Monday, June 22, 2026

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ মহররম সংখ্যা



আরবি: মহররম, ১৪৪৮ হিজরী
ইংরেজি: জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


সম্পাদকীয়

রেওয়ায়েতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) (অনুবাদ)


কারবালার চিরন্তন চেতনা

আয়াতুল্লাহ খামনায়ীর ১০ টি কথা

আজাদারী ও ইমামে জামানা (আ.)

আযাদারী বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হাদীস (সংগৃহীত)
          ✍️ রাজা আলী 

 

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

       আয়াতুল্লাহর বিদায়

         বীর খামনেয়ী
                ✍️ মইনুল হোসেন

         খামিনি
                ✍️ রাজা আলী 

         রক্তাশ্রুর আজাদার


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। কারবালার শোক মানে শুধু অতীতকে স্মরণ নয়—এ এক জাগরণ, এক আত্মগত শিক্ষা। আজাদারি কেবল কান্না নয়, বরং তা হুসাইন (আ.)-এর পথে নিজেকে গড়ে তোলার শুদ্ধতম উপায়।

এই সংখ্যায় আমরা আলোকপাত করেছি আজাদারির সৌন্দর্য, আদব ও মূল উদ্দেশ্যের উপর। আলোচনা করেছি—কীভাবে আজাদারি হতে পারে হুসাইনির অনুসরণ, আর কীভাবে আমাদের শোক সুর মিলাতে পারে ইমামে জামানার (আ.ফা.) শোকের সাথে। কারবালা আমাদের শিখিয়েছে পর্দা, দিয়েছে যুব সমাজকে আদর্শের শিক্ষা, আর আমাদের রেখে গেছে এক চিরন্তন প্রশ্নের সামনে—তুমি হুসাইনের পক্ষে, না বিপক্ষে? আসুন, এ মহররমে আমরা শোককে করি আত্মশুদ্ধির সোপান, এবং প্রতিজ্ঞা করি—ইমাম মাহ্দি (আ.ফা.)-এর প্রতীক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত করব, এক হুসাইনি আজাদার হয়ে।

                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖



রেওয়ায়েতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) (অনুবাদ)

রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ  “ আমি তোমাদেরকে মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের সুখবর দিচ্ছি-যাকে আমার উম্মতদের মাঝে পাঠান হবে। তাঁকে এমন সময়ে পাঠান হবে, যে সময়ে মানুষ পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী হবে এবং দোলাচলতার মাঝে বিভ্রান্ত হবে”।

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর গুণাবলী ও আবির্ভাবের বিষয়ে রাসুল (সাঃ) ও মাছুমীনগণ (আঃ) -দের থেকে এত পরিমাণে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, আমীরুল মোমেনীন (আঃ) ব্যতীত অপর কোনো মাসুমের সম্পর্কে এত পরিমাণে হাদীস বর্ণিত হয়নি। উল্লেখ্য, এই হাদীসগুলি সবই এসেছে বিশ্বস্ত রেওয়ায়েত সূত্রে। আশ্চর্যের বিষয় হল যে, ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেই কিছু সাহাবীগণ তাঁকে ভিত্তি করে পুস্তক লেখেন। শীয়াদের পুস্তকগুলির সঙ্গে সঙ্গে সুন্নিদের পুস্তকের মধ্যেও ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে রেওয়ায়েত সমূহ ধারাবাহিক ভাবে আজও বিদ্যমান। আে সুন্নতের বহু পুরাতন পুস্তক 'মাসনাদে আহ্বমাদ বিন হাম্বালের' (হিজ্বরী ২৪১) মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সম্পর্কে আনুমানিক ১০০ টির মতো হাদীস আছে। আর পরবর্তী লেখকগণ তাঁদের পুস্তকের (যেমন, সুনানে ইবনে দাউদ (২৭৫ হিজ্বরী), ইবনে মাজাহ্ (২৯৩ হিজ্বরী), তিরমিযী (২৯৭হিজ্বরী)} মধ্যে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর বিষয়ে একটি করে অধ্যায় স্থান দিয়েছেন। এছাড়াও আজ পর্যন্ত আহলে সুন্নতের লেখকদের ১৫০ টি এমন পুস্তক আছে-যা সম্পূর্ণ ইমাম মাহ্দী (আঃ)-কে বিষয় করে লেখা। আর হাজার হাজার এমন পুস্তক পাওয়া যায়, যার মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে পৃথক অধ্যায় স্থান পেয়েছে। শীয়াদের পুস্তকগুলির মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে এমন কিছু রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে, যে গুলির মধ্যে রাসুলে খোদা (সাঃ) এবং ইমামগণ (আঃ) ব্যতীত অন্যান্য সূত্র থেকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তাঁর আবির্ভাবেরে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। 'মুন্তাখাবুল আছার' নামক পুস্তকে আনুমানিক এমন-ই ১৩০০ রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। আর ইমাম মাহ্দী (আঃ)-কে বিষয় করে লেখা শীয়া আলীমদের পুস্তকের সংখ্যা বর্তমানে চার শতাধিক।

শীয়া ও সুন্নি উভয় মাযহাবের কাছে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে অত্যাধিক পরিমাণে হাদীস থাকার কারণে ইমামত বিষয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আবির্ভাব বিষয়ে উভয় মাযহাব সহমত পোষণ করে। আহলে সুন্নত ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে পয়গম্বার (সাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করেছেনঃ

      “ যে মাহ্দীকে অস্বীকার করবে, সে কাফির” (অনুবাদ)। আহলে সুন্নতের মধ্যে এই হাদীসটিও বর্ণিত আছে যে, পয়গম্বার (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ

    “ যদি পৃথিবীর বয়স একদিন থেকে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ ঐ দিনকে খুবই দীর্ঘায়িত করবেন, এবং একজন ব্যক্তিকে (যে আমার সন্তানদের মধ্যে থেকে হবে এবং যার নাম আমার নামের মতো হবে) পাঠাবে। সে জমীনকে ন্যায় বিচার ও ইনসাফ দ্বারা এমন ভাবে পরিপূর্ণ করবে, যেমন ভাবে জমীন জুলুম ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ ছিল”(অনুবাদ)।

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর প্রতি মুসলমানদের প্রকৃত বিশ্বাস আছে । তবে ইতিহাস খুললে দেখা যায়, এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কিছু মুসলমানরা নিজেদের অথবা নিজেদের নেতাদেরকে মাহ্দী বলে মিথ্যা দাবী করেছে। এর ফলে কিছু সংখ্যক মুসলমান পথভ্রষ্ট হয়েছে। এখানে কয়েকজন মিথ্যা 'মাহ্দী' দাবী কারীর নাম উল্লেখ করা হল,-

(ক) মাহ্দী সুডানী (১৩০৫ হিজ্বরী): ইনি আহলে সুন্নতের মধ্য থেকে 'মাহ্দী' বলে দাবি করেন। তিনি আফ্রিকার অধিবাসী ছিলেন।

(খ) মোহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ্ ক্বাহুত্বানী (১৪০০ হিজ্বরী): ইনি ওয়াহাবী মাযহাবের লোক এবং হেযাযের বাসিন্দা।

(গ) মির্জা আলী মোহাম্মাদ শীরাযী (১২৬৬ হিজ্বরী): ইনি ইরানের বাসিন্দা এবং শীয়া মাযহাব অবলম্বী।

বর্তমান অধ্যায়ের পরিসমাপ্তিতে আল্লাহ্র দরবারে দোয়া করি যে, তিনি যেন অতি দ্রুত মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে পৃথিবীকে ন্যায় বিচার ও ইনসাফ দ্বারা পরিপূর্ণ করেন।

_________________________________________


                        
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,              حُسَيْنٌ مِنِّي وَأَنَا مِنْ حُسَيْنٍ أَحَبَّ اللهُ مَنْ أَحَبَّ حُسَيْنًا -হুসাইন আমার থেকে এবং আমি হুসাইন থেকে। যে হুসাইনকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। (সুনান আত-তিরমিযী, ৩৭৭৫)
প্রশ্ন আসতে পারে যে, ইয়াযীদ যেহেতু ক্ষমতায় বসেই গেছেন, তারপর হুসাইন (আ.) এর বাইআত নেয়ার জন্য এত জোরাজুরি কেন করেছিলেন? এমন তো নয় যে, হুসাইন (আ.) বাইআত না দিলে ইয়াযীদ ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। জবাব হলো, অন্য সবার বাইআত আর হুসাইন (আ.) এর বাইআত এক বিষয় নয়। হুসাইন (আ.) যদি ইয়াযীদের হাতে বাইআত দিয়ে দিতেন, তাহলে মনে হতো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবার ইয়াযীদকে স্বীকার করে নিয়েছেন। অনেকে বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) প্রমুখ সাহাবীরা যখন ইয়াযীদের হাতে বাইআত দিয়েছিলেন, তখন হুসাইন (আ.) কেন দেননি? জবাব হচ্ছে, ওই সকল সাহাবীরা তখন রাজনৈতিক হিকমাত দেখেছিলেন, আর হুসাইন (আ.) দেখেছিলেন খিলাফাতে রাশিদার সুন্নাত। হুসাইন (আ.) জানতেন যে, দ্বীন কেবল মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান, যাতে ইবাদত-বন্দেগী যেমন রয়েছে, অর্থব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনাও তেমন রয়েছে। যদি রাষ্ট্র পরিচালনার ভার একজন অযোগ্য ফাসিক ব্যক্তির হাতে চলে যায়, তাহলে দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা খন্ডিত হবে এবং উম্মতের বিনাশ চলে আসবে। তাই ইয়াযীদের শাসনকে মেনে না নিয়ে বরং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই তাঁর কাছে যথোপযুক্ত মনে হয়েছিল। এ প্রতিবাদ হুসাইন (আ.) নিজের জন্য করেননি, করেছিলেন উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য। আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإيمَانِ
-তোমাদের মধ্যে কেউ অন্যায় হতে দেখলে সে যেন হাত (শক্তি) দিয়ে সেটি রুখে দেয়। এতে সক্ষম না হলে জবান দিয়ে, এতেও সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে। আর অন্তর দিয়ে ঘৃণা করা দুর্বল ঈমানের লক্ষণ। (সহীহ মুসলিম, ৪৯)
ইরাকের কুফা শহরের অধিবাসীরা ইয়াযীদের হাতে বাইআত না দিয়ে হুসাইন (আ.) এর কাছে পত্র প্রেরণ করেছিল। আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কুফায় আগমন করার জন্য। অবস্থা বুঝতে পেরে ইয়াযীদ কুফার তৎকালীন গভর্নরকে অপসারণ করে  ইবন যিয়াদকে কুফার দায়িত্ব প্রদান করে। এই ইবন যিয়াদ ছিল কারবালা যুদ্ধের নীলনকশা প্রণয়নকারী। যেহেতু যুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়, তাই আমি পূর্বাপর ঘটনাবলি এখানে বিস্তারিত উল্লেখ করছি না।

হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের ভবিষ্যদ্বাণী
আবদুল্লাহ ইবন নুজায়-এর পিতা বর্ণনা করেছেন, একবার সফরকালে তাঁরা নিনওয়া নামক স্থান অতিক্রম করছিলেন। তখন আলী (আ.) চিৎকার দিয়ে বললেন, হে আবূ আবদিল্লাহ (হুসাইন) ফোরাতের তীরে ধৈর্য ধারণ করো। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? আলী (আ.) বললেন,
دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ وَعَيْنَاهُ تَفِيضَانِ قُلْتُ يَا نَبِيَّ الله أَغْضَبَكَ أَحَدٌ مَا شَأْنُ عَيْنَيْكَ تَفِيضَانِ قَالَ بَلْ قَامَ مِنْ عِنْدِي جِبْرِيلُ قَبْلُ فَحَدَّثَنِي أَنَّ الْحُسَيْنَ يُقْتَلُ بِشَطِّ الْفُرَاتِ قَالَ فَقَالَ هَلْ لَكَ إِلَى أَنْ أُشِمَّكَ مِنْ تُرْبَتِهِ قَالَ قُلْتُ نَعَمْ فَمَدَّ يَدَهُ فَقَبَضَ قَبْضَةً مِنْ تُرَابٍ فَأَعْطَانِيهَا فَلَمْ أَمْلِكْ عَيْنَيَّ أَنْ فَاضَتَا‏.
-আমি একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরে প্রবেশ করে দেখি তাঁর চোখ অশ্রু তে ভেজা। জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর নবী, কেউ কি আপনাকে অখুশি করেছে? আপনার চোখ ভেজা কেন? তিনি বললেন, কিছুক্ষণ আগে জিবরাঈল এসেছিলেন। বলে গেলেন, (আমার নাতি) হুসাইন ফোরাতের তীরে শহীদ হবেন। জিবরাঈল আমাকে বললেন, আপনি কি ওই মাটির ঘ্রাণ শুঁকতে চান? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি হাত বাড়িয়ে কিছু মাটি এনে আমার হাতে দিলেন। ফলে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। (আবূ ইয়ালা, ৩৬৩; তাবরানী, ২৮১১)

হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের সংবাদ
কুফাবাসীর আমন্ত্রণে মক্কা থেকে কুফায় যাওয়ার পথে ইয়াযীদের প্রেরিত সেনাবাহিনী হুসাইন (আ.) এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের পথ আটকে দেয়। তাঁকে ইয়াযীদের পক্ষে বাইআত দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু হুসাইন (আ.) এমনটি করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলাফলস্বরূপ ৬১ হিজরীর ১০ই মুহাররাম ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে আমর ইবন সাদ ও শিমর ইবন যুল জাওশানের নেতৃত্বাধীন ৮ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সাথে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন নবী-দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আ.) এবং আহলুল বাইতের আরও ১৮ জন সদস্যসহ মোট ৭২ জন পুরুষ (বিদায়াহ, ৮ম খন্ড)। অসুস্থ অবস্থায় তাবুতে অবস্থান করার কারণে আলী ইবন হুসাইন যাইনুল আবিদীন (আ.) এ শাহাদাত থেকে বেঁচে যান।
অনেকে বলে থাকেন, হুসাইন (আ.) এর শাহাদাত ইয়াযীদের হাত ছিল না। বরং ইবন যিয়াদ একাই এ বিষয়ে আদেশ দিয়েছিল। অথচ হুসাইন (আ) এর ওপর আক্রমণকারী বাহিনীটি মূলত রাজধানী দামেস্ক থেকে তুরস্কের দায়লাম অঞ্চলে যুদ্ধ করার জন্য যাচ্ছিল। ইয়াযীদের সরাসরি নির্দেশ ব্যতীত ইবন যিয়াদের পক্ষে এত বড় বাহিনীকে পথ পরিবর্তন করে অন্যত্র যুদ্ধে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানের আদেশে চলে, প্রাদেশিক গভর্নরের আদেশে নয়। অতএব কারবালার ঘটনায় ইয়াযীদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করা নেহায়েত মূর্খতা।
হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের সংবাদ মক্কায় আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) এবং মদীনায় উম্মে সালামাহ (রা.) এর কাছে পৌঁছে দেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইবন আব্বাস (রা.) বলেছেন,
رأيتُ النبيَّ صلَّى الله عليه وسلَّم في المنام بنِصْف النهار أشعثَ أغْبَرَ معه قارورةٌ فيها دمٌ يلتقطُه قال قلت يا رسول الله ما هذا قال دمُ الحسين وأصحابه لَم أزَلْ أتتبَّعُه منذُ اليومِ. قال عمَّار فحَفِظْنا ذلك اليوم فوجَدْناه قُتِلَ ذلك اليوم
-আমি এক দুপুরবেলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বপ্নে দেখলাম। তাঁর চুল অবিন্যস্ত, চেহারা ছিল ধুলোমাখা। হাতে এক শিশি রক্ত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার হাতে কী? তিনি জবাব দিলেন, হুসাইন ও তার সাথিদের রক্ত। আমি আজ সারাদিন এগুলো সংগ্রহ করছি। বর্ণনাকারী বলেছেন, আমরা ওই দিনটি মনে রেখেছি এবং জানতে পেরেছি যে, ওই দিনেই হুসাইনকে শহীদ করা হয়েছিল। (মুসনাদে আহমাদ, ২১৬৫)
উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামাহ (রা.) বলেছেন,
رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم تَعْنِي فِي الْمَنَامِ وَعَلَى رَأْسِهِ وَلِحْيَتِهِ التُّرَابُ فَقُلْتُ مَا لَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏شَهِدْتُ قَتْلَ الْحُسَيْنِ آنِفًا
-আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বপ্নে দেখলাম। তাঁর মাথা ও দাড়ি মুবারকে মাটি লেগে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার কী হয়েছে? তিনি বললেন, এইমাত্র দেখে আসলাম হুসাইনকে হত্যা করা হয়েছে। (সুনান আত-তিরমিযী, ৩৭৭১)

কারবালার ঘটনায় সাহাবা-তাবিঈদের প্রতিক্রিয়া
এক. শাহার ইবন হাউশাব বলেছেন, হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের কথা জানতে পেরে উম্মে সালামাহ (রা.) চিৎকার দিয়ে বলেন,                                                                                                                                                                            قَتَلُوهُ قَتَلَهُمُ اللهُ غَرُّوهُ وَذَلُّوهُ لَعَنَهُمُ اللهُ 
-ওরা তাঁকে হত্যা করেছে, আল্লাহ ওদেরকে ধ্বংস করুন। ওরা তাঁকে ধোকা দিয়েছে এবং অপদস্থ করেছে, ওদের প্রতি আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক। (মুসনাদে আহমাদ, ২৬৫৫০)
দুই. একবার ইরাকের কিছু লোক আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) এর কাছে মাছি মারা বিষয়ে প্রশ্ন করেছিল। তিনি জবাব দিলেন, 
                                                                                                                 أَهْلُ الْعِرَاقِ يَسْأَلُونَ عَنِ الذُّبَابِ وَقَدْ قَتَلُوا ابْنَ ابْنَةِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم
 -ইরাকবাসী মাছির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে। অথচ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৌহিত্রকে হত্যা করেছে। (সহীহ বুখারী, ৩৭৫৩)
তিন. ইমাম ইবরাহিম নাখয়ী (ইমাম আবূ হানীফার উস্তায) বলেছেন,
لَوْ كُنْتُ فِيمَنْ قَتَلَ الْحُسَيْنَ بْنَ عَلِيٍّ ثُمَّ غُفِرَ لِي ثُمَّ أُدْخِلْتُ الْجَنَّةَ اسْتَحْيَيْتُ أَنْ أَمُرَّ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَنْظُرَ فِي وَجْهِي
-যদি আমি হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতে জড়িত থাকতাম, এরপর ক্ষমা পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতাম, তবুও আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুখ দেখাতে লজ্জাবোধ করতাম। (তাবরানী, ২৮২৯) 
শেষকথা
কোনো ব্যক্তিবিশেষের প্রতি সমালোচনার তীর ধার্য করা উদ্দেশ্য ছিল না। ইতিহাসের গভীর গিরিখাতে প্রবেশ করে সত্য তালাশ করার পেছনে আমার একমাত্র অভিপ্রায় হচ্ছে আহলুল বাইতের প্রতি বনু উমাইয়ার নিদারুণ অত্যাচারের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবহিত হওয়া। নিবন্ধে উল্লেখিত হাদীসসমূহ এবং উলামায়ে কিরামের বিশ্লেষণকে সামনে রাখলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কারবালার নির্মম ঘটনা হঠাৎ করে সংঘটিত হয়নি। এটি ছিল দীর্ঘদিনের উত্তরোত্তর অবনতির পরিণাম। উসমান (রা.) এর হত্যাকাণ্ডের পর থেকে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৌত্রিক রেষারেষি, খিলাফাত ভেঙ্গে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরা রাজতন্ত্রের গোড়াপত্তন এবং সে রাজতন্ত্রের দূষিত উপজাত হিসেবে উদিত হওয়া ইয়াযীদ ও ইবন যিয়াদের মতো লোকদের কারণেই সংঘটিত হয়েছিল কারবালার যুদ্ধ, মদীনা ও মক্কা আক্রমণ। প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি সব সময়ই কারবালার মতো ঘটনার জন্ম দেয়।

