Saturday, June 14, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ জিলহজ্জ সংখ্যা

           

আরবি: জিলহজ্জ, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির হোসেন গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖



নূরের মিলন : আলী ও ফাতেমার (আ.) বিবাহ

শোকের প্রকৃত অর্থ ও ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর শোক

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আছহাব

ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফতের স্বীকৃতি

হযরত আলী (আ.)-র মনোনয়ন দ্বারা দ্বীন পূর্ণতা লাভ করেছে

ঈদে গাদীর - বিদআত নাকি সুন্নাত?

জিলহজ্জে ঝরে পড়া এক মহব্বতের তারা

ইমাম মাহদী আঃ কে চেনার গুরুত্ব এবং কীভাবে তা সম্ভবপর
          ✍️  রাজা আলী 

                    ওয়াদা
           ✍️ আব্বাস আলী



📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

গাইবাতের আর্তনাদ

             
                মারেফাত 
          ✍️  রাজা আলী 

শুধু একবার, হে মাহ্দী!


__________________________________________
__________________________________________

                   সম্পাদকীয়

আল্লাহর অশেষ রহমতে ‘আল-হুজ্জাত’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে জিলহজ্জ্ব সংখ্যা প্রকাশিত হলো। জিলহজ্জ্ব হলো ত্যাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। এই মাস আমাদের শেখায়, কুরবানি মানে শুধু পশু জবাই নয়—নিজের খারাপ ইচ্ছা, অহংকার আর আরামপ্রিয়তাকে ত্যাগ করাও এক ধরনের কুরবানি। ইব্রাহিম (আ.)-এর আজ্ঞাবহতা, ইসমাঈল (আ.)-এর রাজি হওয়া, আর হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত—এই তিনটি ঘটনাই জিলহজ্জ্বকে পূর্ণ করে তোলে।

এই সংখ্যায় আমরা স্মরণ করেছি সেই সব মানুষকে, যারা ঈমানের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন। প্রতিটি লেখার ভেতরেই রয়েছে একটি বার্তা—ইমাম মাহ্দি (আ.)-এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার ডাক।

আসুন, এই জিলহজ্জ্ব মাসে আমরা অন্তর থেকে আল্লাহকে বলি, ‘লাব্বাইক’—আমি হাজির, হে আল্লাহ!
                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

নূরের মিলন : আলী ও ফাতেমার (আ.) বিবাহ
✍️ কবির আলী তরফদার কুম্মী।

رسول الله (ص):
«لَوْ لَمْ يَخْلُقِ اللَّهُ عَلِيّاً، لَما كانَ لِفاطِمَةَ كُفْءٌ»
"যদি আল্লাহ আলীকে সৃষ্টি না করতেন, তবে ফাতেমার কোনো যোগ্য বর থাকত না।"

ভূমিকা:
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর প্রভাব শুধু ঐতিহাসিক নয়, বরং চিরন্তন শিক্ষার উৎস। তেমনি এক শুভ, মোবারক ও মহিমান্বিত ঘটনা হলো হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) ও হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.) এর বিবাহ। এ বিবাহ কেবল দুটি মানুষের নয়, বরং দুটি আধ্যাত্মিক মহত্ত্বের মিলন, যার মধ্য দিয়ে নবীজির পবিত্র আহলে বাইতের উত্তরসূরি বিশ্বে আবির্ভূত হয়।

ফাতেমা (আ.) এর জন্য প্রস্তাবনা:
হযরত ফাতেমা (আ.) ছিলেন মহানবী (সা.) এর প্রিয় কন্যা, যিনি তাকওয়া, পবিত্রতা, জ্ঞান ও খোদাভীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। বহু বিশিষ্ট সাহাবি তাঁর বিবাহের প্রস্তাব দেন যেমন আবু বকর ও ওমর। কিন্তু রাসূল (সা.) সবারকেই বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন, এ বলে:
"আমি অপেক্ষা করছি আল্লাহর আদেশের জন্য।"
(সূত্র: ইবনে মাজাহ, কিতাবুন নিকাহ)

আসমানী নির্দেশ ও আলীর(আঃ) প্রস্তাব:
ইমাম আলী (আ.) এর হৃদয়ে ফাতেমা (আ.) এর প্রতি গভীর সম্মান ও ভালোবাসা ছিল, কিন্তু তিনি তার দারিদ্র্যের কারণে প্রস্তাব দিতে লজ্জিত ছিলেন। রাসূল (সা.) নিজে তাঁকে উৎসাহ দিলেন এবং আলী (আ.) যখন প্রস্তাব দিলেন, তখন রাসূল (সা.) খুশিতে বললেন:
"হ্যাঁ আলী, আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যে ফাতেমার বিবাহ আমি তোমার সঙ্গেই করিয়ে দেই।"
(সূত্র: ইবনে আসাকির, তারীখ দামিশক)

নিকাহ ও মেহর:
রাসূল (সা.) নিজে এ মহান নিকাহ সম্পাদন করেন। হযরত আলী (আ.) তাঁর যুদ্ধের সময়ে ব্যবহৃত একটি বর্ম বিক্রি করে দেন, যা ছিল তাঁর মূল সম্পদ। সে অর্থই ছিল ফাতেমা (আ.) এর মেহর।
মেহর : আনুমানিক ৫০০ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা)।
রাসূল (সা.) সেই অর্থ দিয়ে কনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনলেন, যা ছিল অত্যন্ত সাধারণ, বিনয়পূর্ণ ও নূরানী।

ওলীমা ও বিবাহোত্তর উৎসব:
শাইখ তূসী “আল-আমালী” গ্রন্থে যে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন, তার ভিত্তিতে, রাসূল (সা.) ও হযরত আলী (আ.) অনেক সংখ্যক সাহাবিকে ওলীমার (বিবাহোত্তর ভোজ) জন্য দাওয়াত দিয়েছিলেন। রাসূল (সা.) মাংস ও রুটি সরবরাহ করেন এবং আলী (আ.) খেজুর ও তেল নিয়ে আসেন।
ওলীমার পর রাসূল (সা.) ফাতেমা (সা.)-এর হাত আলী (আ.)-এর হাতে রাখেন এবং তাঁদের জন্য দোয়া করেন। তিনি বলেছিলেন:

"হে আলী! ফাতেমা একজন উত্তম স্ত্রী।"
আর ফাতেমাকে বলেছিলেন:
"হে ফাতেমা! আলী একজন উত্তম স্বামী।"

এরপর তিনি তাঁদের নিজ ঘরে পাঠান এবং তাঁদের কাছে গিয়ে দোয়া করেন, যেন আল্লাহ তাঁদের বংশধারা বরকতময় করেন। 

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতেমা (সা.) এর ঘর বিবাহের কিছু সময় পর নবী (সা.) এর প্রতিবেশী হিসেবে সাহাবি হারিসা ইবনে নোমান এর ঘরে স্থানান্তরিত করা হয়। কারণ, ফাতেমার দূরত্ব রাসূল (সা.) এর জন্য সহনীয় ছিল না। 

এ বিবাহের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব:
এ বিবাহ কেবল সামাজিক নয়, আধ্যাত্মিক ও আসমানীভাবে নির্ধারিত।

রাসূল (সা.) বলেছেন:
"যদি আলী না থাকত, তবে ফাতেমার জন্য যোগ্য কোনো বর থাকত না।"
(সূত্র: মুসনাদ আহমাদ, খাসায়েসে নাসাঈ)

ফাতেমা(আঃ)ও আলীর(আঃ) দাম্পত্য জীবন:
তাঁদের সংসার ছিল প্রেম, শ্রদ্ধা, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির অনন্য এক উদাহরণ।
হযরত ফাতেমা (আ.) কখনো আলীর (আ.) প্রতি কোনো অভিযোগ করেননি। আর আলী (আ.) ফাতেমা (আ.) কে সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা দিতেন।
তাঁদের ঘর থেকেই জন্ম নিয়েছেন ইমাম হাসান (আ.), ইমাম হুসাইন (আ.), জয়নাব (সা.) ও উম্মে কুলসুম (সা.) আহলে বাইতের মহান সদস্যগণ।

উপসংহার:
ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতেমা (আ.) এর বিবাহ আমাদের শেখায়:
দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হচ্ছে তাকওয়া, ভালোবাসা ও ইখলাস।
মোহ, ধন-সম্পদ, চাকচিক্য নয়; বরং পবিত্রতা ও চরিত্র প্রধান।
একটি পরিবার গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমানদার দুইটি হৃদয়ের মিলন।

এই বিবাহ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং যুগে যুগে মুসলিম সমাজের জন্য একটি আদর্শ। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন এমন এক জীবন গঠনের, যেখানে ফাতেমা (আ.) ও আলী (আ.) এর নূরানী পথ অনুসরণ করতে পারি।
__________________________________________

 শোকের প্রকৃত অর্থ ও ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর শোক
✍️ মাওলানা রিপন মন্ডল ইস্পাহানী

ভূমিকা

শিয়া সংস্কৃতিতে শোক পালন কেবলমাত্র আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি প্রতিরোধ, সচেতনতা ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক। এই পরিপ্রেক্ষিতে কারবালার শহীদ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য শোক পালন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই বিপ্লবের অন্যতম উত্তরাধিকারী ও বার্তাবাহক ছিলেন ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) যিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের সাথে আশুরার বার্তা সংরক্ষণ করেন।

শোকের প্রকৃত অর্থ শিয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে

আহলে বাইতের (আ.) দৃষ্টিতে শোক পালন কেবল কান্নাকাটি নয়; এটি হচ্ছে একটি চেতনা জাগানোর মাধ্যম, যা ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ করে এবং আহলে বাইতের উপর যে জুলুম হয়েছে তা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই শোক যদি জ্ঞান ও উপলব্ধির সাথে যুক্ত হয়, তবে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এবং ন্যায় ও মর্যাদার বার্তা বহন করে।

ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর শোক সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন

চতুর্থ শিয়া ইমাম, ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.), কারবালার ট্র্যাজেডির পরে বন্দী হয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে আশুরার সত্য প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি শোককে একটি সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিবাদের রূপে পরিণত করেন।

১. নিয়মিত কান্না ও স্মরণ: ইমাম (আ.) সারাজীবন কারবালার স্মরণে কাঁদতেন। এমনকি তিনি যখন পানি দেখতেন, তখন পিতার (ইমাম হুসাইন আ.) তৃষ্ণার কথা স্মরণ করতেন।

২. দোয়া ও সমাজচিন্তা: তাঁর বিখ্যাত কিতাব সহিফা সাজ্জাদিয়া শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক দোয়া নয়, বরং এতে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তাও আছে। এই দোয়াগুলো ছিল আশুরার শোকের একটি চিন্তাশীল রূপ।

৩. প্রকাশ্য বক্তব্য ও প্রচার: ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ইবনে জিয়াদ ও ইয়াজিদের সভায় ভাষণ দিয়ে শোককে প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দেন। দামেস্কে তাঁর খুতবা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল।


     ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর শোকের বার্তা

আশুরার পরিচয় সংরক্ষণ: উমাইয়া শাসকদের মিথ্যা প্রচারের বিপরীতে তিনি সত্যকে তুলে ধরেন।

জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: শোক ছিল নীরব প্রতিবাদের একটি মাধ্যম।

সচেতন প্রজন্ম গঠনের চেষ্টা: তাঁর দোয়া, ভাষণ ও কান্না একটি প্রতিবাদী ও সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলে।


উপসংহার

ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-এর দৃষ্টিতে শোক পালন একটি সচেতনতা ও প্রতিবাদের প্রতীক। তিনি কেবল কান্না নয়, দোয়া ও ভাষণের মাধ্যমে আশুরার সত্যকে ইতিহাসে অমর করে রাখেন। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি—শোক যদি হিকমাহ, ধৈর্য ও সচেতনতার সাথে পালন করা হয়, তবে তা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিবাদের রূপ নিতে পারে।
__________________________________________

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আছহাব
   ✍️ মাওলানা কাজিম আলি


فسوف ياتى الله بقوم يحبهم ويحبونه اذلة على المومنين اعزة على الكافرين يجاهدون في سبيل اللهو لا يخافون لومة لائم

“ খুব শীঘ্র আল্লাহ্ এমন মানুষদেরকে আবির্ভূত করবে; যাদেরকে আল্লাহ্ ভালোবাসে। আর তারা ভালোবাসে ঈমানদারদের। আর কাফিরদের বিরোধীতা করবে, আল্লাহর পথে জেহাদ করবে। আর কোনো সমালোচনা কারীর সমালোচনার মূল্য দেবে না"(অনুবাদ)।

প্রথম দিকে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহায্যকারীদের সংখ্যা বদর যুদ্ধের সৈন্যদের মতো নগন্য হলেও ক্রমান্বয়ে তা দশ হাজারে পরিণত হবে। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই আসহাবদের এমন উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হয়েছে যে, আম্বিয়াগণ ও আউলীয়াগণও এই সম্মান প্রত্যাশা করতো।ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। তিনি বলতেনঃ- “যদি আমি ইমাম মাহ্দীর যুগকে পেতাম, তাহলে সমগ্র জীবন আমি তাঁর সাহায্যার্থে অতিবাহিত করতাম"(অনুবাদ)।

তাই আমাদের পাঠ করা দোয়াগুলিতে আমরা প্রতিনিয়ত আল্লাহর নিকট ঐ উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানীয় স্থানের আকাঙক্ষা করে থাকি।

        বিভিন্ন রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাহাবীদের কিছু গুণাবলী নিম্নে তুলে ধরা হ'লঃ-

ক। এবাদাত ও পরহেজগারীতাঃ-

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীরা প্রবল এবাদাতকারী ও পরহেজগার হবে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ

"তারা রাতে জেগে জেগে খোদার এবাদাত করবে। নামাজের সময় তাদের আওয়াজ মৌমাছির বিন বিন আওয়াজের ন্যায় হবে। তাদের কপালে সেজদার চিহ্ন থাকবে। আর দিনে তারা বাঘের ন্যায় হবে "(অনুবাদ)।

খ। শক্তি ও অনুসন্ধানঃ-

আমীরুল মোমেনীন (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ

"মাহ্দীর সৈন্য-সাহাবারা যুবক আছে, তাদের মাঝে কেউ বুড়ো নেই”।

প্রকৃত প্রস্তাবে যুবক হওয়া, শক্তিশালী হওয়া, শত্রুদের অনুসন্ধান করা, তাদের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়ান ইত্যাদি হ'ল প্রকৃত সৈন্যদের বৈশিষ্ট্য। আর ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সৈন্যদের এমন সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে, যে কাজগুলিতে সফলতা অর্জন করা শক্তি-সাহস ও বাহাদুরিতা ছাড়া কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ

"তাদের মধ্যে প্রত্যেকে ৪০ জন ব্যক্তির ন্যায় শক্তিশালী হবে। আর তাদের অন্তর লৌহ খন্ডের মতো হবে। যদি তারা লোহার পাহাড়ের ওপর দিয়েও যায়, তবে তা খন্ড খন্ড হয়ে যাবে। আর তারা লোহার তলোয়ারকে ঐ সময় পর্যন্ত নেয়াম বন্দী (তলোয়ার রাখার খাপ) করবে না, যতক্ষণ না খোদা সন্তুষ্ট হবেন” (অনুবাদ)।

        অপর একটি রেওয়ায়েতে ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেছেনঃ

“যদি তাদের উপর কোনো শহরকে ধ্বংস করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে তারা ঐ সময় পর্যন্ত শান্ত হবে না, যতক্ষণ না শহরটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হবে” (অনুবাদ)।

গ। ঈমানঃ-

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীগণ একই সাথে পরিপূর্ণ ঈমানদার এবং জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান হবে। তাদের হৃদয়ে আল্লাহর মারেফাত থাকবে, আর কোনো প্রকার সন্দেহ থাকবে না। তারা নিজেদের মারেফাতের রাস্তা অন্য কোনো পথে নয়; সর্বদা কোরআন ও মাছুমীন (আঃ)-দের হাদীস থেকে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করবে। দ্বীন ইসলামের মধ্যে তাদের স্থান ফক্বীহগণদের মধ্যে গণ্য করা হবে। আর জ্ঞানের বিষয়ে তারা ঐ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসাবে পরিগণিত হবে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেছেনঃ 

“ঐ মোমেনীন, যাদের মাঝে আল্লাহ্ মাহ্দীকে পাঠাবে; তারা নির্ধারিত হবে, শাসক ও বিচারক হওয়া একমাত্র তাদেরই মানাবে। আর দ্বীনে ইসলামে তারা ফক্বীহগণদের মধ্যে গণ্য হবে” (অনুবাদ)।

ঘ। মহব্বত ও অনুসরণকারীঃ

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর প্রতি তাঁর সাহাবীদের সীমাহীন মহব্বত থাকবে। তাঁদের অন্তর শুধুমাত্র ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর মহব্বতে পরিপূর্ণ হবে। তাই প্রত্যেকটি কাজ তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আদেশ মতোই করবে। সর্বদা তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সামনে মাথা নত করে থাকবে।কোনো প্রকার মূল্যতে তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সঙ্গ ছাড়বে না। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ

“যে ব্যক্তি ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হতে চায়, তার উচিত প্রতীক্ষা করা, পরহেজগার হওয়া, মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার করা। তার চরিত্র ও ব্যবহার এমন হবে যাতে এটা বোঝা যায় যে সে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর অপেক্ষায় আছে” (অনুবাদ)।

 বর্তমান অধ্যায়টি আমি ইমাম রিযা (আঃ)-এর দোয়া দিয়ে সমাপ্ত করছিঃ-

হে আল্লাহ্! আমাদের ঐ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত কর, যাদের মাধ্যমে তোমার দ্বীনের মদত হয়; আর এই মদতের মাধ্যমে তুমি যাকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছো। আর আমাদের স্থানে আমাদের পরিবর্তে অপর কাউকে যেন স্থান দিওনা” (অনুবাদ)।

বর্তমান অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

১.ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারীরা এমন উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী যে, ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)ও তাঁর সাহায্যকারী হওয়ার আকাঙক্ষা প্রকাশ করেছেন।

২.আমরা দোয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহর দরবারে ইমাম মাহ্দী (আঃ) কে সাহায্য করার ইচ্ছা পোষণ করে থাকি।

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের কিছু গুণাবলী নিম্নে তুলে ধরা হ'ল,--

ক। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীগণ রাত জেগে এবাদাত করবে।

খ। তাঁরা একদিকে যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি অপর দিকে অনুসন্ধিৎসু হবে।

গ। তাঁরা ঈমানদার হবে।

ঘ। তাঁরা ইমাম (আঃ)-এর প্রতি প্রবল মহব্বতকারী এবং তাঁর উপর জীবন উৎসর্গকারী হবে।

ঙ। তাঁরা পরহেজগার ও সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হবে।

চ। আমাদের আল্লাহর দরবারে দোয়া করা উচিত যে, তিনি যেন আমাদেরকে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব কে যেন দ্রুত ত্বরান্বিত করেন।
             
_________________________________________

ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফতের স্বীকৃতি
✍️ সুজা উদ্দিন মাশহাদী
                           
উসমান (রা.)-এর মৃত্যু 
উসমান (রা.)-এর শাসনামলে কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আত্মীয়দের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে মুসলিম সমাজে অসন্তোষ দেখা দেয়। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে (৩৫ হিজরি) মিসর, কুফা ও বসরার কিছু বিদ্রোহী মদিনায় এসে উসমান (রা.)-এর বাড়ি অবরোধ করে। দীর্ঘ অবরোধের পর, বিদ্রোহীরা তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তাকে হত্যা করে 
ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফতের স্বীকৃতি ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অধ্যায়।


খেলাফতের গ্রহণ:
উসমান (রা.)-এর মৃত্যুর পরে মদিনায় এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সাহাবিদের বড় একটি অংশ এবং সাধারণ জনগণ ইমাম আলী (আঃ)-কে খেলাফতের জন্য আহ্বান জানান। তাদের অনেক অনুরোধে তিনি খেলাফত গ্রহণ করেন (25 জিলহিজ্জ 35 হিজরি)


প্রাথমিক স্বীকৃতি:
মদিনার অধিকাংশ মুসলমান, সাহাবি ও গুরুত্বপূর্ণ শহর যেমন কুফা ও বসরার মানুষ তাঁর খেলাফতকে স্বীকৃতি দেন। বিশেষত আনসার ও মুহাজিরদের অনেকেই তাঁর পক্ষে ছিলেন।


বিরোধিতাকারী গোষ্ঠী:

কিন্তু সবাই স্বীকৃতি দেয়নি। বিশেষত শামের গভর্নর মু'আবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান উসমান (রা.)-এর হত্যার বিচার দাবি করে খেলাফত মানতে অস্বীকার করেন। আয়েশা (রা.), তলহা ও যুবাইরও শুরুতে বিরোধিতা করেন, যার ফলে "যমল যুদ্ধ" হয়।


                    পরিণতি:

এই বিরোধিতা ও গৃহযুদ্ধের কারণে তাঁর খেলাফতকাল (প্রায় ৫ বছর) নানা সংঘর্ষে জর্জরিত ছিল। তবে বহু বড় সাহাবি এবং দ্বীনদার মানুষ তাঁকে প্রকৃত খলিফা ও হকপন্থী নেতা হিসেবে মানতেন।


মাযহাবে ইমামীয়ার দৃষ্টিতে ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফত

ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফত শরিয়তের দৃষ্টিতে পূর্ণ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ছিল, তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও পূর্ববর্তী হত্যাকাণ্ডের জের ধরে তার খেলাফত সর্বত্র শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।মাযহাবে ইমামীয়া তাঁকে সরাসরি রাসুল (সা.)-এর পর উত্তরসূরি হিসেবে মানেন কারণ,,,,,,
ঈদে গাদীর (عيد الغدير) ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা মূলত মাযহাবে ইমামীয়া দের কাছে ঈদের সমতুল্য মর্যাদা পায়। এটি হিজরি ১৮ জিলহজ্জে সংঘটিত হয়।


           ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
হজ্বুল বিদা (শেষ হজ) শেষে, রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদীর খুম নামক স্থানে দাঁড়িয়ে লাখো সাহাবির সামনে ঘোষণা দেন:
"من كنت مولاه فهذا علي مولاه"
"যার আমি (মাওলা), আলী তার (মাওলা)।"
এই ঘোষণার মাধ্যমে রাসূল (সা.) ইমাম আলী (আ.)-কে তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি ও উম্মতের নেতা হিসেবে নিযুক্ত করেন।


           মাযহাবে ইমামীয়া দৃষ্টিতে:

