যারা না খেয়ে থাকার অনুভূতি অনুভব করে। যারা রোজা রাখে তারা তাদের সম্পত্তির কিছু অংশ আল্লাহর পথে এবং অভাবী মানুষদের জন্য ব্যয় করতে উৎসাহিত হয়।
রোজাদারদের সম্পর্কে দুটি হাদিসঃ
(১) প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কিছু ফেরেশতাকে শুধুমাত্র রোজাদারদের জন্য দোয়া করতে নিযুক্ত করেছেন। জিব্রাইল আমাকে জানিয়েছেন যে আল্লাহ বলেছেন: ‘আমি আমার ফেরেশতাদের আমার সৃষ্টির কারো জন্য দোয়া করার আদেশ দিইনি, যতক্ষণ না আমি তাদের জন্য সেই দোয়া কবুল করি।”
(২) ষষ্ঠ ইমাম, ইমাম সাদিক (আঃ) বলেছেন, “যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গরমের দিনে রোজা রাখে এবং তৃষ্ণার্ত হয়, তখন আল্লাহ এক হাজার ফেরেশতা পাঠান তার মুখ স্পর্শ করতে এবং ইফতারের সময় পর্যন্ত তাকে সুসংবাদ দিতে, তখন আল্লাহ তাকে বলেন: ‘তোমার গন্ধ কত সুন্দর! তোমার আত্মা কত আনন্দদায়ক! হে আমার ফেরেশতারা! সাক্ষ্য দাও যে আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি”।
__________________________________________
মোমিন ব্যক্তিদের রোজা
বাতাসে রমজানের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, জানান দিয়ে যাচ্ছে পবিত্রতার বার্তা। আরবি মাসসমূহের নবম মাস পবিত্র রমজান মাস। আরবি অন্যান্য মাসের মতো রমজানও একটি মাস, তবে অন্যান্য মাসের চেয়ে ফজিলতপূর্ণ হওয়ায় এর মূল্য ও মর্যাদা অনেক বেশি। কারণ রমজান কোরআন অবতরণের মাস, রহমত বর্ষণের মাস।
রোজা হল ইসলামের ফুরুয়েদিন এর দ্বিতীয় স্তম্ভ। 'রোজা' শব্দটি ফারসি। এর আরবি পরিভাষা হচ্ছে সাওম, বহুবচনে বলা হয় সিয়াম। সাওম অর্থ বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা। সাওম এর সংজ্ঞা দিতে গেলে বলা যায় যে, আল্লাহর সন্তুটির কামনায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহ পানাহার থেকে বিরত থাকা।
তবে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকলেই রোজার হক আদায় হয়ে যাবে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখেও অশ্লীল কাজ ও পাপাচার ত্যাগ করতে পারল না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো মূল্য নেই।’ সুতরাং পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং অন্যান্য আমল ও ইবাদতে নিজেকে মশগুল রাখতে হবে, তবেই রোজার পূর্ণ হক আদায় হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীরুতা) অবলম্বন করতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত, ১৮৩)
যেহেতু রোজা আল্লাহর বিধান এবং আমাদের জন্য তা ওয়াজিব করা হয়েছে, তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রোজা পালন ও রোজার অন্যান্য হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।
রোজা রাখার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ করে। কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। মানুষ এ মাসে আল্লাহর ভয়ে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে দূরে থাকে। যেন সে ঘোষণা করে, ‘আমরা শুনেছি এবং পালন করেছি! হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাই আর প্রত্যাবর্তন তোমারই কাছে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৫)
