আরবি: জামাদিউস সানী, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________
সম্পাদক :
সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী
প্রচ্ছদ ভাবনা:
অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:
প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা
__________________________________________
সূচিপত্র
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
সম্পাদকীয়
কুরআন ও হাদীসের আলোকে ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর আদর্শ ও শিক্ষা
যাহেরার জন্মদিনই হোক আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস
ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন: দ্বীনি সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা
✍️ রাজা আলী
বিবি ফতেমা যাহারা (স:) এর বিবাহোত্তর জীবন (অনুবাদ)
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
সাইয়্যিদাতুন নিসা
ফাতেমার শোক
✍️ রাজা আলী
ঈদে যাহেরা
__________________________________________
__________________________________________
সম্পাদকীয়
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
আলহামদুলিল্লাহ! আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকার জামাদিউস সানী সংখ্যার অনলাইন সংস্করণ পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করতে পেরে আমরা কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ অনুভব করছি। গত বছরের পবিত্র সা‘বান মাস থেকে অনলাইনে নিয়মিত প্রকাশনার মাধ্যমে এই পত্রিকা সত্য, ন্যায় ও দ্বীনি চেতনার বার্তা বহন করে চলেছে।
এই সংখ্যাটি নিবেদিত মানবতার শ্রেষ্ঠ নারীদের শিরোমণি, হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর প্রতি—যাঁর জীবন ছিল ইমান, ত্যাগ, লজ্জা ও দায়িত্ববোধের জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তাঁর আদর্শ আজও আমাদের চিন্তার জগতে আলোর পথ দেখায়।
এই সংখ্যায় ইমাম মাহদী (আ:) এর আবির্ভাব, কুরআন ও হাদীসের আলোকে যাহেরার মহিমান্বিত চরিত্র, মাতৃত্বের সর্বোচ্চ মর্যাদা, দ্বীনি সমাজ গঠনে তাঁর অনুপ্রেরণা এবং বিবাহোত্তর জীবনের অনুপম দৃষ্টান্ত গভীর মমতা ও গবেষণার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
আমরা বিশ্বাস করি, এই লেখাগুলো কেবল পাঠ নয়—বরং আত্মাকে স্পর্শ করা এক নীরব দাওয়াত।
আল্লাহ তাআলা যেন এ প্রয়াস কবুল করেন এবং ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর আদর্শ আমাদের জীবনে বাস্তব রূপ দান করেন—এই দোয়া।
ওয়াস সালাম
সম্পাদক
__________________________________________------------------------------------------------
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)
“ ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের সুখবর আসমানী পুস্তকগুলির মধ্যে আছে। আর সমস্ত ওলীগণ ও আম্বীয়াগণও ঐ দিনের অপেক্ষা করছে। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই গায়বত কতদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে; আর আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ইমাম মাহ্দী (আঃ)-কে কোন্ দিন আবির্ভাবের অনুমতি দেবেন, তা তিনি ছাড়া আর সকলের ই অজানা। তাই ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের নির্ধারিত দিন যদি কেউ ঘোষণা করে, তাহলে সে মিথ্যাবাদী।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মাহ্দী (আঃ) একটি পত্রে লিখেছেনঃ
أما ظهور الفرج فإنه إلى الله وكزب الوقاتون
"আবির্ভাবের হুকুম (আদেশ) আল্লাহ্ হাতে; আর যারা আবির্ভাবের জন্য সময় নির্ধারণ করবে, তারা মিথ্যাবাদী” (অনুবাদ)।
ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর গায়বাতের যুগ শীয়াদের প্রকৃত সমস্যার সময়। এই যুগ সমাপ্ত হওয়া ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভূত হওয়া মানুষদের দোয়া ও মোনাজাতের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন বানী ইস্রাইলদের দোয়া ও কান্না-কাটিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের চার শ' বছরের আযাবকে হাল্কা করে দেয়; আর ১৭০ বছরের আযাবকে ক্ষমা করে দেয়। আর হজরত মুসা (আঃ)-কে তাদের আম্বিয়া হিসাবে পাঠিয়ে ফিরআউনের জঘন্য কার্যকলাপ থেকে পরিত্রাণ দেয়। এই কারণেই জাফর সাদিক (আঃ) মুসলমানদের বিশেষ ভাবে বলেছেন 'ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের জন্য আল্লাহর দরবারে বানি ইস্রাইলদের মতো দোয়া প্রার্থনা ও কান্না-কাটি করো'।
ইমাম মাহ্দী (আঃ) ক্বাবা ঘরের নিকট হাজ্বরে আসওয়াদ নামক স্থান থেকে আবির্ভূত হবেন। সেই সময় সেখানে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর ৩১৩ জন আসহাব থাকবে। আবির্ভাবের পর জিব্রাইল ক্বাবা ঘরের ছাদ থেকে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের ঘোষণা করবেন। এই ঘোষণার স্বর এবং উদ্দেশ্য সমগ্র পৃথিবীর মানুষ শুনতে এবং বুঝতে পারবে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থান থেকে মোমেনীনরা তাঁর বায়াত গ্রহণ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে। হজরত ঈসা (আঃ) চতুর্থ আসমান থেকে আসবেন। আর ইমাম মাহদী (আঃ)-এর বায়াত গ্রহণ করে তাঁর সৈন্যদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবেন। এবং তাঁর পিছনে নামাজ আদায় করবেন। যে সমস্ত মোমেনীন ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশা রাখত, অথচ জীবদ্দশায় সাক্ষাৎ করতে পারেনি; আল্লাহ্ তাদেরকেও পুনরায় জীবিত করবেন। আর তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পক্ষ থেকে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।
এই ধারাবাহিকতায় ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের সংখ্যা যখন দশ হাজারে পৌঁছাবে, তখন তিনি 'ক্বেয়াম' করবেন। প্রথমে মক্কা জয় করে মদীনা; আর সেখান থেকে কুফা পৌঁছাবেন। কুফাকেই সমগ্র পৃথিবীর রাজধানী নির্বাচন করে, সেখান থেকেই গোটা পৃথিবী শাসন করবেন। ক্রমান্বয়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাছাড়াও ফ্রেস্তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আদেশ পালন করতে থাকবে। আর শত্রুরা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যবাহিনী দেখে ভয় পাবে। তাদের সামনে কোনো ভাবেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। তারা একের পর এক জয়ী হবে, কখনো পরাভূত হবে না। কয়েকটি কারণে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সৈন্যদলের সামনে শত্রুরা নত হবে।
কারণগুলি হ'ল, -
(ক) মোজেযা ও খোদায়ী চিহ্নের নিদর্শন,
(খ) ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর অন্তরজয়ী আলাপ ও কথাবার্তা,
(গ) ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তাঁর সৈন্যদের আচার-আচরণ, মানুষ্যত্ববোধ ও আন্তরিকতা ইত্যাদি।
ইসলাম বিরোধী ইহুদী ও আহলেবাইয়াতের শত্রুদের সমস্ত রকম বিরোধীতাকে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সৈন্যরা কঠোর ভাবে প্রতিরোধ করবেন। মাত্র আট মাসের মধ্যেই পূর্ব ও পশ্চিম দিক ব্যাপী ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই শাসনের একটি উদ্দেশ্য হল জালিম ও অত্যাচারীদের থেকে অসহায় মানুষদের হক্ক বুঝে দেওয়া এবং কাফির ও মুশরিকদের (ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের পরেও যদি কাফির থেকে যায়) হত্যা করা। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসনে আহলেবায়েতের শত্রুরা অপমানিত ও লজ্জিত হবে। ফাসাদকারী ও বিরোধীতাকারীরা উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহর সমস্ত শত্রুদের হত্যা করা হবে। সমস্ত পৃথিবীতে ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তার অনুসারীদের সুশাসন চলবে। এবং পৃথিবীর বুকে সঠিক দ্বীন প্রচারিত হবে। হে আল্লাহ্, ঐ দ্বীনের আবির্ভাবকে দ্রুত ত্বরান্বিত করুন। আমীন।
