আরবি: সা'বান, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________
সম্পাদক :
সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী
প্রচ্ছদ ভাবনা:
অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:
প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা
__________________________________________
সূচিপত্র
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
সম্পাদকীয়
কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইমামে যামানা (আঃ)
ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব: একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস
ইমাম মাহদী (আ.) — বৈশ্বিক নিরাপত্তার একমাত্র পথ
✍️ মইনুল হোসেন
ইমামের সঙ্গে না–বলা কথাগুলো
মারেফাত (জ্ঞান বা প্রজ্ঞা):ইমাম মাহদী (আঃ)
✍️ রাজা আলী
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
জহুরের ডাক
অপেক্ষা
✍️ রাজা আলী
গায়েবের চাঁদ
__________________________________________
__________________________________________
সম্পাদকীয়
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আল হুজ্জাত মাসিক পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ আজ এক বছর পূর্ণ হল। গত বছর পবিত্র শাবান মাসে যে সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন ও নিয়ত নিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা পাঠকসমাজের ভালোবাসা ও দোয়ার বরকতে একটি আলোকিত পথে রূপ নিয়েছে। এই এক বছর ছিল আমাদের জন্য পরীক্ষা, শিক্ষা ও কৃতজ্ঞতার এক অনন্য সময়।
শাবান মাস এমন এক পবিত্র সময়, যা আমাদের হৃদয়কে ইমামে যামানা (আ.)–এর অপেক্ষায় আরও সংবেদনশীল করে তোলে। এই মাস আমাদের শেখায় আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার অর্থ। আল হুজ্জাত অনলাইন সংস্করণ সেই চেতনাকেই ধারণ করে—আহলে বাইত (আ.)–এর আদর্শ, ন্যায় ও মানবিকতার বাণী সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিক প্রয়াস হিসেবে।
এই এক বছরে যাঁরা লেখালেখি, পরামর্শ, দোয়া ও উৎসাহ দিয়ে আমাদের পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতি রইল গভীর কৃতজ্ঞতা। আমরা বিশ্বাস করি, কলমের আলো দিয়েও হৃদয়ের অন্ধকার দূর করা সম্ভব—যদি নিয়ত হয় খাঁটি এবং পথ হয় ইমামের পথ।
এই শাবান সংখ্যায় দাঁড়িয়ে আমরা আবারও অঙ্গীকার করছি—ইমামে যামানা (আ.)–এর আগমণের অপেক্ষায় নিজেদের শুদ্ধ করা, সমাজকে সচেতন করা এবং সত্যের পক্ষে কলম চালিয়ে যাওয়ার। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের এই প্রচেষ্টা কবুল করেন এবং আমাদেরকে তাঁর হুজ্জাতের প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।
ওয়াস সালাম
সম্পাদক
__________________________________________------------------------------------------------
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আযহাব
"খুব শীঘ্র আল্লাহ্ এমন মানুষদেরকে আবির্ভূত করবে ; যাদেরকে আল্লাহ্ ভালোবাসে। আর তারা ভালোবাসে ঈমানদারদের। আর কাফিরদের বিরোধীতা করবে, আল্লাহ্র পথে জেহাদ করবে। আর কোনো সমালোচনার কারীর সমালোচনা মূল্য দেবে না।" (অনুবাদ)।
প্রথম দিকে ইমাম মাযদী (আঃ)-এর সাহাব্যাকরীদের সংখ্যা বদর যুদ্ধের সেনাদের মতো নগণ্য হলেও ক্রমাগত তা দশ হাজারে পরিণত হবে। ইমাম মাহদী (আঃ) -এর এই সাহাবীদের এমন উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হয়েছে যে, আধ্যাত্মিকতা ও আউলিয়াগণও এই সম্মান প্রত্যাশা করতো। ইতিপূর্বে আমি উল্লেখ করেছি যে, ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) ইমাম মাযদী (আঃ)-
এর সাহাব্যাকরী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। তিনি বলতেন:- "যদি আমি ইমাম মাহদীর যুগকে পেতাম, তাহলে সমস্ত জীবন আমি তাঁর সাহাব্যাক অতিবাহিত করতাম" ( অনুবাদ)।
তাই আমাদের পাঠ করা দোয়াগুলিতে আমরা প্রতি নিয়ত আল্লাহ্ নিকট উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানীয় স্থানের আকাঙ্ক্ষা করে থাকি। বিভিন্ন রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে ইমাম মাযদী (আঃ)-এর সাহাবীদের কিছু গুণাবলী নিম্নে তুলে ধরা হ'ল:—
ক। এবাদাত ও পরহেজগারীতাঃ-
ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহাবীয়া প্রবল এবাদাতকারী ও পরহেজগার হবে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ “তারা রাতে জেগে জেগে খোদার এবাদাত করবে। নামাজের সময় তাদের আওয়াজ মৌমাছির বিন বিন আওয়াজের ন্যায় হবে। তাদের কপালে সেজদার চিহ্ন থাকবে। আর দিনে তারা প্যাঁচার ন্যায় হবে ” (অনুুুুবাদ)।
খ। শক্তি ও অনুুুুুকানঃ-
আমীরুল মোমেনীন (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ
“মাহ্দীর সৈন্য-সাহাবারা যুবক আছে, তাদের
মাঝে কেউ বুড়ো নেই ” ।
প্রকৃত প্রস্তাবে যুবক হওয়া, শক্তি শালী হওয়া, শত্রুদের অনুুুুুুকান করা , তাদের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়ািন ইত্যাদি হ'ল প্রকৃত সৈন্যদের বৈশিষ্ট্য। আর ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সেন্দেদের এমন সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে, যে
কাজগুলোতে সফলতা অর্জন করা শক্তি-সাহস ও বাহাদুরীতা ছাড়া কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ “তাদের মধ্যে প্রত্যেক ৪০ জন ব্যক্তির ন্যায় শক্তি শালী হবে। আর তাদের অন্তর লৌহ খণ্ডের মতো হবে। যদি তারা লৌহির পাহাড়ের ওপর দিয়েও যায়, তবে তা খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে। আর তারা লোহার তলোয়ারকে ঐ সময় পর্যন্ত নেয়ামত (তলোয়ার রাখার ধাপ) করবে না, যতক্ষণ না খোদা সন্তুষ্ট হবে” (অনুবাদ)।
অপর একটি রেওয়ায়েতে ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেছেনঃ “যদি তাদের উপর কোনো শহরকে ধ্বংস করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে তারা ঐ সময় পর্যন্ত শান্ত হবে না, যতক্ষণ না শহরটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিত হবে” (অনুবাদ)।
গ। ঈমান:-
ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহাবীগণ একই সাথে পরিপূর্ণ ঈমানদার এবং জ্ঞানী ও বুঝিম্যান হবে। তাদের হৃদয়ে আল্লাহর মা’রেফাত থাকবে, আর কোনো প্রকার সন্দেহ থাকবে না। তারা নিজেদের মা’রেফাতের রাস্তা অন্য
কোনো পথে নয়; সর্বদা কোরআন ও মা’সুমীন (আঃ)-দের হাদীস থেকে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করবে। ইসলামের মধ্যে তাদের স্থান ফকীহগনের মধ্যে গণ্য করা হবে। আর জ্ঞানের বিষয়ে তারা ঐ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসাবে পরিগণিত হবে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)
বলেছেনঃ
“এ মোমেনীন, যাদের মাঝে আল্লাহ্ মাযহদীকে
পাঠাবে ; তারা নিৰ্দ্ধারিত হবে, শাসক ও বিচারক
হওয়া একমাত্র তাদেরই মানাবে । আর দ্বীনে ইসলামে তারা ফক্বীহগণদের মধ্যে গণ্য হবে” (অনুবাদ)
ঘ। মহব্বত ও অনুসরণকারীঃ
ইমাম মাযদী (আঃ)-এর প্রতি তাঁর সাহাবীদের সীমাহীন মহব্বত থাকবে । তাঁদের অন্তর শুধুমাত্র ইমাম মাযদী (আঃ)-এর মহব্বতে পরিপূর্ণ হবে । তাই প্রত্যেক কাজ তারা ইমাম মাযদী (আঃ)-এর আদেশ মতোই করবে । সর্বদা তারা ইমাম মাযদী (আঃ)-এর সামনে মাথা নত করে থাকবে । কোনো প্রকার মূল্লাতে তারা ইমাম মাযদী (আঃ)-এর সঙ্গ ছাড়বে না । ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইমাম মাযদী (আঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তার উচিত পরীক্ষা করা ,পরহেজগার হওয়া, মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার করা । তার চরিত্র ও ব্যবহার এমন হবে যাতে এটা বোঝা যায় যে, সে ইমাম মাযদী (আঃ)-এর অপেক্ষায় আছে” (অনুবাদ)।
বর্তমান অধ্যায়টি আমি ইমাম রিয়া (আঃ)-এর দোয়া দিয়ে সমাপ্ত করছিঃ
