আরবি: মহররম, ১৪৪৮ হিজরী
ইংরেজি: জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________
সম্পাদক :
সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী
প্রচ্ছদ ভাবনা:
অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:
প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা
__________________________________________
সূচিপত্র
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
সম্পাদকীয়
কারবালার ইতিহাস
কারবালার চিরন্তন চেতনা
✍️ মইনুল হোসেন
আয়াতুল্লাহ খামনায়ীর ১০ টি কথা
আজাদারী ও ইমামে জামানা (আ.)
আযাদারী বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হাদীস (সংগৃহীত)
✍️ রাজা আলী
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
আয়াতুল্লাহর বিদায়
বীর খামনেয়ী
✍️ মইনুল হোসেন
খামিনি
✍️ রাজা আলী
রক্তাশ্রুর আজাদার
__________________________________________
__________________________________________
সম্পাদকীয়
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। কারবালার শোক মানে শুধু অতীতকে স্মরণ নয়—এ এক জাগরণ, এক আত্মগত শিক্ষা। আজাদারি কেবল কান্না নয়, বরং তা হুসাইন (আ.)-এর পথে নিজেকে গড়ে তোলার শুদ্ধতম উপায়।
এই সংখ্যায় আমরা আলোকপাত করেছি আজাদারির সৌন্দর্য, আদব ও মূল উদ্দেশ্যের উপর। আলোচনা করেছি—কীভাবে আজাদারি হতে পারে হুসাইনির অনুসরণ, আর কীভাবে আমাদের শোক সুর মিলাতে পারে ইমামে জামানার (আ.ফা.) শোকের সাথে। কারবালা আমাদের শিখিয়েছে পর্দা, দিয়েছে যুব সমাজকে আদর্শের শিক্ষা, আর আমাদের রেখে গেছে এক চিরন্তন প্রশ্নের সামনে—তুমি হুসাইনের পক্ষে, না বিপক্ষে? আসুন, এ মহররমে আমরা শোককে করি আত্মশুদ্ধির সোপান, এবং প্রতিজ্ঞা করি—ইমাম মাহ্দি (আ.ফা.)-এর প্রতীক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত করব, এক হুসাইনি আজাদার হয়ে।
ওয়াস সালাম
সম্পাদক
__________________________________________------------------------------------------------
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
রেওয়ায়েতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) (অনুবাদ)
রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ “ আমি তোমাদেরকে মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের সুখবর দিচ্ছি-যাকে আমার উম্মতদের মাঝে পাঠান হবে। তাঁকে এমন সময়ে পাঠান হবে, যে সময়ে মানুষ পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী হবে এবং দোলাচলতার মাঝে বিভ্রান্ত হবে”।
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর গুণাবলী ও আবির্ভাবের বিষয়ে রাসুল (সাঃ) ও মাছুমীনগণ (আঃ) -দের থেকে এত পরিমাণে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, আমীরুল মোমেনীন (আঃ) ব্যতীত অপর কোনো মাসুমের সম্পর্কে এত পরিমাণে হাদীস বর্ণিত হয়নি। উল্লেখ্য, এই হাদীসগুলি সবই এসেছে বিশ্বস্ত রেওয়ায়েত সূত্রে। আশ্চর্যের বিষয় হল যে, ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেই কিছু সাহাবীগণ তাঁকে ভিত্তি করে পুস্তক লেখেন। শীয়াদের পুস্তকগুলির সঙ্গে সঙ্গে সুন্নিদের পুস্তকের মধ্যেও ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে রেওয়ায়েত সমূহ ধারাবাহিক ভাবে আজও বিদ্যমান। আে সুন্নতের বহু পুরাতন পুস্তক 'মাসনাদে আহ্বমাদ বিন হাম্বালের' (হিজ্বরী ২৪১) মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সম্পর্কে আনুমানিক ১০০ টির মতো হাদীস আছে। আর পরবর্তী লেখকগণ তাঁদের পুস্তকের (যেমন, সুনানে ইবনে দাউদ (২৭৫ হিজ্বরী), ইবনে মাজাহ্ (২৯৩ হিজ্বরী), তিরমিযী (২৯৭হিজ্বরী)} মধ্যে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর বিষয়ে একটি করে অধ্যায় স্থান দিয়েছেন। এছাড়াও আজ পর্যন্ত আহলে সুন্নতের লেখকদের ১৫০ টি এমন পুস্তক আছে-যা সম্পূর্ণ ইমাম মাহ্দী (আঃ)-কে বিষয় করে লেখা। আর হাজার হাজার এমন পুস্তক পাওয়া যায়, যার মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে পৃথক অধ্যায় স্থান পেয়েছে। শীয়াদের পুস্তকগুলির মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে এমন কিছু রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে, যে গুলির মধ্যে রাসুলে খোদা (সাঃ) এবং ইমামগণ (আঃ) ব্যতীত অন্যান্য সূত্র থেকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তাঁর আবির্ভাবেরে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। 'মুন্তাখাবুল আছার' নামক পুস্তকে আনুমানিক এমন-ই ১৩০০ রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। আর ইমাম মাহ্দী (আঃ)-কে বিষয় করে লেখা শীয়া আলীমদের পুস্তকের সংখ্যা বর্তমানে চার শতাধিক।
শীয়া ও সুন্নি উভয় মাযহাবের কাছে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে অত্যাধিক পরিমাণে হাদীস থাকার কারণে ইমামত বিষয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আবির্ভাব বিষয়ে উভয় মাযহাব সহমত পোষণ করে। আহলে সুন্নত ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে পয়গম্বার (সাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করেছেনঃ