_________________________________________
১. ঈমান ও তাকওয়ার আদর্শ:
হযরত ফাতেমা (সা.আ.) ছিলেন সর্বোচ্চ ঈমানদার ও মুত্তাকি নারীদের মধ্যে একজন। কুরআনে বলা হয়েছে:
"إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ
(সূরা আহযাব ৩৩:৩৩)
এই আয়াতে আল্লাহ পাক তাঁর পবিত্রতা ও তাকওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। হাদীসে নবী (সা.) বলেন:
"ফাতেমা জান্নাতি নারীদের সর্দার।" (সহীহ মুসলিম)
২. ইলম ও হিকমতের প্রতীক:
ফাতেমা (সা.আ.) ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে সরাসরি জ্ঞান লাভ করেন। “মুশাফে ফাতেমা” নামে এক বিশেষ জ্ঞানভাণ্ডার তার দখলে ছিল।
৩. ইবাদত ও দুআর শিক্ষা:
তিনি ইবাদতের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। ইমাম হাসান (আ.) বলেন:
"আমার মা এক রাতভর নামাজে মগ্ন থাকতেন, শুধু অন্যদের জন্য দোয়া করতেন।"
(বিহারুল আনওয়ার)
৪. ইনসাফ ও প্রতিবাদের প্রতীক:
ফাতেমা (সা.আ.) নিজ অধিকারের জন্য দ্ব্যর্থহীন প্রতিবাদ করেন, বিশেষ করে ফাদাকের জমির প্রশ্নে। তাঁর সেই ভাষণ (খুতবা-ই-ফাদাকিয়া) ছিল সত্য ও ইনসাফের নির্ভীক আহ্বান।
খুতবা ই ফাদাকিয়া সম্পর্কে নিচে বর্ণনা করা হয়েছে
৫. হিজাব ও শালীনতার আদর্শ:
তিনি নারীদের জন্য হিজাব, লজ্জাশীলতা ও মর্যাদার এক অনন্য আদর্শ। একটি হাদীসে আছে, ফাতেমা (সা.আ.) বলেন:
“সেরা নারী সেই, যার চোখ পরপুরুষকে না দেখে এবং কেউ তাকে না দেখে।”
৬. পারিবারিক জীবনে পূর্ণতা:
তিনি একজন আদর্শ স্ত্রী, স্নেহশীলা মা ও বুদ্ধিমতী গৃহিণী ছিলেন। হযরত আলী (আ.) বলেন:
"আমি কখনো তাকে রাগান্বিত দেখি নি বা কোনো কাজে আমার অবাধ্য দেখি নি।"
খুতবা ফাদাক এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ
খুতবা ফাদাক হল হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.)‑এর একটি বিখ্যাত ভাষণ, যা তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর wafat-এর পর মদীনার মসজিদে দিয়েছিলেন। এই খুতবাটি ইসলামি ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল হিসেবে গণ্য হয়। নিচে এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
খুতবার প্রেক্ষাপট:
রাসুল (সা.)-এর শাহাদাতের পর, ফাতিমা (সা.) পৈতৃক সম্পত্তি "ফাদাক" যা রাসুল (সা.) তাকে জীবিত থাকতেই দিয়েছিলেন, তা দাবি করতে গিয়ে খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সামনে এই খুতবা প্রদান করেন। খলিফা সম্পত্তিটি রাষ্ট্রীয় মাল মনে করে তা ফিরিয়ে দেননি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ফাতিমা (সা.) মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয়ে এই জ্ঞানে পরিপূর্ণ ও আবেগপূর্ণ ভাষণ দেন।
খুতবার মূল বিষয়বস্তু:
1. আল্লাহর প্রশংসা ও বান্দার দায়িত্ব:
আল্লাহর তাওহীদ, তাঁর গুণাবলি ও সৃষ্টি নিয়ে প্রশংসা। মানবজাতির দায়িত্ব ও আল্লাহর আনুগত্যের গুরুত্ব।
2. নবী করীম (সা.)-এর প্রেরণ ও মিশন:
রাসুল (সা.)-এর নবুওয়ত, তাঁর জীবন সংগ্রাম ও কোরআন অবতীর্ণের গুরুত্ব আলোচনা।
3. কোরআনের ব্যাখ্যা:
কোরআনের বিভিন্ন আয়াত, বিধান ও তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের গুরুত্ব।
4. ফাদাক ও অধিকার দাবি:
