Wednesday, November 19, 2025

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ জামাদিউল আওয়াল সংখ্যা


আরবি: জামাদিউল আওয়াল, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 

সহযোগী সম্পাদকরাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


কিছু সংখ্যক ব্যক্তি কিভাবে ইমাম মাহ্দী (আঃ) এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন

ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবনী আমাদের  জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ

ফাতিমা ও মাহ্দী: হেদায়েতের আলো

পশ্চিমবঙ্গের শিয়া কওমের শিক্ষা : একটি পর্যালোচনা 
          ✍️ রাজা আলী 

 আল্লাহর নেয়ামত ও ইমামে জামানা (আঃ)-এর মহা অনুগ্রহ




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

         নারী জাতির অনন্ত আলোকচ্ছটা

                ঋণ এবং
                সুদান
                ✍️ রাজা আলী 

       কুরআন, হাদিস, আহলে বাইতের সুর


             ইমাম মাহ্দীর আদর্শ (সনেট)


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

জামাদিউল আওয়াল—স্মৃতি, হেদায়েত ও রূহানিয়াতের এক প্রশান্ত মাস। আহলে বাইত (আ.)-এর সিয়ারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্যের পথে অটল থাকার মর্ম, আর ইমামতের আলো জাগিয়ে তোলে অন্তরের নীরব প্রতিজ্ঞা।

এই সংখ্যার প্রতিটি রচনা সেই আলোকে বহন করে—
কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর বার্তা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় মূলের দিকে;
ইমাম মাহদী (আ.)-এর সাক্ষাৎ, ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর আদর্শ, ফাতিমা ও মাহদীর নূরানী সম্পর্ক—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে রূহানিয়াতের এক উজ্জ্বল চিত্র।
এছাড়া সমাজ, তরবিয়্যাত ও নেয়ামতের ওপর আলোচনাগুলো আমাদের করে তোলে ভাবনাশীল ও দায়িত্ববান।

আসুন, এই পবিত্র মাসে আমরা নবায়ন করি আমাদের প্রতিজ্ঞা—
ইমামের পথে থাকুক আমাদের কলম, আমল ও হৃদয়ের ভালোবাসা।
                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


কিছু সংখ্যক ব্যক্তি কিভাবে ইমাম মাহ্দী (আঃ) এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন

গাইবাতে কুবরার যুগে অনেক ব্যক্তি হজরত ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আর আল্লাহ্র দান ও মোহাব্বতের কারণে ভাগ্যবান রূপে পরিগণিত হয়েছেন। তবে যে বিষয়টি অনুসন্ধান যোগ্য, সেটি হল এই যে, ঐ সমস্ত ব্যক্তিরা কিভাবে এমন উত্তম সৌভাগ্যের অধিকারী হলেন? তাঁদের তাক্বওয়া, পরহেজগারী ও নেক আমলই কি এই সৌভাগ্যের পিছনে কাজ করেছে? না, তাঁদের জ্ঞান শিক্ষা ও আভ্যন্তরীন মর্যাদাই ইমাম (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়েছে? না, শুধুমাত্র ইমাম (আঃ)- এর দয়া-মহব্বতের কারনেই তাঁরা সাক্ষাৎ পেয়েছেন?

অতি প্রসিদ্ধ ও বিখ্যাত হাদীস, যা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পবিত্র যিয়ারাতে নাহীইয়াহ্ হতে, তাঁর চতুর্থ নায়েব (প্রতিনিধি) শেখ আলী বীন মোহাম্মাদ সামারী (রহঃ)-এর কাছে পৌঁছায়; তাঁর প্রতি যদি মনযোগী হওয়া যায়, তাহলে আসল সত্যের সন্ধান পাওয়া যাবে। হাদীসটি হলঃ (অনুবাদ) "যদি কেউ তাঁকে দেখেছেন বলে দাবি করেন, চারজন নায়েবকে যেমন ভাবে দেখেছেন, সে মিথ্যাবাদী এবং অপবাদদাতা"। এই হাদীস থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নিজের ইচ্ছা বা খেয়াল-খুশি মত ইমাম মাহ্দী (আঃ) কে দেখা যায় না বা তার সঙ্গে নিজের মর্জি মত সম্পর্ক গড়া যায় না।

অপরদিকে ইসলামী ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, ইমাম (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জনকারীরা কেউ ওলামা, কেউ মুত্তাক্বী, আবার কেউ বা সাধারণ ও নিম্ন শ্রেণীর মানুষ এবং তাদের মধ্যে আহালে সুন্নত ও কাফিরদেরও সন্ধান পাওয়া যায়। ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের নাফস ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারণে এটা বোঝা যায় যে, ইমাম (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জনকারীদের বিশেষ কোন শ্রেণী বা দল নেই। বরং ইমাম (আঃ) আল্লাহ্ ও নিজের মর্জিমত সাধারণ ও বিশেষ ব্যক্তিদের নিজের দান ও বরকতের মাধ্যমে উপকৃত করে থাকেন।

'আল্ আ'বক্বারিইউল হিসান'

এখন উপরে উল্লেখিত পুস্তকটির পরিচয় তুলে ধরছি। এর মধ্যে এমন ভাগ্যবান ব্যক্তিদের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যাদের ভাগ্যে ইমাম মাহ্দী (আঃ) এর সাক্ষৎ অর্জিত হয়েছে। পুস্তকের যে অংশগুলি আমাদের নিকট অবশিষ্ট আছে, তা দু'খণ্ডে বিভক্ত আছে।

পঞ্চম ভাগে বিভক্ত

দুই খণ্ডে বিভক্ত পুস্তকটি আবার পাঁচ ভাগে খণ্ডিত। প্রথম খণ্ডে তিনটি ভাগ, আর দ্বিতীয় খণ্ডে দু'টি ভাগ আছে। গ্রন্থটিতে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার থেকে শুরু করে গাইবাতে ছোগরা এবং গাইবাতে কুবরাতে সাক্ষাতকারী ব্যক্তিদের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রমান

পুস্তকটির আকর্ষণীয় দিক হল, প্রতিটি ঘটনার পূর্বে লেখক দলিল বা প্রমান দিয়েছেন। ওলামা ও গবেষকদের জন্য এই প্রমান অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কতকগুলি প্রমান আকারে দীর্ঘ।

পুস্তকটির খণ্ডিত বিষয়

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে,, আলোচ্য পুস্তকটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত। কিন্তু এখানে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে অধ্যায় অনুসারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হ'ল।

প্রথম অধ্যায়:-

এই অধ্যায়ে এমন সৌভাগ্যবান সাক্ষাতকারী ব্যক্তিদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যারা সাক্ষাতের সময় ইমাম মাহদী (আঃ)-কে চিনতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে এখানে এমন সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যারা সাক্ষাতের সময় ইমাম মাহদী (আঃ)-কে চিনতে না পারলেও পরবর্তীতে কারণ ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এছাড়াও এই অংশে কিছু এমন ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে, যে ঘটনায় সাক্ষাতকারী ব্যক্তি বুঝতে পারেননি যে, তিনি ইমাম মাহদী (আঃ)-কে চিনতে পেরেছেন, না চিনতে পারেননি।

দ্বিতীয় অধ্যায়:-

এই অধ্যায়ে ইমামে যামানা (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও 'মোকাশেফাহ্' বিষয় বর্ণিত হয়েছে। 'মোকাশেফাহ্' অর্থাৎ স্বপ্ন ও জাগ্রতর মধ্যম অবস্থা। মোকাশেফাহ্ অবস্থায় মানুষ যে সমস্ত জিনিসকে দেখতে পায়, তা বাহ্যিক হুশের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। স্বপ্নে মানুষের শ্রবণ ও দৃষ্টি বাইরের চোখও কান দিয়ে হয় না। তবে মোকাশেফাহ্-তে আত্মা ও রুহ তার নিজের অবস্থায় থাকে, আর ঐ সময় বাইরের কান চারপাশের আওয়াজ বা শব্দকে শুনতে থাকে।

তৃতীয় অধ্যায়ঃ-

এই অধ্যায়ে স্বপ্নে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জনকারী ব্যক্তিদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলি সত্য স্বপ্ন।

চতুর্থ অধ্যায়:-

এই অধ্যায়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পবিত্র নুরের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

অর্থাৎ সাক্ষাৎকারীরা সাক্ষাতের সময় ইমাম (আঃ)-এর নুরের ছটা, না আওয়াজ, না তাঁর পবিত্র সুগন্ধ পেয়েছেন, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

পঞ্চম অধ্যায়:-

এই অধ্যায়ে এমন ব্যক্তিদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যারা ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সঙ্গে তাওয়াসুল (ওছীলা বা মাধ্যম) করেছেন, আর উত্তম ফল পেয়ে উপকৃত হয়েছেন।

_________________________________________



ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবনী আমাদের  জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ


ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবনী আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ। তাঁর জীবন থেকে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অর্জন করতে পারি, যেমন:
১. ধৈর্য ও সহনশীলতা
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পরেও ইমাম (আ.) ধৈর্যের সঙ্গে সবকিছু সহ্য করেন। তাঁর সহনশীলতা ছিল ঈমানের নিদর্শন।
২. ইবাদতের প্রতি গভীর অনুরাগ
তাঁকে বলা হয় সাজ্জাদ (সেজদাকারী) ও জাইনুল আবেদিন (ইবাদতকারীদের অলংকার)। তাঁর দোয়া, নামাজ ও কান্না আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করে।
৩. দুঃখ-কষ্টেও আল্লাহর স্মরণ
কারবালার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন জীবনকে গড়ে তুলেছিলেন, তখন আল্লাহর স্মরণই ছিল তাঁর একমাত্র শক্তি।
৪. দোয়া ও আত্মিক উন্নয়ন
তাঁর বিখ্যাত দোয়ার সংকলন "সাহিফা সাজ্জাদিয়া" আত্মিক উন্নয়নের জন্য এক অতুলনীয় উপহার, যেখানে নৈতিকতা, আত্মসমালোচনা, দয়া, সমাজসেবার দিক নির্দেশনা রয়েছে।
৫. অত্যাচারের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ
যদিও তিনি সরাসরি যুদ্ধ করেননি, তবুও ইয়াজিদের দরবারে তাঁর খুৎবা ছিল অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ। 
৬. সমাজ সংস্কার ও মানবতা
তিনি গোপনে দরিদ্রদের সাহায্য করতেন। মানুষকে শিক্ষা দিতেন কিভাবে দয়া, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবন হাদীস ও ইসলামিক শিক্ষার আলোকে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বংশধরদের সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীসে যেভাবে গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, তা ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবনেও পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

  হাদীসের আলোকে তাঁর জীবন থেকে কিছু দিক:

১. আহলে বাইতের ফজিলত সংক্রান্ত হাদীস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
_«إني تاركٌ فيكم الثقلين: كتابَ اللهِ، وعِترتي أهلَ بيتي، ما إن تمسَّكتم بهما لن تضلُّوا بعدي أبدًا.»_  
(সহিহ মুসলিম) ( کتاب مشهور نزد اهل‌سنت)
 অর্থাৎ: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী জিনিস রেখে যাচ্ছি — আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত। তোমরা যদি এদের ধরে রাখো, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।”  
এই হাদীস অনুযায়ী ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.) আল্লাহর কিতাব ও নবীর আহলে বাইতের অন্যতম প্রতিনিধি ছিলেন। 

২. ইবাদতে শ্রেষ্ঠত্ব:
রাসূল (সা.) বলেন:
“সেজদার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হও।”
(সহিহ মুসলিম) کتاب مشهور نزد اهل‌سنت 
 ইমামকে "সাজ্জাদ" বলা হতো কারণ তিনি দীর্ঘ সময় সেজদা করতেন। তাঁর সেজদা ও ইবাদত হাদীসের প্রকৃত বাস্তবায়ন। 

৩. সাহিফা সাজ্জাদিয়া — হাদীসসমৃদ্ধ দোয়ার ভাণ্ডার:
ইমাম (আ.)-এর দোয়াগুলোর সংকলন "সাহিফা সাজ্জাদিয়া" হাদীসের মতই নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গঠনের অনুপম নির্দেশনা দেয়।

৪. ইমামতের ধারক হিসেবে:
হাদীস: _“হাসান ও হুসাইন আমার সন্তানেরা, এবং তাদের সন্তানদের মধ্যেই ইমামগণ হবেন।”_  
(ইবনে মাজাহ)

 ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর তাঁর পুত্র জাইনুল আবেদিন (আ.)-কে আল্লাহর নিযুক্ত ইমাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উপসংহার:
ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবন হাদীসের বাস্তব রূপ, যেখানে আমরা দেখতে পাই কীভাবে কষ্ট, বন্দিত্ব, ও দুঃসহ জীবনে ইবাদত, ধৈর্য, দয়া ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা যায়। তাঁর জীবন মুসলমানদের জন্য নৈতিকতা ও ইমানদারির এক উজ্জ্বল আদর্শ। ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)-এর জীবন আমাদের শেখায় – দুঃখ-কষ্ট, জুলুম-অত্যাচারের মাঝেও ইবাদত, ধৈর্য, দয়া ও ন্যায়ের পথে অটল থাকতে হয়।
 
__________________________________________



ফাতিমা ও মাহ্দী: হেদায়েতের আলো

 ভূমিকা

আলহামদুলিল্লাহ, যিনি মানবজাতির জন্য হেদায়েতের পূর্ণ আলোকধারা দান করেছেন কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর মাধ্যমে।

বিবি ফাতিমা জাহেরা (সা.আ.) ও ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) — এই দুই নূর একই দিভ্য আলো থেকে উৎসারিত। ফাতিমা (সা.আ.) হচ্ছেন নবুয়তের ঘরের নূর, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) সেই নূরের শেষ প্রতিফলন, যার মাধ্যমে পৃথিবী পূর্ণ হবে ন্যায় ও শান্তিতে।


 ফাতিমা জাহেরা (সা.আ.) — ইমামতের নূরানী উৎস

বিবি ফাতিমা (সা.আ.)-এর মর্যাদা শুধু নবীর কন্যা হিসেবে নয়; তিনি ইমামতের কেন্দ্রবিন্দু ও নূরের ধারক। ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.) বলেন: 
ফাতিমা (সা.আ.) হচ্ছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমামদের উপর হুজ্জত।”
[Bihar al-Anwar, vol. 43, p. 105; Tafsir al-Ayyashi, vol. 1, p. 240]