“হে আল্লাহ্ ! আমাদের ঐ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তুর্ভূক্ত
কর, যাদের মাধ্যমে তোমার দ্বীনের মত দেওয়া হয় ; আর এই মতের মাধ্যমে তুমি যাকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছি। আর আমাদের স্থানে আমাদের পরিবর্তে
অপর কাউকে যেন স্থান দিওনা” (অনুবাদ)।
_________________________________________
কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইমামে যামানা (আঃ)
"যে ব্যক্তি তার জামানার ইমামকে না চিনে মৃত্যু বরণ করে সে জাহিলিয়্যাতের মৃত্যুবরণ করে।" (মশহুর হাদীস)
এই হাদীসটির মতো আরো কয়েকটি হাদীস আছে। যেমন: "যে ব্যক্তি মারা যায় অথচ তার গলায় বাইয়াতের রশি থাকে না সে কুস্ত্রীর মৃত্যুবরণ করে" (সহীহ্ মুসলিম,তাফসীর ইবনে কাসীর)
"যে ব্যক্তি ইমাম ছাড়া মৃত্যুবরণ করে সে কুস্ত্রীর মৃত্যুবরণ করে।" (মুসনাদে আহমাদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-৯৬)
এই তিনটি হাদীস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বাইয়াত ও অনুসরণ ছাড়া মারিফাত তথা পরিচয় অর্জন সম্ভব নয়। আর এ কারণে আহলে কিতাব (ইহুদী ও খৃষ্টান) নবী (সাঃ) কে ভালোভাবে চিনলেও তাঁর অনুসরণ করতো না বলে তাদের এ চেনার কোনো মূল্য ছিলো না। মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: "যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা তাঁকে (নবী সাঃ) চেনে সেভাবে, যেভাবে তারা তাদের সন্তানকে চেনে।" (বাকারাহ: ১৪৬, আনআম: ২০)
কারণ, তাওরাত ও ইঞ্জিলে নবী (সাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিলো।যার কারণে তারা নবী (সাঃ)-এর আগমনের জন্য অপেক্ষাও করতো।
কিন্তু কুরআন কি বলেছে যে, সব জামানায় একজন ইমাম থাকা জরুরী? অবশ্যই। মহান আল্লাহ কিয়ামত সম্পর্কে বলেছেন "সেদিন আমরা প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামসহ ডাকবো।" (বনি ইসরাইল: ৭১)
এজন্যই সকল জামানায় একজন 'সত্য ইমাম' থাকা এবং তাঁর আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক। এই আনুগত্যের কারণে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামের সাথে ডাকা হবে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, তাহলে কি 'মিথ্যা ইমাম'ও হতে পারে? অবশ্যই। প্রত্যেক ব্যক্তি, যে এমন দীনের অনুসরণ করে যার অনুসরণের অনুমতি আল্লাহ তাকে দেননি;সে ব্যক্তি মিথ্যা ইমাম-এর অনুসারী এবং কিয়ামতের দিন তাকে উক্ত ইমামের সাথেই ডাকা হবে এবং তার সাথেই তাকে জাহান্নামে পাঠানো হবে। যেমন ফেরাউন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন- 'সে কিয়ামাতের দিন তার সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে এবং তাদেরকে নিয়ে সে আগুনে প্রবেশ করবে।' (হুদ: ৯৮)
প্রশ্ন হতে পারে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো মানুষের আনুগত্য করা কী জায়েজ? আনুগত্য পাওয়া শুধু আল্লাহরই অধিকার, যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের রিযিক দিয়েছেন এবং সকল প্রকার নেয়ামত প্রদান করেছেন। আর এজন্য মহান আল্লাহ আমাদেরকে যদি কোনো ব্যক্তির আনুগত্য করার আদেশ দেন,তাহলে তাঁর আনুগত্য করা আমাদের জন্য ওয়াজিব। ইরশাদ হচ্ছে- "আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর (কর্তৃত্বের অধিকারী) তাদের।" (নিসা: ৫৯)
তিনি আরো বলেছেন: "রাসুলকে এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছি যে আল্লাহর অনুমতিতে তাঁর আনুগত্য করা হবে।" (নিসা: ৬৪) রাসুলুল্লাহ্ (সা:)-এর আনুগত্য ওয়াজিব। একারণে যে আল্লাহ এব্যাপারে অনুমতি ও আদেশ দিয়েছেন।
এখন বুঝতে হবে আয়াতে উল্লেখিত 'কর্তৃত্বের অধিকারী' (উলিল আমর) কারা যাদের আনুগত্য আল্লাহ ওয়াজিব করেছেন?
যখন এই আয়াত নাযিল হয় তখন নবী (সাঃ)-কে 'উলিল আমর' বা 'কর্তৃত্বের অধিকারী' কাদেরকে বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তখন তিনি (সাঃ) বলেন, "উলিল আমর হচ্ছে আলী (আঃ) এবং ঐ ইমামগণ যারা তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে হবে" (ফারায়িদুস সামতাঈন)।
ফখরুদ্দীন রাযী তার 'তাফসীর-ই কাবীর' গ্রন্থে এই আয়াত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সকল জামানায় 'উলিল আমর' থাকা অত্যাবশ্যক। এ কারণে আয়াতে যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে,তাঁরা ঐ সকল লোক যারা সুদীর্ঘকাল ধরে ঈমান আনতে থাকবে। আর এ থেকে উলিল আমরের 'নিষ্পাপ' হওয়ার কথাটিও প্রমাণিত হয়ে যায়। কারণ এখানে তাঁদের আনুগত্যকে নবী (সাঃ)-এর আনুগত্যের সমান বলা হয়েছে। (তাফসীরে কাবীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা-৩৫৭)
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "আমার পরে ১২ জন আমীর হবেন, তাঁদের প্রত্যেকেই কুরাইশ থেকে।" (বোখারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নং-৬৭৯৬)
তিনি (সাঃ) আরও বলেছেন: "আমার পরে ১২ জন ইমাম হবেন, তাঁদের প্রত্যেকেই বনি হাশেম থেকে।" (ইয়ানাবিয়্যুল মুয়াদ্দাত, পৃষ্ঠা-৪৪৫, ইস্তাবুল)
ইবনে আরাবী স্বীয় কিতাব 'ইবক্বাউল ক্বাইয়্যিম'-এর ২৬৬ নং অধ্যায়ে লিখেছেন, "তোমরা নিঃসন্দেহে জেনে নাও মাহদী (আঃ) আত্মপ্রকাশ করবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর বংশধর এবং ফাতেমা (আঃ)-এর সন্তান হবেন। তাঁর পূর্বপুরুষ হুসাইন বিন আলী ইবনে আবিতালিব (আঃ)। তাঁর পিতা আল হাসান আল আসকারী, ইবনুল ইমাম আলী নাক্বী ইবনুল ইমাম মুহাম্মাদ তাক্বী ইবনুল ইমাম আলী রেযা ইবনুল ইমাম আল কাযিম ইবনুল ইমাম আস সাদিক, ইবনুল ইমাম আল বাক্কির ইবনুল ইমাম যায়নুল আবেদীন আলী ইবনুল ইমাম আল হোসাইন, ইবনুল ইমাম আলী ইবনে আবিতালিব (আঃ)। তাঁর নাম রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামে হবে। মুসলমানরা তাঁর হাতে বাইয়াত হবে রুক্ত ও মাকামের মাঝখানে...।
ইমাম মাহদী (আঃ) ইমাম হাসান আল আসকারী (আঃ)-এর সন্তান। তিনি ২৫৫ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর থেকে তাঁর পিতা তাঁকে শত্রুর ভয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখে ছিলেন। ২৬০ হিজরীতে শত্রুরা তাঁর পিতাকে গ্রেফতার করে হত্যা করে। এসময় আল্লাহ ইমাম মাহদী (আঃ)-কে রক্ষা করার জন্য তাঁকে অদৃশ্য করে ফেলেন। তিনি ২৬০ হিজরী থেকে ৩২৯ হিজরী পর্যন্ত স্বল্পকালীন অন্তর্ধানে ছিলেন। এই সময় তিনি একাদিক্রমে ৪ জন বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। অতঃপর ৩২৯ হিজরী থেকে এখনো পর্যন্ত তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় দীর্ঘ মেয়াদী অন্তর্ধানে বিরাজ করছেন। যখন আল্লাহর আদেশ হবে তখন তিনি মানবজাতিকে উদ্ধারের জন্য আবির্ভূত হবেন।
তাঁর এ দীর্ঘ জীবন কোনো আশ্চর্যজনক ও নতুন বিষয় নয়। বিশ্বাসীদের মধ্যে হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত খিজির (আঃ) এবং ইলিয়াস (আঃ) এবং ঈসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন লাভ করেছেন। আর অবিশ্বাসীদের মধ্যে ইবলিস (শয়তান) আর দাজ্জাল দীর্ঘ জীবন লাভ করেছে।
এ ধরনের হাদীস যাহাবী তাঁর 'সিআরু আলামুন নুবালা', খন্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৪১, শিবলাঞ্জী তাঁর 'নুরুল আবসার', পৃষ্ঠা ১৮৬ এবং সিত্ত ইবনে জওযী তাঁর 'তাক্বীরাতুল খাওয়াস' গ্রন্থের পৃষ্ঠা ৩৬৩ তে উল্লেখ করেছেন।
শিবলাঞ্জী ও ইবনে সাব্বাঘ মালিকী বলেছেন: "যখন মাহদী (আঃ) আত্মপ্রকাশ করবেন তখন তিনি কাবাগৃহে স্বীয় পিঠ ঠেকিয়ে অবস্থান নিবেন, আর তাঁর ৩১৩ জন পুরুষ তাঁকে আনুগত্য করবেন। সর্বপ্রথম তিনি এই আয়াতটি পাঠ করবেন: 'বাক্বিয়াতুল্লাহি খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম মুমিনীন' (হুদ: ৮৬) এবং বলবেন, 'আমিই বাক্বিয়াতুল্লাহ, আল্লাহর খলিফা এবং তোমাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কর্তৃত্বকারী।' যে কেউ তাকে সালাম করবে বলবে 'আসসালামু আলাইকা ইয়া বাক্বীয়াতুল্লাহি ফীল আরদ।' (নুরুল আবছার, পৃষ্ঠা ১৭২, আল-ফুসুলিল মুহিম্মা, অধ্যায় ১২)