রাসুল (সা.) ফাদাক তাকে কীভাবে দিয়েছিলেন এবং তা ছিল নাস-অনুযায়ী (শরিয়ত মোতাবেক)। তিনি কোরআন ও হাদিস দিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
5. আহলে বাইতের মর্যাদা:
আহলে বাইতের মাহাত্ম্য, তাঁদের প্রতি উম্মাহর দায়িত্ব এবং তাঁদের অবিচারের কথা তুলে ধরা।
6. উম্মাহর অবস্থা ও ন্যায়ের আহ্বান:
তিনি মুসলিম উম্মাহর উদাসীনতা ও অন্যায় সহ্য করার প্রবণতা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।
খুতবার শিক্ষণীয় দিক:
- নারীর জ্ঞান, যুক্তি ও সাহসিকতার অনন্য উদাহরণ।
- ইসলামে অধিকার আদায়ে ন্যায়ের ভাষা ও যুক্তির গুরুত্ব।
- আহলে বাইতের ওপর জুলুম ইতিহাসে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
- কোরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা ও তার অনুশীলনের শিক্ষা।
উপসংহার:
খুতবা ফাদাক কেবল একটি সম্পত্তির দাবি নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ও আদর্শিক প্রতিবাদ — যা ন্যায়ের, ইমানের ও ইসলামী জ্ঞানের এক উজ্জ্বল দলিল।
ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর জীবন ইসলামের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি। তিনি কুরআনের জীবন্ত বাস্তবায়ন, নবীর শিক্ষার বাস্তব নমুনা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে নারীরা যেমন ইবাদতে, তেমন পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকেও সফলতা অর্জন করতে পারে।
__________________________________________
যাহেরার জন্মদিনই হোক আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস
মাতৃত্ব—এই একটি শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টি, ভালোবাসা, ত্যাগ, বিশ্বাস, আলো, আর একটি জাতির ভবিষ্যৎ। মানব ইতিহাসে যত মহৎ চরিত্র, যত ধৈর্যশীল মন, যত দৃঢ় আত্মা দেখা গেছে—তার অধিকাংশের পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো মায়ের নীরব সংগ্রাম। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে এই মাতৃত্বের মহিমা অনেক সময়ই কেবল আবেগের উদযাপনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বাণিজ্যিকতা, আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণ, আর সাংস্কৃতিক বিচ্যুতির ভিড়ে মাতৃত্বের প্রকৃত মর্যাদা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.)-র জন্মোৎসবকে আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস হিসেবে দেখার ধারণা শুধু ধর্মীয় নয়—এটি মানবিক, নৈতিক ও সভ্যতাগত একটি প্রয়াস। কারণ ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.) ছিলেন এমন এক মা, যাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মাতৃত্বের অর্থ নতুন করে ব্যাখ্যাত হয়েছে।
তিনি ছিলেন কোমলতার প্রতীক, কিন্তু অন্যায়ের সামনে অটল দৃঢ়তা; তিনি ছিলেন বিনয়ের চূড়া, কিন্তু নৈতিকতার সামনে আপসহীন সাহস। তাঁর ঘর ছিল দরিদ্র, কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল অসীম ধনসম্পদের অধিকারী। তিনি সন্তানদের শুধু লালন করেননি—তাদের চরিত্রে ঢেলে দিয়েছিলেন সত্য, ন্যায়, ত্যাগ ও মানবতার আলো। তাঁর সন্তানরা মানবতার ইতিহাসে যে ভূমিকা রেখেছেন, তা তাঁর মাতৃত্বের অনন্য সাফল্য ছাড়া ব্যাখ্যা করা যায় না।
বর্তমান নারী সমাজের সংকটগুলো বাস্তব—অতিরিক্ত অনুকরণ, সামাজিক বিভ্রান্তি, মূল্যবোধের ভাঙন, আত্মপরিচয়ের সংকট, ভোগবাদী ধারা, এবং পরিবার রক্ষার দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাওয়া। এই সময়ে ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.) হয়ে উঠতে পারেন সত্যিকারের দিকনির্দেশনা—
যাঁর জীবনে শালীনতা শক্তি, নৈতিকতা স্বাধীনতা, জ্ঞান মর্যাদা, আর মাতৃত্ব আলোকবর্তিকা।
