Saturday, January 17, 2026

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ রজব সংখ্যা



আরবি: রজব, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 

সহযোগী সম্পাদকরাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

সম্পাদকীয়

ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কিত
✍️ ইমাম খোমেনী (রঃ)

যুগের ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর মারেফাত অর্জনের প্রয়োজনীয়তা (অনুবাদ)

মাওলা আলি (আঃ)-এর দৃষ্টিতে খেলাফত

ইমাম মাহ্দী (আ:) ও বর্তমান যুগ

ইমাম মাহদী (আঃ) জন্য অপেক্ষা: গভীরতা ও গুরুত্ব 
          ✍️ রাজা আলী 

 মাওলা-এ-কায়েনাত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) এর শিক্ষা




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

         মাওলা আলী

         আল আকসার ঋণ
                ✍️ রাজা আলী 

         কুল্লে ঈমান — মাওলা আলী (আ:)


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

আলহামদুলিল্লাহ! পবিত্র রজব মাস আত্মশুদ্ধি, তাওবা ও ইমানি জাগরণের এক বরকতময় সময়। এই মাস আমাদের হৃদয়ে নতুন করে জাগিয়ে রেখেছে মাওলা আলী (আ.)-এর ন্যায়, সাহস ও তাকওয়ার নূর এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতীক্ষার দায়িত্বশীল চেতনা।

আল-হুজ্জাত পত্রিকার এই রজব সংখ্যায় সেই চেতনাকেই তুলে ধরার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এতে রয়েছে মাওলা আলী (আ.)-কে নিয়ে রচিত দুটি হৃদয়স্পর্শী কবিতা—যেখানে ভালোবাসা ও আনুগত্বের অনুভূতি স্পষ্ট। পাশাপাশি “আল আকসার ঋণ” শীর্ষক কবিতাটি উম্মাহর ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে দেয়, নীরবতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। এই সংখ্যায় আরও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মাওলা আলী (আ.) ও ইমাম মাহ্দী (আ.)-কে কেন্দ্র করে চিন্তাশীল প্রবন্ধ, যেখানে ইমামতের দর্শন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং প্রতীক্ষার বাস্তব অর্থ গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে।

আমরা বিশ্বাস করি, রজব কেবল ইবাদতের মাস নয়; এটি চরিত্র গঠনের, অবস্থান গ্রহণের এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আগমনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। আল্লাহ তাআলা যেন এই প্রয়াস কবুল করেন এবং আলী (আ:)এর নূর ও মাহ্দী (আ:)এর চেতনায় আমাদের জীবন আলোকিত করেন—আমিন।

                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কিত
✍️ ইমাম খোমেনী (রঃ)

 ইমাম মাহদী (আঃ): (পৃঃ ৯) শিয়া মাজহাবের দ্বাদশ ইমাম হযরত হুজ্জাত্ ইবনে হাসান আসকারী (আঃ) ওরফে ইমাম মাহদীর (আঃ) ইমামতকাল তাঁর বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হবার পূর্বেই শুরু হয়। সমকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং আল্লাহ্ তায়ালার ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি আত্মগোপন অবস্থা বেছে নেন। তাঁর আত্মগোপন কাল

দুই ভাগে বিভক্ত। তাঁর ক্ষুদ্রতর আত্মগোপনকাল (غیبت صغری) ৬৯ বছর দীর্ঘায়িত হয়। এ সময় হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) তাঁর চারজন প্রতিনিধির মাধ্যমে পরোক্ষ ভাবে জনগণের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। এরপর তাঁর বৃহত্তর আত্মগোপন কাল (غیبت کبری) শুরু হয় যা এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং তাঁর আত্মগোপন মিথ্যার ওপর সত্যের বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, হযরত ইমাম মাহদীর (আঃ) আবির্ভাব ও সংগ্রাম হবে মিথ্যাপন্থীদের বিরুদ্ধে সত্যপন্থীদের অবিরত সংগ্রামের সর্বশেষ পর্যায়। অর্থাৎ ইতিহাসের পুরো সময় ধরে সত্যপন্থীদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে ও দিনের পর দিন সত্যের বিজয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। অতঃপর প্রতিশ্রুত মাহ্দী (আঃ) এ সংগ্রামকে চূড়ান্তভাবে ফলপ্রসূ করবেন এবং সত্য, ন্যায় নীতি ও ন্যায়বিচারের সূর্য উদিত হবে। আর সে সময়টি হবে মানুষের চৈন্তিক, মানসিক ও সামাজিক পূর্ণতার যুগ।

"অন্তিম বাণী" গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত
_________________________________________

যুগের ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর মারেফাত অর্জনের প্রয়োজনীয়তা (অনুবাদ)

يوم ندعو كل أناس بإمامهم.

“ যখন আমি সমস্ত মানুষদেরকে তাদের ইমাম সহ ডাকবো "(অনুবাদ)।

প্রতিটি বিবেচক ও বুদ্ধিমান মানুষ জানে যে, আল্লাহ্ ও তার প্রেরিত সমস্ত বিশেষ ব্যক্তিত্বকে চেনা অবশ্যই প্রয়োজন। এটাও প্রয়োজন যে, আল্লাহ্ ও তার রাসুলকে জানার পর নিজের যুগের ইমাম (আঃ)-কে চেনা এবং তার ইমামতকে কবুল করে নেওয়া। কেননা, তাওহীদ ও নবুয়াতের পরে ইমামত,অর্থাৎ নিজের যুগের ইমামের মারেফাত প্রতিটি মানুষের উপর ওয়াজীব। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর একটি হাদীসকে-যেটি উপরে উল্লেখিত আয়েতটির সঙ্গে সম্পর্কিত,-

من مات ولم يعرف امام زمانه مات ميتة جاهليه

“যে ব্যক্তি নিজের যুগের ইমামের মারেফাত ব্যতীত মৃত্যুবরণ করবে, তার মৃত্যু মূর্খতার মৃত্যুর ন্যায়” (অনুবাদ)।

মূর্খতাঃ- মূর্খতা বলতে বোঝায় দ্বীন ইসলাম প্রচারের পূর্বে যে দিনগুলিতে মানুষ পথভ্রষ্ট ও বেদ্বীন ছিল। কোনো ব্যক্তি তাওহীদ, নবুওয়াত ও কোরআনের উপর বিশ্বাস রাখার সাথে সাথে যদি দ্বীনি আমল করে, অথচ যুগের ইমাম (আঃ)-এর প্রতি মারেফাত না রাখে তবে রাসুল (সাঃ)-এর দৃষ্টিভঙ্গিতে তার মৃত্যু হবে পথভ্রষ্ট মূর্খের মতো। তাওহীদ, নবুওয়াত এবং এবাদাত কবুল হওয়ার একমাত্র রাস্তা হ'ল ইমাম (আঃ)-এর মারেফাত অর্জন করা। প্রসঙ্গত একটি উদাহারণ দেওয়া যাক:ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)-এর যুগে বসবাসকারী মানুষদের উপর তাঁর মারেফাত ওয়াজীব ছিল। এই মারেফাত ব্যতীত তাদের দ্বীন কখনো সম্পূর্ণ ছিল না। আর বর্তমান যুগে আমাদের ইমাম মাহদী (আঃ)-ই খোদার হুজ্জাত। তাই আমাদের সকলের উপর ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর মারেফাত ওয়াজীব। তাওহীদ এবং নবুয়াতের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ইমাম (আঃ) দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর মারেফাত অর্জনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবন-বনস্পতির বীজটি।

      ইমাম রিযা (আঃ) এক সফর কালে 'নিশাপুর' অতিক্রম করছিলেন। তখন ঐ শহরের শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ বাসিন্দারা (যারা অধিকাংশই আহলে সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত ছিল) ইমাম (আঃ)-কে সম্মান ও মোবারকবাদ জানাতে এসেছিল। বিদায় নেওয়ার পূর্বমূহূর্তে তারা ইমাম (আঃ)-এর কাছ থেকে হাদীস শোনার ইচ্ছা পোষণ করেন। ফলে ইমাম রিযা (আঃ) একটি হাদীস বর্ণনা করেন--যার ধারা তাঁর পিতা থেকে রাসুল (সাঃ) পর্যন্ত এবং রাসুল (সাঃ) থেকে আল্লাহ্ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ইমাম রিযা (আঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসটি হল,
لا اله الا الله حصني فمن دخل حصنى امن من عذابي

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্-- আমার কিল্লাআর যে এই কিল্লাতে প্রবেশ করল, সে আমার আযাব থেকে রক্ষা পেল (অনুবাদ)। হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ হল, যে ব্যক্তি তাওহীদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রাণ পাবে। তাই হাদীসটি শোনার পরে আহলে সুন্নতের মানুষেরা ইমাম (আঃ)-এর ওপর খুবই সন্তুষ্ট হল। আর ইমাম (আঃ)-কে সফর সম্পূর্ণ করার জন্য বিদায় দিল। ইমাম রিযা (আঃ) কিছু দূর যাওয়ার পর পিছনের দিকে তাকিয়ে বলেন

بشروطها وانا من شروطها
তাওহীদের প্রতি বিশ্বাস এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য কিছু শর্ত আছে; আর আমি ঐ শর্তগুলির মধ্য থেকে একটি।

   উপরিউক্ত ঘটনা থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, ইমাম রিযা (আঃ)-এর ইমামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা যেমন সেই যুগে ওয়াজীব ছিল, তেমনি ভাবে বর্তমান যুগে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর মারেফাত আর তার ইমামতের উপর বিশ্বাস স্থাপনের মধ্য দিয়েই কেবল আমাদের ঈমান পরিপূর্ণ হতে পারে, আর আমরা আযাব থেকে রক্ষা ও নাযাত পেতে পারি।

 আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবারে দোয়া করি যে, তিনি যেন আমাদের অন্তরকে ইমাম (আঃ)-এর মারেফাত ও আহলেবাইত (আঃ)-এর মোহাব্বত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন। আমরা যেন ইমাম মাহদী (আঃ)-এর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে পৃথিবী থেকে যেতে পারি। আর সেই বিশেষ দিনে যখন সকলকে নিজ নিজ ইসাসের সঙ্গে ডাকা হবে, তখন আমরা যেন ইমাম আঃ এর সঙ্গে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে পারি।

_________________________________________

মাওলা আলি (আঃ)-এর দৃষ্টিতে খেলাফত

মাওলা আলি (আঃ)-এর দৃষ্টিতে খেলাফত একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দায়িত্ব, যা কেবল শাসনক্ষমতা নয় বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষা এবং উম্মাহর কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি মহান দায়িত্ব।

ইমাম আলি (আঃ)-এর খেলাফতের দর্শন:

1. খেলাফতের প্রকৃত উদ্দেশ্য:
   খেলাফত কোনো পার্থিব রাজত্ব নয়, বরং এটি দ্বীনের হেফাজত, সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

2. ক্ষমতার প্রতি উদাসীনতা:
   ইমাম আলি (আঃ) খেলাফতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন না যতক্ষণ না মুসলিমরা নিজেরাই তার দিকে ফিরে আসে। তিনি বলেন:  
   _“তোমরা জানো, আমি খেলাফতের চেয়ে পানি-ভেজা নালের চেয়ে কম মূল্যবান মনে করি, যতক্ষণ পর্যন্ত তা দ্বারা সত্য প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যা ধ্বংস না হয়।”_

3. শাসকের গুণাবলি:
   ইমাম আলি (আঃ)-এর মতে, খেলাফতের অধিকারী হতে হলে একজন শাসকের উচিত:
   - আল্লাহভীরু হওয়া
   - জুলুম থেকে বিরত থাকা
   - গরীবের পাশে দাঁড়ানো
   - সম্পদের অপব্যবহার না করা
   - ন্যায়ের জন্য নিজ পরিবার বা আত্মীয়র বিরুদ্ধেও রায় দেওয়া

4. নাহজুল বালাগা-তে তার দৃষ্টিভঙ্গি:
   ইমাম আলি (আঃ) খেলাফত নিয়ে অসংখ্য খুতবায় (বিশেষত খুতবা ৩ ও ৩৩) খেলাফতের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিশ্লেষণ করেছেন।

5. উম্মাহর প্রতি দায়িত্ব:
   তার মতে, খেলাফতের মূল লক্ষ্য উম্মাহর মধ্যে:
   - শান্তি প্রতিষ্ঠা
   - শিরক-মুনাফিকি নির্মূল
   - আদর্শিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা

নিচে নাহজুল বালাগা থেকে খেলাফতের দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে ইমাম আলি (আঃ)-এর গুরুত্বপূর্ণ খুতবার অংশ আরবি ভাষায় তুলে ধরা হলো:

১. খুতবা ৩ (الشقشقية) – খেলাফতের অধিকার:  
إِنَّهُ يَعْلَمُ أَنَّ مَحَلِّي مِنْهَا مَحَلُّ الْقُطْبِ مِنَ الرَّحَى، يَنْحَدِرُ عَنِّي السَّيْلُ، وَلاَ يَرْقَى إِلَيَّ الطَّيْرُ.   
“তিনি (আবু বকর) জানতেন, খেলাফতের ক্ষেত্রে আমি সেই কেন্দ্রবিন্দু, যেমন ঘূর্ণায়মান চাকায় কেন্দ্র থাকে, পাহাড় থেকে ঝরনা যেমন বের হয়, তেমনই জ্ঞান আমার থেকে উৎসারিত হয়, পাখিও আমার উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে না।”

. খুতবা ১৬৪ – খেলাফতের দায়িত্ব ও শাসকের চরিত্র: 
أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ أَحَقَّ النَّاسِ بِهَذَا الأَمْرِ أَقْوَاهُمْ عَلَيْهِ، وَأَعْلَمُهُمْ بِأَمْرِ اللَّهِ فِيهِ.
“হে মানুষ! খেলাফতের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি সেই, যে এর ভার বহনের ক্ষমতাসম্পন্ন এবং এতে আল্লাহর বিধান সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞান রাখে।”

৩. খুতবা ৩৪ – খেলাফত একটি ইলাহী আমানত:   
اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ أَنَّهُ لَمْ يَكُنِ الَّذِي كَانَ مِنَّا مُنَافَسَةً فِي سُلْطَانٍ، وَلاَ الْتِمَاسَ شَيْءٍ مِنْ فُضُولِ الْحُطَامِ، وَلَكِنْ لِنَرُدَّ الْمَعَالِمَ مِنْ دِينِكَ، وَنُظْهِرَ الإِصْلاَحَ فِي بِلادِكَ.
“হে আল্লাহ! তুমি জানো, আমরা খেলাফতের জন্য ক্ষমতার লোভে প্রতিযোগিতা করিনি কিংবা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করিনি, বরং আমরা চাই তোমার দ্বীনের চিহ্ন ফিরিয়ে আনতে, এবং তোমার জমিনে সংস্কার প্রতিষ্ঠা করতে।”

নাহজুল বালাগা ইমাম আলি (আঃ)-এর খুতবা, চিঠি ও বাণীর সংকলন, যেখানে তিনি খেলাফত সম্পর্কে গভীর চিন্তা ও দর্শন তুলে ধরেছেন। এতে খেলাফতের দায়িত্ব ও অধিকার-কে ইলাহী আমানত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।



খেলাফতের দায়িত্ব (নাহজুল বালাগার আলোকে):

1. আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন:
   খেলাফতের প্রধান দায়িত্ব হলো শরিয়তের হুকুম কায়েম করা ও আল্লাহর জমিনে ন্যায়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

2. জনগণের হক রক্ষা:
   - দুর্বল ও নিপীড়িতদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া  
   - জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো  
   - গরীব ও মজলুমের পাশে থাকা

3. খেলাফত = দায়িত্ব, নয় সুবিধা:
   খুতবা ৩ (শিকায়াতি খুতবা)-তে তিনি বলেন: "তোমরা জানো আমি খেলাফত চেয়েছি না, বরং আমি ন্যায় কায়েম করতে চেয়েছি।"_ এটি ছিল দায়িত্ব পালনের জন্য তার অগ্রগণ্য অবস্থান।

4. শাসকের চারিত্রিক গুণ:
   - তাকওয়া  
   - ন্যায়ের পক্ষে আপোষহীনতা  
   - নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে উম্মাহর কল্যাণে কাজ করা

5. জবাবদিহিতা:
   ইমাম আলি (আঃ) বলেছেন, “নেতা সেই, যে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু।” (খুতবা ১৬৪)



            খেলাফতের অধিকার:

1. সত্য ও ন্যায়ের নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার
   খুতবা ৩-এর শুরুতে তিনি বলেছেন: _“আমিই খেলাফতের সবচেয়ে উপযুক্ত, কারণ আমিই রাসূল (সা.)-এর সবচেয়ে নিকট আত্মীয় এবং দ্বীনের বিষয়ে সবচেয়ে জ্ঞানী।”_

2. উম্মাহর আনুগত্য দাবি করার অধিকার:
নেতা হিসেবে তাঁর অধিকার ছিল মানুষ যেন আল্লাহর ও রাসূলের আনুগত্যের অংশ হিসেবে তাঁর নির্দেশ মেনে চলে।

3. ব্যবস্থাপনার পূর্ণ কর্তৃত্ব:
   রাষ্ট্র, বিচার, অর্থনীতি ও যুদ্ধনীতিতে ন্যায়নিষ্ঠ প্রশাসনের অধিকার ছিল তাঁর।

উপসংহার:
নাহজুল বালাগা অনুসারে, খেলাফত মানে ক্ষমতা নয়, বরং আমানত। এটি হলো জনগণের অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহর বিধান কায়েম করার গুরু দায়িত্ব। ইমাম আলি (আঃ)-এর খেলাফত দর্শন আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য এক আলোকবর্তিকা।
__________________________________________


ইমাম মাহ্দী (আ:) ও বর্তমান যুগ

ইতিহাস কখনো শূন্যে কথা বলে না। প্রতিটি যুগের সংকটের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি গভীর আহ্বান—পরিবর্তনের ডাক। বর্তমান বিশ্বসভ্যতা আজ প্রযুক্তিতে অগ্রসর, অথচ নৈতিকতায় বিপর্যস্ত; জ্ঞানে সমৃদ্ধ, কিন্তু ন্যায়ে দারিদ্র্যপীড়িত। এই বৈপরীত্যপূর্ণ বাস্তবতায় মুসলমানদের বিশ্বাসে এক চিরন্তন আশার নাম—ইমাম মাহ্দী (আ:)। তিনি কেবল ভবিষ্যতের একজন প্রতীক্ষিত ইমাম নন; বরং বর্তমান যুগের সংকট বোঝার জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক মানদণ্ড।

ইমাম মাহ্দী (আ:)‑এর আবির্ভাবের পূর্বশর্ত হিসেবে হাদিসে যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলা হয়েছে—অন্যায়, জুলুম, বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয়—সেগুলো আজ বিশ্বব্যাপী প্রকট বাস্তবতা। ক্ষমতাবানদের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, দুর্বলরা বঞ্চিত; সত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে মিথ্যার চাপে। এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বর্তমান যুগ কেবল ইতিহাসের এক অধ্যায় নয়—বরং ইমাম মাহ্দী (আ:)‑এর প্রতীক্ষার যুগ।

ইমাম মাহ্দী (আ:)‑এর মূল মিশন হবে ন্যায়ের সর্বজনীন প্রতিষ্ঠা। তিনি পৃথিবীকে এমন ন্যায়ে পরিপূর্ণ করবেন, যেমনটি আগে জুলুমে ভরে গিয়েছিল। এই ন্যায়ের দর্শন কোনো হঠাৎ বিপ্লব নয়; বরং মানুষের বিবেক, চরিত্র ও সামাজিক কাঠামোর গভীর সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হবে। তাই প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি মানসিক ও নৈতিকভাবে সেই ন্যায়ের সমাজের জন্য প্রস্তুত?