তিনি ছিলেন আল্লাহভীতিতে অতুলনীয়, ইবাদতে অনন্য এবং সমাজে সত্যের জন্য নির্ভীক কণ্ঠস্বর। আর ইমাম আলী (আ.)-এর প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল কুরআনিক আদর্শের জীবন্ত প্রতিফলন। তাঁর জীবনের শিক্ষা আমাদের জানায় — ইলাহি ন্যায় প্রতিষ্ঠা, দ্বীনের সুরক্ষা এবং ইমামতের আনুগত্য* — এই তিনই প্রকৃত মুক্তির পথ



ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) — ফাতিমার নূরের পরিপূর্ণ প্রতিফলন

ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) হচ্ছেন ফাতিমা (সা.আ.)-এর বংশধর, তাঁর রক্ত, নূর ও আদর্শের উত্তরাধিকারী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “মাহ্দী ফাতিমার (সা.আ.) সন্তানদের মধ্য থেকে।”
[Sunan Abi Dawood, vol. 4, hadith 4284; Mustadrak al-Hakim, vol. 4, p. 557]


ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর মিশন হলো: 
ক) বিশ্বে ন্যায় ও সমতার প্রতিষ্ঠা, খ) কুরআনের প্রকৃত ব্যাখ্যার পুনরুজ্জীবন,
গ) মানবতাকে আহলে বাইতের (আ.) পথে ফিরিয়ে আনা।

ইমাম বাকির (আ.) বলেন: “যখন কায়েম (আ.) উদ্ভাসিত হবেন, তিনি ন্যায়ের সঙ্গে শাসন করবেন এবং তাঁর যুগে অন্যায় বিলুপ্ত হবে।”
[Kamal al-Din, Shaykh Saduq, p. 331; Al-Ghaybah, al-Nu’mani, p. 238]


 মিলিত আদর্শ — নূর থেকে নূরে প্রবাহিত হেদায়েত

ফাতিমা (সা.আ.) হচ্ছেন ন্যায়, ত্যাগ ও সত্যের বীজ, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) সেই বীজের পূর্ণ প্রস্ফুটন। তাঁদের মধ্যে রয়েছে এক ধারাবাহিক ইলাহি সম্পর্ক —
নূর ফি নূর” (নূরের মধ্যে নূর)। এই মিলিত আদর্শের তিনটি স্তম্ভ হলো —

 ক) ইলাহি ন্যায়:
ফাতিমা (সা.আ.) ন্যায়ের পথে নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছেন, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) সেই ন্যায়কে বিশ্বব্যাপী বাস্তবায়ন করবেন।

 খ) ইমামতের ধারাবাহিকতা:
ফাতিমা (সা.আ.) হচ্ছেন সকল ইমামের উৎস, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) হচ্ছেন তাঁদের সমাপ্তি।

 গ) হেদায়েতের বিশ্বায়ন:
ফাতিমা (সা.আ.) মানবতার হৃদয়ে নূর জ্বালিয়েছেন, আর ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) সেই নূরকে ছড়িয়ে দেবেন সমগ্র পৃথিবীতে।

ইমাম সাদিক (আ.) বলেন: “যে মাহ্দীর অপেক্ষায় মৃত্যুবরণ করে, সে যেন কায়েমের পতাকার নিচেই শহীদ হয়।”
 [Kamal al-Din, Shaykh Saduq, p. 335; Al-Ghaybah, al-Nu’mani, p. 200]


কওমের জন্য হেদায়েতের বার্তা

আজ আমাদের শিয়া ইসনা আশারী কওম নানা দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশ্বাসে শৈথিল্য, সমাজে বিভক্তি ও দুনিয়াবী আকর্ষণ আমাদের ইমানের মজবুত ভিত্তি নাড়া দিচ্ছে। এখন আমাদের ফিরতে হবে সেই আদর্শে —
ফাতিমা (সা.আ.)-এর আত্মিক পবিত্রতা, আলী (আ.)-এর ন্যায় ও সাহস, এবং ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর অপেক্ষা ও প্রস্তুতির সংস্কৃতি। ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) এক পত্রে ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকের উচিত আমাদের ভালোবাসার পথে এগিয়ে যাওয়া এবং যা আমাদের অসন্তুষ্ট করে তা থেকে দূরে থাকা।”
 [Al-Ihtijaj, Al-Tabrisi, vol. 2, p. 497]



এই কথাই আমাদের কওমের হেদায়েতের মূল: “ইন্তিজার” মানে শুধু অপেক্ষা নয় — বরং আত্ম-সংস্কার, সমাজ-সংস্কার ও আহলে বাইতের আদর্শে জীবন গড়া।

 উপসংহার

ফাতিমা জাহেরা (সা.আ.) ও ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.) — এই দুই নূর একই ইলাহি আলোর প্রতিফলন। ফাতিমা (সা.আ.) ছিলেন ন্যায় ও হেদায়েতের সূচনা, মাহ্দী (আ.ফা.) সেই হেদায়েতের চূড়ান্ত পরিণতি। যে তাঁদের ভালোবাসে ও তাঁদের পথ অনুসরণ করে, সে-ই প্রকৃত “মুহিব্বে আহলে বাইত”।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে ইমাম মাহ্দীর (আ.ফা.) সহায়ক, অনুগামী ও তাঁর পতাকার নিচে শহীদ হওয়াদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন... ছুম্মা আআমিন।

__________________________________________



পশ্চিমবঙ্গের শিয়া কওমের শিক্ষা : একটি পর্যালোচনা
        ✍️ রাজা আলী

শিক্ষা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের এমন একটি নেয়ামত,যা মানুষকে সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে শেখায়।এই কারণে কোরানে কারীমের মধ্যে শিক্ষা র অশেষ গুরুত্ব একাধিক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলের হাদীসেও শিক্ষার বহুমুখী গুরুত্ব উঠে এসেছে।এই শিক্ষাই মানুষের মর্যাদার কারণ; শিক্ষা ই সমাজের মেরুদণ্ড। তাই বর্তমান সময়ে আমাদের শিয়া কওমের চিন্তা -চেতনায় শিক্ষা কিছু টা পরিমাণ জায়গা করে নিয়েছে।

      তা সত্ত্বেও বলা যায় আজ আমরাই পশ্চিমবঙ্গের বুকে শিক্ষা ক্ষেত্রে সব থেকে পিছিয়ে। কিন্তু কেন?প্রতিটি ঘরের প্রতিটি সন্তান আজ স্কুলের দুয়ারে।প্রায় প্রতিটি বাঙালি শিয়া সন্তান আজ ক্লাস এইট , মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা আরো কিছু ডিগ্রি ঝুলিতে ভরে নিয়েছে।প্রশ্ন জাগে তার পরেও কেনো শিয়া কওম উন্নত চিন্তা-চেতনা ,সরকারি -বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এত পিছিয়ে! আমাদের সমাজ কেনো এখনো অনুন্নত? এখন এই "কেনো"র উত্তর অনুসন্ধান করা যাক।

     গত দশকের তুলনায় বর্তমানে শিয়া সমাজের শিক্ষার হার অনেক খানি এগিয়েছে। কিন্তু শিক্ষা র মান উন্নয়ন হয় নি।হাতে গোনা দুচার জন ছাড়া বাকি সকলে অতি সাধারণ ভাবে পাশ করেছে এবং করছে এবং পড়াশোনা র মূল ক্ষেত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।অনেকে আবার মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তর থেকেই বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে এবং চেতনাশীল মানুষ হিসাবে কিম্বা ভালো কর্ম থেকে দূরে রয়ে যাচ্ছে।।দু এক জন উচ্চশিক্ষার উন্নত সোপানে পা রেখেছে; কিন্তু ভালো মতো আর্থিক পরিস্থিতি কিম্বা ভালো দিকনির্দেশনা র অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।দুএক জন মাত্র চিন্তাশীল মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে পেরেছে বা ভালো সরকারি-বেসরকারি কাজে নিযুক্ত হতে পেরেছে।

মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তরে হারিয়ে যাওয়ার কারণ:

     আমাদের শিয়া সমাজের বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তরেই পড়াশোনার মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়(তবে কন্যাশ্রী,রূপশ্রীর দৌলতে কিছু মেয়ে গ্র্যাজুয়েশন স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে)। তারা অনেকেই পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়।কেউ বা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার তাগিদ উপলব্ধি করে এবং কাজ ও পড়াশোনা  পাশাপাশি চালাতে থাকে ফলে পড়াশোনা এক অর্থে শেষ হয়ে যায়।এই সমস্যার মূল কারণ লুকিয়ে রয়েছে ঐ সকল ছাত্রদের শৈশবকালীন পড়াশোনা র মধ্যে।বাবা-মার অসাবধানতা এবং অজ্ঞতা এক্ষেত্রে দায়ী।বাবা-মা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছে, কিন্তু ভালো রেজাল্টের তাগিদ অনুভব করেনি। সংসার, আত্মীয় এবং বন্ধুদের পিছনে অহেতুক খরচ করেছে, কিন্তু সন্তানের জন্য ভালো শিক্ষকের ব্যবস্থা করেনি।আজকের দিনের পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভালো গৃহশিক্ষক অপরিহার্য।এটা প্রত্যেক বাবা-মা জানে, কিন্তু সাধারণ টিউশন বা সাধারণ কোনো কোচিং এ পাঠিয়েছে।যে বাবা নিজের সন্তানের জন্য মাসে পাঁচ সাত শ'টাকার খাবার আনতে পারে,যে বাবা নিজের মেয়ের বিয়েতে তিন /চার লক্ষ টাকা খরচ করতে পারে ;সেই বাবা নিজের সন্তানের পিছনে মাসে পাঁচ শ' সাত শ টাকা টিউশন খরচ করে না।নাইন টেন স্তরে প্রবেশ করলে কোনো কোনো বাবা মা কিছুটা সচেতন হয়,ভালো টিউশনের ব্যবস্থা করে, কিন্তু ভিত দুর্বল থাকার কারণে ভালো রেজাল্ট হয় না।সুতরাং ঐ সন্তান বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার 'মায়াবী আকাশে'এক,দুই, তিন... করে শুধু ক্লাসে উঠেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি।

অভিভাবকের অজ্ঞতা:

অজ্ঞতা মানুষের ভবিষ্যত নষ্ট করে দেয়।তাই শিক্ষার্থীদের অভিভাবক রা সঠিক ভাবে সন্তানদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে না। কিছু অজ্ঞ ও অসৎ মানুষের জন্য সন্তান দের পড়িয়ে কী হবে বা চাকরি নেই ধরণের শ্লোগানে তারা ভ্রান্ত ধারণা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সন্তানদের ভবিষ্যতকে বরবাদ করে দেয়।

শিক্ষকদের অনিহা:

বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের অনিহা শিক্ষার্থীদের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সাধারণ কৃষি প্রধান এলাকায় স্কুল শিক্ষক দের গভীর ঔদাস্য এবং ফাঁকি বাজী র কারণে শিক্ষার্থীরা যেমন ভালো কিছু শিখতে পারে না,তেমন ই উৎসাহ পায় না। সুতরাং ক্লাসের পর ক্লাসে উঠলেও প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের ঘাটতি থেকেই যায়।

উপসংহার:

পরিশেষে এটাই বলতে হয় যে,শিয়া কওমের শিক্ষার মূল ঘাটতি টি হয়ে থাকে অভিভাবকদের থেকে। অভিভাবকদের সচেতনতা এবং উদ্যোগ না থাকলে কোনো শিক্ষার্থী সঠিক ভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাবে না।ফলে আমাদের অর্থনীতি,সমাজ ও সংস্কৃতি পিছিয়ে পড়বে। আমাদের সমাজে আজ যে সমস্যা রয়েছে,তা তো সমাধান হবে না; বরং নতুন নতুন সমস্যা এসে হাজির হবে।

__________________________________________



আল্লাহর নেয়ামত ও ইমামে জামানা (আঃ)-এর মহা অনুগ্রহ


بسم الله الرحمن الرحيم
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
“অতএব, তোমাদের প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে?” (সূরা রহমান)

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তা’আলার, যিনি সমগ্র সৃষ্টির রব, পরম দয়ালু ও পরম করুণাময়। তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের রিজিক দান করেছেন, এবং আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে নবী ও ইমামগণকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর হামদ ও শুকরিয়া আদায় করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।

আল্লাহ তায়ালা সূরা রহমানের মাধ্যমে তাঁর অসংখ্য নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে, আর জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন আগুনের উত্তপ্ত শিখা থেকে। এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা তাঁর সৃষ্টির নিদর্শন, তাঁর রহমতের প্রতিফলন।
তবুও মানুষ ভুলে যায়, অস্বীকার করে, অথচ আল্লাহ প্রশ্ন করেন—
“তাহলে তোমাদের প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে তোমরা অস্বীকার করবে?”

