Friday, March 14, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_ (অনলাইন সংস্করণ) || রমজান সংখ্যা ||

                          
             

আরবি: রমজান, ১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: মার্চ, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
__________________________________________

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

             প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন এবং মুন্তাজির গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা,মিনা খাঁন,উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                             সূচিপত্র 
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড : সম্পদ বা ক্ষমতা নয়, খোদা ভিতিই কাম্য -- মাওলানা কবির আলি তরফদার কুম্মী 

ইমাম হাসান আঃ এর পরিচয় ও শিক্ষা মূলক বাণী -- মাওলানা মহম্মদ সুজাউদ্দিন মাসহাদী

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)

ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা, ঈশ্বরকে জানার পথ এবং সৃজনশীল যুক্তি: একটি বিশদ পর্যালোচনা -- মাওলানা রিপন মন্ডল ইস্পাহানী 

মাহে রমজান ও রোজার মাহাত্ম্য -- মইনুল হোসেন

মোমিন ব্যক্তিদের রোজা -- মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত:মানব মুক্তির চাবিকাঠি --  রাজা আলী 

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
             

আল-কুদস :-- মইনুল হোসেন

তাক্বওয়াপূর্ণ জীবন :--মিনহাজউদ্দিন মন্ডল


ইমাম আসবে তাই :-- রাজা আলী 


__________________________________________
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের বরকতে প্রকাশিত হলো আল হুজ্জাত পত্রিকার (অনলাইন) দ্বিতীয় সংস্করণ। পবিত্র রমযান মাস উপলক্ষে প্রকাশিত এই সংখ্যায় রমযান এবং ইমাম মাহদী আঃ বিষয়ক কিছু আলোচনা স্থান পেয়েছে। রমযান মাসের গুরুত্ব অশেষ।এই গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে এবং যুগের হাদী ইমাম মাহদী আঃ এর নাম প্রচারের উদ্দেশ্যে রমযান সংখ্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই ছোট্ট খেদমতকে তাঁর দরবারে কবুল করুন। এবং যুগের ইমাম আঃ এর ওছিলায়  পত্রিকা প্রকাশে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার তৌফিক দান করুন।
                 
                                ওয়াস সালাম 
        মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)
__________________________________________------------------------------------------------

📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖
📃কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা🧾
📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖📖

শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড : সম্পদ বা ক্ষমতা নয়, খোদা ভিতিই কাম্য

اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ ۚ وَفَرِحُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مَتَاعٌ
“আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা সংকীর্ণ করেন। তারা দুনিয়ার জীবনে আনন্দিত হয়, অথচ দুনিয়ার জীবন পরকালের তুলনায় কেবল সামান্য ভোগমাত্র।” — (সুরাহ আর-রাদ: ২৬)

এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, সম্পদ ও দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য চূড়ান্ত সম্মান বা শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়; বরং এগুলো সাময়িক এবং প্রকৃত মর্যাদা নির্ভর করে তাকওয়া ও সৎকর্মের ওপর।

এখানে একটি প্রশ্ন হচ্ছে,
ধন-সম্পদই কি শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি?
কুরআন ও হাদীস আমাদের এই প্রশ্নের কি উত্তর দেয়,আসুন নিম্নে কয়েকটি  আয়াত ও হাদীসের আলোকে উত্তর নেওয়ার চেষ্টা করি।

ভূমিকা: 
সমাজে আমরা প্রায়ই দেখে থাকি যে ধনী ব্যক্তিদের কথাই বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়, তারা অধিক সম্মানিত হয় এবং তাদের মতামতকেই শেষ কথা হিসেবে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন, যার বেশি সম্পদ রয়েছে, সেই-ই উত্তম। কিন্তু কুরআন ও আহলুল বায়েত (আ.)-এর হাদিস কি এই ধারণাকে সমর্থন করে? বরং আল্লাহর বাণী ও আহলুল বায়েতের শিক্ষায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া, চারিত্রিক গুণ ও আমলের ভিত্তিতে, ধন-সম্পদের ভিত্তিতে নয়।

# কুরআনের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড:

১. তাকওয়া—আসল শ্রেষ্ঠত্ব:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা স্পষ্টভাবে বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
(হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান (পরহেজগার)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।) — (সুরাহ হুজুরাত: ১৩)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কুরআনের দৃষ্টিতে ধন-সম্পদ, বংশ, জাতি বা সামাজিক অবস্থান নয়; বরং তাকওয়াই (আল্লাহভীতি ও ন্যায়পরায়ণতা) প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড।

২. ধনী হওয়া কখনোই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়:

অনেকে মনে করেন, যার কাছে প্রচুর সম্পদ আছে, সে নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে প্রিয়। কিন্তু কুরআন এই ধারণাকে নাকচ করে বলে:

وَمَا ٱلْمَالُ وَلَا ٱلْبَنُونَ بِٱلَّتِى تُقَرِّبُكُمْ عِندَنَا زُلْفَىٰٓ إِلَّا مَنْ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحًا فَأُو۟لَٰٓئِكَ لَهُمْ جَزَآءُ ٱلضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا۟ وَهُمْ فِى ٱلْغُرُفَٰتِ ءَامِنُونَ
(তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকট সান্নিধ্য লাভ করাবে না; বরং যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তারাই দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবে এবং তারা জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষসমূহে নিরাপদে থাকবে।) — (সুরাহ সাবা: ৩৭)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে বোঝায় যে সম্পদ কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে না, বরং ঈমান ও সৎকর্মই প্রকৃত মূল্যবান।

# আহলুল বায়েত (আ.)-এর হাদিসে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড:

১. ইমাম আলী (আ.)-এর শিক্ষা:

ইমাম আলী (আ.) ধনীদের অহংকার ও দারিদ্র্যের প্রতি সমাজের তাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন:

"ধনীরা যদি দান না করতো এবং দরিদ্ররা ধৈর্য ধারণ না করতো, তবে এই সমাজ ধ্বংস হয়ে যেতো।"
— (নাহজুল বালাগা, হিকমাহ ২০৯)

অর্থাৎ, ধনীদের উচিত অহংকার না করে সম্পদকে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা এবং দরিদ্রদেরও ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখা উচিত।

২. ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর শিক্ষা:

এক ব্যক্তি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "মানুষ কি তার ধন-সম্পদের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে?"
তিনি উত্তর দিলেন:

"ধন-সম্পদ মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড নয়; বরং তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতাই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।" — (আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২৩)

হাদিসটি এটা স্পষ্ট করে দেয় যে, আহলুল বায়েত (আ.)-এর দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে চারিত্রিক গুণাবলির ওপর, সম্পদের ওপর নয়।

৩. ইমাম হাসান (আ.)-এর শিক্ষা:

ইমাম হাসান (আ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি তার সম্পদের কারণে অহংকারী হয়, সে আসলে নিজেকেই ধোঁকা দেয়। কেননা, সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ভালো চরিত্র ও আমল চিরস্থায়ী।" — (মিজানুল হিকমাহ)

এই হাদিস থেকে এটা বোঝা যায় যে, সম্পদ একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু সৎকর্ম ও ভালো চরিত্রই মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।

উপসংহার

কুরআন ও আহলুল বায়েত (আ.)-এর শিক্ষা স্পষ্টভাবে বলে যে, ধন-সম্পদ কখনোই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়। বরং তাকওয়া, ঈমান, ন্যায়পরায়ণতা, চারিত্রিক গুণ এবং সৎকর্মই মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে।

আজকের সমাজে আমাদের উচিত ধনীদের( যাদের মধ্যে তাকওয়া,ঈমান,ন্যায়পরায়ণতা,সুন্দর চরিত্র এবং সৎকর্ম নেই) তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ না করে, বরং সৎ ও তাকওয়াবান ব্যক্তিদের মর্যাদা দেওয়া। তাহলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ প্রকৃত অর্থে সম্মানিত হবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথের উপর পরিচালিত করুন।
__________________________________________

ইমাম হাসান আঃ এর পরিচয় ও শিক্ষা মূলক বাণী

মহান আল্লাহ তাঁর (ইমাম হাসান মুজতাবা) মাধ্যমে আমার উম্মতের মধ্যে দু'দলকে সন্ধি করাবেন এবং তারা তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ অস্তিত্বের মাধ্যমে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও শান্তি লাভ করবে।' রাসূলুল্লাহ (সা.) (মশহুর হাদীস)