ইমাম মাহদী (আঃ) অতঃপর তাঁর ৩১৩ জন বিশ্বস্ত সেনাপতি ও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তাঁর সাহায্যকারীদের দ্বারা এই পৃথিবীকে অন্যায় অত্যাচার থেকে মুক্ত করে পবিত্র করে দিবেন। এ সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) বলেছেন: 'মাহদী আমার আহলে বাইত থেকে হবে এবং পৃথিবীকে সেরূপে ন্যায় ও সাম্যে পূর্ণ করে দিবে যেরূপে অন্যায় ও অত্যাচারে তা পূর্ণ হয়ে পড়বে। (মুসনাদে আহমাদ, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩২৭)
ইমাম মাহদী (আঃ) এর আগমনের আলামত সম্পর্কে যে হাদীসগুলো রয়েছে তা পাঠ করার পর বুঝা যায় যে তাঁর আগমন অত্যাসন্ন। যেমন রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, "একদল লোক পূর্ব দিক থেকে বের হবে যারা তাঁর আগমনকে লক্ষ্য রেখে সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করবে।" (সুনানে ইবনে মাযা, খন্ড-২, হাদীস নং-৪০৮৮)
বর্তমান কালেও এর দুটো আলামত দেখা যাচ্ছে: ১. তাঁকে যারা বিশ্বাস করে এবং সাহায্য করতে চায় তাঁরা তাঁর আগমন ত্বরান্বিত হবার জন্য প্রতিদিন দোয়া করছে।
২. তাঁকে সাহায্য করবে এমন এক সৈন্যবাহিনীও মধ্যপ্রাচ্যে তৈরী হচ্ছে।
এভাবে আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ হুজ্জাতের মাধ্যমে সকল দীনের ওপর তাঁর নিজের দীনকে বিজয়ী করবেন "তিনিই তাঁর রাসুলকে পথ-নির্দেশ ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন যেন তাকে সকল দীনের ওপর বিজয়ী করতে পারেন, মুশরিকরা তা যতই অপ্রীতিকর মনে করুক।" (তওবা: ৩৩)
_________________________________________
ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব: একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস
শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে আপামর মুসলিম উম্মাহ ঐক্যমত্য পোষণ করে যে, মহানবী (সা.) এর বংশধারার সর্বশেষ ইমাম হচ্ছেন ইমাম মুহাম্মদ আল মাহদী (আ.), যিনি শেষ যামানায় আবির্ভূত হয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামী হুকুমত এবং ন্যায়বিচার কায়েম করবেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে অন্যায়-অত্যাচার ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন।
শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে আপামর মুসলিম উম্মাহ ঐক্যমত্য পোষণ করে যে, মহানবী (সা.) এর বংশধারার সর্বশেষ ইমাম হচ্ছেন ইমাম মুহাম্মদ আল মাহদী (আ.), যিনি শেষ যামানায় আবির্ভূত হয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামী হুকুমত এবং ন্যায়বিচার কায়েম করবেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে অন্যায়-অত্যাচার ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। তার আগমন অবশ্যম্ভাবী এবং এতে কোন সন্দেহ নেই। তার আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য শিয়া-সুন্নী হাদীস গ্রন্থসমূহে মহানবী (সা.) থেকে এতদপ্রসঙ্গে বর্নিত হয়েছে :
لو لم يبق من الدنیا إلا یوم لبعث الله رجلا مناّ یملأ¬ها عدلا کما ملئت جورا
“দুনিয়া ধ্বংস হতে মাত্র একদিনও যদি অবশিষ্ট থাকে তাহলে মহান আল্লাহ (ঐ একদিনের মধ্যেই) আমাদের (আহলে বাইতের) মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে অবশ্যই প্রেরণ করবেন যে এ পৃথিবী যেভাবে অন্যায়-অবিচারে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে ঠিক সেভাবে ন্যায় ও সুবিচার দিয়ে তা পূর্ণ করে দেবে।” (মুসনাদ-ই আহমদ ইবনে হাম্বল, ১ম খণ্ড, পৃ.৯৯, বৈরুত, দারুল ফিকর কর্তৃক প্রকাশিত)
মহানবী (সা.) হুযাইফা বিন ইয়ামানকে বলেন :
یا حذیفة لو لم يبق من الدنيا الا يوم لطول الله ذلک اليوم حتي يملک رجل من اهل بيتي، تجري الملاحم علي يديه و يظهر الاسلام لا يخلف وعده و هو سریع الحساب
“হে হুযাইফা! এ পৃথিবী ধ্বংস হতে মাত্র একদিনও যদি অবশিষ্ট থাকে তাহলে মহান আল্লাহ ঐ দিনকে এত বেশী দীর্ঘ করবেন যাতে আমার আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত এক ব্যক্তি (বিশ্বের) শাসন কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে সক্ষম হয় যার হাতে বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং ইসলাম ধর্ম বিজয়ী হবে । মহান আল্লাহ স্বীয় ওয়াদা ভঙ্গ করেন না এবং তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।” (ইকদুদ দুরার, আবু নাঈম ইস্ফাহানী প্রণীত সিফাতুল মাহদী)
মহানবী (সা.) বলেছেন :
لا تذهب الدّنیا حتی یملک العرب رجل من اهل بیتی یواطئ اسمه اسمی
“আমার আহলে বাইতের অন্তর্ভূক্ত এক ব্যক্তি-যার নাম হবে আমার নামের অনুরূপ, সে যে পর্যন্ত সমগ্র আরবের অধিপতি না হবে, সে পর্যন্ত এ দুনিয়া ধ্বংস হবে না।” (সুনান আত তিরমিযী, বৈরুত, দার ইহয়াইত তুরাস আল আরাবী, কিতাবুল ফিতান, ৫২তম বা মাহদী সংক্রান্ত অধ্যায়, পৃ ৬১১, হাদীস নং ২২৩০)
উপরিউক্ত এ সব সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, শেষ যামানায় কিয়ামতের পূর্বে ইমাম মাহদী (আ.)এর আগমন একটি অকাট্য বিষয় যা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। আহলে সুন্নাতের প্রসিদ্ধ হাদীস বিশারদগণ ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত অগণিত হাদীস ও রেওয়ায়েত অনেক সাহাবী ও তাবেয়ীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যা তাদের বড় বড় প্রামাণ্য ও প্রসিদ্ধ হাদীস ও ইতিহাসের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
গবেষক পণ্ডিত ও আলেমদের মতে, আহলে সুন্নাতের মুহাদ্দিসগণ মহানবী (সা.) এর তেত্রিশ জন সাহাবী থেকে ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত হাদীস নিজ নিজ হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন; একশ’ ছয় জন প্রসিদ্ধ সুন্নী আলেম গায়েব ইমাম মাহদীর আবির্ভাব সংক্রান্ত হাদীস নিজ নিজ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। বত্রিশ জন প্রসিদ্ধ সুন্নী আলেম ইমাম মাহদী (আ.) প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন।
ইমাম মাহদী (আ.), তার গুণাবলী এবং তার আবির্ভাবের নিদর্শন সংক্রান্ত ,মহানবী (সা.) এর হাদীসসমূহ আহলে সুন্নাতের প্রাচীন প্রামান্য ও নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থসমূহে এত অধিক পরিমাণে বিদ্যমান যে আহলে সুন্নাতের বড় বড় হাদীসশাস্ত্রবিদ ও হাফেয ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে মুতাওয়াতির অর্থাৎ অকাট্যসূত্রে প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত বলে মত প্রকাশ করেছেন।
আল্লামা শাওকানী, হাফেয আবু আবদিল্লাহ গাঞ্জী শাফেয়ী, হাদীসের প্রসিদ্ধ হাফেয ইবনে হাজার আল আসকালানী আশ শাফেয়ী, শেখ মানসূর আলী নাসিফ প্রমূখের মতো বিখ্যাত আলেম ইমাম মাহদী সংক্রান্ত হাদীসসমূহে মুতাওয়াতির বলে নিজ নিজ গ্রন্থে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
আল্লামা শাওকানী التوضیح فی تواتر ما جاء فی المنتظر অর্থাৎ প্রতীক্ষিত (ইমাম মাহদী) সংক্রান্ত হাদীস ও রেওয়ায়েতসমূহ মুতাওয়াতির হওয়ার ব্যাপারে ব্যাখ্যা’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি বলেছেন : “ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত যে সব হাদীস ও রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছি সেগুলোর সবই ‘তাওয়াতুর’ অর্থাৎ বহুল ও অকাট্যসূত্রে বর্ণিত হওয়ার পর্যায়ে উত্তীর্ণ । আর এ বিষয়টি হাদীসশাস্ত্র সংক্রান্ত যাদের সামান্য জ্ঞান আছে তাদের কাছে গোপন নয়। সুতরাং আমি যেসব হাদীস উদ্ধৃত করেছি সেগুলোর ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীসসমূহ মুতাওয়াতির…যা কিছু এখানে আলোচনা করা হল তা ঐ সব ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট যাদের অন্তরে সামান্যতম ঈমান ও ইনসাফ বিদ্যমান।”