 মানব শরীরে আল্লাহর নেয়ামতের নিদর্শন:

আল্লাহর নেয়ামতের সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমাদের নিজের দেহে নিহিত।
তিনি কানের ভিতরে তিক্ততা সৃষ্টি করেছেন, যেন কোনো জীব বা পোকা-মাকড় প্রবেশ করলে তা মারা যায়। যদি এমন না হতো, তবে অসংখ্য কীটপতঙ্গ কানে ঢুকে মানুষকে কষ্ট দিতো বা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতো।

তিনি ঠোঁটের মাঝে রেখেছেন মিষ্টতা, যাতে মানুষ তিক্ত ও মিষ্টির পার্থক্য অনুধাবন করতে পারে।
চোখে রেখেছেন নোনাভাব, কারণ চোখ দুটি চর্বিযুক্ত। যদি এতে নোনাভাব না থাকত, চোখ গলে যেত।
আর নাককে প্রবাহমান করেছেন, যাতে মাথার অতিরিক্ত পদার্থ নাক দিয়ে বের হয়ে আসে—না হলে মাথা ভারী হয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হতো।

এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুগ্রহই প্রমাণ করে, আল্লাহর নেয়ামত অসীম, অগণিত ও অপরিমেয়।

এক অদৃশ্য কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত:
তবে এসব দৃশ্যমান নেয়ামতের পাশাপাশি আছে এমন এক নেয়ামত, যা অদৃশ্য হলেও সর্বশ্রেষ্ঠ।
তিনি আমাদের মাঝে আছেন, কিন্তু আমরা তাঁকে দেখি না। আমরা তাঁর কণ্ঠ শুনতে পাই না, কিন্তু তিনি আমাদের প্রতিটি আহ্বান শুনেন। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সাহায্য করেন, কিন্তু আমরা তা অনুভব করতে পারি না। বিপদের সময় তিনি আমাদের মাথায় স্নেহের হাত রাখেন, অথচ আমরা সেই উপস্থিতি টের পাই না।

তিনি আমাদের গোনাহ দেখে কাঁদেন, আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, অথচ আমরা তাঁর জন্য একবারও আল্লাহর দরবারে হাত তুলতে পারি না!
আমরা মুখে বলি—কারবালার প্রতিশোধের সৈনিক হবো, কিন্তু আমাদের আমল দেখে হয়তো তিনি জুলফিকার হাতে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখেন!
হে আল্লাহ! আমরা কৃতজ্ঞ যে, তুমি আমাদের এমন এক নেয়ামত দান করেছ, যা সকল নেয়ামতের ঊর্ধ্বে—
সেই নেয়ামত হলেন আমাদের মাওলা, ইমাম মাহ্দী (আখেরি জামান আঃ)।
তাঁর বরকতেই এই পৃথিবী টিকে আছে।
তাঁর অস্তিত্বের বরকতেই আমরা আজ রিজিক, শান্তি ও আলো পাচ্ছি।
প্রতিটি নেয়ামতের পেছনে রয়েছে ইমামে জামানা (আঃ)-এর রহমত ও দোয়া।

 আমাদের করণীয়
১️, ইমামে জামানা (আঃ)-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা ও মহব্বত জাগ্রত করা।
২️, এমন আমল করা যা তাঁকে সন্তুষ্ট করে, এবং গোনাহ থেকে দূরে থাকা যা আমাদের তাঁর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত করে।
৩️, প্রতিনিয়ত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা যে, তিনি আমাদের যুগের ইমাম হিসেবে এমন এক মহীয়ান নেইমত দান করেছেন।

 উপসংহার
প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি দৃষ্টিতে, প্রতিটি অনুভূতিতে আল্লাহর নেয়ামতের ছোঁয়া।
তবুও মানবজাতি ভুলে যায়, অকৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে।
আর তাঁর প্রেরিত সর্বশেষ প্রমাণ, আমাদের ইমামে জামানা (আঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও প্রত্যাশা যেন আমাদের জীবনকে আলোকিত করে—
যতক্ষণ না আমরা তাঁর ন্যায়ের পতাকার নিচে মাথা নত করে দাঁড়াতে পারি।

__________________________________________------------------------------------------------




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
     নারী জাতির অনন্ত আলোকচ্ছটা

নূরের গুচ্ছ ফাতেমা,
পাঞ্জতনের কেন্দ্র ফাতেমা।
আরশ হতে সৃষ্টি হল—
মুর্তজার প্রিয় ফাতেমা।

জগৎজননী তুমি ফাতেমা,
এগারো ইমামের মা তুমি ফাতেমা।
তোমারই নামে আছে কাওসার,
রহমতের ধারা তুমি ফাতেমা।

নারীজাতির আদর্শ তুমি ফাতেমা,
রোগের শেফা— তাসবিহে ফাতেমা।
নারীরা পাবে জান্নাত তোমার আদেশে,
উম্মতেরা ভ্রমে ছিল তোমার পথের বেশে।

ফিদাক মেরে নিয়েছে তোমার ফাতেমা,
দলিল ছিঁড়ে দিয়েছে তোমার ফাতেমা।
নবীর সাহাবা দাবি করে তারা কিভাবে—
যতই হোক খলিফা, তারা কাতিলে ফাতেমা।

__________________________________________


    ঋণ এবং সুদান
    ✍️ রাজা আলী 


               ঋণ
রাত ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে আরো
মুক্তি কোথায় বলতে পারো?

ওদের কালো হাত,উগ্র দৃষ্টি
শুকিয়েছে মেঘ,নেই তো বৃষ্টি!

যন্ত্রণা , যন্ত্রণা আজ অনবরত
ওই দেখ লাশ শিশুর শত শত!

এরা শান্তির দূত,গায়ে বেশ যুত
ভাব এদের,এরাই পবিত্র ও পূত।

জেনে রাখ ওরা শয়তান 
করে আছে মানুষের ভান।

আসবে সেদিন আসবে শীঘ্র 
ধ্বংস হবেই,ওদের বিগ্রহ।

মুক্ত,মুক্ত,হবে নতুন ফিলিস্তিন 
শোধ হবে কি,আল আকসার ঋণ?


          সুদান
কালো মানুষের দেশ
সর্বদা দরিদ্রদের বেশ
আবার এখন তীব্র কালো ছায়া
কে রে তুই,এখন দূর হ অপয়া।

বীভৎস দানব এক
দুচোখ মেলে দেখ
যদিও মানুষের বেশ ধরেছে খুব 
শয়তানেরা মুনাফেক দেখে চুপ।

পথে ঘাটে শুধু লাশ
এক টুকরো নেই আশ
গরীব মানুষের দেশ বলে নেই মান
যন্ত্রণা দগ্ধ তুমি,বেদনাকাতর সুদান।
__________________________________________

কুরআন, হাদিস, আহলে বাইতের সুর

কুরআন নূরের ঝর্ণা ধারা, আল্লাহর কালাম মধুর, 
হাদিস নবীর পথের তারা, জীবনে জাগায় সত্যের সুর। 
কিন্তু আহলে বাইত ছাড়া, হায়, পথটা অন্ধকারে ডোবে, ইসলামের গভীর রহস্য তখন, হৃদয়ে অচেনা কুয়াশায় থোবে।

ফাতেমা, আলী, হাসান, হোসেন, জয়নাবের ত্যাগের ঝংকার, কুরআনের আয়াত তাদের জীবনে, হাদিসের প্রাণের আধার। নবীর কোলে জন্ম তাদের, পবিত্র ঘরের আলোর ফুল, 
তাদের ছাড়া ইসলামের পথ, অসম্পূর্ণ, ম্লান কুমুদ।

কুরআন বলে, "চলো হে মুমিন, সত্যের পথে হৃদয় জাগাও,” হাদিস বলে, "নবীর সুন্নাহ, জীবনে এনে স্বপ্ন গড়াও।
" আহলে বাইত সেই পথের দীপ, জীবন্ত রূপে আলোর মায়া, তাদের ভালোবাসা ছাড়া, ইসলাম অধরা, হৃদয়ে ছায়া।

ফাতেমার ধৈর্যে শিখি ত্যাগ, অটল সত্যের অমর কথা, 
আলীর তরবারি জাগায় হৃদয়ে, হকের জন্য নির্ভীক ব্যথা। 
হাসান-হোসেনের শাহাদাতে, ইসলামের জয়ের রাগিনী, জয়নাবের কণ্ঠে শুনি আমরা, সত্যের অমর সুরের ধ্বনি।

কুরআন, হাদিস, আহলে বাইত, তিন মিলে ছন্দের তাল, 
একটি ছাড়া পথ অচল, হৃদয়ে জাগে না আলোর মশাল।
ও মুমিন, তুই বুকে ধরো, এই তিনের মধুর মিলন, 
আহলে বাইতের ভালোবাসা, ইসলামের প্রাণের কিরণ।

তাই আয়, ছন্দে ছন্দে করি, আহলে বাইতের গুণগান, কুরআন-হাদিসের আলোয় চলি, সত্যের পথে দিই প্রাণ।
তাদের ভালোবাসা হৃদয়ে নিয়ে, ইসলামের সুরে মাতি, 
ছন্দে ছন্দে জীবন গড়ি, আলোর পথে হেঁটে যাই।


 __________________________________________

ইমাম মাহ্দীর আদর্শ (সনেট)

অন্ধকার ঢাকে যখন বিশ্বাসের জ্যোতি,
রাত্রির মাঝে জাগে এক নীরব আশা।
প্রতিশ্রুত সেই নূর আসিবেন সত্ত্বগতি,
ন্যায়ে ভরবে ধরা, জ্বলবে আলোক ভাষা।

লুকায়ে আছেন তবু নজর রাখেন প্রাণে,
যে হৃদয় চায় পবিত্রতার ছোঁয়া।
তাঁর নামেই জাগে দুনিয়ার প্রতিজনে,
করুণা চায়, চায় ইলাহি আলো রোয়া।

তাঁর তরবারি ন্যায়ের প্রতীক মহীয়ান,
জ্ঞান ও দয়ায় ভরে দিবেন সংসার।
জুলুম মুছে যাবে, উঠবে প্রেমের গান,
মানবতা ফিরবে সত্যের দ্বারে আবার।

হে হৃদয়! প্রস্তুত হও আহ্বানের তরে,
মাহ্দী আসিবেন, জাগবে নূর ঘরে।


Following Shakespearean Sonnets (abab cdcd efef gg )
------ _____------_____------______------______------

Sunday, October 19, 2025

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ রবিউস সানি সংখ্যা

আরবি: রবিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: অক্টোবর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


শেখ মুর্তযা আনছারী (রহঃ)- অনুবাদ

ইমাম মেহদী আঃ এর ইমামত  (ঈদে জাহরা)

ইয়াতীমে দো আলম ও আমাদের অন্তরের প্রতীক্ষা

ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন:এক আধ্যাত্মিক বিস্ময় 
          ✍️ রাজা আলী 

 মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতীক্ষা: সর্বোত্তম ইবাদত




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

           আখেরী নবুয়াত

                মানবতা
                      ও
            নোবেল তুমি কার?
                ✍️ রাজা আলী 

             নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

রবিউস সানী—রূহানিয়াত ও আশার মাস। সফরের শোক শেষে এই মাস আমাদের ডাকে নতুন আলোর পথে, যেখানে প্রতীক্ষা হয়ে ওঠে ইমানের প্রাণ, আর ইমামতের স্মৃতি জাগায় আত্মার জাগরণ।

এই সংখ্যার প্রতিটি রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে সেই আলো। শেখ মূর্তজা আনছারি (রহঃ)-এর জ্ঞান ও ত্যাগ আমাদের শেখায় ঈমানের গভীরতা। “ঈদে জাহেরা”-য় ফুটে উঠেছে মুক্তির আনন্দ, “ইয়াতিমে দো আলম ও আমাদের অন্তরের প্রতীক্ষা”-য় জেগে উঠেছে অন্তরের বিপ্লব, আর “মানুষ শ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর প্রতীক্ষা : সর্বোচ্চ এবাদত” আমাদের আহ্বান জানায় কর্মমুখর অপেক্ষায়।

কবিতার পাতায় “আখেরি নবুয়াত”, “মানবতা” ও “নি:শব্দ প্রতিজ্ঞা”—এই তিনটি কবিতা যেন হৃদয়ের প্রার্থনা, যেখানে শব্দই হয়ে ওঠে দোয়া।

আসুন, এই রবিউস সানীতে আমরা নবায়ন করি আমাদের প্রতিজ্ঞা—
ইমামের পথে থাকুক আমাদের কলম, আমল ও ভালোবাসা।
                 
                              ওয়াস সালাম 
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


শেখ মুর্তযা আনছারী (রহঃ)

ইসলামী জগতের এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও উচ্চ পর্যায়ের ফক্বীহ্ হলেন শেখ মুর্তযা আনছারী (রহঃ) (১২১৪-১২৮১ হিজ্বরী)। তাঁর শিক্ষা ও আমলের আলো ইসলামী দেশগুলির উপর পড়েছিল। কিছু ওলামাদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন ফক্বীহ ও মুজতাহীদদের মধ্যে শেষতম। তাঁর বংশ নবী (সাঃ)-এর বিখ্যাত সাহাবী জনাবে জাবীর ইবনে আবদুল্লাহ্ আনছারী (রহঃ) থেকে ছিল। আল্লামা মোহাদ্দিছ নুরী (রহঃ) নিজের পুস্তক 'মুস্তাদরিকে'র শেষে তাঁর বিষয়ে বলেছেনঃ 'আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন জনাবে জাবীরের উপর খুবই এহসান ও দয়া করেছেন। আর তাঁর নসলে এমন একজন ব্যক্তিকে সৃষ্টি করেছেন যে নিজের মেধা, শিক্ষা, গবেষণা ও এবাদাত দ্বারা দ্বীন ও মযহাবের জন্য শ্রেষ্ঠ খেদমতটি করেছে। তিনি নিজের যুগে উম্মতদের জন্য একজন শ্রেষ্ঠ মার্জা-মুজতাহিদ, নিজের ইমাম (আঃ)-এর সাহায্যকারী, আশিক ও অপেক্ষাকারীদের মধ্যে ছিলেন। আর নিজের চিন্তা-চেতনা ইমাম মাহদী (আঃ)-এর পবিত্র ব্যক্তিত্বের উপর থেকে সরাতেন না। তাঁর একজন ছাত্র বর্ণনা করেছে যে, একবার মধ্যরাত্রির পরে আমি আমার বাড়ি থেকে কারবালার দিকে বার হই। পথে কাঁদা এবং চারি দিকে অন্ধকার হওয়ার জন্য সঙ্গে একটি চেরাগ (আলো) নিয়ে নিই। কিছু দূর গিয়ে আমি একজন মানুষকে দেখতে পাই। কিছুটা কাছে গিয়ে আমি তাঁকে চিনতে পারি। তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক শেখ আনছারী (রহঃ)। তাঁকে দেখে আমি খুব-ই চিন্তিত হলাম। ভাবতে থাকলাম চোখে কম দেখতে পাওয়া এই মানুষটি এত রাতে কাদা রাস্তা এবং অন্ধকার পথে কোথায় যাচ্ছে? একবার মনে হলো হয়ত বা তার ওপর কারো নজর আছে। তাই আমিও তাঁর পিছনে পিছনে চলতে থাকলাম। শেখ আনছারী (রহঃ) চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত একটি ঘরের কাছে এসে থেমে যান। আর ঐ ঘরের সামনে দাঁড়িয়েই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ করলেন ও যিয়ারাতে 'জামেয়া'হ্' পড়লেন। তার পরে ঐ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। এর পরে আমি আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না; তবে শেখের কথা আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি যেন কারো সাথে কথা বলছিলেন। ঘন্টা খানেক পরে আমি আমার গন্তব্য স্থানের (রওযার দিকে) উদ্দেশ্যে চলে গেলাম। এর কিছু দিন পরে শেখের কাছে যাই। আর ঐ রাতের ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু তিনি কিছুই বলতে চাচ্ছিলেন না। আমার বার বার অনুরোধের কারণে অবশেষে বললেনঃ 'কখনও কখনও ইমামে যামানা (আঃ)-এর দরবারে সাক্ষাৎ করার অনুমতি অর্জন করার জন্য ঐ ঘরের নিকটে (ঐ ঘর তুমি কখনো দেখতে পাবেনা) যাই; আর যিয়ারাতে 'জামেআ'হ্' পড়ি। যখন অনুমতি পেয়ে যাই, তখন তার পবিত্র দরবারে গিয়ে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করি। আর প্রয়োজনীয় মাসলা-মাসায়েল বিষয়ে ইমাম (আঃ)-এর কাছে প্রশ্ন করি এবং উত্তর জেনে নিই। তার পরে শেখ আমাকে ওয়াদা করতে বলে যে, তাঁর জীবিত থাকা কালে আমি যেন এই ঘটনাটি কারও সঙ্গে না বলি। এরপর তিনি বলেনঃ অবশ্যই ইমাম (আঃ) নিজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। আর এই সমস্ত ব্যক্তিগণও ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আদেশ পালন করতে থাকে; আর তাঁকে সাহায্য করতে থাকে। আর এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধুমাত্র নিজের প্রতিনিধিদের উপর ইমাম (আঃ) দয়া করেন না, বরং যারা আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের সঙ্গে মোহব্বতের সম্পর্ক রাখেন, তাদের প্রতিও দয়া করেন। তবে এক্ষেত্রে যদি কোনো বাধা না আসে, অর্থাৎ আল্লাহ্র আদেশ থাকে। আমাদের বিশ্বাস রাখা উচিত, যদি আমরা সাহায্য ও বন্ধুত্বের সমস্ত স্তরগুলি অতিক্রম করতে পারি, তা হলে ইমাম (আঃ)ও আমাদের সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবেন না।

