Friday, May 23, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ)_ জিলকাদ (ফিলিস্তিন সংখ্যা)




আরবি: জিলকাদ, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: মে, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা, মিনাখাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖



ফিলিস্তিন: মুসলিম উম্মাহর হৃদস্পন্দন

ফিলিস্তিনের মজলুমত্ব ও শিয়া মাযহাবের সমর্থন: কুরআন, হাদীস ও সমসাময়িক ইতিহাসের আলোকে

ইহুদী রাষ্ট্র : নির্মাণের নেপথ্যে

ফিলিস্তিন ও ঈমান

বাইতুল মুকাদ্দাস: মুসলমান দের প্রথম কেবলা 

বারুদের দেশে শৈশব হারিয়ে যায়

ফিলিস্তিন সমস্যা:ইমাম মাহদী আঃ এর আবির্ভাবের পটভূমি
          ✍️  রাজা আলী 

ইমাম আঃ এর আবির্ভাব: শান্তির জগৎ (অনুবাদ)



📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

শুক্রবারের উষালগ্নে

             গাজা
          ✍️  রাজা আলী 

রক্তে লেখা আহ্বান


__________________________________________
__________________________________________

                   সম্পাদকীয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ দয়ার বরকতে আল-হুজ্জাত পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ)-এর যিলকাদ সংখ্যা প্রকাশিত হলো।রাহবারের নির্দেশনা অনুযায়ী ফিলিস্তিন ইস্যুকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।এই সংখ্যা আমরা নিবেদন করছি ফিলিস্তিনের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের স্মৃতির প্রতি, যাঁরা রক্ত দিয়ে লিখছেন প্রতিরোধের ইতিহাস।

ফিলিস্তিন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ঈমানি আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই সংখ্যা তাই একটি উচ্চারণ—আহ্বান ও অনুতাপের, প্রতিবাদ ও প্রত্যাশার।এই সংখ্যায় স্থান পেয়েছে কুরআন-হাদীসের আলোকে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ, মুসলমানদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস, ইমাম মাহদী (আ.)-র আগমনের পটভূমি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রঘোষণা, কবিতা ও সাহিত্যচিন্তার দীপ্ত বার্তা।

আমাদের আশা—পাঠকগণ এই সংখ্যার প্রতিটি প্রবন্ধে খুঁজে পাবেন ঈমানি চেতনার নবজাগরণ, আর অন্তরে অনুভব করবেন নিপীড়িত এক জাতির আর্তনাদ ও অধিকার।
                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

ফিলিস্তিন: মুসলিম উম্মাহর হৃদস্পন্দন
✍️ কবির আলী তরফদার কুম্মী।

رسول الله صلى الله عليه وآله قال:
"من لا يهتم بأمر المسلمين فليس منهم."
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে মুসলমানদের বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।"

ভূমিকা:
 যে ব্যক্তি মুসলমানদের ব্যাপারে চিন্তিত নয়, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়—এই মহান হাদীস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মুসলিম উম্মাহ একটি অদ্বিতীয় দেহের মতো। ফিলিস্তিন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এটি আমাদের ঈমান, আমাদের ইতিহাস, আমাদের অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ যখন সেই ভূমি রক্তে রঞ্জিত, নিপীড়নের যন্ত্রণায় কাঁপছে, তখন এক একটি মুসলিম হৃদয়কে জেগে উঠতে হবে। বুঝতে হবে—কেন ফিলিস্তিন এত গুরুত্বপূর্ণ, কেন কুদস আমাদের হৃদয়ে ও চেতনায় এমন গভীরভাবে গাঁথা।

ফিলিস্তিন কেন মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

ফিলিস্তিন হল সভ্যতাগুলোর সংযোগস্থল। ফিলিস্তিন ও বাইতুল মুকাদ্দাস—নবীদের ভূমি, ঐশ্বরিক ধর্মের আবির্ভাব ও প্রসারের স্থান এবং মুসলমানদের প্রথম কিবলা—সর্বদা বিশ্বের প্রধান ধর্মাবলম্বী ও সকল জাতির জন্য গুরুত্ব ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। ফিলিস্তিন একটি পবিত্র ভূমি, যা ইসলামধর্ম , খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদিধর্ম—এই তিনটি প্রধান ধর্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বলে বিবেচিত হয়।  

আপনি কি কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছেন,কেন ফিলিস্তিন আমাদের মুসলমানদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?অতীতে এমন অনেক ভূমি ছিল এবং এখনও আছে, যা ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফিলিস্তিনের গুরুত্ব অন্য রকম। ফিলিস্তিনকে জানা ও অধ্যয়ন করা মানে হলো মানবতার উচ্চতর মূল্যবোধকে চিনতে পারা, যা এই ভূমিতে বাস্তবায়িত হয়েছে। ফিলিস্তিন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে আল্লাহর নেক বান্দারা বাস করেছেন বা অতিক্রম করেছেন। 

কুদস (জেরুজালেম) ইসলামিক পবিত্রতার অধিকারী, যা মুসলমানদের হৃদয়ে ও স্মৃতিতে গভীরভাবে অঙ্কিত। কুদস তার ধর্মীয় অবস্থানের কারণে, মুসলমানদের প্রথম কিবলা, ইসরা ও মিরাজের ভূমি, মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম শহর, নবুয়ত ও বরকতের ভূমি এবং জিহাদ ও প্রতিরক্ষার স্থান হিসেবে পরিচিত।  

সামগ্রিকভাবে, ফিলিস্তিন ও কুদস নিম্নলিখিত কারণে গুরুত্বপূর্ণ:

১. বাইতুল মুকাদ্দাসের ধর্মীয় মর্যাদা:
বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের কাছে ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহ্ তাআলা কুরআনে এই ভূমিকে পাঁচবার বর্ণনা করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে কুদসের ধর্মীয় মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ।  

ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি নিয়ে মুসলমান, আরব ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তারা সবাই একমত যে—কুদস ইসলামিক, এর পরিচয় রক্ষা করা আবশ্যক এবং ইসরাইলের অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যা কুদসকে ইহুদিকরণ, এর ঐতিহাসিক পরিচয় মুছে ফেলা এবং এর আরবি, ইসলামিক ও খ্রিস্টান চিহ্ন ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। 

২. কুদস মুসলমানদের প্রথম কিবলা:
কুদস মুসলমানদের প্রথম কিবলা, তাই এটি তাদের অনুভূতি, স্মৃতি ও ধর্মীয় চিন্তায় উচ্চ স্থান দখল করে আছে। নবুওয়তের দশম বছর (হিজরতের তিন বছর আগে) থেকে হিজরতের ১৬ মাস পর পর্যন্ত রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ কুদসের দিকে ফিরে নামাজ পড়তেন। এরপর আল্লাহ্ কাবা বা মাসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরানোর নির্দেশ দেন।  

৩. কুদস ইসরা ও মিরাজের ভূমি:
মুসলমানদের চেতনায় কুদসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি রাসূল (সা.)-এর মিরাজের যাত্রার স্থান। আল্লাহ্ চেয়েছিলেন যে রাসূল (সা.)-এর রাত্রিকালীন ভ্রমণ মক্কার মাসজিদুল হারাম থেকে শুরু হয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসে শেষ হোক।  

ইসরা ও মিরাজের ঘটনায় অনেক রহস্য ও ইঙ্গিত রয়েছে, যা এই পবিত্র স্থানের গুরুত্বকে তুলে ধরে। যে স্থানে জিবরাইল (আ.) বুরাক (এক অদ্ভুত বাহন যা মক্কা থেকে কুদসে নিয়ে গিয়েছিল) বেঁধে রেখেছিলেন। জিবরাইল (আ.) এটিকে পাথরের সাথে বেঁধে রেখেছিলেন, যাতে কুদস থেকে আসমানের দিকে 'সিদরাতুল মুনতাহা' পর্যন্ত যাওয়ার পর ফিরে আসতে পারেন। এই ঘটনার কারণে মুসলমানরা যখন 'পাথর' ও 'হায়াতুল বুরাক' দেখে, তখন এই স্মৃতি তাদের মনে ভেসে ওঠে।  

যদি কুদস এত গুরুত্বপূর্ণ না হতো, তাহলে মেরাজ সরাসরি মক্কা থেকে আসমানে হতে পারত, যেমন কুরআন ও হাদীসে এর ইঙ্গিত রয়েছে।  

৪. কুদস নবুয়ত ও বরকতের ভূমি:
কুদস ফিলিস্তিনের একটি অংশ নয়, বরং এর উজ্জ্বল নিদর্শন ও মণিমুক্তা। আল্লাহ্ তাআলা এই ভূমিকে পাঁচবার কুরআনে বর্ণনা করেছেন:  

- ইসরার আয়াতে, যখন বাইতুল মুকাদ্দাসের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।  
- ইব্রাহীম (আ.)-এর ঘটনায়।
- মুসা (আ.)-এর ঘটনায়, যখন ফেরাউন ও তার সৈন্যদের ডুবিয়ে দেওয়ার পর বনি ইসরাইলের কথা বলা হয়েছে।  
- সুলাইমান (আ.)-এর ঘটনায়, যেখানে আল্লাহ্ তাকে যে রাজত্ব ও ক্ষমতা দিয়েছিলেন, তা বর্ণনা করা হয়েছে।  
- সাবা সম্প্রদায়ের ঘটনায়, যেখানে আল্লাহ্ তাদের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তির ব্যবস্থা করেছিলেন।  

এই ভূমিগুলো, যেগুলোকে আল্লাহ্ বরকতময় করেছেন, তা হলো শাম ও ফিলিস্তিনের অঞ্চল। অনেক প্রাচীন ও আধুনিক মুফাসসির মনে করেন, সূরা তীন-এর প্রথম আয়াতগুলোতে "তীন ও জাইতুনের শপথ, সিনাই পর্বতের শপথ এবং এই নিরাপদ নগরীর শপথ..."—এখানে তীন ও জাইতুন দ্বারা বাইতুল মুকাদ্দাসকেই বোঝানো হয়েছে, কারণ সেখানে এই ফলগুলো জন্মে।  

এই গুরুত্বের কারণেই ইমাম খোমেনী (রহ.) ১৯৭৯ সালের আগস্টে ইরান ও বিশ্বের মুসলমানদের উদ্দেশ্যে একটি বার্তা দিয়ে রমজানের শেষ শুক্রবারকে "ইয়াওমুল কুদস" (কুদস দিবস) হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি মুসলমানদেরকে এই দিনে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের আইনগত অধিকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করার আহ্বান জানান।  

উপসংহার:
ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি এবং কুদসের মর্যাদা শুধুই ইতিহাস বা ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব ও সম্মানের প্রতীক। বাইতুল মুকাদ্দাস  আমাদের অতীতের গৌরব, বর্তমানের যন্ত্রণা এবং ভবিষ্যতের মুক্তির আশার প্রতিচ্ছবি। ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসন কেবল একটি ভূখণ্ড দখলের বিষয় নয়, এটি একটি ধর্মীয়, মানবিক এবং সভ্যতাগত অপরাধ।
আজ আমাদের কর্তব্য—এই পবিত্র ভূমির জন্য প্রার্থনা করা, সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা।
কুদস আমাদের ছিল, আছে এবং থাকবে—ইনশাআল্লাহ।
__________________________________________

 ফিলিস্তিনের মজলুমত্ব ও শিয়া মাযহাবের সমর্থন: কুরআন, হাদীস ও সমসাময়িক ইতিহাসের আলোকে
✍️ মাওলানা রিপন মন্ডল ইস্পাহানী


সারসংক্ষেপ:
ফিলিস্তিনের জনগণ কয়েক দশকজুড়ে আন্তর্জাতিক জায়োনিস্ট আগ্রাসনের অধীনে সমসাময়িক ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক নিপীড়ন সহ্য করে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে, শিয়া মাযহাব, যার শিকড় গভীরভাবে কুরআন ও হাদীসে প্রোথিত; সর্বদা মজলুমদের পক্ষে এবং ফিলিস্তিনের জনগণের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা ইসলামী উৎস, আহলে বাইতের (আ.) জীবনচরিত ও শিয়া আলেমদের অবস্থানের আলোকে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে শিয়াদের বিশ্বাসগত ও বাস্তব সমর্থন বিশ্লেষণ করব।

ভূমিকা: মজলুমত্ব—একটি মানবিক ও ঐশী ইস্যু ।মজলুমত্ব একটি সাধারণ মানবিক ব্যথা, যা জাতি, বর্ণ, ভাষা ও সীমানার ঊর্ধ্বে। যখন এই নিপীড়ন পবিত্র ফিলিস্তিন ভূমির দখল, লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া, ইসলামী পবিত্র স্থান ধ্বংস এবং গণহত্যার রূপ নেয়, তখন নীরবতা অপরাধ। এ প্রেক্ষিতে আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষা—"জালিমের শত্রু ও মজলুমের বন্ধু হও"—সমস্ত স্বাধীনতা প্রেমী জাতির অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম অধ্যায়: ফিলিস্তিন দখল থেকে প্রতিরোধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফিলিস্তিন ভূমি দখল শুরু হয়। সাত লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি হারায়, শত শত গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়, হাজার হাজার নিরীহ মানুষ শহীদ হন।
সাবরা ও শাতিলা, জেনিন, গাজা সহ বহু গণহত্যা জায়োনিস্টদের নৃশংসতার প্রমাণ।
বায়তুল মুকাদ্দাস, মুসলমানদের প্রথম কিবলা, আজও অপমান ও দখলের শিকার।

দ্বিতীয় অধ্যায়: কুরআনের আলোকে মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর ভিত্তি

সূরা নিসা, আয়াত ৭৫:
"তোমরা কেন আল্লাহর পথে এবং নিপীড়িতদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করো না?"

সূরা হজ্জ, আয়াত ৪১:
"যখন আমি তাদেরকে ভূমিতে শক্তি দিই, তখন তারা সালাত কায়েম করে এবং মন্দকে নিষিদ্ধ করে।"

কুরআনের শিক্ষা স্পষ্ট: মজলুমদের পাশে থাকা এবং জালিমদের বিরুদ্ধাচরণ করা ঈমানের আবশ্যক দিক।

তৃতীয় অধ্যায়: আহলে বাইতের (আ.) বাণীতে মজলুমের সমর্থন ও জুলুমের বিরোধিতা

ইমাম আলী (আ.):
"জালিমের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, মজলুমের সহায়ক হও" — (নাহজুল বালাগা, পত্র ৪৭)

ইমাম হুসাইন (আ.):
কারবালার মাধ্যমে চিরন্তন জুলুমবিরোধী আদর্শ স্থাপন করেন।

ইমাম সাদিক (আ.):
"যে কেউ একজন জালিমকে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে ঐ জালিমের হাতে শাস্তি দিবেন।"

চতুর্থ অধ্যায়: ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে শিয়া আলেমদের অবস্থান

ইমাম খোমেনী (রহ):

ফিলিস্তিনকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলেছেন।
তিনি আল-কুদস দিবস চালু করেন (রমজানের শেষ শুক্রবার)। এবং বলেন, "ইসরাইলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে হবে।"

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (দা.জি):

সর্বদা হামাস, ইসলামি জিহাদ, হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য প্রতিরোধ আন্দোলনকে সর্বদা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছন। এবং ঘোষণা করেছেন, "ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনের; ইসরাইল ধ্বংস অনিবার্য।"

আয়াতুল্লাহ সিস্তানি, আয়াতুল্লাহ বেহজত, আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমলি, আয়াতুল্লাহ নূরী হামেদানী সহ বহু শিয়া মর্জে তাকলিদ ফিলিস্তিনের প্রতি তাদের নৈতিক সমর্থন ঘোষণা করেছেন।

পঞ্চম অধ্যায়: প্রতিরোধে শিয়াদের ভূমিকা

হিজবুল্লাহ (লেবানন): শিয়া ভিত্তিক প্রতিরোধ বাহিনী, ইসরাইলকে একাধিকবার পরাজিত করেছে। এবং আল আকসা অভিযানের পর গাজায়  ইসরাইলের আগ্রাসনের সময় গাজার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বছর খানেক ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।এই যুদ্ধে হাসান নাসরুল্লাহ র আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় শোভা পাচ্ছে।

ইরান: একমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্র যা ফিলিস্তিনকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন করে।

জাইনাবিয়ুন ও ফাতেমিয়ুন ব্রিগেড: শিয়া রেজিস্ট্যান্স যোদ্ধারা যারা মধ্যপ্রাচ্যে দখলদার ও তাকফিরি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়ছেন।

ষষ্ঠ অধ্যায়: আজকের সময়ে শিয়া ও বিশ্ব মানবতার দায়িত্ব

আজ আমাদের দায়িত্ব কেবলমাত্র দোয়া ও স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়:

১.মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে ফিলিস্তিনের আওয়াজ তোলা

২.অর্থনৈতিক বয়কট—ইসরাইলি পণ্য পরিহার করা।

৩.বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদে সচেতনতা ছড়ানো।

৪.রাজনীতি ও বাস্তবিক ময়দানে প্রতিরোধের পাশে থাকা।

উপসংহার:

তাশায়্যু' বা শিয়া মাযহাব কেবল একটি বিশ্বাস নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল ন্যায়ভিত্তিক জীবনদর্শন। ফিলিস্তিনের মজলুমত্ব আজ আমাদের ঈমান ও মানবতার পরীক্ষা। ইমাম হুসাইন (আ.) যেমন রক্ত দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনই আজ আমাদের উচিত—কলম, শব্দ, সম্পদ ও অবস্থান দিয়ে মজলুম ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানো।"যদি ধর্মে জীবন না থাকে, তাহলে অন্তত একজন মুক্ত মানুষ হয়ে ওঠো!"
— ইমাম হুসাইন (আ.)