- এটিকে ইমামত ও ওলায়াত প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
- এই দিনে ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি নবীর (সা.) নেতৃত্ব হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়।
-মাযহাবে ইমামীয়া এই দিনটিকে  বড় ঈদ হিসেবে পালন করে থাকেন।

 উপসংহার:
প্রকৃত পক্ষে ইমাম আলী (আঃ)-এর খেলাফত হজ্বুল বিদা (শেষ হজ) শেষে, রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদীর খুম নামক স্থানে দাঁড়িয়ে লাখো সাহাবির সামনে ঘোষিত হলেও কিছু সাহাবি সেটা মেনে নিতে পারেন নি ।
ঈদে গাদীর আমাদের শেখায় নেতৃত্বের গুরুত্ব, সত্যের অনুসরণ, ও আহলে বাইতের প্রতি আনুগত্য। এটি শুধুই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং ইসলামী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষার পবিত্র দিন।
__________________________________________

 হযরত আলী (আ.)-র মনোনয়ন দ্বারা দ্বীন পূর্ণতা লাভ করেছে
✍️  মজিদুল ইসলাম শাহ


ইমাম আলী (আ.)-কে মনোনয়ন করার মাধ্যমে নবুওত বন্ধ হয়নি বা অসম্পূর্ণ থাকেনি; বরং তা তার পূর্ণতার দিকে এগিয়ে গেছে। আল্লাহ্‌ যখন আলী (আ.)-কে মুসলমানদের খলিফা হিসেবে মনোনীত করলেন-যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর সবচেয়ে শক্তিশালী, জ্ঞানী ও বিজ্ঞ মুসলিম-তখন তিনি নিজের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করলেন।

আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর সরাসরি নেতৃত্ব ও খিলাফত প্রমাণকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াতগুলোর মধ্যে গাদীর দিবসে নাজিল হওয়া আয়াতগুলো অন্যতম। যেমন-আয়াত বালাগ বা আয়াত তাবলিগ এবং আয়াত একমালে দ্বীন। এসব আয়াতের তাৎপর্য নতুনভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘতা ও পাঠকের ধৈর্যের কথা বিবেচনায় রেখে আমরা পূর্বে পৃথক একটি প্রবন্ধে "আয়াত তাবলিগ" নিয়ে আলোচনা করেছি। এবার এই আলোচনায় "আয়াত একমালে দ্বীন" নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। আশা করা যায়, এই কাজ আল্লাহ, রাসূল (সা.) ও তাঁর ন্যায্য উত্তরাধিকারীর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক হবে।
আয়াত একমালে দ্বীন:
আল্লাহ্‌ সূরা মায়েদার ৩য় আয়াতে বলেন:
"الْیَوْمَ یَئِسَ الَّذِینَ كَفَرُوا مِنْ دِینِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ ۚ الْیَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِینَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَیْكُمْ نِعْمَتِی وَرَضِیتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِینًا..."
অর্থাৎ: আজ কাফিররা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেছে; অতএব, তাদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো! আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের ওপর সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য চিরস্থায়ী দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।

আলোচনার প্রেক্ষাপট:
এই আয়াতে এমন এক মহান ও গৌরবোজ্জ্বল দিনের কথা বলা হয়েছে যা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মোড় ঘোরানো দিন ছিল। এটি এমন এক দিন, যার বার্তা ছিল:
শত্রুর হতাশা, দ্বীনের পূর্ণতা, আল্লাহর নিয়ামতের পরিপূর্ণতা, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
আসলে এই দিনটি কী ছিল?

ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ:

দ্বীনের পূর্ণতা ও নিয়ামতের সমাপ্তি
"الْیَوْمَ یَئِسَ الَّذِینَ كَفَرُوا مِنْ دِینِكُمْ"
ইসলামের শত্রু ও কাফেররা শুরু থেকেই ইসলাম ধ্বংসের চেষ্টা করেছে। তবে প্রত্যেক ধাপে ব্যর্থ হয়ে ভবিষ্যতের আশায় ছিল। কিন্তু এই আয়াত নাজিলের সময় এমন এক ঘটনা ঘটল, যার ফলে কেবল তাদের চলতি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়নি, বরং ভবিষ্যতের আশা-ভরসাও শেষ হয়ে গেছে।
"فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ"
এই মহান বিজয়ের দিন মুসলমানরা শত্রুদের ভয় না করে একমাত্র আল্লাহকে ভয় করবে। কারণ এখন মূল হুমকি বাইরের নয়, বরং আত্মিক দুর্বলতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করা।
"الْیَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِینَكُمْ..."
এই গৌরবোজ্জ্বল দিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে দ্বীন পরিপূর্ণ হলো এবং আল্লাহর নিয়ামত পূর্ণতা লাভ করল।
"وَرَضِیتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِینًا"
আজকের দিনের গুরুত্ব এত বেশি যে, আল্লাহ ইসলামকে মানুষের চিরন্তন ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
এই দিনটি কী দিন ছিল?

এই আয়াত চারটি বৈশিষ্ট্য যুক্ত এক দিনের কথা বলছে:
১. কাফেররা হতাশ হয়,
২. দ্বীন পূর্ণ হয়,
৩. নিয়ামত পরিপূর্ণ হয়,
৪. ইসলাম চিরন্তন ধর্ম হিসেবে গৃহীত হয়।
এই চার বৈশিষ্ট্য সম্বলিত দিনটি গাদীর খুমের দিন ব্যতীত আর কোনো দিন হতে পারে না।

এই আয়াতের গভীরতা ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে দুটি পথ রয়েছে:
১. আয়াতের বক্তব্য নিজে বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি করা, বাইরের উৎস ব্যতিরেকে।
২. আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদীস ও মুফাসসিরদের মতামত দ্বারা ব্যাখ্যা করা।
উভয় পথেই স্পষ্ট হয়: গাদীরের দিনই সেই মহান দিন, যেদিন আল্লাহ ইমাম আলী (আ.)-কে মনোনীত করে দ্বীনকে পূর্ণতা দান করেন।

আয়াত ইকমাল-এর ব্যাখ্যা
এই পবিত্র আয়াতটি নবী করিম (সা.)-এর জীবনের কোন ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত?
এই প্রশ্নের উত্তরে ফখর রাজী দুটি মতামত দিয়েছেন, এবং মরহুম তাবারসী একটি তৃতীয় মত তুলে ধরেছেন।
আমরা আল্লাহর সাহায্য নিয়ে, যুক্তি ও বিবেকের আলোকে এবং পক্ষপাত ও আবেগ থেকে মুক্ত থেকে, এমনভাবে এই তিনটি মত বিশ্লেষণ করব যাতে বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যে কোনো আঘাত না লাগে।

প্রথম মত (ফখর রাজীর):
তিনি বলেন, "اليوم" শব্দটি এখানে তার প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; এটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে-অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট দিন নয়, বরং একটি সময়কাল বা যুগ বোঝাতে। যেমন বলা হয়: “গতকাল আমি যুবক ছিলাম, আজ আমি বৃদ্ধ”, এটি একটি সময়ের রূপক প্রকাশ।
উত্তর: এই ব্যাখ্যার কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বা নির্দিষ্ট রূপক নির্দেশনা নেই। রূপক অর্থ ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট প্রেক্ষাপট দরকার, যা এখানে নেই। সুতরাং, এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয় মত (ফখর রাজী):
"اليوم" শব্দটি প্রকৃত অর্থেই কোনো নির্দিষ্ট দিন বোঝাচ্ছে, আর সেই দিনটি হচ্ছে হজ্জের ‘আরাফা’ দিবস (১০ হিজরির হজ্বে বিদা)।
উত্তর: এই দিনটি আগের বছরের আরাফার দিনের থেকে কিসে ভিন্ন ছিল? যদি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেই না থাকে, তাহলে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বলা হলো? অতএব, এই ব্যাখ্যাও যুক্তি-সঙ্গত নয়।

তৃতীয় মত (মরহুম তাবারসী):
তিনি ফখর রাজীর দুটি মত প্রত্যাখ্যান করে আহলুল বায়েত (আ.)-এর ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করেন, যা সকল শিয়া মুফাসসির ও বিদ্বানদের দ্বারা সমর্থিত।

এই মতানুসারে, আয়াতে যে গৌরবময় দিনটির কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে: ১৮ জিলহজ্জ, ১০ হিজরি- গাদীর খুম দিবস।
সেদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর আদেশে হযরত আলী (আ.)-কে তাঁর উত্তরসূরি ও মুসলমানদের নেতা ঘোষণা করেন।
এই ব্যাখ্যা আয়াতের সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?
উত্তর: পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ:
১. শত্রুর হতাশা:
ইসলামবিরোধীরা সব চক্রান্তে ব্যর্থ হয়ে শেষ আশায় ছিল যে, রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর, যেহেতু তাঁর কোনো পুত্র নেই ও কোনো উত্তরসূরি ঘোষণা করেননি, তখন ইসলাম ধ্বংসের সুযোগ মিলবে। কিন্তু গাদীর দিবসে যখন রাসুল (সা.) হাজার হাজার সাহাবার সামনে হযরত আলী (আ.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করলেন, তাদের সব আশা শেষ হয়ে গেল।
২. ধর্ম পূর্ণতা পেল:
নবুয়তের পরে ইমামত দ্বারা ইসলাম পূর্ণতা পায়। হযরত আলী (আ.)-কে খলীফা নিযুক্ত করার মাধ্যমে, ইসলাম ধর্ম তার পূর্ণরূপ পেল। নবুয়ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়নি।
৩. নিয়ামত সম্পূর্ণ হলো:
রাসুলের (সা.) পর নেতৃত্ব নির্ধারিত হওয়ায় আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নিয়ামত পূর্ণ হলো।
৪. বিশ্বজনীন ধর্ম হিসেবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলো:
ইমামত ছাড়া ইসলাম একটি পূর্ণ, চিরস্থায়ী ধর্ম হতে পারে না। প্রতিটি যুগে মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে একজন নির্ভুল নেতা প্রয়োজন, যা ইমামতের মাধ্যমেই সম্ভব।


সারকথা: গাদীরের ঘটনার ভিত্তিতে আয়াতের ব্যাখ্যা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, বরং একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যা। এই ঘটনার মাধ্যমেই মুনাফিকদের আশা ছিন্ন হয় এবং আল্লাহর ধর্ম পূর্ণতা পায়।“দ্বীন পূর্ণ করলাম”-এর অর্থ কী?

এই অংশের ব্যাখ্যায় তিনটি মত রয়েছে:
১. দ্বীন মানে আইন:
কেউ কেউ বলেন, “দ্বীন” বলতে ইসলামি আইন বোঝানো হয়েছে, যা ওই দিন পূর্ণতা পেয়েছে।
প্রশ্ন: যদি তাই হয়, তাহলে ওই দিনে এমন কী নতুন আইন বা বিধান নাজিল হয়েছিল, যা এত গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য?
২. দ্বীন মানে হজ্ব:
কারো মতে, আয়াতে ‘দ্বীন’ বলতে ‘হজ্ব’ বোঝানো হয়েছে।
উত্তর: ভাষাগতভাবে ‘দ্বীন’ মানে পূর্ণ জীবনব্যবস্থা-আকীদা ও আমলের সমন্বয়; হজ্ব তার একটি অংশ মাত্র। তাই এই ব্যাখ্যা ভুল।
৩. কাফেরদের পরাজয়:
কেউ বলেন, এই আয়াতের অর্থ হলো-মুসলমানরা শত্রুদের উপর বিজয় লাভ করেছিল।
প্রশ্ন: কোন শত্রু? মক্কার মুশরিকরা ৮ হিজরিতেই পরাজিত হয়েছিল, ইহুদিরা যুদ্ধের মাধ্যমে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। খ্রিস্টানরাও শান্তিচুক্তি করেছিল। তাহলে ১০ হিজরিতে নতুন করে কী ঘটল?
উত্তর নেই।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ: শিয়া মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা-গাদীরের ঘটনাই হচ্ছে দ্বীনের পূর্ণতার কারণ-সব প্রশ্নের স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত উত্তর দেয়। সুতরাং, আয়াতে ইকমালের একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যা হলো গাদীর খুম ও হযরত আলী (আ.)-এর ইমামত প্রতিষ্ঠা।
__________________________________________

ঈদে গাদীর - বিদআত নাকি সুন্নাত?
     ✍️ মইনুল হোসেন

  শিয়াদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তিগুলির মধ্যে একটি আপত্তি হলো অনেকেই বলে থাকেন যে, শিয়ারা নিজেদের জন্য একটি নতুন ঈদ উদ্ভাবন করেছে - যার নাম ঈদে গাদীর। অভিযোগকারী সম্প্রদায়ের মত হল, মুসলমানদের জন্য মাত্র দুটি ঈদ রয়েছে - ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। এই যুক্তির উপর ভিত্তি করে, তারা গাদীরের দিনে ঈদ উদযাপনকে বিদআত বলে মনে করে।

 আরবি শব্দ ‘ঈদ’ কথাটি ‘আদা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ফিরে আসা বা পুনরাবৃত্তি হওয়া। এথেকে বোঝা যায় যে ঈদের দিন প্রতি বছর ফিরে আসে। সমস্ত ঐশী ধর্মে যেকোনো ঈদ একটি স্মরণীয় উপলক্ষ বা একটি বড় অর্জন উদযাপনের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছিল। মুসলমানেরাও একই প্রথা অনুসরণ করে। 

উদাহরণস্বরূপ প্রতি বছর শাওয়ালের ১ তারিখ ঈদুল ফিতর হিসাবে পালিত হয় কারণ এটি রমজান মাসের সমাপ্তি চিহ্নিত করে এবং তাই সমস্ত রোজাদার মুসলমানদের জন্য আনন্দের কারণ হয়। ফলস্বরূপ, মুসলমানেরা এই দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদযাপন করে। একইভাবে হজ্ব সমাপ্তির দিন তথা নবী ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নত পালনের নিমিত্তে সমস্ত মুসলমান ঈদুল আযহা উদযাপন করে।

গাদীরের দিনটি কেবল মুসলমানদের ঈমানের পূর্ণতাকেই চিহ্নিত করে না বরং এটি সেই দিন যখন দ্বীনে ইসলাম ঐশী ধর্ম হিসাবে তার পরিপূর্ণতায় পৌঁছেছিল। ১০ হিজরির ১৮ই জিলহজ্ব তারিখে আল্লাহর নির্দেশে যখন মহানবী (সাঃ) সকলের সম্মুখে “আমি যার মাওলা, এই আলীও তার মাওলা” কথাটি ঘোষণা করেন, সেই মুহুর্তে মহান আল্লাআহ রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াতটি নাযিল হয়। যেখানে মহান আল্লাহ্‌ ঘোষণা করছেন, “...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করে সন্তুষ্ট হলাম…

এই আয়াতটি গাদীরের দিনে অর্থাৎ ১৮-ই জিলহজ্ব তারিখে নাজিল হয়েছিল এবং এই বিষয়টি সমস্ত মুসলমানদের দ্বারা বহুলভাবে প্রসিদ্ধ। তাহলে একজন প্রকৃত মুসলমান ব্যক্তি এমন একটি দিনকে কেন ঈদ হিসাবে উদযাপন করবে না যেদিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর মনোনীত ধর্ম ইসলামকে পূর্ণতা দান করেছেন? 

ঈদে গাদীর উদযাপনের ফযিলত
আহলে সুন্নাতের আলেম ইবনে তালহা শাফেয়ী তার কিতাব মাতালিব আল-সু’উল, পৃষ্ঠা ৭৯-এ বলেন, “আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) নিজেই তাঁর কবিতায় গাদীরে খুমের দিনটিকে ঈদ হিসাবে স্মরণ করেছেন, কারণ এই দিনে মহানবী (সা.) মুসলমানদের উপর ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়েত (অভিভাবকত্ব)-এর ঘোষণা করেছিলেন। আর এইভাবে মহানবী (সা.) তাকে অন্য সকল মানুষের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।” 

সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, আমীরুল মুমিনীন ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) নিজ জীবনে এই দিনটিকে ঈদ হিসাবে গণ্য করেছিলেন এবং গাদীরে খুমে উপস্থিত সাহাবীরাও যাঁদের মধ্যে হজরত ওমর (রা.), হজরত আবুবকর (রা.) প্রমুখ ছিলেন, তারা ইমাম আলী (আ.)-কে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উত্তরাধিকারী হিসাবে নিয়োগের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে এই অনুষ্ঠান উদযাপন করেছিলেন। তাদের কেউই এটিকে ধর্মের মধ্যে বিদআত বলে আপত্তি করেননি। প্রকৃতপক্ষে, তারা নিজেরাই সেই দিনটি উদযাপন করেছিলেন। তাহলে কেন তাদেরই অনুসারীরা ইসলামের এই শ্রেষ্ঠ ঈদকে অস্বীকার করে? এর দুটি কারণ থাকতে পারে – 

(১) হয় তারা প্রকৃত ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, যার কারণে তারা তাদের নিজস্ব নেতাদের অনুসরণ করছে না।

 অথবা (২) তারা সচেতন কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করছে এবং তাদেরকে সঠিক বেলায়েত (অভিভাবকত্ব) অর্থাৎ আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ থেকে দূরে রাখছে কিছু তুচ্ছ পার্থিব লাভ বা ক্ষমতার জন্য।

পরিশেষে সকল মুসলমানের প্রতি একটি আন্তরিক আবেদন যে – যদি আপনি আপনার ঈমান এবং ইসলামকে পরিপূর্ণ করতে চান, যদি আপনি আল্লাহর ধর্মকে তার প্রকৃত অর্থে অনুসরণ করতে চান,‌ যদি আপনি পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অমান্য করতে না চান - তাহলে ইসলামের এই শ্রেষ্ঠ ঈদকে সঠিক মূল্যায়ণসহ পালন করা উচিত। কারণ এই দিনটি উদযাপনের সওয়াব অপরিসীম। মহান শিয়া আলেম সাইয়েদ ইবনে তাউস তার কিতাব ইকবাল আল-আ’মাল, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৪-৪৬৫-এ ইমাম আলী ইবনে মূসা (আ.) থেকে একটি দীর্ঘ রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন,
...যে ব্যক্তি গাদীরের দিনে তার মুমিন ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন, তার হাজারো আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবেন, তার জন্য জান্নাতে সাদা মুক্তার একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন এবং তার চেহারা আলোকিত করবেন কারণ এটি সাজসজ্জার দিন। সুতরাং, যে ব্যক্তি গাদীরের দিনে সাজসজ্জা করবে, আল্লাহ তার করা প্রতিটি ছোট-বড় ভুল ক্ষমা করে দেবেন এবং আল্লাহ তার জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করবেন যে তার জন্য ভালো কাজ লিখবে, তার মর্যাদা বাড়াতে থাকবে পরের বছর একই দিন পর্যন্ত। যদি সে মারা যায়, সে শহীদ হিসাবে মারা যাবে এবং যদি সে জীবিত থাকে, সে সৌভাগ্যের জীবন যাপন করবে। যে ব্যক্তি একজন মুমিনকে খাবার খাওয়াবে, সে যেন সকল নবী (আ.) এবং সত্যবাদীদের খাবার খাওয়ালো। যে ব্যক্তি এই দিনে একজন মুমিনকে দেখতে যাবে, আল্লাহ তার কবরে ৭০টি আলো প্রবেশ করাবেন, তার কবর প্রসারিত করবেন এবং প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা তার কবরে এসে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেবে..."।
__________________________________________

জিলহজ্জে ঝরে পড়া এক মহব্বতের তারা
              ✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

জিলহজ্জ—তাওহীদের সুগন্ধময় মাস। এই মাসে কা'বার আঙিনায় প্রতিধ্বনিত হয় কুরবানির আহ্বান। প্রতিটি তাকবীর যেন হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে সেই স্মৃতি— ইব্রাহিম (আ.)-এর আত্মসমর্পণ, ইসমাইল (আ.)-এর নিঃশব্দ উৎসর্গ। এই পবিত্র সময়ে, ইতিহাসের ছায়া থেকে উঠে আসেন এক অন্যরকম কুরবানিদাতা—হজরত মিসাম তাম্মার (রহ.)।

তিনি ছিলেন না কোনো খ্যাতিমান রাজপুত্র, ছিলেন না কোনো ধনবান সমাজনেতা। তিনি ছিলেন একজন দাস, একজন সাধারণ খেজুর বিক্রেতা। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল এমন প্রেম, যা তাঁকে করে তোলে আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল মিনার। তাঁর জিহ্বায় জ্বলে উঠেছিল আলী (আ.)-এর ফজিলতের শিখা; তাঁর জীবনের রক্তরেখায় লেখা হয়েছিল এক অনন্ত প্রেমের ইতিহাস।

 ইতিহাসের প্রাঙ্গণে মিসামের আগমন

পারস্যের এক কোণ থেকে উঠে আসা এই গৌরবান্বিত মানুষটি ছিলেন এক নিঃস্ব দাস। কুফার রাজপথে একদিন তাঁর ভাগ্য বদলে যায়—ইমাম আলী (আ.) তাঁকে শুধু দাসত্ব থেকে নয়, বরং অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করেন।

ইমামের সান্নিধ্যে এসে মিসাম হয়ে উঠেন ‘আলিমুন বিল-আসমা’— নামের গভীরতম অর্থ বোঝা এক আত্মার অধিকারী। তাঁর হৃদয়ে অঙ্কুরিত হয় এমন এক নীরব দীপ্তি, যা তাঁকে করে তোলে সত্যের বাহক ও প্রেমের শহীদ।

 প্রেমিকের পরিণতি : ইমামের কণ্ঠে ঘোষিত

একদিন ইমাম আলী (আ.) মিসামকে ডেকে বললেন—
 “হে মিসাম! আমার শাহাদাতের পর তোমাকেও বন্দি করা হবে। তোমাকে একটি খেজুরগাছে বেঁধে রাখা হবে। তোমার জিহ্বা কেটে নেওয়া হবে, কারণ তুমি আমার কথা বলবে, নির্ভয়ে আমার প্রেম ঘোষণা করবে।”

মিসাম জিজ্ঞেস করলেন—
 “হে আমার মাওলা, সে অবস্থায় কি আমার দ্বীন নিরাপদ থাকবে?”