 জন্ম : ৩য় হিজরির ১৫ রমযান, মঙ্গলবার অথবা বৃহস্পতিবার, পবিত্র মদীনা নগরী।

 নাম : হাসান (তাওরাতে শুব্বার এবং ইনজীলে তাব)

 কুনিয়াত : আবু মুহাম্মাদ

 লকব : মুজতাবা, তাইয়্যেব, সাইয়্যেদ, ওয়ালী, তাকী, হুজ্জাত, 
কায়েম, ওয়াযির, আমীন।

 প্রহরী: দু'ব্যক্তি মহান ইমামের প্রহরী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। একজনের নাম সাফিনা (রাসূলুল্লাহ সা.-এর গোলাম) এবং অন্যজনের নাম কায়েস ইবনে আবদুর রহমান।

 ইমামত কাল: প্রায় ১০ বছর (৪০ হিজরির ২১ রমজান শুক্রবার তাঁর ইমামতকাল শুরু হয়)

 মানব জীবনের জন্য ইমাম হাসান (আ.) হতে বর্ণিত কতিপয় অমীয় বাণী 👇👇👇👇👇👇👇👇

 সালামের গুরুত্ব:

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি সালাম প্রদানের পূর্বে কথা শুরু করে তার কথার উত্তর দিও না'।

 জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব:

তিনি (আ.) বলেছেন: 'নিরবতা, ত্রুটি গোপন রাখে এবং সম্মান রক্ষা করে। যে এ গুণের অধিকারী সে সর্বদা প্রশান্তিতে থাকে এবং তার সহচর ও তার সাথে ওঠাবসাকারীরাও তার হতে নিরাপদে থাকে।'

 শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য ও কল্যাণ:

তিনি (আ.) বলেছেন: 'যে কল্যাণের মাঝে কোন মন্দ থাকে, তা হল নেয়ামতের বিপরীতে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও বিপর্যয়ের সময় ধৈর্য ধারণ করা।'

 বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতা:

তিনি (আ.) বলেছেন: 'জনগণের সাথে উত্তম ব্যবহার, বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতার পরিচয়'।

 ওয়াজিবের জন্য মুস্তাহাব কর্ম ত্যাগ করা:

তিনি (আ.) বলেছেন: 'যখন মুস্তাহাব ইবাদাত ও কর্মসমূহ, ওয়াজিব ইবাদাত ও কর্মসমূহের ক্ষতিসাধন করে তখন তা ত্যাগ করো।'

*আধ্যাত্মিক বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান*

তিনি (আ.) বলেছেন: 'আমি ঐ সকল ব্যক্তিদের বিষয়ে আশ্চর্য হই,যারা নিজেদের শরীরের খাদ্যের বিষয়ে চিন্তা করে;কিন্তু আধ্যাত্মিক বিষয়াদি ও আত্মার খাদ্যের বিষয়ে চিন্তা করে না। ক্ষতিকর খাদ্য থেকে নিজের পেটকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু যে সকল নোংরা চিন্তা তার অন্তরকে দূষিত করে তা হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে না।'

 আত্মীয়তার বিষয়:

জনৈক ব্যক্তি ইমাম হাসান (আ.) এর উদ্দেশ্যে বললেন: আমার একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা রয়েছে, কেমন ব্যক্তির সাথে তার বিবাহ দেব? ইমাম হাসান (আ.) বললেন: এমন ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে দাও, যে তাকাওয়াকারী ও পরেজগার। কেননা তাকওয়াবান ব্যক্তি যদি তাকে ভালবাসে তবে তাকে সম্মান করবে। আর যদি তাকে ভাল নাও বাসে তবে অন্তত তার উপর অত্যাচার করবে না।'

 ইমামের দৃষ্টিতে রাজনীতি:

জনৈক ব্যক্তি ইমাম (আ.) কে সিয়াসাত তথা রাজনীতির অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন: 'রাজনীতি হল, আল্লাহর অধিকার এবং আল্লাহর জীবিত ও মৃত বান্দাদের অধিকার মেনে চলার নাম। অতঃপর তিনি ব্যখ্যা ঞদিতে গিয়ে বলেন: 'আল্লাহর অধিকার হল, যা কিছু মহান আল্লাহ্ বাস্তবায়নের নির্দেশ ও আঞ্জাম দিতে নিষেধ করেছেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা'। আল্লাহর জীবিত বান্দাদের অধিকার হল, নিজের দ্বীনি ভাইয়ের বিষয়ে তোমার কর্তব্যকে পালন করা, তোমার দ্বীনি ভাইয়ের সেবা দানের ক্ষেত্রে বিলম্ব না করা এবং ইসলামি সমাজের নেতার বিষয়ে, যতক্ষণ সে জনগণের বিষয়ে একনিষ্ঠ থাকে ততক্ষণ তুমিও তার প্রতি একনিষ্ঠ থেকো, আর যখন সে সত্য পথ হতে বিভ্রান্ত হয়ে যায়,তখন তার প্রতিবাদ জানাও'। আর আল্লাহর মৃত বান্দাদের অধিকার হল; 'তাদের উত্তম কর্মসমূহকে স্মরণ করা এবং তাদের মন্দ কর্মসমূহকে গোপন করা। 
__________________________________________

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব (অনুবাদ)

মূল লেখক: ড. হাদী ক্বান্দেহারী

" ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের সুখবর আসমানী পুস্তকগুলির মধ্যে আছে। আর সমস্ত ওলীগণ ও আম্বীয়াগণ ঐ দিনের অপেক্ষা করছে। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই গাইবাত কতদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে; আর আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ইমাম মাহদী (আঃ)-কে কোন্ দিন আবির্ভাবের অনুমতি দেবেন, তা তিনি ছাড়া আর সকলেরই অজানা। তাই ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আবির্ভাবের নির্ধারিত দিন যদি কেউ ঘোষণা করে, তাহলে সে মিথ্যাবাদী। এপ্রসঙ্গে ইমাম মাহ্দী (আঃ) একটি পত্রে লিখেছেনঃ

أما ظهور الفرج فإنه إلى الله وكزب الوقاتون   “ আবির্ভাবের হুকুম  (আদেশ) আল্লাহর হাতে ; আর  যারা আবির্ভাবের জন্য সময় নির্ধারণ করবে, তারা মিথ্যাবাদী” (অনুবাদ)।

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর গাইবাতের যুগ শীয়াদের প্রকৃত সমাস্যার সময়। এই যুগ সমাপ্ত হওয়া ও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভূত হওয়া মানুষের দোয়া ও মোনাজাতের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন বানী ইস্রাইলদের দোয়া ও কান্না-কাটিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের চার শ' বছরের আযাবকে হাল্কা করে দেয়, আর ১৭০ বছরের আযাবকে ক্ষমা করে দেয়। আর হজরত মুসা (আঃ)-কে তাদের আম্বিয়া হিসাবে পাঠিয়ে ফিরআউনের জঘন্য কার্যকলাপ থেকে পরিত্রাণ দেয়। এই কারণেই জাফর সাদিক (আঃ) মুসলমানদের বিশেষ ভাবে বলেছেন 'ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবের জন্য আল্লাহ্ দরবারে বানি ইস্রাইলদের মতো দোয়া প্রার্থনা ও কান্না-কাটি করো'।

ইমাম মাহ্দী (আঃ) ক্বাবা ঘরের নিকট হাজ্বরে আসওয়াদ নামক স্থান থেকে আবির্ভূত হবেন। সেই সময় সেখানে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর ৩১৩ জন আসহাব থাকবে। আবির্ভাবের পর জিব্রাইল ক্বাবা ঘরের ছাদ থেকে ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের ঘোষণা করবেন। এই ঘোষণার স্বর এবং উদ্দেশ্য সমগ্র পৃথিবীর মানুষ শুনতে এবং বুঝতে পারবে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থান থেকে মোমেনীনরা তাঁর বায়াত গ্রহণ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে। হজরত ঈসা (আঃ) চতুর্থ আসমান থেকে আসবেন। আর ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর বায়াত গ্রহণ করে তাঁর সৈন্যদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবেন। এবং তাঁর পিছনে নামাজ আদায় করবেন। যে সমস্ত মোমেনীন ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশা রাখত, অথচ জীবদ্দশায় সাক্ষাৎ করতে পারেনি; আল্লাহ্ তাদেরকেও পুনরায় জীবিত করবেন। আর তারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পক্ষ থেকে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।