রোজা রাখলে মানুষের ভেতর ধৈর্য ও দৃঢ়তা তৈরি হয়, যা মনুষ্যত্ব বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোজাদারের সামনে বাহারি রকম সুস্বাদু ও উপাদেয় খাবার উপস্থিত থাকার পরও সে সেদিকে চোখ তুলে তাকায় না। সে তা করে না কেবল আল্লাহর ভয়ে। রোজা মানুষের প্রত্যয়, দৃঢ়তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দেয় বলেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা পালন করে। রোজা তার প্রবৃত্তিকে দমন করে।
রোজায় করণীয় ও বর্জনীয় :
রোজা রাখার মাধ্যমে যেহেতু তাকওয়া অর্জন হয়, তাই রমজান মাসে প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, তাকওয়া অর্জনের জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। রমজান মাসে একটি নেক আমলের সওয়াব ৭০ গুণ। তাই এই মাসে আমরা মুখরোচক ইফতার সামগ্রী আর সেহরি নিয়ে ব্যস্ত না থেকে যথাসম্ভব ইবাদত ও আমলে মশগুল থাকব। বেশি বেশি দান-সদকা করব।
বছরের অন্যান্য সময় ঘুমের কারণে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে আমাদের অনেকরই কষ্ট হয়ে যায়, রমজান আমাদের জন্য তাহাজ্জুদ আদায়ের সুবর্ণ সুযোগ। তাই সেহরির কিছু সময় আগে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করে; আল্লাহ তায়ালার দরবারে হাত তুলে নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতেও যেন শয়তানের ধোকা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর পথে চলতে পারি, সেজন্য দোয়া করা উচিত।
রমজানে আমাদের বেশি বেশি ইস্তেগফার পড়া উচিত। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করো। এতে আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপরাশিকে মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে। (সূরা তাহরিম, আয়াত, ৮)
রমজান কোরআন নাজিলের মাস, তাই এই মাসে আমাদের বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা এবং অর্থ বুঝে তেলাওয়াত করা উচিত।এতে করে আমরা কোরআনে আল্লাহ তায়ালা কী বলেছেন, তা সহজেই বুঝতে পারব এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারব।
আমাদের স্মরণে রাখতে হবে যে, শুধু বাহ্যিক অবয়ব ও দৈহিক কাঠামোর নাম মানুষ নয়, বরং মনুষ্যত্ব লাভের জন্য আরো কিছুর প্রয়োজন। যার ভিত্তিতে তারা সৃষ্টিজগতে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। আর তা হলো আত্মা। আত্মাই মূলত মানুষের ভেতর বুদ্ধি, বিবেক ও চিন্তা-ভাবনার শক্তি সৃষ্টি করে। রুহ বা আত্মার অনন্য বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই সে সৃষ্টিজগতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে এবং ফেরেশতাদের সিজদা লাভের উপযুক্ত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তাতে আমার রুহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৭২)
আর মানুষের আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায় প্রবৃত্তি দমনের মাধ্যমে। প্রবৃত্তি পূরণের প্রধান দুটি মাধ্যম হলো পেট ও লজ্জাস্থান। মানুষ যখন পেট ও লজ্জাস্থানের ব্যাপারে সংযত হতে শেখে, তখন তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।এভাবেই যদি আমরা আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ দিয়েই রোজা রাখি অর্থাৎ চোখ দিয়ে হারাম কিছু না দেখে, কান দিয়ে হারাম কিছু না শুনে, নাক দিয়ে হারাম কিছুর সুগন্ধ না নিয়ে, জিহ্বা বা মুখ দিয়ে কাওকে কটু কথা না বলে, হাত-পা দিয়ে কোনো ব্যক্তির ক্ষতি না করে সারা দিন কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চিন্তায় মত্ত থেকে দুনিয়াবী কাজ করে যেতে পারি, তবেই সম্মানের সঙ্গে আমাদের হাসর ও নাসর হবে