ইমাম শান্ত কণ্ঠে বললেন—
 “হ্যাঁ, হে মিসাম! তোমার দ্বীন অক্ষত থাকবে। এই শাহাদাত হবে তোমার ঈমানের পূর্ণতা।”

এই কথোপকথন ছিল শুধু ভবিষ্যদ্বাণী নয়—এটি ছিল একটি প্রতিজ্ঞা, এক দাস প্রেমিকের হৃদয়ে শাহাদাতের বীজ বপনের মুহূর্ত।

 চলমান মিনবারের ভাষা : মিসামের উচ্চারণ

মিসামের কণ্ঠ ছিল এক চলমান মিনবার। কুফার অলিগলি, হাটবাজার, মসজিদে—তিনি বারবার বলতেন:
 “আমি জানি, তারা আমার জিহ্বা কেটে ফেলবে। কিন্তু যতক্ষণ তা কাটা হয়নি, আমি বলব— আলী হক, আলী নূর, আলী ইমাম।”

এই ছিল তাঁর প্রেম—যা প্রতিকূলতার মাঝেও নীরব আলো হয়ে জ্বলে থাকত, বাতাসে ভেসে যেত, সময়কে স্পর্শ করে ইতিহাসে গাঁথা হয়ে যেত।

 শাহাদাতের সকাল

ইমাম আলীর (আ.) সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়ে উঠল। কুফার শাসক উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ, মুয়াবিয়ার আদেশে, মিসামকে গ্রেফতার করল। তাঁকে একটি খেজুরগাছে বেঁধে রাখা হলো। সেদিন সূর্য ছিল উজ্জ্বল, আকাশ ছিল নির্বাক। আর সেই গাছের ছায়ায় বাঁধা ছিল এক প্রেমিক, যাঁর অপরাধ ছিল শুধু একটিই—তিনি সত্য বলেছিলেন, প্রেম উচ্চারণ করেছিলেন।

তাঁর জিহ্বা কেটে নেওয়া হলো—এক নির্মম বাস্তবতা, যার পেছনে ছিল এক গভীর ভয়: সত্য যদি উচ্চারিত হয়, তবে তা জাগিয়ে তোলে অন্তর, বদলে দেয় সমাজ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—একজন প্রেমিকের জিহ্বা থামানো যায়, তবে তাঁর প্রেমের উচ্চারণ থামে না।

সেই খেজুরগাছ আজও যেন দাঁড়িয়ে আছে কুফার আকাশের নিচে, বাতাসে ভেসে আসে নীরব ঘোষণা— “সত্য রক্তে লেখা হলে, তা চিরস্থায়ী হয়।”


 মিসাম থেকে আমাদের প্রেরণা

হজরত মিসামের জীবন কেবল এক অতীত নয়—এ এক জাগ্রত প্রতিচ্ছবি, যা আমাদের শেখায়:
যে প্রেম ইমামের প্রতি নিবেদিত, তা আত্মার পরিচয় হয়ে ওঠে।
সত্য বলার মূল্য হয়তো রক্ত, কিন্তু সে সত্যই হয়ে ওঠে ঐশ্বরিক দীপ্তির আধার।
যখন এক দাস হয়ে ওঠে শহীদ, তখন আমরা—স্বাধীন মানুষ—নীরব কেন থাকব?

মিসামের কণ্ঠ যেন আমাদের হৃদয়ের দরজায় প্রশ্ন রাখে— “তোমরা স্বাধীন হয়েও নীরব কেন?”

এ প্রশ্ন শুধু ইতিহাসের নয়,
এ প্রশ্ন আজও ভেসে আসে সময়ের হাওয়ায়,
যার উত্তরের দাবি রাখে সেই এক মহাপ্রেম—
ইমামে জামানা (আ.)-এর প্রতি আমাদের অঙ্গীকার।

আমরা কি সেই কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছি—
যা তাঁর পক্ষে দাঁড়ায়?
আমরা কি সেই প্রস্তুতি গড়েছি—
যা তাঁর প্রতীক্ষাকে অর্থবহ করে?

তাই একটু ছন্দের ভাষায় বলি;-
হে মাহদি! ও গায়েব চাঁদ!      
      যাঁর আলোয় জাগে রাতের প্রাণ,
আমরা কী তবে নিরুত্তর থাকি? 
      নাকি জ্বালাই প্রেমের নিঃশব্দ দীপদান?

 উপসংহার

হজরত মিসাম তাম্মার (রহ.)—একজন নিঃশব্দ প্রেমিক, যাঁর আত্মত্যাগ ছিল দীপ্তি, যাঁর কণ্ঠ ছিল অনন্ত সত্যের ধ্বনি।

জিলহজ্জের কুরবানির মাসে, যখন আমরা আত্মত্যাগের স্মরণে অবগাহন করি, তখন মিসামের শাহাদাত আমাদের শেখায় যে, 
কুরবানি কেবল ছুরির ফলায় নয় বরং প্রেমে, পরিচয়ে, আর সত্যের উচ্চারণেই হয় আসল উৎসর্গ।

এবং আজ—
এই গায়েবাতের যুগে, যখন এক ইমাম আমাদের চেয়ে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রেমময় দৃষ্টি ছুঁড়ে দেন, তখন আমরা—মিসামের উত্তরসূরি কি প্রস্তুত হতে পেরেছি?

হে আল্লাহ!
আমাদের হৃদয় যেন আশ্রয় পায় সেই খেজুরগাছের ছায়ায়, যেখানে নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়েছিল প্রেমের পবিত্রতা।

আমাদের অন্তর যেন হয়ে ওঠে
তেমনই এক প্রেমিকের, যার প্রতিটি স্পন্দনে উচ্চারিত হয় আলী (আ.) হক, আলী (আ.) নূর, আর আলী (আ.)-এর বংশধর  মাহদি (আ.)—আমাদের আশ্রয়।

তুমি আমাদের দাও সেই সাহস,
যাতে সত্য বলায় কণ্ঠ রুদ্ধ না হয়,
আর প্রেমের ঘোষণায় ভয় স্থান না পায়।

হে প্রভু! আমাদের এমন প্রাণ দাও—যা ইমাম (আ:) এর জন্য কাঁদে, তাঁর জন্য জাগে, আর প্রয়োজনে তাঁর পথেই রক্ত ঝরায়।  আমীন... ইয়া রাব্বুল আলামিন..

__________________________________________

ইমাম মাহদী আঃ কে চেনার গুরুত্ব এবং কীভাবে তা সম্ভবপর
        ✍️ রাজা আলী 

"যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহ অনুমোদিত য কিছু বাকী থাকবে সেটাই তোমাদের জন্য উত্তম"(সূরা হুদ:৮৬)
    সূরা হুদ এর উপরোক্ত আয়েতের 'বাকিয়াতুল্লাহ' অর্থাৎ "আল্লাহ অনুমোদিত যা কিছু বাকি"বলতে ইমাম মাহদী (আঃ) কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ঘোষণা অনুযায়ী বর্তমান যুগে মুমিন দের জন্য উত্তম হলো ইমাম মাহদী (আঃ)কে আঁকড়ে ধরা।কোনো ব্যক্তি যদি মুমিন হয় বা মুমিন হতে চায় তবে তাকে ইমাম মাহদী (আঃ) এর মারেফাত অর্জন করতে হবে বা মারেফাত অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।তবে সে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা পাবে।
     ইমাম মাহদী (আঃ) মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এমামত প্রাপ্ত হন এবং আল্লাহর রব্বুল আলামীনের ইচ্ছায় অন্তর্ধান করেন।তার এই অন্তর্ধানের যুগে তার প্রতি আক্বীদা রেখে মারেফাত অর্জন করা অনেক খানি কঠিন বিষয়। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের নির্দেশ যেহেতু রয়েছে , সেহেতু এই বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকের মনোনিবেশ করতে হবে।
    বর্তমান যুগে ইমাম মাহদী (আঃ) এর মারেফাত অর্জন, তাঁকে নিয়ে চর্চা, জ্ঞান অর্জন এবং সেই শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ খুব ই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ ।এই জন্য আমাদের প্রত্যেকেকেই ইমাম আঃ বিষয়ক বই,পত্র-পত্রিকা পাঠ করতে হবে এবং ইমাম আঃ বিষয়ে বক্তব্য শুনতে হবে। কোরান ও হাদীসে ইমাম আঃ কে চেনার গুরুত্ব,ইমাম আঃ এর জন্ম , তাঁর মারেফাত অর্জন, তাঁর শাসন ইত্যাদি বিষয় সঠিক ভাবে জানতে হবে। এবং এই চর্চা এমন একটি ধারাবাহিক নিয়মে করতে হবে,যাতে ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে এবং তাঁকে নিয়ে কিছু চিন্তা করার বা আলোচনা করার পরিস্থিতি তৈরি হয়।কাজটি আমাদের পরিবেশ অনুযায়ী কিছু টা কঠিন ও সময় সাপেক্ষ। কিন্তু সেটা বড়ো বিষয় নয় ,বড়ো বিষয় হলো যথেষ্ট প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়।যদি নিজেদের ইমাম (আঃ)কে জানার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলার ইচ্ছা থাকে ,তবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং পরিবেশ-পরিস্থিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে হবে।তবেই একমাত্র ইমাম আঃ এর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হবে বা তার প্রতি একাত্মতার অনুভব জন্মাবে।
    ইমাম মাহদী আঃ কে চিনে নেওয়াই মুমিনের মানদন্ড। আখেরাতে সফলতার সার্টিফিকেট টি যুগের ইমাম আঃ এর কাছ থেকে ই নিতে হবে।তাই আল্লাহ রব্বুল আলামীন কোরান মজীদের মধ্যে ঘোষণা করেছেন:"সেদিন আমরা প্রত্যেক মানুষ কে তার ইমাম সহ ডাকবো"(সূরা বনি ইসরাইল:৭১)। সুতরাং সেদিন ইমাম (আঃ)ই হবেন মানবের ত্রাণকর্তা।এই ঘোষণার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ইমাম আঃ কে চেনা র গুরুত্ব।
    আল্লাহ রাসূল সাঃ বলেছেন,"যে ব্যক্তি তার যামানার ইমাম কে না চিনে মৃত্যু বরণ করে ,সে মূর্খতার মৃত্যু গ্রহণ করে"। অর্থাৎ বর্তমান যুগের প্রত্যেক মানুষ কেই যুগের ইমাম আঃ সম্পর্কে অবগত হতে হবে। নতুবা মূর্খের ন্যায় পৃথিবী ছাড়তে হবে।আর এক্ষেত্রে মূর্খতার অর্থ হলো পথভ্রষ্টতা। সুতরাং সঠিক পথের সন্ধান রয়েছে ইমাম মাহদী আঃ কে চেনা এবং তাঁর মারেফাত অর্জনের মধ্যে। এ কাজে আমাদের কার্পণ্য করলে চলবে না।

__________________________________________

                    ওয়াদা
           ✍️ আব্বাস আলী
 
ওয়াদা হল একটি উর্দু শব্দ যার বাংলা অর্থ কাউকে কথা দেওয়া। আমরা আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত ওয়াদা করে থাকি,সেটা কখনো নিজের পরিবারের সাথে, কখনো নিজের বন্ধু-বান্ধবের সাথে, আবার কখনো নিজের কর্ম ক্ষেত্রে। অতএব, আমাদের প্রতিদিনের জীবন-যাপনের মধ্য অতিমাত্রায় ব্যবহারিত হয় ওয়াদা বা কাউকে কথা দেওয়া। আর ইসলাম ধর্মের মধ্য ওয়াদা রাখার ব্যাপারে অনেক সতর্ক করা হয়েছে يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ "হে ঈমানদারগণ তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো"(সুরা মায়েদা ৫:১)

সুতরাং একজন মুসলমান, মমিন ও আহলেবায়েতের মান্নেওালা হিসাবে আমাদের ওয়াদা রাখার ব্যাপারে অনেক অনেক সতর্ক থাকতে হয়। তাই আমরা যেমন দুনিয়াবি ক্ষেত্রে ওয়াদা করি ঠিক অনুরূপ কিছু ওয়াদা আমাদের যুগের ইমাম ইমামে মেহেদী আলাইহি সালামের সাথে করার প্রয়োজন আছে সেদিকে আমাদের একটু লক্ষ করতে হবে। আমরা ঠিক কিভাবে আমাদের ইমামের সাথে ওয়াদা করব বা ওয়াদা করতে পারি তার কিছু বিবরণ খুবই সংক্ষিপ্ত ভাবে নিচে উল্লেখ করা হলো। 

ঈমানের ওয়াদা 
প্রথমেই যে ওয়াদা আমাদের ইমামের সাথে করতে হবে সেটা হলো ঈমানের ওয়াদা অর্থাৎ ঈমান বজায় রাখার ওয়াদা। বর্তমান যুগে ঈমানের বিষয় অনেক সতর্ক থাকা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প রাস্তা নেই।আজকের বর্তমান সময়ে ডিজিটালাইজের মাধ্যমে দুশমন আমাদের ঈমানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে চাই, তাই তারা অনেক পথ অবলম্বন করে থাকে যেমন, তার মধ্য উল্লেখযোগ্য হল হলিউড সিনেমা। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখান থেকে তারা যুবসমাজ বা ইয়ং জেনারেশনের কাছ থেকে ইসলামী আদর্শকে কেড়ে নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে চলেছে । তাই আমাদের সর্বপ্রথম প্রয়োজন আমাদের যুগের ইমামের সাথে এই ওয়াদা করা কে, মাওলা আপনাকে কথা দিচ্ছি যে দুনিয়াবি সমস্ত রকম পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করে ইসলামী আদর্শকে ধরে রাখবো এবং আপনার জহুরের পথকে প্রশস্ত করব।

সাথী হওয়ার ওয়াদা 
নিজের ঈমানকে ঠিক করার পরেই আমাদের আরো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ইমামের সাথী হওয়া বা ইমামের আসাব হওয়া। কারণ নিজের মাযহাবের প্রতি সঠিক ঈমান রাখা ও ইমামকে চেনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়, কারণ আল্লাহ কোরআন শরীফের মধ্যে বলছেন “আমি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামসহ ডাকবো” (বনি ইসরাইল: ৭১)। তাই আমাদের যেমন প্রয়োজন ইমামকে চেনা, ঠিক অনুরূপ ইমামের প্রতি আমাদের কিছু নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে। আমরা জানি যে সন ৬১ তে ইমাম হোসাইন কারবালাতে ডাক দিয়েছিলেন কেউ আছো আমাকে সাহায্য করবে, ঠিক ওই রুপ ডাক আজ পর্দার আড়াল থেকে যুগের হোসাইন অর্থাৎ আমাদের যুগের ইমাম ইমামে মেহেদী ( আ সা) ও দিচ্ছেন, যে কেউ আছো আমাকে সাহায্য করবে। তাই আমাদের নৈতিক কর্তব্য বা দায়িত্ব যে আমরা আমাদের যুগের ইমামের ডাকে সাড়া দিয়ে লাব্বাইক বলি তাই আমাদের দরকার একবার নিজের মন থেকে বলা যে মাওলা আমরা আপনার সাথে আছি আমরা আপনার প্রতিটি কাজে সাহায্য করবো ও আপনার কথাই হবে আমাদের জন্য প্রথম ও শেষ কথা এবং প্রয়োজনে আপনার জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত আছি আজ ঠিক এই রূপ ওয়াদা আমাদের যুগের ইমামের সাথে করার প্রয়োজন আছে।

উপরে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে দুটি ওয়াদার কথা উল্লেখ করা হলো যে ওয়াদা আমরা আমাদের যুগের ইমামের সাথে করতে পারি বা করা প্রয়োজন আছে উপরিউক্ত উল্লেখিত ওয়াদার সাথে সাথে আমাদের আরো কিছু কাজ ইমামের মেহেদী ( আ সা) এর সাথে করতে পারি বা করা প্রয়োজনীয় যেমন আমাদের প্রতিটি কাজ ইমামের নাম দিয়ে শুরু করা আমাদের প্রতিটি চিন্তায় ইমামকে রাখা এমনকি আমরা সকালে ওঠার পরে ইমামকে সালাম দেওয়া ও সাদকা প্রদান করা তার সুস্থতা সালামতির জন্য এইভাবে যখন আমরা আমাদের প্রতিটি কাজেই ইমামে জমানাকে স্বরন রাখবো তখনই সাহেবুজ্জামান আমাদের থেকে রাজি ও সন্তুষ্ট হবেন । এবং মহান আল্লাহ ও আমাদের থেকে সন্তুষ্ট ও রাজি হবেন এবং তার “ হাদী এ বার হক” যাকে তিনি আজও হেফাজত করে রেখেছেন এই পৃথিবীর নেজার দাতা হিসাবে এবং সমগ্র মানবজাতির মুক্তিদাতা হিসেবে তাকে আমাদের মাঝে পাঠিয়ে দেবেন এবং দুনিয়াবী দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়ে একটি প্রত্যাশিত পরিবেশ আমাদের মধ্যে তৈরি করে দেবেন যেখানে থাকবে না কোন অত্যাচার থাকবে না কোন ভয় কোন চুরি কোন মারামারি হিংসা ও খুনখুনি।

 আর মহান আল্লাহ তখনই নিজের ওয়াদাকে সম্পন্ন করবেন জমিনের উপরে তখনই তার হাদিকে পাঠাবেন যখন আমি এবং আপনি ওয়াদা করব যে ইমামের সাথে নেক কাজ করার জন্য তাই আসুন সকলে মিলে আজ এখনই নিজের বুকে হাত রেখে ওয়াদা করি কে মাওলা এই জীবন আজ থেকে নতুন করে শুরু আজ থেকে আমি শুধু আপনার অনুগত্য করব আপনার কথা মতোই চলব নিজের জীবনকে সাজাবো আপনার সুমধুর বাক্য দিয়ে।
__________________________________________------------------------------------------------







📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
     🌹🌹গাইবাতের আর্তনাদ🌹🌹 
        ✍️মো: মুন্তাজির হোসেন গাজী

বাল্যকালে হারিয়েছে পিতামাতার ভালবাসা,,
উম্মতেরা দূরে ঠেলে দিয়েছে বোঝেনি তার 
প্রত্যাশা।

অন্তর্ধানে যেতে হয় আল্লাহের নির্দেশে,,
একাকিত্বের ধ্বনি আজও ভাসে আকাশে বাতাসে।।

নয়ন থেকে রক্তের ধারা বহিছে পূর্বপুরুষের শোকে,,
চন্দ্রের ছটায় ভাসিয়ে আনে এতিমের দৃশ্যকে।।

গাঢ় অন্ধকারের স্পর্শে এই আওয়াজ শোনা যায়,,
এক কয়েদি কয়েদখানায় আছেন বন্দি অবস্থায়।।

শিয়াদের আঘাত হানিলে তার হতাশার আগুন জ্বলে ওঠে,,
প্রখর রবির কিরণ ভাসিয়ে তোলে হুজ্জাতের আর্তনাদকে।

মোদের অপকর্ম পৌঁছাতে তার ভরসা ভেঙে ভেঙে যায়,
গাইবাতের সময়সীমা আরো বেড়ে বেড়ে যায়।

জুলফিকারে হাত দেন দুনিয়ার জুলুম- অত্যাচার দেখে ,
কিন্তু হাই! কুফার কথা মনে পড়ে যায় অবশেষে।

হে খোদা সমাপ্ত করো বেদনা ভরা সময় সীমাকে,,
ইমামে জামানা কে পাঠিয়ে দাও মোদের দিকে দিকে।।

__________________________________________


মারেফাত 
 ✍️ রাজা আলী

ঐ দেখ,ওদিকে
হাহাকার 
পীড়িত ফিলিস্তিনি 
দুঃখ ভার।

অনাহারে মারা যায়
শিশু সব 
অসহায় মানুষের 
কলরব।

গাজা আজ শ্মশানের 
অনুরূপ 
তথাকথিত মানবতা 
নিশ্চুপ ।

পৃথিবী চলছে আজ
একপেশে 
মাহদী আঃ আসবেন
অবশেষে ।

জানো এর শেষে কি
তোমারা সব?
এমামের আবির্ভাব 
করাবেন রব ।

শোনো শোনো মুমিনিন 
তৈরি হও 
এমামের অপেক্ষার 
তরী ব'ও।

"আনা বাকিয়াতুল্লাহ"র ধ্বনি 
সন্নিকটে 
সর্বদা ইমাম আঃ কে রাখো 
হৃদয় পটে।

ইমামের আবির্ভাবে 
মুক্তি 
জালিমের শেষ হবে 
শক্তি ।

প্রয়োজন এখন শুধু 
এবাদত 
হৃদয়ে আনো এমামের 
মারেফাত ।
__________________________________________

     শুধু একবার, হে মাহ্দী!
      ✍️মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

যদি আমার ইমাম, সেই আড়ালে থাকা আলো,
একদিন নাম ধরে ডাকেন,
আমি কি পারি—এই দুনিয়া আর গাফেলি ভুলে
তাঁর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে থাকতে?