__________________________________________

কারবালার চিরন্তন চেতনা

প্রতি বছর মহরম মাস আসলে বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজ ইমাম হুসাইন (আ.) এবং কারবালার শহীদদের হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি স্মরণ করার জন্য একত্রিত হয়। ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই শোকের অনুষ্ঠান শুধুমাত্র এই ঘটনার আচারগত স্মরণের জন্য নয়; বরং এর ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে গভীর নৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “অবশ্যই তাদের গল্পে বুদ্ধিমানদের জন্য নৈতিক শিক্ষা রয়েছে” (১২:১১১)। এই আলোকেই কারবালার বার্ষিক স্মরণের তথা আজাদারী শোকপালনের কয়েকটি দিক আলোচনা করা হলো:
১. নৈতিক ও আচরণগত গঠনঃ
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কোনো ভালো বিষয়ের বারবার চর্চা ও স্মরণ মানুষের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। মহরমের মজলিশ, মার্সিয়া, নওহা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ যখন ইমাম হুসাইনের ত্যাগ, সাহসিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল থাকার গল্প শোনে, তখন অবচেতনভাবেই সেই আদর্শগুলো তার নিজের জীবনে প্রতিফলিত হতে শুরু করে। কুরআনও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বলে—“নিশ্চয়ই স্মরণ মুমিনদের উপকার করে” (৫১:৫৫)। ফলে, এই বার্ষিক আয়োজন আসলে হৃদয়ের এক ধরনের নৈতিক প্রশিক্ষণ, যা কারবালার আদর্শকে কেবল পুঁথিগত না রেখে বাস্তব জীবনে রূপান্তর করতে শেখায়।
২. সত্য ও মূল্যবোধের সংরক্ষণ
ইতিহাসে অত্যাচারী শাসকরা বরাবরই কারবালার স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল ইমাম হুসাইনের মাজার পর্যন্ত ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু শত নিপীড়ন সত্ত্বেও ইমাম হুসাইনের শোক পালনকারী আজাদারগণ এই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। স্বৈরাচারী শক্তি সবসময় ইতিহাস ও স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যাতে তাদের নিজেদের অন্যায় ঢাকা পড়ে যায়। প্রতি বছর কারবালার পুনরাবৃত্তি করার অর্থ হলো—এইসব অত্যাচারী শক্তির দাপটের মোকাবিলায় সত্যকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া। কোন কোন ধরনের নৈতিক অবক্ষয় সমাজে অন্যায়কে টিকিয়ে রাখে-সেগুলি এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে মনে করিয়ে দেওয়া।
৩. কারবালার শিক্ষা
কারবালার স্মৃতি তখনই সার্থক হবে যখন তা আমাদের হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটাবে। কেবল অশ্রুবিসর্জন নয়, এই ইতিহাস আমাদের কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপ নেওয়ার শিক্ষা দেয়:
ইতিহাস জানা ও প্রচার করা: ইমাম হুসাইনের জীবন, আদর্শ ও তাঁর দেওয়া খুতবাগুলো গভীরভাবে জানা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান: কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী (“তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো...” ৪:১৩৫), পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা সমাজ—সবখানেই সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
মানবতার সেবা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিন ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করা আজীবন ইবাদতের সমতুল্য। সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করাই কারবালার মূল চেতনা।
আত্মশুদ্ধি: কারবালার আয়নায় নিজের আত্মাকে দেখা উচিত যে—আমরা নিজেরা কতটা সত্য ও ন্যায়ের পথে চলছি।
উপসংহার
মহানবী (সা.) বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই হুসাইনের শাহাদাতের ব্যাপারে মুমিনদের হৃদয়ে এমন একটি উত্তাপ রয়েছে যা কখনো প্রশমিত হয় না।” এই উত্তাপ কেবল আবেগ নয়, এটি একজনের জীবনে চলার শক্তি।
কারবালা কোনো অতীত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি বর্তমানের এক জীবন্ত গাইডবুক। কারবালার ঘটনা কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষের জন্য আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। সত্য ও মিথ্যার লড়াই যেহেতু চিরন্তন, তাই ইমাম হুসাইনের রেখে যাওয়া আদর্শও চির প্রাসঙ্গিক। আমাদের দুয়া হওয়া উচিত—আমরা যেন কেবল চোখের পানিতে কারবালাকে স্মরণ না করি। বরং আমাদের চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমেও এর চেতনাকে জীবনে ধারণ করতে পারি।
_________________________________________

আয়াতুল্লাহ খামনায়ীর ১০ টি কথা
      
১. যদি আমরা মারা যাই, তাতে বড় কোনো বিষয় নয়—কারণ ইরান গুরুত্বপূর্ণ নয়, ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ।

২. ইরানি জাতি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে যেমন দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি চাপিয়ে দেওয়া শান্তির বিরুদ্ধেও দাঁড়াবে, এবং এই জাতি কারও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।

৩. গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যখন একজন মানুষ উপলব্ধি করে যে শত্রু অহংকারভরে দেশের ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে চাইছে… তখন শত্রুর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে এবং প্রতিরোধে বুক চিতিয়ে দিতে হবে।

৪. আমরা কারও অধিকার লঙ্ঘন করিনি, এবং কখনও করব না; তেমনি কেউ আমাদের অধিকার লঙ্ঘন করবে—এটাও আমরা মেনে নেব না। আমরা কারও অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করব না; এটাই ইরানি জাতির যুক্তি।

৫. একজন নারী একটি কোমল ফুল, গৃহকর্মী নয় ।

৬. শত্রুদের কাছে আত্মসমর্পণ না করা ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম নীতি। তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে শত্রুর সাথে আলোচনা বা দরকষাকষি করা মানে আত্মসমর্পণ করা নয়।

৭. ইসলাম সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে বোঝার একটি সুযোগ তৈরি করুন। হয়তো আপনার দায়িত্ববোধের কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইসলাম ও পশ্চিমের এই বর্তমান মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাস কম ক্ষোভ নিয়ে লিখবে। 

৮. মহরম আমাদের ইতিহাস শুধু নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রের জন্য এক চলমান পথনির্দেশ।

৯. আমার এই জীবনের মূল্য খুবই সামান্য। আমার শরীরও অক্ষম, দূর্বল।  যে সামান্য মর্যাদা এখনো আমার মধ্যে আছে — সেটাও আপনারা-ই আমাকে দান করেছন। আমি এই আমার সামান্য সবটুকুও আপনাদের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। এই বিপ্লবের জন্য, ইসলামের জন্য — আমি আমার সবকিছুকে কুরবানি করতে প্রস্তুত। আমার প্রাণ, আমার সত্তা—সব যেন আপনাদের রাহে কুরবান হয়ে যায়,  হে আমাদের নেতা, হে আমাদের পথপ্রদর্শক, আমাদের জন্য দোয়া করুন।আপনারাই আমাদের মালিক, আপনারাই এই দেশের মালিক, আপনারাই এই বিপ্লবের মালিক। আপনারাই আমাদের ভরসা। আমরা কখনোই বিপ্লবের এই পথ ছেড়ে যাবো না; আমরা এই পথেই অবিচল থাকবো, আরও দৃঢ়ভাবে। আপনারা আপনাদের দোয়া, সহায়তা, মনোযোগ দিয়ে আমাদেরকে এই পথে সহায়তা করুন।" 
১০. হে উম্মাহ, আশা হারাবেন না। সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন, কারণ এই ঐক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
__________________________________________

আজাদারী ও ইমামে জামানা (আ.)

৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার উত্তপ্ত মরুভূমিতে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের নিয়ে আল্লাহর দ্বীন রক্ষার জন্য যে অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সেই আত্মত্যাগের স্মৃতি ধারণ ও প্রচারের নামই আজাদারী। আর এই আজাদারীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত আছেন ইমামে জামানা, হযরত ইমাম মাহদী (আ.)—যিনি কারবালার রক্তস্নাত আদর্শকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত শেষ হুজ্জত।

অনেকেই মনে করেন আজাদারী শুধু শোক প্রকাশ বা অশ্রু বিসর্জনের নাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আজাদারী হলো ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জীবন্ত রাখা। কারবালার শহীদদের স্মরণ করে কান্না করা অবশ্যই সওয়াবের কাজ, কিন্তু সেই কান্নার প্রকৃত মূল্য তখনই হয় যখন তা মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করে এবং তাকে সত্য, ন্যায় ও তাকওয়ার পথে পরিচালিত করে। আজাদারী মানুষের হৃদয়কে কোমল করে, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শিক্ষা দেয়। এটি শুধু একটি আবেগ নয়; বরং একটি আন্দোলন, একটি শিক্ষা এবং একটি জীবনব্যবস্থা।

হযরত ইমাম মাহদী (আ.) হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আহলুল বাইতের শেষ ইমাম। তিনি সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি আল্লাহর নির্দেশে গায়বতের পর্দায় অবস্থান করছেন এবং নির্ধারিত সময়ে আবির্ভূত হয়ে পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ করবেন।
কারবালার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বংশধর এবং তাঁর রক্তের উত্তরাধিকারী। বিভিন্ন জিয়ারত ও দোয়ায় আমরা দেখতে পাই যে ইমামে জামানা (আ.) সর্বদা তাঁর দাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোককে হৃদয়ে ধারণ করেন। বর্ণনায় এসেছে যে তিনি কারবালার মুসিবতের জন্য অশ্রুপাত করেন এবং শহীদদের স্মরণে শোক প্রকাশ করেন। ইমাম হুসাইন (আ.) যেই লক্ষ্য নিয়ে কারবালায় শাহাদাত বরণ করেছিলেন, ইমাম মাহদী (আ.) সেই লক্ষ্যকেই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করবেন।

একজন প্রকৃত মুমিন যখন আন্তরিকতার সঙ্গে আজাদারী করেন, তখন তিনি শুধু ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন না; বরং ইমামে জামানা (আ.)-এর হৃদয়কেও আনন্দিত করেন। কারণ ইমামে জামানা (আ.) চান যে মানুষ কারবালার শিক্ষা ভুলে না যাক এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক। মজলিসে অংশগ্রহণ, মাতম, নওহা পাঠ, জিয়ারত এবং কারবালার ইতিহাস আলোচনা—এসবই আজাদারীর অংশ। তবে এর চেয়েও বড় বিষয় হলো নিজের চরিত্রকে হুসাইনি আদর্শে গড়ে তোলা। একজন মানুষ যদি মজলিসে উপস্থিত হয় কিন্তু তার চরিত্রে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়া না আসে, তবে তার আজাদারী অপূর্ণ থেকে যায়।

ইমামে জামানা (আ.)-এর আবির্ভাবকে অনেক আলেম “কারবালার বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়” বলে অভিহিত করেছেন। কারণ তিনি আবির্ভূত হয়ে পৃথিবী থেকে জুলুম, অত্যাচার, বৈষম্য ও অন্যায় দূর করবেন। তিনি সেই সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেন, যার জন্য কারবালায় রক্ত ঝরেছিল। আজ পৃথিবী অন্যায়, যুদ্ধ, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ে আক্রান্ত। এই পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজেকে ইমামে জামানা (আ.)-এর সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলা। আর সেই প্রস্তুতির অন্যতম মাধ্যম হলো প্রকৃত আজাদারী।

আজাদারী আমাদের শেখায়:
১, সত্যের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে।
২, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।
৩, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে।
৪, মানবতার সেবা করতে।
৫, ইমামে জামানা (আ.)-এর আবির্ভাবের জন্য আত্মিক ও নৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে।

যে হৃদয়ে হুসাইনের ভালোবাসা থাকে, সে হৃদয় কখনো জালিমের পক্ষে দাঁড়াতে পারে না। আর যে হৃদয় ইমামে জামানা (আ.)-এর অপেক্ষায় থাকে, সে সর্বদা নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করে।

আজাদারী ও ইমামে জামানা (আ.) একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। আজাদারী আমাদের কারবালার শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং ইমামে জামানা (আ.)-এর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য অশ্রু বিসর্জন শুধু শোক নয়, এটি একটি অঙ্গীকার—সত্যের পথে চলার অঙ্গীকার, ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং ইমামে জামানা (আ.)-এর বিশ্বজনীন বিপ্লবের সহযোদ্ধা হওয়ার অঙ্গীকার।

আসুন, আমরা শুধু মহররমের কয়েকটি দিনে নয়, বরং সারা জীবন হুসাইনি আদর্শকে ধারণ করি, ইমামে জামানা (আ.)-এর আবির্ভাবের জন্য দোয়া করি এবং নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলি যাতে তিনি আবির্ভূত হলে আমাদের তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন।

আল্লাহুম্মা আজ্জিল লিওয়ালিয়্যিকাল ফারাজ। হে আল্লাহ! ইমামে জামানা (আ.) আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন। আমীন।

__________________________________________

আযাদারী বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হাদীস (সংগৃহীত)
        ✍️ রাজা আলী


 আযাদারী একটি ফার্সি শব্দ। এর অর্থ হলো শোকপালন। ইমাম হোসেন আঃ, তাঁর পরিবার বর্গ এবং সহযোগীদের দ্বীন ইসলামের জন্য করুণ আত্মত্যাগ কে স্মরণ করে যে শোক পালন করা হয়, তাকেই আযাদারী বলে থাকি।আযাদারীর গুরুত্ব অনেক বেশি।আযাদারী সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস নিচে উল্লেখ করা হলো।

১.শহীদ সঙ্গীদের পুরস্কার*:

ইমাম রিযা (আঃ) তাঁর এক সাহাবীকে বললেন: যদি তুমি চাও যে, হুসাইন (আঃ)-এর সাথে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের সমতুল্য সওয়াব অর্জন করবে, তাহলে যখনই তাঁকে স্মরণ করবে, বলবে: 'হায়! যদি আমি তাঁদের সাথে থাকতাম ! তাহলে আমি এক বিরাট সাফল্য অর্জন করতাম।' 
(ওয়াসাইল আল-শিয়াহ, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৫০১)।

২.হুসাইন (আঃ) সম্পর্কে কবিতা/শোকগাথা পাঠের পুরস্কার

ইমাম সাদিক (আঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি হুসাইন (আঃ)-কে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করে এবং এর দ্বারা নিজে কাঁদে ও অন্যদেরও কাঁদায়, আল্লাহ তার উপর জান্নাত আবশ্যক করে দেন এবং তার গুনাহ মাফ করে দেন। (রিজাল আল-শাইখ আল-তুসি, পৃষ্ঠা ১৮৯)।

৩.অশ্রু : নরকের বাধা

ইমাম বাকির (আঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি আমাদেরকে স্মরণ করে, অথবা যার উপস্থিতিতে আমাদেরকে স্মরণ করা হয়, এবং (এর ফলে) তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ে, যদিও তা একটি মশার ডানার সমান পরিমাণও হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করবেন এবং সেই অশ্রুকে তার ও জাহান্নামের আগুনের মাঝে প্রতিবন্ধক বানিয়ে দেবেন।
(আল-গাদীর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২০২)।

৪.বিশ বছরের কান্না!

ইমাম সাদিক (আঃ) বলেন: 'আর আলি ইবনুল হুসাইন (আঃ) (কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর) কুড়ি বছর ধরে হুসাইন (আঃ)-এর জন্য কেঁদেছিলেন; তাঁর সামনে কোনো খাবার দেওয়া হলেই তিনি কাঁদতে শুরু করতেন।' 
(বিহার আল আনওয়ার, খণ্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ১০৮)।

৫.শিয়া:সঙ্গী ও সহযোগী

ইমাম 'আলী (আঃ) বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের জন্য এমন অনুসারী (শিয়া) মনোনীত করেছেন, যারা আমাদের সাহায্য করে, আমাদের সুখে সুখী হয় এবং আমাদের দুঃখে দুঃখী হয়।
(গুরারাল-হিকাম খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫)।

৬.স্বর্গ : শোকের প্রতিদান

ইমাম আলি ইবনুল হুসাইন (আঃ) বলতেন: প্রত্যেক মু'মিন, যার চোখ থেকে হুসাইন ইবনুল আলি (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের শোকে এমন অশ্রু ঝরে যে, তা তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের উচ্চ কক্ষে স্থান দেবেন। 
(ইয়ানাবিয়াল মাওয়াদ্দাহ, পৃষ্ঠা ৪১৯)।

৭ .ফাতিমা (আঃ)-এর সন্তানদের স্মরণে

ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) বলেছেন: নিশ্চয়ই আমি যখনই ফাতিমা (আঃ)-এর সন্তানদের শাহাদাতের কথা স্মরণ করেছি, তখনই তা আমাকে অশ্রুসিক্ত করেছে। 
(বিহার আল-আনোয়ার খণ্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ১০৯)।

------ _____------_____------______------______------
------ _____------_____------______------______------


📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
আয়াতুল্লাহর বিদায়

তোমার যাওয়াতে আমরা
অভিভাবক হারিয়েছি
পর্দার আড়ালে কথা বলার
আয়াতুল্লাহ কে হারিয়েছি।

তোমাকে দেখেলে অন্তরে
প্রশান্তির ছায়া খুঁজে পাই
আজ যেন নিজেকে লাগছে
বড্ড একা ও নিরুপায় ।

তোমার সাহস আর খোদাভীরুতা
দুনিয়া দেখেছে স্পষ্ট চোখে,
সারা জগতের মানবসমাজ
আজ তোমাকে চিনেছে।

তোমার ত্যাগ আর অটল ঈমান
ইতিহাসে এঁকেছে অমলিন চিহ্ন,
আজ বিশ্ববাসী জানে স্পষ্ট—
শিয়া জাতি, ইসলামের মেরুদণ্ড।

পিপাসা ছিল শাহাদাতের
তোমার আসা পুরন হয়েছে 
হাই! দুনিয়া ছাড়িলে তুমি
এবাদাত ও রোজার হালতে।

__________________________________________


    বীর খামনেয়ী

ছিয়াশি বছর বয়সেও যিনি ছিলেন বীর এক যোদ্ধা, 
হৃদয়ে যাঁর জিন্দা ছিল নূরানী আর ঈমানী জজবা। 
শহীদি তামান্না বুকে নিয়ে যিনি পথ চলেছেন চিরকাল, 
জ্ঞানের সাগরে ডুব দিয়ে যিনি গড়েছেন প্রজ্ঞার ঢাল।

পরহেজগারিতে অনন্য তিনি, আধ্যাত্মিকতায় বীর, 
জালিমের কাছে নত করেননি কখনও মহিমান্বিত শির। 
আমেরিকা আর ইজরায়েলের দম্ভকে চূর্ণ করে, 
অটল অবিচল হয়ে দাঁড়িয়েছেন— একলা আপন ঘরে।

নিঃসঙ্গ ইরান, চারপাশে সব শয়তানি চক্রান্ত, 
তবুও হারাননি সাহস তিনি, হননি কভু ক্লান্ত। 
সাম্রাজ্যবাদী হায়েনা রুখতে একাই তিনি তুফান, 
মযলুমের তরে বিলিয়ে দিলেন আপন প্রাণ।

হায়দারী তেজে দীপ্ত কণ্ঠ, অন্তরে খোদা-ভীতি, 
সত্যের তরে লড়ে যাওয়াই ছিল যাঁর আজব রীতি। 
বিপ্লবী এক রুহ্ হয়ে আজ অমর মহানায়ক, 
ইতিহাসে লেখা থাকবে— তিনি হলেন সত্যের ধারক ও বাহক।

__________________________________________

    খামিনি
    ✍️ রাজা আলী 

তুমি অটল পর্বতের মতো 
বেড় দিয়েছো একটি অক্ষ 
চেতনায় শান দিয়েছো বেশ
ভয়ে আছে আজ শত্রু পক্ষ।

তোমার নামেতেই ওদের ভয়
বিরাট এক মৃত্যু সম্মুখে দেখে 
সূর্যের মতো দীপ্তিমান তুমি 
শত্রু রা অনুকম্পা য় কাঁপে।

তুমি একজন ধর্মীয় নেতা
ইসলাম ই তোমার অনুসৃত
তুমি তো ইমামের সৈনিক এক 
বাকি তিন'শ বারো থাকলে কি হত?