বর্তমান অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

[ যিয়ারাতে জামিআ'হ্ খুবই বিশ্বস্ত ও বিখ্যাত একটি যিয়ারাত। এই যিয়ারাতটি আহলেবায়েত (আঃ)-এর মোহব্বতের ভিত্তিতে তাদের নৈকট্য অর্জনের জন্য বেশি মাত্রায় পড়া উচিত।

[ মুজতাহীদরা যখনই দ্বীনি মাসলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হন, তখন ইমামে যামানা (আঃ) তাঁদেরকে সাহায্য করেন।


_________________________________________
ইমাম মেহদী আঃ এর ইমামত  (ঈদে জাহরা)

ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফত ইসলামের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের খেলাফত হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ইমাম মেহদী আঃ পৃথিবীতে আগমন করবেন এবং দুনিয়ায় শান্তি, ন্যায় এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁর খেলাফত বা শাসনকালে পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকল অন্যায় ও অশান্তির অবসান ঘটবে।
ইমামত এ ইমাম মেহদী এর

 হাদীস ও বর্ণনা:
1. ইমাম মুহাম্মদ আল-হাদি (আ.) বলেছেন: "৯ই রবিউল আউয়াল আমাদের সবচেয়ে বড় ঈদ এবং আমাদের অনুসারীদের ঈদ।
2. ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহর সেবা করার বিভিন্ন স্তর রয়েছে, তবে আমাদের (আহলে বাইতের) প্রতি ভালোবাসা সর্বোচ্চ স্তর।"
3. ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর সময়ে, কারবালার ঘটনার পর প্রথমবারের মতো তিনি হাসেন, যখন তিনি জানতে পারেন যে মুকতার সাকাফি কারবালার অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছেন। 

ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফতের মূল দিকসমূহ:
1. খেলাফতের সূচনা: ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফত তখন শুরু হবে যখন পৃথিবীতে শোচনীয় অবস্থা বিরাজ করবে—মানবতার মধ্যে দুর্নীতি, অশান্তি এবং অন্যায় বেড়ে যাবে। তিনি তার আগমনের মাধ্যমে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন।
2. *ন্যায় প্রতিষ্ঠা*: ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফতের সময় পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্গ ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁর শাসনে পৃথিবী থেকে সকল ধরনের দুর্নীতি, অত্যাচার এবং অন্যায় দূর হয়ে যাবে।
3. *শান্তি ও নিরাপত্তা*: ইমাম মেহদী আঃ এর শাসনকালে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীতে কোন যুদ্ধ বা অশান্তি থাকবে না এবং সমস্ত জাতি একত্রে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে।
4.* ইসলামের পরিপূর্ণ বিজয়*: ইমাম মেহদী আঃ এর শাসনে ইসলাম পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তৃত হবে। মুসলিমরা তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামিক মূল্যবোধ এবং ন্যায়নীতির দিকে এগিয়ে যাবে।
5. *মুসলিম জাতির ঐক্য*: ইমাম মেহদী আঃ এর নেতৃত্বে মুসলিম জাতি একত্রিত হবে এবং তাদের মধ্যে কোন ধরনের বিভক্তি থাকবে না। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে মুসলিম সমাজ পুনরুজ্জীবিত হবে।
6. *বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক উন্নতি*: ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফতের সময় মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটবে। মানুষ নিজেদের আত্মা ও বিশ্বাসের দিকে মনোনিবেশ করবে এবং তাদের আচার-আচরণে ইসলামের মূলনীতিগুলি প্রতিফলিত হবে।
7. *ফিতনা ও বিপর্যয়ের সমাপ্তি*: ইমাম মেহদী আঃ এর আগমনের পর পৃথিবী থেকে সকল ধরনের ফিতনা ও বিপর্যয়ের অবসান হবে। তার শাসনে অশান্তি, যুদ্ধ এবং হিংসা বন্ধ হবে এবং পৃথিবী একটি শান্তিপূর্ণ স্থান হয়ে উঠবে।
8.* ইসলামিক শাসনব্যবস্থা*: ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফতে ইসলামের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে সকল আইন ও শাসন ইসলামী নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। তাঁর শাসনব্যবস্থায় সমাজে সমান অধিকার, ন্যায় এবং মানবাধিকারের গুরুত্ব দেয়া হবে।

ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফত এবং মুসলিম জাতির ভবিষ্যত:
ইসলামী ঐক্য ও সংহতি: ইমাম মেহদী আঃ মুসলিম উম্মাতকে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং ইসলামী বিশ্বের শক্তিশালী পুনর্গঠন করবেন।
বিশ্বের শাসন: ইমাম মেহদী আঃ পৃথিবীর প্রতিটি দেশে ইসলামী ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন এবং পুরো পৃথিবী ইসলামের আলোকে আলোকিত হবে।
একতা এবং শান্তি: তাঁর খেলাফত থেকে মুসলিম জাতির মধ্যে একতা এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। 
অপেক্ষা: ইমাম মেহদী আঃ এর আগমনের জন্য মুসলিম জাতি সর্বদা অপেক্ষা করে থাকে। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন হাদিস ও ধর্মীয় গ্রন্থে নানা লক্ষণ ও সময়সূচী উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমাম মেহদী আঃ এর খেলাফত বা শাসনটি মুসলমানদের জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে ধরা হয়, যা পৃথিবীকে একটি নতুন, শান্তিপূর্ণ এবং ন্যায়পরায়ণ যুগে প্রবাহিত করবে।
 
__________________________________________

ইয়াতীমে দো আলম ও আমাদের অন্তরের প্রতীক্ষা


ভূমিকা

ইতিহাসের কিছু দিন আছে যেগুলো মানবতার বুকে আনন্দের সুর তোলে, আবার কিছু দিন আছে যেগুলো গোটা মহাবিশ্বকে শোকে নিমজ্জিত করে। রবিউল আওয়াল মাস মুসলিম জগতে একদিকে আলোর উৎসব—কারণ এই মাসেই এসেছে রহমাতুল্লিল আলামীন, মহানবী (সা.)। অপরদিকে, এ মাসেই আছে এমন এক দিন, যেদিন আকাশ কেঁদেছিল, ফেরেশতারা শোকে রঙিন হয়েছিল, আর আমাদের প্রিয় ইমামে জামানা (আ.ফা.) হয়ে পড়েছিলেন ইয়াতীমে দো আলম। সেই দিন হলো—৮ই রবিউল আওয়াল।


 ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদত

ইমাম হাসান আসকারী (আ.), একাদশতম ইমাম, ২৬০ হিজরির ৮ই রবিউল আওয়ালে (৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় শাসকের ষড়যন্ত্রে শহীদ হন। ইতিহাসকাররা লিখেছেন, তাঁকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করা হয় (শেখ মুফীদ, আল-ইরশাদ, খণ্ড ২)। এই শাহাদতের মাধ্যমে কেবল একজন ইমামের জীবনই শেষ হয়নি, বরং গোটা উম্মাহর জন্য শুরু হয়েছিল এক গভীর পরীক্ষা।


 ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর এতিমত্ব

ইমাম আসকারী (আ.)-এর শাহাদতের মুহূর্তে তাঁর অমূল্য সন্তান, ইমাম মাহদী (আ.ফা.), তখন খুবই ছোট। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, সেই সময়ে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫ বছর (শেখ তুসী, আল-গায়বা)। এই বয়সেই তিনি হারালেন পিতাকে। কিন্তু তাঁর এতিমত্ব ছিল কোনো সাধারণ এতিমত্ব নয়।

তিনি হলেন _ইয়াতীমুস সাকলেইন_ —অর্থাৎ দুনিয়া ও আখেরাতের এতিম। কারণ তিনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহর শেষ হুজ্জত, সমগ্র মানবজাতির অভিভাবক। তাঁর পিতার শাহাদতের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি হয়ে গেলেন সেই মহান ইমাম, যিনি এখনো গায়বতের পর্দায় আছেন এবং যাঁর প্রতীক্ষায় আমরা প্রহর গুনছি।


 কুরআন ও আহলে বাইতের আলোকে ইমামের শোক
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইমামদের গুরুত্বের কথা বলেছেন: "এবং আমি তাদেরকে করেছিলাম নেতা, যারা আমার আদেশে পথপ্রদর্শক হতো।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৭৩)
এ আয়াত আমাদের শেখায় যে ইমামরা মানবতার পথপ্রদর্শক। কিন্তু ৮ই রবিউল আওয়ালে যখন ইমাম মাহদী (আ.ফা.) এতিম হলেন, তখন গোটা মানবতা তাদের দৃশ্যমান পথপ্রদর্শককে হারাল। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এক হাদিসে বলেন: "যে ব্যক্তি আমাদের কায়েম (আ.ফা.)-এর শোকে কাঁদবে, আল্লাহ তার চোখকে জান্নাতের আলোতে ভরিয়ে দেবেন।” (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫২) অতএব, ৮ই রবিউল আওয়ালের শোক কেবল ইতিহাস নয়, বরং ঈমানের অংশ।


 শোক ও প্রতীক্ষার সেতুবন্ধন
৮ই রবিউল আওয়াল আমাদের শেখায়— আমরা শুধু নবীর জন্মের আনন্দে মেতে উঠব না, আমরা কেবল ইতিহাসের শোক স্মরণ করব না, বরং আমরা বুঝব, আমাদের ইমাম আজও নিঃসঙ্গ। তিনি এখনো অপেক্ষা করছেন আমাদের প্রস্তুতির জন্য। তাঁর সেই প্রতীক্ষার সঙ্গী হওয়াই আমাদের আসল দায়িত্ব।


 আমাদের দায়বদ্ধতা
আজ যখন আমরা ৮ই রবিউল আওয়াল স্মরণ করি, তখন শুধু চোখের জল যথেষ্ট নয়। ইমামের এতিমত্ব আমাদের ওপর কিছু কর্তব্য চাপিয়ে দেয়:

1.ইমামের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করা।

2.দোয়া করা বিশেষ করে দুয়া নুদবা, যাতে ইমামের অন্তরে আমাদের সঙ্গ অনুভূত হয়।

3.ইমামের আগমনের জন্য সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

4.তাঁর নাম ও স্মৃতি হৃদয়ে জাগ্রত রাখা।


 উপসংহার
৮ই রবিউল আওয়াল শুধু একটি শোকের দিন নয়, এটি একটি আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা সবাই এতিম, যতক্ষণ না ইমাম মাহদী (আ.ফা.) আমাদের মাঝে ফিরে আসছেন।
__________________________________________

ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন:এক আধ্যাত্মিক বিস্ময় 
        ✍️ রাজা আলী

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী বোমা ও বারুদের পৃথিবী।দুর্বলের ওপর অত্যাচার ও উৎপীড়ন গত শতাব্দীগুলি থেকে একটুও কমেনি; বরং বেড়েছে। এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্যবাদী, অত্যাচারী শক্তি আল্লাহ নির্দেশিত আদেশ কে অমান্য করে পৃথিবীকে মৃত এক বারুদের স্তূপে পরিণত করেছে।তাই আজ আপাত দৃষ্টিতে শান্তি দূর অস্ত। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন কোরানে কারীমের মধ্যে ঘোষণা করেছেন যে,এই পৃথিবীর মৃত্যু ঘটলে তবেই নতুন এক পৃথিবী সৃষ্টি করবেন--
"জেনে রাখ যে, আল্লাহ জমিনকে মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবিত করবে" (সুরা হাদীদ,১৭নং আয়াত)।

      জমিনের মৃত্যু ঘটায় অর্থ হল, জমিনের ওপর থেকে ন্যায়, ইনসাফ ইত্যাদি ধূলিসাৎ হওয়া। বর্তমান সময়ে যদি আমরা বিশ্বের দিকে তাকাই ,তবে বুঝতে পারবো
ইসরাইল ,আমেরিকা,ইউরোপ এই জমিন থেকে সত্য, ন্যায়, ইনসাফকে প্রতিনিয়ত হত্যা করছে। সুতরাং খুব দ্রুত আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর ওয়াদা পরিপূর্ণ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কার দ্বারা এই জমিনকে জীবিত করবেন? আল্লাহ তায়ালা বলেছেন -
"তোমাদের মধ্যে যে সমস্ত মানুষ ঈমান এনেছে,আর ভালো কাজ করেছে, আল্লাহ তাদের সঙ্গে ওয়াদা করেছেন যে,তাদেরকে একদিন না একদিন জমিনের ওপর অবশ্যই প্রতিনিধি নির্ধারণ করবে"(সুরা নূর ,৫৫ নং আয়াত)।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই পৃথিবীকে তার শেষ হুজ্জাত ইমাম মাহদী আঃ এর দ্বারা পুনরায় জীবিত করবেন। তাঁর আবির্ভাবের কিছু দিনের মধ্যেই সমস্ত শত্রুরা পরাস্ত ও ধ্বংস হয়ে যাবে। সমস্ত মানুষ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ওপর ঈমান আনার সঙ্গে সঙ্গে ইমাম আঃ এর শাসনকে বরণ করে নেবে।সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন হবে সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত এক পরিপূর্ণ ইসলামী শাসন ।