আজকের মাতৃ দিবসের উদযাপন অনেক সময় উপহারের বিনিময়, বাহ্যিক প্রদর্শনী বা একদিনের আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.)-র জন্মোৎসব স্মরণ করায়—
মাতৃত্ব মানে ত্যাগ, দায়িত্ব, প্রজন্ম গঠন, চরিত্র নির্মাণ, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পরিবারের পথ নির্দেশ করা।
তাঁর জন্মদিনকে আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবসের প্রতীক করা হলে মাতৃত্বের ধারণা শুধু আবেগের নয়—হয়ে উঠবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস। এটি বিশ্বের সব ধর্মের, সব সংস্কৃতির মায়েদের সামনে উপস্থাপন করবে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ—একজন মা কেমন হলে সমাজ উন্নত হয়, প্রজন্ম সুশিক্ষিত হয়, আর মানবতা রক্ষা পায়।
ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.)-র জন্মোৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
একজন মা যখন আলোর পথে চলেন, তখন শুধু তাঁর সন্তান নয়; সমগ্র সমাজ আলো পায়।
একজন মা যখন হৃদয়কে পবিত্র রাখেন, তখন জাতির ভবিষ্যৎ পবিত্র হয়।
আর একজন মা যখন নৈতিকতার মশাল জ্বালান, তখন অন্ধকারও পথ হারায়।
পরিশেষে বলা যায়, ফাতিমা যাহেরা (সা.আ.)-র জন্মোৎসবকে আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস হিসেবে রূপ দেওয়ার ধারণা কোনো সম্প্রদায়ের দাবি নয়—এটি মানবতার প্রতি আহ্বান। এটি মাতৃত্বকে পুনরুদ্ধার করতে চায় তার আসল মহিমায়; যেখানে মা শুধু ঘরের নারী নন, তিনি চরিত্রের নির্মাতা, নৈতিকতার শিক্ষক, সমাজের আলোকদূত। তাঁর জীবনই প্রমাণ করে—মায়ের হাতে একটি প্রজন্ম বদলে যায়, আর একটি প্রজন্ম বদলে দিলে বদলে যায় পুরো পৃথিবী।
হে আল্লাহ! আমাদেরকে ইমাম মাহ্দীর (আ.ফা.) সহায়ক, অনুগামী ও তাঁর পতাকার নিচে শহীদ হওয়াদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন... ছুম্মা আআমিন।
__________________________________________
ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন: দ্বীনি সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা
✍️ রাজা আলী
পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী হলেন মা ফাতেমা জাহেরা সাঃ। ঐশী মহিমা এবং পিতামাতার কারণে তিনি এমন এক সমুন্নত চরিত্রে র নারী,যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে দুর্লভ।অথচ এই মহিমান্বিত নারীর খুব সংক্ষিপ্ত জীবন এবং শেষ জীবনের নিঃসীম দুঃখ-যন্ত্রণা ও মৃত্যু খুব ই বেদনা বিধুর।এই দুঃখ যে কোনো মোমিন হৃদয়কে শোকসাগরে নিমজ্জিত করে।তাই ফাতেমা জাহরা সাঃ এর শোক আজ পৃথিবীর অলিতে গলিতে পালিত হচ্ছে।
বিশিষ্ট আলেম দের তাগিদ এবং মোমিন হৃদয়ের আগ্রহে আজ প্রতিটি দেশেই পালিত হচ্ছে আইয়ামে ফাতেমিয়া। কিন্তু আইয়ামে ফাতেমিয়া র মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে নানা তাৎপর্য মন্ডিত দিক।সেই দিকগুলি সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আইয়ামে ফাতেমিয়াকে সচেতন হৃদয়ে লালন করতে পারলে এক দিকে যেমন মোমিন হৃদয়ের আর্তি পরিপূর্ণ হবে,অন্যদিকে তেমনি সমাজ গঠনের দাবি পূর্ণ হবে।
ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন বিচিত্র গুণে গুণান্বিত।তাই আইয়ামে ফাতেমিয়া র নানা দিক অন্বেষণ করা যায়। যেমন:
১.আইয়ামে ফাতেমিয়া আহলে বাইত প্রেমীদের কাছে গভীর শোক ও আযাদারীর তাৎপর্য বহন করে,
২.আইয়ামে ফাতেমিয়া ফাতেমা যাহরা সাঃ এর খুব সংক্ষিপ্ত জীবন এবং মৃত্যু-রহস্যের জটিল জাল সকলের নিকট উন্মোচন করে,
৩.আইয়ামে ফাতেমিয়ার মাধ্যমে ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন দর্শনের আলো সমাজকে আলোকিত করে।
বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবন দর্শনের আলোকে সমাজকে আলোকিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো।
চারপাশের মানুষ জন নিয়েই আমাদের সমাজ জীবন গড়ে উঠেছে।আর আল্লাহ রব্বুল আলামীন দ্বীনে ইসলামের মধ্যে এমন কিছু নেয়ামত দান করেছেন,যে নেয়ামতগুলি সমাজ গঠনের আদর্শ ও মডেল হিসাবে বিবেচিত।ফাতেমা জাহেরা সাঃ এমন ই এক নেয়ামত,যার দ্বারা দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ তা পেয়েছে। আল্লাহর রাসুল নিজেই বলেছেন-- "ফাতিমা জান্নাতে র নারীদের নেত্রী এবং তিনি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়"(বিহারুল আনোয়ার)। অর্থাৎ আল্লাহর রাসুল এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ফাতেমা এমন এক ঐশী নারী যাকে তিনি নিজেই সব থেকে গুরুত্ব দিতেন এবং ভালোবাসতেন। সুতরাং আল্লাহর বান্দাদের উচিত ফাতেমা কে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভালোবাসা।আর আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁকে জান্নাতে র নেত্রী র মতো যখন সর্বোচ্চ সম্মান দান করেছেন,তখন বোঝা যায় যে,তাঁকে দ্বীনি সমাজ গঠনের কান্ডারী হিসাবে সৃষ্টি করেছেন।
মা ফাতেমা জাহরা সাঃ ইবাদতের ক্ষেত্রে এক অনুকরণ যোগ্য নারী ছিলেন। সাংসারিক কাজ সুসম্পন্ন করে, সন্তান দের লালন-পালন করেও তিনি দীর্ঘক্ষণ আল্লাহর আরাধনায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে ইমাম হাসান আঃ বলেছেন --"আমার মা ফাতিমা আল্লাহর ইবাদাতে এত বেশি মগ্ন থাকতেন যে, তাঁর পায়ের পাতা ফুলে যেতো।" (বিহারুল আনোয়ার)।
এই হাদিসে ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর ইবাদাতে র মাধুর্য ফুটে উঠেছে। ইবাদাতের মধ্যে যে মিষ্টতা ও মধুরতা লুকিয়ে আছে,তা আমরা তাঁর ইবাদত থেকে সহজেই বুঝতে পারি।তাই আমাদের উচিত তার ইবাদত কে নিজেদের জীবনে অনুকরণ করা এবং নিজেদের সমৃদ্ধ করে একটি দ্বীনি সমাজ গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
ইসলামী সমাজ গঠনের আদর্শ লুকিয়ে রয়েছে নারীদের শালীনতা রক্ষার মধ্যে।আর পর্দা হলো এক্ষেত্রে অদ্বিতীয় উপায়।মা জাহেরা নারী জাতির আব্রু রক্ষার জন্য নিজের জীবনকে মডেল হিসাবে নির্মাণ করেছেন।তাই সর্বোত্তম নারীর গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, নারীদের উচিত কেউ যেনো তাকে না দেখে,বা সে কাউকে না দেখে।কারণ পর্দা ঈমানের অংশ।তাই পর্দা ব্যতীত কোনো নারী র ঈমান পরিপূর্ণ হয় না।তাই আমাদের নারীদের কেও ফাতেমা জাহেরা সাঃ এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করতে হবে।তবেই সুস্থ ও সুন্দর একটি দ্বীনি সমাজ গড়ে উঠবে।এই কারণেই ইমাম খামেনেয়ী বলেছেন--"আমাদের উচিত ফাতিমা জাহরা সাঃ এর পবিত্র জীবন কে গভীর মনোযোগে অনুধাবন করা।তার জীবন কে নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এবং তাঁর মহিমান্বিত আদর্শকে আমাদের জীবন ধারার প্রকৃত মডেল হিসাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন" (১৯ এপ্রিল,২০১৪ খ্রিঃ)।
__________________________________________
বিবি ফতেমা যাহারা (স:) এর বিবাহোত্তর জীবন (অনুবাদ)
বিবি ফাতেমা জাহেরা (সাঃ আঃ) ইসলামের এক অনন্য সাধারণ নারী। তাঁর জীবন এক মহান ধর্মীয় আদর্শে অন্বিত। জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ফতেমা জাহেরা (সাঃ আঃ) জ্ঞানে-গুণে, ধর্মে-কর্মে,খোদা ভীরুতায় এক অনন্য নজির । বর্তমান নিবন্ধে তাঁর বিবাহোত্তর জীবন নিয়ে আলোচনা করা হলো।