তাই ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবে বিশ্বাসী নন বা ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয় অথবা শাব্দিকভাবে ‘হেদায়েতপ্রাপ্ত’ অর্থে ‘মাহদী’ শব্দের ব্যাখ্যা করে অথবা বলতে চায় যে, শেষ যামানায় ‘মাহদী’ নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি হবেন না; বরং প্রতি যুগের মুজাদ্দিদ বা ধর্ম সংস্কারক আলেমই হবেন মাহদী, এমনকি তিনি নিজেও হয়ত তা বুঝতে পারবেন না; তার মৃত্যুর পর জনগণ তার কর্মকাণ্ড, অবাদন ও কর্মবহুল জীবন অধ্যয়ন করে বুঝতে পারবে যে, তিনি মাহদী ছিলেন-তাদের উদ্দেশ্যে এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, তারা ঈমান, ইসলাম এবং আপামর মুসলিম উম্মাহর অন্যতম মৌলিক অকাট্য বিষয়কে অস্বীকার করেছে যা মুতাওয়াতির হাদীস ও রেওয়ায়েতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। আর ধর্মের অকাট্য বিষয়কে অস্বীকার করা ঈমান ও ইনসাফের পরিপন্থী। অতএব, ইমাম মাহদী সম্পর্কে গুটিকতক লোকের এ জাতীয় বিরল অভিমতের কোন তাত্বিক মূল্য নেই।
ইমাম মাহদী (আ.) আগমন এবং তিনি যে সকল অত্যাচারী কাফির- মুশরিক ও বিকৃত ধর্মের অনুসারীকে পরাস্ত করে বিশ্বব্যাপী ইসলামের সৌন্দর্যময় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামকে সকল ধর্ম ও মতবাদের ওপর বিজয়ী করবেন-এতদসংক্রান্ত বিশ্বাস মুসলিম উম্মাহ তথা সকল নিপীড়িত জনগোষ্ঠী ও জাতিকে অত্যাচারী শাসকচক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবার সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায়। ইরানের সফল ইসলামী বিপ্লব এবং লেবাননে ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর সফল প্রতিরোধ সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় আসলে ইমাম মাহদী (আ.) এর প্রতি বিশ্বাস থেকেই উৎসারিত। কারণ, সবার জানা আছে যে, ইরান ও লেবাননের আপামর জনগণ বারো ইমামী শিয়া যারা ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কেবল বারো ইমামী শিয়া মুসলমানরাই নয়; বরং সকল সুন্নী মুসলমানও শ্বাসরুদ্ধকর চলমান বিশ্বপরিস্থিতিতে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ওপর পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ও নাস্তিক্য পরাশক্তিসমূহের উপর্যুপরি চাপ, যুদ্ধ ও আগ্রাসনের কারণে উদ্ধারকর্তা ইমাম মাহদীর দ্রুত আগমন ও আবির্ভাবের প্রত্যাশী। এ বিশ্বাস সকল মাজহাব নির্বিশেষে গোটা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির মূর্ত প্রতীক।
শুধু মুসলমানরাই নয়, বিশ্বের সকল নিপীড়িত ও অধিকারহত জাতি অত্যাচারী শাসকবর্গের অন্যায়-অবিচারে অতীষ্ট হয়ে মহান মুক্তিদাতার আগমনের অপেক্ষা করছে যিনি তাদেরকে অন্যায়-অবিচারের তিমিরাধার থেকে মহামুক্তির আলোর পানে পথ দেখাবেন। তাই শেষ যামানার ইমাম মাহদী (আ.) তথা প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তার আগমনে বিশ্বাস ও মহামুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিঃসন্দেহে গোটা মানব জাতিকে এক মহান আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঐক্যবব্ধ করবে।
দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে আজ আবার নতুন করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তিকামী আন্দোলন জোরদার হচ্ছে এবং একের পর এক জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনসমূহে জনসমর্থন নিয়ে তারাই বিজয়ী হচ্ছে। ভেনেজুয়েলা, পেরু নিকারাগুয়া,ইকুয়েডর হচ্ছে এর জাজ্জ্বল্য উদাহরণ। অন্যদিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিপ্লবী প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদিনেযাদ ভেনেজুয়েলার কট্রর মার্কিনবিরোধী প্রেসিডেন্ট হুগো স্যাভেজকে ‘বিপ্লবী ভাই ও সঙ্গী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই অন্যায়, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মজলুম মুসলিম উম্মাহর সাথে বিশ্বের আপামর মজলুম জাতির বৃহত্তর পরিসরে ঐক্য ও সংহতি যে গড়ে উঠবে তা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে। আর এ সার্বিক ঐক্য ও সংহতি নিঃসন্দেহে ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের যুগে চূড়ান্ত বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করবে যা তার নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী ঐশী বিপ্লব এবং সত্য ও ন্যায়ের সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে।
ইমাম মাহদীর (আ.) সংক্ষিপ্ত জীবনী
নাম ও উপনাম :- এই মহান ব্যক্তির নাম সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার নাম ও উপনাম হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নামেই।
নাম :- মুহাম্মদ ।
উপনাম : আবুল কাসেম। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন “মাহদীর নাম আমার নামেই” অনুরূপ ভাবে হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে “মুহাম্মদ” মাহদীর নাম। (বোরহান ফি আলামতে মাহদী আখেরী যামান, মুত্তাকী হিন্দি, ৩য় অধ্যায় হাদিস নং ৮,৯।)
উপাধী :- তার বিভিন্ন উপাধীর মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্ল্যেখযোগ্য হচ্ছে মাহদী, কাসেম, সাহেবুজ্জামান, সাহেবুল আমর , মুনতাজার ও হুজ্জাত । তবে তিনি মাহদী নামেই অধিক পরিচিত। এটি তার সু প্রসিদ্ধ নাম। তাকে ‘মাহদী’ বলা হয়েছে এ কারণে যে, তিনি নিজে হেদায়েত প্রাপ্ত এবং অন্যদেরকে সঠিক পথে হেদায়েত দান করবেন। তাকে ‘কায়েম’ বলা হয়েছে কেননা তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন। তাকে ‘মুনতাজার’ বলা হয়েছে কেননা সকলেই তার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে। তাকে ‘বাকিয়াতুল্লাহ’ বলা হয়েছে কেননা তিনি হচ্ছেন আল্লাহর হুজ্জাত। হুজ্জাত অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর স্পষ্ট দলিল ।
পিতা : ইমামতের আকাশের একাদশতম নক্ষত্র হযরত ইমাম হাসান আসকারী (আ.)।
মাতা : সম্মানীতা ও সম্ভ্রান্ত রমণী নারজীস। তিনি ছিলেন রোম সম্রাটের দৌহিত্রা।
জন্ম :- ২৫৫ হিজরীর ১৫ই শাবান ইরাকের সামেররা শহরে । হযরত মাহদীর (আ.) জন্ম ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। যা মনে অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে। হযরত হাসান আসকারী (আ.) ইরাকের সামেরায় জীবন যাপন করতেন। ইমামকে আব্বাসী খলিফা মুতাওয়াক্কেল নজর বন্দী করে রাখত। মাঝে মধ্যেই খলিফার কর্মচারীরা ইমামের বাড়ী হানা দিত। তাকে খলিফার দরবারে জোর করে নিয়ে যেত এবং বিভিন্নভাবে তার উপরে নির্যাতন চালাত। (বিহারুল আনওয়ার, ৪র্থ খণ্ড, হাদীস নং-৯৩।)
ইমাম মাহদী (আ.) এর জন্ম সম্পর্কে ঐ সময়ের মুসলমানরা এমনকি শাসকরা পর্যন্ত জানতো যে, ইমাম আসকারী (আ.) এর ঔরসে এক মহামানব জন্ম গ্রহন করবেন। যিনি সমস্ত অন্যায়, অবিচার জুলুম অত্যাচারকে সমুলে উপড়ে ফেলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এই কারণে তারা ইমামের উপর বিভিন্ন কঠোরতা, অবরোধ আরোপ করে। যেন তাকে নিঃশেষ করে ইমাম মাহদী (আ.) এর জন্ম ও ইমামতের ধারাকে রুখতে পারে। (শেখ তুসি, কিতাবুল গেইবাত, পৃ. ২৩১।)
