Wednesday, August 6, 2025

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ সফর সংখ্যা

           

আরবি: সফর, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির হোসেন গাজী

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           
            মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


ইমাম আঃ এর আবির্ভাব: শান্তির জগৎ (অনুবাদ)

এজিদের দরবারে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা 

২৮ শে সফর : পবিত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল ও ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাত

পবিত্র আরবাঈনের ইতিহাস

কারবালার পরবর্তী অধ্যায় — জয়নবের কণ্ঠে হক-এর অগ্নিশিখা

  অমীয় বাণী: ইমাম হোসাইন আঃ
          ✍️  রাজা আলী 

 মারেফাত এ ইমামে জামানা (আ.জ.)
           ✍️ আব্বাস আলী




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

       কাল্পনিক ছোয়াঁ

                পরিচিতি 
          ✍️  রাজা আলী 

কবে আমায় ডাকবেন ইমাম আরবাঈনে


__________________________________________
__________________________________________

                   সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

সফর মাস শোকের গভীর সমুদ্র। একদিকে আছে প্রিয় নবী (সা.)-এর বিদায়ের বেদনা, অন্যদিকে ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাতের রক্তিম স্মৃতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারবালার পরবর্তী অধ্যায়—যেখানে বাকি পরিবারকে বাঁধা হলো বন্দিশিবিরে, আর জয়নব (সা.)-এর কণ্ঠে জেগে উঠল প্রতিবাদের বজ্রধ্বনি, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর খুতবায় ভেঙে পড়ল জুলুমের অন্ধকার।

এই সংখ্যার প্রতিটি রচনা সেই ইতিহাসের আলোই বহন করছে। কখনো আমরা পড়ছি ইমামের আবির্ভাবের শান্তিময় প্রতিশ্রুতি, কখনো শুনছি এজিদের দরবারে সত্য উচ্চারণের ধ্বনি। আমরা স্মরণ করছি ২৮ সফরের শোকস্মৃতি, জানছি আরবাঈনের ইতিহাস এবং উপলব্ধি করছি কারবালার পর জয়নবী সাহসের আগুন।

তেমনি স্থান পাচ্ছে ইমাম হোসাইনের (আ.) অমীয় বাণী ও ইমামে জামানার (আ.জ.) মারেফাত, যা আমাদের শোককে শুধু কান্নায় সীমাবদ্ধ না রেখে পরিণত করে ইন্তেজারে—প্রতিরোধে ও নবীন আশায়।

আর কবিতার পৃষ্ঠায় ভেসে উঠছে হৃদয়ের ভাষা—কখনো কাল্পনিক ছোঁয়ায়, কখনো পরিচয়ের কোমল কথায়, আবার কখনো আরবাঈনের ডাকের আকুতি হয়ে।

আসুন, এই সফরে আমরা শোককে ধারণ করি দায়িত্বে, কান্নাকে রূপ দিই কণ্ঠে, আর ভালোবাসাকে জাগাই মাহ্দভি অপেক্ষার আলোকে।

                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


ইমাম আঃ এর আবির্ভাব: শান্তির জগৎ (অনুবাদ)
   ✍️ মাওলানা কাজিম আলি

পৃথিবীর সমস্ত অন্যায় ও জুলুম একদিন শেষ হবে।যখন জুলুম ও অত্যাচারের সমস্ত কারণ ধ্বংস হয়ে ফিতনা ফাসাদের প্রবাহ শুষ্ক হবে, হত্যা-অত্যাচার-অবিচারের শিকড় কাটা পড়বে, তখন সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি ও সুস্থতা বিরাজ করবে।এই এই শান্তি -সুস্থতা ও সুস্থিতির প্রধান কারিগর হলেন ইমাম মাহদী আঃ।তার আবির্ভাব এবং শাসনকাল হলো শান্তি ও স্বস্তি র পর্ব।হজরত ইমাম মোহাম্মাদ বাক্বের (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “ঐ যুগে একজন বুড়ি পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সফর করবে, তাকে কেউ কষ্ট দেবে না”।
(মুনতাখাবুল আছার, পৃঃ ৩৭৯)।

        মাহ্দী (আঃ)-এর যুগ সম্পর্কে রাসুলে খোদা (সাঃ) এরশাদ করেছেন: 'মাহ্দীর যুগে
নেয়ামত অধিক হবে, বৃষ্টি বর্ষণের ফলে জমি সবুজ ফসলে পূর্ণ হবে, মানুষের অন্তর হিংসা থেকে মুক্ত হবে, হিংস্র জন্তু-জানোয়ার শান্ত হবে। একজন মহিলা ইরাক ও সিরিয়ার মাঝে সফর করবে, সে তার সমস্ত সাজের গহনা পরিধান করবে; কিন্তু কোন ব্যক্তি তাকে বিঘ্ন ঘটাবে না'। (মোজাল্লে ইনতেজার, সংখ্যা ১৪ পৃ-২০৫)।

      আর হজরত আলী (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে: মাহ্দী তাঁর প্রতিনিধিদেরকে প্রত্যেক
শহরে পাঠাবেন, যাতে করে সকল মানুষ ইনসাফ ও ন্যায় বিচার পেতে পারে। ঐ সময় হিংস্র জন্তু, নিরীহ ছাগল একই সঙ্গে বিচরণ করবে। শিশুরা 'বিছে'র সঙ্গে খেলা করবে, কুকর্ম ধ্বংস হবে, সুকর্ম তার স্থান নেবে, মদ-সুদ সব শেষ হয়ে যাবে, মানুষ আল্লাহর এবাদাতের দিকে অটল থাকবে এবং ক্রমে দ্বীনের দিকে আরও অগ্রসর হবে। নামাজে জামায়াতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হবে (নামাজিদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে)। মানুষের বয়স বৃদ্ধি হবে এবং আমানত ফেরত পাবে, গাছ ফলে পরিপূর্ণ থাকবে এবং বরকত অধিক হবে। কুকর্ম ধ্বংস হবে, আর নেক কর্ম বজায় থাকবে। আবোয়েতের কোন শত্রু বাকি থাকবে না। (মোজাল্লে ইনতেজার, সংখ্যা ১৪, পৃ ২০৫)।