তোমার দিকনির্দেশনা প্রবল বিজ্ঞ 
এক একটি বাক্যেই উজ্জীবন 
সহস্র সেনা তৈরি মৃত্যুর মুখে
 মৃত্যু অবধি ভঙ্গ দেবে না রণ।

__________________________________________

   রক্তাশ্রুর আজাদার

কারবালার বুকে সূর্য ডুবেছে, 
            তবু ব্যথা ডুবেনি আজও;
 ফোরাত বয়ে চলে নীরবে, 
            তৃষ্ণার গল্প বলে আজও।

আমরা কাঁদি অশ্রুর জলে, 
              মাতমে ভরে দিই ধরা; 
কিন্তু একজন কাঁদেন নীরবে, 
        রক্তাশ্রু ঝরে যাঁর চোখভরা।

তিনি আমাদের ইমামে জামানা, 
         হুসাইনের শোকের উত্তরাধিকার; 
প্রতিটি নিশ্বাসে যার জাগে 
       কারবালার রক্তাক্ত স্মৃতির ভার।

"হে দাদা!"— ডাকে তাঁর হৃদয়, 
      "কীভাবে ভুলে থাকি তোমায়?" 
অশ্রু ফুরালে রক্ত ঝরে, 
       ভালোবাসার গভীর ব্যথায়।

আজাদারীর প্রতিটি মজলিসে, 
         প্রতিটি নওহা, প্রতিটি মাতমে, 
আমরা খুঁজি সেই মাওলাকে, 
          যিনি কাঁদেন নিভৃত নির্জনে।

হে সাহিবুজ্জামান! 
         আমাদের অশ্রুকে কবুল করুন, 
আপনার রক্তাশ্রুর কাফেলায় 
           আমাদেরও সামিল করুন।

যেন "ইয়া হুসাইন" বলতে বলতে 
                হৃদয় ভেঙে যায় প্রেমে,
 আর আপনার অপেক্ষার প্রদীপ
         জ্বলতে থাকে রূহের গভীরে।
------ _____------_____------______------______------

Thursday, March 12, 2026

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ) || রমযান সংখ্যা ||



আরবি: রমযান, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 

সহযোগী সম্পাদকরাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


সম্পাদকীয়

রেওয়ায়েতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) (অনুবাদ)

ইসলাম প্রচারে বিবি খাদীজা কুবরা (সা:আ:) এর ভূমিকা

ইমাম হাসান (আ.)-এর সন্ধি

নাফস কে চেনা মানে আল্লাহ কে চেনা

ইমামে জামানা (আ:)-এর পছন্দের রোজা

ইমাম মাহদী আঃ এর অন্তর্ধানে আমাদের ফায়দা বা লাভ (সংগৃহীত)
          ✍️ রাজা আলী 

 




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

       বরকত ও বেদনা

         বীর খামনেয়ী
                ✍️ মইনুল হোসেন

         খামিনি
                ✍️ রাজা আলী 

         রমযান ও ইমামে জামানা (আ.)


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে পবিত্র রমযান মাস আবারও আমাদের জীবনে উপস্থিত হয়েছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে। এই বরকতময় মাস কেবল রোজা পালনের সময় নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। রমযান আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, ঈমানকে দৃঢ় করে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার নতুন শক্তি জাগিয়ে তোলে।
আল হুজ্জাত মাসিক পত্রিকার এই রমযান সংখ্যাও সেই চেতনাকেই ধারণ করার এক বিনম্র প্রয়াস। কুরআনের শিক্ষা, আহলে বাইত (আ.)–এর আদর্শ এবং ইমামে যামানা (আ.)–এর প্রতীক্ষার দায়িত্ববোধ—এই সবকিছুর আলোয় আমরা পাঠকদের হৃদয়ে আত্মজাগরণের একটি ক্ষুদ্র প্রদীপ জ্বালাতে চাই।
রমযান আমাদের শেখায় তাকওয়া, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ। যদি আমরা এই মাসের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, তবে ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ই নৈতিকতা ও সত্যের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
এই রমযান সংখ্যাকে সামনে রেখে আমরা আবারও অঙ্গীকার করছি—কুরআনের আলো ও ইমামে যামানা (আ.)–এর চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে সত্যের পথে কলম চালিয়ে যাওয়ার। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের এই প্রচেষ্টা কবুল করেন। আমিন।

                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖



রেওয়ায়েতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) (অনুবাদ)

রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ " আমি তোমাদেরকে মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের সুখবর দিচ্ছি-যাকে আমার উম্মতদের মাঝে পাঠান হবে। তাঁকে এমন সময়ে পাঠান হবে, যে সময়ে মানুষ পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী হবে এবং দোলাচলতার মাঝে বিভ্রান্ত হবে”।

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর গুণাবলী ও আবির্ভাবের বিষয়ে রাসুল (সাঃ) ও মাছুমীনগণ (আঃ) -দের থেকে এত পরিমাণে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, আমীরুল মোমেনীন (আঃ) ব্যতীত অপর কোনো মাসুমের সম্পর্কে এত পরিমাণে হাদীস বর্ণিত হয়নি। উল্লেখ্য, এই হাদীসগুলি সবই এসেছে বিশ্বস্ত রেওয়ায়েত সূত্রে। আশ্চর্যের বিষয় হল যে, ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেই কিছু সাহাবীগণ তাঁকে ভিত্তি করে পুস্তক লেখেন। শীয়াদের পুস্তকগুলির সঙ্গে সঙ্গে সুন্নিদের পুস্তকের মধ্যেও ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে রেওয়ায়েত সমূহ ধারাবাহিক ভাবে আজও বিদ্যমান। আহলে সুন্নতের বহু পুরাতন পুস্তক 'মাসনাদে আহমাদ বিন হাম্বালের' (হিজ্বরী ২৪১) মধ্যে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সম্পর্কে আনুমানিক ১০০ টির মতো হাদীস আছে। আর পরবর্তী লেখকগণ তাঁদের পুস্তকের (যেমন, সুনানে ইবনে দাউদ (২৭৫ হিজুরী), ইবনে মাজাহ্ (২৯৩ হিজ্বরী), তিরমিযী (২৯৭হিজ্বরী)} মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর বিষয়ে একটি করে অধ্যায় স্থান দিয়েছেন। এছাড়াও আজ পর্যন্ত আহলে সুন্নতের লেখকদের ১৫০ টি এমন পুস্তক আছে-যা সম্পূর্ণ ইমাম মাহ্দী (আঃ)-কে বিষয় করে লেখা। আর হাজার হাজার এমন পুস্তক পাওয়া যায়, যার মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে পৃথক অধ্যায় স্থান পেয়েছে। শীয়াদের পুস্তকগুলির মধ্যে ইমাম মাহদী (আঃ) সম্পর্কে এমন কিছু রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে, যে গুলির মধ্যে রাসুলে খোদা (সাঃ) এবং ইমামগণ (আঃ) ব্যতীত অন্যান্য সূত্র থেকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তাঁর আবির্ভাবেরে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। 'মুন্তাখাবুল আছার' নামক পুস্তকে আনুমানিক এমন-ই ১৩০০ রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। আর ইমাম মাহ্দী (আঃ)-কে বিষয় করে লেখা শীয়া আলীমদের পুস্তকের সংখ্যা বর্তমানে চার শতাধিক।

শীয়া ও সুন্নি উভয় মাযহাবের কাছে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে অত্যাধিক পরিমাণে হাদীস থাকার কারণে ইমামত বিষয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব বিষয়ে উভয় মাযহাব সহমত পোষণ করে। আহলে সুন্নত ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে পয়গম্বার (সাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করেছেনঃ

" যে মাহ্দীকে অস্বীকার করবে, সে কাফির” (অনুবাদ)। আহলে সুন্নতের মধ্যে এই হাদীসটিও বর্ণিত আছে যে, পয়গম্বার (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ

“ যদি পৃথিবীর বয়স একদিন থেকে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ ঐ দিনকে খুবই দীর্ঘায়িত করবেন, এবং একজন ব্যক্তিকে (যে আমার সন্তানদের মধ্যে থেকে হবে এবং যার নাম
_________________________________________

ইসলাম প্রচারে বিবি খাদীজা কুবরা (সা:আ:) এর ভূমিকা


বিবি খাদীজা কুবরা (সা:আ:) ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে একটি অন্তর্ভুক্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রথম স্ত্রী এবং ইসলাম ধর্মের প্রথম অনুসারী। তার ভূমিকা ইসলাম প্রচারের শুরুতে অসামান্য ছিল।

 *### ১. সমর্থন ও উৎসাহ:* 
বিবি খাদীজা (সা:আ:) ছিলেন এক শক্তিশালী ও সফল ব্যবসায়ী। তিনি মহানবী (সাঃ) এর প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁদের প্রাথমিক কঠিন সময়ে তাঁকে সমর্থন করেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস এবং উৎসাহ নবীর কাছে অপরিসীম সহায়তা প্রদান করেছে।

 *### ২. অর্থনৈতিক সহায়তা:* 
মহানবী (সাঃ) যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন অনেক সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখী হন। বিবি খাদীজা (সা:আ:) তাঁকে অর্থনৈতিক জোরদার সহায়তা প্রদান করেন, যা ইসলাম প্রচারের কাজে অনেক সাহায্য করেছে। তিনি তার ব্যবসায়ে আয় হওয়া অর্থ ইসলাম প্রচারের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। বিবি খাদীজা (সা:আ:) সম্পর্কে নবী (সাঃ) বলেন:
"খাদীজা আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী, যিনি সবসময় আমার পাশে ছিলেন, এবং আমার জন্য সমস্ত কিছু ত্যাগ করেছেন।"

 *### ৩. সামাজিক মর্যাদা:* 
বিবি খাদীজা (সা:আ:) এর সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা ইসলাম ধর্মের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। তাঁর উচ্চ রক্তের সাথে মহানবী (সাঃ) এর সম্পর্ক মুসলিম সমাজে এক শক্তিশালী উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল।

 *### ৪. প্রথম মুসলিম:* 
তিনি প্রথম মহিলা হিসাবে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত মুসলিম সমাজে অন্যদের জন্য এক উদাহরণ সৃষ্টি করে, যে নারীরাও ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। 
একটি হাদিস অনুসারে, নবী (সাঃ) বলেন:
"শব্দাবলী" অর্থাৎ খাদীজা (সা:আ:) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তিনিই আমার প্রথম সমর্থক।  

 *### ৫. মানসিক সহায়তা:* 
মহানবীর জন্য বিবি খাদীজা (সা:আ:) কেবল একজন স্ত্রীই ছিলেন না, বরং তিনি তার সেরা বন্ধু এবং সহায়কও ছিলেন। মহানবীর কঠিন সময়ে তার পাশে থেকে তিনি মানসিক সহায়তা প্রদান করেছেন, যা নবীর কাজকে আরো শক্তিশালী করেছে। 
নবী (সাঃ) যখন প্রথমবার একটি নবুওয়াতের প্রচার কলেন, তখন তিনি খাদীজা (সা:আ:) এর কাছে যান। তিনি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে সাহস দেন এবং বলেন:
"তুমি কখনো নষ্ট হবে না, কারণ তুমি সৎ, সত্যবাদী এবং পরোপকারী।" 

বিবি খাদীজা (সা:আ:) সম্পর্কে হাদিসে তাঁর মর্যাদা, চরিত্র ও মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে তাঁর সম্পর্কের প্রতিফলন রয়েছে। 

কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো:  

 *### জান্নাতের গণ্ডী:* 
একাধিক হাদিসে উল্লেখ আছে যে, জিব্রাইল আলাইহিস সালাম নবী (সাঃ) কে একটি বার্তা দেন, যেখানে আল্লাহরাসুল (সাঃ) খাদীজা (সা:আ:) কে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। এটি তাঁর বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ।  

 *### নারীর মর্যাদা:* 
মহানবী (সাঃ) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন:
"মুহাম্মদ (সাঃ), খাদীজা (সা:আ:) এর কথা শুনে তাঁর বিশ্বাসে গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং স্ত্রী হিসাবে তাঁকে অত্যন্ত সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেন।"

 *### উপসংহার:* 
বিবি খাদীজা (সা:আ:) এর অবদান শুধুমাত্র ইসলামের প্রাথমিক সময়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ইসলামের যে কোনো পাঠ ও বিশ্বাসে নারীর ভূমিকার গুরুত্বকে প্রমাণ করেছে। তিনি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে এক দৃষ্টান্তস্বরূপ নারী হিসাবে চিরক ।
বিবি খাদীজা (সা:আ:) এর অবদান ও গুরুত্ব ইসলামের ইতিহাসে অপরিসীম। তিনি শুধু একজন স্ত্রীই নন, বরং একজন সাহাবী, যিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ও ভালোবাসা সম্পর্কে নবী (সাঃ) এর উক্তিগুলি এটি প্রমাণ করে যে, নারীর মর্যাদা ও গুরুত্ব ইসলামী সমাজে কতটা বিশাল।

__________________________________________

ইমাম হাসান (আ.)-এর সন্ধি

রমজান মাসের ১৫ তারিখ হল আহলেবাইত (আ.) পরিবারের দ্বিতীয় ইমাম হজরত হাসান আল-মুজতবা (আ.)-এর জন্মদিন। তিনি ৩ হিজরি সনে মদিনা শহরে ইমাম আলি (আ.) ও বিশ্বনবী (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় কন্যা হজরত ফাতেমা (সা.)-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। হিজরি ৪০ সনে তাঁর পিতার শাহাদাতের পরে ইমাম হাসান (আ.) ইমামত ও খিলাফতের দায়িত্ব লাভ করেন। কিন্তু তৎকালীন দামেস্কের গভর্নর মুয়াবিয়া ইমাম হাসানের খিলাফতকে অস্বীকার করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন-ঠিক যেমনটি তিনি পূর্বে ইমাম আলী (আ.)-এর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছিলেন।  
উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা এড়াতে এবং ইসলামী ঐক্যকে শক্তিশালী করতে ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়ার সাথে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যদিও ক্ষমতা লাভ করার পরে মুয়াবিয়া এই চুক্তি লঙ্ঘন করেন এবং যেটি শেষ পর্যন্ত ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক ও দুঃখজনক কারবালা’র মতো ঘটনার দিকে ধাবিত করে।
হজরত মুয়াবিয়া ইমাম হাসান (আ.)-এর খিলাফতের আগেই বৈধ খলিফা ইমাম আলী (আ.)-এর বিরুদ্ধেও সিফফিনের মতো যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়া হজরত রাসূল (সা.)-এর প্রবীণ সাহাবী আম্মার (রা.)-কে হত্যা করেন। অথচ রাসূল (সা.) আগেই বলেছিলেন যে, আম্মার একদল ‘বিপথগামী বিদ্রোহী গোষ্ঠী’র হাতে শহীদ হবেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, এমন একজন ব্যক্তি যে কীনা অনেক অপরাধের সাথে জড়িত, তার সাথে কীভাবে রাসূল (সা.)-এর নাতি এবং জান্নাতের যুবকদের সর্দার ইমাম হাসান (আ.) শান্তি চুক্তি বা সন্ধি করলেন?
দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়ার প্রতারণা ও ছলচাতুরী সম্পর্কে মুসলমানদেরকে সচেতন করতে থাকেন এবং মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার নির্দেশ দেন। ইমাম হাসান (আ.) তাঁর অনুসারীদের মধ্য থেকে সেনাবাহিনী গঠন করেন। তবে তাঁর সেই সেনাবাহিনী ছিল বিচিত্র ও ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যধারী মানুষের সমষ্টি। সেখানে কিছু প্রকৃত মুমিন থাকলেও অধিকাংশই যোগ দিয়েছিলেন কেবল যুদ্ধ থেকে মালে গণিমত পাওয়ার লোভে অথবা দ্বিধাবিভক্ত আনুগত্য নিয়ে। এমনকি কিছু খারেজিও সেই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল - যারা ইমামের প্রতি ভালোবাসার কারণে নয় বরং মুয়াবিয়াকে খেলাফত থেকে সরিয়ে নিজেদের লক্ষ্য হাসিলের জন্য এসেছিল। অন্যরা এসেছিল কেবল তাদের গোত্রীয় নেতাদের নির্দেশে, সত্যের জন্য লড়াই করার কোনো চেতনা তাদের মধ্যে ছিল না।
যুদ্ধের আগে মুয়াবিয়া অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এবং বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ইমামের বাহিনীর শক্তি ভেঙে দিতে উদ্যত হন। এমনকি তিনি ইমাম হাসানের (আ.) সেনাপতি উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে প্রতারিত করেন এবং ঘুষ প্রদান করেন। মুয়াবিয়া তাঁকে ১০ লক্ষ দিরহামের বিনিময়ে তাঁর সৈন্যদের নিয়ে মুয়াবিয়ার বাহিনীতে যোগ দিতে প্ররোচিত করেন। ফলস্বরূপ, উবায়দুল্লাহ রাতে ইমাম হাসানের বাহিনী ত্যাগ করে ৮,০০০ সৈন্যসহ মুয়াবিয়ার পক্ষে চলে যান।
গুজব ছড়ানো হয় যে, ইমাম হাসান (আ.) মুসলিমদের রক্তপাত এড়াতে যুদ্ধ বন্ধ করতে সম্মত হয়েছেন। এই গুজব কাজ করেছিল। খারেজিরা যখন দেখল তাদের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না, তখন তারা ইমামের বিরুদ্ধেই চলে যায়। তাদের মধ্য থেকে একদল ইমাম হাসান (আ.)-এর উপর আক্রমণ করতে উদ্যত হয় এবং ইমাম হাসান (আ.) তাঁর উরুতে একটি গুরুতর আঘাত পান। এমনকি বিভিন্ন গোত্রীয় নেতারা মুয়াবিয়াকে চিঠি লিখে প্রস্তাব দেয় যে, তারা যদি ইমাম হাসানকে তাঁর হাতে তুলে দেয়, তবে যেন তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। মুয়াবিয়া সেই সব চিঠি ইমামের কাছে পাঠিয়ে দেন এবং ইমামের পছন্দমতো শর্তে মদিনায় নিরাপদে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। মুয়াবিয়া নিচে সিলমোহরযুক্ত একটি সাদা কাগজ পাঠিয়ে বলেন, এই কাগজে যা ইচ্ছা শর্ত লিখুন, আমি তা মেনে নেব।
রক্তপাত এড়াতে এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করতে ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়ার এই প্রস্তাব গ্রহণ করাকে শ্রেয় মনে করেন। তিনি তাঁর পিতার সময়ে সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার কৌশল এবং প্রতারণা সম্পর্কে জানতেন। তিনি জানতেন মুয়াবিয়ার কূটচাল মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ এবং জীবনহানি ঘটাচ্ছে। এই আপাত যুদ্ধবিরতি ছিল একটি তিক্ত সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার নিরাপদ পথ। ইসলামকে রক্ষার স্বার্থে ইমাম শান্তি মেনে নেন। তাছাড়া এটা ছিল অপরাধীদের জন্য একটি পরীক্ষা ও সুযোগ -যাতে তারা সংশোধন হয়ে যাবে অথবা চুক্তি অমান্যের মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে তাদের আসল চেহারা প্রকাশিত হবে। মুয়াবিয়ার দেওয়া সেই কাগজে ইমাম হাসান (আ.) নিজের, পরিবার এবং মুমিনদের ইমাম হিসেবে প্রয়োজনীয় সকল শর্ত লিখে দেন। দুর্ভাগ্যবশত আল্লাহর নামে শপথ করে এই শর্তগুলি পালন করার ওয়াদা করলেও মুয়াবিয়া সেই ওয়াদা ভঙ্গ করেন এবং সন্ধিপত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন।
সন্ধির শর্তগুলির মধ্যে একটি শর্ত ছিল মুয়াবিয়া তাঁর মৃত্যুর পরে অন্য কাউকে খলিফা নিযুক্ত করে রেখে যেতে পারবে না। শর্ত ছিল মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পরে খেলাফাতের দায়িত্ব ইমাম হাসান (আ.)-এর কাছে অর্পিত হবে অথবা ইমাম হাসান (আ.)-এর মৃত্যু হলে তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন (আ.) খলিফা হবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় হজরত মুয়াবিয়া তাঁর জীবদ্দশাতেই নিজের অযোগ্য, অপদার্থ, ফাসিখ, ব্যভিচারী পুত্র ইয়াজিদকে খলিফার আসনে বসানোর জন্য জনগণের নিকট থেকে বাইয়াত গ্রহণ ও অন্যান্য কার্যাদি সম্পাদন করে রেখে যান। আর এই ইয়াজিদই কারবালার ময়দানে প্রিয় নবীজীর (সা.) বংশধরদেরকে নির্মমভাবে শহীদ করে এবং বেঁচে থাকা সদস্যদেরকে বন্দী করে অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ও বর্বর কাজ করেছিল। 
সন্ধির শর্তগুলিকে অস্বীকার করে মুয়াবিয়ার প্রকৃত চেহারা উম্মতের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ইসলামের প্রতি কোনো দরদ দেখানোর জন্য নয় বরং ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিজ পরিবারের মধ্যে আগলে রাখাটাই ছিল মুয়াবিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য। আর ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়ার এই আচরণকে সকলের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়ে গেছেন।
_________________________________________