ইমাম আসকারী (আ.) তার ঘনিষ্ঠ জনদের কে তার পরবর্তী ইমামের দুনিয়ায় আগমনের সংবাদ দিয়ে বলতেন শিঘ্রই আল্লাহ আমাকে একজন সন্তান দান করবেন এবং আমাকে তার দয়া ও অনুকম্পার অন্তর্ভুক্ত করবেন। আরও বলতেন যে, কোন শক্তিই কোন ষড়যন্ত্রই মহান আল্লাহ তা’আলার এই ইচ্ছাকে রুখতে পারবেনা। আল্লাহর অঙ্গিকার পূর্ণ হবেই। অন্যদিকে শত্রুরাও তাদের সমস্ত শক্তি সামর্থ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল। যেন আল্লাহর এই অঙ্গিকার পূর্ণতা না পায়। তারা ইমামকে সম্পূর্ণ নজর বন্দী করে রাখে, এমনকি তার বাড়িতে তার সঙ্গী-সাথী, আত্মীয় স্বজন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের যাওয়া আসা ও নিয়ন্ত্রন করতো । কিছু কর্মচারীকে শুধুমাত্র এই কারণে নিযুক্ত করে রেখেছিল যে, যদি কোন ছেলে সন্তানকে ইমামের বাড়িতে ভূমিষ্ট হতে দেখে তাহলে যেন তাকে হত্যা করে। (ইয়ানাবিউল মুয়াদ্দাহ, হাফিজ সুলাইমান,পৃ. ৪৫৫।) এত কিছুর পরে ও নারজেস খাতুন গর্ভবতী হন, শুধুমাত্র ইমাম এবং তার বিশেষ কিছু সঙ্গী সাথী ও নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ এ খবর জানতো না ।
এটা ও সত্য এবং প্রমানিত যে, ইমাম আসকারী (আ.) বিষাক্রান্ত হয়ে দুনিয়া থেকে চলে যান। তার দাফন কাফন ও জানাযায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহন করেছিল এবং জনগনের সম্মুখেই তাকে কবর দেয়া হয়। ইমাম মাহদী (আ.) এর জন্ম হয়েছে এ কথা মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। কেননা এটা অসম্ভব ব্যপার যে, তার পিতা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন অথচ তার জন্ম হয়নি অথবা তার পিতার মৃত্যুর সময় তিনি মাতৃগর্ভে ছিলেন এবং পিতার মৃত্যূর কিছু কাল পর ভুমিষ্ট হয়েছেন। কেননা এটা কখোনই সম্ভব নয় যে, একজন মানুষ মারা যাবে আর তার সস্তান যে তার রক্ত মাংশে মিশে আছে শত শত বছর পর জন্ম নিবে। নিঃসন্দেহে ইমাম মাহদী (আ.) ভুমিষ্ট হয়েছেন এতে কোন সন্দেহ, সংশয় নেই এবং তিনি এখন পর্যন্ত জীবিত আছেন এবং আল্লাহর নির্দেশে লোক চক্ষুর অন্তরালে আত্মগোপন করে আছেন। এটা ও সম্ভব পর নয় যে, তিনি আত্মপ্রকাশের পূর্বেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিবেন। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও মহামানব রাসূল (সা.) এর সাথে ইমাম মাহদীর বেশ কিছু বিষয়ে চমৎকার মিল পাওয়া যায়। মহানবী (সা.) যেমন সর্বশেষ নবী তেমনি ইমাম মাহদী ও সর্বশেষ ইমাম। মহানবী (সা.) এর শুভাগমন সম্পর্কে যেমন পূর্ববর্তী নবী বা রাসূলগণ ভবিষ্যৎ বাণী করে গেছেন, তেমনি ইমাম মাহদী (আ.) এর আগমন সম্পর্কেও মহানবী (সা.) এবং পূর্ববর্তী ইমামগণ বাণী রেখে গেছেন।
প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদীকে সাধারণত ‘ইমামুল আসর’ বা নির্দিষ্ট সময়ের ইমাম এবং সাহিবুজ্জামান বা জামানার নেতা বলা হয়। জন্মের পর মহানবী (সা.) এর নামেই তার নাম রাখা হয়। তিনি জন্মের পর থেকে তার শ্রদ্ধেয় পিতা ইমাম আসকারী (আ.) এর প্রত্যক্ষ ও বিশেষ তত্ত্বাবধানে ছিলেন। স্বৈরশাসকের হুমকীর কারণে ইমামে মাহদীর (আ.) জন্মের খবর গোপন রাখা হয়েছিল। কারণ আব্বাসীয় শাসকরা ইমামের বংশ ধারকে ধ্বংস করে ফেলার জন্য প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে হন্যে হয়ে খুজছিল। বাড়ি বাড়ি তল্লাশী করে খুজে বের করার জন্য ওরা গোপন ঘাতক বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল। তাই স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা শিশু ইমামকে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা ও সুরক্ষিত রেখেছিলেন।
ইমাম মাহদীর (আ.) জন্ম স্বাভাবিক না কি অলৌকিক
শেখ তুসী বলেন এটা একটা মামুলী এবং সাধারণ ব্যাপার। এই ঘটনা প্রথম এবং শেষ নয় মানব জীবনের দীর্ঘ ইতিহাসে এর অনেক নমুনা রয়েছে। যেমন হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর জন্ম নমরুদের চোখের অন্তরালে, হযরত মুসা (আ.) এর জন্ম ফেরাউনের চোখের আড়ালে, হযরত ঈসা (আ.) এর জীবিত থাকা। (শেখ তুসি , কিতাবুল গেইবাত, পৃ. ২৩৭।)
যখন ইমাম মাহদী (আ.) এর ভুমিষ্ঠ হবার সংবাদ তার পিতা ইমাম হাসান আসকারীর নিকট পৌছাল তিনি অত্যান্ত খুশী হলেন শুধু তিনিই নয় এ ধরনী যেন আনন্দে মেতে উঠল। আসকারী (আ.) নবজাতককে কোলে নিলেন এবং তার ডানকানে আজান ও বাম কানে এক্বামত দিলেন। সর্বপ্রথমে যে ধ্বনী নবজাতকের কানে পৌছল তা “আল্লাহু আকবার” ও “লা ইলাহা ইল্লাললাহু ছিল” । এই ভাবে বান্দাদের জন্য আল্লাহর ওলী তৎকালীন জালেম শাসকের প্রতিবন্ধকতা সত্বেও, যারা তাকে পেলে হত্যা করতো, জন্মগ্রহন করলেন।
হাকিমা ইমাম আসকারী (আ.) এর ফুফু তাকে কোলে তুলে নিলেন এবং চুমু দিলেন তিনি বলেন আমি তার থেকে এমন এক সুগন্ধ পাচ্ছিলাম যা আগে কখোন অনুভব করিনি। ইমাম আসকারী (আ.) পুণরায় তাকে হাকিমার কোল থেকে নিলেন। এবং বললেন তোমাকে এমন এক জনার আশ্রয়ে রাখবো যার আশ্রয়ে হযরত মুসা (আ.) এর মাতাও তার সন্তানকে রেখেছিলেন। তুমি সর্বক্ষণ আল্লাহর হেফাজতে থেকো। অতপর হাকিমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন : “এই ফুফু তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দাও এবং এই নবজাতকের সংবাদ কাউকে দিওনা গোপন রাখ যতক্ষন না উপযুক্ত সময় আসে”। (বিহারুল আনওয়ার, ১৩তম খণ্ড, পৃ.৭।)
ইমামত
ইমাম আসকারী (আ.) এর মৃত্যূর সময় ইমাম মাহদী (আ.) এর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। অর্থাৎ ৫ বছর বয়স থেকেই তিনি ইমামত প্রাপ্ত হন। দেশের মারাত্মক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাকে জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়। তখন তিনি আল্লাহর হুকুমে অদৃশ্য অবস্থানে (গায়েব) চলে যান। তার ফলে আব্বাসীয়রা তাকে খুজে বের করে হত্যা করতে পারেনি। গায়েব অবস্থায় ইমাম মাহদী তার কতিপয় বিশিষ্ট প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের জন্য নিজের বাণী প্রকাশ করেন। জনসাধারণকে ধর্মবাণী ও উপদেশ প্রদানের জন্য ইমাম তার পিতা ও পিতামহের এককালীন ঘনিষ্ঠ সহচর উসমান ইবনে সাঈদ আল আমরীকে নিজের বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। তার মাধ্যমেই ধর্মপ্রাণ অনুসারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব ও সমস্যার সমাধান দেয়া হতো। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র মুহাম্মদ ইবনে উসমান আল আমরী ডেপুটির দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এভাবে পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আবুল কাসিম আল হোসাইন ইবনে রুহ আল নওবখতি, আলী ইবনে মুহাম্মদ আস সামুরী। ৩২৯ হিজরীতে আস সামুরীর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে গায়েব অবস্থান থেকে ইমাম মাহদী এক ঘোষণা প্রদান করেন যে, ছয় দিনের মধ্যে আস সামুরী মারা যাবেন এবং সেই সাথে ইমামের প্রতিনিধিত্ব স্থগিত হয়ে যাবে। এখন হতে ইমাম আবার অদৃশ্য অবস্থানে চলে যাবেন।
ইমাম মাহদীর (আ.) গায়িব (অন্তথর্ধান) দু’ভাগে বিভক্ত
প্রথমত : গায়িবাতে সুগরা (স্বল্পকালীন অন্তর্ধান) : প্রথম গায়িব অবস্থার শুরু হয় ২৬০ হিজরীর (৮৭২ খ্রি.) রবিউল আউয়াল মাসে এবং তা শেষ হয় ৩২৯ হিজরীতে (৯৩৯ খ্রি.)শাওয়াল মাসে। প্রথম গায়িব সময়কাল ছিল ৭০ বছর।
দ্বিতীয়ত : গায়িবাতে কুবরা (দীর্ঘকালীন অন্তর্ধান) : দ্বিতীয় প্রধান গায়িব শুরু হয় ৩২৯ হিজরীতে এবং আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা ততদিন এ অবস্থানকে বলবৎ রাখবেন। নির্ভর যোগ্য বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, মহা নবী (সা.) বলেছেন- “এ বিশ্বজগত ধ্বংস হওয়ার জন্য যদি একটি দিনও অবশিষ্ট থাকে, তাহলে মহান আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই সে দিনটিকে এতবেশী দীর্ঘায়ীত করবেন, যাতে আমার সন্তান মাহদী (আ.) আত্মপ্রকাশ করতে পারে এবং অন্যায় অত্যাচারে পরিপূর্ণ এ পৃথিবীতে সম্পূর্ণরূপে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” (বিহারুল আনওয়ার, ৫১তম খণ্ড, পৃ. ৩৬০ থেকে৩৬১। শেখ তুসি, কিতাবুল গেইবাত, পৃ. ২৪২।)
ইমাম মাহদীর হায়াত দীর্ঘায়িত হওয়া কিভাবে সম্ভব ?
অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন, ইমাম মাহদীর হায়াত দীর্ঘায়িত হওয়া কিভাবে সম্ভব ? এর জবাবে বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ.), হযরত খিজির (আ.) ও হযরত নূহ (আ.) ও অন্যরা যেভাবে দীর্ঘজীবি হয়েছেন এবং তাদের কেউ কেউ এখনো জীবিত আছেন, হযরত মাহদী (আ.) এর দীর্ঘ জীবনের বিষয়টিও অনুরূপ। কোরআন মজীদে এ ধরনের অলৌকিক ঘটনার অনেক উদাহরণ আছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা হযরত ওজাইর (আ.) কে পৃথিবী থেকে নিয়ে যান এবং পুনরায় জীবিত করেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) একটি পাখি টুকরা টুকরা করে বিভিন্ন পাহাড়ে রেখে আসেন। পরে আল্লাহর হুকুমে ঐ পাখিকে আহবান করলে তা উড়ে আসে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর জন্য আগুন অদাহ্য ও আরামদায়ক হয়ে যায়। হযরত ঈসা (আ.) পিতাবিহীন জন্মগ্রহণ করেন এবং এখনো পর্যন্ত তিনি জীবিত অবস্থায় আছেন, তিনিই আবার মৃত লোকদের জীবিত করতেন। হযরত মুসা (আ.) এর হাতের লাঠি অজগর সাপে পরিণত হয়, পাখি ও পিপিলিকার সাথে হযরত সোলাইমান (আ.) কথা বলেন, হযরত খিজির (আ.) আজ অবধি জীবিত আছেন। এসব বিষয় মুসলমানরা বিশ্বাস না করে পারেনা। একজন বিশ্বাসী তথা আত্ম সমর্পিত ব্যক্তি অর্থাৎ একজন মোমিন বিনা বাক্য ব্যয়ে এ ঘটনাগুলোকে বিশ্বাস করে। কাজেই ইমাম মাহদী (আ.) এখনো জীবিত থাকার ব্যাপারে বিস্মিত ও অবাক হওয়ার মতো কিছু নাই।
বিভিন্ন গবেষণায় নিশ্চিত হয়ে বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, “বার্ধক্যে উপনীত হওয়া যা মূলত এক ধরনের রোগ। আর বয়স কমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে সঠিক খাদ্যের অভাব, দুষিত বায়ু সেবন, মানসিক অশান্তি বা এক কথায় মানুষের জীবন ধারণের মানবিক ও বস্তুগত পরিবেশের ধরণ ও প্রকৃতি। কাজেই পরিবেশের পরিবর্তন সাধন করে কারো দীর্ঘ জীবন লাভ করা সম্ভবপর বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। জার্মানী ডাক্তার হাভার্ট লিখেছেন যে, বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞান খাদ্য বিজ্ঞানের সহায়তায় বয়সের সীমা এর চেয়ে আরো অধিক দীর্ঘ করতে পারে।
মিশরীয় ম্যাগাজিন ‘আল মুকতাতাফ’ ১৯৮০ সালের তৃতীয় সংখ্যায় লিখেছে, বিশ্বস্ত মনীষিরা লিখেছেন, প্রাণীর দেহের পুরো কাঠামো এতখানি স্থায়িত্বের অধিকারী যে, মানুষ কোনো উপসর্গের আঘাত না আসলে হাজার হাজার বছর জীবিত থাকতে পারে। কাজেই বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষের জীবন দীর্ঘায়িত হওয়ার বিষয়টি সম্ভব।
অন্যান্য ধর্মে হযরত মাহ্দীর উপর বিশ্বাস
ইমাম মাহ্দী (আ.) যে শেষ যামানায় আবির্ভূত হবেন শুধুমাত্র মুসলমানরাই নয় বরং অন্যান্য দীন যেমন ইহুদী, খৃস্টান, অগ্নিপূজক, হিন্দু সবাই আল্লাহর পক্ষ হতে একজন ঐশী সংস্কারকের আবির্ভাবের বিষয়টি স্বীকার করে এবং তাদের ধর্ম গ্রন্থ এরূপ ব্যক্তির আগমনের ঘোষণা দিয়েছে। তারা ও তাঁর অপেক্ষায় দিন গুনছে। পবিত্র তৌরাত ,যাবুর ,ইঞ্জিল এমনকি হিন্দুদের গ্রন্থে এবং অগ্নিপুজকদের গ্রন্থেও ইমাম মাহ্দী সম্পর্কে ঈঙ্গিত করা হয়েছে। তবে প্রত্যেকেই তাকে ভিন্ন নামে চিনে থাকে। অগ্নিপুজকরা তাকে “ সুশিনাস ” অর্থাৎ বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতা ,খ্রীষ্টানরা তাকে “ মাসিহ মাওউদ ” এবং ইহুদিরা তাকে “ সারওয়ারে মিকাইলি ” নামে আখ্যায়িত করেছেন।
হিন্দু ধর্মের “দিদ” নামক ধর্মীয় গ্রন্থে এভাবে লেখা হয়েছে যে : এই পৃথিবী মন্দে (অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, অন্যায়, অবিচার) পূর্ণ হওয়ার পর শেষ জামানায় একজন বাদশাহ্ আসবেন যিনি সৃষ্টি কূলের জন্য পথ প্রদর্শক হবেন। তার নাম মানসুর বা সাহায্যপ্রাপ্ত। সমস্ত পৃথিবীকে তিনি তার হাতের মুঠোয় নিয়ে আসবেন। কে মু’মিন আর কে কাফের চিনতে পারবেন। আর তিনি আল্লাহর কাছে যা কিছুই চাইবেন আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিন তাই তাকে দিবেন।
যারথুষ্ট্র ধর্মের প্রবক্তা যারথুষ্ট্রের এক শিষ্যের লেখা “জামাসব” নামক বইতে এভাবে উল্লেখ আছে যে : আরবের হাশেমী বংশ থেকে এমন এক লোকের আবির্ভাব হবে যার মাথা, দেহ ও পা যুগল হবে বিশালাকারের। তাঁর পূর্বপূরুষের দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ঐ ব্যক্তি বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে ইরানে আসবে এবং এই দেশকে সুখ-শান্তি, সত্য ও ন্যায়ে পূর্ণ করবেন। আর তাঁর ন্যায় পরায়ণ শাসনে বাঘ ও ছাগল একই ঘাটে পানি পান করবে।
যারথুষ্ট্রদের ধর্মীয় গ্রন্থ “যানদ”-এ বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় ইয়ায্দানদের (অগ্নিপূজকদের খোদাদের) পক্ষ হতে বড় ধরনের বিজয় আসবে এবং আহরিমানকে (অশুভ আত্মাকে বা শয়তানকে) নিশ্চিহ্ন করবে। আর পৃথিবীতে আহরিমানের (শয়তানের) সমস্ত অনুচরদেরকে নিরাশ্রয় করা হবে। ইয়াযদানদের বিজয় ও আহরিমানের পরাজয়ের পর এই পৃথিবী তার প্রকৃত পূর্ণতায় পৌঁছাবে এবং আদম সন্তানরা সৌভাগ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবে।
তওরাতে “সেফরে তাকভীন” হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশ থেকে যে বারজন ইমাম আসবেন, তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে : ‘ইসমাইলের জন্য তোমার দোয়া শুনেছি এ কারণে তাকে বরকতময় করেছি এবং বংশধরের মধ্যে বারজন নেতার আবির্ভাব ঘটাব এবং তাকে বিশাল উম্মত দান করব।’
হযরত দাউদ (আ.)-এর মাযামিরে উল্লিখিত হয়েছে : ‘অবশ্য সৎকর্মশীলদেরকে মহান আল্লাহ্ সাহায্য করবেন ... সৎকর্মশীলরা এমন এক ভূমির উত্তরাধিকারী হবে যার মধ্যে তারা স্থায়ী হবে।’
__________________________________________
ইমাম মাহদী (আ.) — বৈশ্বিক নিরাপত্তার একমাত্র পথ
✍️ মইনুল হোসেন
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মানবসভ্যতার অগ্রগতি হলেও মানুষের দূর্দশা এবং বিশ্বময় অস্থিরতা কোনোভাবেই কমছে না। যুদ্ধ, সন্ত্রাস, হত্যা, দূর্নীতি, লুণ্ঠন, বিশৃঙ্খলা, দারিদ্রতা, মূল্যবৃদ্ধি, জীবিকা সংকট—এসবই দিন দিন মানুষের কষ্ট ও যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই যে, পৃথিবীতে যত নৈরাজ্য তার সবই মানবজাতির অন্যায় ও পাপাচারের পরিণাম। যদিও মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে অনেক আগেই এই কঠোর বাস্তবতার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন:
“মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।” [সূরা রুম (৩০), আয়াত ৪১]