__________________________________________

ইহুদী রাষ্ট্র : নির্মাণের নেপথ্যে
✍️ মাওলানা রেজাউল হক কুম্মী


ফিলিস্তিন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাঃ ইরশাদ করেছেন:"সর্বদা ফিলিস্তিনে একটি সত্যবাদী দলের অবস্থান থাকবে ও এক শ্রেনীর মানুষ থাকবে যারা সত্যের জন্য লড়াই করতে থাকবে"। 
রাসূলুল্লাহ্ সা্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া আলীহি ওয়া সাল্লামের আর্বিভাব হবার পূর্বে ফিলিস্তিন একটি বিশেষ গুরুত্ব পূর্ণ জায়গার নাম ছিল।তাঁর অনেকগুলো কারণ ছিল, সেই সমস্ত কারণের মধ্যে একটি বিশেষ কারণ হলো, বিশিষ্ট নবীগণ ও বিপুল নবীগণেরা ফিলিস্তিনে জন্ম গ্রহণ করেন ও তাঁদের সমাধি স্থানও ফিলিস্তিনে।সেই জন্য ঐ স্থান পাক ও পবিত্র স্থান হিসাবে গণ্য হতো।
 
       ফিলিস্তিনের ইতিহাসের ব্যপারে লিখতে গেলে কয়েক খন্ড বই লিখতে হবে, সেই জন্য এই ছোট্ট লেখাটির মধ্যে শুধূ বর্তমান ফিলিস্তিনের মানচিত্র সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনের স্বল্প কিছু অংশ তুলে ধরছি।পৃথিবীর মানচিত্র দেখলে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডের রেখা খুঁজে পাওয়া যাবে না, বরং ইসরাইলের মানচিত্র রেখা বোল্ড করে লেখা আছে। অথচ এখান থেকে সত্তর আশি বৎসর পূর্বে ইসরাইলের নাম পৃথিবীর মানচিত্র ছিলো না। সুতরাং এটাই হলো ইতিহাসের সব থেকে বড়ো জুলুম ও অত্যাচার। কিন্তু তাঁর থেকেও অতিদুঃখের বিষয় এখনো মুসলিম বিশ্ব ঘুমিয়ে আছে ফিলিস্তিনী মুসলমানদের উপর জুলুম অত্যাচার হয়েও  যাচ্ছে, তাঁর পরেও কোন প্রতিবাদ করছে না।

      আপনারা হয়তো প্রশ্ন করবেন
ফিলিস্তিনের এই রকম মর্মান্তিক অবস্থা কীভাবে ঘটলো?এর উত্তর খুঁজতে গেলে কিছু ইতিহাসের পাতা উল্টাতে হবে।রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের যুগ  থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের অনেক ইতিহাস আছে। কিন্তু সেই ইতিহাস ছেড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে ঘটনা ঘটেছে সেগুলো পড়লে বাস্তবটা জানা যাবে।
      ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্যে আরব, ইহুদী,খৃষ্টান, মুসলমান ও অন্যান্যরাও বসবাস করতো। কিন্তু কিছু অর্থশালী ও প্রভাবশালী ইহুদী, যারা ইউরোপ মহাদেশ ও অন্যান্য দেশে নির্যাতিত হয়ে ছিলো এবং যারা ফিলিস্তিনের ইহুদী তাঁরা সম্মিলিত ভাবে, ঐ সময়ের প্রভাবশালী দেশ গুলোর নিকট আলাদা একটি রাষ্ট্রের আবেদন করছিল।তারা তাদের জন্য একটি ইহুদী দেশের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আর্জি জানায় ,যাতে যেখানে তারা সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারে। এই নিয়ে International meeting হলো, সেখানে বিশেষ ভাবে আমেরিকা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স,রাশিয়া, ইতালি ও আরো বিভিন্ন দেশ মিলে ফিলিস্তিনের কিছু অংশকে ইহুদী দেশ ঘোষণা করলেন। কিন্তু মুসলমান দেশগুলো কোনোরূপ  প্রতিবাদ করলো না।
       তার পর থেকে প্রভাবশালী ও অর্থশালী ইহুদীরা বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদি দের ফিলিস্তিনে আগমণ ঘটাতে লাগল‌ । তাঁরা আসতে না আসতেই মুসলমানদের জমি জায়গা ঘরবাড়ী বিক্রয় না করলেও জোরপূর্বক ভাবে ও জুলুম- অত্যাচারের দ্বারা মুসলমানদের নিকট থেকে দখল করে নিতে থাকে।সেই ক্ষেত্রে মুসলমানরা অভিযোগ এবং প্রতিবাদ করলে তাঁদেরকে অন্যায় ভাবে জেল-কোট আদালত করে বিভিন্ন ধরণের শাস্তি দেওয়া হতো, এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্যায় ভাবে মুসলমানদের নির্বাসন করা হতো। এ ভাবেই মুসলমানদের জমি জায়গা ইহুদীরা দখল করতে থাকল।এই দখলদারিত্বের ফলেই ফিলিস্তিনের বেশিরভাগ ভূমি আজ ইসরাইল গ্রাস করে নিয়েছে। এভাবেই তৈরি হয়েছে ফিলিস্তিন সংকট‌।

_________________________________________

ফিলিস্তিন ও ঈমান
✍️ সুজা উদ্দিন মাশহাদী

قال رسول الله صلی الله علیه و آله و سلم "حب الوطن ایمان"
অর্থাৎ জন্মভূমির প্রতি প্রেম ঈমানের অঙ্গ"। এই কথাটির মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, নিজের দেশকে ভালোবাসা একজন মুসলমানের ঈমান বা বিশ্বাসেরই অংশ। ইসলাম শুধুমাত্র নামায, রোযার ধর্ম নয়, বরং ন্যায়নীতি, দায়িত্ববোধ,দেশপ্রেমও শেখায়।

জন্মভূমির প্রতি প্রেম ইসলামে: ...
পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজের জন্মভূমি মক্কাকে অনেক ভালোবাসতেন। হিজরতের সময় তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “হে মক্কা! তুমি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়, যদি আমাকে এখান থেকে বের না করে দেওয়া হতো, আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।”

একজন মুসলমানের দায়িত্ব:....
একজন মুসলমানের উচিত তার দেশকে ভালোবাসা, দেশের সেবা করা এবং সৎ নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। দেশকে দুনিয়াবী ও আখিরাতের শান্তির পথ দেখানোও ইসলামি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
* মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য হলো ফিলিস্তিনি জনগণকে সমর্থন করা, তাদের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের মুক্তির জন্য যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালানো। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সমস্যা নয়, বরং ঈমানের কর্তব্য। সিরাজুল হক বলেন: "ফিলিস্তিনিদের সাফল্য সমগ্র জাতির সাফল্য, ফিলিস্তিনিদের পরাজয় হবে ইহুদি ও ইহুদিবাদীদের সাফল্য।"

ফিলিস্তিন এবং ঈমান : এক ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে:....
ফিলিস্তিনের সমস্যা কেবল একটি ভৌগোলিক বিরোধ নয়, বরং এটি বিশ্বাস, বিশ্বাস এবং আদর্শের সমস্যা। এই বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় এবং নৈতিক দায়িত্বের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ইতিহাসে ফিলিস্তিনের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং একে সমর্থন করা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য।

ইসলামী শিক্ষায় ফিলিস্তিনের গুরুত্ব:.....
  ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদকে মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম উপাসনালয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফিলিস্তিন সমস্যা ঈমানের অংশ:.... 
ইমাম সাইয়্যেদ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেইনী (রহ.) বলেছেন: "ফিলিস্তিনের বিষয়টি আমাদের জন্য কোনও কৌশলগত বিষয় নয়, বরং এটি বিশ্বাসের বিষয়, হৃদয়ের বিষয়, ঈমানের বিষয়।" [১] 
একইভাবে, ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বলেছেন: "যদি ইসলামী বিশ্বে ঐক্য থাকত, তাহলে মুসলিম উম্মাহ এত সমস্যায় পড়ত না। ফিলিস্তিন ইস্যু ইসলামী বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা।" [২]

ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রাম:.....
ফিলিস্তিনি জনগণ গত কয়েক দশক ধরে তাদের ভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সংগ্রাম করে আসছে। তাদের সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক কর্তব্যও বটে। হাফিজ সাদ হুসেন রিজভী বলেন: "ফিলিস্তিন কেবল ফিলিস্তিনিদের সমস্যা নয়, বরং বিশ্বাস, আদর্শ এবং বিশ্বাসের সমস্যা।" 

উপসংহার:....
নিজের দেশকে ভালোবাসা কেবল আবেগ নয়, এটি ঈমানের পরিচয়। তাই আমাদের সবাইকে দেশকে ভালোবাসতে হবে, দেশের জন্য সৎভাবে কাজ করতে হবে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে।
ফিলিস্তিন ইস্যু মুসলিম উম্মাহর একটি জটিল সমস্যা। এটিকে সমর্থন করা প্রতিটি মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য। আমাদের প্রার্থনা, আর্থিক সাহায্য এবং রাজনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রামকে সমর্থন করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের এই দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করুন।
__________________________________________

 বাইতুল মুকাদ্দাস: মুসলমান দের প্রথম কেবলা 
✍️  মজিদুল ইসলাম শাহ

মুসলিম জাতিসমূহের ঐক্যের অর্থ হলো-ইসলামী বিশ্বের সমস্যাগুলোতে একসাথে এগিয়ে আসা এবং পরস্পরকে  সহযোগিতা করা।
ফিলিস্তিনের মুক্তি ও দখলদারদের কবল থেকে প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস উদ্ধারের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা আজ পুনরায় বিক্ষোভে মুখরিত। তারা মানবাধিকারের দাবিদার ও মানবতাবাদীদের আহ্বান জানাচ্ছে নবীদের পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করার, নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের উপর জায়োনিস্টদের বর্বরতা বন্ধ করার। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিবছর পালিত বিশ্ব কুদস দিবস সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী জাতিসমূহ ও মুসলিম উম্মাহর আবেগের প্রতীক। এটি সেই দিন, যখন মুসলিম উম্মাহ ও মানবতাবাদী মানুষ জালিম জায়োনিস্ট শাসনের দখলদারিত্ব, অপরাধ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এককণ্ঠে ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচার ও মুক্তির দাবি তোলে। এটি ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ দিন নয়, বরং বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার-যারা অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পতাকা উঁচু রেখেছে।
     'কুদস দিবস' বাইতুল মুকাদ্দাসের মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক দিবস, যা ইসলামী বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত। ইমাম খোমেইনি (রহ.)-এর নির্দেশে এ দিবস পালিত হয়। এটি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যেখানে দখলদার জায়োনিস্ট শাসন ও তাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন জানানো হয়।  
    ১৯৪৮ সালে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ মুসলমানদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাসকে তার বাসিন্দাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। জায়োনিস্ট শাসনের এই অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের মুসলমানরা শুরু থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, যা আজও প্রবলভাবে চলছে। ইসলামী বিপ্লবের সফলতার পর ইমাম খোমেইনি বাইতুল মুকাদ্দাসকে দখলদারদের কবল থেকে মুক্ত করতে রমজানের শেষ শুক্রবারকে 'কুদস দিবস' হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি তার বার্তায় বলেন, "বিশ্বের সকল মুসলমান ও ইসলামী সরকার এই দখলদার ও তাদের সমর্থকদের মোকাবিলা করবে।" বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতার এই বার্তা নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়েছিল। ইমাম খোমেইনির মতে, কুদস দিবস হলো বৈশ্বিক দিন-যা মজলুম ও মুস্তাকবিরদের মধ্যে সংঘাতের প্রতীক।  
এটি সেই সব জাতির প্রতিরোধের দিন, যারা সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও পশ্চিমা শোষণের শিকার। কুদস দিবস প্রতিরোধ অক্ষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ফিলিস্তিনি সংগ্রামের প্রতি সমর্থনকে শক্তিশালী করে। এই দিনে মুজাহিদরা ফিলিস্তিনের প্রতিরক্ষায় তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। এবারের কুদস দিবস এমন এক সময়ে পালিত হয়েছে, যখন দখলদার জায়োনিস্ট সরকার পুনরায় তার বর্বর চেহারা উন্মোচন করেছে-গাজার নিরস্ত্র ও নির্যাতিত মানুষদের বোমাবর্ষণ, অবরোধ ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। গাজার বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুত হওয়া, ধ্বংসযজ্ঞ ও নিরীহ ফিলিস্তিনি শিশুদের শাহাদতের মর্মান্তিক দৃশ্য আজ বিশ্বের চোখের সামনে। মানবাধিকারের দাবিদার ও শিশুহন্তা আগ্রাসী সরকারের সমর্থকদের জন্য এটি লজ্জার দলিল। কুদস দিবস মূলত দখলদার জায়োনিস্ট শাসন ও আমেরিকার জন্যও একটি বার্তা।

      প্রথম কিবলার পবিত্রতা তার নামেই সুস্পষ্ট। এর মর্যাদার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে এটি মুসলিম বিশ্বের প্রথম কিবলা। এই পবিত্র গৃহের দিকে ফিরে প্রথম মুমিনরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইমামতিতে নামাজ আদায় করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় নবীকে মিরাজে নেওয়ার জন্য এই পবিত্র স্থানকেই বেছে নিয়েছিলেন। খোদার বিশেষ ব্যক্তিত্বরা, বিশেষত নবীরা, এই স্থান জিয়ারতকে গৌরবের বিষয় মনে করতেন। বাইতুল মুকাদ্দাস হলো তাওহিদবাদী প্রথম সিজদাকারীদের কেন্দ্র, যাদের সিজদা মানবতাকে হাজারো শিরক থেকে মুক্ত করেছিল। আজ সেই প্রথম কিবলা আমেরিকার পুতুল, ইসলাম বিরোধী, মানবতা বিরোধী, জালিম ও দখলদার ইসরাইলের পদদলিত ।এই ভূমি মুসলিম বিশ্বের কাছে নিজের মুক্তির আকুতি জানাচ্ছে।

   ১৯৯২ সালে তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী রাবিনের বক্তব্য:
"প্রতিটি ইহুদি, ধার্মিক হোক বা ধর্মনিরপেক্ষ, এই শপথ করে: হে জেরুজালেম! আমি যদি তোমাকে ভুলে যাই, তবে আমার ডান হাত শুকিয়ে যাক।" জায়োনিস্টরা কেবল বাক্যবাগীশতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি (তথাকথিত ইসলামী শাসকদের মতো), বরং এই লক্ষ্যে নৃশংস ও নির্মম পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা সকল প্রকার কৌশল, ধোঁকা ও প্রতারণা প্রয়োগ করেছে-ফিলিস্তিনি মুসলমানদের উচ্ছেদ করে ইহুদিদের ব্যাপকভাবে বসতি স্থাপন করেছে। বারবার শহরের ইসলামী প্রতীক ও নিদর্শন মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে,  মসজিদুল আকসায় অগ্নিসংযোগ করেছে, পবিত্র স্থানগুলিকে অপমানিত করেছে।বারবার ফিলিস্তিনি নামাজিদের রক্তে আকসার মেঝে রঞ্জিত করেছে। মসজিদুল আকসার দেয়াল আজও নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের করুণ অবস্থার সাক্ষী। অথচ তথাকথিত মুসলিম সরকারগুলোর নেতারা তাদের বিলাসবহুল প্রাসাদে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে আছেন।

আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অপমান ও মুসলিম বিশ্বের দুর্বলতা:
আল্লাহর এই সকল নিদর্শন শত্রুদের দখলে থাকা এবং তাদের দৈনিক অপমান মুসলিম উম্মাহর অসহায়ত্ব ও পরাধীনতার জ্বলন্ত প্রমাণ। মসজিদুল আকসা উদ্ধারের বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা মাজহাবের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির সাথে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে সকল মুসলমানের দায়িত্ব ছিল—কাবা শরীফের প্রতি বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের যে আধ্যাত্মিক শ্রদ্ধা ও আবেগ রয়েছে, সেই একই মর্যাদা প্রথম কিবলার জন্যও নিশ্চিত করা। তাহলে কেন এই প্রশ্নগুলো একজন সচেতন মুসলমানের হৃদয়ে অশান্তি সৃষ্টি করবে না?  
- বিশ্বব্যাপী কেন বাইতুল মুকাদ্দাসকে জায়োনিবাদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য কোনো সংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠছে না?  
- কেন এই ইস্যুকে বিস্মৃতির গহ্বরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে?  
বিশ্ব কুদস দিবসের তাৎপর্য:
বিশ্ব কুদস দিবস মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি লক্ষ্য ও স্লোগানের অধীনে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের শক্তিকে একত্রিত করার দিন, সকল মুসলিম দেশ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির দিন। এটি ইসলামের দিন, মানবতার দিন, বিপ্লবের দিন।  

ঐক্যের প্রকৃত অর্থ:
- ঐক্য অর্থ বিভিন্ন ইসলামী মাজহাবের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংঘাত এড়ানো।  
- মুসলিম ঐক্য বলতে বোঝায়: একে অপরের অস্তিত্বকে অস্বীকার না করা, শত্রুর পক্ষে সহযোগিতা না করা, এবং পরস্পরের উপর জুলুম করা থেকে বিরত থাকা।  
- মুসলিম জাতিসমূহের ঐক্য অর্থ—ইসলামী বিশ্বের সমস্যাগুলোতে একসাথে এগিয়ে আসা, পরস্পরের সম্পদকে শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা।  
ঐক্য বাস্তবায়নের পথ:

১. বহুমুখী সহযোগিতা: বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাধারা, যাদের মধ্যে উপ-মাজহাবও রয়েছে, তাদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রকৃত সহযোগিতা ও ঐক্য বজায় রাখতে হবে।  
২. মাজহাবিক সান্নিধ্য: বিভিন্ন মাজহাব নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য কমিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করবে। ফিকহি ও আকিদাগত মিলের জায়গাগুলো চিহ্নিত করবে। আলেমদের ফতোয়া পুনর্বিবেচনা করে সামঞ্জস্য আনা যেতে পারে।  
3. মুসলিম শক্তির উৎস: মুসলিম দেশগুলো যদি হাত মিলায়, তবে এমন শক্তি তৈরি হবে যা শত্রুরা মোকাবেলা করতে পারবে না। মতপার্থক্য থাকলেও শত্রুর দোসর না হয়ে যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে ইসলামী বিশ্বের বিজয় অনিবার্য।  

চূড়ান্ত বার্তা:

যে সকল জাতি সংগ্রামের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে, তাদেরকে এই পথে অটল থাকতে হবে। আমেরিকা বা তার মতো কোনো শক্তি তখন তাদের উপর জুলুম চালাতে পারবে না। বিজয় হবে তাদের নিয়তি। ইসলামী বিশ্বকে যদি বিজয়ের পথে এগিয়ে যেতে হয়, তবে ঐক্য প্রতিষ্ঠা-এটিই প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।

__________________________________________

বারুদের দেশে শৈশব হারিয়ে যায়
            ✍️ মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

"আম্মু, আমি কি আজ রাতে ঘুমাতে পারব?
আমার ছোট ভাইটাকে তো বোমা নিয়ে গেল...
তোমার কোলে এখন আর গন্ধ নেই দুধের,
শুধু আছে বারুদের ঝাঁজ।"
--- এই পঙ্‌ক্তিগুলো কোনো কবিতা নয়,
এ এক ফিলিস্তিনী শিশুর রক্তমাখা বাস্তবতা।


 ভূমিকা

বিশ্ব আজ এক অন্ধকার সময় অতিক্রম করছে,
আর এই আঁধারের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ফিলিস্তিন।
বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র ভূমি আজ পরিণত হয়েছে রক্তের নদী, বারুদের গন্ধে ভারী বাতাসে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে শত শত নিরীহ জীবন।
শিশুরা হারাচ্ছে শৈশব, মায়েরা সন্তান, আর প্রতিটি ঘুম ভেঙে যাচ্ছে বোমার বিকট শব্দে।

এই নিষ্ঠুর সময়েই আমাদের অন্তর চেয়ে থাকে সেই প্রতিশ্রুত মহামানবের দিকে—
ইমাম মাহদী (আ.ফা.), যিনি আল্লাহর আদেশে পৃথিবীকে ন্যায়ের আলোয় আলোকিত করবেন।

 ফিলিস্তিন: অব্যাহত দুর্দশার করুণ ইতিহাস

ফিলিস্তিনের ট্র্যাজেডি কেবল একটি ভৌগোলিক সংঘর্ষ নয়, এটা এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়।
শিশুদের লাশ, বিধ্বস্ত ঘর, রক্তাক্ত হাসপাতাল আর ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ—
এসব যেন আসমানের নিচে ব্যক্ত এবং প্রকম্পিত এক আর্তনাদ।

বিশ্ব যেখানে নির্বিকার দর্শক,
সেখানে ফিলিস্তিনিরা আল্লাহর সামনে হাত তুলে বলে— "হে প্রভু, অন্তত এই রাতটা যেন শান্তিতে কাটে!" কিন্তু আকাশ থেকে নেমে আসে আগুনের বৃষ্টি।

ছোট্ট আয়েশা, রাহিল বা ফাতিমা—
যারা খেলনার বদলে পেয়েছে ধ্বংসস্তূপের মাঝে অনন্ত নীরবতা। তারা কারো কাছে কিছুই চায়নি—
শুধু একটি শান্ত ঘুম, একটি সূর্যভোর।

 ইমামে জামান (আ.ফা.): আশার আলো
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)—
আল্লাহর সেই প্রতিনিধি, যিনি অবিচারের মূলোৎপাটন করবেন, যিনি পৃথিবীকে ন্যায়ের রাজ্যরূপে গড়ে তুলবেন।

 হাদীসের ভাষায়:

“তিনি পৃথিবীকে ন্যায়ে পূর্ণ করবেন, যেভাবে তা জুলুমে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।” — (সহীহ মুসলিম)

ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের সমস্ত নিপীড়িত হৃদয় আজ চেয়ে আছে তাঁর আগমনের দিকে, বিশ্বাস করে— একদিন এই অন্ধকার রাত ভাঙবে,
আর মুক্তির সূর্য উঠবে মাহদী (আ.ফা.)-এর হাতে।

 আমাদের গাফিলতি

যখন একটি শিশু তার ভাইকে হারায় বোমার আঘাতে, আর একটি মা নিঃশেষ হৃদয়ে সন্তানের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে, তখন যেন গোটা মানবতা কাঁদে। তবু আমাদের অনেকের কাছে তা কেবল সংবাদের শিরোনাম।

রাহিলের রক্ত মাটিতে শুকায়,
আর আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলফি পোস্ট করি। গাজার আকাশে যখন আগুনের ঝড় বয়ে যায়, তখন আমরা আলোকসজ্জায় মগ্ন থাকি।
এই নির্লজ্জ গাফিলতিই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

        আমাদের দায়িত্ব

ইমামের আগমনের প্রতীক্ষা শুধু মুখে নয়—
তা হতে হবে কর্মে, হৃদয়ে, চরিত্রে।

 আমাদের যা করণীয় :

• ❌ জালিম রাষ্ট্র ও তাদের পণ্য বর্জন
• 💰 নিঃস্বার্থভাবে ফিলিস্তিনিদের সাহায্য
• 📢 জনমত গঠনে সোচ্চার ভূমিকা
• 🤲 শহীদদের জন্য অন্তর থেকে দোয়া
• 🧠 আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতা লালন
• ⏳ ইমামের সৈনিক হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি


                  উপসংহার

একটি ফিলিস্তিনী শিশু যদি জিজ্ঞেস করে—
 "আপনি কী আমাদের পাশে ছিলেন?"
আপনার উত্তর কী হবে?