“ যে মাহ্দীকে অস্বীকার করবে, সে কাফির” (অনুবাদ)। আহলে সুন্নতের মধ্যে এই হাদীসটিও বর্ণিত আছে যে, পয়গম্বার (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ
“ যদি পৃথিবীর বয়স একদিন থেকে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ ঐ দিনকে খুবই দীর্ঘায়িত করবেন, এবং একজন ব্যক্তিকে (যে আমার সন্তানদের মধ্যে থেকে হবে এবং যার নাম আমার নামের মতো হবে) পাঠাবে। সে জমীনকে ন্যায় বিচার ও ইনসাফ দ্বারা এমন ভাবে পরিপূর্ণ করবে, যেমন ভাবে জমীন জুলুম ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ ছিল”(অনুবাদ)।
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর প্রতি মুসলমানদের প্রকৃত বিশ্বাস আছে । তবে ইতিহাস খুললে দেখা যায়, এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কিছু মুসলমানরা নিজেদের অথবা নিজেদের নেতাদেরকে মাহ্দী বলে মিথ্যা দাবী করেছে। এর ফলে কিছু সংখ্যক মুসলমান পথভ্রষ্ট হয়েছে। এখানে কয়েকজন মিথ্যা 'মাহ্দী' দাবী কারীর নাম উল্লেখ করা হল,-
(ক) মাহ্দী সুডানী (১৩০৫ হিজ্বরী): ইনি আহলে সুন্নতের মধ্য থেকে 'মাহ্দী' বলে দাবি করেন। তিনি আফ্রিকার অধিবাসী ছিলেন।
(খ) মোহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ্ ক্বাহুত্বানী (১৪০০ হিজ্বরী): ইনি ওয়াহাবী মাযহাবের লোক এবং হেযাযের বাসিন্দা।
(গ) মির্জা আলী মোহাম্মাদ শীরাযী (১২৬৬ হিজ্বরী): ইনি ইরানের বাসিন্দা এবং শীয়া মাযহাব অবলম্বী।
বর্তমান অধ্যায়ের পরিসমাপ্তিতে আল্লাহ্র দরবারে দোয়া করি যে, তিনি যেন অতি দ্রুত মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে পৃথিবীকে ন্যায় বিচার ও ইনসাফ দ্বারা পরিপূর্ণ করেন।
_________________________________________
কারবালার ইতিহাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, حُسَيْنٌ مِنِّي وَأَنَا مِنْ حُسَيْنٍ أَحَبَّ اللهُ مَنْ أَحَبَّ حُسَيْنًا -হুসাইন আমার থেকে এবং আমি হুসাইন থেকে। যে হুসাইনকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। (সুনান আত-তিরমিযী, ৩৭৭৫)
প্রশ্ন আসতে পারে যে, ইয়াযীদ যেহেতু ক্ষমতায় বসেই গেছেন, তারপর হুসাইন (আ.) এর বাইআত নেয়ার জন্য এত জোরাজুরি কেন করেছিলেন? এমন তো নয় যে, হুসাইন (আ.) বাইআত না দিলে ইয়াযীদ ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। জবাব হলো, অন্য সবার বাইআত আর হুসাইন (আ.) এর বাইআত এক বিষয় নয়। হুসাইন (আ.) যদি ইয়াযীদের হাতে বাইআত দিয়ে দিতেন, তাহলে মনে হতো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবার ইয়াযীদকে স্বীকার করে নিয়েছেন। অনেকে বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) প্রমুখ সাহাবীরা যখন ইয়াযীদের হাতে বাইআত দিয়েছিলেন, তখন হুসাইন (আ.) কেন দেননি? জবাব হচ্ছে, ওই সকল সাহাবীরা তখন রাজনৈতিক হিকমাত দেখেছিলেন, আর হুসাইন (আ.) দেখেছিলেন খিলাফাতে রাশিদার সুন্নাত। হুসাইন (আ.) জানতেন যে, দ্বীন কেবল মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান, যাতে ইবাদত-বন্দেগী যেমন রয়েছে, অর্থব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনাও তেমন রয়েছে। যদি রাষ্ট্র পরিচালনার ভার একজন অযোগ্য ফাসিক ব্যক্তির হাতে চলে যায়, তাহলে দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা খন্ডিত হবে এবং উম্মতের বিনাশ চলে আসবে। তাই ইয়াযীদের শাসনকে মেনে না নিয়ে বরং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই তাঁর কাছে যথোপযুক্ত মনে হয়েছিল। এ প্রতিবাদ হুসাইন (আ.) নিজের জন্য করেননি, করেছিলেন উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য। আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإيمَانِ
-তোমাদের মধ্যে কেউ অন্যায় হতে দেখলে সে যেন হাত (শক্তি) দিয়ে সেটি রুখে দেয়। এতে সক্ষম না হলে জবান দিয়ে, এতেও সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে। আর অন্তর দিয়ে ঘৃণা করা দুর্বল ঈমানের লক্ষণ। (সহীহ মুসলিম, ৪৯)
ইরাকের কুফা শহরের অধিবাসীরা ইয়াযীদের হাতে বাইআত না দিয়ে হুসাইন (আ.) এর কাছে পত্র প্রেরণ করেছিল। আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কুফায় আগমন করার জন্য। অবস্থা বুঝতে পেরে ইয়াযীদ কুফার তৎকালীন গভর্নরকে অপসারণ করে ইবন যিয়াদকে কুফার দায়িত্ব প্রদান করে। এই ইবন যিয়াদ ছিল কারবালা যুদ্ধের নীলনকশা প্রণয়নকারী। যেহেতু যুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়, তাই আমি পূর্বাপর ঘটনাবলি এখানে বিস্তারিত উল্লেখ করছি না।
হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের ভবিষ্যদ্বাণী
আবদুল্লাহ ইবন নুজায়-এর পিতা বর্ণনা করেছেন, একবার সফরকালে তাঁরা নিনওয়া নামক স্থান অতিক্রম করছিলেন। তখন আলী (আ.) চিৎকার দিয়ে বললেন, হে আবূ আবদিল্লাহ (হুসাইন) ফোরাতের তীরে ধৈর্য ধারণ করো। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? আলী (আ.) বললেন,
دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ وَعَيْنَاهُ تَفِيضَانِ قُلْتُ يَا نَبِيَّ الله أَغْضَبَكَ أَحَدٌ مَا شَأْنُ عَيْنَيْكَ تَفِيضَانِ قَالَ بَلْ قَامَ مِنْ عِنْدِي جِبْرِيلُ قَبْلُ فَحَدَّثَنِي أَنَّ الْحُسَيْنَ يُقْتَلُ بِشَطِّ الْفُرَاتِ قَالَ فَقَالَ هَلْ لَكَ إِلَى أَنْ أُشِمَّكَ مِنْ تُرْبَتِهِ قَالَ قُلْتُ نَعَمْ فَمَدَّ يَدَهُ فَقَبَضَ قَبْضَةً مِنْ تُرَابٍ فَأَعْطَانِيهَا فَلَمْ أَمْلِكْ عَيْنَيَّ أَنْ فَاضَتَا.
-আমি একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরে প্রবেশ করে দেখি তাঁর চোখ অশ্রু তে ভেজা। জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর নবী, কেউ কি আপনাকে অখুশি করেছে? আপনার চোখ ভেজা কেন? তিনি বললেন, কিছুক্ষণ আগে জিবরাঈল এসেছিলেন। বলে গেলেন, (আমার নাতি) হুসাইন ফোরাতের তীরে শহীদ হবেন। জিবরাঈল আমাকে বললেন, আপনি কি ওই মাটির ঘ্রাণ শুঁকতে চান? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি হাত বাড়িয়ে কিছু মাটি এনে আমার হাতে দিলেন। ফলে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। (আবূ ইয়ালা, ৩৬৩; তাবরানী, ২৮১১)
হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের সংবাদ
কুফাবাসীর আমন্ত্রণে মক্কা থেকে কুফায় যাওয়ার পথে ইয়াযীদের প্রেরিত সেনাবাহিনী হুসাইন (আ.) এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের পথ আটকে দেয়। তাঁকে ইয়াযীদের পক্ষে বাইআত দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু হুসাইন (আ.) এমনটি করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলাফলস্বরূপ ৬১ হিজরীর ১০ই মুহাররাম ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে আমর ইবন সাদ ও শিমর ইবন যুল জাওশানের নেতৃত্বাধীন ৮ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সাথে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন নবী-দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আ.) এবং আহলুল বাইতের আরও ১৮ জন সদস্যসহ মোট ৭২ জন পুরুষ (বিদায়াহ, ৮ম খন্ড)। অসুস্থ অবস্থায় তাবুতে অবস্থান করার কারণে আলী ইবন হুসাইন যাইনুল আবিদীন (আ.) এ শাহাদাত থেকে বেঁচে যান।
অনেকে বলে থাকেন, হুসাইন (আ.) এর শাহাদাত ইয়াযীদের হাত ছিল না। বরং ইবন যিয়াদ একাই এ বিষয়ে আদেশ দিয়েছিল। অথচ হুসাইন (আ) এর ওপর আক্রমণকারী বাহিনীটি মূলত রাজধানী দামেস্ক থেকে তুরস্কের দায়লাম অঞ্চলে যুদ্ধ করার জন্য যাচ্ছিল। ইয়াযীদের সরাসরি নির্দেশ ব্যতীত ইবন যিয়াদের পক্ষে এত বড় বাহিনীকে পথ পরিবর্তন করে অন্যত্র যুদ্ধে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানের আদেশে চলে, প্রাদেশিক গভর্নরের আদেশে নয়। অতএব কারবালার ঘটনায় ইয়াযীদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করা নেহায়েত মূর্খতা।
হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের সংবাদ মক্কায় আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) এবং মদীনায় উম্মে সালামাহ (রা.) এর কাছে পৌঁছে দেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইবন আব্বাস (রা.) বলেছেন,
رأيتُ النبيَّ صلَّى الله عليه وسلَّم في المنام بنِصْف النهار أشعثَ أغْبَرَ معه قارورةٌ فيها دمٌ يلتقطُه قال قلت يا رسول الله ما هذا قال دمُ الحسين وأصحابه لَم أزَلْ أتتبَّعُه منذُ اليومِ. قال عمَّار فحَفِظْنا ذلك اليوم فوجَدْناه قُتِلَ ذلك اليوم
-আমি এক দুপুরবেলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বপ্নে দেখলাম। তাঁর চুল অবিন্যস্ত, চেহারা ছিল ধুলোমাখা। হাতে এক শিশি রক্ত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার হাতে কী? তিনি জবাব দিলেন, হুসাইন ও তার সাথিদের রক্ত। আমি আজ সারাদিন এগুলো সংগ্রহ করছি। বর্ণনাকারী বলেছেন, আমরা ওই দিনটি মনে রেখেছি এবং জানতে পেরেছি যে, ওই দিনেই হুসাইনকে শহীদ করা হয়েছিল। (মুসনাদে আহমাদ, ২১৬৫)
উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামাহ (রা.) বলেছেন,
رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم تَعْنِي فِي الْمَنَامِ وَعَلَى رَأْسِهِ وَلِحْيَتِهِ التُّرَابُ فَقُلْتُ مَا لَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ شَهِدْتُ قَتْلَ الْحُسَيْنِ آنِفًا
-আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বপ্নে দেখলাম। তাঁর মাথা ও দাড়ি মুবারকে মাটি লেগে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার কী হয়েছে? তিনি বললেন, এইমাত্র দেখে আসলাম হুসাইনকে হত্যা করা হয়েছে। (সুনান আত-তিরমিযী, ৩৭৭১)
কারবালার ঘটনায় সাহাবা-তাবিঈদের প্রতিক্রিয়া
এক. শাহার ইবন হাউশাব বলেছেন, হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের কথা জানতে পেরে উম্মে সালামাহ (রা.) চিৎকার দিয়ে বলেন, قَتَلُوهُ قَتَلَهُمُ اللهُ غَرُّوهُ وَذَلُّوهُ لَعَنَهُمُ اللهُ