এই প্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছে বর্তমান যুবসমাজ। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—প্রতিটি পরিবর্তনের অগ্রদূত ছিল তরুণ প্রজন্ম। ইমাম মাহ্দী (আ:)‑এর অনুসারী হতে হলে কেবল আবেগী অপেক্ষা নয়, প্রয়োজন আদর্শিক প্রস্তুতি। যুবসমাজকে হতে হবে ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী ও আত্মসংযমী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা পরিহার করে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই হলো প্রকৃত ইন্তেজার (প্রতীক্ষা)।

ইমাম মাহ্দী (আ:)‑এর যুগ মানে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এটি একটি নৈতিক পুনর্জাগরণ। সেখানে নেতৃত্ব মানে সেবা, শক্তি মানে সংযম, আর জ্ঞান মানে মানবতার কল্যাণ। বর্তমান যুগে যুবসমাজ যদি ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও হতাশা থেকে বেরিয়ে এসে আত্মশুদ্ধি ও সমাজসংস্কারের পথে এগোয়, তবেই তারা সেই মাহ্দবী সমাজের যোগ্য নাগরিক হয়ে উঠতে পারবে।

বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, ইমাম মাহ্দী (আ:)‑এর প্রতীক্ষা মানুষকে দায়িত্বহীন করে না; বরং দায়িত্বশীল করে তোলে। যে ব্যক্তি মাহ্দবী সমাজের স্বপ্ন দেখে, তার জীবনে মিথ্যা, দুর্নীতি ও জুলুমের কোনো স্থান থাকতে পারে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের যুবসমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—যারা একদিকে হতাশ, অন্যদিকে পরিবর্তনের জন্য অস্থির।

পরিশেষে বলা যায়, ইমাম মাহ্দী (আ:) কোনো দূরবর্তী কল্পনা নন—তিনি বর্তমান যুগের নৈতিক আয়না। তাঁর আগমনের প্রতীক্ষা মানে নিজের ভেতরের জুলুম ভেঙে ন্যায়ের জায়গা তৈরি করা। আজকের যুবসমাজ যদি এই আত্মিক ও সামাজিক প্রস্তুতিকে জীবনচর্চার অংশ করে, তবে তারা কেবল ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকবে না—বরং সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদার হয়ে উঠবে। এই প্রতীক্ষাই হলো সচেতন প্রতীক্ষা, এই পথই হলো মাহ্দবী পথ।

__________________________________________

ইমাম মাহদী (আঃ) জন্য অপেক্ষা: গভীরতা ও গুরুত্ব
        ✍️ রাজা আলী

"অপেক্ষা" শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো আশা করা বা চেয়ে থাকা। কারো আশায় বা কোনো জিনিসের আশায় বসে থাকাই হলো অপেক্ষা করা।কোনো কিছুর আশায় পথ চেয়ে থাকা আমাদের জীবনের একটি সাধারণ বিষয়। অর্থাৎ বাস্তব জীবনে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি বা জিনিসের জন্য অপেক্ষা করে থাকি । কিন্তু এই অপেক্ষা যদি মানুষ বা কোনো জিনিসের জন্য না হয়ে যুগের ইমাম আঃ এর জন্য হয়ে থাকে ,তবে তা সর্বোচ্চ মাত্রাপ্রাপ্ত হয়। এ কারণেই আল্লাহর রাসুল সাঃ বলেছেন-- "উত্তম এবাদাত হলো ইমাম মাহদী আঃ এর আবির্ভাবের অপেক্ষা করা"(ফারাইদুস সিমতাইন)।
     শিয়া আক্বীদা অনুযায়ী ইমাম মাহদী আঃ জন্মগ্রহণের পর "গায়বতে ছোগরা"র যুগ অতিবাহিত করে বর্তমান "গায়বতে কুবরা"তে অবস্থান করছেন। এই গায়বতের মধ্যে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের বিশেষ নেয়ামত ও উদ্দেশ্য রয়েছে।আর এ কারণেই ইমাম মাহদী আঃ এর পবিত্র গায়বতী অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের প্রখর সচেতনতা থাকতে হবে।তাঁর অস্তিত্ব কে স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি অবিচল ভালোবাসা আমাদের আখেরাতের সুসংবাদ।আর তাঁর প্রকাশ্য অনুপস্থিতির যুগেও তাঁর অপেক্ষা করা যে, প্রত্যেক যুগের মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড,তা একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে--
"নিশ্চয় তাঁর (ইমাম মাহদী আঃ) গায়বতের যুগের লোকেরা,যারা তার গায়বতকে বিশ্বাস করে এবং জহুরের জন্য অপেক্ষা করে,তারা প্রত্যেক যুগের মানুষের চেয়ে উত্তম (কামালুদ্দীন )।
  সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ এর অপেক্ষা কারীরাই উত্তম ব্যক্তি এবং মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যে অন্বিত। 
     অপেক্ষা দুই রকমের ।একটি হলো অল্প সময় বা সীমাবদ্ধ সময়ের জন্য ;অপরটি দীর্ঘ সময় বা সীমাহীন সময়ের জন্য।যুগের ইমাম আঃ এর জন্য এই দ্বিতীয় প্রকার অপেক্ষা টি প্রযোজ্য।আর এই অপেক্ষা টিই শ্রেষ্ঠ অপেক্ষা।কারণ এক্ষেত্রে সংযম এবং ধৈর্যের প্রয়োজন হয়।ইমাম মাহদী আঃ"গায়েতে কুবরাতে" থাকার কারণে তাঁর আবির্ভাব সম্পূর্ণ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের মর্জির উপর।তাই ইমাম মাহদী আঃ এর অনুসারী দের অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ সময়।যিনি প্রকাশ্যে নেই,তাঁর উদ্দেশ্যে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করার মতো গূঢ় বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি উত্তম এবাদাত হিসাবে পরিগণিত।

     এই সমস্ত কারণে ইমাম মাহদী আঃ এর আর্বিভাবের অপেক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।তাঁর অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এবাদাতের পূর্ণতা।অপেক্ষার গুরুত্ব বোঝানো র জন্য হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি ইমাম আঃ এর অপেক্ষা করতে করতে মারা যান,তবে তিনি মারা যান নি ইমাম আঃ এর সঙ্গী এবং শহীদ হয়েছেন। সুতরাং ইমাম আঃ এর জন্য প্রতীক্ষা করার অর্থ হলো ইমামের প্রতি মহব্বতের দিন অতিবাহিত করা, কিংবা শাহাদাত বরণ করা এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভ করা।

__________________________________________

মাওলা-এ-কায়েনাত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) এর শিক্ষা

মাওলা-এ-কায়েনাত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) হলেন জ্ঞানের দরজা। তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডার এতই বিশাল ছিল যে—যদি গাছের পাতাগুলো কাগজ হয়ে যেত, গাছের ডালগুলো কলম হয়ে যেত, সমুদ্রের পানি কালি হয়ে যেত এবং ফেরেশতারা লিখতে শুরু করত, তবুও মাওলার ফজিলত কখনো শেষ হতো না।
আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবু তালিব (আ.)-এর বহু বাণী নাহজুল বালাগা-তে লিপিবদ্ধ আছে। তার মধ্যে কিছু অংশ নিচে বর্ণিত হলো—
1.জ্ঞান শ্রদ্ধাই সম্পত্তি, সদাচরণ নতুন পোষাক এবং চিন্তা স্বচ্ছ আয়না।
2.মানুষ কী আশ্চর্যজনক যে, সে চর্বি আর এক টুকরা মাংস দ্বারা কথা বলে, একটা হাড় দ্বারা শুনে এবং একটা ছিদ্র দ্বারা শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়।
3.মানুষের সাথে দেখা হলে এমন আচরণ করবে যেন তোমার মৃত্যুতে তারা কাঁদে এবং তুমি বেঁচে থাকলে তারা তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করে।
4.প্রতিপক্ষের ওপর জয়ী হলে তাকে ক্ষমা করো।
5.ন্যায়কে ত্যাগ করলেও অন্যায়ের সমর্থন করো না।
6.বিবেচক লোকের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করো, কারণ তারা ভ্রমে নিপতিত হলে আল্লাহ তাদের তুলে আনেন।
7.অসুস্থতার সময় যতটুকু পার হাটা-চলা করো।
8.উদার হয়ো কিন্তুু অপচয়কারী হয়ো না; মিতব্যয়ী হয়ো কিন্তুু কৃপণ হয়ো না।
9.আকাঙ্খা পরিত্যাগ করাই সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ।
10.আমিরুল মোমেনিন তাঁর পুত্র হাসানকে বললেন:
হে আমার পুত্র, আমার কাছ থেকে চারটি জিনিস এবং আরো চারটি জিনিস লেখে নাও। এগুলো চর্চা করলে তোমার কোন ক্ষতি হবে না। বিষয়গুলো হলো, বুদ্ধিমত্তা সর্বোত্তম সম্পদ, মূর্খতা সব চাইতে বড় দুস্থতা, আত্মগর্ব সব চাইতে বড় বর্বরতা এবং নৈতিক চরিত্র সর্বোত্তম অবদান। হে আমার পুত্র, মুর্থ লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না, কারণ সে তোমার উপকার করতে গিয়ে অপকার করে ফেলবে। কৃপণের সাথে বন্ধুত্ব করো না, কারণ যখন তুমি তার প্রয়োজন অনুভব করবে তখন সে দৌড়ে পালাবে। পাপী লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না, কারণ সে তোমাকে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করে দেবে। মিথ্যাবাদীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না, কারণ সে তোমাকে দূরের জিনিস কাছের ও কাছের জিনিস দূরের বলবে।
11.জ্ঞানী লোকের জিহ্বা হৃদয়ের পিছনে, আর মুর্থ লোকের হৃদয় জিহবার পিছনে।
12.যে ব্যক্তি পরকালের কথা মনে রেখে ও জবাবদিহি করতে হবে মনে রেখে কাজ করে এবং যা আছে তাতে তৃপ্ত থেকে আল্লাহতে সন্তুষ্ট থাকে সেই ব্যক্তি সব চাইতে আশীবার্দপুষ্ট।
13.মানুষের হৃদয় বন্য পশুর মতো; যে তাদের পোষে তার ওপর তারা ঝাপিয়ে পড়ে।
14.সম্পদ থাকলে বিদেশও স্বদেশ বলে মনে হয় আর দুর্দশাগ্রস্থ হলে স্বদেশও বিদেশ বলে মনে হয়।
15.তৃপ্তি এমন সম্পদ যা কখনো কমে না।
16.সম্পদ কামনা-বাসনার ঝর্ণাধারা।
17.যে তোমাকে সতর্ক করে সে ওই ব্যক্তির মতো যে তোমাকে সুসংবাদ দেয়।
18.জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা যত বাড়বে বক্তব্য তত কমবে।
19.মানুষের প্রতিটি নিশ্বাস মৃত্যুর দিকে পদক্ষেপ মাত্র।
20.যে নিজের বাতেনকে সঠিক পথে রাখে আল্লাহ তার বাহ্যিক দিক সঠিক পথে রাখেন। যে দ্বীনের খেদমত করে আল্লাহ তার দুনিয়ার কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে দেন। যে আল্লাহ ও তার নিজের মধ্যকার কর্মকান্ড সৎভাবে করে আল্লাহ ওই ব্যক্তির ও অন্য লোকদের মধ্যকার কর্মকাণ্ড কল্যাণকর করে দেন।

নাহজুল বালাগায় সংরক্ষিত এসব বাণী মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে পথনির্দেশনা প্রদান করে। ন্যায়বিচার, তাকওয়া, জ্ঞানার্জন, আত্মশুদ্ধি ও মানবতার প্রতি দায়িত্ববোধ—সব ক্ষেত্রেই আমীরুল মুমিনীন (আ.)-এর বাণী আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয়। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা যুগে যুগে মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে আসছে।

------ _____------_____------______------______------
------ _____------_____------______------______------


📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
    মাওলা আলী

দ্বীনের গৌরব আলী,
হকের পরিচয় আলী।
জুলুমের বিরুদ্ধে তলোয়ার,
মুনাফিকের শত্রু আলী।

দীনের বিজয়ী আলী,
ইসলামের প্রহরী আলী।
জ্ঞানের অথৈ সাগর তিনি,
হিকমতের ভাণ্ডার আলী।

পুলসিরাতের পথ আলী,
নেকীর সাথে আলী।
ইমামতের প্রথম প্রদীপ,
উম্মতের কান্ডারী আলী।

দরিদ্রের আশ্রয় আলী,
ইয়াতিমের ছায়া আলী।
ডাকে যে বিপদে নাম ধরে,
মুশকিল আসান আলী।

__________________________________________

    আল আকসার ঋণ
    ✍️ রাজা আলী 

রাত ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে আরো
মুক্তি কোথায় বলতে পারো?

ওদের কালো হাত,উগ্র দৃষ্টি
শুকিয়েছে মেঘ,নেই তো বৃষ্টি!

যন্ত্রণা , যন্ত্রণা আজ অনবরত
ওই দেখ লাশ শিশুর শত শত!