আমি যেন শুনি সেই দিব্য কণ্ঠ—
"আনা বাকিয়াতুল্লাহ…"
আসমানের ভাষায়, অশ্রুজলে দ্যুতি মেখে,
সেই ডাকে আমার প্রাণ হুংকার তোলে—
"লাব্বাইকা, ইয়া সাইয়্যিদি!"
এই হৃদয়, এই হাড্ডি-মাংস, শুধু তোমারই হয়ে যাক।

সেদিন—যেদিন তুমি জুহুর ঘোষণা করবে,
অন্যায়ের ছায়া চূর্ণ করে উঠবে ইনসাফের সূর্য,
আমি চাই, আমি প্রার্থনা করি
তুমি যেন আমাকে ডেকে নাও,
তোমার সৈন্যদের কাতারে,
তোমার প্রেমে পোড়া এক সঙ্গী করে।

কিন্তু হে প্রিয় ইমাম,
তার আগেও যদি কখনো—
রাতের নিরবতায়, অথবা একাকী কোনো প্রার্থনার মূহূর্তে,
তুমি কেবল একবার…
আমার নামটি উচ্চারণ করো,
তবে আমি ধন্য হয়ে যাবো,
এই জীবনের অর্থ ফিরে পাবো।

আমি তোমার প্রতীক্ষায় রাত পোহাই,
হাত পেতে থাকি আকাশের দিকে,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমারই গন্ধ খুঁজি,

হে ইমাম!
একবার-
শুধু একবার ডাকো…

------ _____------_____------______------______------

   

Friday, May 23, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ জিলকাদ (ফিলিস্তিন সংখ্যা)




আরবি: জিলকাদ, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: মে, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖



ফিলিস্তিন: মুসলিম উম্মাহর হৃদস্পন্দন

ফিলিস্তিনের মজলুমত্ব ও শিয়া মাযহাবের সমর্থন: কুরআন, হাদীস ও সমসাময়িক ইতিহাসের আলোকে

ইহুদী রাষ্ট্র : নির্মাণের নেপথ্যে

ফিলিস্তিন ও ঈমান

বাইতুল মুকাদ্দাস: মুসলমান দের প্রথম কেবলা 

বারুদের দেশে শৈশব হারিয়ে যায়

ফিলিস্তিন সমস্যা:ইমাম মাহদী আঃ এর আবির্ভাবের পটভূমি
          ✍️  রাজা আলী 

ইমাম আঃ এর আবির্ভাব: শান্তির জগৎ (অনুবাদ)



📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

শুক্রবারের উষালগ্নে

             গাজা
          ✍️  রাজা আলী 

রক্তে লেখা আহ্বান


__________________________________________
__________________________________________

                   সম্পাদকীয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ দয়ার বরকতে আল-হুজ্জাত পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ)-এর যিলকাদ সংখ্যা প্রকাশিত হলো।রাহবারের নির্দেশনা অনুযায়ী ফিলিস্তিন ইস্যুকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।এই সংখ্যা আমরা নিবেদন করছি ফিলিস্তিনের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের স্মৃতির প্রতি, যাঁরা রক্ত দিয়ে লিখছেন প্রতিরোধের ইতিহাস।

ফিলিস্তিন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ঈমানি আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই সংখ্যা তাই একটি উচ্চারণ—আহ্বান ও অনুতাপের, প্রতিবাদ ও প্রত্যাশার।এই সংখ্যায় স্থান পেয়েছে কুরআন-হাদীসের আলোকে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ, মুসলমানদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস, ইমাম মাহদী (আ.)-র আগমনের পটভূমি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রঘোষণা, কবিতা ও সাহিত্যচিন্তার দীপ্ত বার্তা।

আমাদের আশা—পাঠকগণ এই সংখ্যার প্রতিটি প্রবন্ধে খুঁজে পাবেন ঈমানি চেতনার নবজাগরণ, আর অন্তরে অনুভব করবেন নিপীড়িত এক জাতির আর্তনাদ ও অধিকার।
                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

ফিলিস্তিন: মুসলিম উম্মাহর হৃদস্পন্দন
✍️ কবির আলী তরফদার কুম্মী।

رسول الله صلى الله عليه وآله قال:
"من لا يهتم بأمر المسلمين فليس منهم."
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে মুসলমানদের বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।"

ভূমিকা:
 যে ব্যক্তি মুসলমানদের ব্যাপারে চিন্তিত নয়, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়—এই মহান হাদীস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মুসলিম উম্মাহ একটি অদ্বিতীয় দেহের মতো। ফিলিস্তিন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এটি আমাদের ঈমান, আমাদের ইতিহাস, আমাদের অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ যখন সেই ভূমি রক্তে রঞ্জিত, নিপীড়নের যন্ত্রণায় কাঁপছে, তখন এক একটি মুসলিম হৃদয়কে জেগে উঠতে হবে। বুঝতে হবে—কেন ফিলিস্তিন এত গুরুত্বপূর্ণ, কেন কুদস আমাদের হৃদয়ে ও চেতনায় এমন গভীরভাবে গাঁথা।

ফিলিস্তিন কেন মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

ফিলিস্তিন হল সভ্যতাগুলোর সংযোগস্থল। ফিলিস্তিন ও বাইতুল মুকাদ্দাস—নবীদের ভূমি, ঐশ্বরিক ধর্মের আবির্ভাব ও প্রসারের স্থান এবং মুসলমানদের প্রথম কিবলা—সর্বদা বিশ্বের প্রধান ধর্মাবলম্বী ও সকল জাতির জন্য গুরুত্ব ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। ফিলিস্তিন একটি পবিত্র ভূমি, যা ইসলামধর্ম , খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদিধর্ম—এই তিনটি প্রধান ধর্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বলে বিবেচিত হয়।  

আপনি কি কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছেন,কেন ফিলিস্তিন আমাদের মুসলমানদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?অতীতে এমন অনেক ভূমি ছিল এবং এখনও আছে, যা ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফিলিস্তিনের গুরুত্ব অন্য রকম। ফিলিস্তিনকে জানা ও অধ্যয়ন করা মানে হলো মানবতার উচ্চতর মূল্যবোধকে চিনতে পারা, যা এই ভূমিতে বাস্তবায়িত হয়েছে। ফিলিস্তিন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে আল্লাহর নেক বান্দারা বাস করেছেন বা অতিক্রম করেছেন। 

কুদস (জেরুজালেম) ইসলামিক পবিত্রতার অধিকারী, যা মুসলমানদের হৃদয়ে ও স্মৃতিতে গভীরভাবে অঙ্কিত। কুদস তার ধর্মীয় অবস্থানের কারণে, মুসলমানদের প্রথম কিবলা, ইসরা ও মিরাজের ভূমি, মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম শহর, নবুয়ত ও বরকতের ভূমি এবং জিহাদ ও প্রতিরক্ষার স্থান হিসেবে পরিচিত।  

সামগ্রিকভাবে, ফিলিস্তিন ও কুদস নিম্নলিখিত কারণে গুরুত্বপূর্ণ:

১. বাইতুল মুকাদ্দাসের ধর্মীয় মর্যাদা:
বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের কাছে ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহ্ তাআলা কুরআনে এই ভূমিকে পাঁচবার বর্ণনা করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে কুদসের ধর্মীয় মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ।  

ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি নিয়ে মুসলমান, আরব ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তারা সবাই একমত যে—কুদস ইসলামিক, এর পরিচয় রক্ষা করা আবশ্যক এবং ইসরাইলের অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যা কুদসকে ইহুদিকরণ, এর ঐতিহাসিক পরিচয় মুছে ফেলা এবং এর আরবি, ইসলামিক ও খ্রিস্টান চিহ্ন ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। 

২. কুদস মুসলমানদের প্রথম কিবলা:
কুদস মুসলমানদের প্রথম কিবলা, তাই এটি তাদের অনুভূতি, স্মৃতি ও ধর্মীয় চিন্তায় উচ্চ স্থান দখল করে আছে। নবুওয়তের দশম বছর (হিজরতের তিন বছর আগে) থেকে হিজরতের ১৬ মাস পর পর্যন্ত রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ কুদসের দিকে ফিরে নামাজ পড়তেন। এরপর আল্লাহ্ কাবা বা মাসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরানোর নির্দেশ দেন।  

৩. কুদস ইসরা ও মিরাজের ভূমি:
মুসলমানদের চেতনায় কুদসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি রাসূল (সা.)-এর মিরাজের যাত্রার স্থান। আল্লাহ্ চেয়েছিলেন যে রাসূল (সা.)-এর রাত্রিকালীন ভ্রমণ মক্কার মাসজিদুল হারাম থেকে শুরু হয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসে শেষ হোক।  

ইসরা ও মিরাজের ঘটনায় অনেক রহস্য ও ইঙ্গিত রয়েছে, যা এই পবিত্র স্থানের গুরুত্বকে তুলে ধরে। যে স্থানে জিবরাইল (আ.) বুরাক (এক অদ্ভুত বাহন যা মক্কা থেকে কুদসে নিয়ে গিয়েছিল) বেঁধে রেখেছিলেন। জিবরাইল (আ.) এটিকে পাথরের সাথে বেঁধে রেখেছিলেন, যাতে কুদস থেকে আসমানের দিকে 'সিদরাতুল মুনতাহা' পর্যন্ত যাওয়ার পর ফিরে আসতে পারেন। এই ঘটনার কারণে মুসলমানরা যখন 'পাথর' ও 'হায়াতুল বুরাক' দেখে, তখন এই স্মৃতি তাদের মনে ভেসে ওঠে।  

যদি কুদস এত গুরুত্বপূর্ণ না হতো, তাহলে মেরাজ সরাসরি মক্কা থেকে আসমানে হতে পারত, যেমন কুরআন ও হাদীসে এর ইঙ্গিত রয়েছে।  

৪. কুদস নবুয়ত ও বরকতের ভূমি:
কুদস ফিলিস্তিনের একটি অংশ নয়, বরং এর উজ্জ্বল নিদর্শন ও মণিমুক্তা। আল্লাহ্ তাআলা এই ভূমিকে পাঁচবার কুরআনে বর্ণনা করেছেন:  

- ইসরার আয়াতে, যখন বাইতুল মুকাদ্দাসের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।  
- ইব্রাহীম (আ.)-এর ঘটনায়।
- মুসা (আ.)-এর ঘটনায়, যখন ফেরাউন ও তার সৈন্যদের ডুবিয়ে দেওয়ার পর বনি ইসরাইলের কথা বলা হয়েছে।  
- সুলাইমান (আ.)-এর ঘটনায়, যেখানে আল্লাহ্ তাকে যে রাজত্ব ও ক্ষমতা দিয়েছিলেন, তা বর্ণনা করা হয়েছে।  
- সাবা সম্প্রদায়ের ঘটনায়, যেখানে আল্লাহ্ তাদের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তির ব্যবস্থা করেছিলেন।  

এই ভূমিগুলো, যেগুলোকে আল্লাহ্ বরকতময় করেছেন, তা হলো শাম ও ফিলিস্তিনের অঞ্চল। অনেক প্রাচীন ও আধুনিক মুফাসসির মনে করেন, সূরা তীন-এর প্রথম আয়াতগুলোতে "তীন ও জাইতুনের শপথ, সিনাই পর্বতের শপথ এবং এই নিরাপদ নগরীর শপথ..."—এখানে তীন ও জাইতুন দ্বারা বাইতুল মুকাদ্দাসকেই বোঝানো হয়েছে, কারণ সেখানে এই ফলগুলো জন্মে।  

এই গুরুত্বের কারণেই ইমাম খোমেনী (রহ.) ১৯৭৯ সালের আগস্টে ইরান ও বিশ্বের মুসলমানদের উদ্দেশ্যে একটি বার্তা দিয়ে রমজানের শেষ শুক্রবারকে "ইয়াওমুল কুদস" (কুদস দিবস) হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি মুসলমানদেরকে এই দিনে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের আইনগত অধিকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করার আহ্বান জানান।  

উপসংহার:
ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি এবং কুদসের মর্যাদা শুধুই ইতিহাস বা ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব ও সম্মানের প্রতীক। বাইতুল মুকাদ্দাস  আমাদের অতীতের গৌরব, বর্তমানের যন্ত্রণা এবং ভবিষ্যতের মুক্তির আশার প্রতিচ্ছবি। ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসন কেবল একটি ভূখণ্ড দখলের বিষয় নয়, এটি একটি ধর্মীয়, মানবিক এবং সভ্যতাগত অপরাধ।
আজ আমাদের কর্তব্য—এই পবিত্র ভূমির জন্য প্রার্থনা করা, সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা।
কুদস আমাদের ছিল, আছে এবং থাকবে—ইনশাআল্লাহ।
__________________________________________

 ফিলিস্তিনের মজলুমত্ব ও শিয়া মাযহাবের সমর্থন: কুরআন, হাদীস ও সমসাময়িক ইতিহাসের আলোকে
✍️ মাওলানা রিপন মন্ডল ইস্পাহানী


সারসংক্ষেপ:
ফিলিস্তিনের জনগণ কয়েক দশকজুড়ে আন্তর্জাতিক জায়োনিস্ট আগ্রাসনের অধীনে সমসাময়িক ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক নিপীড়ন সহ্য করে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে, শিয়া মাযহাব, যার শিকড় গভীরভাবে কুরআন ও হাদীসে প্রোথিত; সর্বদা মজলুমদের পক্ষে এবং ফিলিস্তিনের জনগণের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা ইসলামী উৎস, আহলে বাইতের (আ.) জীবনচরিত ও শিয়া আলেমদের অবস্থানের আলোকে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে শিয়াদের বিশ্বাসগত ও বাস্তব সমর্থন বিশ্লেষণ করব।

ভূমিকা: মজলুমত্ব—একটি মানবিক ও ঐশী ইস্যু ।মজলুমত্ব একটি সাধারণ মানবিক ব্যথা, যা জাতি, বর্ণ, ভাষা ও সীমানার ঊর্ধ্বে। যখন এই নিপীড়ন পবিত্র ফিলিস্তিন ভূমির দখল, লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া, ইসলামী পবিত্র স্থান ধ্বংস এবং গণহত্যার রূপ নেয়, তখন নীরবতা অপরাধ। এ প্রেক্ষিতে আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষা—"জালিমের শত্রু ও মজলুমের বন্ধু হও"—সমস্ত স্বাধীনতা প্রেমী জাতির অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম অধ্যায়: ফিলিস্তিন দখল থেকে প্রতিরোধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফিলিস্তিন ভূমি দখল শুরু হয়। সাত লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি হারায়, শত শত গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়, হাজার হাজার নিরীহ মানুষ শহীদ হন।
সাবরা ও শাতিলা, জেনিন, গাজা সহ বহু গণহত্যা জায়োনিস্টদের নৃশংসতার প্রমাণ।
বায়তুল মুকাদ্দাস, মুসলমানদের প্রথম কিবলা, আজও অপমান ও দখলের শিকার।

দ্বিতীয় অধ্যায়: কুরআনের আলোকে মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর ভিত্তি

সূরা নিসা, আয়াত ৭৫:
"তোমরা কেন আল্লাহর পথে এবং নিপীড়িতদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করো না?"

সূরা হজ্জ, আয়াত ৪১:
"যখন আমি তাদেরকে ভূমিতে শক্তি দিই, তখন তারা সালাত কায়েম করে এবং মন্দকে নিষিদ্ধ করে।"

কুরআনের শিক্ষা স্পষ্ট: মজলুমদের পাশে থাকা এবং জালিমদের বিরুদ্ধাচরণ করা ঈমানের আবশ্যক দিক।

তৃতীয় অধ্যায়: আহলে বাইতের (আ.) বাণীতে মজলুমের সমর্থন ও জুলুমের বিরোধিতা

ইমাম আলী (আ.):
"জালিমের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, মজলুমের সহায়ক হও" — (নাহজুল বালাগা, পত্র ৪৭)

ইমাম হুসাইন (আ.):
কারবালার মাধ্যমে চিরন্তন জুলুমবিরোধী আদর্শ স্থাপন করেন।

ইমাম সাদিক (আ.):
"যে কেউ একজন জালিমকে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে ঐ জালিমের হাতে শাস্তি দিবেন।"

চতুর্থ অধ্যায়: ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে শিয়া আলেমদের অবস্থান

ইমাম খোমেনী (রহ):

ফিলিস্তিনকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলেছেন।
তিনি আল-কুদস দিবস চালু করেন (রমজানের শেষ শুক্রবার)। এবং বলেন, "ইসরাইলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে হবে।"

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (দা.জি):

সর্বদা হামাস, ইসলামি জিহাদ, হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য প্রতিরোধ আন্দোলনকে সর্বদা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছন। এবং ঘোষণা করেছেন, "ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনের; ইসরাইল ধ্বংস অনিবার্য।"

আয়াতুল্লাহ সিস্তানি, আয়াতুল্লাহ বেহজত, আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমলি, আয়াতুল্লাহ নূরী হামেদানী সহ বহু শিয়া মর্জে তাকলিদ ফিলিস্তিনের প্রতি তাদের নৈতিক সমর্থন ঘোষণা করেছেন।

পঞ্চম অধ্যায়: প্রতিরোধে শিয়াদের ভূমিকা

হিজবুল্লাহ (লেবানন): শিয়া ভিত্তিক প্রতিরোধ বাহিনী, ইসরাইলকে একাধিকবার পরাজিত করেছে। এবং আল আকসা অভিযানের পর গাজায়  ইসরাইলের আগ্রাসনের সময় গাজার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বছর খানেক ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।এই যুদ্ধে হাসান নাসরুল্লাহ র আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় শোভা পাচ্ছে।

ইরান: একমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্র যা ফিলিস্তিনকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন করে।

জাইনাবিয়ুন ও ফাতেমিয়ুন ব্রিগেড: শিয়া রেজিস্ট্যান্স যোদ্ধারা যারা মধ্যপ্রাচ্যে দখলদার ও তাকফিরি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়ছেন।

ষষ্ঠ অধ্যায়: আজকের সময়ে শিয়া ও বিশ্ব মানবতার দায়িত্ব

আজ আমাদের দায়িত্ব কেবলমাত্র দোয়া ও স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়:

১.মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে ফিলিস্তিনের আওয়াজ তোলা

২.অর্থনৈতিক বয়কট—ইসরাইলি পণ্য পরিহার করা।

৩.বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদে সচেতনতা ছড়ানো।

৪.রাজনীতি ও বাস্তবিক ময়দানে প্রতিরোধের পাশে থাকা।

উপসংহার:

তাশায়্যু' বা শিয়া মাযহাব কেবল একটি বিশ্বাস নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল ন্যায়ভিত্তিক জীবনদর্শন। ফিলিস্তিনের মজলুমত্ব আজ আমাদের ঈমান ও মানবতার পরীক্ষা। ইমাম হুসাইন (আ.) যেমন রক্ত দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনই আজ আমাদের উচিত—কলম, শব্দ, সম্পদ ও অবস্থান দিয়ে মজলুম ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানো।"যদি ধর্মে জীবন না থাকে, তাহলে অন্তত একজন মুক্ত মানুষ হয়ে ওঠো!"
— ইমাম হুসাইন (আ.)

__________________________________________

ইহুদী রাষ্ট্র : নির্মাণের নেপথ্যে
✍️ মাওলানা রেজাউল হক কুম্মী


ফিলিস্তিন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাঃ ইরশাদ করেছেন:"সর্বদা ফিলিস্তিনে একটি সত্যবাদী দলের অবস্থান থাকবে ও এক শ্রেনীর মানুষ থাকবে যারা সত্যের জন্য লড়াই করতে থাকবে"। 
রাসূলুল্লাহ্ সা্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া আলীহি ওয়া সাল্লামের আর্বিভাব হবার পূর্বে ফিলিস্তিন একটি বিশেষ গুরুত্ব পূর্ণ জায়গার নাম ছিল।তাঁর অনেকগুলো কারণ ছিল, সেই সমস্ত কারণের মধ্যে একটি বিশেষ কারণ হলো, বিশিষ্ট নবীগণ ও বিপুল নবীগণেরা ফিলিস্তিনে জন্ম গ্রহণ করেন ও তাঁদের সমাধি স্থানও ফিলিস্তিনে।সেই জন্য ঐ স্থান পাক ও পবিত্র স্থান হিসাবে গণ্য হতো।
 
       ফিলিস্তিনের ইতিহাসের ব্যপারে লিখতে গেলে কয়েক খন্ড বই লিখতে হবে, সেই জন্য এই ছোট্ট লেখাটির মধ্যে শুধূ বর্তমান ফিলিস্তিনের মানচিত্র সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনের স্বল্প কিছু অংশ তুলে ধরছি।পৃথিবীর মানচিত্র দেখলে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডের রেখা খুঁজে পাওয়া যাবে না, বরং ইসরাইলের মানচিত্র রেখা বোল্ড করে লেখা আছে। অথচ এখান থেকে সত্তর আশি বৎসর পূর্বে ইসরাইলের নাম পৃথিবীর মানচিত্র ছিলো না। সুতরাং এটাই হলো ইতিহাসের সব থেকে বড়ো জুলুম ও অত্যাচার। কিন্তু তাঁর থেকেও অতিদুঃখের বিষয় এখনো মুসলিম বিশ্ব ঘুমিয়ে আছে ফিলিস্তিনী মুসলমানদের উপর জুলুম অত্যাচার হয়েও  যাচ্ছে, তাঁর পরেও কোন প্রতিবাদ করছে না।

      আপনারা হয়তো প্রশ্ন করবেন
ফিলিস্তিনের এই রকম মর্মান্তিক অবস্থা কীভাবে ঘটলো?এর উত্তর খুঁজতে গেলে কিছু ইতিহাসের পাতা উল্টাতে হবে।রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের যুগ  থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের অনেক ইতিহাস আছে। কিন্তু সেই ইতিহাস ছেড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে ঘটনা ঘটেছে সেগুলো পড়লে বাস্তবটা জানা যাবে।
      ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্যে আরব, ইহুদী,খৃষ্টান, মুসলমান ও অন্যান্যরাও বসবাস করতো। কিন্তু কিছু অর্থশালী ও প্রভাবশালী ইহুদী, যারা ইউরোপ মহাদেশ ও অন্যান্য দেশে নির্যাতিত হয়ে ছিলো এবং যারা ফিলিস্তিনের ইহুদী তাঁরা সম্মিলিত ভাবে, ঐ সময়ের প্রভাবশালী দেশ গুলোর নিকট আলাদা একটি রাষ্ট্রের আবেদন করছিল।তারা তাদের জন্য একটি ইহুদী দেশের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আর্জি জানায় ,যাতে যেখানে তারা সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারে। এই নিয়ে International meeting হলো, সেখানে বিশেষ ভাবে আমেরিকা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স,রাশিয়া, ইতালি ও আরো বিভিন্ন দেশ মিলে ফিলিস্তিনের কিছু অংশকে ইহুদী দেশ ঘোষণা করলেন। কিন্তু মুসলমান দেশগুলো কোনোরূপ  প্রতিবাদ করলো না।
       তার পর থেকে প্রভাবশালী ও অর্থশালী ইহুদীরা বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদি দের ফিলিস্তিনে আগমণ ঘটাতে লাগল‌ । তাঁরা আসতে না আসতেই মুসলমানদের জমি জায়গা ঘরবাড়ী বিক্রয় না করলেও জোরপূর্বক ভাবে ও জুলুম- অত্যাচারের দ্বারা মুসলমানদের নিকট থেকে দখল করে নিতে থাকে।সেই ক্ষেত্রে মুসলমানরা অভিযোগ এবং প্রতিবাদ করলে তাঁদেরকে অন্যায় ভাবে জেল-কোট আদালত করে বিভিন্ন ধরণের শাস্তি দেওয়া হতো, এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্যায় ভাবে মুসলমানদের নির্বাসন করা হতো। এ ভাবেই মুসলমানদের জমি জায়গা ইহুদীরা দখল করতে থাকল।এই দখলদারিত্বের ফলেই ফিলিস্তিনের বেশিরভাগ ভূমি আজ ইসরাইল গ্রাস করে নিয়েছে। এভাবেই তৈরি হয়েছে ফিলিস্তিন সংকট‌।

_________________________________________

ফিলিস্তিন ও ঈমান
✍️ সুজা উদ্দিন মাশহাদী

قال رسول الله صلی الله علیه و آله و سلم "حب الوطن ایمان"
অর্থাৎ জন্মভূমির প্রতি প্রেম ঈমানের অঙ্গ"। এই কথাটির মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, নিজের দেশকে ভালোবাসা একজন মুসলমানের ঈমান বা বিশ্বাসেরই অংশ। ইসলাম শুধুমাত্র নামায, রোযার ধর্ম নয়, বরং ন্যায়নীতি, দায়িত্ববোধ,দেশপ্রেমও শেখায়।