বিবাহের পর মুস্তাফা (সা.আ.ওয়াল্লাম)-এর গৃহ থেকে বিবি ফাতিমা যাহরা (সা.) মুরতজা (আ.)-এর গৃহে আগমন করলেন।একদিন সকালে এক দরিদ্র নারী তাঁর দরজায় এসে সাহায্য প্রার্থনা করল। বিবি ফাতিমা (সা.) এমন কোনো বস্তু পেলেন না,যা বিক্রি করে তার প্রয়োজন পূরণ করা যায়। তাই তিনি নিজের বিবাহের পোশাকটি দান করে দিলেন।তাদের জীবনযাপনের পরিমাণ ও মানে ছিল সুস্পষ্ট সাদৃশ্য। প্রকৃতপক্ষে, জ্ঞান, শিক্ষা, তাকওয়া, নামাজ, দান-খয়রাত, আতিথেয়তা, সহমর্মিতা ও উদারতার উপরই ছিল তাঁর গুরুত্ব। বস্তুগত সম্পদের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহই ছিল না ।
বিবি ফাতিমা বিনতে আসাদ, যিনি হযরত আলী (আ.)-কে লালন-পালন করেছিলেন এবং তাকেও দেখাশোনা করতেন।তিনি তাঁর পুত্র মাওলা আলী (আ.)-এর সাথেই বসবাস করতেন।
শুরুর দিকে রাসূলুল্লাহ (সা.আ.ওয়াল্লাম) ও মাওলা আলী (আ.) মসজিদের প্রাচীরের পাশে তাঁদের ঘর নির্মাণ করেন। পরে মক্কা থেকে আগত সাহাবিগণও মসজিদের অন্যান্য প্রাচীরের পাশে ঘর তৈরি করতে শুরু করেন। সব ঘর এমনভাবে নির্মিত হয়েছিল যে তাদের দরজা মসজিদের আঙিনার দিকে খোলা থাকত এবং তা নিয়মিত চলাচলের পথ হয়ে যায়।
তিরমিজি ও নাসাঈ তাঁদের সহীহ গ্রন্থে এবং হাকিমের মুস্তাদরাকে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.আ.ওয়াল্লাম) সাহাবিদেরকে মসজিদের দিকে খোলা সব দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে বলেন এবং সেই দরজা দিয়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল মাওলা আলী (আ.)-এর ঘরের দরজা এবং তাঁর নিজের দরজা।অতএব, বিবি ফাতিমা (সা.) ও তাঁর পিতার ঘরের দরজা ছাড়া সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গৃহস্থালির কাজ—কূপ থেকে পানি আনা, রান্না করা, বাসন ও কাপড় ধোয়া, আটা পেষা, সেলাই ও ঝাড়ু দেওয়ার পাশাপাশি তিনি আল্লাহর ইবাদত ও নামাজে এমনভাবে মগ্ন থাকতেন যেমন তাঁর পিতা বা স্বামী থাকতেন।তাঁর মাত্র একজন গৃহপরিচারিকা ছিল—ফিজ্জা—যিনি তাঁর নিজের বোনের মতো প্রিয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত একটি ব্যবস্থা ছিল—একদিন বিবি ফাতিমা (সা.) গৃহকর্ম করতেন, পরের দিন ফিজ্জা তা করতেন।
বিবি ফাতেমা চিন্তা ভাবনা প্রকাশে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় তাঁর স্বামীর সমকক্ষ ছিলেন। বিভিন্ন স্থান থেকে নারীরা তাঁর কাছে আসত ইসলামের বার্তা শুনতে, ভাষা ও বক্তব্যের কৌশল শিখতে এবং সৃষ্টির অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে।তাঁর আতিথেয়তা, তাকওয়া ও প্রজ্ঞার কাহিনি বিশ্বাসী নারীরা প্রতিটি ঘরে, রান্নার আগুনের পাশে বসে বর্ণনা করত।
ফাতেমার বহুবিধ গুণাবলী ছিল।যে কারণে তার বিভিন্ন উপাধিও ছিল।উপাধিসমূহ—যেগুলো তাঁর অন্তর্নিহিত গুণাবলির প্রতিচ্ছবি এবং পিতার প্রদত্ত—আজও সকল মুসলমানের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় এবং কেয়ামত পর্যন্ত উচ্চারিত হতে থাকবে। উল্লেখযোগ্য কিছু উপাধি নিচে দেওয়া হলো:
বাতুল — স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অপবিত্রতা থেকে মুক্ত, তাহিরাহ — পবিত্র ও নিষ্পাপ, সাইয়্যিদাহ — শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল নারীর শ্রেষ্ঠ, নেত্রীউযরা — ইন্দ্রিয়গত কামনা থেকে মুক্ত, যাহরা — উজ্জ্বল ও সুন্দর, সিদ্দীকাহ কুবরা — সর্বাধিক সত্যবাদিনী, আবিদাহ — সদা ইবাদতকারী, খাতুনে জান্নাত — জান্নাতের শ্রেষ্ঠ নারী, যাকিয়্যাহ — প্রজ্ঞাবান, উম্মুল আইম্মাহ — ইমামগণের জননী, উম্মুল আবীহা — পিতার জননীস্বরূপ, রাজিয়্যাহ — আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিত, কুররাতুল আইন — পিতার চোখের মণি, খাইরুন নিসা — নারীদের মধ্যে সর্বোত্তম।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ইসলামে ফাতেমা জাহেরা (সাঃ আঃ) গুরুত্ব অনেক বেশি। আল্লাহর রাসূলুল্লাহ (সা.আ.ওয়াল্লাম) যখনই মদিনার বাইরে যেতেন, যাওয়ার আগে সর্বশেষ যাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তিনি ছিলেন বিবি ফাতিমা (সা.)।আর ফিরে এসে প্রথমেই তাঁর কাছেই যেতেন।প্রতিদিন সকালে তাঁর চেহারা দেখা এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় তাঁকে চুম্বন করা ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস।