ইমাম মাহদী আঃ এর শাসনের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকবে:

১.ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত হবে। সমগ্র পৃথিবী ই একটি দেশ রূপে অবস্থান করবে। সাম্রাজ্যবাদ,যুদ্ধ, ঠাণ্ডা লড়াই পৃথিবী থেকে দূর হয়ে শান্তির পরিবেশ তৈরি হবে।

২.ইমাম মাহদী আঃ এর শাসনের ভিত্তি হবে দ্বীন ইসলামের সঠিক অনুসরণ।কোরান ও হাদীসের বিধান দ্বারা পৃথিবীর বুকে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহর রাসুলের যুগের মতোই ইসলামের আদর্শ রূপকে ইমাম আঃ তুলে ধরবেন।

৩.ইমাম মাহদী আঃ এর শাসনে মানুষ সঠিক বিচার,ইনসাফ ও নিরাপত্তা পাবে ।সে যুগের যাবতীয় সমস্যা কোনো রকম সাক্ষী প্রমাণ ছাড়া ইমাম আঃ খোদায়ী জ্ঞান দ্বারা সমাধান করবেন।এই সমাধান হজরত দাউত আঃ এর শাসনের মতো হবে।

৪.ইমাম মাহদী আঃ এর শাসনে সমস্ত কুফুর ও শিরক ধ্বংস হবে।এক আল্লাহ রব্বুল আলামীনের এবাদাত প্রতিষ্ঠিত হবে।

    সুতরাং সেই দিন অতি নিকটে, যেদিন অন্যায় ও অত্যাচারের শিকড় কাটা পড়বে এবং ন্যায় ও ইনসাফ এমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে,যেমন ভাবে আজকের দুনিয়া অন্যায়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।তাই আমরা বলতে পারি ইমাম মাহদী আঃ এর শাসন হবে এক আধ্যাত্মিক বিস্ময়।
__________________________________________

মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতীক্ষা: সর্বোত্তম ইবাদত

 وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।”
(সুরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)

আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া যে তিনি আমাদের মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টি করা প্রতিটি জিনিসের একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। যেমন: একটি পিপঁড়েও উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি হয়নি।
আল্লাহর সব সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ। কেননা—

• পাহাড়ের আছে কেবল অবস্থান।
• গাছের আছে অবস্থান ও বৃদ্ধি।
• পশুর আছে অবস্থান, বৃদ্ধি ও চলাচলের ক্ষমতা।
• কিন্তু মানুষের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি আছে বুদ্ধি ও বিবেক।
এই বিবেক বা ‘আকল’-এর কারণে মানুষ শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে। আর এই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির প্রধান দায়িত্ব হলো ইবাদত, অর্থাৎ আল্লাহর নির্ধারিত পথে জীবন পরিচালনা করা।

ইবাদতের ধরন অনেক রকম—
নামাজ, রোযা, হজ, যাকাত, আমর বিল মা'রূফ (সৎ কাজের নির্দেশ) এবং নাহি আনিল মুনকার (অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা) ইত্যাদি।
হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আফজালুল ইবাদা ইন্তিযারুল ফারাজ”
“সর্বোত্তম ইবাদত হলো মুক্তির প্রতীক্ষা।”
(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫২)
এখানে ‘ফারাজ’ বলতে বোঝানো হয়েছে—ইমাম মাহদী (আ.)-এর জুহুর বা আবির্ভাব।
অতএব, এই শ্রেষ্ঠ মাখলুক (মানুষ) হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো—
✅ আমরা আমাদের যুগের ইমামের জন্য প্রতীক্ষা করব।
তবে এই ‘প্রতীক্ষা’ কোনো নিষ্ক্রিয় বসে থাকা নয়।
এটি এমন নয় যে, আমরা শুধু অপেক্ষা করব কেউ আসবে বলে। বরং, এই অপেক্ষার অর্থ হলো—
নিজেকে শুদ্ধ করা, অপকর্ম থেকে দূরে থাকা, এবং ইমামের পথ অনুসরণের যোগ্য হয়ে ওঠা।

ইমাম মাহদী (আ.) দেখা কি মুখ্য? না কি তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন?
ইমাম মাহদী (আ.) নিজেই বহুবার বলেছেন:
“আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য দোয়া বা আমল করো—এইটা মুখ্য নয়। বরং, এমন চরিত্র গঠন করো, যেন আমি নিজেই তোমার কাছে আসি।”

আয়াতুল্লাহ বেহজাত (রহ.)-ও বলেছেন:
“ইমামকে দেখা বড় কথা নয়। সিমার (ধনুকধারী) তো কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-কে দেখেছিল—তবুও সে তাঁকে শহীদ করেছিল।”
তাই আসল কথা হলো, ইমামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হওয়া।

বর্তমান সময়ে প্রতীক্ষাকারীর কিছু করণীয়:
✅ প্রতিদিন ইমামের সালামতির জন্য সদকা দেওয়া
✅ ওয়াজিব কাজগুলো নিয়মিত আদায় করা
✅ গোনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখা
✅ ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতি "আরিজা" (চিঠি) লেখা
✅ প্রত্যেক নামাজে তাঁর জুহুরের জন্য দোয়া করা
✅ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মজলিসে ইমাম মাহদীর জুহুরের দোয়া করা
✅ যুব সমাজে ইমাম মাহদী (আ.)-এর বার্তা ছড়িয়ে দেয়া
✅ সুখে-দুঃখে ইমামকে স্মরণ করা
✅ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইমামের নির্দেশনা স্মরণে রাখা

উপসংহার:
মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো ইবাদত। আর যুগের ইমামের প্রতি আন্তরিক ও সক্রিয় প্রতীক্ষা সেই ইবাদতের সর্বোচ্চ রূপ।
আমরা যেন নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলি, যাতে ইমাম মাহদী (আ.)-এর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং তাঁর সাথী হওয়ার যোগ্য হই—এটাই হোক আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য।

__________________________________________------------------------------------------------




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃 📃 📃 কবিতায় দ্বীনি বার্তা 🧾 🧾 🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
                   আখেরী নবুয়াত

নূরের সরদার তুমি, মুহাম্মদ
বারো ইমামের ওয়ারিস তুমি, মুহাম্মদ।
তোমারই নূরে গড়া এই দুনিয়া,
তোমার আগমনে বিশ্ব মাতোয়ারা

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ দান তুমি, মুহাম্মদ,
জ্ঞানেরি শহর তুমি, মুহাম্মদ
যারা তোমায় মানুষরূপে ভাবলো
তারা দুনিয়া ও পরকাল হারালো

তোমাকে যারা পাগল বলেছে
দুনিয়াতে তারা লাঞ্চিত হচ্ছে
যতই থাকুক তারা তোমারি পাশে
তারা গাদ্দার ছিলো গাদ্দারি থাকবে

শত্রুরা তোমাকে আমীন বলে মানত
 বাগে ফিদাক তারা লুটে খেত
নেতা সেজে বসেছে মুসলমানের সিংহাসনে,
কী মুখ তারা দেখাবে হাশরের ময়দানে?

যারা আগুন দিল তোমার কন্যার দরজায়,
রিসালতের বাণী কি এমনই ছিল সায়?
তোমার জানাজা রেখে যারা ভোট করেছে 
তারাই আবার তোমার উম্মতের দাবি করেছে।

__________________________________________


    মানবতা
    ✍️ রাজা আলী 

আই লাভ মুহাম্মদ 
এখানে অন্যায়টা কি?
বুঝেছি,বাহানা এটা
মনোভাব তোমাদের বিশ্রি।

মুহম্মদ কে চেনো কি?
মানব মুক্তির হোতা
মূর্খতাকে শেষ করে 
উনিই বিশ্ব ত্রেতা।

মানবতা বলতে তোমরা
বোঝনা কো কিছু
উগ্রতা ভর করেছে
তোমাদের পিছু পিছু।

জীবনে যে একটি মিথ্যা 
বলেনি কোনো দিন
দুনিয়ার মানুষের রয়েছে
আজো অনেক ঋণ।

ন্যায় বিচারের প্রতীক তিনি
মজলুমের আশ্রয়
টাকা পয়সা কিছু ই নয়
অন্যায় পায়নি প্রশ্রয়।

গরীবের মসীহা তিনি 
অভুক্তের আশ্রয়
বহুকাল আগেই গেয়েছেন 
মানবতার জয়।

মুক্ত দৃষ্টি দাও যদি
দেখবে তখন বেশ 
ইসলাম ধর্ম এমন ই
মানবতাই যার শেষ।
________   ______   _________

নোবেল তুমি কার?
       ✍️ রাজা আলী 


সম্ভবত এই প্রথম কেউ নির্লজ্জের মতো
নিজেকে নোবেলের যোগ্য বলে দাবি করলো
মানুষ সূর্যের মতো কাজ করে
কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ নোবেল পায়
"আমি যোগ্য" বলা ধৃষ্টতা
এমন আগে কখনো দেখা যায় নি

হয়তো হৃদয় সাড়া দিয়েছে "আমি যোগ্য"বলে
কিন্তু হুঙ্কার কেউ কি ছেড়েছে?
যাক সে সব কথা
নোবেল কমিটির কেমন বা আক্কেল 
মারিয়া করিনা মাচাদো কে শান্তিতে নোবেল দিল!
সে তো ভেনেজুয়েলার অশান্তি 
ও আচ্ছা,সে তো পশ্চিমা দের হাতের পুতুল 
কোনো এক মিরাক্কেল ঘটাবে ভেবে 
এতো আরো আরো উৎসাহ 
কেন গ্রেটা কি শান্তির কথা বলে নি?
ইউরোপীয় মানবতাকে কাঁধে বহন করে 
সে গাজায় রপ্তানি করতে চেয়েছে
খাদ্য, ওষুধ,স্বাস্থ্য, শান্তি 
মাচাদো নাকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে
গ্রেটা তো কথিত মানবতার রাক্ষস কে বিশ্বের নিকট চিনিয়েছে!

গ্রেটা হয়তো তুমি কোনো দিনই নোবেল পাবে না
প্রভুদের খুশি করার পথ না ধরে
প্রভুদের মুখোশ উন্মোচন করো!
কিম্বা কোনো এক দিন 
তোমার জন্য ইউরোপে নেমে আসবে রাত
অন্ধকার সহ্য করতে না পেরে
খুব সামান্য একটি কাজের জন্য
প্রভুদের ইশারা হবে।


__________________________________________

 
নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা

আসমানের বুক আজ নীরবতার ঢেউয়ে ভেসে,
তারার চোখে জমেছে রক্তমাখা অশ্রু।
৮ই রবিউল আওয়াল—
এক অনন্ত বেদনার দিন,
যখন পৃথিবী পেল এক নিঃসঙ্গ শিশুকে।

পিতা ছিলেন শাহাদতের আলোকধারা,
ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর রক্তে রঙা।
আর সেই ছোট্ট হৃদয়,
মাহ্দী (আ.ফা.) হয়ে ওঠেন
সমস্ত দুনিয়ার ইয়াতীমে দো আলম।

নীরব কান্না বয়ে চলে বাতাসে,
ফেরেশতাদের ডানায় স্পর্শ পায় শোক।
হে ইমামে জামানা!
আপনার একাকীত্বে আমরা সবাই
অন্তরে হয়ে নিঃসঙ্গ।

পৃথিবীর প্রতিটি নিঃশব্দ কোণে
আপনার অশ্রু ঝরে পড়ছে—
শিশুর কণ্ঠে বাজে দুঃখের সুর,
যা কেবল আসমান ও ফেরেশতারা শুনতে পারে।

হে ইয়াতীমে দো আলম!
আপনার চোখের অশ্রুতে আমরা দেখি
মানবতার নিঃশেষ প্রেম,
আপনার নিঃসঙ্গতায় আমরা খুঁজে পাই
আশা, প্রার্থনা ও মুক্তির দীপ্তি।

আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাস
আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে,
আপনার প্রতিটি অশ্রু
আমাদের শোকের সমুদ্রের ঢেউ।

যদি আমরা পারি,
আপনার এক ফোঁটা বেদনার ভারও ভাগ করে নিতে,
হবে সেটাই আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদা।

হে ইমামে জামানা!
আমরা আপনার নিঃসঙ্গ পথচলায়
সঙ্গী হতে চাই—
এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা,
এক চিরন্তন ভালোবাসার প্রতিধ্বনি।
------ _____------_____------______------______------

Wednesday, August 6, 2025

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ সফর সংখ্যা

           

আরবি: সফর, ১৪৪৭ হিজরী
ইংরেজি: আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির হোসেন গাজী

অনলাইন সম্পাদনা ও তথ্য সংযোজন:           
            মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


ইমাম আঃ এর আবির্ভাব: শান্তির জগৎ (অনুবাদ)

এজিদের দরবারে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা 

২৮ শে সফর : পবিত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল ও ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাত

পবিত্র আরবাঈনের ইতিহাস

কারবালার পরবর্তী অধ্যায় — জয়নবের কণ্ঠে হক-এর অগ্নিশিখা

  অমীয় বাণী: ইমাম হোসাইন আঃ
          ✍️  রাজা আলী 

 মারেফাত এ ইমামে জামানা (আ.জ.)
           ✍️ আব্বাস আলী




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

       কাল্পনিক ছোয়াঁ

                পরিচিতি 
          ✍️  রাজা আলী 

কবে আমায় ডাকবেন ইমাম আরবাঈনে


__________________________________________
__________________________________________

                   সম্পাদকীয়

                       بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ  

সফর মাস শোকের গভীর সমুদ্র। একদিকে আছে প্রিয় নবী (সা.)-এর বিদায়ের বেদনা, অন্যদিকে ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাতের রক্তিম স্মৃতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারবালার পরবর্তী অধ্যায়—যেখানে বাকি পরিবারকে বাঁধা হলো বন্দিশিবিরে, আর জয়নব (সা.)-এর কণ্ঠে জেগে উঠল প্রতিবাদের বজ্রধ্বনি, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর খুতবায় ভেঙে পড়ল জুলুমের অন্ধকার।

এই সংখ্যার প্রতিটি রচনা সেই ইতিহাসের আলোই বহন করছে। কখনো আমরা পড়ছি ইমামের আবির্ভাবের শান্তিময় প্রতিশ্রুতি, কখনো শুনছি এজিদের দরবারে সত্য উচ্চারণের ধ্বনি। আমরা স্মরণ করছি ২৮ সফরের শোকস্মৃতি, জানছি আরবাঈনের ইতিহাস এবং উপলব্ধি করছি কারবালার পর জয়নবী সাহসের আগুন।