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন—
“অবিচারের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানেই অত্যাচারীর পক্ষে দাঁড়ানো।”

আমরা কী নীরব থাকব, না কি দাঁড়াবো নিপীড়িতদের পাশে?

আজকের এই অন্ধকার সময়ের শেষে
আমরা আশাবাদী—
আসবেন সেই মাহদী (আ.ফা.),
যিনি মুছে দেবেন জুলুমের প্রতিটি দাগ।

আসুন, তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য
নিজেদের হৃদয় প্রস্তুত করি—
আর ফিলিস্তিনের জন্য প্রার্থনা করি এই অটুট বিশ্বাসে: "ইন্নাল্লাহা মাআস্সাবিরীন।"
(নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।)


 ইয়া সাহিবাজ্জামান, আগিসনি!
 ইয়া সাহিবাজ্জামান, আদরিকনি!
(হে যুগের ইমাম, আমাদের সাহায্য করুন! হে যুগের ইমাম, আমাদের উদ্ধার করুন!)

__________________________________________

ফিলিস্তিন সমস্যা:ইমাম মাহদী আঃ এর আবির্ভাবের পটভূমি 
        ✍️ রাজা আলী

একবিংশ শতাব্দীর এক ক্রান্তিলগ্ন আমরা অতিবাহিত করছি। জালিম ও জুলুমের একচ্ছত্র দাপাদাপি সময়কে করে তুলেছে বিষাক্ত। অসহায় মানুষের আর্তি ও আর্তনাদ কাঁদাচ্ছে বিবেকী সকল হৃদয়কে। নির্বিচারে হত্যা,রক্ত আর কান্নায় প্রতিটি সকাল বিষন্ন হয়ে উঠছে।মানবতা আজ মুখ লুকিয়েছে।আর হিংস্রতা প্রবল বৃদ্ধি পেয়ে মানব সভ্যতাকে গ্রাস করে চলেছে।
      বর্তমান যে পরিস্থিতি আমরা অতিবাহিত করছি,তা কোরান ও হাদিসের সঙ্গে সংঘর্ষিক কোনো বিষয় নয়। বরং কোরান ও হাদিসের ভাষ্যে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথাই ছিল। বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পরিবর্তিত বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহ রব্বুল আলামীন একজন মহামানব, মহাকালের ত্রাণকর্তা কে পাঠাবেন। তিনি আল কোরানে ঘোষণা করেছেন-"অবশ্য ই এই জমিনকে নতুন জীবন দেওয়া হবে ,যখন তার মৃত্যু হয়ে যাবে"। (সুরা হাদীদ,১৭ নং আয়াত)

এই আয়াতটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় ,যখন অত্যাচারি দের জুলুমের  দ্বারা এই জমিনের মৃত্যু ঘটবে,তখন ই আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর নির্বাচিত এক প্রতিনিধির দ্বারা এই জমিনকে নতুন করে জীবন দান করবেন, আর্থাৎ জমিনের ওপর শান্তি ও সুস্থতা প্রদান করবেন।
      ইতিহাসের বহু গভীরে প্রোথিত ফিলিস্তিন সমস্যা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিটোল স্বার্থ,আর জায়নবাদী দের সম্প্রসারণ নীতি যখন একত্রে মিশেছে,তখন ই ফিলিস্তিনিরা মাতৃভূমি র অধিকার হারাতে বসেছে।ফলে প্রতিরোধের শক্ত প্রাচীর ই হয়ে ওঠে একমাত্র বেঁচে থাকার উপায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিনের উপর দীর্ঘদিন ধরে অবিচার ও অত্যাচার করে এসেছে।আর আল আকসা অভিযানের পর প্রায় গত দেড় বছরে ইসরাইল গাজা ভূখণ্ডের উপর যে বোমা ও বারুদের ব্যবহার করেছে,তা অবর্ণনীয়। বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখিত যে, ইসরাইল গাজা ভূখণ্ডে হিরোসিমা বা নাগাসাকির থেকেও কয়েকগুণ বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে।ফলে গাজা মূলত হয়ে উঠেছে বসবাসের অযোগ্য। সীমান্তে খাদ্যের ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলেও তা গাজা র ক্ষুধা পীড়িত মানুষদের কাছে অনেকটা মরীচিকার মতোই।গাজাবাসী একাধিক বার হয়েছে বাস্তুচ্যুত।নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই,যা আছে তা হলো বোমা ও  বারুদের গন্ধ এবং অঢেল যন্ত্রণা।রাফাহ সহ বেশিরভাগ গাজা শেষ, ধ্বংস স্তূপ;অধিকাংশ বাড়ি ও বিল্ডিং আজ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ফিলিস্তিনের পবিত্র জমিন এর পরেও কি জীবন্ত আছে?এই জমিন  মানুষের আশা-ভরসা ও সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার কি দিশা দেখাতে পারছে? ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমির জীবন-শিরা কি কাঁটা পড়ে নি?
       ইতিপূর্বেও অন্তত দুবার জমিনের উপর প্রবল অত্যাচার হয়েছে। জমিনের জীবন কে হত্যা করা হয়েছে। যথা ---
১.যখন জানাবে ইয়াহইয়া নবীকে হত্যা করা হয়,
২.যখন কারবালাতে ৬১ হিজরী তে আলি আসগারকে শহিদ করা হয়। 

উল্লেখিত মর্মান্তিক দুটি ঘটনার পরপর ই আমরা আল আকসা অভিযানের পরবর্তী গাজার ধ্বংস যজ্ঞ, বিশেষ করে নারী ও শিশু হত্যার কথা বলতে পারি।এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা কারবালা র ঘটনা পরবর্তী সময়ে সম্ভবত অদ্বিতীয় এবং বিরল।
         গাজা ভূমিতে যে অবর্ণনীয় ধ্বংস যজ্ঞ চলছে,তাতে বিবেকী মানুষ শিউরে উঠছে। মানুষের বাসস্থান নেই,খাদ্য নেই, পিতার সম্মুখে সন্তানের মৃত্যু বা সন্তানের সম্মুখে পিতার।আশ্রয় কেন্দ্র, স্কুল বা হসপিটাল কোনো কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না।অথচ তথাকথিত মানবতার ধ্বজাধারী দেশগুলো নিশ্চুপ। বরং তাদের প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য মদত ও সহযোগিতায় গাজাবাসী র উপর নিদারুণ এই অত্যাচার নেমে এসেছে।আর হাদিসেও এসেছে "পৃথিবী যখন অন্যায় ও অবিচারে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে,তখনই  ইমাম আঃ আর্বিভূত হবেন"। তাই ফিলিস্তিন সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, নিদারুণ অত্যাচারের বহিঃপ্রকাশে তা হাদিসের ভাষ্যকেই সত্যায়িত করে এবং ইমাম মাহদী আঃ এর আবির্ভাবের পটভূমি তৈরি করে
 তাঁর আবির্ভাব কে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।

__________________________________________

ইমাম আঃ এর আবির্ভাব: শান্তির জগৎ (অনুবাদ)
   ✍️ মাওলানা কাজিম আলি

পৃথিবীর সমস্ত অন্যায় ও জুলুম একদিন শেষ হবে।যখন জুলুম ও অত্যাচারের সমস্ত কারণ ধ্বংস হয়ে ফিতনা ফাসাদের প্রবাহ শুষ্ক হবে, হত্যা-অত্যাচার-অবিচারের শিকড় কাটা পড়বে, তখন সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি ও সুস্থতা বিরাজ করবে।এই এই শান্তি -সুস্থতা ও সুস্থিতির প্রধান কারিগর হলেন ইমাম মাহদী আঃ।তার আবির্ভাব এবং শাসনকাল হলো শান্তি ও স্বস্তি র পর্ব।হজরত ইমাম মোহাম্মাদ বাক্বের (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “ঐ যুগে একজন বুড়ি পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সফর করবে, তাকে কেউ কষ্ট দেবে না”।
(মুনতাখাবুল আছার, পৃঃ ৩৭৯)।

        মাহ্দী (আঃ)-এর যুগ সম্পর্কে রাসুলে খোদা (সাঃ) এরশাদ করেছেন: 'মাহ্দীর যুগে
নেয়ামত অধিক হবে, বৃষ্টি বর্ষণের ফলে জমি সবুজ ফসলে পূর্ণ হবে, মানুষের অন্তর হিংসা থেকে মুক্ত হবে, হিংস্র জন্তু-জানোয়ার শান্ত হবে। একজন মহিলা ইরাক ও সিরিয়ার মাঝে সফর করবে, সে তার সমস্ত সাজের গহনা পরিধান করবে; কিন্তু কোন ব্যক্তি তাকে বিঘ্ন ঘটাবে না'। (মোজাল্লে ইনতেজার, সংখ্যা ১৪ পৃ-২০৫)।

      আর হজরত আলী (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে: মাহ্দী তাঁর প্রতিনিধিদেরকে প্রত্যেক
শহরে পাঠাবেন, যাতে করে সকল মানুষ ইনসাফ ও ন্যায় বিচার পেতে পারে। ঐ সময় হিংস্র জন্তু, নিরীহ ছাগল একই সঙ্গে বিচরণ করবে। শিশুরা 'বিছে'র সঙ্গে খেলা করবে, কুকর্ম ধ্বংস হবে, সুকর্ম তার স্থান নেবে, মদ-সুদ সব শেষ হয়ে যাবে, মানুষ আল্লাহর এবাদাতের দিকে অটল থাকবে এবং ক্রমে দ্বীনের দিকে আরও অগ্রসর হবে। নামাজে জামায়াতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হবে (নামাজিদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে)। মানুষের বয়স বৃদ্ধি হবে এবং আমানত ফেরত পাবে, গাছ ফলে পরিপূর্ণ থাকবে এবং বরকত অধিক হবে। কুকর্ম ধ্বংস হবে, আর নেক কর্ম বজায় থাকবে। আবোয়েতের কোন শত্রু বাকি থাকবে না। (মোজাল্লে ইনতেজার, সংখ্যা ১৪, পৃ ২০৫)।

     এই হল হজরত ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ন্যায় বিচার ও ইনসাফী শাসনের এক নজির। যদি আমরা নিজেদের চোখের সামনে মেহদী (আঃ)-এর শাসনকে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্য-কর্তব্য ইমাম জহুরের জন্য বেশি থেকে বেশি দোয়া করা, আর নিজেদের চরিত্রকে সংশোধন করে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।
__________________________________________------------------------------------------------

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
 
                      
     শুক্রবারের উষালগ্নে
        ✍️মো: মুন্তাজির হোসেন গাজী

আরিজার পাতা ফুরিয়েছে
আপনার কথা লিখিতে লিখিতে,
অন্বেষণ করিতেছি আপনাকে 
আজও অলিতে গলিতে।।
               ❤️
না জানি কোথায় পড়িয়াছে
হুজ্জাতের পদধূলিকনা,
যদি হইতো নেত্রপাত
চুম্বন করিতাম মাটিখানা।।
               ❤️
প্রহর গণনা করিতেছি আজও
জ্যোতির্ময় আননকে দেখার,
এই অভিলাষ কবে ঘুচিবে
বেদনাভরা কোমল হৃদয়ের।।
               ❤️
শুক্রবারে অরুনোদয়ের পৃর্বে
নির্জনে হেঁটেছি আপনাকে খুঁজিতে,
শৈত্য প্রবাহের মধ্যেও থামেনি
বজায় রেখেছি মোর ধারাকে।।
               ❤️
সচেতন মনের অনুশোচনা
রয়ে যাবে সদা,
বহিঃপ্রকাশ করবেন যে দিন
অপসারিত হবে অনুতাপ সদা।।

__________________________________________

গাজা
 ✍️ রাজা আলী

গাজায়,
লাশের উপর লাশ
এত করেও সর্বনাশ
হয় না কি আত্মদংশন
এ কেমন দজ্জার্লী শাসন?

গাজায়,
বাড়ির উপর বাড়ি
ভেঙেছো সারি সারি
এখনো কি জাগেনি বোধ
জেনো  একদিন শোধ।

গাজা,
 আজ মৃতের স্তূপ
পরিজন কাঁদছে খুব
আকাশে,বাতাসে বিষাদ
চোখের জল মানছে না বাঁধ।

গাজা,
দিচ্ছে রক্ত তাজা তাজা
ভিখারী আজ,যারা ছিল রাজা
স্বজন হারানোর বেদনা ও শোক
আবাসিক ভবনের মাঝে মৃত‍্যুর ঝোঁক।
__________________________________________

     রক্তে লেখা আহ্বান
         ✍️মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

ফিলিস্তিনের আকাশে আজ রোদ উঠে না,  
ঘুম পায় না পাথরচাপা শিশুরা—  
ধুলিমাখা চোখে চেয়ে থাকে তারা,  
কে আসবে বাঁচাতে এই হাহাকার ভরা ধরা?

শহীদ হয়ে যায় সকাল, বিকেল, রাত,  
বুলেটের নিচে হারিয়ে যায় নাম না-জানা কথকতা।  
ছিন্ন বস্ত্রে খেলতে যাওয়া শিশুটি,  
হঠাৎই ইতিহাস হয়ে যায়—  
কিন্তু কে লিখে তাদের গাঁথা?

ইমামে জামানা! আপনি কোথায়?  
এই পৃথিবীর বুক জুড়ে জুলুমের মিছিল,  
হৃদয় ক্ষয়ে যায় দোয়া করতে করতে,  
কিন্তু আপনার পদধ্বনি এখনো দূরের গান।

যারা জানে না যুদ্ধের মানে,  
তাদের রক্তে লেখা হচ্ছে মানচিত্র—  
নবজাতকের কান্না যেন আজানের মতো শোনা যায়  
ঘরের ছাদের ধ্বংসাবশেষে।

ইয়াযিদের মুখে আজ নব্য মুখোশ,  
তারা জাতিসংঘ, মিডিয়া, সভ্যতার নাম নেয়।  
কিন্তু মানুষের হাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে  
তারা গড়ে তোলে নয়া সভ্যতার প্রাসাদ।

আমরা কাঁদি ইমাম, আপনার প্রতীক্ষায়।  
আপনার ধীর পদচিহ্নে জমিনে ফুটবে শান্তি।  
আপনার তলোয়ার হবে আলো—  
যা গুটিয়ে দেবে নিপীড়কের ছায়া।

আপনার উত্থান হোক আশার অনুরণন,
ফিলিস্তিন হোক গর্বের স্বাধীন দ্যুতি,  
শোককে শিরস্ত্রাণ করে দাঁড়িয়ে যাক জাতি,  
এই অপেক্ষা হোক শেষ… হে মুক্তির প্রতীক!

------ _____------_____------______------______------

   

Wednesday, April 16, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ) || শাওয়াল সংখ্যা



আরবি: শাওয়াল, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন মন্ডল এবং মুন্তাজির গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা,মিনা খাঁন,উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

বিন আকিল: কুফায় আগমণ ও উদ্দেশ্য

যোগ্য ব্যক্তির সম্মান:কোরান ও হাদীসের আলোকে

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর শিক্ষার বিস্তার

ইমাম আ: এর সাহায্য: শিয়াদের প্রতি (অনুবাদ)

আল্লাহর একত্ব (অহদিয়াত) সম্পর্কে দার্শনিক ও কালামি বিশ্লেষণ

ইরান কেন পরমাণু অস্ত্র বানায় না?
          ✍️  রাজা আলী 

যুবকদের আলোকিত পথ--- আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সিসতানীর (হাফিযাহুল্লাহ) অমূল্য আট উপদেশ।  (অনুবাদ) 
          ✍️ মইনুল হোসেন

ইমামে জামানা (আ.) এর গায়বাত: একটি গভীর বিশ্লেষণ

 মা-বাবা ও শিক্ষকের হক : কুরআন ও রেসালাতুল হুকুক-এর দৃষ্টিতে (অনুবাদ)

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

আগমন কবে হবে?

আল-হুজ্জাতের আহ্বানে

কাসেম সোলাইমানি 
     ✍️ রাজা আলী 


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অশেষ দয়ার বরকতে আল হুজ্জাত পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ)র শাওয়াল সংখ্যা প্রকাশিত হলো। আলহামদুলিল্লাহ, মাহে রমজানের আত্মশুদ্ধির সফর শেষে আমরা শাওয়াল মাসে পদার্পণ করেছি। ঈদের আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের পর এই মাস আমাদের জন্য এক নতুন আত্মজিজ্ঞাসার সময়। রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জিত তাকওয়া ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণাবলি যেন শাওয়াল মাসেও আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হয়।

এই সংখ্যায় তুলে ধরা হয়েছে পবিত্র রবের অস্তিত্ব, ইমাম আঃ দের জীবন অভিজ্ঞান, আত্মশুদ্ধি, সামাজিক বিষয় এবং ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কিত প্রবন্ধ। শিক্ষা যেহেতু চিন্তা ও চেতনার দরজায় প্রতিনিয়ত কড়া নাড়ে, সেকারণেই পাঠকগণ বিচিত্র বিষয়ের উপর পরিবেশিত প্রবন্ধ গুলিতে কিছু চিন্তা র খোরাক পাবেন নিশ্চয়--যা কি না সমাজ পরিবর্তনের ইতিবাচক অভিজ্ঞান হয়ে উঠবে।
                 
                              ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
                                সম্পাদক 
                        আল-হুজ্জাত পত্রিকা
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖


বিন আকিল: কুফায় আগমণ ও উদ্দেশ্য
হযরত আলী (আ.) রাসূলুল্লাহ (স.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন:  
"إِنِّي أُحِبُّ عَقِيلًا لِأَمْرَيْنِ: أَحَدُهُمَا: لِنَفْسِهِ، وَالثَّانِي: لِأَنَّ أَبَا طَالِبٍ كَانَ يُحِبُّهُ".
"আমি আকিলকে দুই কারণে ভালোবাসি। এক, তার নিজের জন্য;দুই, তার পিতা আবু তালিব  তাকে ভালোবাসতেন।"

মুসলিম ইবনে আকিল কে?
  