এই ধারাবাহিকতায় ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহাবীদের সংখ্যা যখন দশ হাজারে পৌঁছাবে, তখন তিনি 'ক্বেয়াম' করবেন। প্রথমে মক্কা জয় করে মদীনা; আর সেখান থেকে কুফা পৌঁছাবেন । কুফাকেই সমগ্র পৃথিবীর রাজধানী নির্বাচন করে, সেখান থেকেই গোটা পৃথিবী শাসন করবেন। ক্রমান্বয়ে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সাহায্যকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাছাড়াও ফারিসতারা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আদেশ পালন করতে থাকবে। আর শত্রুরা ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যবাহিনী দেখে ভয় পাবে। তাদের সামনে কোনো ভাবেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। তারা একের পর এক জয়ী হবে, কখনো পরাভূত হবে না। কয়েকটি কারণে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যদলের সামনে শত্রুরা নত হবে। কারণগুলি হ'ল, -

(ক) মোজেযা ও খোদায়ী চিহ্নের নিদর্শন।

(খ) ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর অন্তরজয়ী আলাপ ও কথাবার্তা।

(গ) ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তাঁর সৈন্যদের আচার-আচরণ,

মানুষ্যত্ববোধ ও আন্তরিকতা ইত্যাদি। ইসলাম বিরোধী ইহুদী ও আহলেবায়েতের শত্রুদের সমস্ত রকম বিরোধীতাকে ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর সৈন্যরা কঠোর ভাবে প্রতিরোধ করবে। মাত্র আট মাসের মধ্যেই পূর্ব ও পশ্চিম দিক ব্যাপী ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর এই শাসনের একটি উদ্দেশ্য হল জালিম ও অত্যাচারীদের থেকে অসহায় মানুষদের হক্ক বুঝে দেওয়া এবং কাফির ও মুশরিকদের (ইমাম (আঃ)-এর আবির্ভাবের পরেও যদি কাফির থেকে যায়) হত্যা করা। ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর শাসনে আহলেবায়েতের শত্রুরা অপমানিত ও লজ্জিত হবে । ফাসাদকারী ও বিরোধীতাকারীরা উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহর সমস্ত শত্রুদের হত্যা করা হবে। সমস্ত পৃথিবীতে ইমাম মাহ্দী (আঃ) ও তার অনুসারীদের সুশাসন চলবে। এবং পৃথিবীর বুকে সঠিক দ্বীন প্রচারিত হবে। হে আল্লাহ্, ঐ দ্বীনের আবির্ভাবকে দ্রুত ত্বরান্বিত করুন। আমীন।
__________________________________________

ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা, ঈশ্বরকে জানার পথ এবং সৃজনশীল যুক্তি: একটি বিশদ পর্যালোচনা

ভূমিকা:
ঈশ্বর পরিচয় একটি মৌলিক বিষয়,যা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্ম, দর্শন এবং বিজ্ঞান আলোচনা করে আসছে। ঈশ্বরকে চেনা এবং তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানমূলক এবং আধ্যাত্মিক দায়িত্ব। এই প্রবন্ধে আমরা তিনটি প্রধান বিষয় বিশদভাবে আলোচনা করব।

1. ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা- কেন মানুষকে ঈশ্বরকে জানতে হবে?
2. ঈশ্বরকে জানার পথ – ঈশ্বরকে জানার বিভিন্ন উপায় কী?
3. সৃজনশীল যুক্তি – বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে শৃঙ্খলা ও নিয়ম রয়েছে, তা কীভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ?

1.ঈশ্বর পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা:

১.১. মানুষের প্রকৃতি ও ঈশ্বরের অনুসন্ধান: মানুষের প্রকৃতিতে সবসময়ই একজন উচ্চ সত্তার সন্ধান করার প্রবণতা রয়েছে। প্রতিটি যুগে মানুষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং তার অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করেছে এবং কিছু মৌলিক প্রশ্ন করেছে। যেমন-

ক।আমি কে?
খ।আমার সৃষ্টিকর্তা কে?
গ।আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?

এই প্রশ্নগুলি আমাদের ঈশ্বরের পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়। কুরআনও এই স্বাভাবিক অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে:
"অতএব তুমি একনিষ্ঠ ভাবে নিজেকে সত্য ধর্মের দিকে স্থাপন কর—এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা রূম ৩০)

১.২. নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রয়োজন:

যদি ঈশ্বরকে অস্বীকার করা হয়, তবে ন্যায়-অন্যায়ের কোনও চূড়ান্ত মানদণ্ড থাকে না। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস থাকার কারণেই নৈতিকতার ভিত্তি শক্তিশালী হয়। যদি কোনও সৃষ্টিকর্তা এবং পরকাল না থাকে, তবে একজন মানুষ কোনও অপরাধ করার পরেও কোনও উচ্চ আদালতের ভয় ছাড়াই জীবন যাপন করতে পারে।

১.৩. মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক চাহিদা:

ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস মানুষের মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। অনেক মানুষ যখন কঠিন সময়ের মধ্যে পড়ে, তখন প্রার্থনা এবং আল্লাহর স্মরণ তাদের প্রশান্তি দেয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"সাবধান! আল্লাহর স্মরণেই অন্তর শান্তি পায়।" (সূরা রাদ ২৮)

১.৪. বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রয়োজন:

বিজ্ঞান উন্নতির পরও অনেক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ:

ক।বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কীভাবে সৃষ্টি হল?
খ।জীবনের মূল উদ্দেশ্য কী?
গ।মানুষের চেতনা কীভাবে বিকশিত হল?

এই প্রশ্নগুলি আমাদের ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে।

# ঈশ্বরকে জানার পথ:
২.১. প্রকৃতির মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:

আল্লাহ বিশ্বকে এমন এক অনন্য শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন,যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে। যেমন:
ক।সূর্য ও চাঁদের নির্দিষ্ট কক্ষপথ,
খ।পৃথিবীর সঠিক গতি ও দূরত্ব,
গ।মানবদেহের জটিল গঠন,
ঘ।উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের বিস্ময়কর ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি।

এই সমস্ত কিছু একজন মহান স্রষ্টার অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। কুরআনে বলা হয়েছে:
"নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" (সূরা আলে ইমরান ১৯০)

২.২. ওহী ও নবীদের মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:

আল্লাহ মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবী ও ওহীর ব্যবস্থা করেছেন।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর যুগে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে একত্ববাদের প্রচার করেছিলেন।

হযরত মূসা (আ.) তূর পর্বতে আল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন।

হযরত ঈসা (আ.) অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে আল্লাহর শক্তিকে প্রকাশ করেছিলেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা শেষ ওহী এবং সর্বদা ঈশ্বরের পরিচয়ের মাধ্যম।


২.৩. যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:

দার্শনিক ও পণ্ডিতরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের জন্য বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। যেমন:

1. কসমোলজিক্যাল যুক্তি – প্রতিটি জিনিসের একটি কারণ থাকে, তাই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেরও একটি কারণ থাকতে হবে, এবং সেটি হল ঈশ্বর।


2. নৈতিক যুক্তি – যদি ঈশ্বর না থাকেন, তবে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।


3. নিয়ম-শৃঙ্খলার যুক্তি – বিশ্বে যে শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা রয়েছে, তা একজন মহান স্রষ্টার ইঙ্গিত দেয়।


২.৪. আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ঈশ্বরের পরিচয়:

অনেক মানুষ প্রার্থনা, উপাসনা এবং সুফিবাদের মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য অনুভব করে। সুফি সাধক ও অলিয়াগণের জীবন এ বিষয়ে সর্বোত্তম উদাহরণ।

৩. সৃজনশীল যুক্তি:

সৃজনশীল যুক্তি এই ধারণার উপর ভিত্তি করে যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি উপাদান একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার সাথে তৈরি হয়েছে, যা একজন বুদ্ধিমান স্রষ্টার উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।

৩.১. বিশ্বে বিদ্যমান শৃঙ্খলা:

সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব: যদি পৃথিবী সূর্যের কাছাকাছি হতো, তবে তা পুড়ে যেত, আর দূরে হলে ঠাণ্ডা য় জমে যেত।

মাধ্যাকর্ষণ শক্তি: এটি যদি বেশি বা কম হতো, তবে জীবন অসম্ভব হয়ে পড়ত।

অক্সিজেনের পরিমাণ: বায়ুমণ্ডলে মোটামুটি ২১% অক্সিজেন রয়েছে, যা জীবনের জন্য নিখুঁত।


৩.২. জীববৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা:

ডিএনএ কোড: মানুষের ডিএনএ একটি অত্যন্ত জটিল তথ্যভাণ্ডার, যা একটি মহান স্রষ্টার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।

চোখের গঠন: মানব চোখ এতটাই জটিল যে আধুনিক বিজ্ঞান আজও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

৩.৩. মানব মস্তিষ্ক ও চেতনা:

মানব মস্তিষ্ক বিশ্বের সবচেয়ে জটিল কম্পিউটার। যদি সাধারণ একটি যন্ত্র নিজে নিজে তৈরি হতে না পারে, তাহলে এত জটিল মস্তিষ্ক কীভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হলো?