স্বভাবগতভাবে আমরা যেকোনো দূর্দশার জন্য অন্যকে দোষারোপ করি এবং নিজেকে নির্দোষ মনে করি। প্রশ্ন হলো, যদি সবাই নির্দোষ হয়, তবে অপরাধী কে? বাস্তবতা হলো, আমরা সবাই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে এইসব দূর্দশার জন্য কমবেশী দায়ী। আল্লাহর রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল।”
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী দায়বদ্ধ করা হয়েছে। বরং মানুষের ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, তা তার ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম। যদি সংস্কার বা উন্নয়ন আমাদের সাধ্যের মধ্যে না থাকত, তবে তা আমাদের দায়িত্বও হতো না। আমাদের দায়বদ্ধতা আমাদের সামর্থ্যের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ—তা হোক একটি শহর, একটি গ্রাম, একটি এলাকা বা একটি ঘর। যদি আমরা সম্পূর্ণ অসহায় বা ক্ষমতাহীনও হই, তবুও অন্তত আমাদের নিজেদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে। আমরা অবশ্যই নিজেদের সংশোধনের পদক্ষেপ নিতে পারি।
আজ যদি আমরা অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজেদের দিকে তাকাই এবং নিজেদের অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ ও প্রশিক্ষিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, তবে ধীরে ধীরে এর প্রভাব সবার সামনে দৃশ্যমান হবে। পর্যায়ক্রমে আমাদের ঘরগুলো শান্তিময় হবে, আমাদের এলাকা নিরাপদ হবে এবং আমাদের শহর ও গ্রামগুলো উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। যখন আমরা অনিষ্ট থেকে সংস্কারের দিকে, পাপ থেকে পুণ্যের দিকে, মন্দ থেকে ভালোর দিকে অগ্রসর হবো-তখন আমরা দেখতে পাব যে আমাদের আতঙ্ক-ভয়, অভাব-অভিযোগ সবই নিরাপত্তা ও সচ্ছলতায় রূপান্তরিত হচ্ছে।
বিপর্যয় বা ফিতনার কথা উঠলেই সাধারণত মাথায় পাপাচারের চিন্তা আসে— যেমন মিথ্যা বলা, গিবত করা, অপবাদ দেওয়া, ওয়াজিব কাজ ত্যাগ করা এবং হারাম কাজ আঞ্জাম দেওয়া। এই সবই নিকৃষ্ট পাপ। মহান আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার অধিকার কারো নেই। আল্লাহর প্রতি আমাদের অবাধ্যতাই আমাদের সকল সমস্যা ও কষ্টের মূল কারণ। কিন্তু মানুষের সবচাইতে বড় বিপর্যয় এবং সবচাইতে বড় পাপ হলো আল্লাহর পবিত্র প্রতিনিধি বা খলিফাকে অস্বীকার করা, যার প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রদর্শন করা সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই অবাধ্যতার ক্ষেত্রে বা তাঁর নেতৃত্বের (বিলায়াত) প্রতি উদাসীন থাকার ক্ষেত্রে কাউকে কোনো অজুহাত দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
একটি হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
“সর্বশ্রেষ্ঠ আনুগত্য হলো আমার একত্ববাদ স্বীকার করা, আমার নবীর নবুওয়াতকে সত্যায়ন করা এবং নবীর মাধ্যমে মনোনীত প্রতিনিধিদের সামনে আত্মসমর্পণ করা; আর তারা হলেন আলী ইবনে আবি তালিব এবং তাঁর বংশধর থেকে পবিত্র ইমামগণ।”
অন্য একটি হাদিসে কুদসিতে ঘোষিত হয়েছে:
“হে মুহাম্মদ! আমার কোনো বান্দা যদি ধূলিকণার মতো ক্ষুদ্র হওয়া বা শুকিয়ে যাওয়া গাছের মতো হওয়া পর্যন্ত আমার ইবাদত করে, কিন্তু তোমার ও তোমার আহলে বাইতের নেতৃত্বের (ইমামত) প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়ে আমার কাছে আসে, তবে আমি তাকে কখনোই ক্ষমা করব না। যতক্ষণ না সে তোমাদের নেতৃত্ব স্বীকার করে নেবে।”
প্রথম হাদিসটিতে আহলে বাইতের (আ.) নেতৃত্ব স্বীকার করাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয়টিতে তা অস্বীকার করাকে ক্ষমার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। বরং আহলে বাইতের নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করা মানে হলো সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে ফেলা।
সূরা ইউনুসের মধ্যে হযরত ইউনুস (আ.)-এর জাতির ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নবীর প্রতি ক্রমাগত অবাধ্যতার ফলে সেই জাতির ওপর খোদায়ী আযাব ঘনিয়ে এসেছিল। কিন্তু যখন তারা অন্তরের গভীর থেকে অনুতপ্ত হলো এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত হয়ে তাঁর অনুগত বান্দা হলো, তখন সেই আযাব দূর হয়ে গেল।
আমাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই উম্মতের কষ্ট ও দুর্যোগ তখনই শেষ হবে, যখন মানুষ ভণ্ড ও স্বঘোষিত খলিফা ও নেতাদের ত্যাগ করে আহলে বাইতের (আ.) দরবারে ফিরে আসবে। যেদিন এই জাতি আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত এবং রাসূল (সা.) কর্তৃক পরিচিত ইমামের নেতৃত্বকে মনে-প্রাণে স্বীকার করবে এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ অনুগত হবে, সেদিন এক আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে। হাদিসের ভাষায়: “পৃথিবী যেভাবে অন্যায় ও অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই তা ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
আজ আমাদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আল্লাহ মনোনীত মাসুম ইমামগণের (আ.) ওপর বিশ্বাস রাখা এবং তাঁদের শত্রুদের ঘৃণা করা। তদুপরি, অন্যদেরও এই পবিত্র ব্যক্তিত্বদের দিকে আহ্বান করা— যে ধারার সূচনা আমিরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-কে দিয়ে এবং সমাপ্তি হুজ্জাত ইবনুল হাসান ইমাম মাহদী (আ. ফা.)-এর মাধ্যমে।
_________________________________________
ইমামে জামানা (আ.)–এর কথা ভাবলে আমার মনে প্রথম যে অনুভূতিটি জাগে, তা হলো অপেক্ষা। এ অপেক্ষা কোনো নির্দিষ্ট দিনের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, কোনো উৎসবের ক্যালেন্ডারেও আটকে থাকে না। এটি প্রতিদিনের, প্রতিক্ষণের, আমার শ্বাস–প্রশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর আত্মিক অবস্থা। জন্মদিন সেই অনুভূতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে মাত্র; কিন্তু আকাঙ্খাটি জন্ম নেয় প্রতিদিন।
আমি প্রতিদিনই ইমামের সঙ্গে কথা বলতে চাই। উচ্চস্বরে নয়, ভাষার জাঁকজমকেও নয়—বরং নীরবতায়, নিজের ভাঙা অন্তরের গভীরতম স্তর থেকে। এমন অনেক কথা আছে, যা মানুষের সঙ্গে বলা যায় না; এমন অনেক কষ্ট আছে, যা শব্দ ধারণ করতে পারে না। সেসব কথার ঠিকানাই আমার কাছে ইমামে জামানা (আ.)।
এই দুনিয়াকে দেখলে মনে হয়, মানুষ পথ হারিয়ে ফেলেছে। জুলুম এখন শুধু শক্তিশালীদের অস্ত্র নয়, নীরব মানুষের সম্মতিও পেয়েছে। সত্য জানার পরও চুপ থাকা যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমি নিজেও এই সমাজেরই একজন—এই উপলব্ধি আমাকে বারবার লজ্জিত করে। প্রতিদিন আমি নিজেকে প্রশ্ন করি: হে আমার ইমাম, আপনি এলে আমি কোথায় দাঁড়াবো? দর্শকের কাতারে, না দায়িত্বশীলের সারিতে?