বনি হাশিমের তরুণদের মধ্যে মুসলিম ইবনে আকিল ছিলেন একজন উজ্জ্বল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। আকিল ছিলেন হযরত আলী (আ.)-এর ভাই এবং আবু তালিবের দ্বিতীয় পুত্র।
মুসলিম ইবনে আকিল ছিলেন আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর ভাইপো এবং হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর চাচাতো ভাই। মুসলিম যে পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন, তা ছিল জ্ঞান, পুণ্য ও মর্যাদার পরিবার। এই পরিবারেই তিনি মানবিক ও ইসলামী গুণাবলী অর্জন করেছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি বনি হাশিমের যুবকদের মধ্যে, বিশেষত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সান্নিধ্যে বড় হয়েছিলেন। তিনি নৈতিক সৌন্দর্য, সাহসিকতা ও ত্যাগের পাঠ শিখেছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, হযরত আলী (আ.)-এর শাসনামলে (৩৬ থেকে ৪০ হিজরি পর্যন্ত) মুসলিম সেনাবাহিনীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যেমন, সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (আ.) সেনাবাহিনীকে সাজানোর সময় ইমাম হাসান, ইমাম হুসাইন, আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ও মুসলিম ইবনে আকিলকে ডান পাশের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।  
মুসলিম ইবনে আকিলের পরিচয় শুধু তার বংশগত নয়, বরং তার চিন্তা, কর্ম ও জীবন দর্শনে। হযরত আলী (আ.)-এর শাসনামলে তিনি সত্যের পক্ষে ছিলেন এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ইমামতের সময়েও তিনি তাদের পাশে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এই পথেই শাহাদাত বরণ করেন। 

মুসলিম ইবনে আকিলের কুফায় আগমন :
 
মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ ক্ষমতায় আসে। সে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং মক্কায় চলে যান।ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কায় অবস্থানকালে কুফাবাসীদের কাছ থেকে অসংখ্য চিঠি পেতে শুরু করেন । চিঠির সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, একে সত্যিকার অর্থে "পত্র-আন্দোলন" বলা যায়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই চিঠির সংখ্যা দাঁড়ায় দিনে গড়ে ৬০০টি, এবং মোট ১২,০০০ চিঠি ইমামের কাছে পৌঁছায়। এমনকি ইতিহাসে এই চিঠির সংখ্যা কিছু কিছু জায়গায় আরো বেশি বলা হয়েছে।

১৫ই রমজান ৬০ হিজরি: হাজার হাজার দাওয়াতপত্র ইমাম হুসাইনের (আ.) হাতে পৌঁছায়।স্বাভাবিকভাবেই, ইমাম হুসাইন (আ.) কুফাবাসীদের আমন্ত্রণের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি সেখানকার জনমত ও তাদের আনুগত্যের মাত্রা যাচাই করার জন্য একটি সঠিক প্রতিবেদনের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় প্রেরণ করেন যাতে তিনি পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ইমামকে অবহিত করতে পারেন। ইমাম কুফাবাসীদের কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন:  "আমি আমার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে তোমাদের কাছে পাঠাচ্ছি, যাতে তিনি তোমাদের মতামত ও অবস্থা সম্পর্কে আমাকে জানাতে পারেন।"

৫ই শাওয়াল ৬০ হিজরি: মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় প্রবেশ করেন। জনগণ তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং তাঁর হাতে বাইয়াত করে।

১১ই জিলকদ ৬০ হিজরি: মুসলিম ইবনে আকিল ইমাম হুসাইন (আ.)-কে কুফার পরিস্থিতি জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন এবং আসার আহ্বান জানান।

মুসলিমের চিঠি:
তিনি জানান কুফাবাসীরা তাঁর আগমনের জন্য প্রস্তুত।

৮ই জিলহজ ৬০ হিজরি:
কুফার একজন প্রবীণ, শ্রদ্ধেয় ও প্রভাবশালী নেতা এবং আহলুল বায়েত (আঃ) এর অনুসারী ও প্রেমিক হানী ইবনে উরওয়াহ্—যিনি মুসলিম ইবনে আকিলকে গোপনে আশ্রয় দিয়ে সহায়তা করছিলেন। তৎকালীন অত্যাচারী শাসক উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্দেশে হানি গ্রেফতার হন এবং নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। মুসলিম ইবনে আকিল প্রায় ৪০০০ জনকে নিয়ে বিদ্রোহ করেন, কিন্তু পরে সবাই তাঁকে ছেড়ে যায়। তিনি একা পড়ে যান এবং তওয়া নামক এক নারীর বাড়িতে আত্মগোপন করেন। ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কায় হজকে ওমরায় পরিবর্তন করে একটি খুতবা দেন এবং ৮২ জন পরিবার ও সঙ্গী নিয়ে কুফার দিকে রওনা দেন।

ইবনে জিয়াদের আগমন:
ইবনে জিয়াদ বাসরার ৫০০ সৈন্য নিয়ে ছদ্মবেশে কুফায় প্রবেশ করেন। মানুষ ভেবেছিল তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)। কিন্তু পরে জানতে পারে সে উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ। কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশীর তাঁকে চিনতে না পেরে প্রথমে বাধা দিলেও পরে তাকে প্রবেশ করতে দেয়।

হানী ইবনে উরওয়াহ্:
মুসলিম বুঝতে পারেন ইবনে জিয়াদ তাঁকে খুঁজবে, তাই তিনি শহরের প্রভাবশালী নেতা হানী ইবনে উরওয়াহর বাড়িতে আশ্রয় নেন। হানী ছিলেন সাহাবী এবং শিয়াদের একজন নেতা।

হানীর গ্রেফতার:
ইবনে জিয়াদ মুসলিমের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরে হানীকে কৌশলে তার দরবারে ডেকে পাঠান। হানী সত্য গোপন করলেও ইবনে জিয়াদের দাস মাকিলের সাক্ষ্যে তা প্রকাশ পায়। ইবনে জিয়াদ হানীকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং বন্দি করে।

তওয়া – এক সাহসী নারী:
মুসলিম, একা ও নিরাশ হয়ে কুফার রাস্তায় ঘুরছিলেন। হঠাৎ তিনি এক নারীকে দেখেন যার নাম ছিল তওয়া। মুসলিম পানি চান এবং নারী তাঁকে পানি দেন। পরে জানতে পেরে যে মুসলিম ইবনে আকিল আশ্রয় চাইছেন, তিনি তাঁকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন।

ইবনে জিয়াদের হুমকি ও প্রতিশ্রুতি:
ইবনে জিয়াদ মসজিদে ঘোষণা দেয়, মুসলিম যার ঘরে থাকবেন আর সে তা জানাবে না, তার জান-মাল হালাল। আর যেই মুসলিমকে ধরিয়ে দেবে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে। তওয়ার ছেলে বেলাল পুরস্কারের লোভে মুসলিমের অবস্থান ফাঁস করে দেয়। ইবনে জিয়াদ ৭০ জন সৈন্যকে মুসলিমকে গ্রেফতার করতে পাঠায়।

৯ই জিলহজ ৬০ হিজরি: মুসলিম ও কুফাবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরে তিনি গ্রেফতার হন এবং কুফার দারুল আমারার ছাদে শহীদ করা হয়।
তাঁর রওজা কুফায় এখনো জিয়ারতের স্থান হিসেবে সমাদৃত।

উপসংহার:
হজরত মুসলিম এর জীবনী থেকে আমাদের জন্য উত্তম শিক্ষা হচ্ছে ,তিনি তার যুগের ইমাম ,ইমাম হুসাইন(আঃ) কে কিভাবে অনুসরণ করেছিলেন এবং ইমামের আদেশে আমল করেছিলেন। সত্যকে অনুসরণ করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।তাই আমাদের উচিত আমাদেরকেও যুগের ইমাম মাহদী (আঃ) কে মুসলিম ইবনে আকিলের মতন অনুসরণ ও অনুকরণ করা ।

__________________________________________

যোগ্য ব্যক্তির সম্মান:কোরান ও হাদীসের আলোকে


 قال على عليه‏ السلام : اَلعِلمُ قاتِلُ الجَهلِ.

জ্ঞান, অজ্ঞতার ধ্বংসকারী।
(গুরারুল হিকাম ও দুররুল কালিম, পৃষ্ঠা ৫৬)

সমাজ হলো এমন একটি ব্যবস্থা  যেখানে একাধিক মানুষ কিছু নিয়ম-নীতির নিরিখে জীবন যাপন করে।সমাজ তখনই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, যখন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়। ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ন্যায়বিচার, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং মানুষের সমানাধিকার প্রদান করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজকের সমাজে অনেকেই অন্যের যোগ্যতা বা বিশেষত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে না। বরং অনেক সময় মানুষ মনে করে, "আমি যা বুঝি, সেটাই ঠিক"—এমন মনোভাব সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।

ইসলাম আমাদের শেখায়, যে ব্যক্তি যে বিষয়ে পারদর্শী, তাকে সেই বিষয়ে মূল্যায়ন করা এবং তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আসুন, কুরআন ও হাদীসের আলোকে এই বিষয়ে গভীর ভাবে আলোচনা করি এবং কিছু বাস্তব ঘটনা তুলে ধরি।

কুরআনের দৃষ্টিতে যোগ্যতার মূল্যায়ন:
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
"যারা জ্ঞানী এবং যারা অজ্ঞ তারা কি সমান হতে পারে?" (সুরা আয-জুমার, ৩৯:৯)

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, জ্ঞানী ও অজ্ঞ কখনো সমান হতে পারে না। একজন আলেম যিনি ধর্মীয় বিষয়ে গভীর ভাবে গবেষণা করেন, একজন চিকিৎসক যিনি মানুষের রোগ নিরাময়ে কাজ করেন, কিংবা একজন প্রকৌশলী যিনি সমাজের অবকাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখেন—তাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান অসামান্য। তাই তাদের উপযুক্ত সম্মান দেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

অপর একটি আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: "আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।"
(সুরা আল-মুজাদিলা, ৫৮:১১)

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, আল্লাহ নিজেই জ্ঞানীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। যদি আল্লাহ তাআলা নিজেই জ্ঞানীদের সম্মানিত করেন, তবে আমাদের সমাজেও তাদের মূল্যায়ন করা উচিত।যেখানে আল্লাহ তাআলা নিজেই জ্ঞানীদের মর্যাদা ও গুরুত্ব দিচ্ছেন সেখানে আমরা আল্লাহর মাখলুক ,তাহলে আমাদের মধ্যে এই বিশেষ গুণটি অভাব কেনো দেখা যাচ্ছে ? আমরা কেনো নিজেদের কে আল্লাহর বাণী ও আদেশ অনুযায়ী গড়তে পারছি না ।

হাদীসের আলোকে যোগ্য ব্যক্তির মর্যাদা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।"

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সমাজে যারা নিজেদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও শ্রম দিয়ে অন্যদের উপকার করে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং সম্মান প্রদর্শন করা ইসলামের শিক্ষা। তাই আমাদের উচিত কুরআনের আয়াত ও হাদীসের বানী অনুযায়ী নিজেদের কে দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন:
 "যখন কোনো কাজের দায়িত্ব যোগ্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে না, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।"

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, যদি সমাজে যোগ্য ব্যক্তিকে তার উপযুক্ত সম্মান ও দায়িত্ব প্রদান না করা হয়, তবে তা সমাজের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।আজ আমাদের সমাজ এই কারণেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামের ইতিহাস থেকে শিক্ষণীয় ঘটনা:

১. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা:
হযরত ইউসুফ (আ.) যখন মিশরের বাদশাহের দরবারে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিলেন, তখন রাজা তার বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতা দেখে বিস্মিত হন। ইউসুফ (আ.) নিজেই বললেন:
 "আমাকে দেশের ভান্ডারের দায়িত্ব দিন, কারণ আমি বিশ্বস্ত ও দক্ষ।"
(সুরা ইউসুফ, ১২:৫৫)

২. ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জ্ঞান ও সম্মান:
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর অসাধারণ জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার কারণে বিভিন্ন যুগের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা তাঁকে সম্মান করতেন।নিম্নের বাণীটি তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

 আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:
"আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (আ.)-এর মতো আর কাউকে জ্ঞান, তাকওয়া এবং মর্যাদায় উন্নত দেখি নি।"

৩. ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর বিনয় ও সম্মান প্রদর্শন:
কুফার দরবারে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) অত্যন্ত মর্যাদার সাথে আহলুল বাইতের পরিচয় দেন। ইয়াজিদের দরবারে সাহাবি যায়েদ ইবনে আরকাম যখন ইমামের বন্দিত্ব দেখলেন, তখন তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ইমামকে সম্মান জানিয়ে বলেন:

"এই মানুষগুলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার। তাদের প্রতি সদয় হও।"
আমাদের বুঝতে হবে ও চিনতে হবে কে জ্ঞানী আর কে মূর্খ। শুধু বুঝলেই হবে না ,বোঝার সঙ্গে সঙ্গে সেই যোগ্য ব্যক্তিকে তার সন্মান ও মর্যাদা দিতে হবে এবং তার কথা মানতে হবে ।
এখানে আমরা দেখতে পাই, ইসলামে নিজ যোগ্যতা প্রকাশ করা এবং উপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজে যোগ্য ব্যক্তিকে অবমূল্যায়নের পরিণতি:
যখন সমাজে যোগ্য ব্যক্তিকে অবমূল্যায়ন করা হয়, তখন এর বহুমুখী ক্ষতি হয়:

১. সামাজিক বিশৃঙ্খলা: যখন অযোগ্যরা নেতৃত্বে আসে, তখন সমাজে অবিচার ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

২. যোগ্যতার অপচয়: যোগ্য ব্যক্তিরা যখন মূল্যায়ন পান না, তখন তাদের প্রতিভা ও দক্ষতা সমাজের উপকারে আসে না।

৩. ইসলামী মূল্যবোধের ক্ষতি: ইসলাম যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে বলে। এই নীতি উপেক্ষা করলে ইসলামী আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উপসংহার:
ইসলাম আমাদের শেখায়, যে ব্যক্তি যে বিষয়ে পারদর্শী, তাকে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্মান দেওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এবং নবী (সা.)-এর হাদীসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, সমাজ তখনই সঠিকভাবে পরিচালিত হবে, যখন যোগ্য ব্যক্তিকে তার মর্যাদা ও দায়িত্ব প্রদান করা হবে।

আমাদের উচিত, সমাজের আলেম, ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলীসহ সকল দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সম্মান ও মূল্যায়ন করা। কারণ, যোগ্য ব্যক্তির প্রতি সম্মান জানানো মানে ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শকে জীবিত রাখা।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যোগ্য ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করার তাওফিক দিন।
__________________________________________

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর শিক্ষার বিস্তার

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) ইসলামের এক মহান ব্যক্তিত্ব এবং এক অন্যতম মনীষী ছিলেন।তিনি ইসলাম, বিশেষ করে শিয়া ইতিকাদ এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) ইসলামী ইতিহাসে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইমাম এবং তিনি বিভিন্ন দিক থেকে শিক্ষার বিস্তার করেছেন।

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর শিক্ষার বিস্তার:

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর জীবন এবং শিক্ষা শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বিজ্ঞান, দর্শন, ফিকহ (আইন), এবং অন্যান্য দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি একটি আলোকিত পথ প্রদর্শক ছিলেন। তাঁর শিক্ষা থেকে বহু বিষয় সংক্রান্ত গভীর জ্ঞান অর্জন করা যায়, যা আজও আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

1. ফিকহ (ইসলামী আইন):
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) ইসলামের আধ্যাত্মিক ও দুনিয়াবি দিকের ব্যাপারে বিশাল জ্ঞান প্রদান করেছেন। তার শিক্ষা অনুসারে, জাফরি ফিকহ (শিয়া মুসলিমদের ফিকহ বা আইন) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বর্তমানে শিয়া মুসলিমদের জন্য অনুসরণযোগ্য আইনি ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। তিনি ইসলামের আইনি বিধানগুলোকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যার মধ্যে পারিবারিক আইন, বাণিজ্যিক আইন, ক্রেডিট, শপিং, প্রতিশ্রুতি, হাদ (অপরাধমূলক শাস্তি) ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

2. বিজ্ঞান ও দর্শন:
 ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করেননি, বরং তাঁর শিক্ষায় বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা এবং দর্শনের বিষয়েও যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। সে সময়ে তিনি ইসলামি সভ্যতায় শীর্ষ স্থানীয় বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) অনেক বৈজ্ঞানিক বিষয় যেমন রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদিতে গভীর জ্ঞান প্রদান করেছেন। এমনকি অনেক বিজ্ঞানি, চিকিৎসক ও দার্শনিক তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে জাবির ইবনু হাইয়ান (একজন বিখ্যাত রসায়নবিদ) অন্যতম।

3. তাওহিদ (আল্লাহর একত্ব):
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) তাওহিদের (আল্লাহর একত্ব) গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও প্রদান করেছেন। তিনি আল্লাহর একত্ব ক্ষমতা,এবং মানুষের সাথে সম্পর্কের মধ্যে গভীর দর্শন উপস্থাপন করেছেন। তিনি মানুষের অন্তর ও আত্মার পরিচ্ছন্নতা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস স্থাপন করার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

4. আধ্যাত্মিক শিক্ষা:
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যও শিক্ষা প্রদান করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত চরিত্র, নৈতিকতা, ধৈর্য, সৎকর্ম ও আত্মসংযমের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তার শিক্ষা ছিল যে, একজন মুসলিমকে শুধু সঠিকভাবে আচার-আচরণ করতে হবে না, বরং তার অন্তরও পবিত্র রাখতে হবে। তিনি মানুষের মধ্যে সহানুভূতি, দয়া, এবং ভালোবাসার চর্চা করতে উৎসাহিত করেছেন।

5. সামাজিক ন্যায় ও শান্তি:
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) তাঁর শিক্ষা ও ধর্মীয় বক্তব্যে সামাজিক ন্যায়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি সমাজে অশান্তি, অবিচার, শোষণ এবং দারিদ্র্য দূর করতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। তিনি সকলের প্রতি সমান অধিকারের ধারণা প্রচার করেছেন এবং মুসলিমদের মধ্যে একতা ও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।

6. আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য:
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) প্রাকৃতিক ঘটনাবলী, পরিস্থিতি, এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার প্রতি আনুগত্যের বিষয়ে গভীর শিক্ষা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছিলেন যে, সমস্ত দুনিয়া আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং মুসলিমদের উচিত যে তারা যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বাস স্থাপন করা।

7. মতবিরোধ ও বিতর্কের প্রতি সহিষ্ণুতা:
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের মতবিরোধ এবং বিতর্কের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছেন। তিনি মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও সমঝোতার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান প্রদান করেছেন। তিনি একে অপরকে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির মাধ্যমে আলোচনা করতে উৎসাহিত করেছিলেন।

 উপসংহার:
 ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর শিক্ষা শুধুমাত্র ইসলামী আইন বা তাওহিদ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মানবতার উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার ওপর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছেন। তাঁর শিক্ষা আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি আলোকিত পথপ্রদর্শক হিসেবে বিদ্যমান এবং তার মহান অবদান শিয়া ইসলামের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
__________________________________________

ইমাম আঃ এর সাহায্য : শীয়াদের প্রতি
      ✍️ (অনুবাদ):  মাওলানা কাজিম আলি

জনাবে আল্লামা শেখ হাসান বিন ইউসুফ বিন আলী বিন মোত্বাহার হিল্লী (রহঃ) একজন উচ্চ পর্যায়ের আলিম ছিলেন। হাদীস, কালামে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তিনি নিজের পিতা, মামা এবং খাজা নাছীরুদ্দিন তুসীর ছাত্র ছিলেন। এগারো বছর বয়সে তিনি মুজতাহীদ হন এবং তার থেকে বেশি বয়সের ছাত্রদের পড়াতেন। একদা শিশু বয়সে কোনো একটা ভুলের কারণে পিতা তাকে তাড়া করেন। ফলে হিল্লী (রহঃ) দৌঁড়াতে থাকেন। তিনি যত দৌঁড়ান, পিতাও ততো দৌঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে ধরা পড়ার ভয়ে হিল্লী (রহঃ) ওয়াজীব সেজদার একটি আয়েত তেলাওয়াত করেন (এই আয়েতটি পাঠ করলে ও শুনলে সেজদা করতে হয়)। আয়েতটি শোনার ফলে হিল্লী (রহঃ)-এর পিতা সেজদাতে চলে যান, আর হিল্লী (রহঃ) দৌঁড়িয়ে আগে চলে যান। তিনি সেজদা করেননি; কেন না তিনি নাবালক ছিলেন। পিতা সেজদা করার পর আবার হিল্লী (রহঃ)-কে ধরার জন্য দৌঁড়াতে থাকেন। হিল্লী (রহঃ) সুযোগ বুঝে পুনরায় আয়েতটি পাঠ করেন। পিতা আবার সেজদায় চলে যান। এবার সেজদা থেকে মাথা তুলে পিতা নিজের সন্তানের এই ধরনের ইসলামিক জ্ঞান ও বুদ্ধিকে দেখে সন্তুষ্ট হন এবং খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। আর আদর করে নিজের সন্তানকে কাছে ডাকেন। আর সন্তানও পিতার আদরের ডাকে সাড়া দেন। শহীদে ছালিছ ক্বাজী নুরুল্লাহ্ শুস্তারী (রহঃ) আল্লামা (রহঃ) সম্পর্কে "মাজালিসুল মোমেনীন” নামক পুস্তকে এবং অন্যান্য ওলামাগণ এই ঘটনা তাঁদের পুস্তকে তুলে ধরেছেন। ঘটনাটি হ'লঃ আল্লামা হিল্লী (রহঃ) একজন জ্ঞানী ব্যক্তির শিক্ষানবিশ ছিলেন। ঐ জ্ঞানী ব্যক্তি অনেক পরিশ্রমে একটি পুস্তক শিয়াদের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। আর সময় ও সুযোগ বুঝে প্রায়ই সেই পুস্তক থেকে মানুষদের শোনাতেন। কিন্তু পুস্তকটির বক্তব্যের প্রতিবাদ যেন কেউ করতে না পারে, সেই জন্য পুস্তকটি কারও হাতে দিতেন না। আল্লামা হিল্লী (রহঃ) ঐ পুস্তকটি হাতে পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করতে থাকেন; কিন্তু বারে বারেই ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত তিনি ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে পুস্তক আদান-প্রদানের একটি কৌশল বার করেন। আর এই আদান-প্রদান মাধ্যমের সাহায্যেই ঐ পুস্তকটি হাতে পান এই শর্ত সাপেক্ষে যে, পুস্তকটি একরাতের বেশি সময় কাছে রাখতে পারবে না। এই একরাত সময়কেই আল্লামা হিল্লী (রহঃ) মূল্যবান মনে করে পুস্তকটি নিয়ে বাড়িতে এসেই কপি করতে শুরু করেন। লিখতে লিখতে অর্ধরাত হয়ে যায় এবং প্রচন্ড ঘুম আসে। আর ঐ সময় এক জন ব্যক্তি এসে বললেন, 'তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, অবশিষ্ট যা আছে আমি লিখছি'। আল্লামা হিল্লী (রহঃ) ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে চোখ খুলে দেখলেন ঐ ব্যক্তি আর সেখানে নেই। অথচ পুস্তকটি সম্পূর্ণ লেখা রয়েছে। পুস্তকটির শেষে কয়েকটি কথা লেখা ছিল। তিনি পড়ে দেখলেন লেখা আছে- "কাতাবাহুল হুজ্জাহ্”; অর্থাৎ এটা মাহ্দী লিখেছেন।