     এই হল হজরত ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ন্যায় বিচার ও ইনসাফী শাসনের এক নজির। যদি আমরা নিজেদের চোখের সামনে মেহদী (আঃ)-এর শাসনকে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্য-কর্তব্য ইমাম জহুরের জন্য বেশি থেকে বেশি দোয়া করা, আর নিজেদের চরিত্রকে সংশোধন করে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।

_________________________________________

এজিদের দরবারে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা 

           ✍️ মাওলানা সুজাউদ্দিন মাশহাদী


ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা এজিদের দরবারে ইসলামি ইতিহাসে অন্যতম সাহসী ও গভীর বক্তব্য হিসেবে স্মরণীয়।

প্রেক্ষাপট:
কারবালার ট্রাজেডির পর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পরিবার—বিশেষ করে মহিলারা ও শিশুদের—বন্দি করে কুফা ও পরে দামেস্কে এজিদের দরবারে পাঠানো হয়। তখন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর একমাত্র জীবিত পুত্র ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) ছিলেন খুবই অসুস্থ, কিন্তু বুদ্ধিমত্তা ও ইল্মে ছিলেন অতুলনীয়।

দরবারে খোতবা (সংক্ষেপে):
ইমাম (আ.) এজিদের দরবারে দাঁড়িয়ে বললেন:
أيُّهَا النّاسُ، اُعطينا سِتّاً، وفُضِّلنا بِسَبعٍ: اُعطينَا العِلمَ، وَالحِلمَ، وَالسَّماحَةَ، وَالفَصاحَةَ، وَالشَّجاعَةَ، وَالمَحَبَّةَ في قُلوبِ المُؤمِنينَ
> "হে মানুষ! আল্লাহ আমাদেরকে ছয়টি গুণে শ্রেষ্ঠ করেছেন এবং সাতটি বৈশিষ্ট্যে আমাদের সম্মানিত করেছেন:
> আমাদেরকে জ্ঞান, ধৈর্য, উদারতা, বাগ্মিতা, সাহস, ও মুমিনদের ভালোবাসা দ্বারা শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন।
> আমরা সেই ঘরানার যারা নবুয়তের কেন্দ্র, ওহির স্থান, ফেরেশতাদের যাতায়াতের জায়গা, জ্ঞানের খনি, ধৈর্যের স্থান, ইসলামের মূল ভিত্তি।"

তিনি যখন নিজের পরিচয় দেন: (সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে এখানে )
  أنَا ابنُ مَكَّةَ ومِنىً، أنَا ابنُ زَمزَمَ وَالصَّفا، أنَا ابنُ مَن حَمَلَ الزَّكاةَ بِأَطرافِ الرِّدا، أنَا ابنُ خَيرِ مَنِ ائتَزَرَ وَارتَدى‌، أنَا ابنُ خَيرِ مَنِ انتَعَلَ وَاحتَفى‌
আমি মক্কা ও মিনার সন্তান, আমি জমজম ও সাফার সন্তান, আমি তার সন্তান যে তার চাদরের কিনারায় যাকাত বহন করত, আমি তার শ্রেষ্ঠ সন্তান যে কটি পরত এবং তার পোশাক পরত, আমি তার শ্রেষ্ঠ সন্তান যে জুতা পরত এবং তার জুতা পরত।
أنَا ابنُ خَيرِ مَن طافَ وَسعى‌، أنَا ابنُ خَيرِ مَن حَجَّ ولَبّى‌، أنَا ابنُ مَن حُمِلَ عَلَى البُراقِ‌ فِي الهَوا، أنَا ابنُ مَن اُسرِيَ بِهِ مِنَ المَسجِدِ الحَرامِ إلَى المَسجِدِ الأَقصى‌، فَسُبحانَ مَن أسرى‌، أنَا ابنُ مَن بَلَغَ بِهِ جَبرائيلُ إلى‌ سِدرَةِ المُنتَهى‌، أنَا ابنُ مَن دَنى‌ فَتَدَلّى‌ فَكانَ مِن رَبِّهِ قابَ قَوسَينِ أو أدنى‌
আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যারা তাওয়াফ ও সাঈ করেছেন। আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যারা হজ্জ করেছেন এবং তালবিয়া পাঠ করেছেন। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যাকে আকাশে বুরাকে বহন করা হয়েছিল। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যাকে মসজিদুল হারামের পবিত্র স্থান থেকে দূরতম মসজিদে রাতের ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অতএব পবিত্র সেই ব্যক্তি যিনি তাকে রাতের ভ্রমণে নিয়ে গেছেন। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যাকে জিব্রাইল (আঃ) সীমার লোট বৃক্ষের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যিনি নিকটবর্তী হন এবং অবতরণ করেন, এমনকি তিনি তার প্রভুর কাছ থেকে দুই ধনুকের দূরত্বে অথবা তার চেয়েও নিকটবর্তী স্থানে ছিলেন।