তেমনি স্থান পাচ্ছে ইমাম হোসাইনের (আ.) অমীয় বাণী ও ইমামে জামানার (আ.জ.) মারেফাত, যা আমাদের শোককে শুধু কান্নায় সীমাবদ্ধ না রেখে পরিণত করে ইন্তেজারে—প্রতিরোধে ও নবীন আশায়।

আর কবিতার পৃষ্ঠায় ভেসে উঠছে হৃদয়ের ভাষা—কখনো কাল্পনিক ছোঁয়ায়, কখনো পরিচয়ের কোমল কথায়, আবার কখনো আরবাঈনের ডাকের আকুতি হয়ে।

আসুন, এই সফরে আমরা শোককে ধারণ করি দায়িত্বে, কান্নাকে রূপ দিই কণ্ঠে, আর ভালোবাসাকে জাগাই মাহ্দভি অপেক্ষার আলোকে।

                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা


__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


ইমাম আঃ এর আবির্ভাব: শান্তির জগৎ (অনুবাদ)
   ✍️ মাওলানা কাজিম আলি

পৃথিবীর সমস্ত অন্যায় ও জুলুম একদিন শেষ হবে।যখন জুলুম ও অত্যাচারের সমস্ত কারণ ধ্বংস হয়ে ফিতনা ফাসাদের প্রবাহ শুষ্ক হবে, হত্যা-অত্যাচার-অবিচারের শিকড় কাটা পড়বে, তখন সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি ও সুস্থতা বিরাজ করবে।এই এই শান্তি -সুস্থতা ও সুস্থিতির প্রধান কারিগর হলেন ইমাম মাহদী আঃ।তার আবির্ভাব এবং শাসনকাল হলো শান্তি ও স্বস্তি র পর্ব।হজরত ইমাম মোহাম্মাদ বাক্বের (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “ঐ যুগে একজন বুড়ি পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সফর করবে, তাকে কেউ কষ্ট দেবে না”।
(মুনতাখাবুল আছার, পৃঃ ৩৭৯)।

        মাহ্দী (আঃ)-এর যুগ সম্পর্কে রাসুলে খোদা (সাঃ) এরশাদ করেছেন: 'মাহ্দীর যুগে
নেয়ামত অধিক হবে, বৃষ্টি বর্ষণের ফলে জমি সবুজ ফসলে পূর্ণ হবে, মানুষের অন্তর হিংসা থেকে মুক্ত হবে, হিংস্র জন্তু-জানোয়ার শান্ত হবে। একজন মহিলা ইরাক ও সিরিয়ার মাঝে সফর করবে, সে তার সমস্ত সাজের গহনা পরিধান করবে; কিন্তু কোন ব্যক্তি তাকে বিঘ্ন ঘটাবে না'। (মোজাল্লে ইনতেজার, সংখ্যা ১৪ পৃ-২০৫)।

      আর হজরত আলী (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে: মাহ্দী তাঁর প্রতিনিধিদেরকে প্রত্যেক
শহরে পাঠাবেন, যাতে করে সকল মানুষ ইনসাফ ও ন্যায় বিচার পেতে পারে। ঐ সময় হিংস্র জন্তু, নিরীহ ছাগল একই সঙ্গে বিচরণ করবে। শিশুরা 'বিছে'র সঙ্গে খেলা করবে, কুকর্ম ধ্বংস হবে, সুকর্ম তার স্থান নেবে, মদ-সুদ সব শেষ হয়ে যাবে, মানুষ আল্লাহর এবাদাতের দিকে অটল থাকবে এবং ক্রমে দ্বীনের দিকে আরও অগ্রসর হবে। নামাজে জামায়াতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হবে (নামাজিদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে)। মানুষের বয়স বৃদ্ধি হবে এবং আমানত ফেরত পাবে, গাছ ফলে পরিপূর্ণ থাকবে এবং বরকত অধিক হবে। কুকর্ম ধ্বংস হবে, আর নেক কর্ম বজায় থাকবে। আবোয়েতের কোন শত্রু বাকি থাকবে না। (মোজাল্লে ইনতেজার, সংখ্যা ১৪, পৃ ২০৫)।

     এই হল হজরত ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ন্যায় বিচার ও ইনসাফী শাসনের এক নজির। যদি আমরা নিজেদের চোখের সামনে মেহদী (আঃ)-এর শাসনকে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্য-কর্তব্য ইমাম জহুরের জন্য বেশি থেকে বেশি দোয়া করা, আর নিজেদের চরিত্রকে সংশোধন করে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।

_________________________________________

এজিদের দরবারে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা 

           ✍️ মাওলানা সুজাউদ্দিন মাশহাদী


ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা এজিদের দরবারে ইসলামি ইতিহাসে অন্যতম সাহসী ও গভীর বক্তব্য হিসেবে স্মরণীয়।

প্রেক্ষাপট:
কারবালার ট্রাজেডির পর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পরিবার—বিশেষ করে মহিলারা ও শিশুদের—বন্দি করে কুফা ও পরে দামেস্কে এজিদের দরবারে পাঠানো হয়। তখন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর একমাত্র জীবিত পুত্র ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) ছিলেন খুবই অসুস্থ, কিন্তু বুদ্ধিমত্তা ও ইল্মে ছিলেন অতুলনীয়।

দরবারে খোতবা (সংক্ষেপে):
ইমাম (আ.) এজিদের দরবারে দাঁড়িয়ে বললেন:
أيُّهَا النّاسُ، اُعطينا سِتّاً، وفُضِّلنا بِسَبعٍ: اُعطينَا العِلمَ، وَالحِلمَ، وَالسَّماحَةَ، وَالفَصاحَةَ، وَالشَّجاعَةَ، وَالمَحَبَّةَ في قُلوبِ المُؤمِنينَ
> "হে মানুষ! আল্লাহ আমাদেরকে ছয়টি গুণে শ্রেষ্ঠ করেছেন এবং সাতটি বৈশিষ্ট্যে আমাদের সম্মানিত করেছেন:
> আমাদেরকে জ্ঞান, ধৈর্য, উদারতা, বাগ্মিতা, সাহস, ও মুমিনদের ভালোবাসা দ্বারা শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন।
> আমরা সেই ঘরানার যারা নবুয়তের কেন্দ্র, ওহির স্থান, ফেরেশতাদের যাতায়াতের জায়গা, জ্ঞানের খনি, ধৈর্যের স্থান, ইসলামের মূল ভিত্তি।"

তিনি যখন নিজের পরিচয় দেন: (সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে এখানে )
  أنَا ابنُ مَكَّةَ ومِنىً، أنَا ابنُ زَمزَمَ وَالصَّفا، أنَا ابنُ مَن حَمَلَ الزَّكاةَ بِأَطرافِ الرِّدا، أنَا ابنُ خَيرِ مَنِ ائتَزَرَ وَارتَدى‌، أنَا ابنُ خَيرِ مَنِ انتَعَلَ وَاحتَفى‌
আমি মক্কা ও মিনার সন্তান, আমি জমজম ও সাফার সন্তান, আমি তার সন্তান যে তার চাদরের কিনারায় যাকাত বহন করত, আমি তার শ্রেষ্ঠ সন্তান যে কটি পরত এবং তার পোশাক পরত, আমি তার শ্রেষ্ঠ সন্তান যে জুতা পরত এবং তার জুতা পরত।
أنَا ابنُ خَيرِ مَن طافَ وَسعى‌، أنَا ابنُ خَيرِ مَن حَجَّ ولَبّى‌، أنَا ابنُ مَن حُمِلَ عَلَى البُراقِ‌ فِي الهَوا، أنَا ابنُ مَن اُسرِيَ بِهِ مِنَ المَسجِدِ الحَرامِ إلَى المَسجِدِ الأَقصى‌، فَسُبحانَ مَن أسرى‌، أنَا ابنُ مَن بَلَغَ بِهِ جَبرائيلُ إلى‌ سِدرَةِ المُنتَهى‌، أنَا ابنُ مَن دَنى‌ فَتَدَلّى‌ فَكانَ مِن رَبِّهِ قابَ قَوسَينِ أو أدنى‌
আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যারা তাওয়াফ ও সাঈ করেছেন। আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যারা হজ্জ করেছেন এবং তালবিয়া পাঠ করেছেন। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যাকে আকাশে বুরাকে বহন করা হয়েছিল। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যাকে মসজিদুল হারামের পবিত্র স্থান থেকে দূরতম মসজিদে রাতের ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অতএব পবিত্র সেই ব্যক্তি যিনি তাকে রাতের ভ্রমণে নিয়ে গেছেন। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যাকে জিব্রাইল (আঃ) সীমার লোট বৃক্ষের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যিনি নিকটবর্তী হন এবং অবতরণ করেন, এমনকি তিনি তার প্রভুর কাছ থেকে দুই ধনুকের দূরত্বে অথবা তার চেয়েও নিকটবর্তী স্থানে ছিলেন।

প্রভাব:
 حَتّى‌ ضَجَّ النّاسُ بِالبُكاءِ وَالنَّحيبِ، وخَشِيَ يَزيدُ أن تَكونَ فِتنَةٌ، فَأَمَرَ المُؤَذِّنَ أن يُؤَذِّنَ، فَقَطعَ عَلَيهِ الكَلامَ وسَكَتَ.
তিনি খোতবা দিতে থাকেন যতক্ষণ না লোকেরা কাঁদতে শুরু করে এবং বিলাপ করতে থাকে, এবং ইয়াজিদ আশঙ্কা করে যে দাঙ্গা হতে পারে, তাই সে মুয়াজ্জিনকে আযান দেওয়ার নির্দেশ দেয়, কিন্তু সে খোতবা বন্ধ করে দেয় এবং চুপ থাকে।
فَلَمّا قالَ المُؤَذِّنُ: «اللَّهُ أكبَرُ» قالَ عَلِيُّ بنُ الحُسَينِ عليه السلام: كَبَّرتَ كَبيراً لايُقاسُ، ولا يُدرَكُ بِالحَواسِّ، لا شَي‌ءَ أكبَرُ مِنَ اللَّهِ. فَلَمّا قالَ: «أشهَدُ أن لا إلهَ إلَّا اللَّهُ» قالَ عَلِيٌّ عليه السلام: شَهِدَ بِها شَعري وبَشَري، ولَحمي ودَمي، ومُخّي وعَظمي
যখন মুয়াজ্জিন বললেন, "আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ," আলী ইবনে আল হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, "আপনি এমন কিছু ঘোষণা করেছেন যা ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিমাপ করা বা উপলব্ধি করা যায় না। আল্লাহর চেয়ে বড় আর কিছুই নেই।" যখন তিনি বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই," আলী আলাইহিস সালাম বললেন, "আমার চুল, ত্বক, আমার মাংস ও রক্ত, আমার মজ্জা এবং হাড় এর সাক্ষ্য দেয়।"
فَلَمّا قالَ: «أشهَدُ أنَّ مُحَمَّداً رَسولُ اللَّهِ» التَفَتَ عَلِيٌّ عليه السلام مِن أعلَى المِنبَرِ إلى‌ يَزيدَ، وقالَ: يا يَزيدُ! مُحَمَّدٌ هذا جَدّي أم جَدُّكَ؟ فَإِن زَعَمتَ أنَّهُ جَدُّكَ فَقَد كَذَبتَ، وإن قُلتَ إنَّهُ جَدّي فَلِمَ قَتَلتَ عِترَتَهُ
যখন তিনি বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল," আলী (আঃ) মিম্বরের উপর থেকে ইয়াজিদের দিকে ফিরে বললেন, "হে ইয়াজিদ! এ কি মুহাম্মদ আমার দাদা, নাকি তোমার দাদা? যদি তুমি দাবি করো যে তিনি তোমার দাদা, তাহলে তুমি মিথ্যা বলছো। যদি তুমি বলো যে তিনি আমার দাদা, তাহলে কেন তুমি তার পরিবারকে হত্যা করলে?!"

উপসংহার:
এই খোতবার মাধ্যমে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) কারবালার সত্য প্রকাশ করেন, আহলে বাইতের মর্যাদা তুলে ধরেন এবং ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
__________________________________________

 ২৮ শে সফর : পবিত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল ও ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাত
✍️  মজিদুল ইসলাম শাহ

                              ভূমিকা

ইসলামের ইতিহাসে সফর মাস বিশেষত শিয়া মুসলমানদের কাছে শোক ও বেদনার মাস। এই শোকের শিখর প্রকাশ পায় সফরের অষ্টাবিংশ (২৮) তারিখে; যেদিন দয়াময় নবী, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.), আল্লাহর শেষ রাসূল ও সকল নবীর নেতা, দুনিয়াকে বিদায় জানান। একই দিনে তাঁর প্রিয় সন্তান, নবীর প্রথম নাতি, ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) শাহাদাতবরণ করেন। এই দুই ঘটনার একত্রতা শিয়া ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এ দিনকে এক বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

       রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল



            ইসলামে নবীর স্থান

ইসলামের নবী (সা.) কেবল আল্লাহর ওহীর বাহকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন নৈতিকতার শিক্ষক, মুসলিম সমাজের নেতা এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য আল্লাহর রহমতের প্রতীক। কুরআন কারীম তাঁকে “রাহমাতুল্লিল আলামীন” (সূরা আনবিয়া: ১০৭) বলে অভিহিত করেছে। মদিনায় হিজরত করে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর বন্দেগির এক মহত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

                ইন্তেকালের সময় ও স্থান

বিখ্যাত বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬৩ বছর বয়সে, হিজরতের ১১তম বছরে সফর মাসের ২৮ তারিখে মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন। কয়েক দিন আগে তাঁর অসুস্থতা শুরু হয় এবং প্রথমে উম্মে সালামা (রা.)-এর ঘরে, পরে আয়েশা (রা.)-এর ঘরে অবস্থার অবনতি ঘটে। অবশেষে তিনি ইমাম আলী (আ.)-এর কোলের উপর মাথা রেখে ইন্তেকাল করেন।

                         গসল ও দাফন

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গসল ও কাফন ইমাম আলী (আ.) সম্পন্ন করেন। তাঁকে তাঁর ঘরেই, যেখানে তিনি জীবনযাপন ও ইবাদত করতেন, সমাহিত করা হয়। বর্তমানে এই স্থান মসজিদে নববীর রওজা মুবারকের পাশে অবস্থিত।