নাফস কে চেনা মানে আল্লাহ কে চেনা

Man ‘arafa nafsahu faqad ‘arafa rabbahu
"যে নিজের নাফসকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে।"

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, রব ও মাবুদ। তাঁর হামদ ও শুকরিয়া আদায় করা আমাদের কর্তব্য। হাদিসে বর্ণিত আছে—যে নিজের নাফসকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে। এখানে ‘নাফস’ বলতে মানুষের আত্মসত্তা বা অন্তর্গত সত্তাকে বোঝানো হয়েছে।
মানুষ অধিকাংশ সময় পরচর্চা ও সমালোচনায় ব্যস্ত থাকে। কিন্তু যদি মানুষ এসব কাজ পরিহার করে আত্মশুদ্ধির কাজে মনোযোগী হতো, তবে সে অবশ্যই কামিয়াব হতো।
এই যে পবিত্র মাস—এ মাস আল্লাহর প্রিয় মাস। এ মাসে বান্দারা আল্লাহর মেহমান হয়। আর মেহমান যদি মিসবানের কাছে কিছু চায়, তবে মিসবান তা পূরণ করার চেষ্টা করেন। সুতরাং আমাদের করণীয় হলো—আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা, নিজেদের গোনাহের জন্য তওবা করা। তাহলে করুণাময় পরওয়ারদেগার অবশ্যই আমাদের ক্ষমা করবেন। এভাবেই আমাদের রুহকে উজ্জীবিত করতে হবে; তবেই আমরা খোদাকে চিনতে সক্ষম হবো।
এই বরকতময় মাসে যদি আমাদের রুহ পবিত্র হয়, তবে আমরা সেই পবিত্র সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারবো, যিনি জগতের হুজ্জাত; যাঁর কারণে এই ভূখণ্ড টিকে আছে; যাঁর জন্য জমিন-আসমান, জলধারা, গাছপালা, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র—সবকিছু বিদ্যমান। সেই হুজ্জাতের সহযোগিতা মেঘে ঢাকা সূর্যের ন্যায়। তাঁর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করতে পারলে আমাদের রুহ কামিয়াব হবে।
নিজের নাফসকে চেনা মানে নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যেন যুগের ইমামের সাক্ষাৎ লাভের যোগ্য হওয়া যায়। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে—এক দর্জিওয়ালা যুগের ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। একবার ইমাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যদি এক সপ্তাহ তোমার সাথে সাক্ষাৎ না করি, তবে তোমার অবস্থা কী হবে?” দর্জি বললেন, “আমি মারা যাবো।” তখন ইমাম বললেন, “এই কারণেই আমি প্রতি সপ্তাহে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করি।”
অতএব, সেই দর্জি নিজের নাফসকে চিনেছিলেন বলেই তিনি যুগের ইমামের সাক্ষাৎ লাভ করতে পেরেছিলেন।
নাফসকে চেনার জন্য শুধু জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়; বরং নিজের আমলকে মজবুত করতে হবে। গোনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং সর্বদা সতর্কভাবে চলতে হবে, যাতে খোদার নৈকট্য অর্জন করা যায়।

উপসংহার
১. পরচর্চা করার আগে নিজের দিকে তাকানো।
২. নিজের নাফসকে চেনা এবং কোথায় ঘাটতি আছে তা চিহ্নিত করা ও সংশোধন করা।
৩. নিজের আমলের উপর গুরুত্ব দেওয়া।
৪. আল্লাহ কোন কাজে সন্তুষ্ট হন তা বাস্তবায়ন করা।
৫. যুগের ইমামকে অন্তরে স্থান দেওয়া এবং সর্বদা তাঁকে স্মরণ রাখা।
৬. নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

এইভাবে যদি আমরা আত্মশুদ্ধি করতে পারি, তবে আমরা আমাদের রবকে চিনতে পারবো এবং ইমামে জামানার সাক্ষাৎ লাভের যোগ্য হতে পারবো। ইনশাআল্লাহ।
__________________________________________

ইমামে জামানা (আ:)-এর পছন্দের রোজা

রোজা ইসলামের এক মহান ইবাদত, কিন্তু ইমামে জামানা (আ.)–এর দৃষ্টিতে রোজার প্রকৃত মূল্য কেবল বাহ্যিক সংযমে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন রোজা পছন্দ করেন, যা মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করে, চরিত্রকে শুদ্ধ করে এবং সমাজকে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা রোজার সূচনা; কিন্তু এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ।

 প্রথমত, ইমাম এমন তাকওয়াভিত্তিক রোজা পছন্দ করেন, যেখানে মানুষ শুধু খাদ্য থেকে বিরত থাকে না, বরং গুনাহ থেকেও নিজেকে রক্ষা করে। চোখ যেন হারাম দৃশ্য থেকে সরে আসে, কান যেন অপবাদ ও অশ্লীলতা না শোনে, জিহ্বা যেন মিথ্যা, গীবত ও কটু বাক্য থেকে সংযত থাকে। কারণ বাহ্যিকভাবে রোজা রেখে যদি অন্তর পাপে আচ্ছন্ন থাকে, তবে সে রোজা আধ্যাত্মিক পূর্ণতা লাভ করে না। ইমামের পছন্দের রোজা হলো এমন, যা হৃদয়কে বিনয়ী ও পরিশুদ্ধ করে তোলে।

 দ্বিতীয়ত, তিনি পছন্দ করেন সচেতন ও আন্তরিক রোজা। অনেক সময় রোজা আমাদের কাছে অভ্যাসে পরিণত হয়; কিন্তু ইমামের দৃষ্টিতে রোজা হলো সচেতন ইবাদত। সাহরির নীরবতায় আত্মসমালোচনা, ইফতারের মুহূর্তে কৃতজ্ঞতা, মাগরিবের সিজদায় অশ্রু—এসবই রোজাকে জীবন্ত করে তোলে। যখন বান্দা উপলব্ধি করে যে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সংযম পালন করছে, তখন সেই রোজা ইমামের নিকট প্রিয় হয়ে ওঠে।

 তৃতীয়ত, ইমামে জামানা (আ.)–এর পছন্দের রোজা হলো সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন রোজা। রোজা আমাদের ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করায়, যাতে আমরা দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হই। যদি রোজা রাখার পরও আমাদের হৃদয় কঠোর থাকে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা নীরব থাকি, তবে সেই রোজার উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়। ইমামের আদর্শ ন্যায় ও মানবতার উপর প্রতিষ্ঠিত; তাই তিনি এমন রোজা পছন্দ করেন, যা মানুষকে ন্যায়পরায়ণ ও সহানুভূতিশীল করে তোলে।

 চতুর্থত, তিনি পছন্দ করেন অপেক্ষা ও প্রস্তুতির রোজা। ইমামে জামানা (আ.)–এর অপেক্ষা শুধুই সময় গোনা নয়; বরং এটি আত্মগঠন ও চরিত্র নির্মাণের এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যে রোজা মানুষকে ধৈর্য শেখায়, আত্মসংযমে দৃঢ় করে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রেরণা দেয়—সেই রোজাই তাঁর সন্তুষ্টির উপযুক্ত। প্রতিটি সিজদা, প্রতিটি তাওবা এবং প্রতিটি সৎকর্ম যেন তাঁর আগমনের প্রস্তুতি হয়ে ওঠে।

 পঞ্চমত, ইমাম এমন নিরব অহংকারহীন রোজা পছন্দ করেন, যেখানে মানুষ নিজের ইবাদত নিয়ে গর্ব করে না। প্রকৃত রোজাদার জানে—তার সব আমল আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভরশীল। তাই বিনয়, কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিকতা রোজার অলংকার।

অতএব, ইমামে জামানা (আ.)–এর পছন্দের রোজা হলো এমন রোজা, যা দেহকে সংযত করে, আত্মাকে আলোকিত করে এবং সমাজকে ন্যায় ও মানবতার পথে এগিয়ে নেয়। এটি কেবল একটি মাসের অনুশীলন নয়; বরং সারাজীবনের চরিত্র গঠনের শিক্ষা। যখন আমাদের রোজা আমাদেরকে সত্যবাদী, সহানুভূতিশীল, ন্যায়পরায়ণ ও আল্লাহভীরু বানায়—তখনই সেই রোজা ইমামের নিকট প্রিয় হয়ে ওঠে। রোমজান তখন হয়ে ওঠে কেবল সিয়ামের মাস নয়, বরং ইমামের সন্তুষ্টি লাভের এক পবিত্র সেতু—যা আমাদের অন্তরকে তাঁর আদর্শের আলোয় উদ্ভাসিত করে। হে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, আমাদের সকলকেই সেই তাকওয়াভিত্তিক রোজা করার তৌফিক দান করুন। আমিন... ছুম্মা আমিন।

__________________________________________

ইমাম মাহদী আঃ এর অন্তর্ধানে আমাদের ফায়দা বা লাভ (সংগৃহীত)
        ✍️ রাজা আলী

বর্তমানে আমাদের ইমাম (আঃ) অদৃশ্য আছেন। এর অর্থ এই নয় যে, ইমাম (আঃ) সমস্ত দুনিয়া থেকে অন্যত্র কোথাও জীবন-যাপন করছেন। গায়বাত বা অদৃশ্যের অর্থ হল, এখন ইমাম (আঃ) কোথায় আছেন মানুষ সেটা জানে না। বর্তমানে কেউ ইমাম (আঃ) কে যদি দেখেও থাকে,
তবে চিনতে পারে না। ইমাম জাফর ছাদিক (আঃ) বলেছেন যে, মানুষ ইমাম (আঃ)-কে দেখতে পায়; কিন্তু চিনতে পারে না। [সূত্রঃ মুনতাখাবুল আছর]।

    অপর দিকে ইমাম (আঃ) মানুষদের দেখতেও পান চিনতেও পারেন। ইমাম (আঃ) নিজে বলেছেন, 'তোমাদের কোনো কর্ম বা খবর আমার অজানা নেই, সবটাই আমি জানি। আমি তোমাদের হেফাজাত বা রক্ষার জন্য চেষ্টা কম করিনা বা তোমাদের স্মরণ থেকে গাফিল নই। যদি তাই না হত, তবে তোমাদের উপর বালা-মছিবত নাজিল হত এবং শত্রুরা তোমাদের নিঃশেষ করে দিত' ( সূত্রঃ বেহারুল আনওয়ার, খন্ড-৫৩, অধ্যায় ২) ।

অতএব এর থেকে প্রমাণ হয়, ইমাম (আঃ)-এর দৃষ্টি মানুষদের উপর আছে ও ইমাম (আঃ) সর্বদা আমাদের খবর নিতে থাকেন।

      এই সময় বা এখন আমরা ইমাম (আঃ)-এর জন্য এমন ভাবে উপকৃত হয়ে থাকি, যেমন মেঘের আড়ালে সূর্য আমাদের উপকার করে। আমরা আমাদের সমস্ত সমস্যা ইমাম (আঃ)-এর সঙ্গে বলতে পারি। প্রতি পদে ইমাম (আঃ)-এর কাছে ফরিয়াদ করতে পারি। একবার তো আমরা ইমাম (আঃ)এর কাছে ফরিয়াদ করে দেখি, কী ভাবে তিনি আমাদের সাহায্য করেন। বিভিন্ন পুস্তকে হাজারো এমন ঘটনা আছে-যার থেকে আমরা ইমাম (আঃ)-এর সাহায্য করা প্রসঙ্গে জানতে পারি।

        বর্তমান সময়ে ইমাম আঃ তার মান্যকারী ও অনুসারী দের যে সাহায্য করছেন,তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। ধরুন, চলমান আমেরিকা ইসরাইল এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ। বিশ্বের সেরা শক্তি গুলো একত্রিত হওয়ার পরেও ইরান নিজের সম্মান সম্পর্কে সচেতন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করছে---যা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমেরিকার অহংকার ইমাম আঃ এর সাহায্যেই ইরান ভেঙে দিচ্ছে। সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ গায়বতে থাকলেও আমাদের কল্যাণের জন্য ই কাজ করছেন।

------ _____------_____------______------______------
------ _____------_____------______------______------


📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
বরকত ও বেদনা
মোন্তাজির 

আল্লাহর শ্রেষ্ঠ মাস
রমজান মোবারক,
এই মাসেতে নাজিল হয়
রহমত আর বরকত।

রমজানের শ্রেষ্ঠ রাত
লাইলাতুল কদর,
দোয়ার অপেক্ষায় থাকেন
ওয়ালিয়ে আসর।

একুশে রমজান এলো
শোকের বারতা,
মাওলা আলী সেজদাতে
পেলেন আঘাতটা।

ইফতারের সে ক্ষণে
আমায় ভুলো না,
কেঁদে কেঁদে দোয়া করে
ইমামে জামানা।

পানি যখন পান করো
রেখো আমার পিপাসা,
তৃষ্ণা কত কঠিন ছিল
দেখিয়েছে দিনের বাদশা।

__________________________________________


    বীর খামনেয়ী

ছিয়াশি বছর বয়সেও যিনি ছিলেন বীর এক যোদ্ধা, 
হৃদয়ে যাঁর জিন্দা ছিল নূরানী আর ঈমানী জজবা। 
শহীদি তামান্না বুকে নিয়ে যিনি পথ চলেছেন চিরকাল, 
জ্ঞানের সাগরে ডুব দিয়ে যিনি গড়েছেন প্রজ্ঞার ঢাল।

পরহেজগারিতে অনন্য তিনি, আধ্যাত্মিকতায় বীর, 
জালিমের কাছে নত করেননি কখনও মহিমান্বিত শির। 
আমেরিকা আর ইজরায়েলের দম্ভকে চূর্ণ করে, 
অটল অবিচল হয়ে দাঁড়িয়েছেন— একলা আপন ঘরে।

নিঃসঙ্গ ইরান, চারপাশে সব শয়তানি চক্রান্ত, 
তবুও হারাননি সাহস তিনি, হননি কভু ক্লান্ত। 
সাম্রাজ্যবাদী হায়েনা রুখতে একাই তিনি তুফান, 
মযলুমের তরে বিলিয়ে দিলেন আপন প্রাণ।

হায়দারী তেজে দীপ্ত কণ্ঠ, অন্তরে খোদা-ভীতি, 
সত্যের তরে লড়ে যাওয়াই ছিল যাঁর আজব রীতি। 
বিপ্লবী এক রুহ্ হয়ে আজ অমর মহানায়ক, 
ইতিহাসে লেখা থাকবে— তিনি হলেন সত্যের ধারক ও বাহক।

__________________________________________

    খামিনি
    ✍️ রাজা আলী 

তুমি অটল পর্বতের মতো 
বেড় দিয়েছো একটি অক্ষ 
চেতনায় শান দিয়েছো বেশ
ভয়ে আছে আজ শত্রু পক্ষ।

তোমার নামেতেই ওদের ভয়
বিরাট এক মৃত্যু সম্মুখে দেখে 
সূর্যের মতো দীপ্তিমান তুমি 
শত্রু রা অনুকম্পা য় কাঁপে।

তুমি একজন ধর্মীয় নেতা
ইসলাম ই তোমার অনুসৃত
তুমি তো ইমামের সৈনিক এক 
বাকি তিন'শ বারো থাকলে কি হত?

তোমার দিকনির্দেশনা প্রবল বিজ্ঞ 
এক একটি বাক্যেই উজ্জীবন 
সহস্র সেনা তৈরি মৃত্যুর মুখে
 মৃত্যু অবধি ভঙ্গ দেবে না রণ।

__________________________________________

   রমযান ও ইমামে জামানা (আ.)