এরা শান্তির দূত,গায়ে বেশ যুত
ভাব এদের,এরাই পবিত্র ও পূত।

জেনে রাখ ওরা শয়তান 
করে আছে মানুষের ভান।

আসবে সেদিন আসবে শিঘ্র 
ধ্বংস হবেই,ওদের বিগ্রহ।

মুক্ত,মুক্ত,হবে নতুন ফিলিস্তিন 
শোধ হবে কি,আল আকসার ঋণ?
__________________________________________

           কুল্লে ঈমান — মাওলা আলী (আ:)

ইমান যদি সাগর হয়, তুমি তার ঢেউ,
নবীর পাশে দাঁড়িয়ে তুমি, সত্যের অটল কেউ।
খায়বারের সেই লড়াইয়ে ডাক উঠেছিল ভার—
“লা ফাতা ইল্লা আলী, লা সাইফ ইল্লা যুলফিকার।”

নামাজে ডুবে থাকা সেই হৃদয় কত পবিত্র,
তীর বিঁধেও ব্যথা ভুলে, সেজদায় ছিল অবিচল চিত্র।
ইমানের পূর্ণতা মানে, তোমার পথেই চলা,
তাই তো নবী বলেছিলেন—কুল্লে ঈমান মাওলা।

ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন, দয়ার মাঝে সীমাহীন,
শত্রুর প্রতিও তুমি ছিলে নম্র ও ধীর।
হাতে ছিল তরবারি, কিন্তু হৃদয়ে ভরা মায়া,
অসহায়ের চোখে তুমি ছিলে আল্লাহর রহমতের ছায়া।

ইলমের দরজা তুমি হলে, নবীর শহর পূর্ণতা পেল,
অজ্ঞতার অন্ধকারে তোমার জ্ঞান আলো হয়ে জ্বললো।
আজও যারা সত্য খোঁজে, তোমার দিকেই চায়,
কারণ আলীর পথে চললেই ইমান শক্ত হয়ে যায়।

হে মাওলা আলী (আ:), হৃদয়ে রাখি তোমার নাম,
ইমানের পূর্ণতা পেতে, চাই তোমার পথের দাম।
------ _____------_____------______------______------

Monday, December 15, 2025

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ জামাদিউস সানী সংখ্যা



আরবি: জামাদিউস সানী, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 

সহযোগী সম্পাদকরাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

সম্পাদকীয়

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)

কুরআন ও হাদীসের আলোকে ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর আদর্শ ও শিক্ষা

যাহেরার জন্মদিনই হোক আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস

ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন: দ্বীনি সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা 
          ✍️ রাজা আলী 

 বিবি ফতেমা যাহারা (স:) এর বিবাহোত্তর জীবন (অনুবাদ)




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

         সাইয়্যিদাতুন নিসা

                ফাতেমার শোক
                ✍️ রাজা আলী 

             ঈদে যাহেরা


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

আলহামদুলিল্লাহ! আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকার জামাদিউস সানী সংখ্যার অনলাইন সংস্করণ পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করতে পেরে আমরা কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ অনুভব করছি। গত বছরের পবিত্র সা‘বান মাস থেকে অনলাইনে নিয়মিত প্রকাশনার মাধ্যমে এই পত্রিকা সত্য, ন্যায় ও দ্বীনি চেতনার বার্তা বহন করে চলেছে।

এই সংখ্যাটি নিবেদিত মানবতার শ্রেষ্ঠ নারীদের শিরোমণি, হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর প্রতি—যাঁর জীবন ছিল ইমান, ত্যাগ, লজ্জা ও দায়িত্ববোধের জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তাঁর আদর্শ আজও আমাদের চিন্তার জগতে আলোর পথ দেখায়।

এই সংখ্যায় ইমাম মাহদী (আ:) এর আবির্ভাব, কুরআন ও হাদীসের আলোকে যাহেরার মহিমান্বিত চরিত্র, মাতৃত্বের সর্বোচ্চ মর্যাদা, দ্বীনি সমাজ গঠনে তাঁর অনুপ্রেরণা এবং বিবাহোত্তর জীবনের অনুপম দৃষ্টান্ত গভীর মমতা ও গবেষণার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

আমরা বিশ্বাস করি, এই লেখাগুলো কেবল পাঠ নয়—বরং আত্মাকে স্পর্শ করা এক নীরব দাওয়াত।
আল্লাহ তাআলা যেন এ প্রয়াস কবুল করেন এবং ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর আদর্শ আমাদের জীবনে বাস্তব রূপ দান করেন—এই দোয়া।

                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)


“ ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের সুখবর আসমানী পুস্তকগুলির মধ্যে আছে। আর সমস্ত ওলীগণ ও আম্বীয়াগণও ঐ দিনের অপেক্ষা করছে। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই গায়বত কতদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে; আর আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ইমাম মাহ্দী (আঃ)-কে কোন্ দিন আবির্ভাবের অনুমতি দেবেন, তা তিনি ছাড়া আর সকলের ই অজানা। তাই ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের নির্ধারিত দিন যদি কেউ ঘোষণা করে, তাহলে সে মিথ্যাবাদী। 

এ প্রসঙ্গে ইমাম মাহ্দী (আঃ) একটি পত্রে লিখেছেনঃ 
أما ظهور الفرج فإنه إلى الله وكزب الوقاتون 
"আবির্ভাবের হুকুম (আদেশ) আল্লাহ্ হাতে; আর যারা আবির্ভাবের জন্য সময় নির্ধারণ করবে, তারা মিথ্যাবাদী” (অনুবাদ)।

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর গায়বাতের যুগ শীয়াদের প্রকৃত সমস্যার সময়। এই যুগ সমাপ্ত হওয়া ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভূত হওয়া মানুষদের দোয়া ও মোনাজাতের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন বানী ইস্রাইলদের দোয়া ও কান্না-কাটিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের চার শ' বছরের আযাবকে হাল্কা করে দেয়; আর ১৭০ বছরের আযাবকে ক্ষমা করে দেয়। আর হজরত মুসা (আঃ)-কে তাদের আম্বিয়া হিসাবে পাঠিয়ে ফিরআউনের জঘন্য কার্যকলাপ থেকে পরিত্রাণ দেয়। এই কারণেই জাফর সাদিক (আঃ) মুসলমানদের বিশেষ ভাবে বলেছেন 'ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের জন্য আল্লাহর দরবারে বানি ইস্রাইলদের মতো দোয়া প্রার্থনা ও কান্না-কাটি করো'।

ইমাম মাহ্দী (আঃ) ক্বাবা ঘরের নিকট হাজ্বরে আসওয়াদ নামক স্থান থেকে আবির্ভূত হবেন। সেই সময় সেখানে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর ৩১৩ জন আসহাব থাকবে। আবির্ভাবের পর জিব্রাইল ক্বাবা ঘরের ছাদ থেকে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের ঘোষণা করবেন। এই ঘোষণার স্বর এবং উদ্দেশ্য সমগ্র পৃথিবীর মানুষ শুনতে এবং বুঝতে পারবে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থান থেকে মোমেনীনরা তাঁর বায়াত গ্রহণ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে। হজরত ঈসা (আঃ) চতুর্থ আসমান থেকে আসবেন। আর ইমাম মাহদী (আঃ)-এর বায়াত গ্রহণ করে তাঁর সৈন্যদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবেন। এবং তাঁর পিছনে নামাজ আদায় করবেন। যে সমস্ত মোমেনীন ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশা রাখত, অথচ জীবদ্দশায় সাক্ষাৎ করতে পারেনি; আল্লাহ্ তাদেরকেও পুনরায় জীবিত করবেন। আর তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পক্ষ থেকে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।

এই ধারাবাহিকতায় ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের সংখ্যা যখন দশ হাজারে পৌঁছাবে, তখন তিনি 'ক্বেয়াম' করবেন। প্রথমে মক্কা জয় করে মদীনা; আর সেখান থেকে কুফা পৌঁছাবেন। কুফাকেই সমগ্র পৃথিবীর রাজধানী নির্বাচন করে, সেখান থেকেই গোটা পৃথিবী শাসন করবেন। ক্রমান্বয়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাছাড়াও ফ্রেস্তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আদেশ পালন করতে থাকবে। আর শত্রুরা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যবাহিনী দেখে ভয় পাবে। তাদের সামনে কোনো ভাবেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। তারা একের পর এক জয়ী হবে, কখনো পরাভূত হবে না। কয়েকটি কারণে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সৈন্যদলের সামনে শত্রুরা নত হবে।

কারণগুলি হ'ল, -
(ক) মোজেযা ও খোদায়ী চিহ্নের নিদর্শন,
(খ) ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর অন্তরজয়ী আলাপ ও কথাবার্তা,
(গ) ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তাঁর সৈন্যদের আচার-আচরণ, মানুষ্যত্ববোধ ও আন্তরিকতা ইত্যাদি।

ইসলাম বিরোধী ইহুদী ও আহলেবাইয়াতের শত্রুদের সমস্ত রকম বিরোধীতাকে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সৈন্যরা কঠোর ভাবে প্রতিরোধ করবেন। মাত্র আট মাসের মধ্যেই পূর্ব ও পশ্চিম দিক ব্যাপী ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই শাসনের একটি উদ্দেশ্য হল জালিম ও অত্যাচারীদের থেকে অসহায় মানুষদের হক্ক বুঝে দেওয়া এবং কাফির ও মুশরিকদের (ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের পরেও যদি কাফির থেকে যায়) হত্যা করা। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসনে আহলেবায়েতের শত্রুরা অপমানিত ও লজ্জিত হবে। ফাসাদকারী ও বিরোধীতাকারীরা উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহর সমস্ত শত্রুদের হত্যা করা হবে। সমস্ত পৃথিবীতে ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তার অনুসারীদের সুশাসন চলবে। এবং পৃথিবীর বুকে সঠিক দ্বীন প্রচারিত হবে। হে আল্লাহ্, ঐ দ্বীনের আবির্ভাবকে দ্রুত ত্বরান্বিত করুন। আমীন।
_________________________________________

কুরআন ও হাদীসের আলোকে ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর আদর্শ ও শিক্ষা



১. ঈমান ও তাকওয়ার আদর্শ:
হযরত ফাতেমা (সা.আ.) ছিলেন সর্বোচ্চ ঈমানদার ও মুত্তাকি নারীদের মধ্যে একজন। কুরআনে বলা হয়েছে:  
"إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ
(সূরা আহযাব ৩৩:৩৩)  
এই আয়াতে আল্লাহ পাক তাঁর পবিত্রতা ও তাকওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। হাদীসে নবী (সা.) বলেন:  
"ফাতেমা জান্নাতি নারীদের সর্দার।" (সহীহ মুসলিম)

২. ইলম ও হিকমতের প্রতীক:
ফাতেমা (সা.আ.) ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে সরাসরি জ্ঞান লাভ করেন। “মুশাফে ফাতেমা” নামে এক বিশেষ জ্ঞানভাণ্ডার তার দখলে ছিল।

৩. ইবাদত ও দুআর শিক্ষা:
তিনি ইবাদতের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। ইমাম হাসান (আ.) বলেন:  
"আমার মা এক রাতভর নামাজে মগ্ন থাকতেন, শুধু অন্যদের জন্য দোয়া করতেন।"
(বিহারুল আনওয়ার)

৪. ইনসাফ ও প্রতিবাদের প্রতীক:
ফাতেমা (সা.আ.) নিজ অধিকারের জন্য দ্ব্যর্থহীন প্রতিবাদ করেন, বিশেষ করে ফাদাকের জমির প্রশ্নে। তাঁর সেই ভাষণ (খুতবা-ই-ফাদাকিয়া) ছিল সত্য ও ইনসাফের নির্ভীক আহ্বান। 


খুতবা ই ফাদাকিয়া সম্পর্কে নিচে বর্ণনা করা হয়েছে

৫. হিজাব ও শালীনতার আদর্শ:
তিনি নারীদের জন্য হিজাব, লজ্জাশীলতা ও মর্যাদার এক অনন্য আদর্শ। একটি হাদীসে আছে, ফাতেমা (সা.আ.) বলেন:  
“সেরা নারী সেই, যার চোখ পরপুরুষকে না দেখে এবং কেউ তাকে না দেখে।”

৬. পারিবারিক জীবনে পূর্ণতা:
তিনি একজন আদর্শ স্ত্রী, স্নেহশীলা মা ও বুদ্ধিমতী গৃহিণী ছিলেন। হযরত আলী (আ.) বলেন:  
"আমি কখনো তাকে রাগান্বিত দেখি নি বা কোনো কাজে আমার অবাধ্য দেখি নি।"
                       

খুতবা ফাদাক এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ

খুতবা ফাদাক হল হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.)‑এর একটি বিখ্যাত ভাষণ, যা তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর wafat-এর পর মদীনার মসজিদে দিয়েছিলেন। এই খুতবাটি ইসলামি ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল হিসেবে গণ্য হয়। নিচে এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:


 খুতবার প্রেক্ষাপট:
রাসুল (সা.)-এর শাহাদাতের পর, ফাতিমা (সা.) পৈতৃক সম্পত্তি "ফাদাক" যা রাসুল (সা.) তাকে জীবিত থাকতেই দিয়েছিলেন, তা দাবি করতে গিয়ে খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সামনে এই খুতবা প্রদান করেন। খলিফা সম্পত্তিটি রাষ্ট্রীয় মাল মনে করে তা ফিরিয়ে দেননি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ফাতিমা (সা.) মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয়ে এই জ্ঞানে পরিপূর্ণ ও আবেগপূর্ণ ভাষণ দেন।


 খুতবার মূল বিষয়বস্তু:

1. আল্লাহর প্রশংসা ও বান্দার দায়িত্ব:
   আল্লাহর তাওহীদ, তাঁর গুণাবলি ও সৃষ্টি নিয়ে প্রশংসা। মানবজাতির দায়িত্ব ও আল্লাহর আনুগত্যের গুরুত্ব।

2. নবী করীম (সা.)-এর প্রেরণ ও মিশন:
   রাসুল (সা.)-এর নবুওয়ত, তাঁর জীবন সংগ্রাম ও কোরআন অবতীর্ণের গুরুত্ব আলোচনা।

3. কোরআনের ব্যাখ্যা:
   কোরআনের বিভিন্ন আয়াত, বিধান ও তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের গুরুত্ব।

4. ফাদাক ও অধিকার দাবি:
   রাসুল (সা.) ফাদাক তাকে কীভাবে দিয়েছিলেন এবং তা ছিল নাস-অনুযায়ী (শরিয়ত মোতাবেক)। তিনি কোরআন ও হাদিস দিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন।

5. আহলে বাইতের মর্যাদা:
   আহলে বাইতের মাহাত্ম্য, তাঁদের প্রতি উম্মাহর দায়িত্ব এবং তাঁদের অবিচারের কথা তুলে ধরা।

6. উম্মাহর অবস্থা ও ন্যায়ের আহ্বান:
তিনি মুসলিম উম্মাহর উদাসীনতা ও অন্যায় সহ্য করার প্রবণতা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।

খুতবার শিক্ষণীয় দিক:
- নারীর জ্ঞান, যুক্তি ও সাহসিকতার অনন্য উদাহরণ।
- ইসলামে অধিকার আদায়ে ন্যায়ের ভাষা ও যুক্তির গুরুত্ব।
- আহলে বাইতের ওপর জুলুম ইতিহাসে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
- কোরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা ও তার অনুশীলনের শিক্ষা।  

উপসংহার:
খুতবা ফাদাক কেবল একটি সম্পত্তির দাবি নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ও আদর্শিক প্রতিবাদ — যা ন্যায়ের, ইমানের ও ইসলামী জ্ঞানের এক উজ্জ্বল দলিল।
ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর জীবন ইসলামের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি। তিনি কুরআনের জীবন্ত বাস্তবায়ন, নবীর শিক্ষার বাস্তব নমুনা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে নারীরা যেমন ইবাদতে, তেমন পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকেও সফলতা অর্জন করতে পারে।
__________________________________________


যাহেরার জন্মদিনই হোক আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস

মাতৃত্ব—এই একটি শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টি, ভালোবাসা, ত্যাগ, বিশ্বাস, আলো, আর একটি জাতির ভবিষ্যৎ। মানব ইতিহাসে যত মহৎ চরিত্র, যত ধৈর্যশীল মন, যত দৃঢ় আত্মা দেখা গেছে—তার অধিকাংশের পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো মায়ের নীরব সংগ্রাম। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে এই মাতৃত্বের মহিমা অনেক সময়ই কেবল আবেগের উদযাপনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বাণিজ্যিকতা, আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণ, আর সাংস্কৃতিক বিচ্যুতির ভিড়ে মাতৃত্বের প্রকৃত মর্যাদা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

এই প্রেক্ষাপটে ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.)-র জন্মোৎসবকে আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস হিসেবে দেখার ধারণা শুধু ধর্মীয় নয়—এটি মানবিক, নৈতিক ও সভ্যতাগত একটি প্রয়াস। কারণ ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.) ছিলেন এমন এক মা, যাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মাতৃত্বের অর্থ নতুন করে ব্যাখ্যাত হয়েছে।

তিনি ছিলেন কোমলতার প্রতীক, কিন্তু অন্যায়ের সামনে অটল দৃঢ়তা; তিনি ছিলেন বিনয়ের চূড়া, কিন্তু নৈতিকতার সামনে আপসহীন সাহস। তাঁর ঘর ছিল দরিদ্র, কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল অসীম ধনসম্পদের অধিকারী। তিনি সন্তানদের শুধু লালন করেননি—তাদের চরিত্রে ঢেলে দিয়েছিলেন সত্য, ন্যায়, ত্যাগ ও মানবতার আলো। তাঁর সন্তানরা মানবতার ইতিহাসে যে ভূমিকা রেখেছেন, তা তাঁর মাতৃত্বের অনন্য সাফল্য ছাড়া ব্যাখ্যা করা যায় না।

বর্তমান নারী সমাজের সংকটগুলো বাস্তব—অতিরিক্ত অনুকরণ, সামাজিক বিভ্রান্তি, মূল্যবোধের ভাঙন, আত্মপরিচয়ের সংকট, ভোগবাদী ধারা, এবং পরিবার রক্ষার দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাওয়া। এই সময়ে ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.) হয়ে উঠতে পারেন সত্যিকারের দিকনির্দেশনা—
যাঁর জীবনে শালীনতা শক্তি, নৈতিকতা স্বাধীনতা, জ্ঞান মর্যাদা, আর মাতৃত্ব আলোকবর্তিকা।

আজকের মাতৃ দিবসের উদযাপন অনেক সময় উপহারের বিনিময়, বাহ্যিক প্রদর্শনী বা একদিনের আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.)-র জন্মোৎসব স্মরণ করায়—
মাতৃত্ব মানে ত্যাগ, দায়িত্ব, প্রজন্ম গঠন, চরিত্র নির্মাণ, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পরিবারের পথ নির্দেশ করা।

তাঁর জন্মদিনকে আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবসের প্রতীক করা হলে মাতৃত্বের ধারণা শুধু আবেগের নয়—হয়ে উঠবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস। এটি বিশ্বের সব ধর্মের, সব সংস্কৃতির মায়েদের সামনে উপস্থাপন করবে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ—একজন মা কেমন হলে সমাজ উন্নত হয়, প্রজন্ম সুশিক্ষিত হয়, আর মানবতা রক্ষা পায়।

ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.)-র জন্মোৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
একজন মা যখন আলোর পথে চলেন, তখন শুধু তাঁর সন্তান নয়; সমগ্র সমাজ আলো পায়।
একজন মা যখন হৃদয়কে পবিত্র রাখেন, তখন জাতির ভবিষ্যৎ পবিত্র হয়।
আর একজন মা যখন নৈতিকতার মশাল জ্বালান, তখন অন্ধকারও পথ হারায়।