প্রভাব:
 حَتّى‌ ضَجَّ النّاسُ بِالبُكاءِ وَالنَّحيبِ، وخَشِيَ يَزيدُ أن تَكونَ فِتنَةٌ، فَأَمَرَ المُؤَذِّنَ أن يُؤَذِّنَ، فَقَطعَ عَلَيهِ الكَلامَ وسَكَتَ.
তিনি খোতবা দিতে থাকেন যতক্ষণ না লোকেরা কাঁদতে শুরু করে এবং বিলাপ করতে থাকে, এবং ইয়াজিদ আশঙ্কা করে যে দাঙ্গা হতে পারে, তাই সে মুয়াজ্জিনকে আযান দেওয়ার নির্দেশ দেয়, কিন্তু সে খোতবা বন্ধ করে দেয় এবং চুপ থাকে।
فَلَمّا قالَ المُؤَذِّنُ: «اللَّهُ أكبَرُ» قالَ عَلِيُّ بنُ الحُسَينِ عليه السلام: كَبَّرتَ كَبيراً لايُقاسُ، ولا يُدرَكُ بِالحَواسِّ، لا شَي‌ءَ أكبَرُ مِنَ اللَّهِ. فَلَمّا قالَ: «أشهَدُ أن لا إلهَ إلَّا اللَّهُ» قالَ عَلِيٌّ عليه السلام: شَهِدَ بِها شَعري وبَشَري، ولَحمي ودَمي، ومُخّي وعَظمي
যখন মুয়াজ্জিন বললেন, "আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ," আলী ইবনে আল হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, "আপনি এমন কিছু ঘোষণা করেছেন যা ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিমাপ করা বা উপলব্ধি করা যায় না। আল্লাহর চেয়ে বড় আর কিছুই নেই।" যখন তিনি বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই," আলী আলাইহিস সালাম বললেন, "আমার চুল, ত্বক, আমার মাংস ও রক্ত, আমার মজ্জা এবং হাড় এর সাক্ষ্য দেয়।"
فَلَمّا قالَ: «أشهَدُ أنَّ مُحَمَّداً رَسولُ اللَّهِ» التَفَتَ عَلِيٌّ عليه السلام مِن أعلَى المِنبَرِ إلى‌ يَزيدَ، وقالَ: يا يَزيدُ! مُحَمَّدٌ هذا جَدّي أم جَدُّكَ؟ فَإِن زَعَمتَ أنَّهُ جَدُّكَ فَقَد كَذَبتَ، وإن قُلتَ إنَّهُ جَدّي فَلِمَ قَتَلتَ عِترَتَهُ
যখন তিনি বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল," আলী (আঃ) মিম্বরের উপর থেকে ইয়াজিদের দিকে ফিরে বললেন, "হে ইয়াজিদ! এ কি মুহাম্মদ আমার দাদা, নাকি তোমার দাদা? যদি তুমি দাবি করো যে তিনি তোমার দাদা, তাহলে তুমি মিথ্যা বলছো। যদি তুমি বলো যে তিনি আমার দাদা, তাহলে কেন তুমি তার পরিবারকে হত্যা করলে?!"

উপসংহার:
এই খোতবার মাধ্যমে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) কারবালার সত্য প্রকাশ করেন, আহলে বাইতের মর্যাদা তুলে ধরেন এবং ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
__________________________________________

 ২৮ শে সফর : পবিত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল ও ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাত
✍️  মজিদুল ইসলাম শাহ

                              ভূমিকা

ইসলামের ইতিহাসে সফর মাস বিশেষত শিয়া মুসলমানদের কাছে শোক ও বেদনার মাস। এই শোকের শিখর প্রকাশ পায় সফরের অষ্টাবিংশ (২৮) তারিখে; যেদিন দয়াময় নবী, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.), আল্লাহর শেষ রাসূল ও সকল নবীর নেতা, দুনিয়াকে বিদায় জানান। একই দিনে তাঁর প্রিয় সন্তান, নবীর প্রথম নাতি, ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) শাহাদাতবরণ করেন। এই দুই ঘটনার একত্রতা শিয়া ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এ দিনকে এক বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

       রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল



            ইসলামে নবীর স্থান

ইসলামের নবী (সা.) কেবল আল্লাহর ওহীর বাহকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন নৈতিকতার শিক্ষক, মুসলিম সমাজের নেতা এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য আল্লাহর রহমতের প্রতীক। কুরআন কারীম তাঁকে “রাহমাতুল্লিল আলামীন” (সূরা আনবিয়া: ১০৭) বলে অভিহিত করেছে। মদিনায় হিজরত করে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর বন্দেগির এক মহত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

                ইন্তেকালের সময় ও স্থান

বিখ্যাত বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬৩ বছর বয়সে, হিজরতের ১১তম বছরে সফর মাসের ২৮ তারিখে মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন। কয়েক দিন আগে তাঁর অসুস্থতা শুরু হয় এবং প্রথমে উম্মে সালামা (রা.)-এর ঘরে, পরে আয়েশা (রা.)-এর ঘরে অবস্থার অবনতি ঘটে। অবশেষে তিনি ইমাম আলী (আ.)-এর কোলের উপর মাথা রেখে ইন্তেকাল করেন।

                         গসল ও দাফন

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গসল ও কাফন ইমাম আলী (আ.) সম্পন্ন করেন। তাঁকে তাঁর ঘরেই, যেখানে তিনি জীবনযাপন ও ইবাদত করতেন, সমাহিত করা হয়। বর্তমানে এই স্থান মসজিদে নববীর রওজা মুবারকের পাশে অবস্থিত।

               ইন্তেকালের পরিণাম

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল ইসলামের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। খিলাফতের প্রশ্নে সাকিফা বানী সাঈদার ঘটনাটি ঘটে, যা মুসলিম সমাজে বিভেদ ও মতভেদের জন্ম দেয়। শিয়া মত অনুযায়ী, বহু হাদিস ও বাণীর ভিত্তিতে ইমাম আলী (আ.)-ই ছিলেন নবীর মনোনীত ও আল্লাহপ্রদত্ত উত্তরসূরি।

ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাত


       ইমাম হাসান (আ.)-এর মর্যাদা

ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) ছিলেন আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) ও ফাতিমা যাহরা (সা.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং শিয়াদের দ্বিতীয় ইমাম। তিনি ৩য় হিজরিতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ধৈর্য, উদারতা ও অদ্বিতীয় দানশীলতার জন্য তিনি “কারীমে আহলে বাইত” নামে খ্যাত।

পিতা ইমাম আলী (আ.)-এর শাহাদাতের পর, কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি ইমামতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মু’আবিয়া ইবনে আবুসুফিয়ানের ষড়যন্ত্র এবং সাথীদের দুর্বলতায় তিনি বাধ্য হন একটি জটিল চুক্তিতে পৌঁছাতে, যা ইতিহাসে “ইমাম হাসানের সন্ধি” নামে পরিচিত।

                   শাহাদাতের ঘটনা

মু’আবিয়া, ইমাম হাসান (আ.)-এর প্রভাব ও মর্যাদা থেকে আতঙ্কিত হয়ে, তাঁর হত্যার পরিকল্পনা করে। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, মু’আবিয়া ইমামের স্ত্রী জোদাহ, যে আশআস ইবনে কায়সের কন্যা ছিল, তাকে বিপুল সম্পদ ও ইয়াজিদের সাথে বিয়ের প্রলোভন দেয়। সে বিষ মিশ্রিত পানীয় ইমামকে খাওয়ায়। ফলে ৫০ হিজরিতে মদিনায় তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে শাহাদাতবরণ করেন।

ইমামের পবিত্র দেহ জন্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন করা হয়, যেখানে তাঁর মাতা ফাতিমা যাহরা (সা.) এবং চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুলমুত্তালিব (আ.)-এর কবর রয়েছে। তবে বনী উমাইয়ার বাধার কারণে তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। এই ঘটনা আহলে বাইতের উপর এক গভীর জুলুমের সাক্ষ্য বহন করে।

                  এ দিনের শিক্ষা ও বার্তা

১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রহমত ও রিসালতের স্মরণ: তাঁর ইন্তেকাল বিশ্বজনীন বার্তা ও কুরআনের শিক্ষার পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ।
২. আহলে বাইতের (আ.) মজলুমিয়্যাত: ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত প্রমাণ করে, নবীর পরিবার তাঁর ইন্তেকালের পরও নির্যাতন ও শত্রুতার শিকার হয়েছিলেন।
৩. নবুয়ত ও ইমামতের যোগসূত্র: এই দুই ঘটনার একত্রতা দেখায় যে নবীর রিসালত ইমামতের ধারাবাহিকতা ছাড়া অসম্পূর্ণ।
৪. নৈতিকতার শিক্ষা: নবী করীম (সা.) ছিলেন দয়ার আদর্শ, আর ইমাম হাসান (আ.) ছিলেন ধৈর্য ও দানশীলতার প্রতীক। তাঁদের স্মরণ নৈতিক ও ধৈর্যশীল জীবনের প্রেরণা জোগায়।

             ২৮ সফরে মুস্তাহাব আমল

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জিয়ারত: মদিনায় উপস্থিত হয়ে বা দূর থেকে মশহুর জিয়ারত পাঠ করা।

ইমাম হাসান (আ.)-এর জিয়ারত: তাঁর বিশেষ জিয়ারত পাঠ করা।

শোকসভা ও আজাদারি: নবী (সা.) ও ইমাম হাসান (আ.)-এর ফজিলত ও মজলুমিয়্যাত বর্ণনা।

সাদকা ও দান: ইমাম হাসান (আ.)-এর দানশীলতার স্মরণে।

কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া: বিশেষত ইমাম মাহদি (আ.জ.)-এর জরুরি আগমনের জন্য দোয়া করা।

উপসংহার

২৮ সফর ইসলামের ইতিহাসে দুই মহা বিপদের স্মারক: পবিত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালতের সমাপ্তি এবং ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাত। এই দিনটি নববী মিশন, ইমামতের গুরুত্ব ও আহলে বাইতের মজলুমিয়্যাত নিয়ে ভাববার এক বিশেষ সুযোগ। এ দিন থেকে শিক্ষা হলো—ইসলামের আসল মূল্যবোধে অটল থাকা, বিপথগামিতার বিরুদ্ধে ধৈর্য ও প্রতিরোধ করা, এবং নবীর নৈতিকতা ও ইমাম হাসানের দানশীলতাকে জীবনে ধারণ করা। 
__________________________________________

     পবিত্র আরবাঈনের ইতিহাস
        ✍️  মইনুল হোসায়েন

সফর মাসের ২০ তারিখকে আরবাঈন দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ৬১ হিজরি সনের ১০ মহরমে কারবালাতে ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর শাহাদাতের ৪০ দিন পর এই দিনটি পালিত হয়। আরবী ভাষায় আরবাঈন শব্দের অর্থ হল চল্লিশ। তাই তাঁর শাহাদাতের ৪০ দিন পর এই শোক অনুষ্ঠান পালিত হওয়ার জন্য এর নাম আরবাঈন।

কারবালায় ইমাম হুসাইন (আঃ) নিহত হওয়ার প্রায় ১৪০০ বছর পরেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তাঁর আত্মত্যাগকে স্মরণ করে থাকে। প্রতি বছর আরবাঈন উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ শিয়া মুসলিম একত্রিত হয়ে ইমাম হুসাইনের জন্য শোক পালন করেন।