রোমজানের চাঁদ ওঠে নীল আকাশের কোণে,
হৃদয় কাঁদে আজ ইমামেরই স্মরণে।
সাহরির নীরবতায় অশ্রু ঝরে চুপে,
ডাকি হে মাওলা, এসো হৃদয়ের রূপে।

রোজার ক্ষুধা শুধু দেহের তরে নয়,
তোমার বিরহে প্রাণ পুড়ে ক্ষয়।
ইফতারের আগে তুলে ধরি হাত,
বলি—আর কত থাকবে এই রাত?

লাইলাতুল কদরের পবিত্র সে ক্ষণ,
তোমার জহুর ছাড়া অপূর্ণ জীবন।
সিজদায় সিজদায় করি মিনতি,
দাও হে ইমাম, হৃদয়ে পবিত্র গতি।

পৃথিবী জুড়ে অন্যায় আর হাহাকার,
তোমার আগমনে হবে শান্তির দ্বার।
রোমজান শেখায় তাওবা আর ধৈর্য,
শেখায় ইমামের পথে সত্যের ঐক্য।

হে ইমামে জামানা (আ.), শোনো প্রাণের গান,
তোমার অপেক্ষায় কাটে প্রতিক্ষণ।
এই মাস হোক জহুরের দোয়া,
রোমজান হোক তোমার আগমনের ছোঁয়া।
------ _____------_____------______------______------

Tuesday, February 3, 2026

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ) || সাবান সংখ্যা ||



আরবি: সা'বান, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 

সহযোগী সম্পাদকরাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


সম্পাদকীয়

ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আসহাব (অনুবাদ)

কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইমামে যামানা (আঃ)

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব: একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস

ইমাম মাহদী (আ.) — বৈশ্বিক নিরাপত্তার একমাত্র পথ

ইমামের সঙ্গে না–বলা কথাগুলো

মারেফাত (জ্ঞান বা প্রজ্ঞা):ইমাম মাহদী (আঃ) 
          ✍️ রাজা আলী 

 




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

         জহুরের ডাক
                ✍️আব্দুল আলী

         অপেক্ষা
                ✍️ রাজা আলী 

         গায়েবের চাঁদ


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আল হুজ্জাত মাসিক পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ আজ এক বছর পূর্ণ হল। গত বছর পবিত্র শাবান মাসে যে সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন ও নিয়ত নিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা পাঠকসমাজের ভালোবাসা ও দোয়ার বরকতে একটি আলোকিত পথে রূপ নিয়েছে। এই এক বছর ছিল আমাদের জন্য পরীক্ষা, শিক্ষা ও কৃতজ্ঞতার এক অনন্য সময়।
শাবান মাস এমন এক পবিত্র সময়, যা আমাদের হৃদয়কে ইমামে যামানা (আ.)–এর অপেক্ষায় আরও সংবেদনশীল করে তোলে। এই মাস আমাদের শেখায় আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার অর্থ। আল হুজ্জাত অনলাইন সংস্করণ সেই চেতনাকেই ধারণ করে—আহলে বাইত (আ.)–এর আদর্শ, ন্যায় ও মানবিকতার বাণী সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিক প্রয়াস হিসেবে।
এই এক বছরে যাঁরা লেখালেখি, পরামর্শ, দোয়া ও উৎসাহ দিয়ে আমাদের পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতি রইল গভীর কৃতজ্ঞতা। আমরা বিশ্বাস করি, কলমের আলো দিয়েও হৃদয়ের অন্ধকার দূর করা সম্ভব—যদি নিয়ত হয় খাঁটি এবং পথ হয় ইমামের পথ।
এই শাবান সংখ্যায় দাঁড়িয়ে আমরা আবারও অঙ্গীকার করছি—ইমামে যামানা (আ.)–এর আগমণের অপেক্ষায় নিজেদের শুদ্ধ করা, সমাজকে সচেতন করা এবং সত্যের পক্ষে কলম চালিয়ে যাওয়ার। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের এই প্রচেষ্টা কবুল করেন এবং আমাদেরকে তাঁর হুজ্জাতের প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।

                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖



ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আসহাব (অনুবাদ)

"খুব শীঘ্র আল্লাহ্ এমন মানুষদেরকে আবির্ভূত করবে ; যাদেরকে আল্লাহ্ ভালোবাসে। আর তারা ভালোবাসে ঈমানদারদের। আর কাফিরদের বিরোধীতা করবে, আল্লাহর পথে জেহাদ করবে। আর কোনো সমালোচনার কারীর সমালোচনার মূল্য দেবে না" (অনুবাদ)।

      প্রথম দিকে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহায্যকারীদের সংখ্যা বদর যুদ্ধের সেনাদের মতো নগণ্য হলেও ক্রমাগত তা দশ হাজারে পরিণত হবে। ইমাম মাহদী (আঃ) -এর এই সাহাবীদের এমন উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হয়েছে যে, আম্বিয়াগণ ও আউলিয়াগণও এই সম্মান প্রত্যাশা করতো। ইতিপূর্বে আমি উল্লেখ করেছি যে, ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহায্যকারী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। তিনি বলতেন--

"যদি আমি ইমাম মাহদীর যুগকে পেতাম, তাহলে সমস্ত    জীবন আমি তাঁর সাহায্যার্থে অতিবাহিত করতাম" ( অনুবাদ)।

তাই আমাদের পাঠ করা দোয়াগুলিতে আমরা প্রতি নিয়ত আল্লাহ্ নিকট উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানীয় স্থানের আকাঙ্ক্ষা করে থাকি। বিভিন্ন রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে ইমাম মাযদী (আঃ)-এর সাহাবীদের কিছু গুণাবলী নিম্নে তুলে ধরা হ'ল:—

ক। এবাদাত ও পরহেজগারীতাঃ-
ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহাবীরা প্রবল এবাদাতকারী ও পরহেজগার হবে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ “তারা রাতে জেগে জেগে খোদার এবাদাত করবে। নামাজের সময় তাদের আওয়াজ মৌমাছির বিন বিন আওয়াজের ন্যায় হবে। তাদের কপালে সেজদার চিহ্ন থাকবে। আর দিনে তারা বাঘের ন্যায় হবে ” (অনুুুুবাদ)।

খ। শক্তি ও অনুুুুুসন্ধানঃ-
আমীরুল মোমেনীন (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ
মাহ্দীর সৈন্য-সাহাবারা যুবক আছে, তাদের
মাঝে কেউ বুড়ো নেই ”
প্রকৃত প্রস্তাবে যুবক হওয়া, শক্তি শালী হওয়া, শত্রুদের অনুুুুুুসন্ধান  করা , তাদের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়ান ইত্যাদি হ'ল প্রকৃত সৈন্যদের বৈশিষ্ট্য। আর ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সৈন্যদের এমন সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে, যে কাজগুলোতে সফলতা অর্জন করা শক্তি-সাহস ও বাহাদুরিতা ছাড়া কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ“তাদের মধ্যে প্রত্যেকে ৪০ জন ব্যক্তির ন্যায় শক্তি শালী হবে। আর তাদের অন্তর লৌহ খণ্ডের মতো হবে। যদি তারা লোহার পাহাড়ের ওপর দিয়েও যায়, তবে তা খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে। আর তারা লোহার তলোয়ারকে ঐ সময় পর্যন্ত নেয়ামবন্দী (তলোয়ার রাখার খাপ) করবে না, যতক্ষণ না খোদা সন্তুষ্ট হবে” (অনুবাদ)।

অপর একটি রেওয়ায়েতে ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেছেনঃ “যদি তাদের উপর কোনো শহরকে ধ্বংস করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে তারা ঐ সময় পর্যন্ত শান্ত হবে না, যতক্ষণ না শহরটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হবে” (অনুবাদ)।

গ। ঈমান:-
ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহাবীগণ একই সাথে পরিপূর্ণ ঈমানদার এবং জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান হবে। তাদের হৃদয়ে আল্লাহর মারেফাত থাকবে, আর কোনো প্রকার সন্দেহ থাকবে না। তারা নিজেদের মারেফাতের রাস্তা অন্য
কোনো পথে নয়; সর্বদা কোরআন ও মা’সুমীন (আঃ)-দের হাদীস থেকে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করবে। ইসলামের মধ্যে তাদের স্থান ফকীহগণের মধ্যে গণ্য করা হবে। আর জ্ঞানের বিষয়ে তারা ঐ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসাবে পরিগণিত হবে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)বলেছেনঃ
ঐ মোমেনীন, যাদের মাঝে আল্লাহ্ মাহদীকে পাঠাবে ; তারা নির্ধারিত হবে, শাসক ও বিচারক
হওয়া একমাত্র তাদেরই মানাবে । আর দ্বীনে ইসলামে তারা ফক্বীহগণদের মধ্যে গণ্য হবে” (অনুবাদ)

ঘ। মহব্বত ও অনুসরণকারীঃ
ইমাম মাহদী (আঃ)-এর প্রতি তাঁর সাহাবীদের সীমাহীন মহব্বত থাকবে । তাঁদের অন্তর শুধুমাত্র ইমাম মাহদী (আঃ)-এর মহব্বতে পরিপূর্ণ হবে । তাই প্রত্যেক কাজ তারা ইমাম মাযদী (আঃ)-এর আদেশ মতোই করবে । সর্বদা তারা ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সামনে মাথা নত করে থাকবে । কোনো প্রকার মূল্যতে তারা ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গ ছাড়বে না । ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তার উচিত প্রতীক্ষা করা ,পরহেজগার হওয়া, মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার করা । তার চরিত্র ও ব্যবহার এমন হবে যাতে এটা বোঝা যায় যে, সে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর অপেক্ষায় আছে” (অনুবাদ)।

বর্তমান অধ্যায়টি আমি ইমাম রিয়া (আঃ)-এর দোয়া দিয়ে সমাপ্ত করছিঃ
হে আল্লাহ্ ! আমাদের ঐ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তুর্ভূক্ত
কর, যাদের মাধ্যমে তোমার দ্বীনের মদত হয় ; আর এই মদতের মাধ্যমে তুমি যাকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছো। আর আমাদের স্থানে আমাদের পরিবর্তে অপর কাউকে যেন স্থান দিওনা” (অনুবাদ)।
_________________________________________

কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইমামে যামানা (আঃ)


"যে ব্যক্তি তার জামানার ইমামকে না চিনে মৃত্যু বরণ করে সে জাহিলিয়্যাতের মৃত্যুবরণ করে।" (মশহুর হাদীস)

এই হাদীসটির মতো আরো কয়েকটি হাদীস আছে। যেমন: "যে ব্যক্তি মারা যায় অথচ তার গলায় বাইয়াতের রশি থাকে না সে কুস্ত্রীর মৃত্যুবরণ করে" (সহীহ্ মুসলিম,তাফসীর ইবনে কাসীর)

"যে ব্যক্তি ইমাম ছাড়া মৃত্যুবরণ করে সে কুস্ত্রীর মৃত্যুবরণ করে।" (মুসনাদে আহমাদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-৯৬)

এই তিনটি হাদীস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বাইয়াত ও অনুসরণ ছাড়া মারিফাত তথা পরিচয় অর্জন সম্ভব নয়। আর এ কারণে আহলে কিতাব (ইহুদী ও খৃষ্টান) নবী (সাঃ) কে ভালোভাবে চিনলেও তাঁর অনুসরণ করতো না বলে তাদের এ চেনার কোনো মূল্য ছিলো না। মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: "যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা তাঁকে (নবী সাঃ) চেনে সেভাবে, যেভাবে তারা তাদের সন্তানকে চেনে।" (বাকারাহ: ১৪৬, আনআম: ২০)

কারণ, তাওরাত ও ইঞ্জিলে নবী (সাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিলো।যার কারণে তারা নবী (সাঃ)-এর আগমনের জন্য অপেক্ষাও করতো।

কিন্তু কুরআন কি বলেছে যে, সব জামানায় একজন ইমাম থাকা জরুরী? অবশ্যই। মহান আল্লাহ কিয়ামত সম্পর্কে বলেছেন "সেদিন আমরা প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামসহ ডাকবো।" (বনি ইসরাইল: ৭১)

এজন্যই সকল জামানায় একজন 'সত্য ইমাম' থাকা এবং তাঁর আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক। এই আনুগত্যের কারণে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামের সাথে ডাকা হবে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, তাহলে কি 'মিথ্যা ইমাম'ও হতে পারে? অবশ্যই। প্রত্যেক ব্যক্তি, যে এমন দীনের অনুসরণ করে যার অনুসরণের অনুমতি আল্লাহ তাকে দেননি;সে ব্যক্তি মিথ্যা ইমাম-এর অনুসারী এবং কিয়ামতের দিন তাকে উক্ত ইমামের সাথেই ডাকা হবে এবং তার সাথেই তাকে জাহান্নামে পাঠানো হবে। যেমন ফেরাউন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন- 'সে কিয়ামাতের দিন তার সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে এবং তাদেরকে নিয়ে সে আগুনে প্রবেশ করবে।' (হুদ: ৯৮)

প্রশ্ন হতে পারে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো মানুষের আনুগত্য করা কী জায়েজ? আনুগত্য পাওয়া শুধু আল্লাহরই অধিকার, যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের রিযিক দিয়েছেন এবং সকল প্রকার নেয়ামত প্রদান করেছেন। আর এজন্য মহান আল্লাহ আমাদেরকে যদি কোনো ব্যক্তির আনুগত্য করার আদেশ দেন,তাহলে তাঁর আনুগত্য করা আমাদের জন্য ওয়াজিব। ইরশাদ হচ্ছে- "আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর (কর্তৃত্বের অধিকারী) তাদের।" (নিসা: ৫৯) 
তিনি আরো বলেছেন: "রাসুলকে এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছি যে আল্লাহর অনুমতিতে তাঁর আনুগত্য করা হবে।" (নিসা: ৬৪রাসুলুল্লাহ্ (সা:)-এর আনুগত্য ওয়াজিব। একারণে যে আল্লাহ এব্যাপারে অনুমতি ও আদেশ দিয়েছেন।

এখন বুঝতে হবে আয়াতে উল্লেখিত 'কর্তৃত্বের অধিকারী' (উলিল আমর) কারা যাদের আনুগত্য আল্লাহ ওয়াজিব করেছেন?

যখন এই আয়াত নাযিল হয় তখন নবী (সাঃ)-কে 'উলিল আমর' বা 'কর্তৃত্বের অধিকারী' কাদেরকে বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তখন তিনি (সাঃ) বলেন, "উলিল আমর হচ্ছে আলী (আঃ) এবং ঐ ইমামগণ যারা তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে হবে" (ফারায়িদুস সামতাঈন)।

ফখরুদ্দীন রাযী তার 'তাফসীর-ই কাবীর' গ্রন্থে এই আয়াত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সকল জামানায় 'উলিল আমর' থাকা অত্যাবশ্যক। এ কারণে আয়াতে যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে,তাঁরা ঐ সকল লোক যারা সুদীর্ঘকাল ধরে ঈমান আনতে থাকবে। আর এ থেকে উলিল আমরের 'নিষ্পাপ' হওয়ার কথাটিও প্রমাণিত হয়ে যায়। কারণ এখানে তাঁদের আনুগত্যকে নবী (সাঃ)-এর আনুগত্যের সমান বলা হয়েছে। (তাফসীরে কাবীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা-৩৫৭)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "আমার পরে ১২ জন আমীর হবেন, তাঁদের প্রত্যেকেই কুরাইশ থেকে।" (বোখারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নং-৬৭৯৬)

তিনি (সাঃ) আরও বলেছেন: "আমার পরে ১২ জন ইমাম হবেন, তাঁদের প্রত্যেকেই বনি হাশেম থেকে।" (ইয়ানাবিয়্যুল মুয়াদ্দাত, পৃষ্ঠা-৪৪৫, ইস্তাবুল)

ইবনে আরাবী স্বীয় কিতাব 'ইবক্বাউল ক্বাইয়্যিম'-এর ২৬৬ নং অধ্যায়ে লিখেছেন, "তোমরা নিঃসন্দেহে জেনে নাও মাহদী (আঃ) আত্মপ্রকাশ করবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর বংশধর এবং ফাতেমা (আঃ)-এর সন্তান হবেন। তাঁর পূর্বপুরুষ হুসাইন বিন আলী ইবনে আবিতালিব (আঃ)। তাঁর পিতা আল হাসান আল আসকারী, ইবনুল ইমাম আলী নাক্বী ইবনুল ইমাম মুহাম্মাদ তাক্বী ইবনুল ইমাম আলী রেযা ইবনুল ইমাম আল কাযিম ইবনুল ইমাম আস সাদিক, ইবনুল ইমাম আল বাক্কির ইবনুল ইমাম যায়নুল আবেদীন আলী ইবনুল ইমাম আল হোসাইন, ইবনুল ইমাম আলী ইবনে আবিতালিব (আঃ)। তাঁর নাম রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামে হবে। মুসলমানরা তাঁর হাতে বাইয়াত হবে রুক্ত ও মাকামের মাঝখানে...।

ইমাম মাহদী (আঃ) ইমাম হাসান আল আসকারী (আঃ)-এর সন্তান। তিনি ২৫৫ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর থেকে তাঁর পিতা তাঁকে শত্রুর ভয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখে ছিলেন। ২৬০ হিজরীতে শত্রুরা তাঁর পিতাকে গ্রেফতার করে হত্যা করে। এসময় আল্লাহ ইমাম মাহদী (আঃ)-কে রক্ষা করার জন্য তাঁকে অদৃশ্য করে ফেলেন। তিনি ২৬০ হিজরী থেকে ৩২৯ হিজরী পর্যন্ত স্বল্পকালীন অন্তর্ধানে ছিলেন। এই সময় তিনি একাদিক্রমে ৪ জন বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। অতঃপর ৩২৯ হিজরী থেকে এখনো পর্যন্ত তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় দীর্ঘ মেয়াদী অন্তর্ধানে বিরাজ করছেন। যখন আল্লাহর আদেশ হবে তখন তিনি মানবজাতিকে উদ্ধারের জন্য আবির্ভূত হবেন।

তাঁর এ দীর্ঘ জীবন কোনো আশ্চর্যজনক ও নতুন বিষয় নয়। বিশ্বাসীদের মধ্যে হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত খিজির (আঃ) এবং ইলিয়াস (আঃ) এবং ঈসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন লাভ করেছেন। আর অবিশ্বাসীদের মধ্যে ইবলিস (শয়তান) আর দাজ্জাল দীর্ঘ জীবন লাভ করেছে।

এ ধরনের হাদীস যাহাবী তাঁর 'সিআরু আলামুন নুবালা', খন্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৪১, শিবলাঞ্জী তাঁর 'নুরুল আবসার', পৃষ্ঠা ১৮৬ এবং সিত্ত ইবনে জওযী তাঁর 'তাক্বীরাতুল খাওয়াস' গ্রন্থের পৃষ্ঠা ৩৬৩ তে উল্লেখ করেছেন।