ইনশা আল্লাহ্! আল্লাহ আমাদের সকলকেই প্রকৃত মোমিন ব্যক্তিদের ন্যায় সিয়াম সাধনের তৌফিক দান করুন। আমিন...সুম্মা আমিন।
_________________________________________
ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত:মানব মুক্তির চাবিকাঠি
✍️ রাজা আলী
ইমাম মাহদী আঃ এর অস্তিত্ব এবং আর্বিভাব দ্বীন ইসলামের একটি মূলগত ভিত্তি।শীয়া মাযহাবের গবেষণা ও বিশ্বাস হলো ইমাম মাহদী আঃ ইতিপূর্বে জন্ম নিয়েছেন এবং অন্তর্ধানে আছেন।সময় হলেই আত্মপ্রকাশ করবেন। তাঁর এই অন্তর্ধানের সময় ও সীমার মধ্যে আমাদের প্রধান কর্তব্য তাঁর পরিচিতি বা মারেফাত অর্জন করার প্রচেষ্টা চালানো।এ বিষয়ে আল্লাহর নবীর বিখ্যাত হাদীস হলো--"যে ব্যক্তি তার নিজের যুগের ইমাম কে না চিনে মারা যায়,তার মৃত্যু জাহেলিয়াতের মতোই"।এই হাদীস থেকেই যুগের ইমাম আঃ কে চেনার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন প্রত্যেক যুগের জন্য একজন প্রতিনিধি বা ইমাম রেখেছেন। এ যুগেও যে ইমাম রয়েছেন, সে বিষয়ে আমরা অবগত। তবে ইমাম আঃ কে চেনা বা তার মারেফাত অর্জনের বিষয়টি এখনো অনেক শিয়া এসনা আসারি সম্পূর্ণ উপলব্ধি ও অনুধাবন করতে পারি নি। ইমাম আঃ মারেফাত বা পরিচিতি অর্জন ই যে মানব মুক্তির একমাত্র উপায় সে বিষয়ে বক্ষমান নিবন্ধে আলোচনা করবো।
মারেফাত একটি আরবি শব্দ। শব্দটি র অর্থ হলো জ্ঞান, চেতনা বা অন্তর্দৃষ্টি। শব্দটি মূলত গভীর আত্মজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত বলতে ইমাম আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন বা চেতনা বৃদ্ধি কে বোঝানো হয়েছে।যদি ইমাম আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন সম্ভব না হয় বা তাঁর সম্পর্কে ধারণা ও উপলব্ধি তৈরি না হয়,তবে পার্থিব ও পরলোকগত সফলতা অসম্ভব।
বর্তমান শীয়া সমাজের অনেক মানুষ এটাই মনে করে যে, ইমাম মাহদী আঃ হলেন ইমামতের শেষ কড়ি এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ই যথেষ্ট কিংবা ইমাম আঃ নাম-পরিচয় জেনে রাখাই আমাদের কর্তব্য।অর্থাৎ ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি মারেফাত অর্জন কে তাত্ত্বিক দিক নির্দেশনা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র পরিসরে অনেকেই বেঁধে ফেলেছে।এই সংকীর্ণ চিন্তা থেকে আমাদের বার হতে হবে এবং কোরান ও হাদিসের দৃষ্টিতে ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের যে তাগিদ রয়েছে,তা আমাদের অনুধাবন করে তাঁর প্রতি কর্তব্য পালনে অগ্রসর হতে হবে।কেননা ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও উপলব্ধি ছাড়া তাঁর আসহাব কিংবা শাফায়াত লাভ আমাদের নসিবে হবে না।
ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে সম্যক ও গভীর জ্ঞান আমাদের চিন্তা -চেতনা এবং কাজ-কর্মকে প্রভাবিত করে। আমাদের নৈতিক কর্তব্য ও মানবতাকে উদ্বোধিত করে সৎ কর্ম শীল মুমিন ব্যক্তি তে পরিণত করে। সুতরাং ইমাম আঃ এর সম্যক পরিচিতি বা মারেফাত আমাদের একাধিক কল্যাণে র কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন--
১. ইমাম আঃ মারেফাত অর্জনের ফলে ইমামতের শেষ প্রতিনিধি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি হয়।ফলে ইমাম আঃ এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মহব্বত তৈরি হয়।
২. ইমাম আঃ এর মারেফাত আমাদের সাহস ও শক্তি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিক কর্তব্য সম্পাদনে সাহায্য করে।