আরবাঈন পদযাত্রার সূচনা 

পবিত্র আরবাঈনের দিনের যিয়ারাতের ঐতিহ্যটি ৬১ হিজরিসনেই শুরু হয়েছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর শাহাদাতের ৪০ দিন পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একজন সাহাবী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী সর্বপ্রথম কারবালায় ইমামের পবিত্র কবরে যিয়ারাত করতে আসেন। এরপর থেকে প্রতি বছর এই যিয়ারাতের ধারাবাহিকতা পালিত হয়ে আসছে।
তবে, আধুনিক যুগে শেখ মির্জা হোসেইন নূরী এই যিয়ারাত ও পদযাত্রাকে পুনরায় চালু করার জন্য পরিচিত হয়ে আছেন। তিনি প্রথমবার তার বন্ধু এবং আত্মীয়-স্বজনসহ ত্রিশজনের একটি দল নিয়ে পায়ে হেঁটে এই কারবালাতে পৌঁছেছিলেন। পরে তিনি তার মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি বছর এই প্রথা বজায় রেখেছিলেন।

আরবাঈন এবং ইরাকের মানুষ 

ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রকাশ্যে আরবাঈন পালন করা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০০৩ সালে তার পতনের পর থেকে এই অনুষ্ঠান আবার শুরু হয়। বর্তমানে ইরাকসহ সারা বিশ্বের লাখ লাখ শিয়া মুসলিম আরবাঈন পালনের জন্য ইরাকে আসেন। এই সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যায়েরীনরা নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেন। এই পথ অতিক্রম করতে প্রায় তিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে।

আরবাঈনের সময় ইরাকের অর্ধেক লোক যায়েরীনদের মেহমানদারীর দায়িত্ব নেয়। ইরাকি স্বেচ্ছাসেবকরা এই দীর্ঘ যাত্রাপথে যায়েরীনদের জন্য বিনামূল্যে খাবার, পানীয়, বিশ্রামাগার, শৌচাগার, এবং ঘুমানোর ব্যবস্থা করেন। এমনকি অনেক ইরাকি মানুষ নিজেদের বাড়িগুলিকে যায়েরীনদের জন্য খুলে দেন। এই অসাধারণ মেহমানদারীর জন্য যায়েরীনরা ইরাকের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আরবাঈনের ধর্মীয় তাৎপর্য 

আরবাঈনের ধর্মীয় তাৎপর্য অনেক গভীর। ইমাম হাসান আসকারী (আঃ)-এর একটি হাদিসে মোমিনদের পাঁচটি লক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছে - যার মধ্যে একটি হল পবিত্র আরবাঈনের দিনে জিয়ারত আল-আরবাঈন।

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)-এর মতে, যারা ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর কবরের কাছে হেঁটে যান, আল্লাহ তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে এক হাজার পুণ্য দেন, এক হাজার পাপ মুছে দেন এবং তাদের মর্যাদা এক হাজার স্তর বাড়িয়ে দেন। এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায় যে, আরবাঈন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা মহানবী (সাঃ) এবং আহলে বাইতের ইমামগণের শিক্ষা থেকে প্রচলিত হয়ে আসছে।

পরিশেষে বলা যায়, আরবাঈন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। বরং এটি হল ইসলামের শান্তি, ন্যায় ও ত্যাগের প্রতীক। ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর আত্মত্যাগ আমাদেরকে শেখায় কিভাবে অত্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। তাই আরবাঈন সকল মানুষের জন্য একটি আদর্শ, যা আমাদের জীবনকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে অনুপ্রাণিত করে। এই কারণে, শিয়া মুসলিমদের পাশাপাশি অনেক অমুসলিম এবং অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও এই দিনে ইমাম হুসাইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কারবালাতে একত্রিত হন।
__________________________________________

কারবালার পরবর্তী অধ্যায় — জয়নবের কণ্ঠে হক-এর অগ্নিশিখা
          ✍️মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

 ভূমিকা:
কারবালার সেই লাল মাটি আজও কেঁপে ওঠে রক্তস্নাত স্মৃতির দগদগে যন্ত্রণায়। আশুরার সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে রক্তমাখা হয়ে অস্ত গেল, তখন কেউ ভেবেছিল হক-এর আলোর প্রদীপ নিভে গেছে। কিন্তু কারবালার ইতিহাস জানে—হুসায়েন (আ:) এর শাহাদাতের পর শুরু হয়েছিল এক নতুন জাগরণ, এক অগ্নিময় অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের রূপকার ছিলেন ইমাম সাজ্জাদ (আ:) আর জনাবে জয়নব (সা:)—যাঁদের ধৈর্য ও সাহস ইতিহাসের আকাশে নক্ষত্রের মতো দীপ্ত।

 কারবালার পর রক্তের শপথ

কারবালার ময়দানে নবীর দৌহিত্র ইমাম হুসায়েন (আ:) এর নিথর দেহ পড়ে রইল। বাতাসে তখন শোকের দীর্ঘ আর্তনাদ—
 “হে আসমান, কেন তুমি ভেঙে পড়ো না? হে জমিন, কেন তুমি কেঁপে ওঠো না?”
রক্তের প্রতিটি ফোঁটা যেন বলছিল: “আমার ত্যাগ বৃথা নয়, সত্যের পতাকা এই রক্তে চিরকাল উড়বে।” সেই সময় বন্দি কাফেলা চলল কুফার পথে। মাথার ওপরে ছিল শহীদদের কাটা মস্তক, আর উটের পিঠে বসে ছিলেন নবীর কন্যাদের সন্তানরা। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন রক্তের কাব্য লিখে যাচ্ছিল ইতিহাসের অমর পৃষ্ঠায়।

 জয়নব (সা:)—ইতিহাসের বজ্রধ্বনি

কুফার দরবারে জনাবে জয়নব (সা:) দাঁড়ালেন, তাঁর চোখে ছিল গভীর বেদনা আর কণ্ঠে ছিল অদম্য সাহস। তিনি বললেন: “হে ইবনে জিয়াদ! তুমি কি ভেবেছ আমাদের শোক আমাদের ভেঙে দেবে? না, হুসায়েনের (আ:) রক্ত আজ সত্যকে জীবন্ত করে তুলেছে। তুমি মিথ্যার পরাজিত সৈনিক।” এই কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রপাতের মতো। যে কুফাবাসীরা প্রথমে উদাসীন ছিল, তারা জয়নব (সা:)-এর ভাষণে কেঁদে ফেলল। সেই কান্না আজও আমাদের অন্তরে শোনা যায়।