শিবলাঞ্জী ও ইবনে সাব্বাঘ মালিকী বলেছেন: "যখন মাহদী (আঃ) আত্মপ্রকাশ করবেন তখন তিনি কাবাগৃহে স্বীয় পিঠ ঠেকিয়ে অবস্থান নিবেন, আর তাঁর ৩১৩ জন পুরুষ তাঁকে আনুগত্য করবেন। সর্বপ্রথম তিনি এই আয়াতটি পাঠ করবেন: 'বাক্বিয়াতুল্লাহি খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম মুমিনীন' (হুদ: ৮৬) এবং বলবেন, 'আমিই বাক্বিয়াতুল্লাহ, আল্লাহর খলিফা এবং তোমাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কর্তৃত্বকারী।' যে কেউ তাকে সালাম করবে বলবে 'আসসালামু আলাইকা ইয়া বাক্বীয়াতুল্লাহি ফীল আরদ।' (নুরুল আবছার, পৃষ্ঠা ১৭২, আল-ফুসুলিল মুহিম্মা, অধ্যায় ১২)

ইমাম মাহদী (আঃ) অতঃপর তাঁর ৩১৩ জন বিশ্বস্ত সেনাপতি ও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তাঁর সাহায্যকারীদের দ্বারা এই পৃথিবীকে অন্যায় অত্যাচার থেকে মুক্ত করে পবিত্র করে দিবেন। এ সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) বলেছেন: 'মাহদী আমার আহলে বাইত থেকে হবে এবং পৃথিবীকে সেরূপে ন্যায় ও সাম্যে পূর্ণ করে দিবে যেরূপে অন্যায় ও অত্যাচারে তা পূর্ণ হয়ে পড়বে। (মুসনাদে আহমাদ, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩২৭)

ইমাম মাহদী (আঃ) এর আগমনের আলামত সম্পর্কে যে হাদীসগুলো রয়েছে তা পাঠ করার পর বুঝা যায় যে তাঁর আগমন অত্যাসন্ন। যেমন রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, "একদল লোক পূর্ব দিক থেকে বের হবে যারা তাঁর আগমনকে লক্ষ্য রেখে সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করবে।" (সুনানে ইবনে মাযা, খন্ড-২, হাদীস নং-৪০৮৮)

বর্তমান কালেও এর দুটো আলামত দেখা যাচ্ছে: ১. তাঁকে যারা বিশ্বাস করে এবং সাহায্য করতে চায় তাঁরা তাঁর আগমন ত্বরান্বিত হবার জন্য প্রতিদিন দোয়া করছে। 
২. তাঁকে সাহায্য করবে এমন এক সৈন্যবাহিনীও মধ্যপ্রাচ্যে তৈরী হচ্ছে।

এভাবে আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ হুজ্জাতের মাধ্যমে সকল দীনের ওপর তাঁর নিজের দীনকে বিজয়ী করবেন "তিনিই তাঁর রাসুলকে পথ-নির্দেশ ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন যেন তাকে সকল দীনের ওপর বিজয়ী করতে পারেন, মুশরিকরা তা যতই অপ্রীতিকর মনে করুক।" (তওবা: ৩৩)


_________________________________________

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব: একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস

শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে আপামর মুসলিম উম্মাহ ঐক্যমত্য পোষণ করে যে, মহানবী (সা.) এর বংশধারার সর্বশেষ ইমাম হচ্ছেন ইমাম মুহাম্মদ আল মাহদী (আ.), যিনি শেষ যামানায় আবির্ভূত হয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামী হুকুমত এবং ন্যায়বিচার কায়েম করবেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে অন্যায়-অত্যাচার ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন।

শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে আপামর মুসলিম উম্মাহ ঐক্যমত্য পোষণ করে যে, মহানবী (সা.) এর বংশধারার সর্বশেষ ইমাম হচ্ছেন ইমাম মুহাম্মদ আল মাহদী (আ.), যিনি শেষ যামানায় আবির্ভূত হয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামী হুকুমত এবং ন্যায়বিচার কায়েম করবেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে অন্যায়-অত্যাচার ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। তার আগমন অবশ্যম্ভাবী এবং এতে কোন সন্দেহ নেই। তার আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য শিয়া-সুন্নী হাদীস গ্রন্থসমূহে মহানবী (সা.) থেকে এতদপ্রসঙ্গে বর্নিত হয়েছে :
لو لم يبق من الدنیا إلا یوم لبعث الله رجلا مناّ یملأ¬ها  عدلا کما ملئت جورا

দুনিয়া ধ্বংস হতে মাত্র একদিনও যদি অবশিষ্ট থাকে তাহলে মহান আল্লাহ (ঐ একদিনের মধ্যেই) আমাদের (আহলে বাইতের) মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে অবশ্যই প্রেরণ করবেন যে এ পৃথিবী যেভাবে অন্যায়-অবিচারে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে ঠিক সেভাবে ন্যায় ও সুবিচার দিয়ে তা পূর্ণ করে দেবে।” (মুসনাদ-ই আহমদ ইবনে হাম্বল, ১ম খণ্ড, পৃ.৯৯, বৈরুত, দারুল ফিকর কর্তৃক প্রকাশিত)

মহানবী (সা.) হুযাইফা বিন ইয়ামানকে বলেন :
یا حذیفة لو لم يبق من الدنيا الا يوم لطول الله ذلک اليوم حتي يملک رجل من اهل بيتي، تجري الملاحم علي يديه و يظهر الاسلام لا يخلف وعده و هو سریع الحساب

হে হুযাইফা! এ পৃথিবী ধ্বংস হতে মাত্র একদিনও যদি অবশিষ্ট থাকে তাহলে মহান আল্লাহ ঐ দিনকে এত বেশী দীর্ঘ করবেন যাতে আমার আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত এক ব্যক্তি (বিশ্বের) শাসন কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে সক্ষম হয় যার হাতে বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং ইসলাম ধর্ম বিজয়ী হবে । মহান আল্লাহ স্বীয় ওয়াদা ভঙ্গ করেন না এবং তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।” (ইকদুদ দুরার, আবু নাঈম ইস্ফাহানী প্রণীত সিফাতুল মাহদী)

মহানবী (সা.) বলেছেন :
لا تذهب الدّنیا حتی یملک العرب رجل من اهل بیتی یواطئ اسمه اسمی

আমার আহলে বাইতের অন্তর্ভূক্ত এক ব্যক্তি-যার নাম হবে আমার নামের অনুরূপ, সে যে পর্যন্ত সমগ্র আরবের অধিপতি না হবে, সে পর্যন্ত এ দুনিয়া ধ্বংস হবে না।” (সুনান আত তিরমিযী, বৈরুত, দার ইহয়াইত তুরাস আল আরাবী, কিতাবুল ফিতান, ৫২তম বা মাহদী সংক্রান্ত অধ্যায়, পৃ ৬১১, হাদীস নং ২২৩০)

উপরিউক্ত এ সব সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, শেষ যামানায় কিয়ামতের পূর্বে ইমাম মাহদী (আ.)এর আগমন একটি অকাট্য বিষয় যা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। আহলে সুন্নাতের প্রসিদ্ধ হাদীস বিশারদগণ ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত অগণিত হাদীস ও রেওয়ায়েত অনেক সাহাবী ও তাবেয়ীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যা তাদের বড় বড় প্রামাণ্য ও প্রসিদ্ধ হাদীস ও ইতিহাসের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

গবেষক পণ্ডিত ও আলেমদের মতে, আহলে সুন্নাতের মুহাদ্দিসগণ মহানবী (সা.) এর তেত্রিশ জন সাহাবী থেকে ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত হাদীস নিজ নিজ হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন; একশ’ ছয় জন প্রসিদ্ধ সুন্নী আলেম গায়েব ইমাম মাহদীর আবির্ভাব সংক্রান্ত হাদীস নিজ নিজ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। বত্রিশ জন প্রসিদ্ধ সুন্নী আলেম ইমাম মাহদী (আ.) প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন।

ইমাম মাহদী (আ.), তার গুণাবলী এবং তার আবির্ভাবের নিদর্শন সংক্রান্ত ,মহানবী (সা.) এর হাদীসসমূহ আহলে সুন্নাতের প্রাচীন প্রামান্য ও নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থসমূহে এত অধিক পরিমাণে বিদ্যমান যে আহলে সুন্নাতের বড় বড় হাদীসশাস্ত্রবিদ ও হাফেয ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে মুতাওয়াতির অর্থাৎ অকাট্যসূত্রে প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত বলে মত প্রকাশ করেছেন।

আল্লামা শাওকানী, হাফেয আবু আবদিল্লাহ গাঞ্জী শাফেয়ী, হাদীসের প্রসিদ্ধ হাফেয ইবনে হাজার আল আসকালানী আশ শাফেয়ী, শেখ মানসূর আলী নাসিফ প্রমূখের মতো বিখ্যাত আলেম ইমাম মাহদী সংক্রান্ত হাদীসসমূহে মুতাওয়াতির বলে নিজ নিজ গ্রন্থে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

আল্লামা শাওকানী التوضیح فی تواتر ما جاء فی المنتظر অর্থাৎ প্রতীক্ষিত (ইমাম মাহদী) সংক্রান্ত হাদীস ও রেওয়ায়েতসমূহ মুতাওয়াতির হওয়ার ব্যাপারে ব্যাখ্যা’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি বলেছেন : “ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত যে সব হাদীস ও রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছি সেগুলোর সবই ‘তাওয়াতুর’ অর্থাৎ বহুল ও অকাট্যসূত্রে বর্ণিত হওয়ার পর্যায়ে উত্তীর্ণ । আর এ বিষয়টি হাদীসশাস্ত্র সংক্রান্ত যাদের সামান্য জ্ঞান আছে তাদের কাছে গোপন নয়। সুতরাং আমি যেসব হাদীস উদ্ধৃত করেছি সেগুলোর ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীসসমূহ মুতাওয়াতির…যা কিছু এখানে আলোচনা করা হল তা ঐ সব ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট যাদের অন্তরে সামান্যতম ঈমান ও ইনসাফ বিদ্যমান।

তাই ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবে বিশ্বাসী নন বা ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয় অথবা শাব্দিকভাবে ‘হেদায়েতপ্রাপ্ত’ অর্থে ‘মাহদী’ শব্দের ব্যাখ্যা করে অথবা বলতে চায় যে, শেষ যামানায় ‘মাহদী’ নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি হবেন না; বরং প্রতি যুগের মুজাদ্দিদ বা ধর্ম সংস্কারক আলেমই হবেন মাহদী, এমনকি তিনি নিজেও হয়ত তা বুঝতে পারবেন না; তার মৃত্যুর পর জনগণ তার কর্মকাণ্ড, অবাদন ও কর্মবহুল জীবন অধ্যয়ন করে বুঝতে পারবে যে, তিনি মাহদী ছিলেন-তাদের উদ্দেশ্যে এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, তারা ঈমান, ইসলাম এবং আপামর মুসলিম উম্মাহর অন্যতম মৌলিক অকাট্য বিষয়কে অস্বীকার করেছে যা মুতাওয়াতির হাদীস ও রেওয়ায়েতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। আর ধর্মের অকাট্য বিষয়কে অস্বীকার করা ঈমান ও ইনসাফের পরিপন্থী। অতএব, ইমাম মাহদী সম্পর্কে গুটিকতক লোকের এ জাতীয় বিরল অভিমতের কোন তাত্বিক মূল্য নেই।

ইমাম মাহদী (আ.) আগমন এবং তিনি যে সকল অত্যাচারী কাফির- মুশরিক ও বিকৃত ধর্মের অনুসারীকে পরাস্ত করে বিশ্বব্যাপী ইসলামের সৌন্দর্যময় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামকে সকল ধর্ম ও মতবাদের ওপর বিজয়ী করবেন-এতদসংক্রান্ত বিশ্বাস মুসলিম উম্মাহ তথা সকল নিপীড়িত জনগোষ্ঠী ও জাতিকে অত্যাচারী শাসকচক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবার সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায়। ইরানের সফল ইসলামী বিপ্লব এবং লেবাননে ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর সফল প্রতিরোধ সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় আসলে ইমাম মাহদী (আ.) এর প্রতি বিশ্বাস থেকেই উৎসারিত। কারণ, সবার জানা আছে যে, ইরান ও লেবাননের আপামর জনগণ বারো ইমামী শিয়া যারা ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কেবল বারো ইমামী শিয়া মুসলমানরাই নয়; বরং সকল সুন্নী মুসলমানও শ্বাসরুদ্ধকর চলমান বিশ্বপরিস্থিতিতে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ওপর পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ও নাস্তিক্য পরাশক্তিসমূহের উপর্যুপরি চাপ, যুদ্ধ ও আগ্রাসনের কারণে উদ্ধারকর্তা ইমাম মাহদীর দ্রুত আগমন ও আবির্ভাবের প্রত্যাশী। এ বিশ্বাস সকল মাজহাব নির্বিশেষে গোটা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির মূর্ত প্রতীক।

শুধু মুসলমানরাই নয়, বিশ্বের সকল নিপীড়িত ও অধিকারহত জাতি অত্যাচারী শাসকবর্গের অন্যায়-অবিচারে অতীষ্ট হয়ে মহান মুক্তিদাতার আগমনের অপেক্ষা করছে যিনি তাদেরকে অন্যায়-অবিচারের তিমিরাধার থেকে মহামুক্তির আলোর পানে পথ দেখাবেন। তাই শেষ যামানার ইমাম মাহদী (আ.) তথা প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তার আগমনে বিশ্বাস ও মহামুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিঃসন্দেহে গোটা মানব জাতিকে এক মহান আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঐক্যবব্ধ করবে।

দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে আজ আবার নতুন করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তিকামী আন্দোলন জোরদার হচ্ছে এবং একের পর এক জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনসমূহে জনসমর্থন নিয়ে তারাই বিজয়ী হচ্ছে। ভেনেজুয়েলা, পেরু নিকারাগুয়া,ইকুয়েডর হচ্ছে এর জাজ্জ্বল্য উদাহরণ। অন্যদিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিপ্লবী প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদিনেযাদ ভেনেজুয়েলার কট্রর মার্কিনবিরোধী প্রেসিডেন্ট হুগো স্যাভেজকে ‘বিপ্লবী ভাই ও সঙ্গী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই অন্যায়, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মজলুম মুসলিম উম্মাহর সাথে বিশ্বের আপামর মজলুম জাতির বৃহত্তর পরিসরে ঐক্য ও সংহতি যে গড়ে উঠবে তা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে। আর এ সার্বিক ঐক্য ও সংহতি নিঃসন্দেহে ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের যুগে চূড়ান্ত বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করবে যা তার নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী ঐশী বিপ্লব এবং সত্য ও ন্যায়ের সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে।

ইমাম মাহদীর (আ.) সংক্ষিপ্ত জীবনী

নাম ও উপনাম :- এই মহান ব্যক্তির নাম সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার নাম ও উপনাম হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নামেই।

নাম :- মুহাম্মদ ।

উপনাম : আবুল কাসেম। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন “মাহদীর নাম আমার নামেই” অনুরূপ ভাবে হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে “মুহাম্মদ” মাহদীর নাম। (বোরহান ফি আলামতে মাহদী আখেরী যামান, মুত্তাকী হিন্দি, ৩য় অধ্যায়  হাদিস নং ৮,৯।)

উপাধী :- তার বিভিন্ন উপাধীর মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্ল্যেখযোগ্য হচ্ছে মাহদী, কাসেম, সাহেবুজ্জামান, সাহেবুল আমর , মুনতাজার ও হুজ্জাত । তবে তিনি মাহদী নামেই অধিক পরিচিত। এটি তার সু প্রসিদ্ধ নাম। তাকে ‘মাহদী’ বলা হয়েছে এ কারণে যে, তিনি নিজে হেদায়েত প্রাপ্ত এবং অন্যদেরকে সঠিক পথে হেদায়েত দান করবেন। তাকে ‘কায়েম’ বলা  হয়েছে কেননা তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন। তাকে ‘মুনতাজার’ বলা হয়েছে কেননা সকলেই তার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে। তাকে ‘বাকিয়াতুল্লাহ’ বলা হয়েছে কেননা তিনি হচ্ছেন আল্লাহর হুজ্জাত। হুজ্জাত অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর স্পষ্ট দলিল ।

পিতা : ইমামতের আকাশের একাদশতম নক্ষত্র হযরত ইমাম হাসান আসকারী (আ.)।

মাতা : সম্মানীতা ও সম্ভ্রান্ত রমণী নারজীস। তিনি ছিলেন রোম সম্রাটের দৌহিত্রা।

জন্ম :- ২৫৫ হিজরীর ১৫ই শাবান ইরাকের সামেররা শহরে । হযরত মাহদীর (আ.) জন্ম ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। যা মনে অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে। হযরত হাসান আসকারী (আ.)  ইরাকের সামেরায় জীবন যাপন করতেন। ইমামকে আব্বাসী খলিফা মুতাওয়াক্কেল নজর বন্দী করে রাখত। মাঝে মধ্যেই খলিফার কর্মচারীরা ইমামের বাড়ী হানা দিত। তাকে খলিফার দরবারে জোর করে নিয়ে যেত এবং বিভিন্নভাবে তার উপরে নির্যাতন চালাত। (বিহারুল আনওয়ার, ৪র্থ খণ্ড, হাদীস নং-৯৩।)

ইমাম মাহদী (আ.) এর জন্ম সম্পর্কে ঐ সময়ের মুসলমানরা এমনকি শাসকরা পর্যন্ত জানতো যে, ইমাম আসকারী (আ.) এর ঔরসে এক মহামানব জন্ম গ্রহন করবেন। যিনি সমস্ত অন্যায়, অবিচার জুলুম অত্যাচারকে সমুলে উপড়ে ফেলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এই কারণে তারা ইমামের উপর বিভিন্ন কঠোরতা, অবরোধ আরোপ করে। যেন তাকে নিঃশেষ করে ইমাম মাহদী (আ.) এর জন্ম ও ইমামতের ধারাকে রুখতে পারে। (শেখ তুসি, কিতাবুল গেইবাত, পৃ. ২৩১।)

ইমাম আসকারী (আ.) তার ঘনিষ্ঠ জনদের কে তার পরবর্তী ইমামের দুনিয়ায় আগমনের সংবাদ দিয়ে বলতেন শিঘ্রই আল্লাহ আমাকে একজন সন্তান দান করবেন এবং আমাকে তার দয়া ও অনুকম্পার অন্তর্ভুক্ত করবেন। আরও বলতেন যে, কোন শক্তিই কোন ষড়যন্ত্রই মহান আল্লাহ তা’আলার এই ইচ্ছাকে রুখতে পারবেনা। আল্লাহর অঙ্গিকার পূর্ণ হবেই। অন্যদিকে শত্রুরাও তাদের সমস্ত শক্তি সামর্থ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল। যেন আল্লাহর এই অঙ্গিকার পূর্ণতা না পায়। তারা ইমামকে সম্পূর্ণ নজর বন্দী করে রাখে, এমনকি তার বাড়িতে তার সঙ্গী-সাথী, আত্মীয় স্বজন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের যাওয়া আসা ও নিয়ন্ত্রন করতো । কিছু কর্মচারীকে শুধুমাত্র এই কারণে নিযুক্ত করে রেখেছিল যে, যদি কোন ছেলে সন্তানকে ইমামের বাড়িতে ভূমিষ্ট হতে দেখে তাহলে যেন তাকে হত্যা করে। (ইয়ানাবিউল মুয়াদ্দাহ, হাফিজ সুলাইমান,পৃ. ৪৫৫।) এত কিছুর পরে ও নারজেস খাতুন গর্ভবতী  হন, শুধুমাত্র ইমাম এবং তার বিশেষ কিছু সঙ্গী সাথী ও নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ এ খবর জানতো না ।