-ওরা তাঁকে হত্যা করেছে, আল্লাহ ওদেরকে ধ্বংস করুন। ওরা তাঁকে ধোকা দিয়েছে এবং অপদস্থ করেছে, ওদের প্রতি আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক। (মুসনাদে আহমাদ, ২৬৫৫০)
দুই. একবার ইরাকের কিছু লোক আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) এর কাছে মাছি মারা বিষয়ে প্রশ্ন করেছিল। তিনি জবাব দিলেন,
أَهْلُ الْعِرَاقِ يَسْأَلُونَ عَنِ الذُّبَابِ وَقَدْ قَتَلُوا ابْنَ ابْنَةِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم
-ইরাকবাসী মাছির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে। অথচ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৌহিত্রকে হত্যা করেছে। (সহীহ বুখারী, ৩৭৫৩)
তিন. ইমাম ইবরাহিম নাখয়ী (ইমাম আবূ হানীফার উস্তায) বলেছেন,
لَوْ كُنْتُ فِيمَنْ قَتَلَ الْحُسَيْنَ بْنَ عَلِيٍّ ثُمَّ غُفِرَ لِي ثُمَّ أُدْخِلْتُ الْجَنَّةَ اسْتَحْيَيْتُ أَنْ أَمُرَّ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَنْظُرَ فِي وَجْهِي
-যদি আমি হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতে জড়িত থাকতাম, এরপর ক্ষমা পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতাম, তবুও আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুখ দেখাতে লজ্জাবোধ করতাম। (তাবরানী, ২৮২৯)
শেষকথা
কোনো ব্যক্তিবিশেষের প্রতি সমালোচনার তীর ধার্য করা উদ্দেশ্য ছিল না। ইতিহাসের গভীর গিরিখাতে প্রবেশ করে সত্য তালাশ করার পেছনে আমার একমাত্র অভিপ্রায় হচ্ছে আহলুল বাইতের প্রতি বনু উমাইয়ার নিদারুণ অত্যাচারের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবহিত হওয়া। নিবন্ধে উল্লেখিত হাদীসসমূহ এবং উলামায়ে কিরামের বিশ্লেষণকে সামনে রাখলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কারবালার নির্মম ঘটনা হঠাৎ করে সংঘটিত হয়নি। এটি ছিল দীর্ঘদিনের উত্তরোত্তর অবনতির পরিণাম। উসমান (রা.) এর হত্যাকাণ্ডের পর থেকে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৌত্রিক রেষারেষি, খিলাফাত ভেঙ্গে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরা রাজতন্ত্রের গোড়াপত্তন এবং সে রাজতন্ত্রের দূষিত উপজাত হিসেবে উদিত হওয়া ইয়াযীদ ও ইবন যিয়াদের মতো লোকদের কারণেই সংঘটিত হয়েছিল কারবালার যুদ্ধ, মদীনা ও মক্কা আক্রমণ। প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি সব সময়ই কারবালার মতো ঘটনার জন্ম দেয়।
__________________________________________
কারবালার চিরন্তন চেতনা
✍️ মইনুল হোসেন
প্রতি বছর মহরম মাস আসলে বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজ ইমাম হুসাইন (আ.) এবং কারবালার শহীদদের হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি স্মরণ করার জন্য একত্রিত হয়। ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই শোকের অনুষ্ঠান শুধুমাত্র এই ঘটনার আচারগত স্মরণের জন্য নয়; বরং এর ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে গভীর নৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “অবশ্যই তাদের গল্পে বুদ্ধিমানদের জন্য নৈতিক শিক্ষা রয়েছে” (১২:১১১)। এই আলোকেই কারবালার বার্ষিক স্মরণের তথা আজাদারী শোকপালনের কয়েকটি দিক আলোচনা করা হলো:
১. নৈতিক ও আচরণগত গঠনঃ
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কোনো ভালো বিষয়ের বারবার চর্চা ও স্মরণ মানুষের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। মহরমের মজলিশ, মার্সিয়া, নওহা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ যখন ইমাম হুসাইনের ত্যাগ, সাহসিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল থাকার গল্প শোনে, তখন অবচেতনভাবেই সেই আদর্শগুলো তার নিজের জীবনে প্রতিফলিত হতে শুরু করে। কুরআনও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বলে—“নিশ্চয়ই স্মরণ মুমিনদের উপকার করে” (৫১:৫৫)। ফলে, এই বার্ষিক আয়োজন আসলে হৃদয়ের এক ধরনের নৈতিক প্রশিক্ষণ, যা কারবালার আদর্শকে কেবল পুঁথিগত না রেখে বাস্তব জীবনে রূপান্তর করতে শেখায়।
২. সত্য ও মূল্যবোধের সংরক্ষণ
ইতিহাসে অত্যাচারী শাসকরা বরাবরই কারবালার স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল ইমাম হুসাইনের মাজার পর্যন্ত ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু শত নিপীড়ন সত্ত্বেও ইমাম হুসাইনের শোক পালনকারী আজাদারগণ এই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। স্বৈরাচারী শক্তি সবসময় ইতিহাস ও স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যাতে তাদের নিজেদের অন্যায় ঢাকা পড়ে যায়। প্রতি বছর কারবালার পুনরাবৃত্তি করার অর্থ হলো—এইসব অত্যাচারী শক্তির দাপটের মোকাবিলায় সত্যকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া। কোন কোন ধরনের নৈতিক অবক্ষয় সমাজে অন্যায়কে টিকিয়ে রাখে-সেগুলি এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে মনে করিয়ে দেওয়া।