 ইমাম সাজ্জাদ (আ:)—শোকের মাঝে সংগ্রামের মশাল

রক্তাক্ত ইতিহাসের মাঝে ইমাম সাজ্জাদ (আ:) ছিলেন এক জীবন্ত কোরআন। বন্দিত্বের মাঝেও তিনি কাঁদতেন, কিন্তু তাঁর কান্না ছিল জাগরণের অশ্রু। তিনি বলতেন: “হুসায়েনের (আ:) রক্ত বৃথা নয়। শোকের মাধ্যমে সত্যের পতাকা আরও উঁচু হবে।”

 আরবাঈন—চল্লিশার প্রতিজ্ঞা

কারবালার চল্লিশতম দিনে, ২০ সফর, ইমাম সাজ্জাদ (আ:) কারবালার ময়দানে ফিরে এলেন। বালুর প্রতিটি দানা যেন এখনও লাল রঙে রঞ্জিত। জনাবে জয়নব (সা:) সেই মাটিতে চিৎকার করে বললেন: “হুসায়েন, আমরা ফিরেছি! তোমার রক্তের শপথ আমরা ভুলিনি। প্রতিটি অশ্রু হবে প্রতিজ্ঞা, প্রতিটি ধ্বনি হবে প্রতিরোধ।” সেই আরবাঈন আজ বিশ্বের বৃহত্তম শোকযাত্রা, যা হুসায়েনি আদর্শের শাশ্বত শক্তি প্রমাণ করে।

 শিক্ষা ও আহ্বান

 হক-এর পথে অটল থাকা: কারবালার পরবর্তী অধ্যায় আমাদের শেখায় যে সত্যের শক্তি মিথ্যার সাম্রাজ্য ভেঙে দিতে পারে।

 নারীর সাহসের প্রতীক: জনাবে জয়নব (সা:) দেখিয়েছেন, একটি অগ্নিময় কণ্ঠ ইতিহাস বদলে দিতে পারে।

 ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর অপেক্ষা: এই শোকের প্রতিটি অশ্রু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা হুসায়েনি সৈনিক হতে প্রস্তুত।

 উপসংহার
কারবালার পরবর্তী অধ্যায় কেবল ইতিহাস নয়, এটি হৃদয়ের অগ্নিপাঠ। হুসায়েন (আ:) এর রক্তে লেখা সেই পাঠ আমাদের শেখায়—অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা হার মানার নাম, আর সত্যের পাশে দাঁড়ানোই মুক্তির প্রকৃত পথ। আজও প্রতিটি হুসায়েনি হৃদয় ফিসফিসিয়ে বলে: “আমরা কারবালার সন্তান। যতদিন অন্যায় আছে, ততদিন জয়নবের কণ্ঠ আর হুসায়েনের রক্ত আমাদের জাগিয়ে রাখবে।”
__________________________________________

অমীয় বাণী: ইমাম হোসাইন আঃ
        ✍️ রাজা আলী

ভূমিকা
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কিছু ব্যক্তিত্ব আলো ছড়িয়ে দেন যুগ থেকে যুগান্তরে। তাঁদের কথা, তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে মানবতার চিরন্তন পথনির্দেশ। ইমাম হোসাইন আঃ তেমনই এক আলোকবর্তিকা, যাঁর অমীয় বাণী আজও হৃদয় জাগায়, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং সত্যের পথে আহ্বান জানায়। তাঁর বাণী শুধু শব্দ নয়, বরং চিরন্তন এক শিক্ষার ঝরনা, যা আমাদের শিরায় শিরায় সাহস, ন্যায় আর ভক্তির স্রোত বয়ে আনে।

গাদীরে খুমের ময়দানে মাওলা আলী আঃ এর খেলাফত ঘোষণায় দ্বীন এ ইসলাম পূর্ণতা পায়।আর ৬১ হিজরীতে দ্বীন ইসলামের প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায় ইরাকের কারবালার মরু প্রান্তরে ইমাম হোসাইন আঃ ও তাঁর সাথীদের আত্ম ত্যাগের মাধ্যমে।সেই ঘটনা আজ বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক ইতিহাস।এই ইতিহাস থেকে ই আমরা জেগে উঠেছি,অন্যদের জাগানোর চেষ্টা করি।
ইমাম হোসাইন আঃ সাধারণ ব্যক্তি নন, তিনি খোদার হুজ্জাত। ইতিহাসের ক্রান্তি লগ্নের সত্যের দরজা ও দিশা।মানবতা ও ন্যায়ের উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা ও প্রতিমূর্তি।বিশ্ব মনীষীদের পিতা।তাই তাঁর পদাঙ্ক সর্বদা অনুকরণীয়। তাঁর অমীয় বাণীর অনুপম স্রোতে অবগাহন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে আমাদের শিয়া মাযহাবের উচিত তাঁর অমীয় বাণী আকণ্ঠ পান করে নীলকণ্ঠ হওয়া।তবেই আমরা ইমাম হোসাইন আঃ এর প্রকৃত অনুসারী হতে পারবো।

নিম্নে ইমাম হোসাইন আঃ এর কয়েকটি অমীয় বাণী তুলে ধরা হলো:

১. সূত্র অনুযায়ী আমরা শিয়া। কিন্তু প্রকৃত শিয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে অন্যত্র। ইমাম হোসাইন আঃ প্রকৃত শিয়াদের সংজ্ঞা দিয়েছেন:
"আমাদের শিয়া হলো তারা, যাদের অন্তর সমস্ত প্রকার বিদ্বেষ ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকে"(বিহারুল আনওয়ার,খণ্ড ৬৫)। সুতরাং শিয়া শুধু দাবীই করলে হবে না,প্রকৃত শিয়া হওয়ার জন্য ইমাম হোসাইন আঃ এর বাণী ও আদর্শের দিকে আমাদের ধ্যাণ দিতে হবে।