উপসংহার
ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বীকৃতি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, যা জীবন সম্পর্কে গভীর প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে। বিশ্বে বিদ্যমান শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য আমাদের সৃষ্টিকর্তার পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়।আল্লাহ বলেন:
"তারা কি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর শাসন সম্পর্কে চিন্তা করে না?" (সূরা আল-আ’রাফ ১৮৫)
এই আলোচনা ঈশ্বরকে জানার গুরুত্ব, তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাসের কারণ তুলে ধরে।
__________________________________________

মাহে রমজান ও রোজার মাহাত্ম্য

পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াত থেকে ইসলামে রোজার গুরুত্ব অনুমান করা যায়। উদাহরণস্বরূপ “ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই এটা বিনয়ীদের ব্যতীত অন্যদের জন্য কঠিন” (সূরা বাকারাহ, আয়াত ৪৫)। বিভিন্ন তাফসীরে ‘ধৈর্য’-কে রোজা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কারণ রোজার মধ্য দিয়ে দিনের কিছু অংশে খাওয়া-দাওয়া ও অন্য কিছু কাজ ত্যাগ করা ধৈর্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপ। মুসলমানদেরকে কঠিন সমস্যা ও বিপদের সম্মুখীন হলে রোজার আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। যদিও রোজা রমজান মাসের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত, তবুও এটি এমনই একটি ফযিলতপূর্ণ ইবাদত যা রমজানের বাইরেও পালন করা যেতে পারে - বিশেষ করে রজব ও শাবান মাসের মতো নির্দিষ্ট মাসে এবং সোম ও বৃহস্পতিবারের মতো নির্দিষ্ট দিনে রোজা রাখতে বিশেষ তাগিদ করা হয়েছে।

আল্লাহ‌র নবী (সাঃ) এর বর্ণনা অনুযায়ী রমজান মাসঃ

শাবান মাসের শেষ শুক্রবারে মহান নবী (সাঃ) এর দেওয়া একটি বিখ্যাত খুতবায় (খুতবা-এ-শাবানীয়াহতে) তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, “হে লোকেরা! আল্লাহর মাস তোমাদের দিকে আসছে বরকত, রহমত এবং মাগফেরাত নিয়ে।” এখানে লক্ষণীয় যে, এই তিনটি ঐশী উপহার (অর্থাৎ রহমত, বরকত ও মাগফেরাত) এই মাসের শেষে দেওয়া হবে তা নয় বরং এগুলো রমজান মাসের শুরু থেকেই প্রাপ্ত হয়।

নবীকরীম (সাঃ) আরও বলেছেন, “এটি এমন একটি মাস যাতে তোমাদেরকে আল্লাহর মেহমানদারীতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।” অর্থাৎ গোটা মানবজাতিকে ‘আমন্ত্রণ’ জানানো হয়েছে। অতএব আল্লাহর এই মেহমানদারীতে প্রবেশ করার জন্য মানুষকে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। উল্লেখ থাকে যে, মহান আল্লাহর এই বিশেষ মেহমান (অতিথি) হওয়ার মর্যাদা পাওয়ার জন্য রোজা একটি শর্ত।

ঐশী মেহমান সম্পর্কে কিছু কথাঃ

১. যখন কাওকে নিমন্ত্রণ জানানো হয় তখন তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয় না। সুতরাং নিমন্ত্রণকর্তা তার অতিথিদের স্বাগত জানাবেন, অন্যথায় নিমন্ত্রণ অর্থহীন দাঁড়ায়। সেই অনুযায়ী যখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রমজানের মেহমানদারীতে আমন্ত্রণ জানান, তখন যারা আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তাদের জন্য তাঁর রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়।

২. যখন কেউ নিমন্ত্রণ স্থলে প্রবেশ করে, তখন তার সঙ্গে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করা হয়। যদিও নিমন্ত্রিত অতিথিদের প্রত্যেকেই সম্মানিত হওয়ার যোগ্য নয়, তবুও অতিথি হওয়ার সুবাদে তাদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা হয়। উপরের খুতবায় উল্লেখিত নিম্নলিখিত বাক্যটি অনুধাবনের দাবী রাখে - “এই মাসে তোমাদেরকে সেই লোকদের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে যাদেরকে আল্লাহ সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন”।

৩. যখন কেউ কোনও নিমন্ত্রণ বাড়িতে যায়, তখন তাকে বিনামূল্যে কিছু দেওয়া হয় বা দেখানো হয়। অন্য কথায়, নিমন্ত্রিত অতিথি কোনো প্রতিদান ছাড়াই কিছু পাওয়ার আশা করে। একইভাবে রমজানের ঐশী মেহমানদারীতে আল্লাহতা’লা কেবল আমাদের কাজগুলো উদারভাবে পুরস্কৃত করেন তা নয়, বরং তাঁর অতিথিদের বিভিন্ন অনুগ্রহ দিয়ে আপ্যায়ণ করেন। এমনকি তারা বড়ধরনের তেমন কিছু না করলেও মহান আল্লাহ তাঁর অতিথিদেরকে বিশেষ বিশেষ মর্যাদা ও অনুগ্রহ দান করেন। যেমনটি একই খুতবায় আরও উল্লেখ হয়েছে - “এতে (এই রমজান মাসে) তোমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস আল্লাহর তাসবীহ এবং এতে (এই রমজান মাসে) তোমাদের ঘুম আল্লাহর ইবাদত।”

খুতবাটির অন্য জায়গাতে মহান নবী (সাঃ) আরও বলেছেন, “মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে এই মাসটি শ্রেষ্ঠ মাস, এর দিনগুলো শ্রেষ্ঠ দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘন্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘন্টা।” অর্থাৎ অন্য মাসের তুলনায় এই মাসের প্রতিটি অংশ অন্য প্রতিটি মাসের অংশের চেয়ে উত্তম।

রমজান মাসের জন্য সুপারিশঃ

উক্ত খুতবাটির অন্য একটি অংশে বলা হয়েছে, “হে মানব সম্প্রদায়! এই মাসে জান্নাতের দরজা খোলা থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি সেগুলো তোমাদের জন্য বন্ধ না করেন।"

‘জান্নাতের দরজা খোলা’ - এই বাক্যাংশের অর্থ নিমরূপ হতে পারে -

১. অন্যান্য মাসের তুলনায় এই বরকতময় মাসে জান্নাতে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জনের সম্ভাবনা বেশি। 

২. জান্নাতের দরজা খোলা থাকার কারণে, জান্নাতের সমস্ত ধরণের ঐশী রহমত এই জগতে বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। জান্নাতের বাতাস এই জগতে প্রবাহিত হয়। এগুলো রমজান মাসে রোজাদারদের শ্বাস-প্রশ্বাস ও ঘুমকে জান্নাতবাসীদের মতো আল্লাহর তাসবীহ ও ইবাদতে পরিণত করে।

রমজান মাসে শয়তানের অবস্থাঃ

“এবং শয়তান শিকলবদ্ধ। সুতরাং তোমাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি তাদের তোমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না দেন।” যদিও শয়তান এবং তার সহযোগীরা এই মাসে শিকলবদ্ধ থাকে, তবে গুনাহ করার ফলে তারা মুক্তি পায়। অতএব রমজান মাস শ্রেষ্ঠ মাস হলেও একদল লোকের জন্য এই মাসটি অন্যান্য মাসের চাইতে খারাপ। ঠিক যেমনভাবে পবিত্র কুরআন “বিশ্বাসীদের জন্য নিরাময় ও রহমত; এবং এটি কেবল অত্যাচারীদের ক্ষতি বৃদ্ধি করে” (১৭:৮২)।