জন্মভূমির প্রতি প্রেম ইসলামে: ...
পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজের জন্মভূমি মক্কাকে অনেক ভালোবাসতেন। হিজরতের সময় তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “হে মক্কা! তুমি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়, যদি আমাকে এখান থেকে বের না করে দেওয়া হতো, আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।”

একজন মুসলমানের দায়িত্ব:....
একজন মুসলমানের উচিত তার দেশকে ভালোবাসা, দেশের সেবা করা এবং সৎ নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। দেশকে দুনিয়াবী ও আখিরাতের শান্তির পথ দেখানোও ইসলামি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
* মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য হলো ফিলিস্তিনি জনগণকে সমর্থন করা, তাদের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের মুক্তির জন্য যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালানো। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সমস্যা নয়, বরং ঈমানের কর্তব্য। সিরাজুল হক বলেন: "ফিলিস্তিনিদের সাফল্য সমগ্র জাতির সাফল্য, ফিলিস্তিনিদের পরাজয় হবে ইহুদি ও ইহুদিবাদীদের সাফল্য।"

ফিলিস্তিন এবং ঈমান : এক ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে:....
ফিলিস্তিনের সমস্যা কেবল একটি ভৌগোলিক বিরোধ নয়, বরং এটি বিশ্বাস, বিশ্বাস এবং আদর্শের সমস্যা। এই বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় এবং নৈতিক দায়িত্বের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ইতিহাসে ফিলিস্তিনের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং একে সমর্থন করা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য।

ইসলামী শিক্ষায় ফিলিস্তিনের গুরুত্ব:.....
  ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদকে মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম উপাসনালয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফিলিস্তিন সমস্যা ঈমানের অংশ:.... 
ইমাম সাইয়্যেদ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেইনী (রহ.) বলেছেন: "ফিলিস্তিনের বিষয়টি আমাদের জন্য কোনও কৌশলগত বিষয় নয়, বরং এটি বিশ্বাসের বিষয়, হৃদয়ের বিষয়, ঈমানের বিষয়।" [১] 
একইভাবে, ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বলেছেন: "যদি ইসলামী বিশ্বে ঐক্য থাকত, তাহলে মুসলিম উম্মাহ এত সমস্যায় পড়ত না। ফিলিস্তিন ইস্যু ইসলামী বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা।" [২]

ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রাম:.....
ফিলিস্তিনি জনগণ গত কয়েক দশক ধরে তাদের ভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সংগ্রাম করে আসছে। তাদের সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক কর্তব্যও বটে। হাফিজ সাদ হুসেন রিজভী বলেন: "ফিলিস্তিন কেবল ফিলিস্তিনিদের সমস্যা নয়, বরং বিশ্বাস, আদর্শ এবং বিশ্বাসের সমস্যা।" 

উপসংহার:....
নিজের দেশকে ভালোবাসা কেবল আবেগ নয়, এটি ঈমানের পরিচয়। তাই আমাদের সবাইকে দেশকে ভালোবাসতে হবে, দেশের জন্য সৎভাবে কাজ করতে হবে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে।
ফিলিস্তিন ইস্যু মুসলিম উম্মাহর একটি জটিল সমস্যা। এটিকে সমর্থন করা প্রতিটি মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য। আমাদের প্রার্থনা, আর্থিক সাহায্য এবং রাজনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রামকে সমর্থন করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের এই দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করুন।
__________________________________________

 বাইতুল মুকাদ্দাস: মুসলমান দের প্রথম কেবলা 
✍️  মজিদুল ইসলাম শাহ

মুসলিম জাতিসমূহের ঐক্যের অর্থ হলো-ইসলামী বিশ্বের সমস্যাগুলোতে একসাথে এগিয়ে আসা এবং পরস্পরকে  সহযোগিতা করা।
ফিলিস্তিনের মুক্তি ও দখলদারদের কবল থেকে প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস উদ্ধারের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা আজ পুনরায় বিক্ষোভে মুখরিত। তারা মানবাধিকারের দাবিদার ও মানবতাবাদীদের আহ্বান জানাচ্ছে নবীদের পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করার, নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের উপর জায়োনিস্টদের বর্বরতা বন্ধ করার। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিবছর পালিত বিশ্ব কুদস দিবস সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী জাতিসমূহ ও মুসলিম উম্মাহর আবেগের প্রতীক। এটি সেই দিন, যখন মুসলিম উম্মাহ ও মানবতাবাদী মানুষ জালিম জায়োনিস্ট শাসনের দখলদারিত্ব, অপরাধ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এককণ্ঠে ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচার ও মুক্তির দাবি তোলে। এটি ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ দিন নয়, বরং বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার-যারা অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পতাকা উঁচু রেখেছে।
     'কুদস দিবস' বাইতুল মুকাদ্দাসের মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক দিবস, যা ইসলামী বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত। ইমাম খোমেইনি (রহ.)-এর নির্দেশে এ দিবস পালিত হয়। এটি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যেখানে দখলদার জায়োনিস্ট শাসন ও তাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন জানানো হয়।  
    ১৯৪৮ সালে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ মুসলমানদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাসকে তার বাসিন্দাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। জায়োনিস্ট শাসনের এই অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের মুসলমানরা শুরু থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, যা আজও প্রবলভাবে চলছে। ইসলামী বিপ্লবের সফলতার পর ইমাম খোমেইনি বাইতুল মুকাদ্দাসকে দখলদারদের কবল থেকে মুক্ত করতে রমজানের শেষ শুক্রবারকে 'কুদস দিবস' হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি তার বার্তায় বলেন, "বিশ্বের সকল মুসলমান ও ইসলামী সরকার এই দখলদার ও তাদের সমর্থকদের মোকাবিলা করবে।" বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতার এই বার্তা নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়েছিল। ইমাম খোমেইনির মতে, কুদস দিবস হলো বৈশ্বিক দিন-যা মজলুম ও মুস্তাকবিরদের মধ্যে সংঘাতের প্রতীক।  
এটি সেই সব জাতির প্রতিরোধের দিন, যারা সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও পশ্চিমা শোষণের শিকার। কুদস দিবস প্রতিরোধ অক্ষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ফিলিস্তিনি সংগ্রামের প্রতি সমর্থনকে শক্তিশালী করে। এই দিনে মুজাহিদরা ফিলিস্তিনের প্রতিরক্ষায় তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। এবারের কুদস দিবস এমন এক সময়ে পালিত হয়েছে, যখন দখলদার জায়োনিস্ট সরকার পুনরায় তার বর্বর চেহারা উন্মোচন করেছে-গাজার নিরস্ত্র ও নির্যাতিত মানুষদের বোমাবর্ষণ, অবরোধ ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। গাজার বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুত হওয়া, ধ্বংসযজ্ঞ ও নিরীহ ফিলিস্তিনি শিশুদের শাহাদতের মর্মান্তিক দৃশ্য আজ বিশ্বের চোখের সামনে। মানবাধিকারের দাবিদার ও শিশুহন্তা আগ্রাসী সরকারের সমর্থকদের জন্য এটি লজ্জার দলিল। কুদস দিবস মূলত দখলদার জায়োনিস্ট শাসন ও আমেরিকার জন্যও একটি বার্তা।

      প্রথম কিবলার পবিত্রতা তার নামেই সুস্পষ্ট। এর মর্যাদার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে এটি মুসলিম বিশ্বের প্রথম কিবলা। এই পবিত্র গৃহের দিকে ফিরে প্রথম মুমিনরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইমামতিতে নামাজ আদায় করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় নবীকে মিরাজে নেওয়ার জন্য এই পবিত্র স্থানকেই বেছে নিয়েছিলেন। খোদার বিশেষ ব্যক্তিত্বরা, বিশেষত নবীরা, এই স্থান জিয়ারতকে গৌরবের বিষয় মনে করতেন। বাইতুল মুকাদ্দাস হলো তাওহিদবাদী প্রথম সিজদাকারীদের কেন্দ্র, যাদের সিজদা মানবতাকে হাজারো শিরক থেকে মুক্ত করেছিল। আজ সেই প্রথম কিবলা আমেরিকার পুতুল, ইসলাম বিরোধী, মানবতা বিরোধী, জালিম ও দখলদার ইসরাইলের পদদলিত ।এই ভূমি মুসলিম বিশ্বের কাছে নিজের মুক্তির আকুতি জানাচ্ছে।

   ১৯৯২ সালে তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী রাবিনের বক্তব্য:
"প্রতিটি ইহুদি, ধার্মিক হোক বা ধর্মনিরপেক্ষ, এই শপথ করে: হে জেরুজালেম! আমি যদি তোমাকে ভুলে যাই, তবে আমার ডান হাত শুকিয়ে যাক।" জায়োনিস্টরা কেবল বাক্যবাগীশতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি (তথাকথিত ইসলামী শাসকদের মতো), বরং এই লক্ষ্যে নৃশংস ও নির্মম পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা সকল প্রকার কৌশল, ধোঁকা ও প্রতারণা প্রয়োগ করেছে-ফিলিস্তিনি মুসলমানদের উচ্ছেদ করে ইহুদিদের ব্যাপকভাবে বসতি স্থাপন করেছে। বারবার শহরের ইসলামী প্রতীক ও নিদর্শন মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে,  মসজিদুল আকসায় অগ্নিসংযোগ করেছে, পবিত্র স্থানগুলিকে অপমানিত করেছে।বারবার ফিলিস্তিনি নামাজিদের রক্তে আকসার মেঝে রঞ্জিত করেছে। মসজিদুল আকসার দেয়াল আজও নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের করুণ অবস্থার সাক্ষী। অথচ তথাকথিত মুসলিম সরকারগুলোর নেতারা তাদের বিলাসবহুল প্রাসাদে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে আছেন।

আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অপমান ও মুসলিম বিশ্বের দুর্বলতা:
আল্লাহর এই সকল নিদর্শন শত্রুদের দখলে থাকা এবং তাদের দৈনিক অপমান মুসলিম উম্মাহর অসহায়ত্ব ও পরাধীনতার জ্বলন্ত প্রমাণ। মসজিদুল আকসা উদ্ধারের বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা মাজহাবের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির সাথে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে সকল মুসলমানের দায়িত্ব ছিল—কাবা শরীফের প্রতি বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের যে আধ্যাত্মিক শ্রদ্ধা ও আবেগ রয়েছে, সেই একই মর্যাদা প্রথম কিবলার জন্যও নিশ্চিত করা। তাহলে কেন এই প্রশ্নগুলো একজন সচেতন মুসলমানের হৃদয়ে অশান্তি সৃষ্টি করবে না?  
- বিশ্বব্যাপী কেন বাইতুল মুকাদ্দাসকে জায়োনিবাদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য কোনো সংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠছে না?  
- কেন এই ইস্যুকে বিস্মৃতির গহ্বরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে?  
বিশ্ব কুদস দিবসের তাৎপর্য:
বিশ্ব কুদস দিবস মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি লক্ষ্য ও স্লোগানের অধীনে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের শক্তিকে একত্রিত করার দিন, সকল মুসলিম দেশ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির দিন। এটি ইসলামের দিন, মানবতার দিন, বিপ্লবের দিন।  

ঐক্যের প্রকৃত অর্থ:
- ঐক্য অর্থ বিভিন্ন ইসলামী মাজহাবের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংঘাত এড়ানো।  
- মুসলিম ঐক্য বলতে বোঝায়: একে অপরের অস্তিত্বকে অস্বীকার না করা, শত্রুর পক্ষে সহযোগিতা না করা, এবং পরস্পরের উপর জুলুম করা থেকে বিরত থাকা।  
- মুসলিম জাতিসমূহের ঐক্য অর্থ—ইসলামী বিশ্বের সমস্যাগুলোতে একসাথে এগিয়ে আসা, পরস্পরের সম্পদকে শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা।  
ঐক্য বাস্তবায়নের পথ:

১. বহুমুখী সহযোগিতা: বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাধারা, যাদের মধ্যে উপ-মাজহাবও রয়েছে, তাদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রকৃত সহযোগিতা ও ঐক্য বজায় রাখতে হবে।  
২. মাজহাবিক সান্নিধ্য: বিভিন্ন মাজহাব নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য কমিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করবে। ফিকহি ও আকিদাগত মিলের জায়গাগুলো চিহ্নিত করবে। আলেমদের ফতোয়া পুনর্বিবেচনা করে সামঞ্জস্য আনা যেতে পারে।  
3. মুসলিম শক্তির উৎস: মুসলিম দেশগুলো যদি হাত মিলায়, তবে এমন শক্তি তৈরি হবে যা শত্রুরা মোকাবেলা করতে পারবে না। মতপার্থক্য থাকলেও শত্রুর দোসর না হয়ে যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে ইসলামী বিশ্বের বিজয় অনিবার্য।  

চূড়ান্ত বার্তা:

যে সকল জাতি সংগ্রামের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে, তাদেরকে এই পথে অটল থাকতে হবে। আমেরিকা বা তার মতো কোনো শক্তি তখন তাদের উপর জুলুম চালাতে পারবে না। বিজয় হবে তাদের নিয়তি। ইসলামী বিশ্বকে যদি বিজয়ের পথে এগিয়ে যেতে হয়, তবে ঐক্য প্রতিষ্ঠা-এটিই প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।

__________________________________________

বারুদের দেশে শৈশব হারিয়ে যায়
            ✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

"আম্মু, আমি কি আজ রাতে ঘুমাতে পারব?
আমার ছোট ভাইটাকে তো বোমা নিয়ে গেল...
তোমার কোলে এখন আর গন্ধ নেই দুধের,
শুধু আছে বারুদের ঝাঁজ।"
--- এই পঙ্‌ক্তিগুলো কোনো কবিতা নয়,
এ এক ফিলিস্তিনী শিশুর রক্তমাখা বাস্তবতা।


 ভূমিকা

বিশ্ব আজ এক অন্ধকার সময় অতিক্রম করছে,
আর এই আঁধারের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ফিলিস্তিন।
বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র ভূমি আজ পরিণত হয়েছে রক্তের নদী, বারুদের গন্ধে ভারী বাতাসে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে শত শত নিরীহ জীবন।
শিশুরা হারাচ্ছে শৈশব, মায়েরা সন্তান, আর প্রতিটি ঘুম ভেঙে যাচ্ছে বোমার বিকট শব্দে।

এই নিষ্ঠুর সময়েই আমাদের অন্তর চেয়ে থাকে সেই প্রতিশ্রুত মহামানবের দিকে—
ইমাম মাহদী (আ.ফা.), যিনি আল্লাহর আদেশে পৃথিবীকে ন্যায়ের আলোয় আলোকিত করবেন।

 ফিলিস্তিন: অব্যাহত দুর্দশার করুণ ইতিহাস

ফিলিস্তিনের ট্র্যাজেডি কেবল একটি ভৌগোলিক সংঘর্ষ নয়, এটা এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়।
শিশুদের লাশ, বিধ্বস্ত ঘর, রক্তাক্ত হাসপাতাল আর ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ—
এসব যেন আসমানের নিচে ব্যক্ত এবং প্রকম্পিত এক আর্তনাদ।

বিশ্ব যেখানে নির্বিকার দর্শক,
সেখানে ফিলিস্তিনিরা আল্লাহর সামনে হাত তুলে বলে— "হে প্রভু, অন্তত এই রাতটা যেন শান্তিতে কাটে!" কিন্তু আকাশ থেকে নেমে আসে আগুনের বৃষ্টি।

ছোট্ট আয়েশা, রাহিল বা ফাতিমা—
যারা খেলনার বদলে পেয়েছে ধ্বংসস্তূপের মাঝে অনন্ত নীরবতা। তারা কারো কাছে কিছুই চায়নি—
শুধু একটি শান্ত ঘুম, একটি সূর্যভোর।

 ইমামে জামান (আ.ফা.): আশার আলো
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)—
আল্লাহর সেই প্রতিনিধি, যিনি অবিচারের মূলোৎপাটন করবেন, যিনি পৃথিবীকে ন্যায়ের রাজ্যরূপে গড়ে তুলবেন।

 হাদীসের ভাষায়:

“তিনি পৃথিবীকে ন্যায়ে পূর্ণ করবেন, যেভাবে তা জুলুমে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।” — (সহীহ মুসলিম)

ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের সমস্ত নিপীড়িত হৃদয় আজ চেয়ে আছে তাঁর আগমনের দিকে, বিশ্বাস করে— একদিন এই অন্ধকার রাত ভাঙবে,
আর মুক্তির সূর্য উঠবে মাহদী (আ.ফা.)-এর হাতে।

 আমাদের গাফিলতি

যখন একটি শিশু তার ভাইকে হারায় বোমার আঘাতে, আর একটি মা নিঃশেষ হৃদয়ে সন্তানের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে, তখন যেন গোটা মানবতা কাঁদে। তবু আমাদের অনেকের কাছে তা কেবল সংবাদের শিরোনাম।

রাহিলের রক্ত মাটিতে শুকায়,
আর আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলফি পোস্ট করি। গাজার আকাশে যখন আগুনের ঝড় বয়ে যায়, তখন আমরা আলোকসজ্জায় মগ্ন থাকি।
এই নির্লজ্জ গাফিলতিই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

        আমাদের দায়িত্ব

ইমামের আগমনের প্রতীক্ষা শুধু মুখে নয়—
তা হতে হবে কর্মে, হৃদয়ে, চরিত্রে।

 আমাদের যা করণীয় :

• ❌ জালিম রাষ্ট্র ও তাদের পণ্য বর্জন
• 💰 নিঃস্বার্থভাবে ফিলিস্তিনিদের সাহায্য
• 📢 জনমত গঠনে সোচ্চার ভূমিকা
• 🤲 শহীদদের জন্য অন্তর থেকে দোয়া
• 🧠 আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতা লালন
• ⏳ ইমামের সৈনিক হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি


                  উপসংহার

একটি ফিলিস্তিনী শিশু যদি জিজ্ঞেস করে—
 "আপনি কী আমাদের পাশে ছিলেন?"
আপনার উত্তর কী হবে?

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন—
“অবিচারের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানেই অত্যাচারীর পক্ষে দাঁড়ানো।”

আমরা কী নীরব থাকব, না কি দাঁড়াবো নিপীড়িতদের পাশে?

আজকের এই অন্ধকার সময়ের শেষে
আমরা আশাবাদী—
আসবেন সেই মাহদী (আ.ফা.),
যিনি মুছে দেবেন জুলুমের প্রতিটি দাগ।

আসুন, তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য
নিজেদের হৃদয় প্রস্তুত করি—
আর ফিলিস্তিনের জন্য প্রার্থনা করি এই অটুট বিশ্বাসে: "ইন্নাল্লাহা মাআস্সাবিরীন।"
(নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।)


 ইয়া সাহিবাজ্জামান, আগিসনি!
 ইয়া সাহিবাজ্জামান, আদরিকনি!
(হে যুগের ইমাম, আমাদের সাহায্য করুন! হে যুগের ইমাম, আমাদের উদ্ধার করুন!)