৩. কারবালার শিক্ষা
কারবালার স্মৃতি তখনই সার্থক হবে যখন তা আমাদের হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটাবে। কেবল অশ্রুবিসর্জন নয়, এই ইতিহাস আমাদের কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপ নেওয়ার শিক্ষা দেয়:
ইতিহাস জানা ও প্রচার করা: ইমাম হুসাইনের জীবন, আদর্শ ও তাঁর দেওয়া খুতবাগুলো গভীরভাবে জানা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান: কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী (“তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো...” ৪:১৩৫), পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা সমাজ—সবখানেই সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
মানবতার সেবা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিন ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করা আজীবন ইবাদতের সমতুল্য। সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করাই কারবালার মূল চেতনা।
আত্মশুদ্ধি: কারবালার আয়নায় নিজের আত্মাকে দেখা উচিত যে—আমরা নিজেরা কতটা সত্য ও ন্যায়ের পথে চলছি।
উপসংহার
মহানবী (সা.) বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই হুসাইনের শাহাদাতের ব্যাপারে মুমিনদের হৃদয়ে এমন একটি উত্তাপ রয়েছে যা কখনো প্রশমিত হয় না।” এই উত্তাপ কেবল আবেগ নয়, এটি একজনের জীবনে চলার শক্তি।
কারবালা কোনো অতীত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি বর্তমানের এক জীবন্ত গাইডবুক। কারবালার ঘটনা কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষের জন্য আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। সত্য ও মিথ্যার লড়াই যেহেতু চিরন্তন, তাই ইমাম হুসাইনের রেখে যাওয়া আদর্শও চির প্রাসঙ্গিক। আমাদের দুয়া হওয়া উচিত—আমরা যেন কেবল চোখের পানিতে কারবালাকে স্মরণ না করি। বরং আমাদের চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমেও এর চেতনাকে জীবনে ধারণ করতে পারি।
_________________________________________
আয়াতুল্লাহ খামনায়ীর ১০ টি কথা
১. যদি আমরা মারা যাই, তাতে বড় কোনো বিষয় নয়—কারণ ইরান গুরুত্বপূর্ণ নয়, ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ।
২. ইরানি জাতি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে যেমন দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি চাপিয়ে দেওয়া শান্তির বিরুদ্ধেও দাঁড়াবে, এবং এই জাতি কারও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।
৩. গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যখন একজন মানুষ উপলব্ধি করে যে শত্রু অহংকারভরে দেশের ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে চাইছে… তখন শত্রুর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে এবং প্রতিরোধে বুক চিতিয়ে দিতে হবে।
৪. আমরা কারও অধিকার লঙ্ঘন করিনি, এবং কখনও করব না; তেমনি কেউ আমাদের অধিকার লঙ্ঘন করবে—এটাও আমরা মেনে নেব না। আমরা কারও অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করব না; এটাই ইরানি জাতির যুক্তি।
৫. একজন নারী একটি কোমল ফুল, গৃহকর্মী নয় ।
৬. শত্রুদের কাছে আত্মসমর্পণ না করা ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম নীতি। তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে শত্রুর সাথে আলোচনা বা দরকষাকষি করা মানে আত্মসমর্পণ করা নয়।
৭. ইসলাম সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে বোঝার একটি সুযোগ তৈরি করুন। হয়তো আপনার দায়িত্ববোধের কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইসলাম ও পশ্চিমের এই বর্তমান মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাস কম ক্ষোভ নিয়ে লিখবে।
৮. মহরম আমাদের ইতিহাস শুধু নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রের জন্য এক চলমান পথনির্দেশ।
৯. আমার এই জীবনের মূল্য খুবই সামান্য। আমার শরীরও অক্ষম, দূর্বল। যে সামান্য মর্যাদা এখনো আমার মধ্যে আছে — সেটাও আপনারা-ই আমাকে দান করেছন। আমি এই আমার সামান্য সবটুকুও আপনাদের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। এই বিপ্লবের জন্য, ইসলামের জন্য — আমি আমার সবকিছুকে কুরবানি করতে প্রস্তুত। আমার প্রাণ, আমার সত্তা—সব যেন আপনাদের রাহে কুরবান হয়ে যায়, হে আমাদের নেতা, হে আমাদের পথপ্রদর্শক, আমাদের জন্য দোয়া করুন।আপনারাই আমাদের মালিক, আপনারাই এই দেশের মালিক, আপনারাই এই বিপ্লবের মালিক। আপনারাই আমাদের ভরসা। আমরা কখনোই বিপ্লবের এই পথ ছেড়ে যাবো না; আমরা এই পথেই অবিচল থাকবো, আরও দৃঢ়ভাবে। আপনারা আপনাদের দোয়া, সহায়তা, মনোযোগ দিয়ে আমাদেরকে এই পথে সহায়তা করুন।"
১০. হে উম্মাহ, আশা হারাবেন না। সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন, কারণ এই ঐক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
__________________________________________
আজাদারী ও ইমামে জামানা (আ.)
৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার উত্তপ্ত মরুভূমিতে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের নিয়ে আল্লাহর দ্বীন রক্ষার জন্য যে অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সেই আত্মত্যাগের স্মৃতি ধারণ ও প্রচারের নামই আজাদারী। আর এই আজাদারীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত আছেন ইমামে জামানা, হযরত ইমাম মাহদী (আ.)—যিনি কারবালার রক্তস্নাত আদর্শকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত শেষ হুজ্জত।
অনেকেই মনে করেন আজাদারী শুধু শোক প্রকাশ বা অশ্রু বিসর্জনের নাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আজাদারী হলো ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জীবন্ত রাখা। কারবালার শহীদদের স্মরণ করে কান্না করা অবশ্যই সওয়াবের কাজ, কিন্তু সেই কান্নার প্রকৃত মূল্য তখনই হয় যখন তা মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করে এবং তাকে সত্য, ন্যায় ও তাকওয়ার পথে পরিচালিত করে। আজাদারী মানুষের হৃদয়কে কোমল করে, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শিক্ষা দেয়। এটি শুধু একটি আবেগ নয়; বরং একটি আন্দোলন, একটি শিক্ষা এবং একটি জীবনব্যবস্থা।
হযরত ইমাম মাহদী (আ.) হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আহলুল বাইতের শেষ ইমাম। তিনি সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি আল্লাহর নির্দেশে গায়বতের পর্দায় অবস্থান করছেন এবং নির্ধারিত সময়ে আবির্ভূত হয়ে পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ করবেন।
কারবালার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বংশধর এবং তাঁর রক্তের উত্তরাধিকারী। বিভিন্ন জিয়ারত ও দোয়ায় আমরা দেখতে পাই যে ইমামে জামানা (আ.) সর্বদা তাঁর দাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোককে হৃদয়ে ধারণ করেন। বর্ণনায় এসেছে যে তিনি কারবালার মুসিবতের জন্য অশ্রুপাত করেন এবং শহীদদের স্মরণে শোক প্রকাশ করেন। ইমাম হুসাইন (আ.) যেই লক্ষ্য নিয়ে কারবালায় শাহাদাত বরণ করেছিলেন, ইমাম মাহদী (আ.) সেই লক্ষ্যকেই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করবেন।
একজন প্রকৃত মুমিন যখন আন্তরিকতার সঙ্গে আজাদারী করেন, তখন তিনি শুধু ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন না; বরং ইমামে জামানা (আ.)-এর হৃদয়কেও আনন্দিত করেন। কারণ ইমামে জামানা (আ.) চান যে মানুষ কারবালার শিক্ষা ভুলে না যাক এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক। মজলিসে অংশগ্রহণ, মাতম, নওহা পাঠ, জিয়ারত এবং কারবালার ইতিহাস আলোচনা—এসবই আজাদারীর অংশ। তবে এর চেয়েও বড় বিষয় হলো নিজের চরিত্রকে হুসাইনি আদর্শে গড়ে তোলা। একজন মানুষ যদি মজলিসে উপস্থিত হয় কিন্তু তার চরিত্রে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়া না আসে, তবে তার আজাদারী অপূর্ণ থেকে যায়।
ইমামে জামানা (আ.)-এর আবির্ভাবকে অনেক আলেম “কারবালার বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়” বলে অভিহিত করেছেন। কারণ তিনি আবির্ভূত হয়ে পৃথিবী থেকে জুলুম, অত্যাচার, বৈষম্য ও অন্যায় দূর করবেন। তিনি সেই সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেন, যার জন্য কারবালায় রক্ত ঝরেছিল। আজ পৃথিবী অন্যায়, যুদ্ধ, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ে আক্রান্ত। এই পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজেকে ইমামে জামানা (আ.)-এর সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলা। আর সেই প্রস্তুতির অন্যতম মাধ্যম হলো প্রকৃত আজাদারী।
আজাদারী আমাদের শেখায়:
১, সত্যের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে।
২, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।
৩, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে।
৪, মানবতার সেবা করতে।