সূত্রঃ 
রওযাতুল জান্নাহ্, খন্ড-২ পৃঃ ২৮২; 
জান্নাতুল মাওয়া-- ঘটনা নং ২২, 
নাজমুছ ছাকিব-- ঘটনা নং ১৫।

           বর্তমান অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

১. আমাদের উচিত নিজের মযহাব কে রক্ষা করার চেষ্টা করা।
২. আমাদের এমন কাজ করা উচিত-যা থেকে ইমাম মাহ্দী (আঃ) সন্তুষ্ট হন।
৩. ইমাম আঃ এর সন্তুষ্টি এমন ভাবে অর্জনের চেষ্টা করতে হবে,যাতে স্বয়ং তিনি আমাদের সাহায্যে আসেন।
__________________________________________

আল্লাহর একত্ব (অহদিয়াত) সম্পর্কে দার্শনিক ও কালামি বিশ্লেষণ

সার সংক্ষেপ:
আল্লাহর একত্ব (তাওহিদ ও অহদিয়াত) ইসলামী দর্শন ও কালামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক (আকলী) ও ঐশী (নাকলী) উভয় ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইসলামী দার্শনিক এবং কালামবিদগণ বিভিন্ন যুক্তি ব্যবহার করে আল্লাহর অদ্বিতীয়তা ও সরল সত্তা (বেসাতাত) প্রমাণ করেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে প্রধান দার্শনিক ও কালামি যুক্তিগুলো পর্যালোচনা করবো।

১. ভূমিকা:

তাওহিদ, অর্থাৎ আল্লাহর একত্ব, ইসলামী বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। এখানে “অহদিয়াত” বলতে বোঝানো হয় যে আল্লাহ এক, সরল, অবিভাজ্য এবং অনন্য। এই ধারণাটি কেবল কুরআন-হাদিসের ভিত্তিতেই নয়, বরং ইসলামী দর্শনেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।এজন্য ফারাবি, ইবনে সিনা, মোল্লা সদরাসহ বিভিন্ন মুসলিম দার্শনিক ও কালামবিদ এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

২. আল্লাহর একত্বের দার্শনিক যুক্তি:

ক) আবশ্যক অস্তিত্বের যুক্তি (ওয়াজিবুল-উজুদ বা সিদ্দীকিনের যুক্তি):

এই যুক্তিটি ইবনে সিনা ও মোল্লা সদরা প্রস্তাব করেন। এটি নিম্নলিখিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে:

আল্লাহ ওয়াজিবুল-উজুদ, অর্থাৎ এমন এক সত্তা যিনি নিজ সত্তা থেকে অস্তিত্বশীল এবং যিনি অস্তিত্বহীন হতে পারেন না।
যদি দুটি ওয়াজিবুল-উজুদ থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে অবশ্যই কোনো পার্থক্য থাকবে।
এই পার্থক্য যদি সত্তাগত (জাতি) হয়, তবে একজন অপরের তুলনায় অসম্পূর্ণ হবে, যা ওয়াজিবুল-উজুদ হতে পারে না।
আর যদি পার্থক্য গুণগত (সিফাতি) হয়, তবে তারা কোনোভাবে যৌগিক হবে, কিন্তু ওয়াজিবুল-উজুদ অবশ্যই সরল (বেসিত) হতে হবে।

তাই, একের অধিক ওয়াজিবুল-উজুদ থাকা সম্ভব নয়, ফলে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়।

খ) সরলতার যুক্তি (বেসাতাতের যুক্তি)

আল্লাহ যদি যৌগিক (মুরাক্কাব) হতেন, তবে তাঁর সত্তা বিভিন্ন অংশের সমষ্টি হতো।
প্রত্যেক যৌগিক সত্তা তার অংশগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়, কিন্তু আল্লাহ কারো ওপর নির্ভরশীল নন।
সুতরাং, আল্লাহ সরল (বেসিত), অংশহীন এবং অনন্য।

গ) একাধিক সৃষ্টিকর্তার অসম্ভবতা:

যদি দুটি স্বাধীন ঈশ্বর থাকত, তবে তাদের ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য থাকতো।
যদি তাদের ইচ্ছা সবসময় এক হয়, তবে দুটি আলাদা সত্তার অস্তিত্ব অর্থহীন।
আর যদি তাদের ইচ্ছা কখনও ভিন্ন হয়, তবে হয় একজন বিজয়ী হবে (অপরজন দুর্বল হবে), অথবা দুজনই ব্যর্থ হবে—এই দুটি ক্ষেত্রেই তারা সর্বশক্তিমান (কাদিরুল-মুতলাক) হতে পারবে না।
কিন্তু যেহেতু আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তাই তিনি অদ্বিতীয়।

৩. আল্লাহর একত্বের কালামি যুক্তি:

ক) “তমানু'” (একাধিক উপাস্যের অসম্ভবতা) যুক্তি:

এই যুক্তি কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের ওপর ভিত্তি করে:
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
"যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।" (সূরা আম্বিয়া: ২২)

এই যুক্তি বোঝার জন্য নিচের ধাপগুলো বিবেচনা করা যায়:

1. যদি একাধিক ইলাহ (উপাস্য) থাকত, তবে তারা সৃষ্টিজগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একমত বা ভিন্নমত হতে পারত।
2. যদি তারা একসঙ্গে একমত হতো, তবে তাদের আলাদা আলাদা ইলাহ হওয়ার কোনো মানে থাকত না।
3. যদি তারা ভিন্নমত হতো, তাহলে দুটি সম্ভাবনা থাকত:

ক। একজন বিজয়ী হতো এবং অন্যজন ব্যর্থ হতো (যা তার অক্ষমতা প্রমাণ করে)।
খ। উভয়েই ব্যর্থ হতো, যা তাদের ঈশ্বরত্বের বিপরীত।

4. যেহেতু বাস্তব জগতে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য রয়েছে, তাই একমাত্র একজন স্রষ্টাই বিদ্যমান।

খ) কালামি দৃষ্টিকোণ থেকে ইলাহের একত্ব:

মুতাযিলা মতবাদ: তাঁরা বলেছে, যদি একাধিক আল্লাহ থাকত, তবে তাদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি হতো, যা সর্বশক্তিমান হওয়ার বিপরীত।

আশআরি মতবাদ: তাঁরা বলেছে, আল্লাহ যদি একাধিক হতেন, তবে একে অপরের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতেন, যা সর্বক্ষমতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

৪. উপসংহার
এই আলোচনার মাধ্যমে বোঝা যায় যে,
দার্শনিক ভাবে, আল্লাহ ওয়াজিবুল-উজুদ, তাই তাঁর একাধিক সত্তা থাকা সম্ভব নয়।
যুক্তিবিদ্যাগত ভাবে, আল্লাহ যদি একাধিক হতেন, তাহলে ক্ষমতার বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো।
কালামি ও কুরআনিকভাবে, আল্লাহর একত্ব স্বতঃসিদ্ধ ও প্রমাণিত।
ফলে, আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়, অংশহীন ও সর্বশক্তিমান—এই সত্য যুক্তি, দর্শন ও ধর্মীয় প্রমাণ দ্বারা নিশ্চিত।

তথ্যসূত্র:
১.ইবনে সিনা, আল-ইশারাত ওয়াত-তানবিহাত,
২.মোল্লা সদরা, আল-হিকমাতুল-মুতাআলিয়াহ
৩.ফখরুদ্দিন রাজী, আল-মাতালিব আল-আলিয়াহ
৪.কুরআন, সূরা আম্বিয়া (২১:২২)
__________________________________________

ইরান কেন পরমাণু অস্ত্র বানায় না?

বর্তমান বিশ্বের সাত আট টি দেশের কাছে পরমাণু বোমা মজুত রয়েছে। অনেক ই মনে করেন যে, পরমাণু বোমা সামরিক শক্তির ভরকেন্দ্র। এবং কোন দেশ পরমাণু বোমা সমৃদ্ধ দেশ হলে অন্যদের কে শঙ্কিত ও সন্ত্রস্ত করে রাখা সম্ভব। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যের মূল সংকট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ইরান যেহেতু সদা তৎপর,তাই ইরানের উচিত দ্রুত পরমাণু বোমা তৈরির কাজ সুসম্পন্ন করা। কিন্তু ইরান পরমাণু বোমা তৈরির বিষয়ে উদাসীনতা করছে কেন?আসুন  এর উত্তর খোঁজা যাক।

পরমাণু বোমা না বানানোর যুক্তি:

ইরান দেশটির কর্মকর্তারা নিজেদেরকে "ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান" বলে (১৯৭৯খ্রিঃ বিপ্লবের পর থেকে) পরিচিত করান। এবং বাস্তবিক ই ইরান ইসলামের যাবতীয় নিয়ম-নীতি মেনেই শাসিত হচ্ছে।এই কারণেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ভয়ঙ্কর ধ্বংস ক্ষমতা সম্পন্ন পারমাণবিক বোমা তৈরি ও ব্যবহার কে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। ইরানে কোনো সময় পর্বের প্রশাসন যদি কোনো পরিস্থিতি র পরিপ্রেক্ষিতে প্রচণ্ড মারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই বোমা হঠকারি সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবহার করে ,তবে ইসলামী নীতি-নিয়ম প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। সুতরাং যা ব্যবহার করা যাবে না,তা তৈরি করার মানে হলো অর্থ অপচয় করা বা তা তৈরি করা এক কথায় নিরর্থক।তাই ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করে না।
       দ্বীনে  ইসলাম একটি সুস্থ, সুন্দর ও সুপরিকল্পিত ধর্ম।এই ধর্মে ধ্বংস নয়,মানবতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।তাই ভয়ঙ্কর মারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পরমাণু বোমা বানানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইরানী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এটাই ইশারা দিয়েছে যে, ইসলাম কখনোই গণহারে হত্যা ও ধ্বংস র কথা বলে না। ইসলাম শান্তির কথা বলে এবং এ এক অনবদ্য শান্তি র ধর্ম। ইরান পরমাণু বোমা বানানো নিষিদ্ধ করে বিশ্বকে আরও একবার এই গভীর বার্তা দিতে চেয়েছেন।

পরমাণু বোমার কার্যকারিতা ও ব্যবহার:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সর্বপ্রথম আমেরিকা পরমাণু বোমা ব্যবহার করে।তারপর থেকে আজ অবধি অসংখ্য যুদ্ধ সংগঠিত হলেও কোনো দেশ ই পরমাণু বোমা ব্যবহার করেনি। বিভিন্ন সময় পরমাণু হামলার হুমকি দিয়েছে মাত্র। বাস্তবতা হলো কোনো দেশ বর্তমান সময়ে নানা পরমাণু বোমা কারণে ব্যবহার করতে পারবে না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায়ের চাপ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও একঘরে হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও যদি এই বোমা ব্যবহার করে তবে ঘরে বাইরে প্রবল চাপ এবং আমেরিকার ভাবমূর্তি এতটাই খারাপ হয়ে পড়বে যে ,তা আর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়( দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা এই বোমা যখন ব্যবহার করে,তখন পরিবেশ ও পটভূমি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল)।

ইরান কি কখনো পরমাণু বোমা বানাবে না:

ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী ইরান কখনো পরমাণু বোমা বানাবে না।তবে যদি কখনো ইরান আক্রান্ত হয় বা ইরানের পরমাণু স্থাপনা আক্রান্ত হয়,তবে নিজেদের রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পরমাণু বোমা বানানোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে।গত কয়েকদিন আগে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার উপদেষ্টা এমন ই ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইসলামে মিথ্যা বলা হারাম; কিন্তু জীবন বাঁচানোর জন্য মিথ্যা জায়েজ আছে। অনুরূপ পরমাণু বোমা বানানো হারাম, কিন্তু দেশকে রক্ষা করার জন্য পরমাণু বোমা বানানোর ক্ষেত্রে ছাড় দেবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

__________________________________________


__________________________________________

যুবকদের আলোকিত পথ--- আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সিসতানীর (হাফিযাহুল্লাহ) অমূল্য আট উপদেশ।    

অনুবাদ ও সংকলন:✍️ মইনুল হোসেন

ভূমিকা
একদল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ আয়াতুল্লাহ আল-সিসতানী (হাফিঃ)-এর কাছে পরামর্শ প্রার্থনা করলে, তিনি গভীর দরদ আর অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের উদ্দেশ্যে আটটি উপদেশ তুলে ধরেন। এই উপদেশাবলী শুধুই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয়, বরং নৈতিকতা, জীবিকা, পরিবার, সমাজ ও আত্মিক উন্নতির পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। নিচে উপদেশগুলো সংক্ষিপ্তভাবে অনুবাদ করে পেশ করা হল, যাতে আমাদের তরুণ ভাই-বোনেরা তা থেকে আলো গ্রহণ করতে পারেন।

১. আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা
বিশ্বের প্রতিটি অনু-পরমাণু আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। জীবনের যে কোনও পর্যায়ে, বিশেষত যৌবনের ঘূর্ণিপাকে, এই বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হবেন না। একবার সরে গেলে ফেরত আসা কঠিন হয়ে পড়ে।

২. উত্তম চরিত্র গঠন করা
আল্লাহর নিকট প্রিয় সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সর্বোত্তম। জ্ঞান, ধৈর্য, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা—এই গুণগুলির চর্চা করুন। নিজের ত্রুটি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের চেষ্টা করুন। এর জন্য আল্লাহ্ অধিক পুরস্কার দেন।

৩. হালাল পেশা বা দক্ষতা অর্জন করা
যৌবনকাল ব্যয় করুন কোনও হালাল পেশা বা কল্যাণকর দক্ষতা অর্জনে। খেলাধুলা ও অলসতায় সময় নষ্ট নয়। পরিশ্রমী মানুষ আল্লাহর প্রিয়, অলস ও নির্ভরতাশীল ব্যক্তি তাঁর অপছন্দ।

৪. ভালো কাজ করা ও গুনাহ পরিহার করা
সৎ কাজ উন্নতি আনে, পাপ কাজ অভিশাপ ডেকে আনে। ন্যায়পরায়ণতা, আমানতের হেফাজত, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করুন। রিয়াকারী, অশ্লীলতা, অহংকার, হিংসা—এসব থেকে দূরে থাকুন।

৫. বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠন করা
পরহেজগার জীবনসঙ্গী নির্বাচন করুন। সৌন্দর্যের মোহ নয়, চরিত্রের শক্তিই বিবাহে বরকত আনে। সন্তান প্রতিপালনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলুন।

৬. মানুষের উপকার করা
পারস্পরিক সহানুভূতি ও কল্যাণই সমাজের ভিত্তি। এতিম, বিধবা, অভাবীদের পাশে দাঁড়ান। সত্যিকারের মুমিন সে, যে নিজের মতো অন্যের ভাল চাই।

৭. দায়িত্বশীল হওয়া
পরিবার হোক বা সমাজ—আপনার দায়িত্ব বুঝে পালন করুন। বিশ্বাসঘাতকতা নয়, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতাই হোক আপনার পরিচয়।

৮. জ্ঞান অর্জন ও আত্মবিশ্লেষণ করা
প্রতিদিন নিজের কর্ম, অভিজ্ঞতা ও চারপাশের ঘটনা থেকে শিখুন। জীবনের প্রতিটি ঘটনার পিছনে রয়েছে এক শিক্ষা, এক অর্থ।
বিশেষত এই তিনটি কিতাবের সঙ্গ পাথেয় করুন:

কুরআন মাজিদ – আল্লাহর শেষ ও চিরন্তন বার্তা।

নাহজুল বালাগা – কুরআনের মর্মবাণীর ব্যাখ্যা ও প্রজ্ঞার সাগর।

সাহিফা সাজ্জাদিয়্যাহ – হৃদয় নিংড়ানো দোয়ার ভাষায় আত্মশুদ্ধির দিশা।

উপসংহার
এই আটটি উপদেশ যেন প্রতিটি তরুণের জীবনের মানচিত্র হয়—যা তাকে আলোর পথে, সাফল্যের পথে, আত্মার মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এই দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা দান করেন।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সফলতার দাতা”
__________________________________________

ইমামে জামানা (আ.) এর গায়বাত: একটি গভীর বিশ্লেষণ


ইসলামের ইতিহাসে ইমামে রব্বানী জামানা (আ.) তথা দ্বাদশ ইমাম  হযরত ইমাম মাহদি (আ.)-এর গায়বত (অদৃশ্য থাকা) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় অধ্যায়। মহান আল্লাহর হিকমতের অধীনে ইমাম মাহদি (আ.) গায়ব আছেন এবং শেষ যুগে প্রকাশিত হয়ে মানবতাকে ন্যায়বিচার ও সত্যের দিকে পরিচালিত করবেন। এই প্রবন্ধে আমি গায়বতের কারণ, প্রকারভেদ এবং মানবজাতির উপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবো।


            গায়বতের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি

'গায়বত' শব্দটি আরবি "غيب" ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার *অর্থ লুকিয়ে থাকা বা অদৃশ্য হওয়া*। ইসলামী পরিভাষায়, ইমাম মাহদি (আ.)-এর গায়বত বলতে বোঝায়—তিনি সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে অবস্থান করছেন, কিন্তু এই জগতে বিদ্যমান আছেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন প্রকাশিত হবেন।

              গায়বতের শ্রেণি বিভাগ
 ইমাম মাহদী আঃ এর গায়বতকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে-

 1. গায়বতে ছোগরা (ক্ষুদ্র গায়বত): এটি ২৬০ হিজরী থেকে ৩২৯ হিজরী পর্যন্ত স্থায়ী ছিল, যখন ইমাম মাহদি (আ.) বিশেষ প্রতিনিধিদের (নায়েবে খাস) মাধ্যমে শিয়াদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন।


 2. গায়বতে কুবরা (বৃহৎ গায়বত): ৩২৯ হিজরী থেকে শুরু হয়ে বর্তমান পর্যন্ত চলছে, যখন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিনিধি নেই এবং ইমাম মাহদি (আ.) সরাসরি উপস্থিত থাকলেও সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে আছেন।

           গায়বতের কারণ ও দর্শন

ইমাম আঃ এর গায়বত সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস ও ঐতিহাসিক দলিল থেকে কয়েকটি মূল কারণ তুলে ধরা যায়:

 1. পরীক্ষা ও পরিশুদ্ধি: গায়বতের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করছেন—কে প্রকৃত মুমিন, আর কে নামমাত্র মুসলমান।


 2. শত্রুদের অত্যাচার: ইসলামের শত্রুরা পূর্ববর্তী ইমামদের হত্যা করেছে, তাই আল্লাহ তাঁর হিকমতের দ্বারা দ্বাদশ ইমামকে গায়েব রেখেছেন,যাতে তাঁর জীবন নিরাপদ থাকে।

3. ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি: গায়বাতের মাধ্যমে বিশ্ব মানবতা ধাপে ধাপে প্রস্তুত হচ্ছে ন্যায়ের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য, যেখানে ইমাম মাহদি (আ.) নেতৃত্ব দেবেন।


 4. মানবজাতির আত্মিক পরিপক্বতা: মানুষকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যেখানে তারা স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে আল্লাহর বিধান গ্রহণ করবে।


      গায়বাতের যুগে আমাদের করণীয়

 ইমামের গায়বাতের যুগে আমাদের দায়িত্ব হলো:

1. প্রতীক্ষা ও প্রস্তুতি: ইমামের আগমনের জন্য অপেক্ষা শুধু বসে থাকার নাম নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, জ্ঞান অর্জন, এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।


 2. ইমামের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি: ইমাম আঃ এর জন্য দোয়া করা,দোয়া এ নুদবাহ,দোয়া এ আহদ, জিয়ারতে আসলে ইয়াসিন ইত্যাদি ইমাম আঃ সম্পর্কিত দোয়া ও জিয়ারত পাঠ করা এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা।


 3. অহংকার ও বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকা: অনেক ভণ্ড নিজেদের ইমামের প্রতিনিধি বলে দাবি করে, তাই সত্য ও মিথ্যা যাচাই করার যোগ্যতা অর্জন করা জরুরি।