__________________________________________

ফিলিস্তিন সমস্যা:ইমাম মাহদী আঃ এর আবির্ভাবের পটভূমি 
        ✍️ রাজা আলী

একবিংশ শতাব্দীর এক ক্রান্তিলগ্ন আমরা অতিবাহিত করছি। জালিম ও জুলুমের একচ্ছত্র দাপাদাপি সময়কে করে তুলেছে বিষাক্ত। অসহায় মানুষের আর্তি ও আর্তনাদ কাঁদাচ্ছে বিবেকী সকল হৃদয়কে। নির্বিচারে হত্যা,রক্ত আর কান্নায় প্রতিটি সকাল বিষন্ন হয়ে উঠছে।মানবতা আজ মুখ লুকিয়েছে।আর হিংস্রতা প্রবল বৃদ্ধি পেয়ে মানব সভ্যতাকে গ্রাস করে চলেছে।
      বর্তমান যে পরিস্থিতি আমরা অতিবাহিত করছি,তা কোরান ও হাদিসের সঙ্গে সংঘর্ষিক কোনো বিষয় নয়। বরং কোরান ও হাদিসের ভাষ্যে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথাই ছিল। বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পরিবর্তিত বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহ রব্বুল আলামীন একজন মহামানব, মহাকালের ত্রাণকর্তা কে পাঠাবেন। তিনি আল কোরানে ঘোষণা করেছেন-"অবশ্য ই এই জমিনকে নতুন জীবন দেওয়া হবে ,যখন তার মৃত্যু হয়ে যাবে"। (সুরা হাদীদ,১৭ নং আয়াত)

এই আয়াতটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় ,যখন অত্যাচারি দের জুলুমের  দ্বারা এই জমিনের মৃত্যু ঘটবে,তখন ই আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর নির্বাচিত এক প্রতিনিধির দ্বারা এই জমিনকে নতুন করে জীবন দান করবেন, আর্থাৎ জমিনের ওপর শান্তি ও সুস্থতা প্রদান করবেন।
      ইতিহাসের বহু গভীরে প্রোথিত ফিলিস্তিন সমস্যা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিটোল স্বার্থ,আর জায়নবাদী দের সম্প্রসারণ নীতি যখন একত্রে মিশেছে,তখন ই ফিলিস্তিনিরা মাতৃভূমি র অধিকার হারাতে বসেছে।ফলে প্রতিরোধের শক্ত প্রাচীর ই হয়ে ওঠে একমাত্র বেঁচে থাকার উপায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিনের উপর দীর্ঘদিন ধরে অবিচার ও অত্যাচার করে এসেছে।আর আল আকসা অভিযানের পর প্রায় গত দেড় বছরে ইসরাইল গাজা ভূখণ্ডের উপর যে বোমা ও বারুদের ব্যবহার করেছে,তা অবর্ণনীয়। বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখিত যে, ইসরাইল গাজা ভূখণ্ডে হিরোসিমা বা নাগাসাকির থেকেও কয়েকগুণ বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে।ফলে গাজা মূলত হয়ে উঠেছে বসবাসের অযোগ্য। সীমান্তে খাদ্যের ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলেও তা গাজা র ক্ষুধা পীড়িত মানুষদের কাছে অনেকটা মরীচিকার মতোই।গাজাবাসী একাধিক বার হয়েছে বাস্তুচ্যুত।নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই,যা আছে তা হলো বোমা ও  বারুদের গন্ধ এবং অঢেল যন্ত্রণা।রাফাহ সহ বেশিরভাগ গাজা শেষ, ধ্বংস স্তূপ;অধিকাংশ বাড়ি ও বিল্ডিং আজ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ফিলিস্তিনের পবিত্র জমিন এর পরেও কি জীবন্ত আছে?এই জমিন  মানুষের আশা-ভরসা ও সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার কি দিশা দেখাতে পারছে? ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমির জীবন-শিরা কি কাঁটা পড়ে নি?
       ইতিপূর্বেও অন্তত দুবার জমিনের উপর প্রবল অত্যাচার হয়েছে। জমিনের জীবন কে হত্যা করা হয়েছে। যথা ---
১.যখন জানাবে ইয়াহইয়া নবীকে হত্যা করা হয়,
২.যখন কারবালাতে ৬১ হিজরী তে আলি আসগারকে শহিদ করা হয়। 

উল্লেখিত মর্মান্তিক দুটি ঘটনার পরপর ই আমরা আল আকসা অভিযানের পরবর্তী গাজার ধ্বংস যজ্ঞ, বিশেষ করে নারী ও শিশু হত্যার কথা বলতে পারি।এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা কারবালা র ঘটনা পরবর্তী সময়ে সম্ভবত অদ্বিতীয় এবং বিরল।
         গাজা ভূমিতে যে অবর্ণনীয় ধ্বংস যজ্ঞ চলছে,তাতে বিবেকী মানুষ শিউরে উঠছে। মানুষের বাসস্থান নেই,খাদ্য নেই, পিতার সম্মুখে সন্তানের মৃত্যু বা সন্তানের সম্মুখে পিতার।আশ্রয় কেন্দ্র, স্কুল বা হসপিটাল কোনো কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না।অথচ তথাকথিত মানবতার ধ্বজাধারী দেশগুলো নিশ্চুপ। বরং তাদের প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য মদত ও সহযোগিতায় গাজাবাসী র উপর নিদারুণ এই অত্যাচার নেমে এসেছে।আর হাদিসেও এসেছে "পৃথিবী যখন অন্যায় ও অবিচারে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে,তখনই  ইমাম আঃ আর্বিভূত হবেন"। তাই ফিলিস্তিন সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, নিদারুণ অত্যাচারের বহিঃপ্রকাশে তা হাদিসের ভাষ্যকেই সত্যায়িত করে এবং ইমাম মাহদী আঃ এর আবির্ভাবের পটভূমি তৈরি করে
 তাঁর আবির্ভাব কে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।

__________________________________________

ইমাম আঃ এর আবির্ভাব: শান্তির জগৎ (অনুবাদ)
   ✍️ মাওলানা কাজিম আলি

পৃথিবীর সমস্ত অন্যায় ও জুলুম একদিন শেষ হবে।যখন জুলুম ও অত্যাচারের সমস্ত কারণ ধ্বংস হয়ে ফিতনা ফাসাদের প্রবাহ শুষ্ক হবে, হত্যা-অত্যাচার-অবিচারের শিকড় কাটা পড়বে, তখন সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি ও সুস্থতা বিরাজ করবে।এই এই শান্তি -সুস্থতা ও সুস্থিতির প্রধান কারিগর হলেন ইমাম মাহদী আঃ।তার আবির্ভাব এবং শাসনকাল হলো শান্তি ও স্বস্তি র পর্ব।হজরত ইমাম মোহাম্মাদ বাক্বের (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “ঐ যুগে একজন বুড়ি পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সফর করবে, তাকে কেউ কষ্ট দেবে না”।
(মুনতাখাবুল আছার, পৃঃ ৩৭৯)।

        মাহ্দী (আঃ)-এর যুগ সম্পর্কে রাসুলে খোদা (সাঃ) এরশাদ করেছেন: 'মাহ্দীর যুগে
নেয়ামত অধিক হবে, বৃষ্টি বর্ষণের ফলে জমি সবুজ ফসলে পূর্ণ হবে, মানুষের অন্তর হিংসা থেকে মুক্ত হবে, হিংস্র জন্তু-জানোয়ার শান্ত হবে। একজন মহিলা ইরাক ও সিরিয়ার মাঝে সফর করবে, সে তার সমস্ত সাজের গহনা পরিধান করবে; কিন্তু কোন ব্যক্তি তাকে বিঘ্ন ঘটাবে না'। (মোজাল্লে ইনতেজার, সংখ্যা ১৪ পৃ-২০৫)।

      আর হজরত আলী (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে: মাহ্দী তাঁর প্রতিনিধিদেরকে প্রত্যেক
শহরে পাঠাবেন, যাতে করে সকল মানুষ ইনসাফ ও ন্যায় বিচার পেতে পারে। ঐ সময় হিংস্র জন্তু, নিরীহ ছাগল একই সঙ্গে বিচরণ করবে। শিশুরা 'বিছে'র সঙ্গে খেলা করবে, কুকর্ম ধ্বংস হবে, সুকর্ম তার স্থান নেবে, মদ-সুদ সব শেষ হয়ে যাবে, মানুষ আল্লাহর এবাদাতের দিকে অটল থাকবে এবং ক্রমে দ্বীনের দিকে আরও অগ্রসর হবে। নামাজে জামায়াতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হবে (নামাজিদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে)। মানুষের বয়স বৃদ্ধি হবে এবং আমানত ফেরত পাবে, গাছ ফলে পরিপূর্ণ থাকবে এবং বরকত অধিক হবে। কুকর্ম ধ্বংস হবে, আর নেক কর্ম বজায় থাকবে। আবোয়েতের কোন শত্রু বাকি থাকবে না। (মোজাল্লে ইনতেজার, সংখ্যা ১৪, পৃ ২০৫)।

     এই হল হজরত ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ন্যায় বিচার ও ইনসাফী শাসনের এক নজির। যদি আমরা নিজেদের চোখের সামনে মেহদী (আঃ)-এর শাসনকে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্য-কর্তব্য ইমাম জহুরের জন্য বেশি থেকে বেশি দোয়া করা, আর নিজেদের চরিত্রকে সংশোধন করে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।
__________________________________________------------------------------------------------

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
     শুক্রবারের উষালগ্নে
        ✍️মো: মুন্তাজির হোসেন গাজী

আরিজার পাতা ফুরিয়েছে
আপনার কথা লিখিতে লিখিতে,
অন্বেষণ করিতেছি আপনাকে 
আজও অলিতে গলিতে।।
               ❤️
না জানি কোথায় পড়িয়াছে
হুজ্জাতের পদধূলিকনা,
যদি হইতো নেত্রপাত
চুম্বন করিতাম মাটিখানা।।
               ❤️
প্রহর গণনা করিতেছি আজও
জ্যোতির্ময় আননকে দেখার,
এই অভিলাষ কবে ঘুচিবে
বেদনাভরা কোমল হৃদয়ের।।
               ❤️
শুক্রবারে অরুনোদয়ের পৃর্বে
নির্জনে হেঁটেছি আপনাকে খুঁজিতে,
শৈত্য প্রবাহের মধ্যেও থামেনি
বজায় রেখেছি মোর ধারাকে।।
               ❤️
সচেতন মনের অনুশোচনা
রয়ে যাবে সদা,
বহিঃপ্রকাশ করবেন যে দিন
অপসারিত হবে অনুতাপ সদা।।

__________________________________________

গাজা
 ✍️ রাজা আলী

গাজায়,
লাশের উপর লাশ
এত করেও সর্বনাশ
হয় না কি আত্মদংশন
এ কেমন দজ্জার্লী শাসন?

গাজায়,
বাড়ির উপর বাড়ি
ভেঙেছো সারি সারি
এখনো কি জাগেনি বোধ
জেনো  একদিন শোধ।

গাজা,
 আজ মৃতের স্তূপ
পরিজন কাঁদছে খুব
আকাশে,বাতাসে বিষাদ
চোখের জল মানছে না বাঁধ।

গাজা,
দিচ্ছে রক্ত তাজা তাজা
ভিখারী আজ,যারা ছিল রাজা
স্বজন হারানোর বেদনা ও শোক
আবাসিক ভবনের মাঝে মৃত‍্যুর ঝোঁক।
__________________________________________

     রক্তে লেখা আহ্বান
         ✍️মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

ফিলিস্তিনের আকাশে আজ রোদ উঠে না,  
ঘুম পায় না পাথরচাপা শিশুরা—  
ধুলিমাখা চোখে চেয়ে থাকে তারা,  
কে আসবে বাঁচাতে এই হাহাকার ভরা ধরা?

শহীদ হয়ে যায় সকাল, বিকেল, রাত,  
বুলেটের নিচে হারিয়ে যায় নাম না-জানা কথকতা।  
ছিন্ন বস্ত্রে খেলতে যাওয়া শিশুটি,  
হঠাৎই ইতিহাস হয়ে যায়—  
কিন্তু কে লিখে তাদের গাঁথা?

ইমামে জামানা! আপনি কোথায়?  
এই পৃথিবীর বুক জুড়ে জুলুমের মিছিল,  
হৃদয় ক্ষয়ে যায় দোয়া করতে করতে,  
কিন্তু আপনার পদধ্বনি এখনো দূরের গান।

যারা জানে না যুদ্ধের মানে,  
তাদের রক্তে লেখা হচ্ছে মানচিত্র—  
নবজাতকের কান্না যেন আজানের মতো শোনা যায়  
ঘরের ছাদের ধ্বংসাবশেষে।

ইয়াযিদের মুখে আজ নব্য মুখোশ,  
তারা জাতিসংঘ, মিডিয়া, সভ্যতার নাম নেয়।  
কিন্তু মানুষের হাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে  
তারা গড়ে তোলে নয়া সভ্যতার প্রাসাদ।

আমরা কাঁদি ইমাম, আপনার প্রতীক্ষায়।  
আপনার ধীর পদচিহ্নে জমিনে ফুটবে শান্তি।  
আপনার তলোয়ার হবে আলো—  
যা গুটিয়ে দেবে নিপীড়কের ছায়া।

আপনার উত্থান হোক আশার অনুরণন,
ফিলিস্তিন হোক গর্বের স্বাধীন দ্যুতি,  
শোককে শিরস্ত্রাণ করে দাঁড়িয়ে যাক জাতি,  
এই অপেক্ষা হোক শেষ… হে মুক্তির প্রতীক!

------ _____------_____------______------______------

   

Wednesday, April 16, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ) || শাওয়াল সংখ্যা



আরবি: শাওয়াল, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা,মিনা খাঁন,উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

বিন আকিল: কুফায় আগমণ ও উদ্দেশ্য

যোগ্য ব্যক্তির সম্মান:কোরান ও হাদীসের আলোকে

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর শিক্ষার বিস্তার

ইমাম আ: এর সাহায্য: শিয়াদের প্রতি (অনুবাদ)

আল্লাহর একত্ব (অহদিয়াত) সম্পর্কে দার্শনিক ও কালামি বিশ্লেষণ

ইরান কেন পরমাণু অস্ত্র বানায় না?
          ✍️  রাজা আলী 

যুবকদের আলোকিত পথ--- আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সিসতানীর (হাফিযাহুল্লাহ) অমূল্য আট উপদেশ।  (অনুবাদ) 
          ✍️ মইনুল হোসেন

ইমামে জামানা (আ.) এর গায়বাত: একটি গভীর বিশ্লেষণ

 মা-বাবা ও শিক্ষকের হক : কুরআন ও রেসালাতুল হুকুক-এর দৃষ্টিতে (অনুবাদ)

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

আগমন কবে হবে?

আল-হুজ্জাতের আহ্বানে

কাসেম সোলাইমানি 
     ✍️ রাজা আলী 


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অশেষ দয়ার বরকতে আল হুজ্জাত পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ)র শাওয়াল সংখ্যা প্রকাশিত হলো। আলহামদুলিল্লাহ, মাহে রমজানের আত্মশুদ্ধির সফর শেষে আমরা শাওয়াল মাসে পদার্পণ করেছি। ঈদের আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের পর এই মাস আমাদের জন্য এক নতুন আত্মজিজ্ঞাসার সময়। রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জিত তাকওয়া ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণাবলি যেন শাওয়াল মাসেও আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হয়।

এই সংখ্যায় তুলে ধরা হয়েছে পবিত্র রবের অস্তিত্ব, ইমাম আঃ দের জীবন অভিজ্ঞান, আত্মশুদ্ধি, সামাজিক বিষয় এবং ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কিত প্রবন্ধ। শিক্ষা যেহেতু চিন্তা ও চেতনার দরজায় প্রতিনিয়ত কড়া নাড়ে, সেকারণেই পাঠকগণ বিচিত্র বিষয়ের উপর পরিবেশিত প্রবন্ধ গুলিতে কিছু চিন্তা র খোরাক পাবেন নিশ্চয়--যা কি না সমাজ পরিবর্তনের ইতিবাচক অভিজ্ঞান হয়ে উঠবে।
                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


বিন আকিল: কুফায় আগমণ ও উদ্দেশ্য
হযরত আলী (আ.) রাসূলুল্লাহ (স.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন:  
"إِنِّي أُحِبُّ عَقِيلًا لِأَمْرَيْنِ: أَحَدُهُمَا: لِنَفْسِهِ، وَالثَّانِي: لِأَنَّ أَبَا طَالِبٍ كَانَ يُحِبُّهُ".
"আমি আকিলকে দুই কারণে ভালোবাসি। এক, তার নিজের জন্য;দুই, তার পিতা আবু তালিব  তাকে ভালোবাসতেন।"

মুসলিম ইবনে আকিল কে?
  
বনি হাশিমের তরুণদের মধ্যে মুসলিম ইবনে আকিল ছিলেন একজন উজ্জ্বল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। আকিল ছিলেন হযরত আলী (আ.)-এর ভাই এবং আবু তালিবের দ্বিতীয় পুত্র।
মুসলিম ইবনে আকিল ছিলেন আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর ভাইপো এবং হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর চাচাতো ভাই। মুসলিম যে পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন, তা ছিল জ্ঞান, পুণ্য ও মর্যাদার পরিবার। এই পরিবারেই তিনি মানবিক ও ইসলামী গুণাবলী অর্জন করেছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি বনি হাশিমের যুবকদের মধ্যে, বিশেষত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সান্নিধ্যে বড় হয়েছিলেন। তিনি নৈতিক সৌন্দর্য, সাহসিকতা ও ত্যাগের পাঠ শিখেছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, হযরত আলী (আ.)-এর শাসনামলে (৩৬ থেকে ৪০ হিজরি পর্যন্ত) মুসলিম সেনাবাহিনীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যেমন, সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (আ.) সেনাবাহিনীকে সাজানোর সময় ইমাম হাসান, ইমাম হুসাইন, আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ও মুসলিম ইবনে আকিলকে ডান পাশের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।  
মুসলিম ইবনে আকিলের পরিচয় শুধু তার বংশগত নয়, বরং তার চিন্তা, কর্ম ও জীবন দর্শনে। হযরত আলী (আ.)-এর শাসনামলে তিনি সত্যের পক্ষে ছিলেন এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ইমামতের সময়েও তিনি তাদের পাশে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এই পথেই শাহাদাত বরণ করেন। 

মুসলিম ইবনে আকিলের কুফায় আগমন :
 
মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ ক্ষমতায় আসে। সে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং মক্কায় চলে যান।ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কায় অবস্থানকালে কুফাবাসীদের কাছ থেকে অসংখ্য চিঠি পেতে শুরু করেন । চিঠির সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, একে সত্যিকার অর্থে "পত্র-আন্দোলন" বলা যায়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই চিঠির সংখ্যা দাঁড়ায় দিনে গড়ে ৬০০টি, এবং মোট ১২,০০০ চিঠি ইমামের কাছে পৌঁছায়। এমনকি ইতিহাসে এই চিঠির সংখ্যা কিছু কিছু জায়গায় আরো বেশি বলা হয়েছে।

১৫ই রমজান ৬০ হিজরি: হাজার হাজার দাওয়াতপত্র ইমাম হুসাইনের (আ.) হাতে পৌঁছায়।স্বাভাবিকভাবেই, ইমাম হুসাইন (আ.) কুফাবাসীদের আমন্ত্রণের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি সেখানকার জনমত ও তাদের আনুগত্যের মাত্রা যাচাই করার জন্য একটি সঠিক প্রতিবেদনের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় প্রেরণ করেন যাতে তিনি পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ইমামকে অবহিত করতে পারেন। ইমাম কুফাবাসীদের কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন:  "আমি আমার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে তোমাদের কাছে পাঠাচ্ছি, যাতে তিনি তোমাদের মতামত ও অবস্থা সম্পর্কে আমাকে জানাতে পারেন।"

৫ই শাওয়াল ৬০ হিজরি: মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় প্রবেশ করেন। জনগণ তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং তাঁর হাতে বাইয়াত করে।

১১ই জিলকদ ৬০ হিজরি: মুসলিম ইবনে আকিল ইমাম হুসাইন (আ.)-কে কুফার পরিস্থিতি জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন এবং আসার আহ্বান জানান।

মুসলিমের চিঠি:
তিনি জানান কুফাবাসীরা তাঁর আগমনের জন্য প্রস্তুত।

৮ই জিলহজ ৬০ হিজরি:
কুফার একজন প্রবীণ, শ্রদ্ধেয় ও প্রভাবশালী নেতা এবং আহলুল বায়েত (আঃ) এর অনুসারী ও প্রেমিক হানী ইবনে উরওয়াহ্—যিনি মুসলিম ইবনে আকিলকে গোপনে আশ্রয় দিয়ে সহায়তা করছিলেন। তৎকালীন অত্যাচারী শাসক উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্দেশে হানি গ্রেফতার হন এবং নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। মুসলিম ইবনে আকিল প্রায় ৪০০০ জনকে নিয়ে বিদ্রোহ করেন, কিন্তু পরে সবাই তাঁকে ছেড়ে যায়। তিনি একা পড়ে যান এবং তওয়া নামক এক নারীর বাড়িতে আত্মগোপন করেন। ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কায় হজকে ওমরায় পরিবর্তন করে একটি খুতবা দেন এবং ৮২ জন পরিবার ও সঙ্গী নিয়ে কুফার দিকে রওনা দেন।

ইবনে জিয়াদের আগমন:
ইবনে জিয়াদ বাসরার ৫০০ সৈন্য নিয়ে ছদ্মবেশে কুফায় প্রবেশ করেন। মানুষ ভেবেছিল তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)। কিন্তু পরে জানতে পারে সে উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ। কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশীর তাঁকে চিনতে না পেরে প্রথমে বাধা দিলেও পরে তাকে প্রবেশ করতে দেয়।

হানী ইবনে উরওয়াহ্:
মুসলিম বুঝতে পারেন ইবনে জিয়াদ তাঁকে খুঁজবে, তাই তিনি শহরের প্রভাবশালী নেতা হানী ইবনে উরওয়াহর বাড়িতে আশ্রয় নেন। হানী ছিলেন সাহাবী এবং শিয়াদের একজন নেতা।

হানীর গ্রেফতার:
ইবনে জিয়াদ মুসলিমের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরে হানীকে কৌশলে তার দরবারে ডেকে পাঠান। হানী সত্য গোপন করলেও ইবনে জিয়াদের দাস মাকিলের সাক্ষ্যে তা প্রকাশ পায়। ইবনে জিয়াদ হানীকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং বন্দি করে।

তওয়া – এক সাহসী নারী:
মুসলিম, একা ও নিরাশ হয়ে কুফার রাস্তায় ঘুরছিলেন। হঠাৎ তিনি এক নারীকে দেখেন যার নাম ছিল তওয়া। মুসলিম পানি চান এবং নারী তাঁকে পানি দেন। পরে জানতে পেরে যে মুসলিম ইবনে আকিল আশ্রয় চাইছেন, তিনি তাঁকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন।

ইবনে জিয়াদের হুমকি ও প্রতিশ্রুতি:
ইবনে জিয়াদ মসজিদে ঘোষণা দেয়, মুসলিম যার ঘরে থাকবেন আর সে তা জানাবে না, তার জান-মাল হালাল। আর যেই মুসলিমকে ধরিয়ে দেবে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে। তওয়ার ছেলে বেলাল পুরস্কারের লোভে মুসলিমের অবস্থান ফাঁস করে দেয়। ইবনে জিয়াদ ৭০ জন সৈন্যকে মুসলিমকে গ্রেফতার করতে পাঠায়।

৯ই জিলহজ ৬০ হিজরি: মুসলিম ও কুফাবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরে তিনি গ্রেফতার হন এবং কুফার দারুল আমারার ছাদে শহীদ করা হয়।
তাঁর রওজা কুফায় এখনো জিয়ারতের স্থান হিসেবে সমাদৃত।

উপসংহার:
হজরত মুসলিম এর জীবনী থেকে আমাদের জন্য উত্তম শিক্ষা হচ্ছে ,তিনি তার যুগের ইমাম ,ইমাম হুসাইন(আঃ) কে কিভাবে অনুসরণ করেছিলেন এবং ইমামের আদেশে আমল করেছিলেন। সত্যকে অনুসরণ করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।তাই আমাদের উচিত আমাদেরকেও যুগের ইমাম মাহদী (আঃ) কে মুসলিম ইবনে আকিলের মতন অনুসরণ ও অনুকরণ করা ।

__________________________________________

যোগ্য ব্যক্তির সম্মান:কোরান ও হাদীসের আলোকে


 قال على عليه‏ السلام : اَلعِلمُ قاتِلُ الجَهلِ.