               ইন্তেকালের পরিণাম

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল ইসলামের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। খিলাফতের প্রশ্নে সাকিফা বানী সাঈদার ঘটনাটি ঘটে, যা মুসলিম সমাজে বিভেদ ও মতভেদের জন্ম দেয়। শিয়া মত অনুযায়ী, বহু হাদিস ও বাণীর ভিত্তিতে ইমাম আলী (আ.)-ই ছিলেন নবীর মনোনীত ও আল্লাহপ্রদত্ত উত্তরসূরি।

ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাত


       ইমাম হাসান (আ.)-এর মর্যাদা

ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) ছিলেন আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) ও ফাতিমা যাহরা (সা.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং শিয়াদের দ্বিতীয় ইমাম। তিনি ৩য় হিজরিতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ধৈর্য, উদারতা ও অদ্বিতীয় দানশীলতার জন্য তিনি “কারীমে আহলে বাইত” নামে খ্যাত।

পিতা ইমাম আলী (আ.)-এর শাহাদাতের পর, কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি ইমামতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মু’আবিয়া ইবনে আবুসুফিয়ানের ষড়যন্ত্র এবং সাথীদের দুর্বলতায় তিনি বাধ্য হন একটি জটিল চুক্তিতে পৌঁছাতে, যা ইতিহাসে “ইমাম হাসানের সন্ধি” নামে পরিচিত।

                   শাহাদাতের ঘটনা

মু’আবিয়া, ইমাম হাসান (আ.)-এর প্রভাব ও মর্যাদা থেকে আতঙ্কিত হয়ে, তাঁর হত্যার পরিকল্পনা করে। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, মু’আবিয়া ইমামের স্ত্রী জোদাহ, যে আশআস ইবনে কায়সের কন্যা ছিল, তাকে বিপুল সম্পদ ও ইয়াজিদের সাথে বিয়ের প্রলোভন দেয়। সে বিষ মিশ্রিত পানীয় ইমামকে খাওয়ায়। ফলে ৫০ হিজরিতে মদিনায় তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে শাহাদাতবরণ করেন।

ইমামের পবিত্র দেহ জন্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন করা হয়, যেখানে তাঁর মাতা ফাতিমা যাহরা (সা.) এবং চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুলমুত্তালিব (আ.)-এর কবর রয়েছে। তবে বনী উমাইয়ার বাধার কারণে তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। এই ঘটনা আহলে বাইতের উপর এক গভীর জুলুমের সাক্ষ্য বহন করে।

                  এ দিনের শিক্ষা ও বার্তা

১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রহমত ও রিসালতের স্মরণ: তাঁর ইন্তেকাল বিশ্বজনীন বার্তা ও কুরআনের শিক্ষার পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ।
২. আহলে বাইতের (আ.) মজলুমিয়্যাত: ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত প্রমাণ করে, নবীর পরিবার তাঁর ইন্তেকালের পরও নির্যাতন ও শত্রুতার শিকার হয়েছিলেন।
৩. নবুয়ত ও ইমামতের যোগসূত্র: এই দুই ঘটনার একত্রতা দেখায় যে নবীর রিসালত ইমামতের ধারাবাহিকতা ছাড়া অসম্পূর্ণ।
৪. নৈতিকতার শিক্ষা: নবী করীম (সা.) ছিলেন দয়ার আদর্শ, আর ইমাম হাসান (আ.) ছিলেন ধৈর্য ও দানশীলতার প্রতীক। তাঁদের স্মরণ নৈতিক ও ধৈর্যশীল জীবনের প্রেরণা জোগায়।

             ২৮ সফরে মুস্তাহাব আমল

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জিয়ারত: মদিনায় উপস্থিত হয়ে বা দূর থেকে মশহুর জিয়ারত পাঠ করা।

ইমাম হাসান (আ.)-এর জিয়ারত: তাঁর বিশেষ জিয়ারত পাঠ করা।

শোকসভা ও আজাদারি: নবী (সা.) ও ইমাম হাসান (আ.)-এর ফজিলত ও মজলুমিয়্যাত বর্ণনা।

সাদকা ও দান: ইমাম হাসান (আ.)-এর দানশীলতার স্মরণে।

কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া: বিশেষত ইমাম মাহদি (আ.জ.)-এর জরুরি আগমনের জন্য দোয়া করা।

উপসংহার

২৮ সফর ইসলামের ইতিহাসে দুই মহা বিপদের স্মারক: পবিত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালতের সমাপ্তি এবং ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর শাহাদাত। এই দিনটি নববী মিশন, ইমামতের গুরুত্ব ও আহলে বাইতের মজলুমিয়্যাত নিয়ে ভাববার এক বিশেষ সুযোগ। এ দিন থেকে শিক্ষা হলো—ইসলামের আসল মূল্যবোধে অটল থাকা, বিপথগামিতার বিরুদ্ধে ধৈর্য ও প্রতিরোধ করা, এবং নবীর নৈতিকতা ও ইমাম হাসানের দানশীলতাকে জীবনে ধারণ করা। 
__________________________________________

     পবিত্র আরবাঈনের ইতিহাস
        ✍️  মইনুল হোসায়েন

সফর মাসের ২০ তারিখকে আরবাঈন দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ৬১ হিজরি সনের ১০ মহরমে কারবালাতে ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর শাহাদাতের ৪০ দিন পর এই দিনটি পালিত হয়। আরবী ভাষায় আরবাঈন শব্দের অর্থ হল চল্লিশ। তাই তাঁর শাহাদাতের ৪০ দিন পর এই শোক অনুষ্ঠান পালিত হওয়ার জন্য এর নাম আরবাঈন।

কারবালায় ইমাম হুসাইন (আঃ) নিহত হওয়ার প্রায় ১৪০০ বছর পরেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তাঁর আত্মত্যাগকে স্মরণ করে থাকে। প্রতি বছর আরবাঈন উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ শিয়া মুসলিম একত্রিত হয়ে ইমাম হুসাইনের জন্য শোক পালন করেন।

আরবাঈন পদযাত্রার সূচনা 

পবিত্র আরবাঈনের দিনের যিয়ারাতের ঐতিহ্যটি ৬১ হিজরিসনেই শুরু হয়েছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর শাহাদাতের ৪০ দিন পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একজন সাহাবী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী সর্বপ্রথম কারবালায় ইমামের পবিত্র কবরে যিয়ারাত করতে আসেন। এরপর থেকে প্রতি বছর এই যিয়ারাতের ধারাবাহিকতা পালিত হয়ে আসছে।
তবে, আধুনিক যুগে শেখ মির্জা হোসেইন নূরী এই যিয়ারাত ও পদযাত্রাকে পুনরায় চালু করার জন্য পরিচিত হয়ে আছেন। তিনি প্রথমবার তার বন্ধু এবং আত্মীয়-স্বজনসহ ত্রিশজনের একটি দল নিয়ে পায়ে হেঁটে এই কারবালাতে পৌঁছেছিলেন। পরে তিনি তার মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি বছর এই প্রথা বজায় রেখেছিলেন।

আরবাঈন এবং ইরাকের মানুষ 

ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রকাশ্যে আরবাঈন পালন করা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০০৩ সালে তার পতনের পর থেকে এই অনুষ্ঠান আবার শুরু হয়। বর্তমানে ইরাকসহ সারা বিশ্বের লাখ লাখ শিয়া মুসলিম আরবাঈন পালনের জন্য ইরাকে আসেন। এই সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যায়েরীনরা নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেন। এই পথ অতিক্রম করতে প্রায় তিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে।

আরবাঈনের সময় ইরাকের অর্ধেক লোক যায়েরীনদের মেহমানদারীর দায়িত্ব নেয়। ইরাকি স্বেচ্ছাসেবকরা এই দীর্ঘ যাত্রাপথে যায়েরীনদের জন্য বিনামূল্যে খাবার, পানীয়, বিশ্রামাগার, শৌচাগার, এবং ঘুমানোর ব্যবস্থা করেন। এমনকি অনেক ইরাকি মানুষ নিজেদের বাড়িগুলিকে যায়েরীনদের জন্য খুলে দেন। এই অসাধারণ মেহমানদারীর জন্য যায়েরীনরা ইরাকের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আরবাঈনের ধর্মীয় তাৎপর্য 

আরবাঈনের ধর্মীয় তাৎপর্য অনেক গভীর। ইমাম হাসান আসকারী (আঃ)-এর একটি হাদিসে মোমিনদের পাঁচটি লক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছে - যার মধ্যে একটি হল পবিত্র আরবাঈনের দিনে জিয়ারত আল-আরবাঈন।

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)-এর মতে, যারা ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর কবরের কাছে হেঁটে যান, আল্লাহ তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে এক হাজার পুণ্য দেন, এক হাজার পাপ মুছে দেন এবং তাদের মর্যাদা এক হাজার স্তর বাড়িয়ে দেন। এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায় যে, আরবাঈন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা মহানবী (সাঃ) এবং আহলে বাইতের ইমামগণের শিক্ষা থেকে প্রচলিত হয়ে আসছে।

পরিশেষে বলা যায়, আরবাঈন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। বরং এটি হল ইসলামের শান্তি, ন্যায় ও ত্যাগের প্রতীক। ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর আত্মত্যাগ আমাদেরকে শেখায় কিভাবে অত্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। তাই আরবাঈন সকল মানুষের জন্য একটি আদর্শ, যা আমাদের জীবনকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে অনুপ্রাণিত করে। এই কারণে, শিয়া মুসলিমদের পাশাপাশি অনেক অমুসলিম এবং অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও এই দিনে ইমাম হুসাইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কারবালাতে একত্রিত হন।
__________________________________________

কারবালার পরবর্তী অধ্যায় — জয়নবের কণ্ঠে হক-এর অগ্নিশিখা
          ✍️মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

 ভূমিকা:
কারবালার সেই লাল মাটি আজও কেঁপে ওঠে রক্তস্নাত স্মৃতির দগদগে যন্ত্রণায়। আশুরার সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে রক্তমাখা হয়ে অস্ত গেল, তখন কেউ ভেবেছিল হক-এর আলোর প্রদীপ নিভে গেছে। কিন্তু কারবালার ইতিহাস জানে—হুসায়েন (আ:) এর শাহাদাতের পর শুরু হয়েছিল এক নতুন জাগরণ, এক অগ্নিময় অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের রূপকার ছিলেন ইমাম সাজ্জাদ (আ:) আর জনাবে জয়নব (সা:)—যাঁদের ধৈর্য ও সাহস ইতিহাসের আকাশে নক্ষত্রের মতো দীপ্ত।

 কারবালার পর রক্তের শপথ

কারবালার ময়দানে নবীর দৌহিত্র ইমাম হুসায়েন (আ:) এর নিথর দেহ পড়ে রইল। বাতাসে তখন শোকের দীর্ঘ আর্তনাদ—
 “হে আসমান, কেন তুমি ভেঙে পড়ো না? হে জমিন, কেন তুমি কেঁপে ওঠো না?”
রক্তের প্রতিটি ফোঁটা যেন বলছিল: “আমার ত্যাগ বৃথা নয়, সত্যের পতাকা এই রক্তে চিরকাল উড়বে।” সেই সময় বন্দি কাফেলা চলল কুফার পথে। মাথার ওপরে ছিল শহীদদের কাটা মস্তক, আর উটের পিঠে বসে ছিলেন নবীর কন্যাদের সন্তানরা। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন রক্তের কাব্য লিখে যাচ্ছিল ইতিহাসের অমর পৃষ্ঠায়।

 জয়নব (সা:)—ইতিহাসের বজ্রধ্বনি

কুফার দরবারে জনাবে জয়নব (সা:) দাঁড়ালেন, তাঁর চোখে ছিল গভীর বেদনা আর কণ্ঠে ছিল অদম্য সাহস। তিনি বললেন: “হে ইবনে জিয়াদ! তুমি কি ভেবেছ আমাদের শোক আমাদের ভেঙে দেবে? না, হুসায়েনের (আ:) রক্ত আজ সত্যকে জীবন্ত করে তুলেছে। তুমি মিথ্যার পরাজিত সৈনিক।” এই কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রপাতের মতো। যে কুফাবাসীরা প্রথমে উদাসীন ছিল, তারা জয়নব (সা:)-এর ভাষণে কেঁদে ফেলল। সেই কান্না আজও আমাদের অন্তরে শোনা যায়।

 ইমাম সাজ্জাদ (আ:)—শোকের মাঝে সংগ্রামের মশাল

রক্তাক্ত ইতিহাসের মাঝে ইমাম সাজ্জাদ (আ:) ছিলেন এক জীবন্ত কোরআন। বন্দিত্বের মাঝেও তিনি কাঁদতেন, কিন্তু তাঁর কান্না ছিল জাগরণের অশ্রু। তিনি বলতেন: “হুসায়েনের (আ:) রক্ত বৃথা নয়। শোকের মাধ্যমে সত্যের পতাকা আরও উঁচু হবে।”

 আরবাঈন—চল্লিশার প্রতিজ্ঞা

কারবালার চল্লিশতম দিনে, ২০ সফর, ইমাম সাজ্জাদ (আ:) কারবালার ময়দানে ফিরে এলেন। বালুর প্রতিটি দানা যেন এখনও লাল রঙে রঞ্জিত। জনাবে জয়নব (সা:) সেই মাটিতে চিৎকার করে বললেন: “হুসায়েন, আমরা ফিরেছি! তোমার রক্তের শপথ আমরা ভুলিনি। প্রতিটি অশ্রু হবে প্রতিজ্ঞা, প্রতিটি ধ্বনি হবে প্রতিরোধ।” সেই আরবাঈন আজ বিশ্বের বৃহত্তম শোকযাত্রা, যা হুসায়েনি আদর্শের শাশ্বত শক্তি প্রমাণ করে।

 শিক্ষা ও আহ্বান

 হক-এর পথে অটল থাকা: কারবালার পরবর্তী অধ্যায় আমাদের শেখায় যে সত্যের শক্তি মিথ্যার সাম্রাজ্য ভেঙে দিতে পারে।

 নারীর সাহসের প্রতীক: জনাবে জয়নব (সা:) দেখিয়েছেন, একটি অগ্নিময় কণ্ঠ ইতিহাস বদলে দিতে পারে।

 ইমাম মাহ্দী (আ.ফা.)-এর অপেক্ষা: এই শোকের প্রতিটি অশ্রু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা হুসায়েনি সৈনিক হতে প্রস্তুত।