 4. একতা ও ভ্রাতৃত্ব: মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা এবং সত্যের পথে দৃঢ় থাকা।

         ইমাম মাহদি (আ.) এর পুনরাগমন ও 
                       বিশ্বপরিবর্তন:

ইমামের পুনরাগমন সম্পর্কে মহানবী (সা.) ও ইমামগণের বহু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। তিনি যখন প্রকাশিত হবেন, তখন পৃথিবী অন্যায় ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ থাকবে, এবং তিনি ন্যায় ও ইনসাফ দিয়ে একে পরিবর্তন করবেন।

কুরআনে বলা হয়েছে:
 "আর আমি তাদের ইমাম করবো যারা পৃথিবীতে দুর্বল ও নিপীড়িত ছিল এবং আমি তাদের উত্তরাধিকারী করবো।" (সূরা কাসাস: ৫)

                    উপসংহার

ইমাম মাহদি (আ.)-এর গায়বাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ। এটি আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা ও প্রস্তুতির সময়। প্রকৃত মু’মিনদের উচিত ধৈর্য, ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যের পথে অবিচল থাকা। আমরা যদি সত্যিকারভাবে তাঁর অনুসারী হতে চাই, তবে আমাদের উচিত ন্যায়ের পথে চলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং আল্লাহর বিধানকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

যে দিন তিনি প্রকাশিত হবেন, সে দিন পৃথিবী ন্যায় ও শান্তিতে ভরে উঠবে—এজন্য আমাদের সকলের প্রতীক্ষা।

اللهم عجل لوليك الفرج 🤲🤲
(হে আল্লাহ! তোমার ওলির আগমণ দ্রুততর করুন)।🤲🤲
_________________________________________

 মা-বাবা ও শিক্ষকের হক : কুরআন ও রেসালাতুল হুকুক-এর দৃষ্টিতে (অনুবাদ)

وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ
إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ
وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا

"তোমার প্রভু আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁরই ইবাদত করো এবং পিতামাতার প্রতি সদয় হও। যদি তাদের একজন অথবা উভয়ে তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ্‌’ পর্যন্ত বলো না, এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।"
(সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ২৩)


ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং নানাবিধ নিয়ামতে পরিপূর্ণ করেছেন। তাঁর প্রতি শুকরিয়া আদায় করা আমাদের কর্তব্য। কুরআনের অসংখ্য জায়গায় তিনি পিতামাতার প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

পিতামাতা এমন এক অমূল্য নিয়ামত, যাদের ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। আর শিক্ষক—তিনি সেই প্রদীপ, যিনি অন্ধকারে পথ দেখান।
এই নিবন্ধে আমরা সংক্ষেপে আলোচনা করবো মা, বাবা ও শিক্ষকের হক সম্পর্কে, যা ইমাম আলী (আ.)-এর ‘‘রিসালাতুল হুকুক’’-এ বর্ণিত রয়েছে।


                  মায়ের হক

তোমার মায়ের অধিকার হলো—তুমি জানো যে, তিনি তোমাকে বহু কষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন, যেমন কেউ কাউকে বহন করে না।
তিনি তাঁর হৃদয়ের ফল, নিজের দুধ দিয়ে তোমাকে আহার করিয়েছেন। নিজের কান, চোখ, হাত, পা, চুল, চামড়া দিয়ে খুশিমনে তোমার ভার বহন করেছেন।
যদিও এর ফলে তিনি ভোগ করেছেন সীমাহীন কষ্ট। তিনি নিজে ক্ষুধার্ত থেকেছেন, কিন্তু তোমাকে খাইয়েছেন। নিজে তৃষ্ণার্ত থেকেছেন, কিন্তু তোমায় পানি দিয়েছেন।
নিজে রোদে থেকেছেন, কিন্তু তোমাকে রেখেছেন ছায়ায়। তাঁর ঘুম গেছে তোমার ঘুমের জন্য, তাঁর ক্লান্তি হয়েছে তোমার শান্তির জন্য। তাঁর পেট ছিল তোমার প্রথম আশ্রয়, তাঁর বুক তোমার দুধের ঝর্ণা, তাঁর জীবন ছিল তোমার প্রহরী।
সুতরাং তোমার কর্তব্য হলো—তাঁর কষ্ট ও ত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞ হও। কিন্তু আল্লাহর সাহায্য ছাড়া তুমি সেই কৃতজ্ঞতা কখনোই পূর্ণ করতে পারবে না।


                     পিতার হক

তোমার পিতার অধিকার হলো—তুমি জেনে রাখো, তিনিই তোমার মূল ও ভিত্তি; তুমি তাঁর শাখা। যদি তিনি না থাকতেন, তবে তুমি থাকতেই না ।অতএব, যখন তুমি নিজের মাঝে কোনো গুণ বা সাফল্য দেখে গর্বে ভরে ওঠো, তখন চিন্তা করো—এই আশীর্বাদের মূল কারণ তোমার পিতা।

এই উপলব্ধি তোমার মধ্যে জন্ম নিক বিনয় ও কৃতজ্ঞতার। আল্লাহর প্রশংসা করো, কারণ শক্তি ও সামর্থ্য শুধু তিনিই দেন।


                 শিক্ষকের হক

 তোমার ওপর শিক্ষকের হক হলো—তুমি তাঁকে সম্মান করবে, তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করবে।
তাঁর শিক্ষায় মনোযোগ দিবে, হৃদয় খুলে গ্রহণ করবে। তুমি তাঁর সহায়তা করবে যেন তিনি তোমাকে শিক্ষাদানে সফল হন। তাঁর শেখানো জ্ঞানের বাহক হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করবে।
আর এই জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে সততার সঙ্গে। কারণ, জ্ঞান একটি আমানত। তা পৌঁছে দেওয়া, রক্ষা করা—তোমার দ্বায়িত্ব। মনে রেখো, সত্যিকার শক্তি ও প্রজ্ঞা একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।


                         উপসংহার

মা, বাবা এবং শিক্ষক—তাঁরা আমাদের জীবনের তিনটি অমূল্য রত্ন।
তাঁদের প্রতি সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানানো শুধু কর্তব্য নয়, বরং ইবাদতের অংশ।
এই হক আদায় করলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই আলোকিত হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই তাওফিক দান করুন, আমিন।


সূত্র: রিসালাতুল হুকুক (ইমাম আলী ইবনে হুসাইন, জাইনুল আবেদীন আ.)

__________________________________________------------------------------------------------

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜


আগমন কবে হবে?

সুদূর দিগন্তের দিকে অপেক্ষাই
পথ চেয়ে আছি,
আপনার আগমনের জন্য 
আমি অস্থির হয়ে আছি।।

অন্ধকার পৃথিবীতে
আবির্ভাবের আলো কবে ফুটিবে?
তার জীবনের দীর্ঘায়ুর
অবশান কবে ঘুচিবে?

স্মরণ করেছি আপনাকে
আলে-ইয়াছিন,আহাদ কিংবা নুদবাতে,
আবির্ভাব কবে হবে ? 
এই কুসংস্কারময় পৃথিবীতে।

আপনার সাথে সাক্ষাতের 
জন্য আরিজাতে লিখেছি,
আপনাকে দেখবার জন্য
আজাখানাতে খুঁজেছি।

হে! মোর খোদা 
পাঠিয়ে দাও শেষ হুজ্জাত কে,
ন্যায় বিচারে পরিপূর্ণ করিবে
এই নষ্করময় পৃথিবীকে।

অশ্রু থামেনা আপনার
দীর্ঘমেয়াদীর কষ্টের জন্য,
আমি আজও আছি অপেক্ষায়
আপনার আবির্ভাবের জন্য।।
_________________________________________

         আল-হুজ্জাতের আহ্বানে

আলোর পথের পত্রিকা, নাম ‘আল-হুজ্জাত’
শিয়া হৃদয় জাগায় বাংলা য়, জ্ঞানের প্রভাত;
দু’হাতে তুলে দেয় দীপ্তি, ইমামদের চিন্তাধারা
অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালায়, হৃদয়-আলো করা।

মাওলানা কাজিম আলী,ইনিই  হলেন কাণ্ডারি
কলমে তাঁর ঝরে লেখা, বাংলা র অলি-গলি;
ত্রৈমাসিকে প্রথম যাত্রা, স্বপ্ন ছিলো পবিত্র
বাংলা র জমিনে বসে বীজ বুনেছে  বিচিত্র।

ইমামে যামানার প্রেমে, হৃদয় করে জাগরণ,
এই পত্রিকা তারই বাহক, করে নব নির্মাণ;
কুম থেকে কবির আলী, মাশহাদে সুজা ভাই,
ইস্পাহানে রিপনের কলম,দ্বীনের বাণী গায়।

মইনুল হোসেন ছড়ায় কবিতা, ইসলামের পথে,
রাজার ছোঁয়ায় জ্যোতি নামে, মিনহাজ থাকে সাথে।
মুন্তাজির গাজীর হাতে, সুশ্রুত কথার মায়া,
তাঁদের কলম স্রোতের মতো, বয়ে আনে হায়া।

‘আল-হুজ্জাত’ আজও বলে যায়, প্রাণে নিয়ে শক্তি
ইমামের নামে দিগন্ত জয়ের, রচে নতুন মুক্তি;
এসো সবাই পড়ি আমরা, এই পত্রিকার পাতা,
আল্লাহর আনুগত্য করো, তিনিই একমাত্র ত্রাতা।

_____________________________________
 
                      
     কাসেম সোলাইমানি
          ✍️ রাজা আলী 

সিরিয়া আজ ধুঁকছে 
বন্ধুকে আজ খুঁজছে 
হে কাশেম,অভাব তোমার 
সিরিয়ান রা ভালোই বুঝছে।

তুমি চুপি চুপি চলে গেলে
কিছু বলে, কিছু না বলে
তুমি ছিলে মুক্তিদাতা সিরিয়ার 
তোমার অভাব ওরা বুঝছে।

তুমি ইরানি, কিন্তু শুধু ইরানের নও
ফিলিস্তিন,ইরাকের পতাকা ওড়াও
বুঝবে একদিন তোমাকে বুঝবে
তোমার আদর্শকেই ওরা খুঁজবে।

প্রতিরোধ ছাড়া মুক্তি আজ স্বপ্ন 
ভালো সাজলে শত্রুরা ভাবে রুগ্ন 
তাই লাঠির বদলা শুধু ই লাঠি 
নেড়েছিলে প্রতিরোধের কলকাঠি।

হে বীর,তোমার অভাব আজ বড়ো
প্রতিরোধ আন্দোলন হোক জড়ো
তোমার রক্তে রঞ্জিত ইরাকের মাটি
কারবালা তেই বিপ্লব হয়েছিল খাঁটি।


Friday, March 14, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ) || রমজান সংখ্যা ||

                          
             

আরবি: রমজান, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: মার্চ, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন এবং মুন্তাজির গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা,মিনা খাঁন,উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড : সম্পদ বা ক্ষমতা নয়, খোদা ভিতিই কাম্য -- মাওলানা কবির আলি তরফদার কুম্মী 

ইমাম হাসান আঃ এর পরিচয় ও শিক্ষা মূলক বাণী -- মাওলানা মহম্মদ সুজাউদ্দিন মাসহাদী

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)

ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা, ঈশ্বরকে জানার পথ এবং সৃজনশীল যুক্তি: একটি বিশদ পর্যালোচনা -- মাওলানা রিপন মন্ডল ইস্পাহানী 

মাহে রমজান ও রোজার মাহাত্ম্য -- মইনুল হোসেন

মোমিন ব্যক্তিদের রোজা -- মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত:মানব মুক্তির চাবিকাঠি --  রাজা আলী 

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

আল-কুদস :-- মইনুল হোসেন

তাক্বওয়াপূর্ণ জীবন :--মিনহাজউদ্দিন মন্ডল


ইমাম আসবে তাই :-- রাজা আলী 


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের বরকতে প্রকাশিত হলো আল হুজ্জাত পত্রিকার (অনলাইন) দ্বিতীয় সংস্করণ। পবিত্র রমযান মাস উপলক্ষে প্রকাশিত এই সংখ্যায় রমযান এবং ইমাম মাহদী আঃ বিষয়ক কিছু আলোচনা স্থান পেয়েছে। রমযান মাসের গুরুত্ব অশেষ।এই গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে এবং যুগের হাদী ইমাম মাহদী আঃ এর নাম প্রচারের উদ্দেশ্যে রমযান সংখ্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই ছোট্ট খেদমতকে তাঁর দরবারে কবুল করুন। এবং যুগের ইমাম আঃ এর ওছিলায়  পত্রিকা প্রকাশে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার তৌফিক দান করুন।
                 
                                ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড : সম্পদ বা ক্ষমতা নয়, খোদা ভিতিই কাম্য

اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ ۚ وَفَرِحُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مَتَاعٌ
“আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা সংকীর্ণ করেন। তারা দুনিয়ার জীবনে আনন্দিত হয়, অথচ দুনিয়ার জীবন পরকালের তুলনায় কেবল সামান্য ভোগমাত্র।” — (সুরাহ আর-রাদ: ২৬)

এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, সম্পদ ও দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য চূড়ান্ত সম্মান বা শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়; বরং এগুলো সাময়িক এবং প্রকৃত মর্যাদা নির্ভর করে তাকওয়া ও সৎকর্মের ওপর।

এখানে একটি প্রশ্ন হচ্ছে,
ধন-সম্পদই কি শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি?
কুরআন ও হাদীস আমাদের এই প্রশ্নের কি উত্তর দেয়,আসুন নিম্নে কয়েকটি  আয়াত ও হাদীসের আলোকে উত্তর নেওয়ার চেষ্টা করি।

ভূমিকা: 
সমাজে আমরা প্রায়ই দেখে থাকি যে ধনী ব্যক্তিদের কথাই বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়, তারা অধিক সম্মানিত হয় এবং তাদের মতামতকেই শেষ কথা হিসেবে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন, যার বেশি সম্পদ রয়েছে, সেই-ই উত্তম। কিন্তু কুরআন ও আহলুল বায়েত (আ.)-এর হাদিস কি এই ধারণাকে সমর্থন করে? বরং আল্লাহর বাণী ও আহলুল বায়েতের শিক্ষায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া, চারিত্রিক গুণ ও আমলের ভিত্তিতে, ধন-সম্পদের ভিত্তিতে নয়।

# কুরআনের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড:

১. তাকওয়া—আসল শ্রেষ্ঠত্ব:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা স্পষ্টভাবে বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
(হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান (পরহেজগার)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।) — (সুরাহ হুজুরাত: ১৩)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কুরআনের দৃষ্টিতে ধন-সম্পদ, বংশ, জাতি বা সামাজিক অবস্থান নয়; বরং তাকওয়াই (আল্লাহভীতি ও ন্যায়পরায়ণতা) প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড।

২. ধনী হওয়া কখনোই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়:

অনেকে মনে করেন, যার কাছে প্রচুর সম্পদ আছে, সে নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে প্রিয়। কিন্তু কুরআন এই ধারণাকে নাকচ করে বলে:

وَمَا ٱلْمَالُ وَلَا ٱلْبَنُونَ بِٱلَّتِى تُقَرِّبُكُمْ عِندَنَا زُلْفَىٰٓ إِلَّا مَنْ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحًا فَأُو۟لَٰٓئِكَ لَهُمْ جَزَآءُ ٱلضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا۟ وَهُمْ فِى ٱلْغُرُفَٰتِ ءَامِنُونَ
(তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকট সান্নিধ্য লাভ করাবে না; বরং যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তারাই দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবে এবং তারা জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষসমূহে নিরাপদে থাকবে।) — (সুরাহ সাবা: ৩৭)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে বোঝায় যে সম্পদ কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে না, বরং ঈমান ও সৎকর্মই প্রকৃত মূল্যবান।

# আহলুল বায়েত (আ.)-এর হাদিসে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড:

১. ইমাম আলী (আ.)-এর শিক্ষা:

ইমাম আলী (আ.) ধনীদের অহংকার ও দারিদ্র্যের প্রতি সমাজের তাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন:

"ধনীরা যদি দান না করতো এবং দরিদ্ররা ধৈর্য ধারণ না করতো, তবে এই সমাজ ধ্বংস হয়ে যেতো।"
— (নাহজুল বালাগা, হিকমাহ ২০৯)

অর্থাৎ, ধনীদের উচিত অহংকার না করে সম্পদকে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা এবং দরিদ্রদেরও ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখা উচিত।

২. ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর শিক্ষা:

এক ব্যক্তি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "মানুষ কি তার ধন-সম্পদের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে?"
তিনি উত্তর দিলেন:

"ধন-সম্পদ মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড নয়; বরং তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতাই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।" — (আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২৩)

হাদিসটি এটা স্পষ্ট করে দেয় যে, আহলুল বায়েত (আ.)-এর দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে চারিত্রিক গুণাবলির ওপর, সম্পদের ওপর নয়।

৩. ইমাম হাসান (আ.)-এর শিক্ষা:

ইমাম হাসান (আ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি তার সম্পদের কারণে অহংকারী হয়, সে আসলে নিজেকেই ধোঁকা দেয়। কেননা, সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ভালো চরিত্র ও আমল চিরস্থায়ী।" — (মিজানুল হিকমাহ)

এই হাদিস থেকে এটা বোঝা যায় যে, সম্পদ একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু সৎকর্ম ও ভালো চরিত্রই মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।

উপসংহার

কুরআন ও আহলুল বায়েত (আ.)-এর শিক্ষা স্পষ্টভাবে বলে যে, ধন-সম্পদ কখনোই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়। বরং তাকওয়া, ঈমান, ন্যায়পরায়ণতা, চারিত্রিক গুণ এবং সৎকর্মই মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে।

আজকের সমাজে আমাদের উচিত ধনীদের( যাদের মধ্যে তাকওয়া,ঈমান,ন্যায়পরায়ণতা,সুন্দর চরিত্র এবং সৎকর্ম নেই) তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ না করে, বরং সৎ ও তাকওয়াবান ব্যক্তিদের মর্যাদা দেওয়া। তাহলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ প্রকৃত অর্থে সম্মানিত হবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথের উপর পরিচালিত করুন।
__________________________________________

ইমাম হাসান আঃ এর পরিচয় ও শিক্ষা মূলক বাণী

মহান আল্লাহ তাঁর (ইমাম হাসান মুজতাবা) মাধ্যমে আমার উম্মতের মধ্যে দু'দলকে সন্ধি করাবেন এবং তারা তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ অস্তিত্বের মাধ্যমে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও শান্তি লাভ করবে।' রাসূলুল্লাহ (সা.) (মশহুর হাদীস)

 জন্ম : ৩য় হিজরির ১৫ রমযান, মঙ্গলবার অথবা বৃহস্পতিবার, পবিত্র মদীনা নগরী।

 নাম : হাসান (তাওরাতে শুব্বার এবং ইনজীলে তাব)

 কুনিয়াত : আবু মুহাম্মাদ

 লকব : মুজতাবা, তাইয়্যেব, সাইয়্যেদ, ওয়ালী, তাকী, হুজ্জাত, 
কায়েম, ওয়াযির, আমীন।

 প্রহরী: দু'ব্যক্তি মহান ইমামের প্রহরী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। একজনের নাম সাফিনা (রাসূলুল্লাহ সা.-এর গোলাম) এবং অন্যজনের নাম কায়েস ইবনে আবদুর রহমান।

 ইমামত কাল: প্রায় ১০ বছর (৪০ হিজরির ২১ রমজান শুক্রবার তাঁর ইমামতকাল শুরু হয়)

 মানব জীবনের জন্য ইমাম হাসান (আ.) হতে বর্ণিত কতিপয় অমীয় বাণী 👇👇👇👇👇👇👇👇

 সালামের গুরুত্ব:

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি সালাম প্রদানের পূর্বে কথা শুরু করে তার কথার উত্তর দিও না'।

 জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব:

তিনি (আ.) বলেছেন: 'নিরবতা, ত্রুটি গোপন রাখে এবং সম্মান রক্ষা করে। যে এ গুণের অধিকারী সে সর্বদা প্রশান্তিতে থাকে এবং তার সহচর ও তার সাথে ওঠাবসাকারীরাও তার হতে নিরাপদে থাকে।'

 শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য ও কল্যাণ:

তিনি (আ.) বলেছেন: 'যে কল্যাণের মাঝে কোন মন্দ থাকে, তা হল নেয়ামতের বিপরীতে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও বিপর্যয়ের সময় ধৈর্য ধারণ করা।'

 বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতা:

তিনি (আ.) বলেছেন: 'জনগণের সাথে উত্তম ব্যবহার, বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতার পরিচয়'।