পরিশেষে বলা যায়, ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.)-র জন্মোৎসবকে আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস হিসেবে রূপ দেওয়ার ধারণা কোনো সম্প্রদায়ের দাবি নয়—এটি মানবতার প্রতি আহ্বান। এটি মাতৃত্বকে পুনরুদ্ধার করতে চায় তার আসল মহিমায়; যেখানে মা শুধু ঘরের নারী নন, তিনি চরিত্রের নির্মাতা, নৈতিকতার শিক্ষক, সমাজের আলোকদূত। তাঁর জীবনই প্রমাণ করে—মায়ের হাতে একটি প্রজন্ম বদলে যায়, আর একটি প্রজন্ম বদলে দিলে বদলে যায় পুরো পৃথিবী।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে ইমাম মাহ্দীর (আ.ফা.) সহায়ক, অনুগামী ও তাঁর পতাকার নিচে শহীদ হওয়াদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন... ছুম্মা আআমিন।

__________________________________________

ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন: দ্বীনি সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা
        ✍️ রাজা আলী

পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী হলেন মা ফাতেমা জাহেরা সাঃ। ঐশী মহিমা এবং পিতামাতার কারণে তিনি এমন এক সমুন্নত চরিত্রে র নারী,যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে দুর্লভ।অথচ এই মহিমান্বিত নারীর খুব সংক্ষিপ্ত জীবন এবং শেষ জীবনের নিঃসীম দুঃখ-যন্ত্রণা ও মৃত্যু খুব ই বেদনা বিধুর।এই দুঃখ যে কোনো  মোমিন হৃদয়কে শোকসাগরে নিমজ্জিত করে।তাই ফাতেমা জাহরা সাঃ এর শোক আজ পৃথিবীর অলিতে গলিতে পালিত হচ্ছে।

     বিশিষ্ট আলেম দের তাগিদ এবং মোমিন হৃদয়ের আগ্রহে আজ প্রতিটি দেশেই পালিত হচ্ছে আইয়ামে ফাতেমিয়া। কিন্তু আইয়ামে ফাতেমিয়া র মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে নানা তাৎপর্য মন্ডিত দিক।সেই দিকগুলি সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আইয়ামে ফাতেমিয়াকে সচেতন হৃদয়ে লালন করতে পারলে এক দিকে যেমন মোমিন হৃদয়ের আর্তি পরিপূর্ণ হবে,অন্যদিকে তেমনি সমাজ গঠনের দাবি পূর্ণ হবে।

    ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন বিচিত্র গুণে গুণান্বিত।তাই আইয়ামে ফাতেমিয়া র নানা দিক অন্বেষণ করা যায়। যেমন:
      ১.আইয়ামে ফাতেমিয়া আহলে বাইত প্রেমীদের কাছে গভীর শোক ও আযাদারীর তাৎপর্য বহন করে,
     ২.আইয়ামে ফাতেমিয়া ফাতেমা যাহরা সাঃ এর খুব সংক্ষিপ্ত জীবন এবং মৃত্যু-রহস্যের জটিল জাল সকলের নিকট উন্মোচন করে,
    ৩.আইয়ামে ফাতেমিয়ার মাধ্যমে ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন দর্শনের আলো  সমাজকে আলোকিত করে।

বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন দর্শনের আলোকে সমাজকে আলোকিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো।

     চারপাশের মানুষ জন নিয়েই আমাদের সমাজ জীবন গড়ে উঠেছে।আর আল্লাহ রব্বুল আলামীন দ্বীনে ইসলামের মধ্যে এমন কিছু নেয়ামত দান করেছেন,যে নেয়ামতগুলি সমাজ গঠনের আদর্শ ও মডেল হিসাবে বিবেচিত।ফাতেমা জাহেরা সাঃ এমন ই এক নেয়ামত,যার দ্বারা দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ তা পেয়েছে। আল্লাহর রাসুল নিজেই বলেছেন-- "ফাতিমা জান্নাতে র নারীদের নেত্রী এবং তিনি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়"(বিহারুল আনোয়ার)। অর্থাৎ আল্লাহর রাসুল এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ফাতেমা এমন এক ঐশী নারী যাকে তিনি নিজেই সব থেকে গুরুত্ব দিতেন এবং ভালোবাসতেন। সুতরাং আল্লাহর বান্দাদের উচিত ফাতেমা কে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভালোবাসা।আর আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁকে জান্নাতে র নেত্রী র মতো যখন সর্বোচ্চ সম্মান দান করেছেন,তখন বোঝা যায় যে,তাঁকে দ্বীনি সমাজ গঠনের কান্ডারী হিসাবে সৃষ্টি করেছেন।
      মা ফাতেমা জাহরা সাঃ ইবাদতের ক্ষেত্রে এক অনুকরণ যোগ্য নারী ছিলেন। সাংসারিক কাজ সুসম্পন্ন করে, সন্তান দের লালন-পালন করেও তিনি দীর্ঘক্ষণ আল্লাহর আরাধনায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে ইমাম হাসান আঃ বলেছেন --"আমার মা ফাতিমা আল্লাহর ইবাদাতে এত বেশি মগ্ন থাকতেন যে, তাঁর পায়ের পাতা ফুলে যেতো।" (বিহারুল আনোয়ার)। 
এই হাদিসে ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর ইবাদাতে র মাধুর্য ফুটে উঠেছে। ইবাদাতের মধ্যে যে মিষ্টতা ও মধুরতা লুকিয়ে আছে,তা আমরা তাঁর ইবাদত থেকে সহজেই বুঝতে পারি।তাই আমাদের উচিত তার ইবাদত কে নিজেদের জীবনে অনুকরণ করা এবং নিজেদের সমৃদ্ধ করে একটি দ্বীনি সমাজ গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
     
 ইসলামী সমাজ গঠনের আদর্শ লুকিয়ে রয়েছে নারীদের শালীনতা রক্ষার মধ্যে।আর পর্দা হলো এক্ষেত্রে অদ্বিতীয় উপায়।মা জাহেরা নারী জাতির আব্রু রক্ষার জন্য নিজের জীবনকে মডেল হিসাবে নির্মাণ করেছেন।তাই সর্বোত্তম নারীর গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, নারীদের উচিত কেউ যেনো তাকে না দেখে,বা সে কাউকে না দেখে।কারণ পর্দা ঈমানের অংশ।তাই পর্দা ব্যতীত কোনো নারী র ঈমান পরিপূর্ণ হয় না।তাই আমাদের নারীদের কেও ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করতে হবে।তবেই সুস্থ ও সুন্দর একটি দ্বীনি সমাজ গড়ে উঠবে।এই কারণেই ইমাম খামেনেয়ী বলেছেন--"আমাদের উচিত ফাতিমা জাহরা সাঃ এর পবিত্র জীবন কে গভীর মনোযোগে অনুধাবন করা।তার জীবন কে নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এবং তাঁর মহিমান্বিত আদর্শকে আমাদের জীবন ধারার প্রকৃত মডেল হিসাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন" (১৯ এপ্রিল,২০১৪ খ্রিঃ)।

__________________________________________

বিবি ফতেমা যাহারা (স:) এর বিবাহোত্তর জীবন (অনুবাদ)

বিবি ফাতেমা জাহেরা (সাঃ আঃ) ইসলামের এক অনন্য সাধারণ নারী। তাঁর জীবন এক মহান ধর্মীয় আদর্শে অন্বিত। জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ফতেমা জাহেরা (সাঃ আঃ) জ্ঞানে-গুণে, ধর্মে-কর্মে,খোদা ভীরুতায় এক অনন্য নজির । বর্তমান নিবন্ধে তাঁর বিবাহোত্তর জীবন নিয়ে আলোচনা করা হলো।

     বিবাহের পর মুস্তাফা (সা.আ.ওয়াল্লাম)-এর গৃহ থেকে বিবি ফাতিমা যাহরা (সা.) মুরতজা (আ.)-এর গৃহে আগমন করলেন।একদিন সকালে এক দরিদ্র নারী তাঁর দরজায় এসে সাহায্য প্রার্থনা করল। বিবি ফাতিমা (সা.) এমন কোনো বস্তু পেলেন না,যা বিক্রি করে তার প্রয়োজন পূরণ করা যায়। তাই তিনি নিজের বিবাহের পোশাকটি দান করে দিলেন।তাদের জীবনযাপনের পরিমাণ ও মানে ছিল সুস্পষ্ট সাদৃশ্য। প্রকৃতপক্ষে, জ্ঞান, শিক্ষা, তাকওয়া, নামাজ, দান-খয়রাত, আতিথেয়তা, সহমর্মিতা ও উদারতার উপরই ছিল তাঁর গুরুত্ব। বস্তুগত সম্পদের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহই ছিল না ।


বিবি ফাতিমা বিনতে আসাদ, যিনি হযরত আলী (আ.)-কে লালন-পালন করেছিলেন এবং তাকেও দেখাশোনা করতেন।তিনি তাঁর পুত্র মাওলা আলী (আ.)-এর সাথেই বসবাস করতেন।

শুরুর দিকে রাসূলুল্লাহ (সা.আ.ওয়াল্লাম) ও মাওলা আলী (আ.) মসজিদের প্রাচীরের পাশে তাঁদের ঘর নির্মাণ করেন। পরে মক্কা থেকে আগত সাহাবিগণও মসজিদের অন্যান্য প্রাচীরের পাশে ঘর তৈরি করতে শুরু করেন। সব ঘর এমনভাবে নির্মিত হয়েছিল যে তাদের দরজা মসজিদের আঙিনার দিকে খোলা থাকত এবং তা নিয়মিত চলাচলের পথ হয়ে যায়।
তিরমিজি ও নাসাঈ তাঁদের সহীহ গ্রন্থে এবং হাকিমের মুস্তাদরাকে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.আ.ওয়াল্লাম) সাহাবিদেরকে মসজিদের দিকে খোলা সব দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে বলেন এবং সেই দরজা দিয়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল মাওলা আলী (আ.)-এর ঘরের দরজা এবং তাঁর নিজের দরজা।অতএব, বিবি ফাতিমা (সা.) ও তাঁর পিতার ঘরের দরজা ছাড়া সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

গৃহস্থালির কাজ—কূপ থেকে পানি আনা, রান্না করা, বাসন ও কাপড় ধোয়া, আটা পেষা, সেলাই ও ঝাড়ু দেওয়ার পাশাপাশি তিনি আল্লাহর ইবাদত ও নামাজে এমনভাবে মগ্ন থাকতেন যেমন তাঁর পিতা বা স্বামী থাকতেন।তাঁর মাত্র একজন গৃহপরিচারিকা ছিল—ফিজ্জা—যিনি তাঁর নিজের বোনের মতো প্রিয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত একটি ব্যবস্থা ছিল—একদিন বিবি ফাতিমা (সা.) গৃহকর্ম করতেন, পরের দিন ফিজ্জা তা করতেন।

   বিবি ফাতেমা চিন্তা ভাবনা প্রকাশে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় তাঁর স্বামীর সমকক্ষ ছিলেন। বিভিন্ন স্থান থেকে নারীরা তাঁর কাছে আসত ইসলামের বার্তা শুনতে, ভাষা ও বক্তব্যের কৌশল শিখতে এবং সৃষ্টির অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে।তাঁর আতিথেয়তা, তাকওয়া ও প্রজ্ঞার কাহিনি বিশ্বাসী নারীরা প্রতিটি ঘরে, রান্নার আগুনের পাশে বসে বর্ণনা করত।

  ফাতেমার বহুবিধ গুণাবলী ছিল।যে কারণে তার বিভিন্ন উপাধিও ছিল।উপাধিসমূহ—যেগুলো তাঁর অন্তর্নিহিত গুণাবলির প্রতিচ্ছবি এবং পিতার প্রদত্ত—আজও সকল মুসলমানের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় এবং কেয়ামত পর্যন্ত উচ্চারিত হতে থাকবে। উল্লেখযোগ্য কিছু উপাধি নিচে দেওয়া হলো:
বাতুল — স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অপবিত্রতা থেকে মুক্ত, তাহিরাহ — পবিত্র ও নিষ্পাপ, সাইয়্যিদাহ — শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল নারীর শ্রেষ্ঠ, নেত্রীউযরা — ইন্দ্রিয়গত কামনা থেকে মুক্ত, যাহরা — উজ্জ্বল ও‌ সুন্দর, সিদ্দীকাহ কুবরা — সর্বাধিক সত্যবাদিনী, আবিদাহ — সদা ইবাদতকারী, খাতুনে জান্নাত — জান্নাতের শ্রেষ্ঠ নারী, যাকিয়্যাহ — প্রজ্ঞাবান, উম্মুল আইম্মাহ — ইমামগণের জননী, উম্মুল আবীহা — পিতার জননীস্বরূপ, রাজিয়্যাহ — আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিত, কুররাতুল আইন — পিতার চোখের মণি, খাইরুন নিসা — নারীদের মধ্যে সর্বোত্তম।

 সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ইসলামে ফাতেমা জাহেরা (সাঃ আঃ) গুরুত্ব অনেক বেশি। আল্লাহর রাসূলুল্লাহ (সা.আ.ওয়াল্লাম) যখনই মদিনার বাইরে যেতেন, যাওয়ার আগে সর্বশেষ যাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তিনি ছিলেন বিবি ফাতিমা (সা.)।আর ফিরে এসে প্রথমেই তাঁর কাছেই যেতেন।প্রতিদিন সকালে তাঁর চেহারা দেখা এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় তাঁকে চুম্বন করা ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস।

সালমান, আবু যর, মিকদাদ, মাইসাম ও আম্মার ইয়াসির তাঁদের পরিবারসহ তাঁর গৃহে আসতেন। এছাড়া হামজা, আকিল, জাফর তাইয়ার ও বনি হাশিমের অন্যান্য সন্তানদের জন্য তাঁর গৃহ ছিল দ্বিতীয় ঘর।
সালমান এত বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে বিবি ফাতিমা (সা.)-এর গৃহে সেবা করতেন যে রাসূলুল্লাহ (সা.আ.ওয়াল্লাম) তাঁকে “মুহাম্মদের পরিবারভুক্ত” ঘোষণা করেন। এমন মর্যাদা আর কোনো সাহাবি লাভ করেননি।সালমান এগারোটি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর মতো জ্ঞানী ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই সকল জ্ঞানের উৎস—মাওলা আলী (আ.) ও বিবি ফাতিমা (সা.)-এর গৃহ ছাড়া অন্য কোথাও যেতেন না।আবুযর (রা.), যিনি তিন খলিফার সময়ে সমগ্র আরব জুড়ে ইসলামের সত্য বার্তা ও মাওলা আলী (আ.) ও বিবি ফাতিমা (সা.)-এর ফজিলত প্রচার করতেন; তিনিও তাঁদের গৃহের দরজায় বিনয়ী শিক্ষার্থী হিসেবে অবস্থান করতেন।
 
 (মূল গ্রন্থ:- বিবি ফতেমা যাহারা (স:) এর জীবনী_হাদি হুসাইন সৈয়দ)

------ _____------_____------______------______------
------ _____------_____------______------______------


📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
     সাইয়্যিদাতুন নিসা

আল্লাহর ইজ্জত ফতেমা, নবীকন্যা বাতুল,
যাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন স্বয়ং রাসূল।

হাজার সিজদা করলেও যদি অন্তরে থাকে বিদ্বেষ,
ফতেমার প্রতি ঘৃণা থাকলে জান্নাতের আশা শেষ।

দুই জগতের সব নিয়ামত তিনি পেয়েছেন দানে,
আল্লাহর কসম, ফাদাক তাঁর পদধূলিরই মানে।

যার প্রতি ফতেমা অসন্তুষ্ট, আল্লাহও তার প্রতি,
দ্বীনের মূলনীতি এটাই—আল্লাহর সাথে সত্যের প্রীতি।

__________________________________________

    ফাতেমার শোক
    ✍️ রাজা আলী 

আমার উপরে যে কষ্ট 
এসেছে নেমে,
দিনের উপর পড়লে দিন
যেতো থেমে।

তোমার পরে বাবা আমি
বড়ো অসহায়, 
শত্রুরা অবিচার করেছে 
দেয়নি রেহায়‌।

আলিকে ওরা বার করে
নিয়ে যেতে,
আমার ঘরে এসেছিলো 
লোক নিয়ে সাথে।

আমি বাধা দিয়েছি বাবা
এপাশ হতে,
বন্ধ দরজা আগুন সাথে
পড়ে উদরে।

বাবা,মোহসিনের হয় ইন্তেকাল 
শত্রুর হাতে,
আমার পাঁজর টুকরো হয়
দরজা ভারে।

বেশি দিন বাঁচবো না আর আমি
তোমার শোক,
তার উপর আলীর উপর অবিচার 
করছে লোক।

এসব কিছু তোমার মৃত্যুর পরে
ভুলেছে সব,
ভাবিনি ওরা তোমার কন্যার তরে
ভুলেছে রব।
__________________________________________

           ঈদে যাহেরা

যাহেরার জন্মদিনে নামে শান্ত নূরের আলো,
ফাতেমার স্মৃতিতে হৃদয় হয় পবিত্র, ভালো।
তার আগমনে দুনিয়া ভরে, দয়ার নরম ছায়ায়,
মুছে গিয়ে সব কষ্ট-অন্ধকার, হৃদয় জেগে ওঠে মায়ায়।

তিনি ছিলেন হায়ার প্রতীক, বিনয়ের কোমল দিশা,
নারীর জীবনে পথ দেখাতে আজও জ্বলজ্বলে তার নিশা।
শালীনতা তাঁর গর্ব ছিল, চরিত্র ছিল নূরের ফুল,
তার জীবনে লুকানো আলো—মুছে দিতো দুঃখের ধূল।

বাহিরের সাজ নয় মূল কথা, সৌন্দর্য বাসে অন্তরে,
যাহেরার শিক্ষা বলে—“হায়াই রাখো হৃদয় ভরে।”
যে নারী বিনয় নিয়ে চলে, সে-ই পায় সত্যর পথ,
আল্লাহর দয়া নেমে আসে তার জীবনের প্রতিক্ষণ-রথ।