৩. ইমাম আঃ মারেফাত আমাদের ইমাম আঃ এর প্রকৃত অপেক্ষা কারী হিসাবে বাঁচতে শেখায়।
৪. ইমাম আঃ এর আবির্ভাবের সূত্র ধরে কেউ কেউ মিথ্যা মাহদী দাবি করে। সেই "মিথ্যা মাহদী" দের চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং বিভ্রান্তি এড়ানো যায়।
৫. ইমাম আঃ এর প্রতি উচ্চ মারেফাত তাঁর আসহাব ও আনসার হওয়ার পথকে সুগম করবে।
বর্তমান আলোচনা র সাপেক্ষে এটা বলা যায় যে, ইমাম আঃ এর প্রতি গভীর জ্ঞান ও মারেফাত কিন্তু আবশ্যিক। নতুবা ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৃত দ্বীনদার হওয়া সম্ভব নয় কিংবা মানব মুক্তি ত্বরান্বিত হবে না।তাই ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি মারেফাত অর্জনের জন্য এখন থেকেই আমাদের সচেতন হতে হবে।
__________________________________________------------------------------------------------
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
কবিতাঃ আল-কুদস
✍️ মইনুল হোসেন
আল-কুদস আমার হৃদয়ে
আল-কুদস আমার অন্তরে
চিরকাল থাকবে, অনন্তকাল থাকবে।
এটি শান্তির সুন্দর শহর
এটি ঈমানের উজ্জ্বল নিদর্শন
কখনো ভুলব না, আমি তা ভুলব না।
আমি শোকাহত, অশ্রুশিক্ত আমার নয়ন
আমার সুন্দর শহরটি বন্দী, ধ্বংস হয়েছে সবই।
কেউ খোঁজ নেয়নি, তার কোনও খোঁজ নেয়নি।
জায়নবাদের গোলাম হওয়ার দৌড়ে
আরব মুসলিম শাসক সব বিধর্মী পথে
আল-কুদস একা পড়ে, আজও সে একা পড়ে।
কেউ হয়তো ভুলে যেতে পারে,
কিন্তু আমি ভুলব না, কারণ
এটি আমার অন্তরে, সর্বদা আমার অন্তরে।
লাখো মজলুমের আকুতি আর
সহস্র শহীদের রক্তের দাগ
বৃথা সে যাবে না, হতে তা দেবো না।
জালেমদের আজকের এই উৎপীড়ন
বন্ধ হবে, এইসব মৃত্যু মিছিল সেটাও থামবে
এলাহী ওয়াদা পূরণ হবে, মজলুমরা ক্ষমতা পাবে।
একটি নতুন দিনে একটি নতুন ভোর আসবে
আল-কুদস স্বাধীন হবে, সকলে আবার ঘরে ফিরবে
সেই দিনের অপেক্ষাতে, আমি তারই আশাতে।
__________________________________________
কবিতা: তাক্বওয়াপূর্ণ জীবন
রমজান থেকেই আত্মার সাথে
আত্মার হোক মিলন,
ধনী-দরিদ্র সবার যেন
সমান হয় জীবন-যাপন।
তসবী পড়ব দিবা-রাতি
করবো খোদার ইবাদত,
সিয়াম সাধনায় লাভ করবো
চিরসুখের আড়ৎ।
ভোরের আগেই করবো সাহরী আর
রাতে ইফতারের আঞ্জাম,
উপস থাকব সারাটা দিন আর
গাইবো খোদার গুণগান।
বন্ধু-শত্রু কারোর কোনো
করবোনা গো ক্ষতি,
দোয়া করবো প্রভূর নিকট
হয় যেন নেক-প্রাপ্তি।
মাহে রমজানেই করবো গঠন
তাক্বওয়া পূর্ণ জীবন,
যে যেমন পারি পাক-সাফ করবো
নিজ দেহ ও মন।
_____________________________________
আত্মনাদ
১. তোমরা চলে গেলে
আমাদের একা ফেলে,
অন্তর করে হাহা-কার
শোনা যায়
মজলুমদের চিৎকার ।
২. দুর্বোধ্য আঁধারে
মাহদীর আলো জলে ,
শোনা যায় এক ধ্বনি
মাহদী আদরিকনী।
৩. হিংসার বেড়াজালে
আরবেরা জায়েনবাদের কোলে
নিরুপায় গাজাবাসি
আশ্রয়ের অভিলাষী।
৪. হাসান ইব্রাহিম, সোলেমানী
ছিল তারা মেহদী আর্মি
তাদের শহীদে
মজলুমেরা বিপাকে।
৫. প্রত্যাশার নির্যাস
খুঁজে পায় আশ্বাস ,
ইরানের দিকে চেয়ে
মুক্তি হবে অবশেষে।
_________________________________________
ইমাম আসবে তাই
✍️ রাজা আলী
সময়ের কড়িকাঠে
ধরেছে ঘুণ
চারিদিকে আগুন
নেভাবে কে?
সমাজের মেরুদন্ড
ভেঙেছে আজ
চলছে অন্যায় রাজ
শেষ করবে কে?
মজলুমের সমস্যা
একা সে
অত্যাচারী দলে ভারী রে
এর শেষ কবে?
ইমাম আসবে তাই
এত কিছু
অত্যাচারী হবে শিশু
সময়ের সাথে সাথে।
No comments:
Post a Comment