কেয়ামত দিবস সম্পর্কে সতর্কীকরণঃ

উক্ত খুতবায় পবিত্র নবী (সাঃ) আরও বলেছেন, “এই মাসে তোমাদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে কেয়ামতের দিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ করো।” এই পৃথিবীতেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা খুব কঠিন। তাহলে আমাদের অবশ্যই এই সত্যটি নিয়ে চিন্তা করতে হবে যে পরকালের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বছরের পর বছর বা কিছু সম্প্রদায়ের জন্য চিরকাল স্থায়ী হবে। উপরন্তু এই জগতে অসহনীয় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সমাধান হিসেবে মৃত্যুকে গণ্য করা যেতে পারে। কিন্তু পরবর্তী জগতে অনন্ত জীবন। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তারা চিৎকার করে বলবে, ‘হে মালিক! [জাহান্নামের রক্ষকের নাম] আপনার রব যেন আমাদের শেষ করে দেন!’ তিনি বলবেন, ‘নিশ্চয়ই তোমরা এখানেই থাকবে” (৪৩:৭৭)।

পবিত্র কুরআন অনুসারে, পরকালে অত্যাচারীদের জন্য কোনো মৃত্যু নেই এবং এমনকি যখন তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, তখন একটি নতুন চামড়া প্রতিস্থাপন করা হবে যাতে পরকালের শাস্তি সর্বদা নতুন করে অনুভূত হয়। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই যারা আমার নিদর্শন ও অলৌকিকতায় অবিশ্বাস করেছে, আমি তাদের আগুনে নিক্ষেপ করব। যখনই তাদের চামড়া সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যাবে, আমরা তাদের জন্য অন্য চামড়া পরিবর্তন করব যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৪:৫৬)।

পরকালের কথা স্মরণ করানোর পাশাপাশি রমজান মাসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যারা না খেয়ে থাকার অনুভূতি অনুভব করে। যারা রোজা রাখে তারা তাদের সম্পত্তির কিছু অংশ আল্লাহর পথে এবং অভাবী মানুষদের জন্য ব্যয় করতে উৎসাহিত হয়।

রোজাদারদের সম্পর্কে দুটি হাদিসঃ

(১) প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কিছু ফেরেশতাকে শুধুমাত্র রোজাদারদের জন্য দোয়া করতে নিযুক্ত করেছেন। জিব্রাইল আমাকে জানিয়েছেন যে আল্লাহ বলেছেন: ‘আমি আমার ফেরেশতাদের আমার সৃষ্টির কারো জন্য দোয়া করার আদেশ দিইনি, যতক্ষণ না আমি তাদের জন্য সেই দোয়া কবুল করি।”

(২) ষষ্ঠ ইমাম, ইমাম সাদিক (আঃ) বলেছেন, “যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গরমের দিনে রোজা রাখে এবং তৃষ্ণার্ত হয়, তখন আল্লাহ এক হাজার ফেরেশতা পাঠান তার মুখ স্পর্শ করতে এবং ইফতারের সময় পর্যন্ত তাকে সুসংবাদ দিতে, তখন আল্লাহ তাকে বলেন: ‘তোমার গন্ধ কত সুন্দর! তোমার আত্মা কত আনন্দদায়ক! হে আমার ফেরেশতারা! সাক্ষ্য দাও যে আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি”।
__________________________________________

      মোমিন ব্যক্তিদের রোজা

বাতাসে রমজানের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, জানান দিয়ে যাচ্ছে পবিত্রতার বার্তা। আরবি মাসসমূহের নবম মাস পবিত্র রমজান মাস। আরবি অন্যান্য মাসের মতো রমজানও একটি মাস, তবে অন্যান্য মাসের চেয়ে ফজিলতপূর্ণ হওয়ায় এর মূল্য ও মর্যাদা অনেক বেশি। কারণ রমজান কোরআন অবতরণের মাস, রহমত বর্ষণের মাস।

রোজা হল ইসলামের ফুরুয়েদিন এর দ্বিতীয় স্তম্ভ। 'রোজা' শব্দটি ফারসি। এর আরবি পরিভাষা হচ্ছে সাওম, বহুবচনে বলা হয় সিয়াম। সাওম অর্থ বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা। সাওম এর সংজ্ঞা দিতে গেলে বলা যায় যে, আল্লাহর সন্তুটির কামনায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহ পানাহার থেকে বিরত থাকা।

তবে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকলেই রোজার হক আদায় হয়ে যাবে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখেও অশ্লীল কাজ ও পাপাচার ত্যাগ করতে পারল না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো মূল্য নেই।’ সুতরাং পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং অন্যান্য আমল ও ইবাদতে নিজেকে মশগুল রাখতে হবে, তবেই রোজার পূর্ণ হক আদায় হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীরুতা) অবলম্বন করতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত, ১৮৩)

যেহেতু রোজা আল্লাহর বিধান এবং আমাদের জন্য তা ওয়াজিব করা হয়েছে, তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রোজা পালন ও রোজার অন্যান্য হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

রোজা রাখার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ করে। কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। মানুষ এ মাসে  আল্লাহর ভয়ে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে দূরে থাকে। যেন সে ঘোষণা করে, ‘আমরা শুনেছি এবং পালন করেছি! হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাই আর প্রত্যাবর্তন তোমারই কাছে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৫)

রোজা রাখলে মানুষের ভেতর ধৈর্য ও দৃঢ়তা তৈরি হয়, যা মনুষ্যত্ব বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোজাদারের সামনে বাহারি রকম সুস্বাদু ও উপাদেয় খাবার উপস্থিত থাকার পরও সে সেদিকে চোখ তুলে তাকায় না। সে তা করে না কেবল আল্লাহর ভয়ে। রোজা মানুষের প্রত্যয়, দৃঢ়তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দেয় বলেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা পালন করে। রোজা তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। 

 রোজায় করণীয় ও বর্জনীয় : 
রোজা রাখার মাধ্যমে যেহেতু তাকওয়া অর্জন হয়, তাই রমজান মাসে প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, তাকওয়া অর্জনের জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। রমজান মাসে একটি নেক আমলের সওয়াব ৭০ গুণ। তাই এই মাসে আমরা মুখরোচক ইফতার সামগ্রী আর সেহরি নিয়ে ব্যস্ত না থেকে যথাসম্ভব ইবাদত ও আমলে মশগুল থাকব। বেশি বেশি দান-সদকা করব।

বছরের অন্যান্য সময় ঘুমের কারণে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে আমাদের অনেকরই কষ্ট হয়ে যায়, রমজান আমাদের জন্য তাহাজ্জুদ আদায়ের সুবর্ণ সুযোগ। তাই সেহরির কিছু সময় আগে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করে; আল্লাহ তায়ালার দরবারে হাত তুলে নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতেও যেন শয়তানের ধোকা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর পথে চলতে পারি, সেজন্য দোয়া করা উচিত।

রমজানে আমাদের বেশি বেশি ইস্তেগফার পড়া উচিত। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করো। এতে আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপরাশিকে মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে। (সূরা তাহরিম, আয়াত, ৮)

রমজান কোরআন নাজিলের মাস, তাই এই মাসে আমাদের বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা এবং অর্থ বুঝে তেলাওয়াত করা উচিত।এতে করে আমরা কোরআনে আল্লাহ তায়ালা কী বলেছেন, তা সহজেই বুঝতে পারব এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারব।
     আমাদের স্মরণে রাখতে হবে যে, শুধু বাহ্যিক অবয়ব ও দৈহিক কাঠামোর নাম মানুষ নয়, বরং মনুষ্যত্ব লাভের জন্য আরো কিছুর প্রয়োজন। যার ভিত্তিতে তারা সৃষ্টিজগতে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। আর তা হলো আত্মা। আত্মাই মূলত মানুষের ভেতর বুদ্ধি, বিবেক ও চিন্তা-ভাবনার শক্তি সৃষ্টি করে। রুহ বা আত্মার অনন্য বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই সে সৃষ্টিজগতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে এবং ফেরেশতাদের সিজদা লাভের উপযুক্ত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তাতে আমার রুহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৭২)
আর মানুষের আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায় প্রবৃত্তি দমনের মাধ্যমে। প্রবৃত্তি পূরণের প্রধান দুটি মাধ্যম হলো পেট ও লজ্জাস্থান। মানুষ যখন পেট ও লজ্জাস্থানের ব্যাপারে সংযত হতে শেখে, তখন তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।এভাবেই যদি আমরা আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ দিয়েই রোজা রাখি অর্থাৎ চোখ দিয়ে হারাম কিছু না দেখে, কান দিয়ে হারাম কিছু না শুনে, নাক দিয়ে হারাম কিছুর সুগন্ধ না নিয়ে, জিহ্বা বা মুখ দিয়ে কাওকে কটু কথা না বলে, হাত-পা দিয়ে কোনো ব্যক্তির ক্ষতি না করে সারা দিন কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চিন্তায় মত্ত থেকে দুনিয়াবী কাজ করে যেতে পারি, তবেই সম্মানের সঙ্গে আমাদের হাসর ও নাসর হবে 
ইনশা আল্লাহ্! আল্লাহ আমাদের সকলকেই প্রকৃত মোমিন ব্যক্তিদের ন্যায় সিয়াম সাধনের তৌফিক দান করুন। আমিন...সুম্মা আমিন।
_________________________________________

ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত:মানব মুক্তির চাবিকাঠি

ইমাম মাহদী আঃ এর অস্তিত্ব এবং আর্বিভাব দ্বীন ইসলামের একটি মূলগত ভিত্তি।শীয়া মাযহাবের গবেষণা ও বিশ্বাস হলো ইমাম মাহদী আঃ ইতিপূর্বে জন্ম নিয়েছেন এবং অন্তর্ধানে আছেন।সময় হলেই আত্মপ্রকাশ করবেন। তাঁর এই অন্তর্ধানের সময় ও সীমার মধ্যে আমাদের প্রধান কর্তব্য তাঁর পরিচিতি বা মারেফাত অর্জন করার প্রচেষ্টা চালানো।এ বিষয়ে আল্লাহর নবীর বিখ্যাত হাদীস হলো--"যে ব্যক্তি তার নিজের যুগের ইমাম কে না চিনে মারা যায়,তার মৃত্যু জাহেলিয়াতের মতোই"।এই হাদীস থেকেই যুগের ইমাম আঃ কে চেনার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

     আল্লাহ রব্বুল আলামীন প্রত্যেক যুগের জন্য একজন প্রতিনিধি বা ইমাম রেখেছেন। এ যুগেও যে ইমাম রয়েছেন, সে বিষয়ে আমরা অবগত। তবে ইমাম আঃ কে চেনা বা তার মারেফাত অর্জনের বিষয়টি এখনো অনেক শিয়া এসনা আসারি সম্পূর্ণ উপলব্ধি ও অনুধাবন করতে পারি নি। ইমাম আঃ মারেফাত বা পরিচিতি অর্জন ই যে মানব মুক্তির একমাত্র উপায় সে বিষয়ে বক্ষমান নিবন্ধে আলোচনা করবো।

    মারেফাত একটি আরবি শব্দ। শব্দটি র অর্থ হলো জ্ঞান, চেতনা বা অন্তর্দৃষ্টি। শব্দটি মূলত গভীর আত্মজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ এর মারেফাত বলতে ইমাম আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন বা চেতনা বৃদ্ধি কে বোঝানো হয়েছে।যদি ইমাম আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন সম্ভব না হয় বা তাঁর সম্পর্কে ধারণা ও উপলব্ধি তৈরি না হয়,তবে পার্থিব ও পরলোকগত সফলতা অসম্ভব।

        বর্তমান শীয়া সমাজের   অনেক মানুষ এটাই মনে করে যে, ইমাম মাহদী আঃ হলেন ইমামতের শেষ কড়ি এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ই যথেষ্ট কিংবা ইমাম আঃ নাম-পরিচয় জেনে রাখাই আমাদের কর্তব্য।অর্থাৎ ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি মারেফাত অর্জন কে তাত্ত্বিক দিক নির্দেশনা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র পরিসরে অনেকেই বেঁধে ফেলেছে।এই সংকীর্ণ চিন্তা থেকে আমাদের বার হতে হবে এবং কোরান ও হাদিসের দৃষ্টিতে ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের যে তাগিদ রয়েছে,তা আমাদের অনুধাবন করে তাঁর প্রতি কর্তব্য পালনে অগ্রসর হতে হবে।কেননা ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও উপলব্ধি ছাড়া তাঁর আসহাব  কিংবা শাফায়াত লাভ আমাদের নসিবে হবে না। 

     ইমাম মাহদী আঃ সম্পর্কে সম্যক ও গভীর জ্ঞান আমাদের চিন্তা -চেতনা এবং কাজ-কর্মকে প্রভাবিত করে। আমাদের নৈতিক কর্তব্য ও মানবতাকে উদ্বোধিত করে সৎ কর্ম শীল মুমিন ব্যক্তি তে পরিণত করে। সুতরাং ইমাম আঃ এর সম্যক পরিচিতি বা মারেফাত আমাদের একাধিক কল্যাণে র কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন--
    ১. ইমাম আঃ মারেফাত অর্জনের ফলে ইমামতের শেষ প্রতিনিধি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি হয়।ফলে ইমাম আঃ এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মহব্বত তৈরি হয়।

২. ইমাম আঃ এর মারেফাত আমাদের সাহস ও শক্তি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিক কর্তব্য সম্পাদনে সাহায্য করে।

৩. ইমাম আঃ মারেফাত আমাদের ইমাম আঃ এর প্রকৃত অপেক্ষা কারী হিসাবে বাঁচতে শেখায়।

৪. ইমাম আঃ এর আবির্ভাবের সূত্র ধরে কেউ কেউ মিথ্যা মাহদী দাবি করে। সেই "মিথ্যা মাহদী" দের চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং বিভ্রান্তি এড়ানো যায়।

৫. ইমাম আঃ এর প্রতি উচ্চ মারেফাত তাঁর আসহাব ও আনসার হওয়ার পথকে সুগম করবে।

     বর্তমান আলোচনা র সাপেক্ষে এটা বলা যায় যে, ইমাম আঃ এর প্রতি গভীর জ্ঞান ও মারেফাত কিন্তু আবশ্যিক। নতুবা ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৃত দ্বীনদার হওয়া সম্ভব নয় কিংবা মানব মুক্তি ত্বরান্বিত হবে না‌।তাই ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি মারেফাত অর্জনের জন্য এখন থেকেই আমাদের সচেতন হতে হবে।
__________________________________________------------------------------------------------

📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜
📃  📃   📃  কবিতায় দ্বীনি বার্তা  🧾  🧾  🧾
📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜📜


       কবিতাঃ আল-কুদস
         ✍️ মইনুল হোসেন

আল-কুদস আমার হৃদয়ে
আল-কুদস আমার অন্তরে 
চিরকাল থাকবে, অনন্তকাল থাকবে। 

এটি শান্তির সুন্দর শহর
এটি ঈমানের উজ্জ্বল নিদর্শন
কখনো ভুলব না, আমি তা ভুলব না। 

আমি শোকাহত, অশ্রুশিক্ত আমার নয়ন 
আমার সুন্দর শহরটি বন্দী, ধ্বংস হয়েছে সবই।
কেউ খোঁজ নেয়নি, তার কোনও খোঁজ নেয়নি।

জায়নবাদের গোলাম হওয়ার দৌড়ে
আরব মুসলিম শাসক সব বিধর্মী পথে
আল-কুদস একা পড়ে, আজও সে একা পড়ে।

কেউ হয়তো ভুলে যেতে পারে, 
কিন্তু আমি ভুলব না, কারণ 
এটি আমার অন্তরে, সর্বদা আমার অন্তরে। 

লাখো মজলুমের আকুতি আর
সহস্র শহীদের রক্তের দাগ
বৃথা সে যাবে না, হতে তা দেবো না।

জালেমদের আজকের এই উৎপীড়ন
বন্ধ হবে, এইসব মৃত্যু মিছিল সেটাও থামবে
এলাহী ওয়াদা পূরণ হবে, মজলুমরা ক্ষমতা পাবে।

একটি নতুন দিনে একটি নতুন ভোর আসবে
আল-কুদস স্বাধীন হবে, সকলে আবার ঘরে ফিরবে
সেই দিনের অপেক্ষাতে, আমি তারই আশাতে।
__________________________________________

      কবিতা: তাক্বওয়াপূর্ণ জীবন

রমজান থেকেই আত্মার সাথে
আত্মার হোক মিলন,
ধনী-দরিদ্র সবার যেন
সমান হয় জীবন-যাপন।

তসবী পড়ব দিবা-রাতি
করবো খোদার ইবাদত,
সিয়াম সাধনায় লাভ করবো
চিরসুখের আড়ৎ।

ভোরের আগেই করবো সাহরী আর
রাতে ইফতারের আঞ্জাম,
উপস থাকব সারাটা দিন আর
গাইবো খোদার গুণগান।

বন্ধু-শত্রু কারোর কোনো 
করবোনা গো ক্ষতি,
দোয়া করবো প্রভূর নিকট 
হয় যেন নেক-প্রাপ্তি।

মাহে রমজানেই করবো গঠন
তাক্বওয়া পূর্ণ জীবন,
যে যেমন পারি পাক-সাফ করবো
নিজ দেহ ও মন।
_____________________________________
 
          আত্মনাদ

১. তোমরা চলে গেলে
আমাদের একা ফেলে,
অন্তর করে হাহা-কার
শোনা যায়
মজলুমদের চিৎকার । 

২. দুর্বোধ্য আঁধারে 
মাহদীর আলো জলে ,
শোনা যায় এক ধ্বনি
মাহদী আদরিকনী।

৩. হিংসার বেড়াজালে 
আরবেরা জায়েনবাদের কোলে 
নিরুপায় গাজাবাসি
আশ্রয়ের অভিলাষী।

৪. হাসান ইব্রাহিম, সোলেমানী
 ছিল তারা মেহদী আর্মি
 তাদের শহীদে 
মজলুমেরা বিপাকে।

৫. প্রত্যাশার নির্যাস 
খুঁজে পায় আশ্বাস ,
ইরানের দিকে চেয়ে
মুক্তি হবে অবশেষে।
_________________________________________

     ইমাম আসবে তাই
       ✍️ রাজা আলী 

সময়ের কড়িকাঠে 
ধরেছে ঘুণ
চারিদিকে আগুন 
নেভাবে কে?