আজকের দিনে আমরা সবাই নেই তাঁর জীবন দৃষ্টিতে,
দয়া, হায়া, নম্রতা রাখি নিজের প্রতিটি সৃষ্টিতে।
ঈদে যাহেরা মনে করায়—শুদ্ধতা সর্বদা জয়ী হয়,
তার আলোয় আমাদের জীবন হোক নূরময়, শান্তিময়।
------ _____------_____------______------______------

Wednesday, November 19, 2025

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ জামাদিউল আওয়াল সংখ্যা


আরবি: জামাদিউল আওয়াল, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 

সহযোগী সম্পাদকরাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


কিছু সংখ্যক ব্যক্তি কিভাবে ইমাম মাহ্দী (আঃ) এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন

ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবনী আমাদের  জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ

ফাতিমা ও মাহ্দী: হেদায়েতের আলো

পশ্চিমবঙ্গের শিয়া কওমের শিক্ষা : একটি পর্যালোচনা 
          ✍️ রাজা আলী 

 আল্লাহর নেয়ামত ও ইমামে জামানা (আঃ)-এর মহা অনুগ্রহ




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

         নারী জাতির অনন্ত আলোকচ্ছটা

                ঋণ এবং
                সুদান
                ✍️ রাজা আলী 

       কুরআন, হাদিস, আহলে বাইতের সুর


             ইমাম মাহ্দীর আদর্শ (সনেট)


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

জামাদিউল আওয়াল—স্মৃতি, হেদায়েত ও রূহানিয়াতের এক প্রশান্ত মাস। আহলে বাইত (আ.)-এর সিয়ারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্যের পথে অটল থাকার মর্ম, আর ইমামতের আলো জাগিয়ে তোলে অন্তরের নীরব প্রতিজ্ঞা।

এই সংখ্যার প্রতিটি রচনা সেই আলোকে বহন করে—
কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর বার্তা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় মূলের দিকে;
ইমাম মাহদী (আ.)-এর সাক্ষাৎ, ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর আদর্শ, ফাতিমা ও মাহদীর নূরানী সম্পর্ক—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে রূহানিয়াতের এক উজ্জ্বল চিত্র।
এছাড়া সমাজ, তরবিয়্যাত ও নেয়ামতের ওপর আলোচনাগুলো আমাদের করে তোলে ভাবনাশীল ও দায়িত্ববান।

আসুন, এই পবিত্র মাসে আমরা নবায়ন করি আমাদের প্রতিজ্ঞা—
ইমামের পথে থাকুক আমাদের কলম, আমল ও হৃদয়ের ভালোবাসা।
                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


কিছু সংখ্যক ব্যক্তি কিভাবে ইমাম মাহ্দী (আঃ) এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন

গাইবাতে কুবরার যুগে অনেক ব্যক্তি হজরত ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আর আল্লাহ্র দান ও মোহাব্বতের কারণে ভাগ্যবান রূপে পরিগণিত হয়েছেন। তবে যে বিষয়টি অনুসন্ধান যোগ্য, সেটি হল এই যে, ঐ সমস্ত ব্যক্তিরা কিভাবে এমন উত্তম সৌভাগ্যের অধিকারী হলেন? তাঁদের তাক্বওয়া, পরহেজগারী ও নেক আমলই কি এই সৌভাগ্যের পিছনে কাজ করেছে? না, তাঁদের জ্ঞান শিক্ষা ও আভ্যন্তরীন মর্যাদাই ইমাম (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়েছে? না, শুধুমাত্র ইমাম (আঃ)- এর দয়া-মহব্বতের কারনেই তাঁরা সাক্ষাৎ পেয়েছেন?

অতি প্রসিদ্ধ ও বিখ্যাত হাদীস, যা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পবিত্র যিয়ারাতে নাহীইয়াহ্ হতে, তাঁর চতুর্থ নায়েব (প্রতিনিধি) শেখ আলী বীন মোহাম্মাদ সামারী (রহঃ)-এর কাছে পৌঁছায়; তাঁর প্রতি যদি মনযোগী হওয়া যায়, তাহলে আসল সত্যের সন্ধান পাওয়া যাবে। হাদীসটি হলঃ (অনুবাদ) "যদি কেউ তাঁকে দেখেছেন বলে দাবি করেন, চারজন নায়েবকে যেমন ভাবে দেখেছেন, সে মিথ্যাবাদী এবং অপবাদদাতা"। এই হাদীস থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নিজের ইচ্ছা বা খেয়াল-খুশি মত ইমাম মাহ্দী (আঃ) কে দেখা যায় না বা তার সঙ্গে নিজের মর্জি মত সম্পর্ক গড়া যায় না।

অপরদিকে ইসলামী ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, ইমাম (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জনকারীরা কেউ ওলামা, কেউ মুত্তাক্বী, আবার কেউ বা সাধারণ ও নিম্ন শ্রেণীর মানুষ এবং তাদের মধ্যে আহালে সুন্নত ও কাফিরদেরও সন্ধান পাওয়া যায়। ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের নাফস ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারণে এটা বোঝা যায় যে, ইমাম (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জনকারীদের বিশেষ কোন শ্রেণী বা দল নেই। বরং ইমাম (আঃ) আল্লাহ্ ও নিজের মর্জিমত সাধারণ ও বিশেষ ব্যক্তিদের নিজের দান ও বরকতের মাধ্যমে উপকৃত করে থাকেন।

'আল্ আ'বক্বারিইউল হিসান'

এখন উপরে উল্লেখিত পুস্তকটির পরিচয় তুলে ধরছি। এর মধ্যে এমন ভাগ্যবান ব্যক্তিদের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যাদের ভাগ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ) এর সাক্ষৎ অর্জিত হয়েছে। পুস্তকের যে অংশগুলি আমাদের নিকট অবশিষ্ট আছে, তা দু'খণ্ডে বিভক্ত আছে।

পঞ্চম ভাগে বিভক্ত

দুই খণ্ডে বিভক্ত পুস্তকটি আবার পাঁচ ভাগে খণ্ডিত। প্রথম খণ্ডে তিনটি ভাগ, আর দ্বিতীয় খণ্ডে দু'টি ভাগ আছে। গ্রন্থটিতে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার থেকে শুরু করে গাইবাতে ছোগরা এবং গাইবাতে কুবরাতে সাক্ষাতকারী ব্যক্তিদের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রমান

পুস্তকটির আকর্ষণীয় দিক হল, প্রতিটি ঘটনার পূর্বে লেখক দলিল বা প্রমান দিয়েছেন। ওলামা ও গবেষকদের জন্য এই প্রমান অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কতকগুলি প্রমান আকারে দীর্ঘ।

পুস্তকটির খণ্ডিত বিষয়

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে,, আলোচ্য পুস্তকটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত। কিন্তু এখানে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে অধ্যায় অনুসারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হ'ল।

প্রথম অধ্যায়:-

এই অধ্যায়ে এমন সৌভাগ্যবান সাক্ষাতকারী ব্যক্তিদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যারা সাক্ষাতের সময় ইমাম মাহদী (আঃ)-কে চিনতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে এখানে এমন সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যারা সাক্ষাতের সময় ইমাম মাহদী (আঃ)-কে চিনতে না পারলেও পরবর্তীতে কারণ ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এছাড়াও এই অংশে কিছু এমন ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে, যে ঘটনায় সাক্ষাতকারী ব্যক্তি বুঝতে পারেননি যে, তিনি ইমাম মাহদী (আঃ)-কে চিনতে পেরেছেন, না চিনতে পারেননি।

দ্বিতীয় অধ্যায়:-

এই অধ্যায়ে ইমামে যামানা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও 'মোকাশেফাহ্' বিষয় বর্ণিত হয়েছে। 'মোকাশেফাহ্' অর্থাৎ স্বপ্ন ও জাগ্রতর মধ্যম অবস্থা। মোকাশেফাহ্ অবস্থায় মানুষ যে সমস্ত জিনিসকে দেখতে পায়, তা বাহ্যিক হুশের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। স্বপ্নে মানুষের শ্রবণ ও দৃষ্টি বাইরের চোখও কান দিয়ে হয় না। তবে মোকাশেফাহ্-তে আত্মা ও রুহ তার নিজের অবস্থায় থাকে, আর ঐ সময় বাইরের কান চারপাশের আওয়াজ বা শব্দকে শুনতে থাকে।

তৃতীয় অধ্যায়ঃ-

এই অধ্যায়ে স্বপ্নে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জনকারী ব্যক্তিদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলি সত্য স্বপ্ন।

চতুর্থ অধ্যায়:-

এই অধ্যায়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পবিত্র নুরের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

অর্থাৎ সাক্ষাৎকারীরা সাক্ষাতের সময় ইমাম (আঃ)-এর নুরের ছটা, না আওয়াজ, না তাঁর পবিত্র সুগন্ধ পেয়েছেন, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

পঞ্চম অধ্যায়:-

এই অধ্যায়ে এমন ব্যক্তিদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যারা ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গে তাওয়াসুল (ওছীলা বা মাধ্যম) করেছেন, আর উত্তম ফল পেয়ে উপকৃত হয়েছেন।

_________________________________________



ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবনী আমাদের  জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ


ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবনী আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ। তাঁর জীবন থেকে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অর্জন করতে পারি, যেমন:
১. ধৈর্য ও সহনশীলতা
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পরেও ইমাম (আ.) ধৈর্যের সঙ্গে সবকিছু সহ্য করেন। তাঁর সহনশীলতা ছিল ঈমানের নিদর্শন।
২. ইবাদতের প্রতি গভীর অনুরাগ
তাঁকে বলা হয় সাজ্জাদ (সেজদাকারী) ও জাইনুল আবেদিন (ইবাদতকারীদের অলংকার)। তাঁর দোয়া, নামাজ ও কান্না আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করে।
৩. দুঃখ-কষ্টেও আল্লাহর স্মরণ
কারবালার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন জীবনকে গড়ে তুলেছিলেন, তখন আল্লাহর স্মরণই ছিল তাঁর একমাত্র শক্তি।
৪. দোয়া ও আত্মিক উন্নয়ন
তাঁর বিখ্যাত দোয়ার সংকলন "সাহিফা সাজ্জাদিয়া" আত্মিক উন্নয়নের জন্য এক অতুলনীয় উপহার, যেখানে নৈতিকতা, আত্মসমালোচনা, দয়া, সমাজসেবার দিক নির্দেশনা রয়েছে।
৫. অত্যাচারের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ
যদিও তিনি সরাসরি যুদ্ধ করেননি, তবুও ইয়াজিদের দরবারে তাঁর খুৎবা ছিল অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ। 
৬. সমাজ সংস্কার ও মানবতা
তিনি গোপনে দরিদ্রদের সাহায্য করতেন। মানুষকে শিক্ষা দিতেন কিভাবে দয়া, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবন হাদীস ও ইসলামিক শিক্ষার আলোকে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বংশধরদের সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীসে যেভাবে গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, তা ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবনেও পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

  হাদীসের আলোকে তাঁর জীবন থেকে কিছু দিক:

১. আহলে বাইতের ফজিলত সংক্রান্ত হাদীস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
_«إني تاركٌ فيكم الثقلين: كتابَ اللهِ، وعِترتي أهلَ بيتي، ما إن تمسَّكتم بهما لن تضلُّوا بعدي أبدًا.»_  
(সহিহ মুসলিম) ( کتاب مشهور نزد اهل‌سنت)
 অর্থাৎ: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী জিনিস রেখে যাচ্ছি — আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত। তোমরা যদি এদের ধরে রাখো, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।”  
এই হাদীস অনুযায়ী ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.) আল্লাহর কিতাব ও নবীর আহলে বাইতের অন্যতম প্রতিনিধি ছিলেন। 

২. ইবাদতে শ্রেষ্ঠত্ব:
রাসূল (সা.) বলেন:
“সেজদার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হও।”
(সহিহ মুসলিম) کتاب مشهور نزد اهل‌سنت 
 ইমামকে "সাজ্জাদ" বলা হতো কারণ তিনি দীর্ঘ সময় সেজদা করতেন। তাঁর সেজদা ও ইবাদত হাদীসের প্রকৃত বাস্তবায়ন। 

৩. সাহিফা সাজ্জাদিয়া — হাদীসসমৃদ্ধ দোয়ার ভাণ্ডার:
ইমাম (আ.)-এর দোয়াগুলোর সংকলন "সাহিফা সাজ্জাদিয়া" হাদীসের মতই নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গঠনের অনুপম নির্দেশনা দেয়।

৪. ইমামতের ধারক হিসেবে:
হাদীস: _“হাসান ও হুসাইন আমার সন্তানেরা, এবং তাদের সন্তানদের মধ্যেই ইমামগণ হবেন।”_  
(ইবনে মাজাহ)

 ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর তাঁর পুত্র জাইনুল আবেদিন (আ.)-কে আল্লাহর নিযুক্ত ইমাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উপসংহার:
ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবন হাদীসের বাস্তব রূপ, যেখানে আমরা দেখতে পাই কীভাবে কষ্ট, বন্দিত্ব, ও দুঃসহ জীবনে ইবাদত, ধৈর্য, দয়া ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা যায়। তাঁর জীবন মুসলমানদের জন্য নৈতিকতা ও ইমানদারির এক উজ্জ্বল আদর্শ। ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবন আমাদের শেখায় – দুঃখ-কষ্ট, জুলুম-অত্যাচারের মাঝেও ইবাদত, ধৈর্য, দয়া ও ন্যায়ের পথে অটল থাকতে হয়।
 
__________________________________________



ফাতিমা ও মাহ্দী: হেদায়েতের আলো

 ভূমিকা

আলহামদুলিল্লাহ, যিনি মানবজাতির জন্য হেদায়েতের পূর্ণ আলোকধারা দান করেছেন কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর মাধ্যমে।

বিবি ফাতিমা জাহেরা (সা.আ.) ও ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) — এই দুই নূর একই দিভ্য আলো থেকে উৎসারিত। ফাতিমা (সা.আ.) হচ্ছেন নবুয়তের ঘরের নূর, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) সেই নূরের শেষ প্রতিফলন, যার মাধ্যমে পৃথিবী পূর্ণ হবে ন্যায় ও শান্তিতে।


 ফাতিমা জাহেরা (সা.আ.) — ইমামতের নূরানী উৎস

বিবি ফাতিমা (সা.আ.)-এর মর্যাদা শুধু নবীর কন্যা হিসেবে নয়; তিনি ইমামতের কেন্দ্রবিন্দু ও নূরের ধারক। ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.) বলেন: 
ফাতিমা (সা.আ.) হচ্ছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমামদের উপর হুজ্জত।”
[Bihar al-Anwar, vol. 43, p. 105; Tafsir al-Ayyashi, vol. 1, p. 240]

তিনি ছিলেন আল্লাহভীতিতে অতুলনীয়, ইবাদতে অনন্য এবং সমাজে সত্যের জন্য নির্ভীক কণ্ঠস্বর। আর ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল কুরআনিক আদর্শের জীবন্ত প্রতিফলন। তাঁর জীবনের শিক্ষা আমাদের জানায় — ইলাহি ন্যায় প্রতিষ্ঠা, দ্বীনের সুরক্ষা এবং ইমামতের আনুগত্য* — এই তিনই প্রকৃত মুক্তির পথ



ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) — ফাতিমার নূরের পরিপূর্ণ প্রতিফলন

ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) হচ্ছেন ফাতিমা (সা.আ.)-এর বংশধর, তাঁর রক্ত, নূর ও আদর্শের উত্তরাধিকারী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “মাহ্দী ফাতিমার (সা.আ.) সন্তানদের মধ্য থেকে।”
[Sunan Abi Dawood, vol. 4, hadith 4284; Mustadrak al-Hakim, vol. 4, p. 557]


ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর মিশন হলো: 
ক) বিশ্বে ন্যায় ও সমতার প্রতিষ্ঠা, খ) কুরআনের প্রকৃত ব্যাখ্যার পুনরুজ্জীবন,
গ) মানবতাকে আহলে বাইতের (আ.) পথে ফিরিয়ে আনা।

ইমাম বাকির (আ.) বলেন: “যখন কায়েম (আ.) উদ্ভাসিত হবেন, তিনি ন্যায়ের সঙ্গে শাসন করবেন এবং তাঁর যুগে অন্যায় বিলুপ্ত হবে।”
[Kamal al-Din, Shaykh Saduq, p. 331; Al-Ghaybah, al-Nu’mani, p. 238]


 মিলিত আদর্শ — নূর থেকে নূরে প্রবাহিত হেদায়েত

ফাতিমা (সা.আ.) হচ্ছেন ন্যায়, ত্যাগ ও সত্যের বীজ, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) সেই বীজের পূর্ণ প্রস্ফুটন। তাঁদের মধ্যে রয়েছে এক ধারাবাহিক ইলাহি সম্পর্ক —
নূর ফি নূর” (নূরের মধ্যে নূর)। এই মিলিত আদর্শের তিনটি স্তম্ভ হলো —

 ক) ইলাহি ন্যায়:
ফাতিমা (সা.আ.) ন্যায়ের পথে নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছেন, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) সেই ন্যায়কে বিশ্বব্যাপী বাস্তবায়ন করবেন।

 খ) ইমামতের ধারাবাহিকতা:
ফাতিমা (সা.আ.) হচ্ছেন সকল ইমামের উৎস, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) হচ্ছেন তাঁদের সমাপ্তি।

 গ) হেদায়েতের বিশ্বায়ন:
ফাতিমা (সা.আ.) মানবতার হৃদয়ে নূর জ্বালিয়েছেন, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) সেই নূরকে ছড়িয়ে দেবেন সমগ্র পৃথিবীতে।