 উপসংহার
কারবালার পরবর্তী অধ্যায় কেবল ইতিহাস নয়, এটি হৃদয়ের অগ্নিপাঠ। হুসায়েন (আ:) এর রক্তে লেখা সেই পাঠ আমাদের শেখায়—অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা হার মানার নাম, আর সত্যের পাশে দাঁড়ানোই মুক্তির প্রকৃত পথ। আজও প্রতিটি হুসায়েনি হৃদয় ফিসফিসিয়ে বলে: “আমরা কারবালার সন্তান। যতদিন অন্যায় আছে, ততদিন জয়নবের কণ্ঠ আর হুসায়েনের রক্ত আমাদের জাগিয়ে রাখবে।”
__________________________________________

অমীয় বাণী: ইমাম হোসাইন আঃ
        ✍️ রাজা আলী

ভূমিকা
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কিছু ব্যক্তিত্ব আলো ছড়িয়ে দেন যুগ থেকে যুগান্তরে। তাঁদের কথা, তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে মানবতার চিরন্তন পথনির্দেশ। ইমাম হোসাইন আঃ তেমনই এক আলোকবর্তিকা, যাঁর অমীয় বাণী আজও হৃদয় জাগায়, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং সত্যের পথে আহ্বান জানায়। তাঁর বাণী শুধু শব্দ নয়, বরং চিরন্তন এক শিক্ষার ঝরনা, যা আমাদের শিরায় শিরায় সাহস, ন্যায় আর ভক্তির স্রোত বয়ে আনে।

গাদীরে খুমের ময়দানে মাওলা আলী আঃ এর খেলাফত ঘোষণায় দ্বীন এ ইসলাম পূর্ণতা পায়।আর ৬১ হিজরীতে দ্বীন ইসলামের প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায় ইরাকের কারবালার মরু প্রান্তরে ইমাম হোসাইন আঃ ও তাঁর সাথীদের আত্ম ত্যাগের মাধ্যমে।সেই ঘটনা আজ বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক ইতিহাস।এই ইতিহাস থেকে ই আমরা জেগে উঠেছি,অন্যদের জাগানোর চেষ্টা করি।
ইমাম হোসাইন আঃ সাধারণ ব্যক্তি নন, তিনি খোদার হুজ্জাত। ইতিহাসের ক্রান্তি লগ্নের সত্যের দরজা ও দিশা।মানবতা ও ন্যায়ের উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা ও প্রতিমূর্তি।বিশ্ব মনীষীদের পিতা।তাই তাঁর পদাঙ্ক সর্বদা অনুকরণীয়। তাঁর অমীয় বাণীর অনুপম স্রোতে অবগাহন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে আমাদের শিয়া মাযহাবের উচিত তাঁর অমীয় বাণী আকণ্ঠ পান করে নীলকণ্ঠ হওয়া।তবেই আমরা ইমাম হোসাইন আঃ এর প্রকৃত অনুসারী হতে পারবো।

নিম্নে ইমাম হোসাইন আঃ এর কয়েকটি অমীয় বাণী তুলে ধরা হলো:

১. সূত্র অনুযায়ী আমরা শিয়া। কিন্তু প্রকৃত শিয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে অন্যত্র। ইমাম হোসাইন আঃ প্রকৃত শিয়াদের সংজ্ঞা দিয়েছেন:
"আমাদের শিয়া হলো তারা, যাদের অন্তর সমস্ত প্রকার বিদ্বেষ ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকে"(বিহারুল আনওয়ার,খণ্ড ৬৫)। সুতরাং শিয়া শুধু দাবীই করলে হবে না,প্রকৃত শিয়া হওয়ার জন্য ইমাম হোসাইন আঃ এর বাণী ও আদর্শের দিকে আমাদের ধ্যাণ দিতে হবে।

২. এবাদতের প্রচলিত ধারণা আমাদের নিকট অতি সংকীর্ণ। কিন্তু এবাদতের মূল অর্থ অতি বিস্তৃত ও প্রসারিত। এবাদাত কাকে বলে এবং মানুষের শোভা কোথায় লুক্কায়িত,তা ইমাম হোসাইন আঃ আমাদের স্মরণ করে দেন: "উত্তম আচার -আচরণ হলো এবাদত এবং নীরবতা হলো মানুষের শোভা"(তারিখ এ ইয়াকুবী,খণ্ড ২য়)।

৩. প্রকৃত মানুষ তথা শিয়া এসনা আশারী হওয়ার কিছু শর্ত ও সীমারেখা রয়েছে,যা আমাদের সর্বদা মনে রাখা এবং মেনে চলা উচিত।প্রতিটি কাজের সর্বোচ্চ পর্যায় রয়েছে,যা উপার্জনে আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিত। সর্বোত্তম ক্ষমাকারী সম্পর্কে ইমাম হোসাইন আঃ বলেন: "সর্বোত্তম ক্ষমাকারী সেই ব্যক্তি,যে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কে ক্ষমা করে দেয়"(বিহারুল আনওয়ার,খণ্ড ৭৫)।

৪. জ্ঞান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের বিশেষ একটি নিয়ামত। জ্ঞান ই মানুষের বোধের দরজা খুলে দেয় এবং বিবেককে জাগ্রত করে।তাই সকলকেই প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। ইসলাম দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জনের তাগিদ দিয়েছে।একই সঙ্গে সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ রাখতে হবে।কারণ মৃত্যু অনিবার্য এবং অন্য এক জগতের সেতু স্বরূপ। মৃত্যুকে স্মরণ রাখার অর্থ খোদাকে স্মরণ রাখা এবং আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা। মাওলা হোসাইন আঃ জ্ঞান অর্জন এবং মৃত্যুকে স্মরণ রাখার বিষয়ে বলেছেন: "মানুষ যদি জ্ঞানী হতো এবং মৃত্যুকে বিশ্বাস রাখতো,তবে পৃথিবী জনশূন্য মনে হতো" (এহক্কাক্কুল হক্ব ,খণ্ড ১১)।

উপসংহার
মাওলা হোসাইন আঃ এর জীবন ও বাণী আমাদের জন্য আদর্শ।সে কারণেই ইমাম হোসাইন আঃ এর বাণীগুলিকে আমাদের পাথেয় করতে হবে এবং তাঁর প্রদর্শিত পথকে আলিঙ্গন করতে হবে।তবেই আল্লাহ রব্বুল আলামীনের প্রকৃত অনুগত্য করা হবে এবং ইহকাল ও পরকালে মুক্তি সম্ভব হবে।


__________________________________________

 মারেফাত এ ইমামে জামানা (আ.জ.)
           ✍️ আব্বাস আলী
  
ভূমিকা
মারেফাত এ ইমামে জামানা অর্থ শুধুমাত্র নাম, বংশ বা ইতিহাস জানা নয়; বরং তাঁর আসল পরিচয়, দায়িত্ব, মর্যাদা ও আমাদের প্রতি তাঁর হককে বোঝা । রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন: "যে ব্যক্তি তার যোগের ইমাম কে চিনলো না সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল"।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইমামের মারেফাত ঈমানের অপরিহার্য অংশ। ইমাম মাহদী (আ.জ.) হলেন আল্লাহর সর্বশেষ হুজ্জত, যিনি কুরআন ও শরীয়তের প্রকৃত ব্যাখ্যাকারী। তাঁর আগমনের জন্য হাদীসে বর্ণনা হয়েছে যে, "যদি দুনিয়ায় মাত্র একদিনও বাকি থাকে, আল্লাহ সেই দিনকে দীর্ঘ করবেন, তার হুজ্জতের জুহুরের জন্য"

ইমামের গায়বতের রহস্য

ইমামের গাইবতের দুটি পর্যায় রয়েছে---
1. ছোট গায়বত (গায়বতে সোগরা) — ৭০ বছর স্থায়ী ছিল, যেখানে চারজন বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন।

2. বড় গায়বত (গায়বতে কুবরা) — এখন পর্যন্ত চলছে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিনিধি নেই, তবে আলেম ও ফকিহগণ তাঁর সাধারণ প্রতিনিধি।

গায়বতের অন্যতম কারণ

ক) ইমামের জীবন রক্ষা
খা) উম্মতকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলা
গ) মানুষকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে শরীয়ত পালন শেখানো

মারেফাত অর্জনের বিস্তারিত উপায়

১. কুরআনের আয়াত অধ্যয়ন 
কুরআনে  ইমামের  মর্যাদা ও দায়িত্ব সম্পর্কিত বহু আয়াত আছে, যেমন:--"তুমি তোমার সময়ের ইমামকে অনুসরণ কর।"

২. হাদিস
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বহু বাণী আছে ইমাম মাহদী (আ.জ.) সম্পর্কে
৩. দোয়া ও জিয়ারতের মাধ্যমে সংযোগ
দোয়া এ আহদ — ইমামের সাথে আধ্যাত্মিক চুক্তি।
জিয়ারতে আল-ইয়াসিন  ইমামের সাথে কথোপকথনের আকারে দোয়া।
দোয়া ফরজে ইমামের দ্রুত আগমনের জন্য দোয়া।

৪. অপেক্ষা
অপেক্ষা মানে শুধু অপেক্ষাই করা নয়, বরং নিজেকে প্রস্তুত করা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, এবং ইমামের উদ্দেশ্যে জীবন পরিচালনা করা।

গায়বতের যুগে আমাদের দায়িত্ব

1. তাকওয়া ও আমল — ব্যক্তিগত চরিত্র ও আমল পরিশুদ্ধ রাখা।
2. শরীয়তের আনুগত্য — ফকিহদের নির্দেশ মেনে চলা।
3. ইমামের জন্য দোয়া — যেমন আল্লাহুম্মা কুন লিওলিয়েকাল…।
4. ইসলামী সমাজ গঠন — অন্যায় ও ফিতনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

উপসংহার
মারেফাত এ ইমামে জামানা কেবল একটি জ্ঞান নয়, এটি এমন একটি জীবন্ত সম্পর্ক যা মুমিনের হৃদয়ে আলো জ্বালায়। এবং ধীরে ধীরে ইমামের জোহরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার আবেগ তৈরি করে দেয়।।

__________________________________________------------------------------------------------




📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
                   কাল্পনিক ছোয়াঁ
        ✍️মো: মুন্তাজির হোসেন গাজী

প্রলাপ বকেছি তোমার কাল্পনিক ছোঁয়া পেয়ে,
হতাসায় ভূগেছি আমি তোমাকে না পেয়ে।
হাজার দূরে থাকলেও তোমার আওয়াজ শোনা যায়,
তোমাকে পেয়েছি আমি আলে-ইয়াসিনের পাতাই।

ভোরের কূয়াশাতে আবছা ছায়া ভেসে আসে,
কিন্তু হাই!এটাও দৃষ্টিভ্রম বুঝলাম অবশেষে ।
রক্তঅশ্রু ঝরিয়ে শহীদের আঘাতে যেন প্রলেপ দাও,
বৃহৎ দূঃখ কে মাওলা তুমি বিভাজন করে নাও।

সব প্রত্যাশা যেন সফলতাকে লঙ্ঘন করে যায়,
মেহদিকে দেখতে, অন্তর অনিচ্ছার কাছে হারে যায়।
নীশিরাতের এবাদাতে গুঞ্জন এলো ভেসে,
এটি সে নয়, আলিমেদ্বীন ছিল পাসে।

ভোরের আকাশে যেন শান্তির শিখা ভেসে আসে,
এখনো অবকাশ হয়নি, আশা যেন কল্পতরুতে ভাসে।
নৈঋত কোনে, রবির কীরণের ছটা এল ভেসে,
এটি সূর্যোদয় নয়, সূর্যাস্তের ছিল সময় ।।

__________________________________________


    পরিচিতি 
    ✍️ রাজা আলী 

আমি তখন খুব ছোটো
হয়তো আধো আধো কথা মুখে
বাবা মা আমাকে একের পর এক কত শব্দ
অতি যত্নে শিখিয়েছে;
প্রতিটি শব্দ করেছি কপি
নেমেছে বাহ্ বাহ্ র স্রোত
"এই দেখ আমাদের মনা র কত কথা,
মিষ্টি , মধুর,পাকা পাকা,
কেউ যেন আগে থেকে শিখিয়েছে পরিপাটি"।

উহঃ,কত কিছু শিখেছি
কেউ তো শেখায় নি আমার ইমাম(আঃ)এর নাম
"বলো মাহদী আদরিকনী"
অনেক বড়ো হয়ে , মক্তবের বইয়ে
পড়েছি ইমামের জন্ম,উপাধি,পরিচয়...
হায়,কত দিন পেরিয়ে চিনেছি তাকে
যার অস্তিত্বের বরকতে পৃথিবী বিদ্যমান।

মক্তবের গন্ডি পেরিয়ে এমাম আঃ ক্লাসে
জেনেছি তার পাওয়ার, ক্যারিশমা 
রহস্য জেনেছি সেই ঐশী সত্তার অন্তর্ধানের
তখন থেকেই জীবনের প্রতিটি কাজে 
সাক্ষী হিসাবে তাকে আগে ভাবি
হৃদয়ের গভীর কথা,ব্যথা
পলকে জানিয়ে রাখি
আর এক প্রচ্ছন্ন ভরসায় 
পথ চলি অবলীলায়।

__________________________________________

     কবে আমায় ডাকবেন ইমাম আরবাঈনে
               ✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

কবে আমায় ডাকবেন ইমাম আরবাঈনে,
কবে ভিজবো চোখের জলে কারবালার মাটিতে?
কবে ধরবো হুসায়েনের রক্তমাখা ধ্বজা,
কবে হাঁটবো আপনার পথে অশ্রুভেজা পায়ে?

কবে দেখবো সেই জ্যোতিময় সমুদ্র,
যেখানে মানুষের হৃদয় গলে যায় ভালোবাসায়?
যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ হয় জিকিরের সুর,
“ইয়া হুসায়েন!” ধ্বনিত হয় আকাশের নীলিমায়।

কবে আমায় ডাকবেন, হে প্রিয় ইমাম,
যেন আপনার আহ্বান শুনতে পাই নিভৃতে,
হৃদয় ভিজে ওঠে নামাজের অশ্রুতে,
আরবাঈনের স্রোতে ভাসি প্রেমের সাগরে।

আমি অপেক্ষা করি চোখ মেলে আকাশে,
হৃদয়ের অন্তরতম প্রার্থনা নিয়ে—
হে মাহ্দী (আ.ফা.), আপনার হাতের ইশারায়
ডেকে নিন আমায় সেই অনন্ত যাত্রায়।
------ _____------_____------______------______------

   

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ) || রমযান সংখ্যা ||

আরবি : রমযান, ১৪৪৭ হিজরী ইংরেজি : মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ __________________________________________               সম্পাদক  :  ম...