এটা ও সত্য এবং প্রমানিত যে, ইমাম আসকারী (আ.) বিষাক্রান্ত হয়ে দুনিয়া থেকে চলে যান। তার দাফন কাফন ও জানাযায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহন করেছিল এবং জনগনের সম্মুখেই তাকে কবর দেয়া হয়। ইমাম মাহদী (আ.) এর জন্ম হয়েছে এ কথা মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। কেননা এটা অসম্ভব ব্যপার যে, তার পিতা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন অথচ তার জন্ম হয়নি অথবা তার পিতার মৃত্যুর সময় তিনি মাতৃগর্ভে ছিলেন এবং পিতার মৃত্যূর কিছু কাল পর ভুমিষ্ট হয়েছেন। কেননা এটা কখোনই সম্ভব নয় যে, একজন মানুষ মারা যাবে আর তার সস্তান যে তার রক্ত মাংশে মিশে আছে শত শত বছর পর জন্ম নিবে। নিঃসন্দেহে ইমাম মাহদী (আ.) ভুমিষ্ট হয়েছেন এতে কোন সন্দেহ, সংশয় নেই এবং তিনি এখন পর্যন্ত জীবিত আছেন এবং আল্লাহর নির্দেশে লোক চক্ষুর অন্তরালে আত্মগোপন করে আছেন। এটা ও সম্ভব পর নয় যে, তিনি আত্মপ্রকাশের পূর্বেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিবেন। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও মহামানব রাসূল (সা.) এর সাথে ইমাম মাহদীর বেশ কিছু বিষয়ে চমৎকার মিল পাওয়া যায়। মহানবী (সা.) যেমন সর্বশেষ নবী তেমনি ইমাম মাহদী ও সর্বশেষ ইমাম। মহানবী (সা.) এর শুভাগমন সম্পর্কে যেমন পূর্ববর্তী নবী বা রাসূলগণ ভবিষ্যৎ বাণী করে গেছেন, তেমনি ইমাম মাহদী (আ.) এর আগমন সম্পর্কেও মহানবী (সা.) এবং পূর্ববর্তী ইমামগণ বাণী রেখে গেছেন।

প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদীকে সাধারণত ‘ইমামুল আসর’ বা নির্দিষ্ট সময়ের ইমাম এবং সাহিবুজ্জামান বা জামানার নেতা বলা হয়। জন্মের পর মহানবী (সা.) এর নামেই তার নাম রাখা হয়। তিনি জন্মের পর থেকে তার শ্রদ্ধেয় পিতা ইমাম আসকারী (আ.) এর প্রত্যক্ষ ও বিশেষ তত্ত্বাবধানে ছিলেন। স্বৈরশাসকের হুমকীর কারণে ইমামে মাহদীর (আ.) জন্মের খবর গোপন রাখা হয়েছিল। কারণ আব্বাসীয় শাসকরা ইমামের বংশ ধারকে ধ্বংস করে ফেলার জন্য প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে হন্যে হয়ে খুজছিল। বাড়ি বাড়ি তল্লাশী করে খুজে বের করার জন্য ওরা গোপন ঘাতক বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল। তাই স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা শিশু ইমামকে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা ও সুরক্ষিত রেখেছিলেন।

ইমাম মাহদীর (আ.) জন্ম স্বাভাবিক না কি অলৌকিক

শেখ তুসী বলেন এটা একটা মামুলী এবং সাধারণ ব্যাপার। এই ঘটনা প্রথম এবং শেষ নয় মানব জীবনের দীর্ঘ ইতিহাসে এর অনেক নমুনা রয়েছে। যেমন হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর জন্ম নমরুদের চোখের অন্তরালে, হযরত মুসা (আ.) এর জন্ম ফেরাউনের চোখের আড়ালে, হযরত ঈসা (আ.) এর জীবিত থাকা। (শেখ তুসি , কিতাবুল গেইবাত, পৃ. ২৩৭।)

যখন ইমাম মাহদী (আ.) এর ভুমিষ্ঠ হবার সংবাদ তার পিতা ইমাম হাসান আসকারীর নিকট পৌছাল তিনি অত্যান্ত খুশী হলেন শুধু তিনিই নয় এ ধরনী যেন আনন্দে মেতে উঠল। আসকারী (আ.) নবজাতককে কোলে নিলেন এবং তার ডানকানে আজান ও বাম কানে এক্বামত দিলেন। সর্বপ্রথমে যে ধ্বনী নবজাতকের কানে পৌছল তা “আল্লাহু আকবার” ও “লা ইলাহা ইল্লাললাহু ছিল” । এই ভাবে বান্দাদের জন্য আল্লাহর ওলী তৎকালীন জালেম শাসকের প্রতিবন্ধকতা সত্বেও, যারা তাকে পেলে হত্যা করতো, জন্মগ্রহন করলেন।

হাকিমা ইমাম আসকারী (আ.) এর ফুফু তাকে কোলে তুলে নিলেন এবং চুমু দিলেন তিনি বলেন আমি তার থেকে এমন এক সুগন্ধ পাচ্ছিলাম যা আগে কখোন অনুভব করিনি। ইমাম আসকারী (আ.) পুণরায় তাকে হাকিমার কোল থেকে নিলেন। এবং বললেন তোমাকে এমন এক জনার আশ্রয়ে রাখবো যার আশ্রয়ে হযরত মুসা (আ.) এর মাতাও তার সন্তানকে  রেখেছিলেন। তুমি সর্বক্ষণ আল্লাহর হেফাজতে থেকো। অতপর হাকিমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন : “এই ফুফু তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দাও এবং এই নবজাতকের সংবাদ কাউকে দিওনা গোপন রাখ যতক্ষন না উপযুক্ত সময় আসে”। (বিহারুল আনওয়ার, ১৩তম খণ্ড, পৃ.৭।)

ইমামত

ইমাম আসকারী (আ.) এর মৃত্যূর সময় ইমাম মাহদী (আ.) এর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। অর্থাৎ ৫ বছর বয়স থেকেই তিনি ইমামত প্রাপ্ত হন। দেশের মারাত্মক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাকে জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়। তখন তিনি আল্লাহর হুকুমে অদৃশ্য অবস্থানে (গায়েব) চলে যান। তার ফলে আব্বাসীয়রা তাকে খুজে বের করে হত্যা করতে পারেনি। গায়েব অবস্থায় ইমাম মাহদী তার কতিপয় বিশিষ্ট প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের জন্য নিজের বাণী প্রকাশ করেন। জনসাধারণকে ধর্মবাণী ও উপদেশ প্রদানের জন্য ইমাম তার পিতা ও পিতামহের এককালীন ঘনিষ্ঠ সহচর উসমান ইবনে সাঈদ আল আমরীকে নিজের বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। তার মাধ্যমেই ধর্মপ্রাণ অনুসারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব ও সমস্যার সমাধান দেয়া হতো। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র মুহাম্মদ ইবনে উসমান আল আমরী ডেপুটির দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এভাবে পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আবুল কাসিম আল হোসাইন ইবনে রুহ আল নওবখতি, আলী ইবনে মুহাম্মদ আস সামুরী। ৩২৯ হিজরীতে আস সামুরীর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে গায়েব অবস্থান থেকে ইমাম মাহদী এক ঘোষণা প্রদান করেন যে, ছয় দিনের মধ্যে আস সামুরী মারা যাবেন এবং সেই সাথে ইমামের প্রতিনিধিত্ব স্থগিত হয়ে যাবে। এখন হতে ইমাম আবার অদৃশ্য অবস্থানে চলে যাবেন।

ইমাম মাহদীর (আ.) গায়িব (অন্তথর্ধান) দু’ভাগে বিভক্ত

প্রথমত : গায়িবাতে সুগরা (স্বল্পকালীন অন্তর্ধান) : প্রথম গায়িব অবস্থার শুরু হয় ২৬০ হিজরীর (৮৭২ খ্রি.) রবিউল আউয়াল মাসে এবং তা শেষ হয় ৩২৯ হিজরীতে (৯৩৯ খ্রি.)শাওয়াল মাসে। প্রথম গায়িব সময়কাল ছিল ৭০ বছর।

দ্বিতীয়ত : গায়িবাতে কুবরা (দীর্ঘকালীন অন্তর্ধান) : দ্বিতীয় প্রধান গায়িব শুরু হয় ৩২৯ হিজরীতে এবং আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা ততদিন এ অবস্থানকে বলবৎ রাখবেন। নির্ভর যোগ্য বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, মহা নবী (সা.) বলেছেন- “এ বিশ্বজগত ধ্বংস হওয়ার জন্য যদি একটি দিনও অবশিষ্ট থাকে, তাহলে মহান আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই সে দিনটিকে এতবেশী দীর্ঘায়ীত করবেন, যাতে আমার সন্তান মাহদী (আ.) আত্মপ্রকাশ করতে পারে এবং অন্যায় অত্যাচারে পরিপূর্ণ এ পৃথিবীতে সম্পূর্ণরূপে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” (বিহারুল আনওয়ার, ৫১তম খণ্ড, পৃ. ৩৬০ থেকে৩৬১। শেখ তুসি, কিতাবুল গেইবাত, পৃ. ২৪২।)

ইমাম মাহদীর হায়াত দীর্ঘায়িত হওয়া কিভাবে সম্ভব ?

অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন, ইমাম মাহদীর হায়াত দীর্ঘায়িত হওয়া কিভাবে সম্ভব ? এর জবাবে বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ.), হযরত খিজির (আ.) ও হযরত নূহ (আ.) ও অন্যরা যেভাবে দীর্ঘজীবি হয়েছেন এবং তাদের কেউ কেউ এখনো জীবিত আছেন, হযরত মাহদী (আ.) এর দীর্ঘ জীবনের বিষয়টিও অনুরূপ। কোরআন মজীদে এ ধরনের অলৌকিক ঘটনার অনেক উদাহরণ আছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা হযরত ওজাইর (আ.) কে পৃথিবী থেকে নিয়ে যান এবং পুনরায় জীবিত করেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) একটি পাখি টুকরা টুকরা করে বিভিন্ন পাহাড়ে রেখে আসেন। পরে আল্লাহর হুকুমে ঐ পাখিকে আহবান করলে তা উড়ে আসে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর জন্য আগুন অদাহ্য ও আরামদায়ক হয়ে যায়। হযরত ঈসা (আ.) পিতাবিহীন জন্মগ্রহণ করেন এবং এখনো পর্যন্ত তিনি জীবিত অবস্থায় আছেন, তিনিই আবার মৃত লোকদের জীবিত করতেন। হযরত মুসা (আ.) এর হাতের লাঠি অজগর সাপে পরিণত হয়, পাখি ও পিপিলিকার সাথে হযরত সোলাইমান (আ.) কথা বলেন, হযরত খিজির (আ.) আজ অবধি জীবিত আছেন। এসব বিষয় মুসলমানরা বিশ্বাস না করে পারেনা। একজন বিশ্বাসী তথা আত্ম সমর্পিত ব্যক্তি অর্থাৎ একজন মোমিন বিনা বাক্য ব্যয়ে এ ঘটনাগুলোকে বিশ্বাস করে। কাজেই ইমাম মাহদী (আ.) এখনো জীবিত থাকার ব্যাপারে বিস্মিত ও অবাক হওয়ার মতো কিছু নাই।

বিভিন্ন গবেষণায় নিশ্চিত হয়ে বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, “বার্ধক্যে উপনীত হওয়া যা মূলত এক ধরনের রোগ। আর বয়স কমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে সঠিক খাদ্যের অভাব, দুষিত বায়ু সেবন, মানসিক অশান্তি বা এক কথায় মানুষের জীবন ধারণের মানবিক ও বস্তুগত পরিবেশের ধরণ ও প্রকৃতি। কাজেই পরিবেশের পরিবর্তন সাধন করে কারো দীর্ঘ জীবন লাভ করা সম্ভবপর বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। জার্মানী ডাক্তার হাভার্ট লিখেছেন যে, বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞান খাদ্য বিজ্ঞানের সহায়তায় বয়সের সীমা এর চেয়ে আরো অধিক দীর্ঘ করতে পারে।

মিশরীয় ম্যাগাজিন ‘আল মুকতাতাফ’ ১৯৮০ সালের তৃতীয় সংখ্যায় লিখেছে, বিশ্বস্ত মনীষিরা লিখেছেন, প্রাণীর দেহের পুরো কাঠামো এতখানি স্থায়িত্বের অধিকারী যে, মানুষ কোনো উপসর্গের আঘাত না আসলে হাজার হাজার বছর জীবিত থাকতে পারে। কাজেই বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষের জীবন দীর্ঘায়িত হওয়ার বিষয়টি সম্ভব।

অন্যান্য ধর্মে হযরত মাহ্দীর উপর বিশ্বাস

ইমাম মাহ্দী (আ.) যে শেষ যামানায় আবির্ভূত হবেন শুধুমাত্র মুসলমানরাই নয় বরং অন্যান্য দীন যেমন ইহুদী, খৃস্টান, অগ্নিপূজক, হিন্দু সবাই আল্লাহর পক্ষ হতে একজন ঐশী সংস্কারকের আবির্ভাবের বিষয়টি স্বীকার করে এবং তাদের ধর্ম গ্রন্থ এরূপ ব্যক্তির আগমনের ঘোষণা দিয়েছে। তারা ও তাঁর অপেক্ষায় দিন গুনছে। পবিত্র তৌরাত ,যাবুর ,ইঞ্জিল এমনকি হিন্দুদের গ্রন্থে এবং অগ্নিপুজকদের গ্রন্থেও ইমাম মাহ্দী সম্পর্কে ঈঙ্গিত করা হয়েছে। তবে প্রত্যেকেই তাকে ভিন্ন নামে চিনে থাকে। অগ্নিপুজকরা তাকে “ সুশিনাস ” অর্থাৎ বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতা ,খ্রীষ্টানরা তাকে “ মাসিহ মাওউদ ” এবং ইহুদিরা তাকে “ সারওয়ারে মিকাইলি ” নামে আখ্যায়িত করেছেন।

হিন্দু ধর্মের “দিদ” নামক ধর্মীয় গ্রন্থে এভাবে লেখা হয়েছে যে : এই পৃথিবী মন্দে (অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, অন্যায়, অবিচার) পূর্ণ হওয়ার পর শেষ জামানায় একজন বাদশাহ্ আসবেন যিনি সৃষ্টি কূলের জন্য পথ প্রদর্শক হবেন। তার নাম মানসুর বা সাহায্যপ্রাপ্ত। সমস্ত পৃথিবীকে তিনি তার হাতের মুঠোয় নিয়ে আসবেন। কে মু’মিন আর কে কাফের চিনতে পারবেন। আর তিনি আল্লাহর কাছে যা কিছুই চাইবেন আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিন তাই তাকে দিবেন।

যারথুষ্ট্র ধর্মের প্রবক্তা যারথুষ্ট্রের এক শিষ্যের লেখা “জামাসব” নামক বইতে এভাবে উল্লেখ আছে যে : আরবের হাশেমী বংশ থেকে এমন এক লোকের আবির্ভাব হবে যার মাথা, দেহ ও পা যুগল হবে বিশালাকারের। তাঁর পূর্বপূরুষের দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ঐ ব্যক্তি বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে ইরানে আসবে এবং এই দেশকে সুখ-শান্তি, সত্য ও ন্যায়ে পূর্ণ করবেন। আর তাঁর ন্যায় পরায়ণ শাসনে বাঘ ও ছাগল একই ঘাটে পানি পান করবে।

যারথুষ্ট্রদের ধর্মীয় গ্রন্থ “যানদ”-এ বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় ইয়ায্দানদের (অগ্নিপূজকদের খোদাদের) পক্ষ হতে বড় ধরনের বিজয় আসবে এবং আহরিমানকে (অশুভ আত্মাকে বা শয়তানকে) নিশ্চিহ্ন করবে। আর পৃথিবীতে  আহরিমানের (শয়তানের) সমস্ত অনুচরদেরকে নিরাশ্রয় করা হবে। ইয়াযদানদের বিজয় ও আহরিমানের পরাজয়ের পর এই পৃথিবী তার প্রকৃত পূর্ণতায় পৌঁছাবে এবং আদম সন্তানরা সৌভাগ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবে।

তওরাতে “সেফরে তাকভীন” হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশ থেকে যে বারজন ইমাম আসবেন, তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে : ‘ইসমাইলের জন্য তোমার দোয়া শুনেছি এ কারণে তাকে বরকতময় করেছি এবং বংশধরের মধ্যে বারজন নেতার আবির্ভাব ঘটাব এবং তাকে বিশাল উম্মত দান করব।’

হযরত দাউদ (আ.)-এর মাযামিরে উল্লিখিত হয়েছে : ‘অবশ্য সৎকর্মশীলদেরকে মহান আল্লাহ্ সাহায্য করবেন ... সৎকর্মশীলরা এমন এক ভূমির উত্তরাধিকারী হবে যার মধ্যে তারা স্থায়ী হবে।’


__________________________________________

ইমাম মাহদী (আ.) — বৈশ্বিক নিরাপত্তার একমাত্র পথ

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মানবসভ্যতার অগ্রগতি হলেও মানুষের দূর্দশা এবং বিশ্বময় অস্থিরতা কোনোভাবেই কমছে না। যুদ্ধ, সন্ত্রাস, হত্যা, দূর্নীতি, লুণ্ঠন, বিশৃঙ্খলা, দারিদ্রতা, মূল্যবৃদ্ধি, জীবিকা সংকট—এসবই দিন দিন মানুষের কষ্ট ও যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই যে, পৃথিবীতে যত নৈরাজ্য তার সবই মানবজাতির অন্যায় ও পাপাচারের পরিণাম। যদিও মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে অনেক আগেই এই কঠোর বাস্তবতার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন:

মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।” [সূরা রুম (৩০), আয়াত ৪১]

স্বভাবগতভাবে আমরা যেকোনো দূর্দশার জন্য অন্যকে দোষারোপ করি এবং নিজেকে নির্দোষ মনে করি। প্রশ্ন হলো, যদি সবাই নির্দোষ হয়, তবে অপরাধী কে? বাস্তবতা হলো, আমরা সবাই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে এইসব দূর্দশার জন্য কমবেশী দায়ী। আল্লাহর রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল।”

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী দায়বদ্ধ করা হয়েছে। বরং মানুষের ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, তা তার ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম। যদি সংস্কার বা উন্নয়ন আমাদের সাধ্যের মধ্যে না থাকত, তবে তা আমাদের দায়িত্বও হতো না। আমাদের দায়বদ্ধতা আমাদের সামর্থ্যের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ—তা হোক একটি শহর, একটি গ্রাম, একটি এলাকা বা একটি ঘর। যদি আমরা সম্পূর্ণ অসহায় বা ক্ষমতাহীনও হই, তবুও অন্তত আমাদের নিজেদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে। আমরা অবশ্যই নিজেদের সংশোধনের পদক্ষেপ নিতে পারি।