ইমাম সাদিক (আ.) বলেন: “যে মাহ্দীর অপেক্ষায় মৃত্যুবরণ করে, সে যেন কায়েমের পতাকার নিচেই শহীদ হয়।”
 [Kamal al-Din, Shaykh Saduq, p. 335; Al-Ghaybah, al-Nu’mani, p. 200]


কওমের জন্য হেদায়েতের বার্তা

আজ আমাদের শিয়া ইসনা আশারী কওম নানা দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশ্বাসে শৈথিল্য, সমাজে বিভক্তি ও দুনিয়াবী আকর্ষণ আমাদের ইমানের মজবুত ভিত্তি নাড়া দিচ্ছে। এখন আমাদের ফিরতে হবে সেই আদর্শে —
ফাতিমা (সা.আ.)-এর আত্মিক পবিত্রতা, আলী (আ.)-এর ন্যায় ও সাহস, এবং ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর অপেক্ষা ও প্রস্তুতির সংস্কৃতি। ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) এক পত্রে ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকের উচিত আমাদের ভালোবাসার পথে এগিয়ে যাওয়া এবং যা আমাদের অসন্তুষ্ট করে তা থেকে দূরে থাকা।”
 [Al-Ihtijaj, Al-Tabrisi, vol. 2, p. 497]



এই কথাই আমাদের কওমের হেদায়েতের মূল: “ইন্তিজার” মানে শুধু অপেক্ষা নয় — বরং আত্ম-সংস্কার, সমাজ-সংস্কার ও আহলে বাইতের আদর্শে জীবন গড়া।

 উপসংহার

ফাতিমা জাহেরা (সা.আ.) ও ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) — এই দুই নূর একই ইলাহি আলোর প্রতিফলন। ফাতিমা (সা.আ.) ছিলেন ন্যায় ও হেদায়েতের সূচনা, মাহ্দী (আ.ফা.) সেই হেদায়েতের চূড়ান্ত পরিণতি। যে তাঁদের ভালোবাসে ও তাঁদের পথ অনুসরণ করে, সে-ই প্রকৃত “মুহিব্বে আহলে বাইত”।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে ইমাম মাহ্দীর (আ.ফা.) সহায়ক, অনুগামী ও তাঁর পতাকার নিচে শহীদ হওয়াদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন... ছুম্মা আআমিন।

__________________________________________



পশ্চিমবঙ্গের শিয়া কওমের শিক্ষা : একটি পর্যালোচনা
        ✍️ রাজা আলী

শিক্ষা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের এমন একটি নেয়ামত,যা মানুষকে সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে শেখায়।এই কারণে কোরানে কারীমের মধ্যে শিক্ষা র অশেষ গুরুত্ব একাধিক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলের হাদীসেও শিক্ষার বহুমুখী গুরুত্ব উঠে এসেছে।এই শিক্ষাই মানুষের মর্যাদার কারণ; শিক্ষা ই সমাজের মেরুদণ্ড। তাই বর্তমান সময়ে আমাদের শিয়া কওমের চিন্তা -চেতনায় শিক্ষা কিছু টা পরিমাণ জায়গা করে নিয়েছে।

      তা সত্ত্বেও বলা যায় আজ আমরাই পশ্চিমবঙ্গের বুকে শিক্ষা ক্ষেত্রে সব থেকে পিছিয়ে। কিন্তু কেন?প্রতিটি ঘরের প্রতিটি সন্তান আজ স্কুলের দুয়ারে।প্রায় প্রতিটি বাঙালি শিয়া সন্তান আজ ক্লাস এইট , মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা আরো কিছু ডিগ্রি ঝুলিতে ভরে নিয়েছে।প্রশ্ন জাগে তার পরেও কেনো শিয়া কওম উন্নত চিন্তা-চেতনা ,সরকারি -বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এত পিছিয়ে! আমাদের সমাজ কেনো এখনো অনুন্নত? এখন এই "কেনো"র উত্তর অনুসন্ধান করা যাক।

     গত দশকের তুলনায় বর্তমানে শিয়া সমাজের শিক্ষার হার অনেক খানি এগিয়েছে। কিন্তু শিক্ষা র মান উন্নয়ন হয় নি।হাতে গোনা দুচার জন ছাড়া বাকি সকলে অতি সাধারণ ভাবে পাশ করেছে এবং করছে এবং পড়াশোনা র মূল ক্ষেত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।অনেকে আবার মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তর থেকেই বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে এবং চেতনাশীল মানুষ হিসাবে কিম্বা ভালো কর্ম থেকে দূরে রয়ে যাচ্ছে।।দু এক জন উচ্চশিক্ষার উন্নত সোপানে পা রেখেছে; কিন্তু ভালো মতো আর্থিক পরিস্থিতি কিম্বা ভালো দিকনির্দেশনা র অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।দুএক জন মাত্র চিন্তাশীল মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে পেরেছে বা ভালো সরকারি-বেসরকারি কাজে নিযুক্ত হতে পেরেছে।

মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তরে হারিয়ে যাওয়ার কারণ:

     আমাদের শিয়া সমাজের বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তরেই পড়াশোনার মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়(তবে কন্যাশ্রী,রূপশ্রীর দৌলতে কিছু মেয়ে গ্র্যাজুয়েশন স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে)। তারা অনেকেই পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়।কেউ বা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার তাগিদ উপলব্ধি করে এবং কাজ ও পড়াশোনা  পাশাপাশি চালাতে থাকে ফলে পড়াশোনা এক অর্থে শেষ হয়ে যায়।এই সমস্যার মূল কারণ লুকিয়ে রয়েছে ঐ সকল ছাত্রদের শৈশবকালীন পড়াশোনা র মধ্যে।বাবা-মার অসাবধানতা এবং অজ্ঞতা এক্ষেত্রে দায়ী।বাবা-মা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছে, কিন্তু ভালো রেজাল্টের তাগিদ অনুভব করেনি। সংসার, আত্মীয় এবং বন্ধুদের পিছনে অহেতুক খরচ করেছে, কিন্তু সন্তানের জন্য ভালো শিক্ষকের ব্যবস্থা করেনি।আজকের দিনের পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভালো গৃহশিক্ষক অপরিহার্য।এটা প্রত্যেক বাবা-মা জানে, কিন্তু সাধারণ টিউশন বা সাধারণ কোনো কোচিং এ পাঠিয়েছে।যে বাবা নিজের সন্তানের জন্য মাসে পাঁচ সাত শ'টাকার খাবার আনতে পারে,যে বাবা নিজের মেয়ের বিয়েতে তিন /চার লক্ষ টাকা খরচ করতে পারে ;সেই বাবা নিজের সন্তানের পিছনে মাসে পাঁচ শ' সাত শ টাকা টিউশন খরচ করে না।নাইন টেন স্তরে প্রবেশ করলে কোনো কোনো বাবা মা কিছুটা সচেতন হয়,ভালো টিউশনের ব্যবস্থা করে, কিন্তু ভিত দুর্বল থাকার কারণে ভালো রেজাল্ট হয় না।সুতরাং ঐ সন্তান বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার 'মায়াবী আকাশে'এক,দুই, তিন... করে শুধু ক্লাসে উঠেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি।

অভিভাবকের অজ্ঞতা:

অজ্ঞতা মানুষের ভবিষ্যত নষ্ট করে দেয়।তাই শিক্ষার্থীদের অভিভাবক রা সঠিক ভাবে সন্তানদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে না। কিছু অজ্ঞ ও অসৎ মানুষের জন্য সন্তান দের পড়িয়ে কী হবে বা চাকরি নেই ধরণের শ্লোগানে তারা ভ্রান্ত ধারণা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সন্তানদের ভবিষ্যতকে বরবাদ করে দেয়।

শিক্ষকদের অনিহা:

বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের অনিহা শিক্ষার্থীদের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সাধারণ কৃষি প্রধান এলাকায় স্কুল শিক্ষক দের গভীর ঔদাস্য এবং ফাঁকি বাজী র কারণে শিক্ষার্থীরা যেমন ভালো কিছু শিখতে পারে না,তেমন ই উৎসাহ পায় না। সুতরাং ক্লাসের পর ক্লাসে উঠলেও প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের ঘাটতি থেকেই যায়।

উপসংহার:

পরিশেষে এটাই বলতে হয় যে,শিয়া কওমের শিক্ষার মূল ঘাটতি টি হয়ে থাকে অভিভাবকদের থেকে। অভিভাবকদের সচেতনতা এবং উদ্যোগ না থাকলে কোনো শিক্ষার্থী সঠিক ভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাবে না।ফলে আমাদের অর্থনীতি,সমাজ ও সংস্কৃতি পিছিয়ে পড়বে। আমাদের সমাজে আজ যে সমস্যা রয়েছে,তা তো সমাধান হবে না; বরং নতুন নতুন সমস্যা এসে হাজির হবে।

__________________________________________



আল্লাহর নেয়ামত ও ইমামে জামানা (আঃ)-এর মহা অনুগ্রহ


بسم الله الرحمن الرحيم
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
“অতএব, তোমাদের প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে?” (সূরা রহমান)

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তা’আলার, যিনি সমগ্র সৃষ্টির রব, পরম দয়ালু ও পরম করুণাময়। তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের রিজিক দান করেছেন, এবং আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে নবী ও ইমামগণকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর হামদ ও শুকরিয়া আদায় করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।

আল্লাহ তায়ালা সূরা রহমানের মাধ্যমে তাঁর অসংখ্য নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে, আর জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন আগুনের উত্তপ্ত শিখা থেকে। এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা তাঁর সৃষ্টির নিদর্শন, তাঁর রহমতের প্রতিফলন।
তবুও মানুষ ভুলে যায়, অস্বীকার করে, অথচ আল্লাহ প্রশ্ন করেন—
“তাহলে তোমাদের প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে তোমরা অস্বীকার করবে?”

 মানব শরীরে আল্লাহর নেয়ামতের নিদর্শন:

আল্লাহর নেয়ামতের সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমাদের নিজের দেহে নিহিত।
তিনি কানের ভিতরে তিক্ততা সৃষ্টি করেছেন, যেন কোনো জীব বা পোকা-মাকড় প্রবেশ করলে তা মারা যায়। যদি এমন না হতো, তবে অসংখ্য কীটপতঙ্গ কানে ঢুকে মানুষকে কষ্ট দিতো বা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতো।

তিনি ঠোঁটের মাঝে রেখেছেন মিষ্টতা, যাতে মানুষ তিক্ত ও মিষ্টির পার্থক্য অনুধাবন করতে পারে।
চোখে রেখেছেন নোনাভাব, কারণ চোখ দুটি চর্বিযুক্ত। যদি এতে নোনাভাব না থাকত, চোখ গলে যেত।
আর নাককে প্রবাহমান করেছেন, যাতে মাথার অতিরিক্ত পদার্থ নাক দিয়ে বের হয়ে আসে—না হলে মাথা ভারী হয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হতো।

এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুগ্রহই প্রমাণ করে, আল্লাহর নেয়ামত অসীম, অগণিত ও অপরিমেয়।

এক অদৃশ্য কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত:
তবে এসব দৃশ্যমান নেয়ামতের পাশাপাশি আছে এমন এক নেয়ামত, যা অদৃশ্য হলেও সর্বশ্রেষ্ঠ।
তিনি আমাদের মাঝে আছেন, কিন্তু আমরা তাঁকে দেখি না। আমরা তাঁর কণ্ঠ শুনতে পাই না, কিন্তু তিনি আমাদের প্রতিটি আহ্বান শুনেন। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সাহায্য করেন, কিন্তু আমরা তা অনুভব করতে পারি না। বিপদের সময় তিনি আমাদের মাথায় স্নেহের হাত রাখেন, অথচ আমরা সেই উপস্থিতি টের পাই না।

তিনি আমাদের গোনাহ দেখে কাঁদেন, আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, অথচ আমরা তাঁর জন্য একবারও আল্লাহর দরবারে হাত তুলতে পারি না!
আমরা মুখে বলি—কারবালার প্রতিশোধের সৈনিক হবো, কিন্তু আমাদের আমল দেখে হয়তো তিনি জুলফিকার হাতে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখেন!
হে আল্লাহ! আমরা কৃতজ্ঞ যে, তুমি আমাদের এমন এক নেয়ামত দান করেছ, যা সকল নেয়ামতের ঊর্ধ্বে—
সেই নেয়ামত হলেন আমাদের মাওলা, ইমাম মাহ্দী (আখেরি জামান আঃ)।
তাঁর বরকতেই এই পৃথিবী টিকে আছে।
তাঁর অস্তিত্বের বরকতেই আমরা আজ রিজিক, শান্তি ও আলো পাচ্ছি।
প্রতিটি নেয়ামতের পেছনে রয়েছে ইমামে জামানা (আঃ)-এর রহমত ও দোয়া।

 আমাদের করণীয়
১️, ইমামে জামানা (আঃ)-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা ও মহব্বত জাগ্রত করা।
২️, এমন আমল করা যা তাঁকে সন্তুষ্ট করে, এবং গোনাহ থেকে দূরে থাকা যা আমাদের তাঁর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত করে।
৩️, প্রতিনিয়ত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা যে, তিনি আমাদের যুগের ইমাম হিসেবে এমন এক মহীয়ান নেইমত দান করেছেন।

 উপসংহার
প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি দৃষ্টিতে, প্রতিটি অনুভূতিতে আল্লাহর নেয়ামতের ছোঁয়া।
তবুও মানবজাতি ভুলে যায়, অকৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে।
আর তাঁর প্রেরিত সর্বশেষ প্রমাণ, আমাদের ইমামে জামানা (আঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও প্রত্যাশা যেন আমাদের জীবনকে আলোকিত করে—
যতক্ষণ না আমরা তাঁর ন্যায়ের পতাকার নিচে মাথা নত করে দাঁড়াতে পারি।

__________________________________________------------------------------------------------




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
     নারী জাতির অনন্ত আলোকচ্ছটা

নূরের গুচ্ছ ফাতেমা,
পাঞ্জতনের কেন্দ্র ফাতেমা।
আরশ হতে সৃষ্টি হল—
মুর্তজার প্রিয় ফাতেমা।

জগৎজননী তুমি ফাতেমা,
এগারো ইমামের মা তুমি ফাতেমা।
তোমারই নামে আছে কাওসার,
রহমতের ধারা তুমি ফাতেমা।

নারীজাতির আদর্শ তুমি ফাতেমা,
রোগের শেফা— তাসবিহে ফাতেমা।
নারীরা পাবে জান্নাত তোমার আদেশে,
উম্মতেরা ভ্রমে ছিল তোমার পথের বেশে।

ফিদাক মেরে নিয়েছে তোমার ফাতেমা,
দলিল ছিঁড়ে দিয়েছে তোমার ফাতেমা।
নবীর সাহাবা দাবি করে তারা কিভাবে—
যতই হোক খলিফা, তারা কাতিলে ফাতেমা।

__________________________________________


    ঋণ এবং সুদান
    ✍️ রাজা আলী 


               ঋণ
রাত ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে আরো
মুক্তি কোথায় বলতে পারো?

ওদের কালো হাত,উগ্র দৃষ্টি
শুকিয়েছে মেঘ,নেই তো বৃষ্টি!

যন্ত্রণা , যন্ত্রণা আজ অনবরত
ওই দেখ লাশ শিশুর শত শত!

এরা শান্তির দূত,গায়ে বেশ যুত
ভাব এদের,এরাই পবিত্র ও পূত।

জেনে রাখ ওরা শয়তান 
করে আছে মানুষের ভান।

আসবে সেদিন আসবে শীঘ্র 
ধ্বংস হবেই,ওদের বিগ্রহ।

মুক্ত,মুক্ত,হবে নতুন ফিলিস্তিন 
শোধ হবে কি,আল আকসার ঋণ?