সমাজের মেরুদন্ড 
ভেঙেছে আজ
চলছে অন্যায় রাজ
শেষ করবে কে?

মজলুমের সমস্যা
একা সে
অত্যাচারী দলে ভারী রে
এর শেষ কবে?

ইমাম আসবে তাই
এত কিছু 
অত্যাচারী হবে শিশু
সময়ের সাথে সাথে।

Monday, February 10, 2025

আল-হুজ্জাত পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ) || ইমাম মাহ্দী (আ:) সংখ্যা ||

আল-হুজ্জাত পত্রিকা_মাসিক (অনলাইন সংস্করণ)
আরবি: শাবান,১৪৪৬ হিজরী
ইংরেজি: ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

             সম্পাদক : 
মাওলানা কাজিম আলি (আশিক হুসাইন)

সহযোগী সম্পাদক: রাজা আলী

প্রচ্ছদ ভাবনা:
মিনহাজউদ্দিন এবং মুন্তাজির গাজী

অনলাইন সেটিং: মিনহাজউদ্দিন

              প্রকাশ:
আল -হুজ্জাত(আঃ) একাডেমী 
বকচরা,মিনা খাঁন,উত্তর ২৪ পরগণা

__________________________________________

                          সূচিপত্র 

💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐
💐কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা💐
💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐

ইমাম মাহদী (আঃ) এর গায়বতের যুগ: আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য --  মাওলানা কবির আলি তরফদার কুম্মী 

কুরআন ও হাদীসের আলোকে ইমাম মাহদী (আঃ)--মাওলানা মহম্মদ সুজাউদ্দিন মাসহাদী

আমাদের প্রতি ইমাম মাহদী (আঃ) এর পেয়গাম (অনুবাদ) -- মাওলানা কাজিম আলি তরফদার

গায়বাতে থাকা ইমামের উপকারিতা

সুন্নী আলীমদের মত:ইমাম মাহদী (আঃ)-ই দ্বাদশ ইমাম (অনুবাদ) -- মিনহাজউদ্দিন মন্ডল

ইমাম মাহদী (আঃ): দ্বীন ইসলামের সর্বশেষ প্রতিনিধি-- মো: মুনতাজির হোসেন গাজী

ইমাম মাহদী (আঃ) এর জন্য অপেক্ষা:গভীরতা ও গুরুত্ব -- রাজা আলী






💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐
💐💐💐💐কবিতায় দ্বীনি বার্তা💐💐💐💐💐
💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐
             

শহীদের স্মরণে  :-- মুন্তাজির হোসেন গাজী

ইচ্ছা  :--রাজা আলী 

আধ্যাত্মিক জ্ঞানী  :--মিনহাজউদ্দিন মন্ডল
__________________________________________

                        সম্পাদকীয়

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের প্রতি। তাঁর অপার করুণায় অবশেষে আল-হুজ্জাত পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ প্রকাশিত হলো। ইমাম মাহদী আঃ আমাদের যুগের সর্বশেষ হাদী, যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশী সত্ত্বা এবং মহাকালের ত্রাণকর্তা।এ কারণেই এই মহা সত্ত্বা র প্রতি কোরান ও হাদীসে অসংখ্য নির্দেশিকা রয়েছে।যার মূল কথা হলো, ইমাম আঃ এর মারেফাত অর্জন ব্যতীত আমাদের মুক্তি নেই।আর তাঁর প্রতি আবেগ ও অপেক্ষা ই মুমিনের লক্ষণ। সুতরাং বর্তমান গায়বতের যুগে ইমাম কে চেনা এবং চেনানোর গুরুত্ব অপরিসীম।আর সেই প্রচেষ্টার ক্ষুদ্র অংশ হিসাবে আল হুজ্জাত পত্রিকা র অনলাইন সংস্করণ প্রকাশিত হলো।
                                ওয়াস সালাম 

__________________________________________
------------------------------------------------
 ||  কুরআন ও আহলে বাইত(আঃ) এর বার্তা  ||
------------------------------------------------
__________________________________________

ইমাম মাহদী (আঃ) এর গায়বাতের যুগ:আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম ইসলামের চূড়ান্ত যুগে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক নেতা।যিনি দুনিয়ায় সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবেন এবং অত্যাচার ও অবিচারকে দূর করবেন। শিয়া মুসলিমরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি বর্তমানে গায়বাতে আছেন এবং এক সুনির্দিষ্ট সময়ে আবির্ভূত হবেন। এই সময়কালে শিয়া মুসলিমদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে।যা কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিশদভাবে বক্ষমাণ প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে। 

আল্লাহর প্রতি গভীর ঈমান ও ইখলাস রাখা:
কুরআনে আল্লাহ বলেন, "তোমরা আল্লাহ এবং তার রাসুলের আনুগত্য কর এবং বিভেদে পড়ো না।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৯) শিয়াদের উচিত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অনুগত থেকে ইমাম মাহদীর প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখা। এই গায়বাতের সময়কালে বিশ্বাসে অবিচল থাকা জরুরি, কারণ এটি একটি পরীক্ষার সময়কাল। এই সময় ঈমান দৃঢ় হলে তারা অন্য সকল প্রলোভন ও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পাবে।

ইমামের জন্য অপেক্ষা করা (ইন্তিজার):
হাদিসে ইন্তিজার বা ইমাম মাহদীর জন্য অপেক্ষাকে ইবাদতের সমতুল্য বলা হয়েছে। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আমার উম্মতের মধ্যে যারা মাহদীর জন্য অপেক্ষা করবে, তারা আমার পথে থাকবে"(মুসনাদে আহমাদ)।
ইমামের জন্য অপেক্ষা করাটা শুধু সময় পার করা নয়, বরং তাঁর আদর্শকে ধারণ করা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখা।

নৈতিকতা ও সততার পথে চলা:
কুরআনে বলা হয়েছে, "আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দেন"(সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)শিয়া মুসলিমদের উচিত তাদের জীবনে নৈতিকতা বজায় রাখা এবং প্রতিটি কাজে সততার পথ অবলম্বন করা। ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক, তাই তাঁর অনুসারীদেরও উচিত প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা।

ইমামের জন্য দোয়া করা:
ইমাম মাহদীর গায়বাতে তাঁর সুস্থতা, দীর্ঘায়ু এবং দ্রুত আবির্ভাবের জন্য নিয়মিত ভাবে দোয়া করা শিয়াদের দায়িত্ব। ইমাম মাহদী আলাইহিস সালামের জন্য একটি বিশেষ দোয়া আছে—যা প্রতি শুক্রবার পাঠ করা হয়। এই দোয়া তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ, যা ঈমানকে আরও মজবুত করে তোলে।

ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন এবং প্রচার করা:
শিয়াদের উচিত ইমামের অনুপস্থিতিতে কুরআন, হাদিস, এবং আহলে বায়তের শিক্ষাকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা এবং তা সমাজে প্রচার করা। ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম আসার পর তাঁর শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে বলা হয়েছে, "তোমরা জ্ঞান অর্জন করো এবং জ্ঞান প্রচার করো।" (সূরা আলাক, ৯৬:১)

সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা ও জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া:
ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম অবিচার এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন এবং তাঁর অনুসারীদের কাছ থেকেও এই প্রত্যাশা রয়েছে। শিয়াদের উচিত সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং কোনো ধরনের অবিচার বা অন্যায়ের সাথে আপস না করা। কুরআনে আল্লাহ বলেন, "তোমরা ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে যায়"(সূরা আন-নিসা, ৪:১৩৫)।