এই প্রশ্নই আমার প্রতিদিনের ইন্তিজারকে অর্থবহ করে তোলে। কারণ ইন্তিজার শুধু চোখে রাস্তা চেয়ে থাকা নয়; ইন্তিজার মানে নিজের ভেতরের অন্যায়গুলোকে চিহ্নিত করা, নিজের সুবিধাবাদিতাকে ভাঙা, আর ধীরে ধীরে ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস গড়ে তোলা।
আমি জানি, আমি দুর্বল। আমার আমল কম, ধৈর্য সীমিত, আর ভয় অনেক। তবুও এই দুর্বলতা নিয়েই আমি আপনার দিকে তাকিয়ে থাকি, হে আমার ইমাম। কারণ ইন্তিজার নিখুঁত মানুষদের কাজ নয়; ইন্তিজার ভাঙা মানুষদের আশ্রয়। যারা জানে—নিজেদের ঠিক করতে না পারলে, আপনার আগমন শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হয়েই থেকে যাবে।
আমি চাই, আপনি এলে অন্তত লজ্জায় মাথা নিচু করতে না হয়। চাই, আমার নীরবতাগুলো যেন কাপুরুষতা না হয়, আমার অপেক্ষা যেন অলসতা না হয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র হলেও অবস্থান নেওয়ার চেষ্টায়—এইভাবেই আমি নিজেকে আপনার জন্য প্রস্তুত করতে চাই।
হে ইমামে জামানা (আ.), আপনি হয়তো এখনও আড়ালে আছেন, কিন্তু আমার জীবনের বাইরে নন। আমার দোয়ার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে, আমার বিবেকের প্রতিটি প্রশ্নে আপনি উপস্থিত। এই প্রতিদিনের অপেক্ষাই আমার ইবাদত, আমার আত্মশুদ্ধির পথ, আর আমার একমাত্র আশা—একদিন আপনি আসবেন, আর আমি বলতে পারব: হে আমার ইমাম, আমি অন্তত চেষ্টা করেছিলাম।
__________________________________________
মারেফাত (জ্ঞান বা প্রজ্ঞা):ইমাম মাহদী (আঃ)
✍️ রাজা আলী
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ভূমিকা:
মারেফাত' শব্দের অর্থ হলো জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বা ইন্দ্রিয়লব্ধ পরিচয় লাভ করা। এটি আরবি 'আরাফা' (عرف) শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার মানে জানা বা জ্ঞান লাভ করা। সুফিবাদে মারেফাত শব্দ টি বহুল প্রচলিত।সেখানে শব্দটি বাহ্যিক জ্ঞানের পরিবর্তে আধ্যাত্মিক ও গভীর উপলব্ধিকে বোঝায়, যা হৃদয় থেকে ঈশ্বরকে জানা বা চেনার জ্ঞানকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
মারেফাত শব্দের তাৎপর্য:
আল্লাহর নবী (স:) বর্ণিত ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কিত একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে "মারেফাত" শব্দটি এসেছে। যেখানে তিনি বলেছেন -
"যে ব্যক্তি তার যুগের ইমামের মারেফাত (জ্ঞান, প্রজ্ঞা) ব্যতীত মৃত্যু বরণ করবে,তার মৃত্যু পথভ্রষ্টের মতোই হবে।"
সুতরাং "মারেফাত" শব্দটির অর্থ ব্যাপ্তি ও গভীরতার কারণে বোঝা যায় যে, এ যুগে আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইমাম মাহদী আঃ এর বিষয়ে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জন এবং বাহ্যিক জ্ঞানের ক্ষেত্রকে ছাড়িয়ে গভীর উপলব্ধি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রচেষ্টা চালানো।তাই ইমাম মাহদী (আঃ)এর প্রতি মারেফাত অর্জন নিছক তাঁর সম্পর্কে প্রাথমিক কয়েকটি তথ্য জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ইমাম মাহদী (আঃ) এর প্রতি সঠিক মারেফাত অর্জন করতে না পারলে মানুষের মৃত্যু জাহেল বা মূর্খ ব্যক্তির ন্যায় হবে।আর জাহেল বা মূর্খ ব্যক্তি কখনো সঠিক পথ ধরে সঠিক স্থানে পৌঁছাতে পারে না।তাই ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি যথাযথ মারেফাত ছাড়া কখনোই দুনিয়া এবং আখেরাতে সাফল্য ও মুক্তি সম্ভব নয়।
মারেফাতের(জ্ঞান, প্রজ্ঞা) শ্রেণি করণ:
ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি 'মারেফাত' (জ্ঞান, প্রজ্ঞা) সকল মানুষের কিন্তু সমান নয়।কেউ শুধুমাত্র ইমাম আঃ এর নাম জানে,তো কেউ তাঁর সম্পর্কে অল্প কিছু তথ্য জানে,কেউ বা আর একটু বেশি জানে,কেউ বা নিজেকে ইমাম ইমাম (আঃ)এর সঙ্গে সাক্ষাতের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।এই জানার শেষ বা চূড়ান্ত পর্যায় কোথায়,তা নির্ণয় করা মুশকিল। তাই 'মারেফাত' মানে একটি কোনো শ্রেণি বা স্তর নয়। মানুষের জ্ঞান, গভীর চিন্তা ও উপলব্ধির কারণে তা নানা স্তর বা শ্রেণিতে বিভক্ত।
আমাদের অবস্থা:
বর্তমানে আমরা ইমাম মাহদী (আঃ) সম্পর্কে মারেফাতের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে অবস্থান করছি।তাই এটা ভাবা উচিত নয় যে, ইমাম সম্পর্কে আমাদের যতটুকু জ্ঞান,তা দুনিয়া এবং আখেরাতে র সাফল্যের জন্য যথেষ্ট। সচেতন মানুষের উচিত ইমাম (আঃ) এর প্রতি মারেফাতের সর্বোচ্চ ধাপে অধিষ্ঠানের প্রচেষ্টা চালোনো।
ইমাম আঃ এর প্রতি 'মারেফাতে'র উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ফল:
সাধারণ ভাবে বলা যায় যে, ইমামের প্রতি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধিই একটি উচ্চ পর্যায়--যে পর্যায়ে পৌঁছালে তার সাহায্য, এমনকি তাঁর সান্নিধ্য ও সাক্ষাৎ পর্যন্ত সম্ভব।পৃথিবীতে এমন বহু সংখ্যক ব্যক্তি ইমাম (আঃ)এর প্রতি উচ্চ 'মারেফাতে'র কারণে তাঁর সাহায্য বা সাক্ষাৎ লাভ করেছেন।এ বিষয়ে আয়াতুল্লাহ বাহজাদ, রজব আলী খাইয়ের প্রমুখ ব্যক্তিত্বের নাম খুব ই প্রসিদ্ধ।
গায়েবী সাহায্য:
উপরোক্ত দুই ব্যক্তিত্ব ছাড়াও আরো বহুসংখ্যক ব্যক্তি ইমাম মাহদী আঃ এর সাহায্য ও সাক্ষাৎ পেয়েছেন।আলীমে দ্বীন থেকে সাধারণ মানুষ--যারাই ইমাম আঃ এর মারেফাত অর্জনের চেষ্টা করেছেন বা ইমাম আঃ এর অপেক্ষায় আছেন,তারাই ইমাম (আঃ)এর নৈকট্য এবং গায়েবী সাহায্য পেয়েছেন।
শেষ কথা:
ইমাম (আঃ)আমাদের নিকট এক খনি স্বরূপ।তাই তাঁর বিষয়ে আমাদের উদাসীন থাকা ঠিক নয়। ইমাম (আঃ) বিষয়ে সচেতনতা এবং 'মারেফাত' অর্জন ই একমাত্র দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তির পথ।তাই দুনিয়াতে দিন ফুরিয়ে আসার আগেই , ইমাম (আঃ) বিষয়ে আমাদের জেগে উঠতে হবে।
------ _____------_____------______------______------
------ _____------_____------______------______------
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
জহুরের ডাক
হাসরে খোদা ডাকবে ইমামের সাথে
থাকবে মেহদী ইমাম আমাদেরই সাথে
১৫ই শাবানে মা-নার্জিসের কোলে
এসেছে যুগের ঈমাম আলো করে
কত সৌভাগ্য আমরা মাওলাকে পেয়ে
দূর্ভাগ্য তাদের যারা দিয়েছে ছেড়ে।।
যদি এক সাথে মিলে করিতাম দোয়া
জহুর করে দিতেন মাওলাকে খোদা
কত মূর্খ আর নির্বোধ আছি আমরা
আর আমাদের জন্য কাঁদেন ইমামে যামানা।
পড়তে হয় তাই পড়ি দোয়ায়ে ফারাজ
মাওলার কথাকে স্বরণ করে পড়ি না আজ
কি ভাবে জহুর হবে আমার মাওলার
যেন কুফাদের মতন আমাদের স্বভাব।
কেন ছোট্ট ছোট্ট আমল গুলো করিনা
একটু কথা আর ছাদকা সাথে আরিজা
মারেফাত বাড়বে এই সব আমলের দ্বারা
যদি সাথে থাকে বিশেষ কিছু দোয়া।
যহুরের কথা প্রতিদিন বলি আমরা
সত্যি সত্যি যহুর হলে কী করবো মোরা
দিইনা খুমস আর খাইনা হালাল রুজি মোরা
বসাবো কোথায় একবার ভেবে বলোনা।
মাওলা সব জায়গায় তুমি আছো বিরাজমান
মোদের গোনাহের দৃষ্টি যায়না সে সমান
আমাদের মনের আশা তোমারি ছায়া
এর থেকে বেশী মাওলা কীছুই চায়না।
আল্লাহ্ মাওলার এই শিক্ষা পেয়েছি যার থেকে
শত শত বছর হায়াত দাও তুমি তাকে
সাধারণ শিয়াদের মতো আমরাও ছিলাম
তার বদৌলতে আজ ইমামকে চিনিলাম।
__________________________________________
অপেক্ষা
✍️ রাজা আলী
মোমিনেরা আজ তোমার অপেক্ষায়
কবে দেখা দেবে মাওলা কৃপার দয়ায়
প্রতীক্ষা দীর্ঘ হোক, জ্বলুক আশার আলো
তুমি এসো ঘুচাও দুনিয়ার যতো কালো।
ভোরের নামাজের পর পশ্চিম আকাশ
সাদা-নীল রংয়ের মাঝে তোমার প্রকাশ
দুর্ভাগা আমি, খুঁজে ফিরি প্রতিদিন
পাইনি এখনো,রয়েছে হাজার ঋণ।
আশা রেখেছি বুকে , তোমার আগমণ
প্রতীক্ষা আমার হবে না অকারণ
পৃথিবীর বুকে তোমার উজ্জ্বল প্রকাশ
দুচোখ ভরে দেখবো খুবই আশ।
প্রতীক্ষায় যেনো মৃত্যু আসে একদিন
অন্তত স্বপ্নে দেখা দিও,করো না হীন
জানি আমি যোগ্য নই, চেষ্টায় তো আছি
তোমার সাক্ষাত পাবো-- মন্ত্র নিয়েই বাঁচি।
__________________________________________
গায়েবের চাঁদ
হে নূরের ইমাম, গায়েবের চাঁদ,
নাম নিলেই ঝরে চোখের বাদল সাধ।
রাতের বুক চিরে যে আশার আলো,
সে আলো শুধু তুমি—আর কেউ নয় ভালো।
আমি চাই না দেখা, অহংকার ভরে,
শুধু চাই তোমার পথে হারিয়ে যেতে ধীরে।
পাপের ভারে হৃদয় ক্লান্ত যখন,
তোমার দয়ার ছায়া হোক শেষ আশ্রয় তখন।
নীরব সিজদায় কাঁদে আমার প্রাণ,
শব্দহীন দোয়ায় শুধু তোমারই নাম।
যদি দেরি হয় দেখা, হে যুগের সর্দার,
আমাকে রেখো তবু অপেক্ষার কাতারে দাঁড়াবার।
নূরের ডাক এলে সময়ের পারে,
লাব্বাইক উঠুক এই ভাঙা স্বরে।
হে আল্লাহর ওলী, শেষ মিনতি আজ—
আমাকে যোগ্য করো ইন্তিজারের সাজ।
------ _____------_____------______------______------