আজ যদি আমরা অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজেদের দিকে তাকাই এবং নিজেদের অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ ও প্রশিক্ষিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, তবে ধীরে ধীরে এর প্রভাব সবার সামনে দৃশ্যমান হবে। পর্যায়ক্রমে আমাদের ঘরগুলো শান্তিময় হবে, আমাদের এলাকা নিরাপদ হবে এবং আমাদের শহর ও গ্রামগুলো উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। যখন আমরা অনিষ্ট থেকে সংস্কারের দিকে, পাপ থেকে পুণ্যের দিকে, মন্দ থেকে ভালোর দিকে অগ্রসর হবো-তখন আমরা দেখতে পাব যে আমাদের আতঙ্ক-ভয়, অভাব-অভিযোগ সবই নিরাপত্তা ও সচ্ছলতায় রূপান্তরিত হচ্ছে।

বিপর্যয় বা ফিতনার কথা উঠলেই সাধারণত মাথায় পাপাচারের চিন্তা আসে— যেমন মিথ্যা বলা, গিবত করা, অপবাদ দেওয়া, ওয়াজিব কাজ ত্যাগ করা এবং হারাম কাজ আঞ্জাম দেওয়া। এই সবই নিকৃষ্ট পাপ। মহান আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার অধিকার কারো নেই। আল্লাহর প্রতি আমাদের অবাধ্যতাই আমাদের সকল সমস্যা ও কষ্টের মূল কারণ। কিন্তু মানুষের সবচাইতে বড় বিপর্যয় এবং সবচাইতে বড় পাপ হলো আল্লাহর পবিত্র প্রতিনিধি বা খলিফাকে অস্বীকার করা, যার প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রদর্শন করা সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই অবাধ্যতার ক্ষেত্রে বা তাঁর নেতৃত্বের (বিলায়াত) প্রতি উদাসীন থাকার ক্ষেত্রে কাউকে কোনো অজুহাত দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

একটি হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
সর্বশ্রেষ্ঠ আনুগত্য হলো আমার একত্ববাদ স্বীকার করা, আমার নবীর নবুওয়াতকে সত্যায়ন করা এবং নবীর মাধ্যমে মনোনীত প্রতিনিধিদের সামনে আত্মসমর্পণ করা; আর তারা হলেন আলী ইবনে আবি তালিব এবং তাঁর বংশধর থেকে পবিত্র ইমামগণ।”

অন্য একটি হাদিসে কুদসিতে ঘোষিত হয়েছে:
হে মুহাম্মদ! আমার কোনো বান্দা যদি ধূলিকণার মতো ক্ষুদ্র হওয়া বা শুকিয়ে যাওয়া গাছের মতো হওয়া পর্যন্ত আমার ইবাদত করে, কিন্তু তোমার ও তোমার আহলে বাইতের নেতৃত্বের (ইমামত) প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়ে আমার কাছে আসে, তবে আমি তাকে কখনোই ক্ষমা করব না। যতক্ষণ না সে তোমাদের নেতৃত্ব স্বীকার করে নেবে।”

প্রথম হাদিসটিতে আহলে বাইতের (আ.) নেতৃত্ব স্বীকার করাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয়টিতে তা অস্বীকার করাকে ক্ষমার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। বরং আহলে বাইতের নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করা মানে হলো সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে ফেলা।
সূরা ইউনুসের মধ্যে হযরত ইউনুস (আ.)-এর জাতির ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নবীর প্রতি ক্রমাগত অবাধ্যতার ফলে সেই জাতির ওপর খোদায়ী আযাব ঘনিয়ে এসেছিল। কিন্তু যখন তারা অন্তরের গভীর থেকে অনুতপ্ত হলো এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত হয়ে তাঁর অনুগত বান্দা হলো, তখন সেই আযাব দূর হয়ে গেল।

আমাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই উম্মতের কষ্ট ও দুর্যোগ তখনই শেষ হবে, যখন মানুষ ভণ্ড ও স্বঘোষিত খলিফা ও নেতাদের ত্যাগ করে আহলে বাইতের (আ.) দরবারে ফিরে আসবে। যেদিন এই জাতি আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত এবং রাসূল (সা.) কর্তৃক পরিচিত ইমামের নেতৃত্বকে মনে-প্রাণে স্বীকার করবে এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ অনুগত হবে, সেদিন এক আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে। হাদিসের ভাষায়: “পৃথিবী যেভাবে অন্যায় ও অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই তা ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।”

আজ আমাদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আল্লাহ মনোনীত মাসুম ইমামগণের (আ.) ওপর বিশ্বাস রাখা এবং তাঁদের শত্রুদের ঘৃণা করা। তদুপরি, অন্যদেরও এই পবিত্র ব্যক্তিত্বদের দিকে আহ্বান করা— যে ধারার সূচনা আমিরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-কে দিয়ে এবং সমাপ্তি হুজ্জাত ইবনুল হাসান ইমাম মাহদী (আ. ফা.)-এর মাধ্যমে।
_________________________________________

ইমামের সঙ্গে না–বলা কথাগুলো

ইমামে জামানা (আ.)–এর কথা ভাবলে আমার মনে প্রথম যে অনুভূতিটি জাগে, তা হলো অপেক্ষা। এ অপেক্ষা কোনো নির্দিষ্ট দিনের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, কোনো উৎসবের ক্যালেন্ডারেও আটকে থাকে না। এটি প্রতিদিনের, প্রতিক্ষণের, আমার শ্বাস–প্রশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর আত্মিক অবস্থা। জন্মদিন সেই অনুভূতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে মাত্র; কিন্তু আকাঙ্খাটি জন্ম নেয় প্রতিদিন।

আমি প্রতিদিনই ইমামের সঙ্গে কথা বলতে চাই। উচ্চস্বরে নয়, ভাষার জাঁকজমকেও নয়—বরং নীরবতায়, নিজের ভাঙা অন্তরের গভীরতম স্তর থেকে। এমন অনেক কথা আছে, যা মানুষের সঙ্গে বলা যায় না; এমন অনেক কষ্ট আছে, যা শব্দ ধারণ করতে পারে না। সেসব কথার ঠিকানাই আমার কাছে ইমামে জামানা (আ.)।

এই দুনিয়াকে দেখলে মনে হয়, মানুষ পথ হারিয়ে ফেলেছে। জুলুম এখন শুধু শক্তিশালীদের অস্ত্র নয়, নীরব মানুষের সম্মতিও পেয়েছে। সত্য জানার পরও চুপ থাকা যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমি নিজেও এই সমাজেরই একজন—এই উপলব্ধি আমাকে বারবার লজ্জিত করে। প্রতিদিন আমি নিজেকে প্রশ্ন করি: হে আমার ইমাম, আপনি এলে আমি কোথায় দাঁড়াবো? দর্শকের কাতারে, না দায়িত্বশীলের সারিতে?

এই প্রশ্নই আমার প্রতিদিনের ইন্তিজারকে অর্থবহ করে তোলে। কারণ ইন্তিজার শুধু চোখে রাস্তা চেয়ে থাকা নয়; ইন্তিজার মানে নিজের ভেতরের অন্যায়গুলোকে চিহ্নিত করা, নিজের সুবিধাবাদিতাকে ভাঙা, আর ধীরে ধীরে ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস গড়ে তোলা। 

আমি জানি, আমি দুর্বল। আমার আমল কম, ধৈর্য সীমিত, আর ভয় অনেক। তবুও এই দুর্বলতা নিয়েই আমি আপনার দিকে তাকিয়ে থাকি, হে আমার ইমাম। কারণ ইন্তিজার নিখুঁত মানুষদের কাজ নয়; ইন্তিজার ভাঙা মানুষদের আশ্রয়। যারা জানে—নিজেদের ঠিক করতে না পারলে, আপনার আগমন শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হয়েই থেকে যাবে।

আমি চাই, আপনি এলে অন্তত লজ্জায় মাথা নিচু করতে না হয়। চাই, আমার নীরবতাগুলো যেন কাপুরুষতা না হয়, আমার অপেক্ষা যেন অলসতা না হয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র হলেও অবস্থান নেওয়ার চেষ্টায়—এইভাবেই আমি নিজেকে আপনার জন্য প্রস্তুত করতে চাই।

হে ইমামে জামানা (আ.), আপনি হয়তো এখনও আড়ালে আছেন, কিন্তু আমার জীবনের বাইরে নন। আমার দোয়ার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে, আমার বিবেকের প্রতিটি প্রশ্নে আপনি উপস্থিত। এই প্রতিদিনের অপেক্ষাই আমার ইবাদত, আমার আত্মশুদ্ধির পথ, আর আমার একমাত্র আশা—একদিন আপনি আসবেন, আর আমি বলতে পারব: হে আমার ইমাম, আমি অন্তত চেষ্টা করেছিলাম।

__________________________________________

মারেফাত (জ্ঞান বা প্রজ্ঞা):ইমাম মাহদী (আঃ)
        ✍️ রাজা আলী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম 

ভূমিকা:

মারেফাত' শব্দের অর্থ হলো জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বা ইন্দ্রিয়লব্ধ পরিচয় লাভ করা। এটি আরবি 'আরাফা' (عرف) শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার মানে জানা বা জ্ঞান লাভ করা। সুফিবাদে মারেফাত শব্দ টি বহুল প্রচলিত।সেখানে  শব্দটি বাহ্যিক জ্ঞানের পরিবর্তে আধ্যাত্মিক ও গভীর উপলব্ধিকে বোঝায়, যা হৃদয় থেকে ঈশ্বরকে জানা বা চেনার জ্ঞানকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। 

মারেফাত শব্দের তাৎপর্য:

 আল্লাহর নবী (স:) বর্ণিত ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কিত একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে "মারেফাত" শব্দটি এসেছে। যেখানে তিনি বলেছেন -
"যে ব্যক্তি তার যুগের ইমামের মারেফাত (জ্ঞান, প্রজ্ঞা) ব্যতীত মৃত্যু বরণ করবে,তার মৃত্যু পথভ্রষ্টের মতোই হবে।"
সুতরাং "মারেফাত" শব্দটির অর্থ ব্যাপ্তি ও গভীরতার কারণে বোঝা যায় যে, এ যুগে আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইমাম মাহদী আঃ এর বিষয়ে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জন এবং বাহ্যিক জ্ঞানের ক্ষেত্রকে ছাড়িয়ে গভীর উপলব্ধি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রচেষ্টা চালানো।তাই ইমাম মাহদী (আঃ)এর প্রতি মারেফাত অর্জন নিছক তাঁর সম্পর্কে প্রাথমিক কয়েকটি তথ্য জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

 ইমাম মাহদী (আঃ) এর প্রতি সঠিক মারেফাত অর্জন করতে না পারলে মানুষের মৃত্যু জাহেল বা মূর্খ ব্যক্তির ন্যায় হবে।আর জাহেল বা মূর্খ ব্যক্তি কখনো সঠিক পথ ধরে সঠিক স্থানে পৌঁছাতে পারে না।তাই ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি যথাযথ মারেফাত ছাড়া কখনোই দুনিয়া এবং আখেরাতে সাফল্য ও মুক্তি সম্ভব নয়।

মারেফাতের(জ্ঞান, প্রজ্ঞা) শ্রেণি করণ:
ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি 'মারেফাত' (জ্ঞান, প্রজ্ঞা) সকল মানুষের কিন্তু সমান নয়।কেউ শুধুমাত্র ইমাম আঃ এর নাম জানে,তো কেউ তাঁর সম্পর্কে অল্প কিছু তথ্য জানে,কেউ বা আর একটু বেশি জানে,কেউ বা নিজেকে ইমাম ইমাম (আঃ)এর সঙ্গে সাক্ষাতের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।এই জানার শেষ বা চূড়ান্ত পর্যায় কোথায়,তা নির্ণয় করা মুশকিল। তাই 'মারেফাত' মানে একটি কোনো শ্রেণি বা স্তর নয়। মানুষের জ্ঞান, গভীর চিন্তা ও উপলব্ধির কারণে তা নানা স্তর বা শ্রেণিতে বিভক্ত।

আমাদের অবস্থা:
বর্তমানে আমরা ইমাম মাহদী (আঃ) সম্পর্কে মারেফাতের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে অবস্থান করছি।তাই এটা ভাবা উচিত নয় যে, ইমাম সম্পর্কে আমাদের যতটুকু জ্ঞান,তা দুনিয়া এবং আখেরাতে র সাফল্যের জন্য যথেষ্ট। সচেতন মানুষের উচিত ইমাম (আঃ) এর প্রতি মারেফাতের সর্বোচ্চ ধাপে অধিষ্ঠানের প্রচেষ্টা চালোনো।

ইমাম আঃ এর প্রতি 'মারেফাতে'র উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ফল:

সাধারণ ভাবে বলা যায় যে, ইমামের প্রতি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধিই একটি উচ্চ পর্যায়--যে পর্যায়ে পৌঁছালে তার সাহায্য, এমনকি তাঁর সান্নিধ্য ও সাক্ষাৎ পর্যন্ত সম্ভব।পৃথিবীতে এমন বহু সংখ্যক ব্যক্তি ইমাম (আঃ)এর প্রতি উচ্চ 'মারেফাতে'র কারণে তাঁর সাহায্য বা সাক্ষাৎ লাভ করেছেন।এ বিষয়ে আয়াতুল্লাহ বাহজাদ, রজব আলী খাইয়ের প্রমুখ ব্যক্তিত্বের নাম খুব ই প্রসিদ্ধ।

গায়েবী সাহায্য: 
উপরোক্ত দুই ব্যক্তিত্ব ছাড়াও আরো বহুসংখ্যক ব্যক্তি ইমাম মাহদী আঃ এর সাহায্য ও সাক্ষাৎ পেয়েছেন।আলীমে দ্বীন থেকে সাধারণ মানুষ--যারাই ইমাম আঃ এর মারেফাত অর্জনের চেষ্টা করেছেন বা ইমাম আঃ এর অপেক্ষায় আছেন,তারাই ইমাম (আঃ)এর নৈকট্য এবং গায়েবী সাহায্য পেয়েছেন।

শেষ কথা:
ইমাম (আঃ)আমাদের নিকট এক খনি স্বরূপ।তাই তাঁর বিষয়ে আমাদের উদাসীন থাকা ঠিক নয়। ইমাম (আঃ) বিষয়ে সচেতনতা এবং 'মারেফাত' অর্জন ই একমাত্র দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তির পথ।তাই দুনিয়াতে দিন ফুরিয়ে আসার আগেই , ইমাম (আঃ) বিষয়ে আমাদের জেগে উঠতে হবে।

------ _____------_____------______------______------
------ _____------_____------______------______------


📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
    জহুরের ডাক

হাসরে খোদা ডাকবে ইমামের সাথে 
থাকবে মেহদী ইমাম আমাদেরই সাথে

১৫ই শাবানে মা-নার্জিসের কোলে
 এসেছে যুগের ঈমাম আলো করে
কত সৌভাগ্য আমরা মাওলাকে পেয়ে 
দূর্ভাগ্য তাদের যারা দিয়েছে ছেড়ে।।

যদি এক সাথে মিলে করিতাম দোয়া 
জহুর করে দিতেন মাওলাকে খোদা
কত মূর্খ আর নির্বোধ আছি আমরা 
আর আমাদের জন্য কাঁদেন ইমামে যামানা।

পড়তে হয় তাই পড়ি দোয়ায়ে ফারাজ 
মাওলার কথাকে স্বরণ করে পড়ি না আজ
কি ভাবে জহুর হবে আমার মাওলার
 যেন কুফাদের মতন আমাদের স্বভাব।

কেন ছোট্ট ছোট্ট আমল গুলো করিনা 
একটু কথা আর ছাদকা সাথে আরিজা 
মারেফাত বাড়বে এই সব আমলের দ্বারা
 যদি সাথে থাকে বিশেষ কিছু দোয়া।

যহুরের কথা প্রতিদিন বলি আমরা 
সত্যি সত্যি যহুর হলে কী করবো মোরা
দিইনা খুমস আর খাইনা হালাল রুজি মোরা 
 বসাবো কোথায় একবার ভেবে বলোনা। 

মাওলা সব জায়গায় তুমি আছো বিরাজমান
 মোদের গোনাহের দৃষ্টি যায়না সে সমান
আমাদের মনের আশা তোমারি ছায়া
এর থেকে বেশী মাওলা কীছুই চায়না।

আল্লাহ্ মাওলার এই শিক্ষা পেয়েছি যার থেকে 
শত শত বছর হায়াত দাও তুমি তাকে
সাধারণ শিয়াদের মতো আমরাও ছিলাম 
তার বদৌলতে আজ ইমামকে চিনিলাম।

__________________________________________

    অপেক্ষা
    ✍️ রাজা আলী 

মোমিনেরা আজ তোমার অপেক্ষায় 
কবে দেখা দেবে মাওলা কৃপার দয়ায়
প্রতীক্ষা দীর্ঘ হোক, জ্বলুক আশার আলো
তুমি এসো ঘুচাও দুনিয়ার যতো কালো।

ভোরের নামাজের পর পশ্চিম আকাশ
সাদা-নীল রংয়ের মাঝে তোমার প্রকাশ 
দুর্ভাগা আমি, খুঁজে ফিরি প্রতিদিন 
পাইনি এখনো,রয়েছে হাজার ঋণ।

আশা রেখেছি বুকে , তোমার আগমণ 
প্রতীক্ষা আমার হবে না অকারণ 
পৃথিবীর বুকে তোমার উজ্জ্বল প্রকাশ 
দুচোখ ভরে দেখবো খুবই আশ।

প্রতীক্ষায় যেনো মৃত্যু আসে একদিন 
অন্তত স্বপ্নে দেখা দিও,করো না হীন
জানি আমি যোগ্য নই, চেষ্টায় তো আছি
তোমার সাক্ষাত পাবো-- মন্ত্র নিয়েই বাঁচি।
__________________________________________

                    গায়েবের চাঁদ

হে নূরের ইমাম, গায়েবের চাঁদ,
নাম নিলেই ঝরে চোখের বাদল সাধ।
রাতের বুক চিরে যে আশার আলো,
সে আলো শুধু তুমি—আর কেউ নয় ভালো।

আমি চাই না দেখা, অহংকার ভরে,
শুধু চাই তোমার পথে হারিয়ে যেতে ধীরে।
পাপের ভারে হৃদয় ক্লান্ত যখন,
তোমার দয়ার ছায়া হোক শেষ আশ্রয় তখন।

নীরব সিজদায় কাঁদে আমার প্রাণ,
শব্দহীন দোয়ায় শুধু তোমারই নাম।
যদি দেরি হয় দেখা, হে যুগের সর্দার,
আমাকে রেখো তবু অপেক্ষার কাতারে দাঁড়াবার।

নূরের ডাক এলে সময়ের পারে,
লাব্বাইক উঠুক এই ভাঙা স্বরে।
হে আল্লাহর ওলী, শেষ মিনতি আজ—
আমাকে যোগ্য করো ইন্তিজারের সাজ।
------ _____------_____------______------______------

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ মহররম সংখ্যা

আরবি : মহররম, ১৪৪৮ হিজরী ইংরেজি : জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ __________________________________________               সম্পাদক :  মাও...