সালমান, আবু যর, মিকদাদ, মাইসাম ও আম্মার ইয়াসির তাঁদের পরিবারসহ তাঁর গৃহে আসতেন। এছাড়া হামজা, আকিল, জাফর তাইয়ার ও বনি হাশিমের অন্যান্য সন্তানদের জন্য তাঁর গৃহ ছিল দ্বিতীয় ঘর।
সালমান এত বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে বিবি ফাতিমা (সা.)-এর গৃহে সেবা করতেন যে রাসূলুল্লাহ (সা.আ.ওয়াল্লাম) তাঁকে “মুহাম্মদের পরিবারভুক্ত” ঘোষণা করেন। এমন মর্যাদা আর কোনো সাহাবি লাভ করেননি।সালমান এগারোটি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর মতো জ্ঞানী ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই সকল জ্ঞানের উৎস—মাওলা আলী (আ.) ও বিবি ফাতিমা (সা.)-এর গৃহ ছাড়া অন্য কোথাও যেতেন না।আবুযর (রা.), যিনি তিন খলিফার সময়ে সমগ্র আরব জুড়ে ইসলামের সত্য বার্তা ও মাওলা আলী (আ.) ও বিবি ফাতিমা (সা.)-এর ফজিলত প্রচার করতেন; তিনিও তাঁদের গৃহের দরজায় বিনয়ী শিক্ষার্থী হিসেবে অবস্থান করতেন।
(মূল গ্রন্থ:- বিবি ফতেমা যাহারা (স:) এর জীবনী_হাদি হুসাইন সৈয়দ)
------ _____------_____------______------______------
------ _____------_____------______------______------
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
সাইয়্যিদাতুন নিসা
আল্লাহর ইজ্জত ফতেমা, নবীকন্যা বাতুল,
যাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন স্বয়ং রাসূল।
হাজার সিজদা করলেও যদি অন্তরে থাকে বিদ্বেষ,
ফতেমার প্রতি ঘৃণা থাকলে জান্নাতের আশা শেষ।
দুই জগতের সব নিয়ামত তিনি পেয়েছেন দানে,
আল্লাহর কসম, ফাদাক তাঁর পদধূলিরই মানে।
যার প্রতি ফতেমা অসন্তুষ্ট, আল্লাহও তার প্রতি,
দ্বীনের মূলনীতি এটাই—আল্লাহর সাথে সত্যের প্রীতি।
__________________________________________
ফাতেমার শোক
✍️ রাজা আলী
আমার উপরে যে কষ্ট
এসেছে নেমে,
দিনের উপর পড়লে দিন
যেতো থেমে।
তোমার পরে বাবা আমি
বড়ো অসহায়,
শত্রুরা অবিচার করেছে
দেয়নি রেহায়।
আলিকে ওরা বার করে
নিয়ে যেতে,
আমার ঘরে এসেছিলো
লোক নিয়ে সাথে।
আমি বাধা দিয়েছি বাবা
এপাশ হতে,
বন্ধ দরজা আগুন সাথে
পড়ে উদরে।
বাবা,মোহসিনের হয় ইন্তেকাল
শত্রুর হাতে,
আমার পাঁজর টুকরো হয়
দরজা ভারে।
বেশি দিন বাঁচবো না আর আমি
তোমার শোক,
তার উপর আলীর উপর অবিচার
করছে লোক।
এসব কিছু তোমার মৃত্যুর পরে
ভুলেছে সব,
ভাবিনি ওরা তোমার কন্যার তরে
ভুলেছে রব।
__________________________________________
ঈদে যাহেরা
যাহেরার জন্মদিনে নামে শান্ত নূরের আলো,
ফাতেমার স্মৃতিতে হৃদয় হয় পবিত্র, ভালো।
তার আগমনে দুনিয়া ভরে, দয়ার নরম ছায়ায়,
মুছে গিয়ে সব কষ্ট-অন্ধকার, হৃদয় জেগে ওঠে মায়ায়।
তিনি ছিলেন হায়ার প্রতীক, বিনয়ের কোমল দিশা,
নারীর জীবনে পথ দেখাতে আজও জ্বলজ্বলে তার নিশা।
শালীনতা তাঁর গর্ব ছিল, চরিত্র ছিল নূরের ফুল,
তার জীবনে লুকানো আলো—মুছে দিতো দুঃখের ধূল।
বাহিরের সাজ নয় মূল কথা, সৌন্দর্য বাসে অন্তরে,
যাহেরার শিক্ষা বলে—“হায়াই রাখো হৃদয় ভরে।”
যে নারী বিনয় নিয়ে চলে, সে-ই পায় সত্যর পথ,
আল্লাহর দয়া নেমে আসে তার জীবনের প্রতিক্ষণ-রথ।
আজকের দিনে আমরা সবাই নেই তাঁর জীবন দৃষ্টিতে,
দয়া, হায়া, নম্রতা রাখি নিজের প্রতিটি সৃষ্টিতে।
ঈদে যাহেরা মনে করায়—শুদ্ধতা সর্বদা জয়ী হয়,
তার আলোয় আমাদের জীবন হোক নূরময়, শান্তিময়।
------ _____------_____------______------______------
No comments:
Post a Comment