জ্ঞান, অজ্ঞতার ধ্বংসকারী।
(গুরারুল হিকাম ও দুররুল কালিম, পৃষ্ঠা ৫৬)

সমাজ হলো এমন একটি ব্যবস্থা  যেখানে একাধিক মানুষ কিছু নিয়ম-নীতির নিরিখে জীবন যাপন করে।সমাজ তখনই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, যখন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়। ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ন্যায়বিচার, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং মানুষের সমানাধিকার প্রদান করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজকের সমাজে অনেকেই অন্যের যোগ্যতা বা বিশেষত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে না। বরং অনেক সময় মানুষ মনে করে, "আমি যা বুঝি, সেটাই ঠিক"—এমন মনোভাব সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।

ইসলাম আমাদের শেখায়, যে ব্যক্তি যে বিষয়ে পারদর্শী, তাকে সেই বিষয়ে মূল্যায়ন করা এবং তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আসুন, কুরআন ও হাদীসের আলোকে এই বিষয়ে গভীর ভাবে আলোচনা করি এবং কিছু বাস্তব ঘটনা তুলে ধরি।

কুরআনের দৃষ্টিতে যোগ্যতার মূল্যায়ন:
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
"যারা জ্ঞানী এবং যারা অজ্ঞ তারা কি সমান হতে পারে?" (সুরা আয-জুমার, ৩৯:৯)

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, জ্ঞানী ও অজ্ঞ কখনো সমান হতে পারে না। একজন আলেম যিনি ধর্মীয় বিষয়ে গভীর ভাবে গবেষণা করেন, একজন চিকিৎসক যিনি মানুষের রোগ নিরাময়ে কাজ করেন, কিংবা একজন প্রকৌশলী যিনি সমাজের অবকাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখেন—তাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান অসামান্য। তাই তাদের উপযুক্ত সম্মান দেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

অপর একটি আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: "আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।"
(সুরা আল-মুজাদিলা, ৫৮:১১)

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, আল্লাহ নিজেই জ্ঞানীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। যদি আল্লাহ তাআলা নিজেই জ্ঞানীদের সম্মানিত করেন, তবে আমাদের সমাজেও তাদের মূল্যায়ন করা উচিত।যেখানে আল্লাহ তাআলা নিজেই জ্ঞানীদের মর্যাদা ও গুরুত্ব দিচ্ছেন সেখানে আমরা আল্লাহর মাখলুক ,তাহলে আমাদের মধ্যে এই বিশেষ গুণটি অভাব কেনো দেখা যাচ্ছে ? আমরা কেনো নিজেদের কে আল্লাহর বাণী ও আদেশ অনুযায়ী গড়তে পারছি না ।

হাদীসের আলোকে যোগ্য ব্যক্তির মর্যাদা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।"

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সমাজে যারা নিজেদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও শ্রম দিয়ে অন্যদের উপকার করে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং সম্মান প্রদর্শন করা ইসলামের শিক্ষা। তাই আমাদের উচিত কুরআনের আয়াত ও হাদীসের বানী অনুযায়ী নিজেদের কে দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন:
 "যখন কোনো কাজের দায়িত্ব যোগ্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে না, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।"

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, যদি সমাজে যোগ্য ব্যক্তিকে তার উপযুক্ত সম্মান ও দায়িত্ব প্রদান না করা হয়, তবে তা সমাজের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।আজ আমাদের সমাজ এই কারণেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামের ইতিহাস থেকে শিক্ষণীয় ঘটনা:

১. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা:
হযরত ইউসুফ (আ.) যখন মিশরের বাদশাহের দরবারে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিলেন, তখন রাজা তার বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতা দেখে বিস্মিত হন। ইউসুফ (আ.) নিজেই বললেন:
 "আমাকে দেশের ভান্ডারের দায়িত্ব দিন, কারণ আমি বিশ্বস্ত ও দক্ষ।"
(সুরা ইউসুফ, ১২:৫৫)

২. ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জ্ঞান ও সম্মান:
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর অসাধারণ জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার কারণে বিভিন্ন যুগের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা তাঁকে সম্মান করতেন।নিম্নের বাণীটি তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

 আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:
"আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (আ.)-এর মতো আর কাউকে জ্ঞান, তাকওয়া এবং মর্যাদায় উন্নত দেখি নি।"

৩. ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর বিনয় ও সম্মান প্রদর্শন:
কুফার দরবারে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) অত্যন্ত মর্যাদার সাথে আহলুল বাইতের পরিচয় দেন। ইয়াজিদের দরবারে সাহাবি যায়েদ ইবনে আরকাম যখন ইমামের বন্দিত্ব দেখলেন, তখন তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ইমামকে সম্মান জানিয়ে বলেন:

"এই মানুষগুলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার। তাদের প্রতি সদয় হও।"
আমাদের বুঝতে হবে ও চিনতে হবে কে জ্ঞানী আর কে মূর্খ। শুধু বুঝলেই হবে না ,বোঝার সঙ্গে সঙ্গে সেই যোগ্য ব্যক্তিকে তার সন্মান ও মর্যাদা দিতে হবে এবং তার কথা মানতে হবে ।
এখানে আমরা দেখতে পাই, ইসলামে নিজ যোগ্যতা প্রকাশ করা এবং উপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজে যোগ্য ব্যক্তিকে অবমূল্যায়নের পরিণতি:
যখন সমাজে যোগ্য ব্যক্তিকে অবমূল্যায়ন করা হয়, তখন এর বহুমুখী ক্ষতি হয়:

১. সামাজিক বিশৃঙ্খলা: যখন অযোগ্যরা নেতৃত্বে আসে, তখন সমাজে অবিচার ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

২. যোগ্যতার অপচয়: যোগ্য ব্যক্তিরা যখন মূল্যায়ন পান না, তখন তাদের প্রতিভা ও দক্ষতা সমাজের উপকারে আসে না।

৩. ইসলামী মূল্যবোধের ক্ষতি: ইসলাম যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে বলে। এই নীতি উপেক্ষা করলে ইসলামী আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উপসংহার:
ইসলাম আমাদের শেখায়, যে ব্যক্তি যে বিষয়ে পারদর্শী, তাকে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্মান দেওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এবং নবী (সা.)-এর হাদীসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, সমাজ তখনই সঠিকভাবে পরিচালিত হবে, যখন যোগ্য ব্যক্তিকে তার মর্যাদা ও দায়িত্ব প্রদান করা হবে।

আমাদের উচিত, সমাজের আলেম, ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলীসহ সকল দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সম্মান ও মূল্যায়ন করা। কারণ, যোগ্য ব্যক্তির প্রতি সম্মান জানানো মানে ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শকে জীবিত রাখা।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যোগ্য ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করার তাওফিক দিন।
__________________________________________

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর শিক্ষার বিস্তার

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) ইসলামের এক মহান ব্যক্তিত্ব এবং এক অন্যতম মনীষী ছিলেন।তিনি ইসলাম, বিশেষ করে শিয়া ইতিকাদ এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) ইসলামী ইতিহাসে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইমাম এবং তিনি বিভিন্ন দিক থেকে শিক্ষার বিস্তার করেছেন।

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর শিক্ষার বিস্তার:

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর জীবন এবং শিক্ষা শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বিজ্ঞান, দর্শন, ফিকহ (আইন), এবং অন্যান্য দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি একটি আলোকিত পথ প্রদর্শক ছিলেন। তাঁর শিক্ষা থেকে বহু বিষয় সংক্রান্ত গভীর জ্ঞান অর্জন করা যায়, যা আজও আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

1. ফিকহ (ইসলামী আইন):
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) ইসলামের আধ্যাত্মিক ও দুনিয়াবি দিকের ব্যাপারে বিশাল জ্ঞান প্রদান করেছেন। তার শিক্ষা অনুসারে, জাফরি ফিকহ (শিয়া মুসলিমদের ফিকহ বা আইন) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বর্তমানে শিয়া মুসলিমদের জন্য অনুসরণযোগ্য আইনি ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। তিনি ইসলামের আইনি বিধানগুলোকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যার মধ্যে পারিবারিক আইন, বাণিজ্যিক আইন, ক্রেডিট, শপিং, প্রতিশ্রুতি, হাদ (অপরাধমূলক শাস্তি) ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

2. বিজ্ঞান ও দর্শন:
 ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করেননি, বরং তাঁর শিক্ষায় বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা এবং দর্শনের বিষয়েও যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। সে সময়ে তিনি ইসলামি সভ্যতায় শীর্ষ স্থানীয় বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) অনেক বৈজ্ঞানিক বিষয় যেমন রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদিতে গভীর জ্ঞান প্রদান করেছেন। এমনকি অনেক বিজ্ঞানি, চিকিৎসক ও দার্শনিক তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে জাবির ইবনু হাইয়ান (একজন বিখ্যাত রসায়নবিদ) অন্যতম।

3. তাওহিদ (আল্লাহর একত্ব):
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) তাওহিদের (আল্লাহর একত্ব) গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও প্রদান করেছেন। তিনি আল্লাহর একত্ব ক্ষমতা,এবং মানুষের সাথে সম্পর্কের মধ্যে গভীর দর্শন উপস্থাপন করেছেন। তিনি মানুষের অন্তর ও আত্মার পরিচ্ছন্নতা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস স্থাপন করার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

4. আধ্যাত্মিক শিক্ষা:
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যও শিক্ষা প্রদান করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত চরিত্র, নৈতিকতা, ধৈর্য, সৎকর্ম ও আত্মসংযমের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তার শিক্ষা ছিল যে, একজন মুসলিমকে শুধু সঠিকভাবে আচার-আচরণ করতে হবে না, বরং তার অন্তরও পবিত্র রাখতে হবে। তিনি মানুষের মধ্যে সহানুভূতি, দয়া, এবং ভালোবাসার চর্চা করতে উৎসাহিত করেছেন।

5. সামাজিক ন্যায় ও শান্তি:
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) তাঁর শিক্ষা ও ধর্মীয় বক্তব্যে সামাজিক ন্যায়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি সমাজে অশান্তি, অবিচার, শোষণ এবং দারিদ্র্য দূর করতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। তিনি সকলের প্রতি সমান অধিকারের ধারণা প্রচার করেছেন এবং মুসলিমদের মধ্যে একতা ও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।

6. আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য:
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) প্রাকৃতিক ঘটনাবলী, পরিস্থিতি, এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার প্রতি আনুগত্যের বিষয়ে গভীর শিক্ষা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছিলেন যে, সমস্ত দুনিয়া আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং মুসলিমদের উচিত যে তারা যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বাস স্থাপন করা।

7. মতবিরোধ ও বিতর্কের প্রতি সহিষ্ণুতা:
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের মতবিরোধ এবং বিতর্কের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছেন। তিনি মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও সমঝোতার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান প্রদান করেছেন। তিনি একে অপরকে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির মাধ্যমে আলোচনা করতে উৎসাহিত করেছিলেন।

 উপসংহার:
 ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর শিক্ষা শুধুমাত্র ইসলামী আইন বা তাওহিদ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মানবতার উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার ওপর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছেন। তাঁর শিক্ষা আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি আলোকিত পথপ্রদর্শক হিসেবে বিদ্যমান এবং তার মহান অবদান শিয়া ইসলামের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
__________________________________________

ইমাম আঃ এর সাহায্য : শীয়াদের প্রতি
      ✍️ (অনুবাদ):  মাওলানা কাজিম আলি

জনাবে আল্লামা শেখ হাসান বিন ইউসুফ বিন আলী বিন মোত্বাহার হিল্লী (রহঃ) একজন উচ্চ পর্যায়ের আলিম ছিলেন। হাদীস, কালামে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তিনি নিজের পিতা, মামা এবং খাজা নাছীরুদ্দিন তুসীর ছাত্র ছিলেন। এগারো বছর বয়সে তিনি মুজতাহীদ হন এবং তার থেকে বেশি বয়সের ছাত্রদের পড়াতেন। একদা শিশু বয়সে কোনো একটা ভুলের কারণে পিতা তাকে তাড়া করেন। ফলে হিল্লী (রহঃ) দৌঁড়াতে থাকেন। তিনি যত দৌঁড়ান, পিতাও ততো দৌঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে ধরা পড়ার ভয়ে হিল্লী (রহঃ) ওয়াজীব সেজদার একটি আয়েত তেলাওয়াত করেন (এই আয়েতটি পাঠ করলে ও শুনলে সেজদা করতে হয়)। আয়েতটি শোনার ফলে হিল্লী (রহঃ)-এর পিতা সেজদাতে চলে যান, আর হিল্লী (রহঃ) দৌঁড়িয়ে আগে চলে যান। তিনি সেজদা করেননি; কেন না তিনি নাবালক ছিলেন। পিতা সেজদা করার পর আবার হিল্লী (রহঃ)-কে ধরার জন্য দৌঁড়াতে থাকেন। হিল্লী (রহঃ) সুযোগ বুঝে পুনরায় আয়েতটি পাঠ করেন। পিতা আবার সেজদায় চলে যান। এবার সেজদা থেকে মাথা তুলে পিতা নিজের সন্তানের এই ধরনের ইসলামিক জ্ঞান ও বুদ্ধিকে দেখে সন্তুষ্ট হন এবং খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। আর আদর করে নিজের সন্তানকে কাছে ডাকেন। আর সন্তানও পিতার আদরের ডাকে সাড়া দেন। শহীদে ছালিছ ক্বাজী নুরুল্লাহ্ শুস্তারী (রহঃ) আল্লামা (রহঃ) সম্পর্কে "মাজালিসুল মোমেনীন” নামক পুস্তকে এবং অন্যান্য ওলামাগণ এই ঘটনা তাঁদের পুস্তকে তুলে ধরেছেন। ঘটনাটি হ'লঃ আল্লামা হিল্লী (রহঃ) একজন জ্ঞানী ব্যক্তির শিক্ষানবিশ ছিলেন। ঐ জ্ঞানী ব্যক্তি অনেক পরিশ্রমে একটি পুস্তক শিয়াদের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। আর সময় ও সুযোগ বুঝে প্রায়ই সেই পুস্তক থেকে মানুষদের শোনাতেন। কিন্তু পুস্তকটির বক্তব্যের প্রতিবাদ যেন কেউ করতে না পারে, সেই জন্য পুস্তকটি কারও হাতে দিতেন না। আল্লামা হিল্লী (রহঃ) ঐ পুস্তকটি হাতে পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করতে থাকেন; কিন্তু বারে বারেই ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত তিনি ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে পুস্তক আদান-প্রদানের একটি কৌশল বার করেন। আর এই আদান-প্রদান মাধ্যমের সাহায্যেই ঐ পুস্তকটি হাতে পান এই শর্ত সাপেক্ষে যে, পুস্তকটি একরাতের বেশি সময় কাছে রাখতে পারবে না। এই একরাত সময়কেই আল্লামা হিল্লী (রহঃ) মূল্যবান মনে করে পুস্তকটি নিয়ে বাড়িতে এসেই কপি করতে শুরু করেন। লিখতে লিখতে অর্ধরাত হয়ে যায় এবং প্রচন্ড ঘুম আসে। আর ঐ সময় এক জন ব্যক্তি এসে বললেন, 'তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, অবশিষ্ট যা আছে আমি লিখছি'। আল্লামা হিল্লী (রহঃ) ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে চোখ খুলে দেখলেন ঐ ব্যক্তি আর সেখানে নেই। অথচ পুস্তকটি সম্পূর্ণ লেখা রয়েছে। পুস্তকটির শেষে কয়েকটি কথা লেখা ছিল। তিনি পড়ে দেখলেন লেখা আছে- "কাতাবাহুল হুজ্জাহ্”; অর্থাৎ এটা মাহ্দী লিখেছেন।

সূত্রঃ 
রওযাতুল জান্নাহ্, খন্ড-২ পৃঃ ২৮২; 
জান্নাতুল মাওয়া-- ঘটনা নং ২২, 
নাজমুছ ছাকিব-- ঘটনা নং ১৫।

           বর্তমান অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

১. আমাদের উচিত নিজের মযহাব কে রক্ষা করার চেষ্টা করা।
২. আমাদের এমন কাজ করা উচিত-যা থেকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সন্তুষ্ট হন।
৩. ইমাম আঃ এর সন্তুষ্টি এমন ভাবে অর্জনের চেষ্টা করতে হবে,যাতে স্বয়ং তিনি আমাদের সাহায্যে আসেন।
__________________________________________

আল্লাহর একত্ব (অহদিয়াত) সম্পর্কে দার্শনিক ও কালামি বিশ্লেষণ

সার সংক্ষেপ:
আল্লাহর একত্ব (তাওহিদ ও অহদিয়াত) ইসলামী দর্শন ও কালামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক (আকলী) ও ঐশী (নাকলী) উভয় ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইসলামী দার্শনিক এবং কালামবিদগণ বিভিন্ন যুক্তি ব্যবহার করে আল্লাহর অদ্বিতীয়তা ও সরল সত্তা (বেসাতাত) প্রমাণ করেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে প্রধান দার্শনিক ও কালামি যুক্তিগুলো পর্যালোচনা করবো।

১. ভূমিকা:

তাওহিদ, অর্থাৎ আল্লাহর একত্ব, ইসলামী বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। এখানে “অহদিয়াত” বলতে বোঝানো হয় যে আল্লাহ এক, সরল, অবিভাজ্য এবং অনন্য। এই ধারণাটি কেবল কুরআন-হাদিসের ভিত্তিতেই নয়, বরং ইসলামী দর্শনেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।এজন্য ফারাবি, ইবনে সিনা, মোল্লা সদরাসহ বিভিন্ন মুসলিম দার্শনিক ও কালামবিদ এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

২. আল্লাহর একত্বের দার্শনিক যুক্তি:

ক) আবশ্যক অস্তিত্বের যুক্তি (ওয়াজিবুল-উজুদ বা সিদ্দীকিনের যুক্তি):

এই যুক্তিটি ইবনে সিনা ও মোল্লা সদরা প্রস্তাব করেন। এটি নিম্নলিখিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে:

আল্লাহ ওয়াজিবুল-উজুদ, অর্থাৎ এমন এক সত্তা যিনি নিজ সত্তা থেকে অস্তিত্বশীল এবং যিনি অস্তিত্বহীন হতে পারেন না।
যদি দুটি ওয়াজিবুল-উজুদ থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে অবশ্যই কোনো পার্থক্য থাকবে।
এই পার্থক্য যদি সত্তাগত (জাতি) হয়, তবে একজন অপরের তুলনায় অসম্পূর্ণ হবে, যা ওয়াজিবুল-উজুদ হতে পারে না।
আর যদি পার্থক্য গুণগত (সিফাতি) হয়, তবে তারা কোনোভাবে যৌগিক হবে, কিন্তু ওয়াজিবুল-উজুদ অবশ্যই সরল (বেসিত) হতে হবে।

তাই, একের অধিক ওয়াজিবুল-উজুদ থাকা সম্ভব নয়, ফলে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়।

খ) সরলতার যুক্তি (বেসাতাতের যুক্তি)

আল্লাহ যদি যৌগিক (মুরাক্কাব) হতেন, তবে তাঁর সত্তা বিভিন্ন অংশের সমষ্টি হতো।
প্রত্যেক যৌগিক সত্তা তার অংশগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়, কিন্তু আল্লাহ কারো ওপর নির্ভরশীল নন।
সুতরাং, আল্লাহ সরল (বেসিত), অংশহীন এবং অনন্য।

গ) একাধিক সৃষ্টিকর্তার অসম্ভবতা:

যদি দুটি স্বাধীন ঈশ্বর থাকত, তবে তাদের ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য থাকতো।
যদি তাদের ইচ্ছা সবসময় এক হয়, তবে দুটি আলাদা সত্তার অস্তিত্ব অর্থহীন।
আর যদি তাদের ইচ্ছা কখনও ভিন্ন হয়, তবে হয় একজন বিজয়ী হবে (অপরজন দুর্বল হবে), অথবা দুজনই ব্যর্থ হবে—এই দুটি ক্ষেত্রেই তারা সর্বশক্তিমান (কাদিরুল-মুতলাক) হতে পারবে না।
কিন্তু যেহেতু আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তাই তিনি অদ্বিতীয়।

৩. আল্লাহর একত্বের কালামি যুক্তি:

ক) “তমানু'” (একাধিক উপাস্যের অসম্ভবতা) যুক্তি:

এই যুক্তি কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের ওপর ভিত্তি করে:
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
"যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।" (সূরা আম্বিয়া: ২২)

এই যুক্তি বোঝার জন্য নিচের ধাপগুলো বিবেচনা করা যায়:

1. যদি একাধিক ইলাহ (উপাস্য) থাকত, তবে তারা সৃষ্টিজগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একমত বা ভিন্নমত হতে পারত।
2. যদি তারা একসঙ্গে একমত হতো, তবে তাদের আলাদা আলাদা ইলাহ হওয়ার কোনো মানে থাকত না।
3. যদি তারা ভিন্নমত হতো, তাহলে দুটি সম্ভাবনা থাকত:

ক। একজন বিজয়ী হতো এবং অন্যজন ব্যর্থ হতো (যা তার অক্ষমতা প্রমাণ করে)।
খ। উভয়েই ব্যর্থ হতো, যা তাদের ঈশ্বরত্বের বিপরীত।

4. যেহেতু বাস্তব জগতে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য রয়েছে, তাই একমাত্র একজন স্রষ্টাই বিদ্যমান।

খ) কালামি দৃষ্টিকোণ থেকে ইলাহের একত্ব:

মুতাযিলা মতবাদ: তাঁরা বলেছে, যদি একাধিক আল্লাহ থাকত, তবে তাদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি হতো, যা সর্বশক্তিমান হওয়ার বিপরীত।

আশআরি মতবাদ: তাঁরা বলেছে, আল্লাহ যদি একাধিক হতেন, তবে একে অপরের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতেন, যা সর্বক্ষমতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

৪. উপসংহার
এই আলোচনার মাধ্যমে বোঝা যায় যে,
দার্শনিক ভাবে, আল্লাহ ওয়াজিবুল-উজুদ, তাই তাঁর একাধিক সত্তা থাকা সম্ভব নয়।
যুক্তিবিদ্যাগত ভাবে, আল্লাহ যদি একাধিক হতেন, তাহলে ক্ষমতার বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো।
কালামি ও কুরআনিকভাবে, আল্লাহর একত্ব স্বতঃসিদ্ধ ও প্রমাণিত।
ফলে, আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়, অংশহীন ও সর্বশক্তিমান—এই সত্য যুক্তি, দর্শন ও ধর্মীয় প্রমাণ দ্বারা নিশ্চিত।

তথ্যসূত্র:
১.ইবনে সিনা, আল-ইশারাত ওয়াত-তানবিহাত,
২.মোল্লা সদরা, আল-হিকমাতুল-মুতাআলিয়াহ
৩.ফখরুদ্দিন রাজী, আল-মাতালিব আল-আলিয়াহ
৪.কুরআন, সূরা আম্বিয়া (২১:২২)
__________________________________________

ইরান কেন পরমাণু অস্ত্র বানায় না?