৫, ইমামে জামানা (আ.)-এর আবির্ভাবের জন্য আত্মিক ও নৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে।
যে হৃদয়ে হুসাইনের ভালোবাসা থাকে, সে হৃদয় কখনো জালিমের পক্ষে দাঁড়াতে পারে না। আর যে হৃদয় ইমামে জামানা (আ.)-এর অপেক্ষায় থাকে, সে সর্বদা নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করে।
আজাদারী ও ইমামে জামানা (আ.) একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। আজাদারী আমাদের কারবালার শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং ইমামে জামানা (আ.)-এর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য অশ্রু বিসর্জন শুধু শোক নয়, এটি একটি অঙ্গীকার—সত্যের পথে চলার অঙ্গীকার, ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং ইমামে জামানা (আ.)-এর বিশ্বজনীন বিপ্লবের সহযোদ্ধা হওয়ার অঙ্গীকার।
আসুন, আমরা শুধু মহররমের কয়েকটি দিনে নয়, বরং সারা জীবন হুসাইনি আদর্শকে ধারণ করি, ইমামে জামানা (আ.)-এর আবির্ভাবের জন্য দোয়া করি এবং নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলি যাতে তিনি আবির্ভূত হলে আমাদের তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
আল্লাহুম্মা আজ্জিল লিওয়ালিয়্যিকাল ফারাজ। হে আল্লাহ! ইমামে জামানা (আ.) আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন। আমীন।
__________________________________________
আযাদারী বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হাদীস (সংগৃহীত)
✍️ রাজা আলী
আযাদারী একটি ফার্সি শব্দ। এর অর্থ হলো শোকপালন। ইমাম হোসেন আঃ, তাঁর পরিবার বর্গ এবং সহযোগীদের দ্বীন ইসলামের জন্য করুণ আত্মত্যাগ কে স্মরণ করে যে শোক পালন করা হয়, তাকেই আযাদারী বলে থাকি।আযাদারীর গুরুত্ব অনেক বেশি।আযাদারী সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস নিচে উল্লেখ করা হলো।
১.শহীদ সঙ্গীদের পুরস্কার*:
ইমাম রিযা (আঃ) তাঁর এক সাহাবীকে বললেন: যদি তুমি চাও যে, হুসাইন (আঃ)-এর সাথে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের সমতুল্য সওয়াব অর্জন করবে, তাহলে যখনই তাঁকে স্মরণ করবে, বলবে: 'হায়! যদি আমি তাঁদের সাথে থাকতাম ! তাহলে আমি এক বিরাট সাফল্য অর্জন করতাম।'
(ওয়াসাইল আল-শিয়াহ, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৫০১)।
২.হুসাইন (আঃ) সম্পর্কে কবিতা/শোকগাথা পাঠের পুরস্কার
ইমাম সাদিক (আঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি হুসাইন (আঃ)-কে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করে এবং এর দ্বারা নিজে কাঁদে ও অন্যদেরও কাঁদায়, আল্লাহ তার উপর জান্নাত আবশ্যক করে দেন এবং তার গুনাহ মাফ করে দেন। (রিজাল আল-শাইখ আল-তুসি, পৃষ্ঠা ১৮৯)।
৩.অশ্রু : নরকের বাধা
ইমাম বাকির (আঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি আমাদেরকে স্মরণ করে, অথবা যার উপস্থিতিতে আমাদেরকে স্মরণ করা হয়, এবং (এর ফলে) তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ে, যদিও তা একটি মশার ডানার সমান পরিমাণও হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করবেন এবং সেই অশ্রুকে তার ও জাহান্নামের আগুনের মাঝে প্রতিবন্ধক বানিয়ে দেবেন।
(আল-গাদীর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২০২)।
৪.বিশ বছরের কান্না!
ইমাম সাদিক (আঃ) বলেন: 'আর আলি ইবনুল হুসাইন (আঃ) (কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর) কুড়ি বছর ধরে হুসাইন (আঃ)-এর জন্য কেঁদেছিলেন; তাঁর সামনে কোনো খাবার দেওয়া হলেই তিনি কাঁদতে শুরু করতেন।'
(বিহার আল আনওয়ার, খণ্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ১০৮)।
৫.শিয়া:সঙ্গী ও সহযোগী
ইমাম 'আলী (আঃ) বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের জন্য এমন অনুসারী (শিয়া) মনোনীত করেছেন, যারা আমাদের সাহায্য করে, আমাদের সুখে সুখী হয় এবং আমাদের দুঃখে দুঃখী হয়।
(গুরারাল-হিকাম খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫)।