          সুদান
কালো মানুষের দেশ
সর্বদা দরিদ্রদের বেশ
আবার এখন তীব্র কালো ছায়া
কে রে তুই,এখন দূর হ অপয়া।

বীভৎস দানব এক
দুচোখ মেলে দেখ
যদিও মানুষের বেশ ধরেছে খুব 
শয়তানেরা মুনাফেক দেখে চুপ।

পথে ঘাটে শুধু লাশ
এক টুকরো নেই আশ
গরীব মানুষের দেশ বলে নেই মান
যন্ত্রণা দগ্ধ তুমি,বেদনাকাতর সুদান।
__________________________________________

কুরআন, হাদিস, আহলে বাইতের সুর

কুরআন নূরের ঝর্ণা ধারা, আল্লাহর কালাম মধুর, 
হাদিস নবীর পথের তারা, জীবনে জাগায় সত্যের সুর। 
কিন্তু আহলে বাইত ছাড়া, হায়, পথটা অন্ধকারে ডোবে, ইসলামের গভীর রহস্য তখন, হৃদয়ে অচেনা কুয়াশায় থোবে।

ফাতেমা, আলী, হাসান, হোসেন, জয়নাবের ত্যাগের ঝংকার, কুরআনের আয়াত তাদের জীবনে, হাদিসের প্রাণের আধার। নবীর কোলে জন্ম তাদের, পবিত্র ঘরের আলোর ফুল, 
তাদের ছাড়া ইসলামের পথ, অসম্পূর্ণ, ম্লান কুমুদ।

কুরআন বলে, "চলো হে মুমিন, সত্যের পথে হৃদয় জাগাও,” হাদিস বলে, "নবীর সুন্নাহ, জীবনে এনে স্বপ্ন গড়াও।
" আহলে বাইত সেই পথের দীপ, জীবন্ত রূপে আলোর মায়া, তাদের ভালোবাসা ছাড়া, ইসলাম অধরা, হৃদয়ে ছায়া।

ফাতেমার ধৈর্যে শিখি ত্যাগ, অটল সত্যের অমর কথা, 
আলীর তরবারি জাগায় হৃদয়ে, হকের জন্য নির্ভীক ব্যথা। 
হাসান-হোসেনের শাহাদাতে, ইসলামের জয়ের রাগিনী, জয়নাবের কণ্ঠে শুনি আমরা, সত্যের অমর সুরের ধ্বনি।

কুরআন, হাদিস, আহলে বাইত, তিন মিলে ছন্দের তাল, 
একটি ছাড়া পথ অচল, হৃদয়ে জাগে না আলোর মশাল।
ও মুমিন, তুই বুকে ধরো, এই তিনের মধুর মিলন, 
আহলে বাইতের ভালোবাসা, ইসলামের প্রাণের কিরণ।

তাই আয়, ছন্দে ছন্দে করি, আহলে বাইতের গুণগান, কুরআন-হাদিসের আলোয় চলি, সত্যের পথে দিই প্রাণ।
তাদের ভালোবাসা হৃদয়ে নিয়ে, ইসলামের সুরে মাতি, 
ছন্দে ছন্দে জীবন গড়ি, আলোর পথে হেঁটে যাই।


 __________________________________________

ইমাম মাহ্দীর আদর্শ (সনেট)

অন্ধকার ঢাকে যখন বিশ্বাসের জ্যোতি,
রাত্রির মাঝে জাগে এক নীরব আশা।
প্রতিশ্রুত সেই নূর আসিবেন সত্ত্বগতি,
ন্যায়ে ভরবে ধরা, জ্বলবে আলোক ভাষা।

লুকায়ে আছেন তবু নজর রাখেন প্রাণে,
যে হৃদয় চায় পবিত্রতার ছোঁয়া।
তাঁর নামেই জাগে দুনিয়ার প্রতিজনে,
করুণা চায়, চায় ইলাহি আলো রোয়া।

তাঁর তরবারি ন্যায়ের প্রতীক মহীয়ান,
জ্ঞান ও দয়ায় ভরে দিবেন সংসার।
জুলুম মুছে যাবে, উঠবে প্রেমের গান,
মানবতা ফিরবে সত্যের দ্বারে আবার।

হে হৃদয়! প্রস্তুত হও আহ্বানের তরে,
মাহ্দী আসিবেন, জাগবে নূর ঘরে।


Following Shakespearean Sonnets (abab cdcd efef gg )
------ _____------_____------______------______------

Sunday, October 19, 2025

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ রবিউস সানি সংখ্যা

আরবি: রবিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: অক্টোবর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


শেখ মুর্তযা আনছারী (রহঃ)- অনুবাদ

ইমাম মেহদী আঃ এর ইমামত  (ঈদে জাহরা)

ইয়াতীমে দো আলম ও আমাদের অন্তরের প্রতীক্ষা

ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন:এক আধ্যাত্মিক বিস্ময় 
          ✍️ রাজা আলী 

 মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতীক্ষা: সর্বোত্তম ইবাদত




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

           আখেরী নবুয়াত

                মানবতা
                      ও
            নোবেল তুমি কার?
                ✍️ রাজা আলী 

             নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

রবিউস সানী—রূহানিয়াত ও আশার মাস। সফরের শোক শেষে এই মাস আমাদের ডাকে নতুন আলোর পথে, যেখানে প্রতীক্ষা হয়ে ওঠে ইমানের প্রাণ, আর ইমামতের স্মৃতি জাগায় আত্মার জাগরণ।

এই সংখ্যার প্রতিটি রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে সেই আলো। শেখ মূর্তজা আনছারি (রহঃ)-এর জ্ঞান ও ত্যাগ আমাদের শেখায় ঈমানের গভীরতা। “ঈদে জাহেরা”-য় ফুটে উঠেছে মুক্তির আনন্দ, “ইয়াতিমে দো আলম ও আমাদের অন্তরের প্রতীক্ষা”-য় জেগে উঠেছে অন্তরের বিপ্লব, আর “মানুষ শ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর প্রতীক্ষা : সর্বোচ্চ এবাদত” আমাদের আহ্বান জানায় কর্মমুখর অপেক্ষায়।

কবিতার পাতায় “আখেরি নবুয়াত”, “মানবতা” ও “নি:শব্দ প্রতিজ্ঞা”—এই তিনটি কবিতা যেন হৃদয়ের প্রার্থনা, যেখানে শব্দই হয়ে ওঠে দোয়া।

আসুন, এই রবিউস সানীতে আমরা নবায়ন করি আমাদের প্রতিজ্ঞা—
ইমামের পথে থাকুক আমাদের কলম, আমল ও ভালোবাসা।
                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


শেখ মুর্তযা আনছারী (রহঃ)

ইসলামী জগতের এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও উচ্চ পর্যায়ের ফক্বীহ্ হলেন শেখ মুর্তযা আনছারী (রহঃ) (১২১৪-১২৮১ হিজ্বরী)। তাঁর শিক্ষা ও আমলের আলো ইসলামী দেশগুলির উপর পড়েছিল। কিছু ওলামাদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন ফক্বীহ ও মুজতাহীদদের মধ্যে শেষতম। তাঁর বংশ নবী (সাঃ)-এর বিখ্যাত সাহাবী জনাবে জাবীর ইবনে আবদুল্লাহ্ আনছারী (রহঃ) থেকে ছিল। আল্লামা মোহাদ্দিছ নুরী (রহঃ) নিজের পুস্তক 'মুস্তাদরিকে'র শেষে তাঁর বিষয়ে বলেছেনঃ 'আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন জনাবে জাবীরের উপর খুবই এহসান ও দয়া করেছেন। আর তাঁর নসলে এমন একজন ব্যক্তিকে সৃষ্টি করেছেন যে নিজের মেধা, শিক্ষা, গবেষণা ও এবাদাত দ্বারা দ্বীন ও মযহাবের জন্য শ্রেষ্ঠ খেদমতটি করেছে। তিনি নিজের যুগে উম্মতদের জন্য একজন শ্রেষ্ঠ মার্জা-মুজতাহিদ, নিজের ইমাম (আঃ)-এর সাহায্যকারী, আশিক ও অপেক্ষাকারীদের মধ্যে ছিলেন। আর নিজের চিন্তা-চেতনা ইমাম মাহদী (আঃ)-এর পবিত্র ব্যক্তিত্বের উপর থেকে সরাতেন না। তাঁর একজন ছাত্র বর্ণনা করেছে যে, একবার মধ্যরাত্রির পরে আমি আমার বাড়ি থেকে কারবালার দিকে বার হই। পথে কাঁদা এবং চারি দিকে অন্ধকার হওয়ার জন্য সঙ্গে একটি চেরাগ (আলো) নিয়ে নিই। কিছু দূর গিয়ে আমি একজন মানুষকে দেখতে পাই। কিছুটা কাছে গিয়ে আমি তাঁকে চিনতে পারি। তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক শেখ আনছারী (রহঃ)। তাঁকে দেখে আমি খুব-ই চিন্তিত হলাম। ভাবতে থাকলাম চোখে কম দেখতে পাওয়া এই মানুষটি এত রাতে কাদা রাস্তা এবং অন্ধকার পথে কোথায় যাচ্ছে? একবার মনে হলো হয়ত বা তার ওপর কারো নজর আছে। তাই আমিও তাঁর পিছনে পিছনে চলতে থাকলাম। শেখ আনছারী (রহঃ) চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত একটি ঘরের কাছে এসে থেমে যান। আর ঐ ঘরের সামনে দাঁড়িয়েই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ করলেন ও যিয়ারাতে 'জামেয়া'হ্' পড়লেন। তার পরে ঐ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। এর পরে আমি আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না; তবে শেখের কথা আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি যেন কারো সাথে কথা বলছিলেন। ঘন্টা খানেক পরে আমি আমার গন্তব্য স্থানের (রওযার দিকে) উদ্দেশ্যে চলে গেলাম। এর কিছু দিন পরে শেখের কাছে যাই। আর ঐ রাতের ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু তিনি কিছুই বলতে চাচ্ছিলেন না। আমার বার বার অনুরোধের কারণে অবশেষে বললেনঃ 'কখনও কখনও ইমামে যামানা (আঃ)-এর দরবারে সাক্ষাৎ করার অনুমতি অর্জন করার জন্য ঐ ঘরের নিকটে (ঐ ঘর তুমি কখনো দেখতে পাবেনা) যাই; আর যিয়ারাতে 'জামেআ'হ্' পড়ি। যখন অনুমতি পেয়ে যাই, তখন তার পবিত্র দরবারে গিয়ে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করি। আর প্রয়োজনীয় মাসলা-মাসায়েল বিষয়ে ইমাম (আঃ)-এর কাছে প্রশ্ন করি এবং উত্তর জেনে নিই। তার পরে শেখ আমাকে ওয়াদা করতে বলে যে, তাঁর জীবিত থাকা কালে আমি যেন এই ঘটনাটি কারও সঙ্গে না বলি। এরপর তিনি বলেনঃ অবশ্যই ইমাম (আঃ) নিজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। আর এই সমস্ত ব্যক্তিগণও ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আদেশ পালন করতে থাকে; আর তাঁকে সাহায্য করতে থাকে। আর এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধুমাত্র নিজের প্রতিনিধিদের উপর ইমাম (আঃ) দয়া করেন না, বরং যারা আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের সঙ্গে মোহব্বতের সম্পর্ক রাখেন, তাদের প্রতিও দয়া করেন। তবে এক্ষেত্রে যদি কোনো বাধা না আসে, অর্থাৎ আল্লাহ্র আদেশ থাকে। আমাদের বিশ্বাস রাখা উচিত, যদি আমরা সাহায্য ও বন্ধুত্বের সমস্ত স্তরগুলি অতিক্রম করতে পারি, তা হলে ইমাম (আঃ)ও আমাদের সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবেন না।

বর্তমান অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

[ যিয়ারাতে জামিআ'হ্ খুবই বিশ্বস্ত ও বিখ্যাত একটি যিয়ারাত। এই যিয়ারাতটি আহলেবায়েত (আঃ)-এর মোহব্বতের ভিত্তিতে তাদের নৈকট্য অর্জনের জন্য বেশি মাত্রায় পড়া উচিত।

[ মুজতাহীদরা যখনই দ্বীনি মাসলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হন, তখন ইমামে যামানা (আঃ) তাঁদেরকে সাহায্য করেন।


_________________________________________
ইমাম মেহদী আঃ এর ইমামত  (ঈদে জাহরা)

ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফত ইসলামের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের খেলাফত হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ইমাম মেহদী আঃ পৃথিবীতে আগমন করবেন এবং দুনিয়ায় শান্তি, ন্যায় এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁর খেলাফত বা শাসনকালে পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকল অন্যায় ও অশান্তির অবসান ঘটবে।
ইমামত এ ইমাম মেহদী এর

 হাদীস ও বর্ণনা:
1. ইমাম মুহাম্মদ আল-হাদি (আ.) বলেছেন: "৯ই রবিউল আউয়াল আমাদের সবচেয়ে বড় ঈদ এবং আমাদের অনুসারীদের ঈদ।
2. ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহর সেবা করার বিভিন্ন স্তর রয়েছে, তবে আমাদের (আহলে বাইতের) প্রতি ভালোবাসা সর্বোচ্চ স্তর।"
3. ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর সময়ে, কারবালার ঘটনার পর প্রথমবারের মতো তিনি হাসেন, যখন তিনি জানতে পারেন যে মুকতার সাকাফি কারবালার অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছেন। 

ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফতের মূল দিকসমূহ:
1. খেলাফতের সূচনা: ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফত তখন শুরু হবে যখন পৃথিবীতে শোচনীয় অবস্থা বিরাজ করবে—মানবতার মধ্যে দুর্নীতি, অশান্তি এবং অন্যায় বেড়ে যাবে। তিনি তার আগমনের মাধ্যমে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন।
2. *ন্যায় প্রতিষ্ঠা*: ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফতের সময় পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্গ ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁর শাসনে পৃথিবী থেকে সকল ধরনের দুর্নীতি, অত্যাচার এবং অন্যায় দূর হয়ে যাবে।
3. *শান্তি ও নিরাপত্তা*: ইমাম মেহদী আঃ এর শাসনকালে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীতে কোন যুদ্ধ বা অশান্তি থাকবে না এবং সমস্ত জাতি একত্রে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে।
4.* ইসলামের পরিপূর্ণ বিজয়*: ইমাম মেহদী আঃ এর শাসনে ইসলাম পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তৃত হবে। মুসলিমরা তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামিক মূল্যবোধ এবং ন্যায়নীতির দিকে এগিয়ে যাবে।
5. *মুসলিম জাতির ঐক্য*: ইমাম মেহদী আঃ এর নেতৃত্বে মুসলিম জাতি একত্রিত হবে এবং তাদের মধ্যে কোন ধরনের বিভক্তি থাকবে না। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে মুসলিম সমাজ পুনরুজ্জীবিত হবে।
6. *বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক উন্নতি*: ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফতের সময় মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটবে। মানুষ নিজেদের আত্মা ও বিশ্বাসের দিকে মনোনিবেশ করবে এবং তাদের আচার-আচরণে ইসলামের মূলনীতিগুলি প্রতিফলিত হবে।
7. *ফিতনা ও বিপর্যয়ের সমাপ্তি*: ইমাম মেহদী আঃ এর আগমনের পর পৃথিবী থেকে সকল ধরনের ফিতনা ও বিপর্যয়ের অবসান হবে। তার শাসনে অশান্তি, যুদ্ধ এবং হিংসা বন্ধ হবে এবং পৃথিবী একটি শান্তিপূর্ণ স্থান হয়ে উঠবে।
8.* ইসলামিক শাসনব্যবস্থা*: ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফতে ইসলামের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে সকল আইন ও শাসন ইসলামী নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। তাঁর শাসনব্যবস্থায় সমাজে সমান অধিকার, ন্যায় এবং মানবাধিকারের গুরুত্ব দেয়া হবে।

ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফত এবং মুসলিম জাতির ভবিষ্যত:
ইসলামী ঐক্য ও সংহতি: ইমাম মেহদী আঃ মুসলিম উম্মাতকে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং ইসলামী বিশ্বের শক্তিশালী পুনর্গঠন করবেন।
বিশ্বের শাসন: ইমাম মেহদী আঃ পৃথিবীর প্রতিটি দেশে ইসলামী ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন এবং পুরো পৃথিবী ইসলামের আলোকে আলোকিত হবে।
একতা এবং শান্তি: তাঁর খেলাফত থেকে মুসলিম জাতির মধ্যে একতা এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। 
অপেক্ষা: ইমাম মেহদী আঃ এর আগমনের জন্য মুসলিম জাতি সর্বদা অপেক্ষা করে থাকে। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন হাদিস ও ধর্মীয় গ্রন্থে নানা লক্ষণ ও সময়সূচী উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফত বা শাসনটি মুসলমানদের জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে ধরা হয়, যা পৃথিবীকে একটি নতুন, শান্তিপূর্ণ এবং ন্যায়পরায়ণ যুগে প্রবাহিত করবে।
 
__________________________________________

ইয়াতীমে দো আলম ও আমাদের অন্তরের প্রতীক্ষা


ভূমিকা

ইতিহাসের কিছু দিন আছে যেগুলো মানবতার বুকে আনন্দের সুর তোলে, আবার কিছু দিন আছে যেগুলো গোটা মহাবিশ্বকে শোকে নিমজ্জিত করে। রবিউল আওয়াল মাস মুসলিম জগতে একদিকে আলোর উৎসব—কারণ এই মাসেই এসেছে রহমাতুল্লিল আলামীন, মহানবী (সা.)। অপরদিকে, এ মাসেই আছে এমন এক দিন, যেদিন আকাশ কেঁদেছিল, ফেরেশতারা শোকে রঙিন হয়েছিল, আর আমাদের প্রিয় ইমামে জামানা (আ.ফা.) হয়ে পড়েছিলেন ইয়াতীমে দো আলম। সেই দিন হলো—৮ই রবিউল আওয়াল।


 ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদত

ইমাম হাসান আসকারী (আ.), একাদশতম ইমাম, ২৬০ হিজরির ৮ই রবিউল আওয়ালে (৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় শাসকের ষড়যন্ত্রে শহীদ হন। ইতিহাসকাররা লিখেছেন, তাঁকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করা হয় (শেখ মুফীদ, আল-ইরশাদ, খণ্ড ২)। এই শাহাদতের মাধ্যমে কেবল একজন ইমামের জীবনই শেষ হয়নি, বরং গোটা উম্মাহর জন্য শুরু হয়েছিল এক গভীর পরীক্ষা।


 ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর এতিমত্ব

ইমাম আসকারী (আ.)-এর শাহাদতের মুহূর্তে তাঁর অমূল্য সন্তান, ইমাম মাহদী (আ.ফা.), তখন খুবই ছোট। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, সেই সময়ে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫ বছর (শেখ তুসী, আল-গায়বা)। এই বয়সেই তিনি হারালেন পিতাকে। কিন্তু তাঁর এতিমত্ব ছিল কোনো সাধারণ এতিমত্ব নয়।

তিনি হলেন _ইয়াতীমুস সাকলেইন_ —অর্থাৎ দুনিয়া ও আখেরাতের এতিম। কারণ তিনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহর শেষ হুজ্জত, সমগ্র মানবজাতির অভিভাবক। তাঁর পিতার শাহাদতের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি হয়ে গেলেন সেই মহান ইমাম, যিনি এখনো গায়বতের পর্দায় আছেন এবং যাঁর প্রতীক্ষায় আমরা প্রহর গুনছি।