২. এবাদতের প্রচলিত ধারণা আমাদের নিকট অতি সংকীর্ণ। কিন্তু এবাদতের মূল অর্থ অতি বিস্তৃত ও প্রসারিত। এবাদাত কাকে বলে এবং মানুষের শোভা কোথায় লুক্কায়িত,তা ইমাম হোসাইন আঃ আমাদের স্মরণ করে দেন: "উত্তম আচার -আচরণ হলো এবাদত এবং নীরবতা হলো মানুষের শোভা"(তারিখ এ ইয়াকুবী,খণ্ড ২য়)।

৩. প্রকৃত মানুষ তথা শিয়া এসনা আশারী হওয়ার কিছু শর্ত ও সীমারেখা রয়েছে,যা আমাদের সর্বদা মনে রাখা এবং মেনে চলা উচিত।প্রতিটি কাজের সর্বোচ্চ পর্যায় রয়েছে,যা উপার্জনে আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিত। সর্বোত্তম ক্ষমাকারী সম্পর্কে ইমাম হোসাইন আঃ বলেন: "সর্বোত্তম ক্ষমাকারী সেই ব্যক্তি,যে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কে ক্ষমা করে দেয়"(বিহারুল আনওয়ার,খণ্ড ৭৫)।

৪. জ্ঞান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের বিশেষ একটি নিয়ামত। জ্ঞান ই মানুষের বোধের দরজা খুলে দেয় এবং বিবেককে জাগ্রত করে।তাই সকলকেই প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। ইসলাম দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জনের তাগিদ দিয়েছে।একই সঙ্গে সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ রাখতে হবে।কারণ মৃত্যু অনিবার্য এবং অন্য এক জগতের সেতু স্বরূপ। মৃত্যুকে স্মরণ রাখার অর্থ খোদাকে স্মরণ রাখা এবং আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা। মাওলা হোসাইন আঃ জ্ঞান অর্জন এবং মৃত্যুকে স্মরণ রাখার বিষয়ে বলেছেন: "মানুষ যদি জ্ঞানী হতো এবং মৃত্যুকে বিশ্বাস রাখতো,তবে পৃথিবী জনশূন্য মনে হতো" (এহক্কাক্কুল হক্ব ,খণ্ড ১১)।

উপসংহার
মাওলা হোসাইন আঃ এর জীবন ও বাণী আমাদের জন্য আদর্শ।সে কারণেই ইমাম হোসাইন আঃ এর বাণীগুলিকে আমাদের পাথেয় করতে হবে এবং তাঁর প্রদর্শিত পথকে আলিঙ্গন করতে হবে।তবেই আল্লাহ রব্বুল আলামীনের প্রকৃত অনুগত্য করা হবে এবং ইহকাল ও পরকালে মুক্তি সম্ভব হবে।


__________________________________________

 মারেফাত এ ইমামে জামানা (আ.জ.)
           ✍️ আব্বাস আলী
  
ভূমিকা
মারেফাত এ ইমামে জামানা অর্থ শুধুমাত্র নাম, বংশ বা ইতিহাস জানা নয়; বরং তাঁর আসল পরিচয়, দায়িত্ব, মর্যাদা ও আমাদের প্রতি তাঁর হককে বোঝা । রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন: "যে ব্যক্তি তার যোগের ইমাম কে চিনলো না সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল"।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইমামের মারেফাত ঈমানের অপরিহার্য অংশ। ইমাম মাহদী (আ.জ.) হলেন আল্লাহর সর্বশেষ হুজ্জত, যিনি কুরআন ও শরীয়তের প্রকৃত ব্যাখ্যাকারী। তাঁর আগমনের জন্য হাদীসে বর্ণনা হয়েছে যে, "যদি দুনিয়ায় মাত্র একদিনও বাকি থাকে, আল্লাহ সেই দিনকে দীর্ঘ করবেন, তার হুজ্জতের জুহুরের জন্য"

ইমামের গায়বতের রহস্য

ইমামের গাইবতের দুটি পর্যায় রয়েছে---
1. ছোট গায়বত (গায়বতে সোগরা) — ৭০ বছর স্থায়ী ছিল, যেখানে চারজন বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন।

2. বড় গায়বত (গায়বতে কুবরা) — এখন পর্যন্ত চলছে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিনিধি নেই, তবে আলেম ও ফকিহগণ তাঁর সাধারণ প্রতিনিধি।

গায়বতের অন্যতম কারণ

ক) ইমামের জীবন রক্ষা
খা) উম্মতকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলা
গ) মানুষকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে শরীয়ত পালন শেখানো

মারেফাত অর্জনের বিস্তারিত উপায়

১. কুরআনের আয়াত অধ্যয়ন 
কুরআনে  ইমামের  মর্যাদা ও দায়িত্ব সম্পর্কিত বহু আয়াত আছে, যেমন:--"তুমি তোমার সময়ের ইমামকে অনুসরণ কর।"

২. হাদিস
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বহু বাণী আছে ইমাম মাহদী (আ.জ.) সম্পর্কে
৩. দোয়া ও জিয়ারতের মাধ্যমে সংযোগ
দোয়া এ আহদ — ইমামের সাথে আধ্যাত্মিক চুক্তি।
জিয়ারতে আল-ইয়াসিন  ইমামের সাথে কথোপকথনের আকারে দোয়া।
দোয়া ফরজে ইমামের দ্রুত আগমনের জন্য দোয়া।