৬.স্বর্গ : শোকের প্রতিদান
ইমাম আলি ইবনুল হুসাইন (আঃ) বলতেন: প্রত্যেক মু'মিন, যার চোখ থেকে হুসাইন ইবনুল আলি (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের শোকে এমন অশ্রু ঝরে যে, তা তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের উচ্চ কক্ষে স্থান দেবেন।
(ইয়ানাবিয়াল মাওয়াদ্দাহ, পৃষ্ঠা ৪১৯)।
৭ .ফাতিমা (আঃ)-এর সন্তানদের স্মরণে
ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) বলেছেন: নিশ্চয়ই আমি যখনই ফাতিমা (আঃ)-এর সন্তানদের শাহাদাতের কথা স্মরণ করেছি, তখনই তা আমাকে অশ্রুসিক্ত করেছে।
(বিহার আল-আনোয়ার খণ্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ১০৯)।
------ _____------_____------______------______------
------ _____------_____------______------______------
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
আয়াতুল্লাহর বিদায়
তোমার যাওয়াতে আমরা
অভিভাবক হারিয়েছি
পর্দার আড়ালে কথা বলার
আয়াতুল্লাহ কে হারিয়েছি।
তোমাকে দেখেলে অন্তরে
প্রশান্তির ছায়া খুঁজে পাই
আজ যেন নিজেকে লাগছে
বড্ড একা ও নিরুপায় ।
তোমার সাহস আর খোদাভীরুতা
দুনিয়া দেখেছে স্পষ্ট চোখে,
সারা জগতের মানবসমাজ
আজ তোমাকে চিনেছে।
তোমার ত্যাগ আর অটল ঈমান
ইতিহাসে এঁকেছে অমলিন চিহ্ন,
আজ বিশ্ববাসী জানে স্পষ্ট—
শিয়া জাতি, ইসলামের মেরুদণ্ড।
পিপাসা ছিল শাহাদাতের
তোমার আসা পুরন হয়েছে
হাই! দুনিয়া ছাড়িলে তুমি
এবাদাত ও রোজার হালতে।
__________________________________________
বীর খামনেয়ী
✍️ মইনুল হোসেন
ছিয়াশি বছর বয়সেও যিনি ছিলেন বীর এক যোদ্ধা,
হৃদয়ে যাঁর জিন্দা ছিল নূরানী আর ঈমানী জজবা।
শহীদি তামান্না বুকে নিয়ে যিনি পথ চলেছেন চিরকাল,
জ্ঞানের সাগরে ডুব দিয়ে যিনি গড়েছেন প্রজ্ঞার ঢাল।
পরহেজগারিতে অনন্য তিনি, আধ্যাত্মিকতায় বীর,
জালিমের কাছে নত করেননি কখনও মহিমান্বিত শির।
আমেরিকা আর ইজরায়েলের দম্ভকে চূর্ণ করে,
অটল অবিচল হয়ে দাঁড়িয়েছেন— একলা আপন ঘরে।
নিঃসঙ্গ ইরান, চারপাশে সব শয়তানি চক্রান্ত,
তবুও হারাননি সাহস তিনি, হননি কভু ক্লান্ত।
সাম্রাজ্যবাদী হায়েনা রুখতে একাই তিনি তুফান,
মযলুমের তরে বিলিয়ে দিলেন আপন প্রাণ।
হায়দারী তেজে দীপ্ত কণ্ঠ, অন্তরে খোদা-ভীতি,
সত্যের তরে লড়ে যাওয়াই ছিল যাঁর আজব রীতি।
বিপ্লবী এক রুহ্ হয়ে আজ অমর মহানায়ক,
ইতিহাসে লেখা থাকবে— তিনি হলেন সত্যের ধারক ও বাহক।
__________________________________________
খামিনি
✍️ রাজা আলী
তুমি অটল পর্বতের মতো
বেড় দিয়েছো একটি অক্ষ
চেতনায় শান দিয়েছো বেশ
ভয়ে আছে আজ শত্রু পক্ষ।
তোমার নামেতেই ওদের ভয়
বিরাট এক মৃত্যু সম্মুখে দেখে
সূর্যের মতো দীপ্তিমান তুমি
শত্রু রা অনুকম্পা য় কাঁপে।
তুমি একজন ধর্মীয় নেতা
ইসলাম ই তোমার অনুসৃত
তুমি তো ইমামের সৈনিক এক
বাকি তিন'শ বারো থাকলে কি হত?
তোমার দিকনির্দেশনা প্রবল বিজ্ঞ
এক একটি বাক্যেই উজ্জীবন
সহস্র সেনা তৈরি মৃত্যুর মুখে
মৃত্যু অবধি ভঙ্গ দেবে না রণ।
__________________________________________
রক্তাশ্রুর আজাদার
কারবালার বুকে সূর্য ডুবেছে,
তবু ব্যথা ডুবেনি আজও;
ফোরাত বয়ে চলে নীরবে,
তৃষ্ণার গল্প বলে আজও।
আমরা কাঁদি অশ্রুর জলে,
মাতমে ভরে দিই ধরা;
কিন্তু একজন কাঁদেন নীরবে,
রক্তাশ্রু ঝরে যাঁর চোখভরা।
তিনি আমাদের ইমামে জামানা,
হুসাইনের শোকের উত্তরাধিকার;
প্রতিটি নিশ্বাসে যার জাগে
কারবালার রক্তাক্ত স্মৃতির ভার।
"হে দাদা!"— ডাকে তাঁর হৃদয়,
"কীভাবে ভুলে থাকি তোমায়?"
অশ্রু ফুরালে রক্ত ঝরে,
ভালোবাসার গভীর ব্যথায়।
আজাদারীর প্রতিটি মজলিসে,
প্রতিটি নওহা, প্রতিটি মাতমে,
আমরা খুঁজি সেই মাওলাকে,
যিনি কাঁদেন নিভৃত নির্জনে।
হে সাহিবুজ্জামান!
আমাদের অশ্রুকে কবুল করুন,
আপনার রক্তাশ্রুর কাফেলায়
আমাদেরও সামিল করুন।
যেন "ইয়া হুসাইন" বলতে বলতে
হৃদয় ভেঙে যায় প্রেমে,
আর আপনার অপেক্ষার প্রদীপ
জ্বলতে থাকে রূহের গভীরে।
------ _____------_____------______------______------