বর্তমান বিশ্বের সাত আট টি দেশের কাছে পরমাণু বোমা মজুত রয়েছে। অনেক ই মনে করেন যে, পরমাণু বোমা সামরিক শক্তির ভরকেন্দ্র। এবং কোন দেশ পরমাণু বোমা সমৃদ্ধ দেশ হলে অন্যদের কে শঙ্কিত ও সন্ত্রস্ত করে রাখা সম্ভব। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যের মূল সংকট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ইরান যেহেতু সদা তৎপর,তাই ইরানের উচিত দ্রুত পরমাণু বোমা তৈরির কাজ সুসম্পন্ন করা। কিন্তু ইরান পরমাণু বোমা তৈরির বিষয়ে উদাসীনতা করছে কেন?আসুন  এর উত্তর খোঁজা যাক।

পরমাণু বোমা না বানানোর যুক্তি:

ইরান দেশটির কর্মকর্তারা নিজেদেরকে "ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান" বলে (১৯৭৯খ্রিঃ বিপ্লবের পর থেকে) পরিচিত করান। এবং বাস্তবিক ই ইরান ইসলামের যাবতীয় নিয়ম-নীতি মেনেই শাসিত হচ্ছে।এই কারণেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ভয়ঙ্কর ধ্বংস ক্ষমতা সম্পন্ন পারমাণবিক বোমা তৈরি ও ব্যবহার কে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। ইরানে কোনো সময় পর্বের প্রশাসন যদি কোনো পরিস্থিতি র পরিপ্রেক্ষিতে প্রচণ্ড মারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই বোমা হঠকারি সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবহার করে ,তবে ইসলামী নীতি-নিয়ম প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। সুতরাং যা ব্যবহার করা যাবে না,তা তৈরি করার মানে হলো অর্থ অপচয় করা বা তা তৈরি করা এক কথায় নিরর্থক।তাই ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করে না।
       দ্বীনে  ইসলাম একটি সুস্থ, সুন্দর ও সুপরিকল্পিত ধর্ম।এই ধর্মে ধ্বংস নয়,মানবতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।তাই ভয়ঙ্কর মারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পরমাণু বোমা বানানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইরানী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এটাই ইশারা দিয়েছে যে, ইসলাম কখনোই গণহারে হত্যা ও ধ্বংস র কথা বলে না। ইসলাম শান্তির কথা বলে এবং এ এক অনবদ্য শান্তি র ধর্ম। ইরান পরমাণু বোমা বানানো নিষিদ্ধ করে বিশ্বকে আরও একবার এই গভীর বার্তা দিতে চেয়েছেন।

পরমাণু বোমার কার্যকারিতা ও ব্যবহার:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সর্বপ্রথম আমেরিকা পরমাণু বোমা ব্যবহার করে।তারপর থেকে আজ অবধি অসংখ্য যুদ্ধ সংগঠিত হলেও কোনো দেশ ই পরমাণু বোমা ব্যবহার করেনি। বিভিন্ন সময় পরমাণু হামলার হুমকি দিয়েছে মাত্র। বাস্তবতা হলো কোনো দেশ বর্তমান সময়ে নানা পরমাণু বোমা কারণে ব্যবহার করতে পারবে না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায়ের চাপ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও একঘরে হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও যদি এই বোমা ব্যবহার করে তবে ঘরে বাইরে প্রবল চাপ এবং আমেরিকার ভাবমূর্তি এতটাই খারাপ হয়ে পড়বে যে ,তা আর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়( দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা এই বোমা যখন ব্যবহার করে,তখন পরিবেশ ও পটভূমি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল)।

ইরান কি কখনো পরমাণু বোমা বানাবে না:

ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী ইরান কখনো পরমাণু বোমা বানাবে না।তবে যদি কখনো ইরান আক্রান্ত হয় বা ইরানের পরমাণু স্থাপনা আক্রান্ত হয়,তবে নিজেদের রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পরমাণু বোমা বানানোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে।গত কয়েকদিন আগে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার উপদেষ্টা এমন ই ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইসলামে মিথ্যা বলা হারাম; কিন্তু জীবন বাঁচানোর জন্য মিথ্যা জায়েজ আছে। অনুরূপ পরমাণু বোমা বানানো হারাম, কিন্তু দেশকে রক্ষা করার জন্য পরমাণু বোমা বানানোর ক্ষেত্রে ছাড় দেবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

__________________________________________


__________________________________________

যুবকদের আলোকিত পথ--- আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সিসতানীর (হাফিযাহুল্লাহ) অমূল্য আট উপদেশ।    

অনুবাদ ও সংকলন:✍️ মইনুল হোসেন

ভূমিকা
একদল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ আয়াতুল্লাহ আল-সিসতানী (হাফিঃ)-এর কাছে পরামর্শ প্রার্থনা করলে, তিনি গভীর দরদ আর অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের উদ্দেশ্যে আটটি উপদেশ তুলে ধরেন। এই উপদেশাবলী শুধুই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয়, বরং নৈতিকতা, জীবিকা, পরিবার, সমাজ ও আত্মিক উন্নতির পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। নিচে উপদেশগুলো সংক্ষিপ্তভাবে অনুবাদ করে পেশ করা হল, যাতে আমাদের তরুণ ভাই-বোনেরা তা থেকে আলো গ্রহণ করতে পারেন।

১. আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা
বিশ্বের প্রতিটি অনু-পরমাণু আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। জীবনের যে কোনও পর্যায়ে, বিশেষত যৌবনের ঘূর্ণিপাকে, এই বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হবেন না। একবার সরে গেলে ফেরত আসা কঠিন হয়ে পড়ে।

২. উত্তম চরিত্র গঠন করা
আল্লাহর নিকট প্রিয় সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সর্বোত্তম। জ্ঞান, ধৈর্য, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা—এই গুণগুলির চর্চা করুন। নিজের ত্রুটি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের চেষ্টা করুন। এর জন্য আল্লাহ্ অধিক পুরস্কার দেন।

৩. হালাল পেশা বা দক্ষতা অর্জন করা
যৌবনকাল ব্যয় করুন কোনও হালাল পেশা বা কল্যাণকর দক্ষতা অর্জনে। খেলাধুলা ও অলসতায় সময় নষ্ট নয়। পরিশ্রমী মানুষ আল্লাহর প্রিয়, অলস ও নির্ভরতাশীল ব্যক্তি তাঁর অপছন্দ।

৪. ভালো কাজ করা ও গুনাহ পরিহার করা
সৎ কাজ উন্নতি আনে, পাপ কাজ অভিশাপ ডেকে আনে। ন্যায়পরায়ণতা, আমানতের হেফাজত, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করুন। রিয়াকারী, অশ্লীলতা, অহংকার, হিংসা—এসব থেকে দূরে থাকুন।

৫. বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠন করা
পরহেজগার জীবনসঙ্গী নির্বাচন করুন। সৌন্দর্যের মোহ নয়, চরিত্রের শক্তিই বিবাহে বরকত আনে। সন্তান প্রতিপালনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলুন।

৬. মানুষের উপকার করা
পারস্পরিক সহানুভূতি ও কল্যাণই সমাজের ভিত্তি। এতিম, বিধবা, অভাবীদের পাশে দাঁড়ান। সত্যিকারের মুমিন সে, যে নিজের মতো অন্যের ভাল চাই।

৭. দায়িত্বশীল হওয়া
পরিবার হোক বা সমাজ—আপনার দায়িত্ব বুঝে পালন করুন। বিশ্বাসঘাতকতা নয়, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতাই হোক আপনার পরিচয়।

৮. জ্ঞান অর্জন ও আত্মবিশ্লেষণ করা
প্রতিদিন নিজের কর্ম, অভিজ্ঞতা ও চারপাশের ঘটনা থেকে শিখুন। জীবনের প্রতিটি ঘটনার পিছনে রয়েছে এক শিক্ষা, এক অর্থ।
বিশেষত এই তিনটি কিতাবের সঙ্গ পাথেয় করুন:

কুরআন মাজিদ – আল্লাহর শেষ ও চিরন্তন বার্তা।

নাহজুল বালাগা – কুরআনের মর্মবাণীর ব্যাখ্যা ও প্রজ্ঞার সাগর।

সাহিফা সাজ্জাদিয়্যাহ – হৃদয় নিংড়ানো দোয়ার ভাষায় আত্মশুদ্ধির দিশা।

উপসংহার
এই আটটি উপদেশ যেন প্রতিটি তরুণের জীবনের মানচিত্র হয়—যা তাকে আলোর পথে, সাফল্যের পথে, আত্মার মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এই দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা দান করেন।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সফলতার দাতা”
__________________________________________

ইমামে জামানা (আ.) এর গায়বাত: একটি গভীর বিশ্লেষণ


ইসলামের ইতিহাসে ইমামে রব্বানী জামানা (আ.) তথা দ্বাদশ ইমাম  হযরত ইমাম মাহদি (আ.)-এর গায়বত (অদৃশ্য থাকা) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় অধ্যায়। মহান আল্লাহর হিকমতের অধীনে ইমাম মাহদি (আ.) গায়ব আছেন এবং শেষ যুগে প্রকাশিত হয়ে মানবতাকে ন্যায়বিচার ও সত্যের দিকে পরিচালিত করবেন। এই প্রবন্ধে আমি গায়বতের কারণ, প্রকারভেদ এবং মানবজাতির উপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবো।


            গায়বতের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি

'গায়বত' শব্দটি আরবি "غيب" ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার *অর্থ লুকিয়ে থাকা বা অদৃশ্য হওয়া*। ইসলামী পরিভাষায়, ইমাম মাহদি (আ.)-এর গায়বত বলতে বোঝায়—তিনি সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে অবস্থান করছেন, কিন্তু এই জগতে বিদ্যমান আছেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন প্রকাশিত হবেন।

              গায়বতের শ্রেণি বিভাগ
 ইমাম মাহদী আঃ এর গায়বতকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে-

 1. গায়বতে ছোগরা (ক্ষুদ্র গায়বত): এটি ২৬০ হিজরী থেকে ৩২৯ হিজরী পর্যন্ত স্থায়ী ছিল, যখন ইমাম মাহদি (আ.) বিশেষ প্রতিনিধিদের (নায়েবে খাস) মাধ্যমে শিয়াদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন।


 2. গায়বতে কুবরা (বৃহৎ গায়বত): ৩২৯ হিজরী থেকে শুরু হয়ে বর্তমান পর্যন্ত চলছে, যখন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিনিধি নেই এবং ইমাম মাহদি (আ.) সরাসরি উপস্থিত থাকলেও সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে আছেন।

           গায়বতের কারণ ও দর্শন

ইমাম আঃ এর গায়বত সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস ও ঐতিহাসিক দলিল থেকে কয়েকটি মূল কারণ তুলে ধরা যায়:

 1. পরীক্ষা ও পরিশুদ্ধি: গায়বতের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করছেন—কে প্রকৃত মুমিন, আর কে নামমাত্র মুসলমান।


 2. শত্রুদের অত্যাচার: ইসলামের শত্রুরা পূর্ববর্তী ইমামদের হত্যা করেছে, তাই আল্লাহ তাঁর হিকমতের দ্বারা দ্বাদশ ইমামকে গায়েব রেখেছেন,যাতে তাঁর জীবন নিরাপদ থাকে।

3. ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি: গায়বাতের মাধ্যমে বিশ্ব মানবতা ধাপে ধাপে প্রস্তুত হচ্ছে ন্যায়ের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য, যেখানে ইমাম মাহদি (আ.) নেতৃত্ব দেবেন।


 4. মানবজাতির আত্মিক পরিপক্বতা: মানুষকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যেখানে তারা স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে আল্লাহর বিধান গ্রহণ করবে।


      গায়বাতের যুগে আমাদের করণীয়

 ইমামের গায়বাতের যুগে আমাদের দায়িত্ব হলো:

1. প্রতীক্ষা ও প্রস্তুতি: ইমামের আগমনের জন্য অপেক্ষা শুধু বসে থাকার নাম নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, জ্ঞান অর্জন, এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।


 2. ইমামের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি: ইমাম আঃ এর জন্য দোয়া করা,দোয়া এ নুদবাহ,দোয়া এ আহদ, জিয়ারতে আসলে ইয়াসিন ইত্যাদি ইমাম আঃ সম্পর্কিত দোয়া ও জিয়ারত পাঠ করা এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা।


 3. অহংকার ও বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকা: অনেক ভণ্ড নিজেদের ইমামের প্রতিনিধি বলে দাবি করে, তাই সত্য ও মিথ্যা যাচাই করার যোগ্যতা অর্জন করা জরুরি।


 4. একতা ও ভ্রাতৃত্ব: মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা এবং সত্যের পথে দৃঢ় থাকা।

         ইমাম মাহদি (আ.) এর পুনরাগমন ও 
                       বিশ্বপরিবর্তন:

ইমামের পুনরাগমন সম্পর্কে মহানবী (সা.) ও ইমামগণের বহু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। তিনি যখন প্রকাশিত হবেন, তখন পৃথিবী অন্যায় ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ থাকবে, এবং তিনি ন্যায় ও ইনসাফ দিয়ে একে পরিবর্তন করবেন।

কুরআনে বলা হয়েছে:
 "আর আমি তাদের ইমাম করবো যারা পৃথিবীতে দুর্বল ও নিপীড়িত ছিল এবং আমি তাদের উত্তরাধিকারী করবো।" (সূরা কাসাস: ৫)

                    উপসংহার

ইমাম মাহদি (আ.)-এর গায়বাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ। এটি আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা ও প্রস্তুতির সময়। প্রকৃত মু’মিনদের উচিত ধৈর্য, ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যের পথে অবিচল থাকা। আমরা যদি সত্যিকারভাবে তাঁর অনুসারী হতে চাই, তবে আমাদের উচিত ন্যায়ের পথে চলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং আল্লাহর বিধানকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

যে দিন তিনি প্রকাশিত হবেন, সে দিন পৃথিবী ন্যায় ও শান্তিতে ভরে উঠবে—এজন্য আমাদের সকলের প্রতীক্ষা।

اللهم عجل لوليك الفرج 🤲🤲
(হে আল্লাহ! তোমার ওলির আগমণ দ্রুততর করুন)।🤲🤲
_________________________________________

 মা-বাবা ও শিক্ষকের হক : কুরআন ও রেসালাতুল হুকুক-এর দৃষ্টিতে (অনুবাদ)

وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ
إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ
وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا

"তোমার প্রভু আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁরই ইবাদত করো এবং পিতামাতার প্রতি সদয় হও। যদি তাদের একজন অথবা উভয়ে তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ্‌’ পর্যন্ত বলো না, এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।"
(সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ২৩)


ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং নানাবিধ নিয়ামতে পরিপূর্ণ করেছেন। তাঁর প্রতি শুকরিয়া আদায় করা আমাদের কর্তব্য। কুরআনের অসংখ্য জায়গায় তিনি পিতামাতার প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

পিতামাতা এমন এক অমূল্য নিয়ামত, যাদের ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। আর শিক্ষক—তিনি সেই প্রদীপ, যিনি অন্ধকারে পথ দেখান।
এই নিবন্ধে আমরা সংক্ষেপে আলোচনা করবো মা, বাবা ও শিক্ষকের হক সম্পর্কে, যা ইমাম আলী (আ.)-এর ‘‘রিসালাতুল হুকুক’’-এ বর্ণিত রয়েছে।


                  মায়ের হক

তোমার মায়ের অধিকার হলো—তুমি জানো যে, তিনি তোমাকে বহু কষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন, যেমন কেউ কাউকে বহন করে না।
তিনি তাঁর হৃদয়ের ফল, নিজের দুধ দিয়ে তোমাকে আহার করিয়েছেন। নিজের কান, চোখ, হাত, পা, চুল, চামড়া দিয়ে খুশিমনে তোমার ভার বহন করেছেন।
যদিও এর ফলে তিনি ভোগ করেছেন সীমাহীন কষ্ট। তিনি নিজে ক্ষুধার্ত থেকেছেন, কিন্তু তোমাকে খাইয়েছেন। নিজে তৃষ্ণার্ত থেকেছেন, কিন্তু তোমায় পানি দিয়েছেন।
নিজে রোদে থেকেছেন, কিন্তু তোমাকে রেখেছেন ছায়ায়। তাঁর ঘুম গেছে তোমার ঘুমের জন্য, তাঁর ক্লান্তি হয়েছে তোমার শান্তির জন্য। তাঁর পেট ছিল তোমার প্রথম আশ্রয়, তাঁর বুক তোমার দুধের ঝর্ণা, তাঁর জীবন ছিল তোমার প্রহরী।
সুতরাং তোমার কর্তব্য হলো—তাঁর কষ্ট ও ত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞ হও। কিন্তু আল্লাহর সাহায্য ছাড়া তুমি সেই কৃতজ্ঞতা কখনোই পূর্ণ করতে পারবে না।


                     পিতার হক

তোমার পিতার অধিকার হলো—তুমি জেনে রাখো, তিনিই তোমার মূল ও ভিত্তি; তুমি তাঁর শাখা। যদি তিনি না থাকতেন, তবে তুমি থাকতেই না ।অতএব, যখন তুমি নিজের মাঝে কোনো গুণ বা সাফল্য দেখে গর্বে ভরে ওঠো, তখন চিন্তা করো—এই আশীর্বাদের মূল কারণ তোমার পিতা।

এই উপলব্ধি তোমার মধ্যে জন্ম নিক বিনয় ও কৃতজ্ঞতার। আল্লাহর প্রশংসা করো, কারণ শক্তি ও সামর্থ্য শুধু তিনিই দেন।


                 শিক্ষকের হক

 তোমার ওপর শিক্ষকের হক হলো—তুমি তাঁকে সম্মান করবে, তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করবে।
তাঁর শিক্ষায় মনোযোগ দিবে, হৃদয় খুলে গ্রহণ করবে। তুমি তাঁর সহায়তা করবে যেন তিনি তোমাকে শিক্ষাদানে সফল হন। তাঁর শেখানো জ্ঞানের বাহক হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করবে।
আর এই জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে সততার সঙ্গে। কারণ, জ্ঞান একটি আমানত। তা পৌঁছে দেওয়া, রক্ষা করা—তোমার দ্বায়িত্ব। মনে রেখো, সত্যিকার শক্তি ও প্রজ্ঞা একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।


                         উপসংহার

মা, বাবা এবং শিক্ষক—তাঁরা আমাদের জীবনের তিনটি অমূল্য রত্ন।
তাঁদের প্রতি সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানানো শুধু কর্তব্য নয়, বরং ইবাদতের অংশ।
এই হক আদায় করলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই আলোকিত হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই তাওফিক দান করুন, আমিন।


সূত্র: রিসালাতুল হুকুক (ইমাম আলী ইবনে হুসাইন, জাইনুল আবেদীন আ.)

__________________________________________------------------------------------------------

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜


আগমন কবে হবে?

সুদূর দিগন্তের দিকে অপেক্ষাই
পথ চেয়ে আছি,
আপনার আগমনের জন্য 
আমি অস্থির হয়ে আছি।।

অন্ধকার পৃথিবীতে
আবির্ভাবের আলো কবে ফুটিবে?
তার জীবনের দীর্ঘায়ুর
অবশান কবে ঘুচিবে?

স্মরণ করেছি আপনাকে
আলে-ইয়াছিন,আহাদ কিংবা নুদবাতে,
আবির্ভাব কবে হবে ? 
এই কুসংস্কারময় পৃথিবীতে।

আপনার সাথে সাক্ষাতের 
জন্য আরিজাতে লিখেছি,
আপনাকে দেখবার জন্য
আজাখানাতে খুঁজেছি।

হে! মোর খোদা 
পাঠিয়ে দাও শেষ হুজ্জাত কে,
ন্যায় বিচারে পরিপূর্ণ করিবে
এই নষ্করময় পৃথিবীকে।

অশ্রু থামেনা আপনার
দীর্ঘমেয়াদীর কষ্টের জন্য,
আমি আজও আছি অপেক্ষায়
আপনার আবির্ভাবের জন্য।।
_________________________________________

         আল-হুজ্জাতের আহ্বানে

আলোর পথের পত্রিকা, নাম ‘আল-হুজ্জাত’
শিয়া হৃদয় জাগায় বাংলা য়, জ্ঞানের প্রভাত;
দু’হাতে তুলে দেয় দীপ্তি, ইমামদের চিন্তাধারা
অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালায়, হৃদয়-আলো করা।

মাওলানা কাজিম আলী,ইনিই  হলেন কাণ্ডারি
কলমে তাঁর ঝরে লেখা, বাংলা র অলি-গলি;
ত্রৈমাসিকে প্রথম যাত্রা, স্বপ্ন ছিলো পবিত্র
বাংলা র জমিনে বসে বীজ বুনেছে  বিচিত্র।

ইমামে যামানার প্রেমে, হৃদয় করে জাগরণ,
এই পত্রিকা তারই বাহক, করে নব নির্মাণ;
কুম থেকে কবির আলী, মাশহাদে সুজা ভাই,
ইস্পাহানে রিপনের কলম,দ্বীনের বাণী গায়।

মইনুল হোসেন ছড়ায় কবিতা, ইসলামের পথে,
রাজার ছোঁয়ায় জ্যোতি নামে, মিনহাজ থাকে সাথে।
মুন্তাজির গাজীর হাতে, সুশ্রুত কথার মায়া,
তাঁদের কলম স্রোতের মতো, বয়ে আনে হায়া।

‘আল-হুজ্জাত’ আজও বলে যায়, প্রাণে নিয়ে শক্তি
ইমামের নামে দিগন্ত জয়ের, রচে নতুন মুক্তি;
এসো সবাই পড়ি আমরা, এই পত্রিকার পাতা,
আল্লাহর আনুগত্য করো, তিনিই একমাত্র ত্রাতা।

_____________________________________
 
                      
     কাসেম সোলাইমানি
          ✍️ রাজা আলী 

সিরিয়া আজ ধুঁকছে 
বন্ধুকে আজ খুঁজছে 
হে কাশেম,অভাব তোমার 
সিরিয়ান রা ভালোই বুঝছে।

তুমি চুপি চুপি চলে গেলে
কিছু বলে, কিছু না বলে
তুমি ছিলে মুক্তিদাতা সিরিয়ার 
তোমার অভাব ওরা বুঝছে।

তুমি ইরানি, কিন্তু শুধু ইরানের নও
ফিলিস্তিন,ইরাকের পতাকা ওড়াও
বুঝবে একদিন তোমাকে বুঝবে
তোমার আদর্শকেই ওরা খুঁজবে।

প্রতিরোধ ছাড়া মুক্তি আজ স্বপ্ন 
ভালো সাজলে শত্রুরা ভাবে রুগ্ন 
তাই লাঠির বদলা শুধু ই লাঠি 
নেড়েছিলে প্রতিরোধের কলকাঠি।

হে বীর,তোমার অভাব আজ বড়ো
প্রতিরোধ আন্দোলন হোক জড়ো
তোমার রক্তে রঞ্জিত ইরাকের মাটি
কারবালা তেই বিপ্লব হয়েছিল খাঁটি।


আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ) || রমযান সংখ্যা ||

আরবি : রমযান, ১৪৪৭ হিজরী ইংরেজি : মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ __________________________________________               সম্পাদক  :  ম...