 ওয়াজিবের জন্য মুস্তাহাব কর্ম ত্যাগ করা:

তিনি (আ.) বলেছেন: 'যখন মুস্তাহাব ইবাদাত ও কর্মসমূহ, ওয়াজিব ইবাদাত ও কর্মসমূহের ক্ষতিসাধন করে তখন তা ত্যাগ করো।'

*আধ্যাত্মিক বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান*

তিনি (আ.) বলেছেন: 'আমি ঐ সকল ব্যক্তিদের বিষয়ে আশ্চর্য হই,যারা নিজেদের শরীরের খাদ্যের বিষয়ে চিন্তা করে;কিন্তু আধ্যাত্মিক বিষয়াদি ও আত্মার খাদ্যের বিষয়ে চিন্তা করে না। ক্ষতিকর খাদ্য থেকে নিজের পেটকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু যে সকল নোংরা চিন্তা তার অন্তরকে দূষিত করে তা হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে না।'

 আত্মীয়তার বিষয়:

জনৈক ব্যক্তি ইমাম হাসান (আ.) এর উদ্দেশ্যে বললেন: আমার একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা রয়েছে, কেমন ব্যক্তির সাথে তার বিবাহ দেব? ইমাম হাসান (আ.) বললেন: এমন ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে দাও, যে তাকাওয়াকারী ও পরেজগার। কেননা তাকওয়াবান ব্যক্তি যদি তাকে ভালবাসে তবে তাকে সম্মান করবে। আর যদি তাকে ভাল নাও বাসে তবে অন্তত তার উপর অত্যাচার করবে না।'

 ইমামের দৃষ্টিতে রাজনীতি:

জনৈক ব্যক্তি ইমাম (আ.) কে সিয়াসাত তথা রাজনীতির অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন: 'রাজনীতি হল, আল্লাহর অধিকার এবং আল্লাহর জীবিত ও মৃত বান্দাদের অধিকার মেনে চলার নাম। অতঃপর তিনি ব্যখ্যা ঞদিতে গিয়ে বলেন: 'আল্লাহর অধিকার হল, যা কিছু মহান আল্লাহ্ বাস্তবায়নের নির্দেশ ও আঞ্জাম দিতে নিষেধ করেছেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা'। আল্লাহর জীবিত বান্দাদের অধিকার হল, নিজের দ্বীনি ভাইয়ের বিষয়ে তোমার কর্তব্যকে পালন করা, তোমার দ্বীনি ভাইয়ের সেবা দানের ক্ষেত্রে বিলম্ব না করা এবং ইসলামি সমাজের নেতার বিষয়ে, যতক্ষণ সে জনগণের বিষয়ে একনিষ্ঠ থাকে ততক্ষণ তুমিও তার প্রতি একনিষ্ঠ থেকো, আর যখন সে সত্য পথ হতে বিভ্রান্ত হয়ে যায়,তখন তার প্রতিবাদ জানাও'। আর আল্লাহর মৃত বান্দাদের অধিকার হল; 'তাদের উত্তম কর্মসমূহকে স্মরণ করা এবং তাদের মন্দ কর্মসমূহকে গোপন করা। 
__________________________________________

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)

মূল লেখক: ড. হাদী ক্বান্দেহারী

" ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের সুখবর আসমানী পুস্তকগুলির মধ্যে আছে। আর সমস্ত ওলীগণ ও আম্বীয়াগণ ঐ দিনের অপেক্ষা করছে। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই গাইবাত কতদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে; আর আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ইমাম মাহদী (আঃ)-কে কোন্ দিন আবির্ভাবের অনুমতি দেবেন, তা তিনি ছাড়া আর সকলেরই অজানা। তাই ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আবির্ভাবের নির্ধারিত দিন যদি কেউ ঘোষণা করে, তাহলে সে মিথ্যাবাদী। এপ্রসঙ্গে ইমাম মাহ্দী (আঃ) একটি পত্রে লিখেছেনঃ

أما ظهور الفرج فإنه إلى الله وكزب الوقاتون   “ আবির্ভাবের হুকুম  (আদেশ) আল্লাহর হাতে ; আর  যারা আবির্ভাবের জন্য সময় নির্ধারণ করবে, তারা মিথ্যাবাদী” (অনুবাদ)।

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর গাইবাতের যুগ শীয়াদের প্রকৃত সমাস্যার সময়। এই যুগ সমাপ্ত হওয়া ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভূত হওয়া মানুষের দোয়া ও মোনাজাতের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন বানী ইস্রাইলদের দোয়া ও কান্না-কাটিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের চার শ' বছরের আযাবকে হাল্কা করে দেয়, আর ১৭০ বছরের আযাবকে ক্ষমা করে দেয়। আর হজরত মুসা (আঃ)-কে তাদের আম্বিয়া হিসাবে পাঠিয়ে ফিরআউনের জঘন্য কার্যকলাপ থেকে পরিত্রাণ দেয়। এই কারণেই জাফর সাদিক (আঃ) মুসলমানদের বিশেষ ভাবে বলেছেন 'ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের জন্য আল্লাহ্ দরবারে বানি ইস্রাইলদের মতো দোয়া প্রার্থনা ও কান্না-কাটি করো'।

ইমাম মাহ্দী (আঃ) ক্বাবা ঘরের নিকট হাজ্বরে আসওয়াদ নামক স্থান থেকে আবির্ভূত হবেন। সেই সময় সেখানে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ৩১৩ জন আসহাব থাকবে। আবির্ভাবের পর জিব্রাইল ক্বাবা ঘরের ছাদ থেকে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের ঘোষণা করবেন। এই ঘোষণার স্বর এবং উদ্দেশ্য সমগ্র পৃথিবীর মানুষ শুনতে এবং বুঝতে পারবে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থান থেকে মোমেনীনরা তাঁর বায়াত গ্রহণ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে। হজরত ঈসা (আঃ) চতুর্থ আসমান থেকে আসবেন। আর ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর বায়াত গ্রহণ করে তাঁর সৈন্যদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবেন। এবং তাঁর পিছনে নামাজ আদায় করবেন। যে সমস্ত মোমেনীন ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশা রাখত, অথচ জীবদ্দশায় সাক্ষাৎ করতে পারেনি; আল্লাহ্ তাদেরকেও পুনরায় জীবিত করবেন। আর তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পক্ষ থেকে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।

এই ধারাবাহিকতায় ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের সংখ্যা যখন দশ হাজারে পৌঁছাবে, তখন তিনি 'ক্বেয়াম' করবেন। প্রথমে মক্কা জয় করে মদীনা; আর সেখান থেকে কুফা পৌঁছাবেন । কুফাকেই সমগ্র পৃথিবীর রাজধানী নির্বাচন করে, সেখান থেকেই গোটা পৃথিবী শাসন করবেন। ক্রমান্বয়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাছাড়াও ফারিসতারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আদেশ পালন করতে থাকবে। আর শত্রুরা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যবাহিনী দেখে ভয় পাবে। তাদের সামনে কোনো ভাবেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। তারা একের পর এক জয়ী হবে, কখনো পরাভূত হবে না। কয়েকটি কারণে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যদলের সামনে শত্রুরা নত হবে। কারণগুলি হ'ল, -

(ক) মোজেযা ও খোদায়ী চিহ্নের নিদর্শন।

(খ) ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর অন্তরজয়ী আলাপ ও কথাবার্তা।

(গ) ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তাঁর সৈন্যদের আচার-আচরণ,

মানুষ্যত্ববোধ ও আন্তরিকতা ইত্যাদি। ইসলাম বিরোধী ইহুদী ও আহলেবায়েতের শত্রুদের সমস্ত রকম বিরোধীতাকে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যরা কঠোর ভাবে প্রতিরোধ করবে। মাত্র আট মাসের মধ্যেই পূর্ব ও পশ্চিম দিক ব্যাপী ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই শাসনের একটি উদ্দেশ্য হল জালিম ও অত্যাচারীদের থেকে অসহায় মানুষদের হক্ক বুঝে দেওয়া এবং কাফির ও মুশরিকদের (ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের পরেও যদি কাফির থেকে যায়) হত্যা করা। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসনে আহলেবায়েতের শত্রুরা অপমানিত ও লজ্জিত হবে । ফাসাদকারী ও বিরোধীতাকারীরা উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহর সমস্ত শত্রুদের হত্যা করা হবে। সমস্ত পৃথিবীতে ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তার অনুসারীদের সুশাসন চলবে। এবং পৃথিবীর বুকে সঠিক দ্বীন প্রচারিত হবে। হে আল্লাহ্, ঐ দ্বীনের আবির্ভাবকে দ্রুত ত্বরান্বিত করুন। আমীন।
__________________________________________

ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা, ঈশ্বরকে জানার পথ এবং সৃজনশীল যুক্তি: একটি বিশদ পর্যালোচনা

ভূমিকা:
ঈশ্বর পরিচয় একটি মৌলিক বিষয়,যা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্ম, দর্শন এবং বিজ্ঞান আলোচনা করে আসছে। ঈশ্বরকে চেনা এবং তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানমূলক এবং আধ্যাত্মিক দায়িত্ব। এই প্রবন্ধে আমরা তিনটি প্রধান বিষয় বিশদভাবে আলোচনা করব।

1. ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা- কেন মানুষকে ঈশ্বরকে জানতে হবে?
2. ঈশ্বরকে জানার পথ – ঈশ্বরকে জানার বিভিন্ন উপায় কী?
3. সৃজনশীল যুক্তি – বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে শৃঙ্খলা ও নিয়ম রয়েছে, তা কীভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ?

1.ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা:

১.১. মানুষের প্রকৃতি ও ঈশ্বরের অনুসন্ধান: মানুষের প্রকৃতিতে সবসময়ই একজন উচ্চ সত্তার সন্ধান করার প্রবণতা রয়েছে। প্রতিটি যুগে মানুষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং তার অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করেছে এবং কিছু মৌলিক প্রশ্ন করেছে। যেমন-

ক।আমি কে?
খ।আমার সৃষ্টিকর্তা কে?
গ।আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?

এই প্রশ্নগুলি আমাদের ঈশ্বরের পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়। কুরআনও এই স্বাভাবিক অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে:
"অতএব তুমি একনিষ্ঠ ভাবে নিজেকে সত্য ধর্মের দিকে স্থাপন কর—এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা রূম ৩০)

১.২. নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রয়োজন:

যদি ঈশ্বরকে অস্বীকার করা হয়, তবে ন্যায়-অন্যায়ের কোনও চূড়ান্ত মানদণ্ড থাকে না। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস থাকার কারণেই নৈতিকতার ভিত্তি শক্তিশালী হয়। যদি কোনও সৃষ্টিকর্তা এবং পরকাল না থাকে, তবে একজন মানুষ কোনও অপরাধ করার পরেও কোনও উচ্চ আদালতের ভয় ছাড়াই জীবন যাপন করতে পারে।

১.৩. মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক চাহিদা:

ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস মানুষের মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। অনেক মানুষ যখন কঠিন সময়ের মধ্যে পড়ে, তখন প্রার্থনা এবং আল্লাহর স্মরণ তাদের প্রশান্তি দেয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"সাবধান! আল্লাহর স্মরণেই অন্তর শান্তি পায়।" (সূরা রাদ ২৮)

১.৪. বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রয়োজন:

বিজ্ঞান উন্নতির পরও অনেক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ:

ক।বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কীভাবে সৃষ্টি হল?
খ।জীবনের মূল উদ্দেশ্য কী?
গ।মানুষের চেতনা কীভাবে বিকশিত হল?

এই প্রশ্নগুলি আমাদের ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে।

# ঈশ্বরকে জানার পথ:
২.১. প্রকৃতির মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:

আল্লাহ বিশ্বকে এমন এক অনন্য শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন,যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে। যেমন:
ক।সূর্য ও চাঁদের নির্দিষ্ট কক্ষপথ,
খ।পৃথিবীর সঠিক গতি ও দূরত্ব,
গ।মানবদেহের জটিল গঠন,
ঘ।উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের বিস্ময়কর ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি।

এই সমস্ত কিছু একজন মহান স্রষ্টার অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। কুরআনে বলা হয়েছে:
"নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" (সূরা আলে ইমরান ১৯০)

২.২. ওহী ও নবীদের মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:

আল্লাহ মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবী ও ওহীর ব্যবস্থা করেছেন।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর যুগে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে একত্ববাদের প্রচার করেছিলেন।

হযরত মূসা (আ.) তূর পর্বতে আল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন।

হযরত ঈসা (আ.) অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে আল্লাহর শক্তিকে প্রকাশ করেছিলেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা শেষ ওহী এবং সর্বদা ঈশ্বরের পরিচয়ের মাধ্যম।


২.৩. যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:

দার্শনিক ও পণ্ডিতরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের জন্য বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। যেমন:

1. কসমোলজিক্যাল যুক্তি – প্রতিটি জিনিসের একটি কারণ থাকে, তাই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেরও একটি কারণ থাকতে হবে, এবং সেটি হল ঈশ্বর।


2. নৈতিক যুক্তি – যদি ঈশ্বর না থাকেন, তবে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।


3. নিয়ম-শৃঙ্খলার যুক্তি – বিশ্বে যে শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা রয়েছে, তা একজন মহান স্রষ্টার ইঙ্গিত দেয়।


২.৪. আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:

অনেক মানুষ প্রার্থনা, উপাসনা এবং সুফিবাদের মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য অনুভব করে। সুফি সাধক ও অলিয়াগণের জীবন এ বিষয়ে সর্বোত্তম উদাহরণ।

৩. সৃজনশীল যুক্তি:

সৃজনশীল যুক্তি এই ধারণার উপর ভিত্তি করে যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি উপাদান একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার সাথে তৈরি হয়েছে, যা একজন বুদ্ধিমান স্রষ্টার উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।

৩.১. বিশ্বে বিদ্যমান শৃঙ্খলা:

সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব: যদি পৃথিবী সূর্যের কাছাকাছি হতো, তবে তা পুড়ে যেত, আর দূরে হলে ঠাণ্ডা য় জমে যেত।

মাধ্যাকর্ষণ শক্তি: এটি যদি বেশি বা কম হতো, তবে জীবন অসম্ভব হয়ে পড়ত।

অক্সিজেনের পরিমাণ: বায়ুমণ্ডলে মোটামুটি ২১% অক্সিজেন রয়েছে, যা জীবনের জন্য নিখুঁত।


৩.২. জীববৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা:

ডিএনএ কোড: মানুষের ডিএনএ একটি অত্যন্ত জটিল তথ্যভাণ্ডার, যা একটি মহান স্রষ্টার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।

চোখের গঠন: মানব চোখ এতটাই জটিল যে আধুনিক বিজ্ঞান আজও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

৩.৩. মানব মস্তিষ্ক ও চেতনা:

মানব মস্তিষ্ক বিশ্বের সবচেয়ে জটিল কম্পিউটার। যদি সাধারণ একটি যন্ত্র নিজে নিজে তৈরি হতে না পারে, তাহলে এত জটিল মস্তিষ্ক কীভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হলো?

উপসংহার
ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বীকৃতি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, যা জীবন সম্পর্কে গভীর প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে। বিশ্বে বিদ্যমান শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য আমাদের সৃষ্টিকর্তার পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়।আল্লাহ বলেন:
"তারা কি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর শাসন সম্পর্কে চিন্তা করে না?" (সূরা আল-আ’রাফ ১৮৫)
এই আলোচনা ঈশ্বরকে জানার গুরুত্ব, তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাসের কারণ তুলে ধরে।
__________________________________________

মাহে রমজান ও রোজার মাহাত্ম্য

পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াত থেকে ইসলামে রোজার গুরুত্ব অনুমান করা যায়। উদাহরণস্বরূপ “ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই এটা বিনয়ীদের ব্যতীত অন্যদের জন্য কঠিন” (সূরা বাকারাহ, আয়াত ৪৫)। বিভিন্ন তাফসীরে ‘ধৈর্য’-কে রোজা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কারণ রোজার মধ্য দিয়ে দিনের কিছু অংশে খাওয়া-দাওয়া ও অন্য কিছু কাজ ত্যাগ করা ধৈর্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপ। মুসলমানদেরকে কঠিন সমস্যা ও বিপদের সম্মুখীন হলে রোজার আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। যদিও রোজা রমজান মাসের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত, তবুও এটি এমনই একটি ফযিলতপূর্ণ ইবাদত যা রমজানের বাইরেও পালন করা যেতে পারে - বিশেষ করে রজব ও শাবান মাসের মতো নির্দিষ্ট মাসে এবং সোম ও বৃহস্পতিবারের মতো নির্দিষ্ট দিনে রোজা রাখতে বিশেষ তাগিদ করা হয়েছে।

আল্লাহ‌র নবী (সাঃ) এর বর্ণনা অনুযায়ী রমজান মাসঃ

শাবান মাসের শেষ শুক্রবারে মহান নবী (সাঃ) এর দেওয়া একটি বিখ্যাত খুতবায় (খুতবা-এ-শাবানীয়াহতে) তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, “হে লোকেরা! আল্লাহর মাস তোমাদের দিকে আসছে বরকত, রহমত এবং মাগফেরাত নিয়ে।” এখানে লক্ষণীয় যে, এই তিনটি ঐশী উপহার (অর্থাৎ রহমত, বরকত ও মাগফেরাত) এই মাসের শেষে দেওয়া হবে তা নয় বরং এগুলো রমজান মাসের শুরু থেকেই প্রাপ্ত হয়।

নবীকরীম (সাঃ) আরও বলেছেন, “এটি এমন একটি মাস যাতে তোমাদেরকে আল্লাহর মেহমানদারীতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।” অর্থাৎ গোটা মানবজাতিকে ‘আমন্ত্রণ’ জানানো হয়েছে। অতএব আল্লাহর এই মেহমানদারীতে প্রবেশ করার জন্য মানুষকে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। উল্লেখ থাকে যে, মহান আল্লাহর এই বিশেষ মেহমান (অতিথি) হওয়ার মর্যাদা পাওয়ার জন্য রোজা একটি শর্ত।

ঐশী মেহমান সম্পর্কে কিছু কথাঃ

১. যখন কাওকে নিমন্ত্রণ জানানো হয় তখন তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয় না। সুতরাং নিমন্ত্রণকর্তা তার অতিথিদের স্বাগত জানাবেন, অন্যথায় নিমন্ত্রণ অর্থহীন দাঁড়ায়। সেই অনুযায়ী যখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রমজানের মেহমানদারীতে আমন্ত্রণ জানান, তখন যারা আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তাদের জন্য তাঁর রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়।

২. যখন কেউ নিমন্ত্রণ স্থলে প্রবেশ করে, তখন তার সঙ্গে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করা হয়। যদিও নিমন্ত্রিত অতিথিদের প্রত্যেকেই সম্মানিত হওয়ার যোগ্য নয়, তবুও অতিথি হওয়ার সুবাদে তাদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা হয়। উপরের খুতবায় উল্লেখিত নিম্নলিখিত বাক্যটি অনুধাবনের দাবী রাখে - “এই মাসে তোমাদেরকে সেই লোকদের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে যাদেরকে আল্লাহ সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন”।

৩. যখন কেউ কোনও নিমন্ত্রণ বাড়িতে যায়, তখন তাকে বিনামূল্যে কিছু দেওয়া হয় বা দেখানো হয়। অন্য কথায়, নিমন্ত্রিত অতিথি কোনো প্রতিদান ছাড়াই কিছু পাওয়ার আশা করে। একইভাবে রমজানের ঐশী মেহমানদারীতে আল্লাহতা’লা কেবল আমাদের কাজগুলো উদারভাবে পুরস্কৃত করেন তা নয়, বরং তাঁর অতিথিদের বিভিন্ন অনুগ্রহ দিয়ে আপ্যায়ণ করেন। এমনকি তারা বড়ধরনের তেমন কিছু না করলেও মহান আল্লাহ তাঁর অতিথিদেরকে বিশেষ বিশেষ মর্যাদা ও অনুগ্রহ দান করেন। যেমনটি একই খুতবায় আরও উল্লেখ হয়েছে - “এতে (এই রমজান মাসে) তোমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস আল্লাহর তাসবীহ এবং এতে (এই রমজান মাসে) তোমাদের ঘুম আল্লাহর ইবাদত।”

খুতবাটির অন্য জায়গাতে মহান নবী (সাঃ) আরও বলেছেন, “মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে এই মাসটি শ্রেষ্ঠ মাস, এর দিনগুলো শ্রেষ্ঠ দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘন্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘন্টা।” অর্থাৎ অন্য মাসের তুলনায় এই মাসের প্রতিটি অংশ অন্য প্রতিটি মাসের অংশের চেয়ে উত্তম।