৪. অপেক্ষা
অপেক্ষা মানে শুধু অপেক্ষাই করা নয়, বরং নিজেকে প্রস্তুত করা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, এবং ইমামের উদ্দেশ্যে জীবন পরিচালনা করা।

গায়বতের যুগে আমাদের দায়িত্ব

1. তাকওয়া ও আমল — ব্যক্তিগত চরিত্র ও আমল পরিশুদ্ধ রাখা।
2. শরীয়তের আনুগত্য — ফকিহদের নির্দেশ মেনে চলা।
3. ইমামের জন্য দোয়া — যেমন আল্লাহুম্মা কুন লিওলিয়েকাল…।
4. ইসলামী সমাজ গঠন — অন্যায় ও ফিতনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

উপসংহার
মারেফাত এ ইমামে জামানা কেবল একটি জ্ঞান নয়, এটি এমন একটি জীবন্ত সম্পর্ক যা মুমিনের হৃদয়ে আলো জ্বালায়। এবং ধীরে ধীরে ইমামের জোহরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার আবেগ তৈরি করে দেয়।।

__________________________________________------------------------------------------------




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
                   কাল্পনিক ছোয়াঁ
        ✍️মো: মুন্তাজির হোসেন গাজী

প্রলাপ বকেছি তোমার কাল্পনিক ছোঁয়া পেয়ে,
হতাসায় ভূগেছি আমি তোমাকে না পেয়ে।
হাজার দূরে থাকলেও তোমার আওয়াজ শোনা যায়,
তোমাকে পেয়েছি আমি আলে-ইয়াসিনের পাতাই।

ভোরের কূয়াশাতে আবছা ছায়া ভেসে আসে,
কিন্তু হাই!এটাও দৃষ্টিভ্রম বুঝলাম অবশেষে ।
রক্তঅশ্রু ঝরিয়ে শহীদের আঘাতে যেন প্রলেপ দাও,
বৃহৎ দূঃখ কে মাওলা তুমি বিভাজন করে নাও।

সব প্রত্যাশা যেন সফলতাকে লঙ্ঘন করে যায়,
মেহদিকে দেখতে, অন্তর অনিচ্ছার কাছে হারে যায়।
নীশিরাতের এবাদাতে গুঞ্জন এলো ভেসে,
এটি সে নয়, আলিমেদ্বীন ছিল পাসে।

ভোরের আকাশে যেন শান্তির শিখা ভেসে আসে,
এখনো অবকাশ হয়নি, আশা যেন কল্পতরুতে ভাসে।
নৈঋত কোনে, রবির কীরণের ছটা এল ভেসে,
এটি সূর্যোদয় নয়, সূর্যাস্তের ছিল সময় ।।

__________________________________________


    পরিচিতি 
    ✍️ রাজা আলী 

আমি তখন খুব ছোটো
হয়তো আধো আধো কথা মুখে
বাবা মা আমাকে একের পর এক কত শব্দ
অতি যত্নে শিখিয়েছে;
প্রতিটি শব্দ করেছি কপি
নেমেছে বাহ্ বাহ্ র স্রোত
"এই দেখ আমাদের মনা র কত কথা,
মিষ্টি , মধুর,পাকা পাকা,
কেউ যেন আগে থেকে শিখিয়েছে পরিপাটি"।

উহঃ,কত কিছু শিখেছি
কেউ তো শেখায় নি আমার ইমাম(আঃ)এর নাম
"বলো মাহদী আদরিকনী"
অনেক বড়ো হয়ে , মক্তবের বইয়ে
পড়েছি ইমামের জন্ম,উপাধি,পরিচয়...
হায়,কত দিন পেরিয়ে চিনেছি তাকে
যার অস্তিত্বের বরকতে পৃথিবী বিদ্যমান।

মক্তবের গন্ডি পেরিয়ে এমাম আঃ ক্লাসে
জেনেছি তার পাওয়ার, ক্যারিশমা 
রহস্য জেনেছি সেই ঐশী সত্তার অন্তর্ধানের
তখন থেকেই জীবনের প্রতিটি কাজে 
সাক্ষী হিসাবে তাকে আগে ভাবি
হৃদয়ের গভীর কথা,ব্যথা
পলকে জানিয়ে রাখি
আর এক প্রচ্ছন্ন ভরসায় 
পথ চলি অবলীলায়।

__________________________________________

     কবে আমায় ডাকবেন ইমাম আরবাঈনে
               ✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

কবে আমায় ডাকবেন ইমাম আরবাঈনে,
কবে ভিজবো চোখের জলে কারবালার মাটিতে?
কবে ধরবো হুসায়েনের রক্তমাখা ধ্বজা,
কবে হাঁটবো আপনার পথে অশ্রুভেজা পায়ে?

কবে দেখবো সেই জ্যোতিময় সমুদ্র,
যেখানে মানুষের হৃদয় গলে যায় ভালোবাসায়?
যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ হয় জিকিরের সুর,
“ইয়া হুসায়েন!” ধ্বনিত হয় আকাশের নীলিমায়।

কবে আমায় ডাকবেন, হে প্রিয় ইমাম,
যেন আপনার আহ্বান শুনতে পাই নিভৃতে,
হৃদয় ভিজে ওঠে নামাজের অশ্রুতে,
আরবাঈনের স্রোতে ভাসি প্রেমের সাগরে।

আমি অপেক্ষা করি চোখ মেলে আকাশে,
হৃদয়ের অন্তরতম প্রার্থনা নিয়ে—
হে মাহ্দী (আ.ফা.), আপনার হাতের ইশারায়
ডেকে নিন আমায় সেই অনন্ত যাত্রায়।
------ _____------_____------______------______------

   

No comments:

Post a Comment

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ সফর সংখ্যা

            আরবি : সফর, ১৪৪৭ হিজরী ইংরেজি : আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ __________________________________________               সম্...