 কুরআন ও আহলে বাইতের আলোকে ইমামের শোক
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইমামদের গুরুত্বের কথা বলেছেন: "এবং আমি তাদেরকে করেছিলাম নেতা, যারা আমার আদেশে পথপ্রদর্শক হতো।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৭৩)
এ আয়াত আমাদের শেখায় যে ইমামরা মানবতার পথপ্রদর্শক। কিন্তু ৮ই রবিউল আওয়ালে যখন ইমাম মাহদী (আ.ফা.) এতিম হলেন, তখন গোটা মানবতা তাদের দৃশ্যমান পথপ্রদর্শককে হারাল। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এক হাদিসে বলেন: "যে ব্যক্তি আমাদের কায়েম (আ.ফা.)-এর শোকে কাঁদবে, আল্লাহ তার চোখকে জান্নাতের আলোতে ভরিয়ে দেবেন।” (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫২) অতএব, ৮ই রবিউল আওয়ালের শোক কেবল ইতিহাস নয়, বরং ঈমানের অংশ।


 শোক ও প্রতীক্ষার সেতুবন্ধন
৮ই রবিউল আওয়াল আমাদের শেখায়— আমরা শুধু নবীর জন্মের আনন্দে মেতে উঠব না, আমরা কেবল ইতিহাসের শোক স্মরণ করব না, বরং আমরা বুঝব, আমাদের ইমাম আজও নিঃসঙ্গ। তিনি এখনো অপেক্ষা করছেন আমাদের প্রস্তুতির জন্য। তাঁর সেই প্রতীক্ষার সঙ্গী হওয়াই আমাদের আসল দায়িত্ব।


 আমাদের দায়বদ্ধতা
আজ যখন আমরা ৮ই রবিউল আওয়াল স্মরণ করি, তখন শুধু চোখের জল যথেষ্ট নয়। ইমামের এতিমত্ব আমাদের ওপর কিছু কর্তব্য চাপিয়ে দেয়:

1.ইমামের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করা।

2.দোয়া করা বিশেষ করে দুয়া নুদবা, যাতে ইমামের অন্তরে আমাদের সঙ্গ অনুভূত হয়।

3.ইমামের আগমনের জন্য সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

4.তাঁর নাম ও স্মৃতি হৃদয়ে জাগ্রত রাখা।


 উপসংহার
৮ই রবিউল আওয়াল শুধু একটি শোকের দিন নয়, এটি একটি আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা সবাই এতিম, যতক্ষণ না ইমাম মাহদী (আ.ফা.) আমাদের মাঝে ফিরে আসছেন।
__________________________________________

ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন:এক আধ্যাত্মিক বিস্ময় 
        ✍️ রাজা আলী

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী বোমা ও বারুদের পৃথিবী।দুর্বলের ওপর অত্যাচার ও উৎপীড়ন গত শতাব্দীগুলি থেকে একটুও কমেনি; বরং বেড়েছে। এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্যবাদী, অত্যাচারী শক্তি আল্লাহ নির্দেশিত আদেশ কে অমান্য করে পৃথিবীকে মৃত এক বারুদের স্তূপে পরিণত করেছে।তাই আজ আপাত দৃষ্টিতে শান্তি দূর অস্ত। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন কোরানে কারীমের মধ্যে ঘোষণা করেছেন যে,এই পৃথিবীর মৃত্যু ঘটলে তবেই নতুন এক পৃথিবী সৃষ্টি করবেন--
"জেনে রাখ যে, আল্লাহ জমিনকে মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবিত করবে" (সুরা হাদীদ,১৭নং আয়াত)।

      জমিনের মৃত্যু ঘটায় অর্থ হল, জমিনের ওপর থেকে ন্যায়, ইনসাফ ইত্যাদি ধূলিসাৎ হওয়া। বর্তমান সময়ে যদি আমরা বিশ্বের দিকে তাকাই ,তবে বুঝতে পারবো
ইসরাইল ,আমেরিকা,ইউরোপ এই জমিন থেকে সত্য, ন্যায়, ইনসাফকে প্রতিনিয়ত হত্যা করছে। সুতরাং খুব দ্রুত আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর ওয়াদা পরিপূর্ণ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কার দ্বারা এই জমিনকে জীবিত করবেন? আল্লাহ তায়ালা বলেছেন -
"তোমাদের মধ্যে যে সমস্ত মানুষ ঈমান এনেছে,আর ভালো কাজ করেছে, আল্লাহ তাদের সঙ্গে ওয়াদা করেছেন যে,তাদেরকে একদিন না একদিন জমিনের ওপর অবশ্যই প্রতিনিধি নির্ধারণ করবে"(সুরা নূর ,৫৫ নং আয়াত)।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই পৃথিবীকে তার শেষ হুজ্জাত ইমাম মাহদী আঃ এর দ্বারা পুনরায় জীবিত করবেন। তাঁর আবির্ভাবের কিছু দিনের মধ্যেই সমস্ত শত্রুরা পরাস্ত ও ধ্বংস হয়ে যাবে। সমস্ত মানুষ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ওপর ঈমান আনার সঙ্গে সঙ্গে ইমাম আঃ এর শাসনকে বরণ করে নেবে।সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন হবে সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত এক পরিপূর্ণ ইসলামী শাসন ।

ইমাম মাহদী আঃ এর শাসনের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকবে:

১.ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত হবে। সমগ্র পৃথিবী ই একটি দেশ রূপে অবস্থান করবে। সাম্রাজ্যবাদ,যুদ্ধ, ঠাণ্ডা লড়াই পৃথিবী থেকে দূর হয়ে শান্তির পরিবেশ তৈরি হবে।

২.ইমাম মাহদী আঃ এর শাসনের ভিত্তি হবে দ্বীন ইসলামের সঠিক অনুসরণ।কোরান ও হাদীসের বিধান দ্বারা পৃথিবীর বুকে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহর রাসুলের যুগের মতোই ইসলামের আদর্শ রূপকে ইমাম আঃ তুলে ধরবেন।

৩.ইমাম মাহদী আঃ এর শাসনে মানুষ সঠিক বিচার,ইনসাফ ও নিরাপত্তা পাবে ।সে যুগের যাবতীয় সমস্যা কোনো রকম সাক্ষী প্রমাণ ছাড়া ইমাম আঃ খোদায়ী জ্ঞান দ্বারা সমাধান করবেন।এই সমাধান হজরত দাউত আঃ এর শাসনের মতো হবে।

৪.ইমাম মাহদী আঃ এর শাসনে সমস্ত কুফুর ও শিরক ধ্বংস হবে।এক আল্লাহ রব্বুল আলামীনের এবাদাত প্রতিষ্ঠিত হবে।

    সুতরাং সেই দিন অতি নিকটে, যেদিন অন্যায় ও অত্যাচারের শিকড় কাটা পড়বে এবং ন্যায় ও ইনসাফ এমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে,যেমন ভাবে আজকের দুনিয়া অন্যায়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।তাই আমরা বলতে পারি ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন হবে এক আধ্যাত্মিক বিস্ময়।
__________________________________________

মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতীক্ষা: সর্বোত্তম ইবাদত

 وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।”
(সুরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)

আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া যে তিনি আমাদের মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টি করা প্রতিটি জিনিসের একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। যেমন: একটি পিপঁড়েও উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি হয়নি।
আল্লাহর সব সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ। কেননা—

• পাহাড়ের আছে কেবল অবস্থান।
• গাছের আছে অবস্থান ও বৃদ্ধি।
• পশুর আছে অবস্থান, বৃদ্ধি ও চলাচলের ক্ষমতা।
• কিন্তু মানুষের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি আছে বুদ্ধি ও বিবেক।
এই বিবেক বা ‘আকল’-এর কারণে মানুষ শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে। আর এই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির প্রধান দায়িত্ব হলো ইবাদত, অর্থাৎ আল্লাহর নির্ধারিত পথে জীবন পরিচালনা করা।

ইবাদতের ধরন অনেক রকম—
নামাজ, রোযা, হজ, যাকাত, আমর বিল মা'রূফ (সৎ কাজের নির্দেশ) এবং নাহি আনিল মুনকার (অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা) ইত্যাদি।
হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আফজালুল ইবাদা ইন্তিযারুল ফারাজ”
“সর্বোত্তম ইবাদত হলো মুক্তির প্রতীক্ষা।”
(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫২)
এখানে ‘ফারাজ’ বলতে বোঝানো হয়েছে—ইমাম মাহদী (আ.)-এর জুহুর বা আবির্ভাব।
অতএব, এই শ্রেষ্ঠ মাখলুক (মানুষ) হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো—
✅ আমরা আমাদের যুগের ইমামের জন্য প্রতীক্ষা করব।
তবে এই ‘প্রতীক্ষা’ কোনো নিষ্ক্রিয় বসে থাকা নয়।
এটি এমন নয় যে, আমরা শুধু অপেক্ষা করব কেউ আসবে বলে। বরং, এই অপেক্ষার অর্থ হলো—
নিজেকে শুদ্ধ করা, অপকর্ম থেকে দূরে থাকা, এবং ইমামের পথ অনুসরণের যোগ্য হয়ে ওঠা।

ইমাম মাহদী (আ.) দেখা কি মুখ্য? না কি তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন?
ইমাম মাহদী (আ.) নিজেই বহুবার বলেছেন:
“আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য দোয়া বা আমল করো—এইটা মুখ্য নয়। বরং, এমন চরিত্র গঠন করো, যেন আমি নিজেই তোমার কাছে আসি।”

আয়াতুল্লাহ বেহজাত (রহ.)-ও বলেছেন:
“ইমামকে দেখা বড় কথা নয়। সিমার (ধনুকধারী) তো কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-কে দেখেছিল—তবুও সে তাঁকে শহীদ করেছিল।”
তাই আসল কথা হলো, ইমামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হওয়া।

বর্তমান সময়ে প্রতীক্ষাকারীর কিছু করণীয়:
✅ প্রতিদিন ইমামের সালামতির জন্য সদকা দেওয়া
✅ ওয়াজিব কাজগুলো নিয়মিত আদায় করা
✅ গোনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখা
✅ ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতি "আরিজা" (চিঠি) লেখা
✅ প্রত্যেক নামাজে তাঁর জুহুরের জন্য দোয়া করা
✅ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মজলিসে ইমাম মাহদীর জুহুরের দোয়া করা
✅ যুব সমাজে ইমাম মাহদী (আ.)-এর বার্তা ছড়িয়ে দেয়া
✅ সুখে-দুঃখে ইমামকে স্মরণ করা
✅ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইমামের নির্দেশনা স্মরণে রাখা

উপসংহার:
মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো ইবাদত। আর যুগের ইমামের প্রতি আন্তরিক ও সক্রিয় প্রতীক্ষা সেই ইবাদতের সর্বোচ্চ রূপ।
আমরা যেন নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলি, যাতে ইমাম মাহদী (আ.)-এর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং তাঁর সাথী হওয়ার যোগ্য হই—এটাই হোক আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য।

__________________________________________------------------------------------------------




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
                   আখেরী নবুয়াত

নূরের সরদার তুমি, মুহাম্মদ
বারো ইমামের ওয়ারিস তুমি, মুহাম্মদ।
তোমারই নূরে গড়া এই দুনিয়া,
তোমার আগমনে বিশ্ব মাতোয়ারা

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ দান তুমি, মুহাম্মদ,
জ্ঞানেরি শহর তুমি, মুহাম্মদ
যারা তোমায় মানুষরূপে ভাবলো
তারা দুনিয়া ও পরকাল হারালো

তোমাকে যারা পাগল বলেছে
দুনিয়াতে তারা লাঞ্চিত হচ্ছে
যতই থাকুক তারা তোমারি পাশে
তারা গাদ্দার ছিলো গাদ্দারি থাকবে

শত্রুরা তোমাকে আমীন বলে মানত
 বাগে ফিদাক তারা লুটে খেত
নেতা সেজে বসেছে মুসলমানের সিংহাসনে,
কী মুখ তারা দেখাবে হাশরের ময়দানে?

যারা আগুন দিল তোমার কন্যার দরজায়,
রিসালতের বাণী কি এমনই ছিল সায়?
তোমার জানাজা রেখে যারা ভোট করেছে 
তারাই আবার তোমার উম্মতের দাবি করেছে।

__________________________________________


    মানবতা
    ✍️ রাজা আলী 

আই লাভ মুহাম্মদ 
এখানে অন্যায়টা কি?
বুঝেছি,বাহানা এটা
মনোভাব তোমাদের বিশ্রি।

মুহম্মদ কে চেনো কি?
মানব মুক্তির হোতা
মূর্খতাকে শেষ করে 
উনিই বিশ্ব ত্রেতা।

মানবতা বলতে তোমরা
বোঝনা কো কিছু
উগ্রতা ভর করেছে
তোমাদের পিছু পিছু।

জীবনে যে একটি মিথ্যা 
বলেনি কোনো দিন
দুনিয়ার মানুষের রয়েছে
আজো অনেক ঋণ।

ন্যায় বিচারের প্রতীক তিনি
মজলুমের আশ্রয়
টাকা পয়সা কিছু ই নয়
অন্যায় পায়নি প্রশ্রয়।

গরীবের মসীহা তিনি 
অভুক্তের আশ্রয়
বহুকাল আগেই গেয়েছেন 
মানবতার জয়।

মুক্ত দৃষ্টি দাও যদি
দেখবে তখন বেশ 
ইসলাম ধর্ম এমন ই
মানবতাই যার শেষ।
________   ______   _________

নোবেল তুমি কার?
       ✍️ রাজা আলী 


সম্ভবত এই প্রথম কেউ নির্লজ্জের মতো
নিজেকে নোবেলের যোগ্য বলে দাবি করলো
মানুষ সূর্যের মতো কাজ করে
কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ নোবেল পায়
"আমি যোগ্য" বলা ধৃষ্টতা
এমন আগে কখনো দেখা যায় নি

হয়তো হৃদয় সাড়া দিয়েছে "আমি যোগ্য"বলে
কিন্তু হুঙ্কার কেউ কি ছেড়েছে?
যাক সে সব কথা
নোবেল কমিটির কেমন বা আক্কেল 
মারিয়া করিনা মাচাদো কে শান্তিতে নোবেল দিল!
সে তো ভেনেজুয়েলার অশান্তি 
ও আচ্ছা,সে তো পশ্চিমা দের হাতের পুতুল 
কোনো এক মিরাক্কেল ঘটাবে ভেবে 
এতো আরো আরো উৎসাহ 
কেন গ্রেটা কি শান্তির কথা বলে নি?
ইউরোপীয় মানবতাকে কাঁধে বহন করে 
সে গাজায় রপ্তানি করতে চেয়েছে
খাদ্য, ওষুধ,স্বাস্থ্য, শান্তি 
মাচাদো নাকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে
গ্রেটা তো কথিত মানবতার রাক্ষস কে বিশ্বের নিকট চিনিয়েছে!

গ্রেটা হয়তো তুমি কোনো দিনই নোবেল পাবে না
প্রভুদের খুশি করার পথ না ধরে
প্রভুদের মুখোশ উন্মোচন করো!
কিম্বা কোনো এক দিন 
তোমার জন্য ইউরোপে নেমে আসবে রাত
অন্ধকার সহ্য করতে না পেরে
খুব সামান্য একটি কাজের জন্য
প্রভুদের ইশারা হবে।


__________________________________________

 
নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা

আসমানের বুক আজ নীরবতার ঢেউয়ে ভেসে,
তারার চোখে জমেছে রক্তমাখা অশ্রু।
৮ই রবিউল আওয়াল—
এক অনন্ত বেদনার দিন,
যখন পৃথিবী পেল এক নিঃসঙ্গ শিশুকে।

পিতা ছিলেন শাহাদতের আলোকধারা,
ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর রক্তে রঙা।
আর সেই ছোট্ট হৃদয়,
মাহ্দী (আ.ফা.) হয়ে ওঠেন
সমস্ত দুনিয়ার ইয়াতীমে দো আলম।

নীরব কান্না বয়ে চলে বাতাসে,
ফেরেশতাদের ডানায় স্পর্শ পায় শোক।
হে ইমামে জামানা!
আপনার একাকীত্বে আমরা সবাই
অন্তরে হয়ে নিঃসঙ্গ।

পৃথিবীর প্রতিটি নিঃশব্দ কোণে
আপনার অশ্রু ঝরে পড়ছে—
শিশুর কণ্ঠে বাজে দুঃখের সুর,
যা কেবল আসমান ও ফেরেশতারা শুনতে পারে।

হে ইয়াতীমে দো আলম!
আপনার চোখের অশ্রুতে আমরা দেখি
মানবতার নিঃশেষ প্রেম,
আপনার নিঃসঙ্গতায় আমরা খুঁজে পাই
আশা, প্রার্থনা ও মুক্তির দীপ্তি।

আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাস
আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে,
আপনার প্রতিটি অশ্রু
আমাদের শোকের সমুদ্রের ঢেউ।

যদি আমরা পারি,
আপনার এক ফোঁটা বেদনার ভারও ভাগ করে নিতে,
হবে সেটাই আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদা।

হে ইমামে জামানা!
আমরা আপনার নিঃসঙ্গ পথচলায়
সঙ্গী হতে চাই—
এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা,
এক চিরন্তন ভালোবাসার প্রতিধ্বনি।
------ _____------_____------______------______------

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ রজব সংখ্যা

আরবি : রজব, ১৪৪৭ হিজরী ইংরেজি : জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ __________________________________________               সম্পাদক  :  ...