রমজান মাসের জন্য সুপারিশঃ

উক্ত খুতবাটির অন্য একটি অংশে বলা হয়েছে, “হে মানব সম্প্রদায়! এই মাসে জান্নাতের দরজা খোলা থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি সেগুলো তোমাদের জন্য বন্ধ না করেন।"

‘জান্নাতের দরজা খোলা’ - এই বাক্যাংশের অর্থ নিমরূপ হতে পারে -

১. অন্যান্য মাসের তুলনায় এই বরকতময় মাসে জান্নাতে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জনের সম্ভাবনা বেশি। 

২. জান্নাতের দরজা খোলা থাকার কারণে, জান্নাতের সমস্ত ধরণের ঐশী রহমত এই জগতে বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। জান্নাতের বাতাস এই জগতে প্রবাহিত হয়। এগুলো রমজান মাসে রোজাদারদের শ্বাস-প্রশ্বাস ও ঘুমকে জান্নাতবাসীদের মতো আল্লাহর তাসবীহ ও ইবাদতে পরিণত করে।

রমজান মাসে শয়তানের অবস্থাঃ

“এবং শয়তান শিকলবদ্ধ। সুতরাং তোমাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি তাদের তোমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না দেন।” যদিও শয়তান এবং তার সহযোগীরা এই মাসে শিকলবদ্ধ থাকে, তবে গুনাহ করার ফলে তারা মুক্তি পায়। অতএব রমজান মাস শ্রেষ্ঠ মাস হলেও একদল লোকের জন্য এই মাসটি অন্যান্য মাসের চাইতে খারাপ। ঠিক যেমনভাবে পবিত্র কুরআন “বিশ্বাসীদের জন্য নিরাময় ও রহমত; এবং এটি কেবল অত্যাচারীদের ক্ষতি বৃদ্ধি করে” (১৭:৮২)।

কেয়ামত দিবস সম্পর্কে সতর্কীকরণঃ

উক্ত খুতবায় পবিত্র নবী (সাঃ) আরও বলেছেন, “এই মাসে তোমাদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে কেয়ামতের দিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ করো।” এই পৃথিবীতেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা খুব কঠিন। তাহলে আমাদের অবশ্যই এই সত্যটি নিয়ে চিন্তা করতে হবে যে পরকালের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বছরের পর বছর বা কিছু সম্প্রদায়ের জন্য চিরকাল স্থায়ী হবে। উপরন্তু এই জগতে অসহনীয় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সমাধান হিসেবে মৃত্যুকে গণ্য করা যেতে পারে। কিন্তু পরবর্তী জগতে অনন্ত জীবন। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তারা চিৎকার করে বলবে, ‘হে মালিক! [জাহান্নামের রক্ষকের নাম] আপনার রব যেন আমাদের শেষ করে দেন!’ তিনি বলবেন, ‘নিশ্চয়ই তোমরা এখানেই থাকবে” (৪৩:৭৭)।

পবিত্র কুরআন অনুসারে, পরকালে অত্যাচারীদের জন্য কোনো মৃত্যু নেই এবং এমনকি যখন তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, তখন একটি নতুন চামড়া প্রতিস্থাপন করা হবে যাতে পরকালের শাস্তি সর্বদা নতুন করে অনুভূত হয়। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই যারা আমার নিদর্শন ও অলৌকিকতায় অবিশ্বাস করেছে, আমি তাদের আগুনে নিক্ষেপ করব। যখনই তাদের চামড়া সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যাবে, আমরা তাদের জন্য অন্য চামড়া পরিবর্তন করব যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৪:৫৬)।

পরকালের কথা স্মরণ করানোর পাশাপাশি রমজান মাসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যারা না খেয়ে থাকার অনুভূতি অনুভব করে। যারা রোজা রাখে তারা তাদের সম্পত্তির কিছু অংশ আল্লাহর পথে এবং অভাবী মানুষদের জন্য ব্যয় করতে উৎসাহিত হয়।

রোজাদারদের সম্পর্কে দুটি হাদিসঃ

(১) প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কিছু ফেরেশতাকে শুধুমাত্র রোজাদারদের জন্য দোয়া করতে নিযুক্ত করেছেন। জিব্রাইল আমাকে জানিয়েছেন যে আল্লাহ বলেছেন: ‘আমি আমার ফেরেশতাদের আমার সৃষ্টির কারো জন্য দোয়া করার আদেশ দিইনি, যতক্ষণ না আমি তাদের জন্য সেই দোয়া কবুল করি।”

(২) ষষ্ঠ ইমাম, ইমাম সাদিক (আঃ) বলেছেন, “যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গরমের দিনে রোজা রাখে এবং তৃষ্ণার্ত হয়, তখন আল্লাহ এক হাজার ফেরেশতা পাঠান তার মুখ স্পর্শ করতে এবং ইফতারের সময় পর্যন্ত তাকে সুসংবাদ দিতে, তখন আল্লাহ তাকে বলেন: ‘তোমার গন্ধ কত সুন্দর! তোমার আত্মা কত আনন্দদায়ক! হে আমার ফেরেশতারা! সাক্ষ্য দাও যে আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি”।
__________________________________________

      মোমিন ব্যক্তিদের রোজা

বাতাসে রমজানের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, জানান দিয়ে যাচ্ছে পবিত্রতার বার্তা। আরবি মাসসমূহের নবম মাস পবিত্র রমজান মাস। আরবি অন্যান্য মাসের মতো রমজানও একটি মাস, তবে অন্যান্য মাসের চেয়ে ফজিলতপূর্ণ হওয়ায় এর মূল্য ও মর্যাদা অনেক বেশি। কারণ রমজান কোরআন অবতরণের মাস, রহমত বর্ষণের মাস।

রোজা হল ইসলামের ফুরুয়েদিন এর দ্বিতীয় স্তম্ভ। 'রোজা' শব্দটি ফারসি। এর আরবি পরিভাষা হচ্ছে সাওম, বহুবচনে বলা হয় সিয়াম। সাওম অর্থ বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা। সাওম এর সংজ্ঞা দিতে গেলে বলা যায় যে, আল্লাহর সন্তুটির কামনায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহ পানাহার থেকে বিরত থাকা।

তবে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকলেই রোজার হক আদায় হয়ে যাবে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখেও অশ্লীল কাজ ও পাপাচার ত্যাগ করতে পারল না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো মূল্য নেই।’ সুতরাং পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং অন্যান্য আমল ও ইবাদতে নিজেকে মশগুল রাখতে হবে, তবেই রোজার পূর্ণ হক আদায় হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীরুতা) অবলম্বন করতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত, ১৮৩)

যেহেতু রোজা আল্লাহর বিধান এবং আমাদের জন্য তা ওয়াজিব করা হয়েছে, তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রোজা পালন ও রোজার অন্যান্য হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

রোজা রাখার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ করে। কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। মানুষ এ মাসে  আল্লাহর ভয়ে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে দূরে থাকে। যেন সে ঘোষণা করে, ‘আমরা শুনেছি এবং পালন করেছি! হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাই আর প্রত্যাবর্তন তোমারই কাছে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৫)

রোজা রাখলে মানুষের ভেতর ধৈর্য ও দৃঢ়তা তৈরি হয়, যা মনুষ্যত্ব বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোজাদারের সামনে বাহারি রকম সুস্বাদু ও উপাদেয় খাবার উপস্থিত থাকার পরও সে সেদিকে চোখ তুলে তাকায় না। সে তা করে না কেবল আল্লাহর ভয়ে। রোজা মানুষের প্রত্যয়, দৃঢ়তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দেয় বলেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা পালন করে। রোজা তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। 

 রোজায় করণীয় ও বর্জনীয় : 
রোজা রাখার মাধ্যমে যেহেতু তাকওয়া অর্জন হয়, তাই রমজান মাসে প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, তাকওয়া অর্জনের জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। রমজান মাসে একটি নেক আমলের সওয়াব ৭০ গুণ। তাই এই মাসে আমরা মুখরোচক ইফতার সামগ্রী আর সেহরি নিয়ে ব্যস্ত না থেকে যথাসম্ভব ইবাদত ও আমলে মশগুল থাকব। বেশি বেশি দান-সদকা করব।

বছরের অন্যান্য সময় ঘুমের কারণে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে আমাদের অনেকরই কষ্ট হয়ে যায়, রমজান আমাদের জন্য তাহাজ্জুদ আদায়ের সুবর্ণ সুযোগ। তাই সেহরির কিছু সময় আগে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করে; আল্লাহ তায়ালার দরবারে হাত তুলে নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতেও যেন শয়তানের ধোকা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর পথে চলতে পারি, সেজন্য দোয়া করা উচিত।

রমজানে আমাদের বেশি বেশি ইস্তেগফার পড়া উচিত। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করো। এতে আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপরাশিকে মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে। (সূরা তাহরিম, আয়াত, ৮)

রমজান কোরআন নাজিলের মাস, তাই এই মাসে আমাদের বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা এবং অর্থ বুঝে তেলাওয়াত করা উচিত।এতে করে আমরা কোরআনে আল্লাহ তায়ালা কী বলেছেন, তা সহজেই বুঝতে পারব এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারব।
     আমাদের স্মরণে রাখতে হবে যে, শুধু বাহ্যিক অবয়ব ও দৈহিক কাঠামোর নাম মানুষ নয়, বরং মনুষ্যত্ব লাভের জন্য আরো কিছুর প্রয়োজন। যার ভিত্তিতে তারা সৃষ্টিজগতে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। আর তা হলো আত্মা। আত্মাই মূলত মানুষের ভেতর বুদ্ধি, বিবেক ও চিন্তা-ভাবনার শক্তি সৃষ্টি করে। রুহ বা আত্মার অনন্য বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই সে সৃষ্টিজগতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে এবং ফেরেশতাদের সিজদা লাভের উপযুক্ত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তাতে আমার রুহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৭২)
আর মানুষের আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায় প্রবৃত্তি দমনের মাধ্যমে। প্রবৃত্তি পূরণের প্রধান দুটি মাধ্যম হলো পেট ও লজ্জাস্থান। মানুষ যখন পেট ও লজ্জাস্থানের ব্যাপারে সংযত হতে শেখে, তখন তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।এভাবেই যদি আমরা আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ দিয়েই রোজা রাখি অর্থাৎ চোখ দিয়ে হারাম কিছু না দেখে, কান দিয়ে হারাম কিছু না শুনে, নাক দিয়ে হারাম কিছুর সুগন্ধ না নিয়ে, জিহ্বা বা মুখ দিয়ে কাওকে কটু কথা না বলে, হাত-পা দিয়ে কোনো ব্যক্তির ক্ষতি না করে সারা দিন কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চিন্তায় মত্ত থেকে দুনিয়াবী কাজ করে যেতে পারি, তবেই সম্মানের সঙ্গে আমাদের হাসর ও নাসর হবে 
ইনশা আল্লাহ্! আল্লাহ আমাদের সকলকেই প্রকৃত মোমিন ব্যক্তিদের ন্যায় সিয়াম সাধনের তৌফিক দান করুন। আমিন...সুম্মা আমিন।
_________________________________________

ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত:মানব মুক্তির চাবিকাঠি

ইমাম মাহদী আঃ এর অস্তিত্ব এবং আর্বিভাব দ্বীন ইসলামের একটি মূলগত ভিত্তি।শীয়া মাযহাবের গবেষণা ও বিশ্বাস হলো ইমাম মাহদী আঃ ইতিপূর্বে জন্ম নিয়েছেন এবং অন্তর্ধানে আছেন।সময় হলেই আত্মপ্রকাশ করবেন। তাঁর এই অন্তর্ধানের সময় ও সীমার মধ্যে আমাদের প্রধান কর্তব্য তাঁর পরিচিতি বা মারেফাত অর্জন করার প্রচেষ্টা চালানো।এ বিষয়ে আল্লাহর নবীর বিখ্যাত হাদীস হলো--"যে ব্যক্তি তার নিজের যুগের ইমাম কে না চিনে মারা যায়,তার মৃত্যু জাহেলিয়াতের মতোই"।এই হাদীস থেকেই যুগের ইমাম আঃ কে চেনার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

     আল্লাহ রব্বুল আলামীন প্রত্যেক যুগের জন্য একজন প্রতিনিধি বা ইমাম রেখেছেন। এ যুগেও যে ইমাম রয়েছেন, সে বিষয়ে আমরা অবগত। তবে ইমাম আঃ কে চেনা বা তার মারেফাত অর্জনের বিষয়টি এখনো অনেক শিয়া এসনা আসারি সম্পূর্ণ উপলব্ধি ও অনুধাবন করতে পারি নি। ইমাম আঃ মারেফাত বা পরিচিতি অর্জন ই যে মানব মুক্তির একমাত্র উপায় সে বিষয়ে বক্ষমান নিবন্ধে আলোচনা করবো।

    মারেফাত একটি আরবি শব্দ। শব্দটি র অর্থ হলো জ্ঞান, চেতনা বা অন্তর্দৃষ্টি। শব্দটি মূলত গভীর আত্মজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত বলতে ইমাম আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন বা চেতনা বৃদ্ধি কে বোঝানো হয়েছে।যদি ইমাম আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন সম্ভব না হয় বা তাঁর সম্পর্কে ধারণা ও উপলব্ধি তৈরি না হয়,তবে পার্থিব ও পরলোকগত সফলতা অসম্ভব।

        বর্তমান শীয়া সমাজের   অনেক মানুষ এটাই মনে করে যে, ইমাম মাহদী আঃ হলেন ইমামতের শেষ কড়ি এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ই যথেষ্ট কিংবা ইমাম আঃ নাম-পরিচয় জেনে রাখাই আমাদের কর্তব্য।অর্থাৎ ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি মারেফাত অর্জন কে তাত্ত্বিক দিক নির্দেশনা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র পরিসরে অনেকেই বেঁধে ফেলেছে।এই সংকীর্ণ চিন্তা থেকে আমাদের বার হতে হবে এবং কোরান ও হাদিসের দৃষ্টিতে ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের যে তাগিদ রয়েছে,তা আমাদের অনুধাবন করে তাঁর প্রতি কর্তব্য পালনে অগ্রসর হতে হবে।কেননা ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও উপলব্ধি ছাড়া তাঁর আসহাব  কিংবা শাফায়াত লাভ আমাদের নসিবে হবে না। 

     ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে সম্যক ও গভীর জ্ঞান আমাদের চিন্তা -চেতনা এবং কাজ-কর্মকে প্রভাবিত করে। আমাদের নৈতিক কর্তব্য ও মানবতাকে উদ্বোধিত করে সৎ কর্ম শীল মুমিন ব্যক্তি তে পরিণত করে। সুতরাং ইমাম আঃ এর সম্যক পরিচিতি বা মারেফাত আমাদের একাধিক কল্যাণে র কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন--
    ১. ইমাম আঃ মারেফাত অর্জনের ফলে ইমামতের শেষ প্রতিনিধি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি হয়।ফলে ইমাম আঃ এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মহব্বত তৈরি হয়।

২. ইমাম আঃ এর মারেফাত আমাদের সাহস ও শক্তি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিক কর্তব্য সম্পাদনে সাহায্য করে।

৩. ইমাম আঃ মারেফাত আমাদের ইমাম আঃ এর প্রকৃত অপেক্ষা কারী হিসাবে বাঁচতে শেখায়।

৪. ইমাম আঃ এর আবির্ভাবের সূত্র ধরে কেউ কেউ মিথ্যা মাহদী দাবি করে। সেই "মিথ্যা মাহদী" দের চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং বিভ্রান্তি এড়ানো যায়।

৫. ইমাম আঃ এর প্রতি উচ্চ মারেফাত তাঁর আসহাব ও আনসার হওয়ার পথকে সুগম করবে।

     বর্তমান আলোচনা র সাপেক্ষে এটা বলা যায় যে, ইমাম আঃ এর প্রতি গভীর জ্ঞান ও মারেফাত কিন্তু আবশ্যিক। নতুবা ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৃত দ্বীনদার হওয়া সম্ভব নয় কিংবা মানব মুক্তি ত্বরান্বিত হবে না‌।তাই ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি মারেফাত অর্জনের জন্য এখন থেকেই আমাদের সচেতন হতে হবে।
__________________________________________------------------------------------------------

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜


       কবিতাঃ আল-কুদস
         ✍️ মইনুল হোসেন

আল-কুদস আমার হৃদয়ে
আল-কুদস আমার অন্তরে 
চিরকাল থাকবে, অনন্তকাল থাকবে। 

এটি শান্তির সুন্দর শহর
এটি ঈমানের উজ্জ্বল নিদর্শন
কখনো ভুলব না, আমি তা ভুলব না। 

আমি শোকাহত, অশ্রুশিক্ত আমার নয়ন 
আমার সুন্দর শহরটি বন্দী, ধ্বংস হয়েছে সবই।
কেউ খোঁজ নেয়নি, তার কোনও খোঁজ নেয়নি।

জায়নবাদের গোলাম হওয়ার দৌড়ে
আরব মুসলিম শাসক সব বিধর্মী পথে
আল-কুদস একা পড়ে, আজও সে একা পড়ে।

কেউ হয়তো ভুলে যেতে পারে, 
কিন্তু আমি ভুলব না, কারণ 
এটি আমার অন্তরে, সর্বদা আমার অন্তরে। 

লাখো মজলুমের আকুতি আর
সহস্র শহীদের রক্তের দাগ
বৃথা সে যাবে না, হতে তা দেবো না।

জালেমদের আজকের এই উৎপীড়ন
বন্ধ হবে, এইসব মৃত্যু মিছিল সেটাও থামবে
এলাহী ওয়াদা পূরণ হবে, মজলুমরা ক্ষমতা পাবে।

একটি নতুন দিনে একটি নতুন ভোর আসবে
আল-কুদস স্বাধীন হবে, সকলে আবার ঘরে ফিরবে
সেই দিনের অপেক্ষাতে, আমি তারই আশাতে।
__________________________________________

      কবিতা: তাক্বওয়াপূর্ণ জীবন

রমজান থেকেই আত্মার সাথে
আত্মার হোক মিলন,
ধনী-দরিদ্র সবার যেন
সমান হয় জীবন-যাপন।

তসবী পড়ব দিবা-রাতি
করবো খোদার ইবাদত,
সিয়াম সাধনায় লাভ করবো
চিরসুখের আড়ৎ।

ভোরের আগেই করবো সাহরী আর
রাতে ইফতারের আঞ্জাম,
উপস থাকব সারাটা দিন আর
গাইবো খোদার গুণগান।

বন্ধু-শত্রু কারোর কোনো 
করবোনা গো ক্ষতি,
দোয়া করবো প্রভূর নিকট 
হয় যেন নেক-প্রাপ্তি।

মাহে রমজানেই করবো গঠন
তাক্বওয়া পূর্ণ জীবন,
যে যেমন পারি পাক-সাফ করবো
নিজ দেহ ও মন।
_____________________________________
 
          আত্মনাদ

১. তোমরা চলে গেলে
আমাদের একা ফেলে,
অন্তর করে হাহা-কার
শোনা যায়
মজলুমদের চিৎকার । 

২. দুর্বোধ্য আঁধারে 
মাহদীর আলো জলে ,
শোনা যায় এক ধ্বনি
মাহদী আদরিকনী।

৩. হিংসার বেড়াজালে 
আরবেরা জায়েনবাদের কোলে 
নিরুপায় গাজাবাসি
আশ্রয়ের অভিলাষী।

৪. হাসান ইব্রাহিম, সোলেমানী
 ছিল তারা মেহদী আর্মি
 তাদের শহীদে 
মজলুমেরা বিপাকে।

৫. প্রত্যাশার নির্যাস 
খুঁজে পায় আশ্বাস ,
ইরানের দিকে চেয়ে
মুক্তি হবে অবশেষে।
_________________________________________

     ইমাম আসবে তাই
       ✍️ রাজা আলী 

সময়ের কড়িকাঠে 
ধরেছে ঘুণ
চারিদিকে আগুন 
নেভাবে কে?

সমাজের মেরুদন্ড 
ভেঙেছে আজ
চলছে অন্যায় রাজ
শেষ করবে কে?

মজলুমের সমস্যা
একা সে
অত্যাচারী দলে ভারী রে
এর শেষ কবে?

ইমাম আসবে তাই
এত কিছু 
অত্যাচারী হবে শিশু
সময়ের সাথে সাথে।

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ) || রমযান সংখ্যা ||

আরবি : রমযান, ১৪৪৭ হিজরী ইংরেজি : মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ __________________________________________               সম্পাদক  :  ম...