ইমামের প্রতীক্ষায় আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় থাকা:
ইমাম মাহদী আলাইহিস সালামের গায়বাতের সময়কাল দীর্ঘ হলেও ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা শিয়াদের দায়িত্ব। ইমাম মাহদী আঃ এর প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা এবং তাঁর আবির্ভাবের প্রতি আস্থা রাখা একজন শিয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য বলেই পরিগণিত হয়। 

অন্যদের সাহায্য করা এবং দয়া প্রদর্শন করা:
ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম মানবতার জন্য দয়া ও সহমর্মিতার প্রতীক। শিয়াদের উচিত তাঁর গায়বাতের সময়েও এই গুণগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করা এবং সমাজে দরিদ্র ও নিপীড়িতদের সাহায্য করা। কুরআনেও বলা হয়েছে, "আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করেন" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৫)।


ইমামের আদর্শ অনুসারে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে পরিবর্তন আনা:
ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম আসার পর তাঁর নেতৃত্বে শিয়াদের সত্যের পথে অবিচল থাকতে হবে। এজন্য বর্তমানে নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও পরিবর্তন আনা জরুরি। তাদের উচিত নিজেদের আচার-আচরণ, চিন্তাধারা এবং সামাজিক ভূমিকা ইসলামি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।

উপসংহার:
ইমাম মাহদী আলাইহিস সালামের গায়বাতে শিয়াদের দায়িত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমুখী। আল্লাহ ও ইমামের প্রতি আনুগত্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ধৈর্য ও আশাবাদী থাকা, এবং ইসলামের আদর্শে নিজেদের জীবনকে পরিচালনা করা তাদের প্রধান কর্তব্য। যদি শিয়ারা তাদের এই দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করতে সক্ষম হয়, তবে তারা ইমাম মাহদী আলাইহিস সালামের যোগ্য অনুসারী হতে পারবে এবং তাঁর নেতৃত্বে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারবে।


__________________________________________


ইমামে যামানা (আঃ): কুরআন ও হাদিসের আলোকে


"যে ব্যক্তি তার জামানার ইমামকে না চিনে মৃত্যু বরণ করে সে জাহিলিয়্যাতের মৃত্যুবরণ করে।" (মশহুর হাদীস)

এই হাদীসটির মতো আরো কয়েকটি হাদীস আছে। যেমন: "যে ব্যক্তি মারা যায় অথচ তার গলায় বাইয়াতের রশি থাকে না সে কুস্ত্রীর মৃত্যুবরণ করে" (সহীহ্ মুসলিম,তাফসীর ইবনে কাসীর।)

"যে ব্যক্তি ইমাম ছাড়া মৃত্যুবরণ করে সে কুস্ত্রীর মৃত্যুবরণ করে।" (মুসনাদে আহমাদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-৯৬)

এই তিনটি হাদীস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বাইয়াত ও অনুসরণ ছাড়া মারিফাত তথা পরিচয় অর্জন সম্ভব নয়। আর এ কারণে আহলে কিতাব (ইহুদী ও খৃষ্টান) নবী (সাঃ) কে ভালোভাবে চিনলেও তাঁর অনুসরণ করতো না বলে তাদের এ চেনার কোনো মূল্য ছিলো না। মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: "যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা তাঁকে (নবী সাঃ) চেনে সেভাবে, যেভাবে তারা তাদের সন্তানকে চেনে।" (বাকারাহ: ১৪৬, আনআম: ২০)

কারণ, তাওরাত ও ইঞ্জিলে নবী (সাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিলো।যার কারণে তারা নবী (সাঃ)-এর আগমনের জন্য অপেক্ষাও করতো।

কিন্তু কুরআন কি বলেছে যে, সব জামানায় একজন ইমাম থাকা জরুরী?

অবশ্যই। মহান আল্লাহ কিয়ামত সম্পর্কে বলেছেন "সেদিন আমরা প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামসহ ডাকবো।" (বনি ইসরাইল: ৭১)

এজন্যই সকল জামানায় একজন 'সত্য ইমাম' থাকা এবং তাঁর আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক। এই আনুগত্যের কারণে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামের সাথে ডাকা হবে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, তাহলে কি 'মিথ্যা ইমাম'ও হতে পারে? অবশ্যই। প্রত্যেক ব্যক্তি, যে এমন দীনের অনুসরণ করে যার অনুসরণের অনুমতি আল্লাহ তাকে দেননি;সে ব্যক্তি মিথ্যা ইমাম-এর অনুসারী এবং কিয়ামতের দিন তাকে উক্ত ইমামের সাথেই ডাকা হবে এবং তার সাথেই তাকে জাহান্নামে পাঠানো হবে। যেমন ফেরাউন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন- 'সে কিয়ামাতের দিন তার সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে এবং তাদেরকে নিয়ে সে আগুনে প্রবেশ করবে।' (হুদ: ৯৮)

প্রশ্ন হতে পারে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো মানুষের আনুগত্য করা কী জায়েজ? আনুগত্য পাওয়া শুধু আল্লাহরই অধিকার, যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের রিযিক দিয়েছেন এবং সকল প্রকার নেয়ামত প্রদান করেছেন। আর এজন্য মহান আল্লাহ আমাদেরকে যদি কোনো ব্যক্তির আনুগত্য করার আদেশ দেন,তাহলে তাঁর আনুগত্য করা আমাদের জন্য ওয়াজিব। ইরশাদ হচ্ছে- "আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর (কর্তৃত্বের অধিকারী) তাদের।" (নিসা: ৫৯) তিনি আরো বলেছেন: "রাসুলকে এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছি যে আল্লাহর অনুমতিতে তাঁর আনুগত্য করা হবে।" (নিসা: ৬৪) রাসুলুল্লাহ্ (সা)-এর আনুগত্য ওয়াজিব। একারণে যে আল্লাহ এব্যাপারে অনুমতি ও আদেশ দিয়েছেন।

এখন বুঝতে হবে আয়াতে উল্লেখিত 'কর্তৃত্বের অধিকারী' (উলিল আমর) কারা যাদের আনুগত্য আল্লাহ ওয়াজিব করেছেন?

যখন এই আয়াত নাযিল হয় তখন নবী (সাঃ)-কে 'উলিল আমর' বা 'কর্তৃত্বের অধিকারী' কাদেরকে বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তখন তিনি (সাঃ) বলেন, "উলিল আমর হচ্ছে আলী (আঃ) এবং ঐ ইমামগণ যারা তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে হবে" (ফারায়িদুস সামতাঈন)।

ফখরুদ্দীন রাযী তার 'তাফসীর-ই কাবীর' গ্রন্থে এই আয়াত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সকল জামানায় 'উলিল আমর' থাকা অত্যাবশ্যক। এ কারণে আয়াতে যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে,তাঁরা ঐ সকল লোক যারা সুদীর্ঘকাল ধরে ঈমান আনতে থাকবে। আর এ থেকে উলিল আমরের 'নিষ্পাপ' হওয়ার কথাটিও প্রমাণিত হয়ে যায়। কারণ এখানে তাঁদের আনুগত্যকে নবী (সাঃ)-এর আনুগত্যের সমান বলা হয়েছে। (তাফসীরে কাবীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা-৩৫৭)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "আমার পরে ১২ জন আমীর হবেন, তাঁদের প্রত্যেকেই কুরাইশ থেকে।" (বোখারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নং-৬৭৯৬)

তিনি (সাঃ) আরও বলেছেন: "আমার পরে ১২ জন ইমাম হবেন, তাঁদের প্রত্যেকেই বনি হাশেম থেকে।" (ইয়ানাবিয়্যুল মুয়াদ্দাত, পৃষ্ঠা-৪৪৫, ইস্তাবুল)

ইবনে আরাবী স্বীয় কিতাব 'ইবক্বাউল ক্বাইয়্যিম'-এর ২৬৬ নং অধ্যায়ে লিখেছেন, "তোমরা নিঃসন্দেহে জেনে নাও মাহদী (আঃ) আত্মপ্রকাশ করবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর বংশধর এবং ফাতেমা (আঃ)-এর সন্তান হবেন। তাঁর পূর্বপুরুষ হুসাইন বিন আলী ইবনে আবিতালিব (আঃ)। তাঁর পিতা আল হাসান আল আসকারী, ইবনুল ইমাম আলী নাক্বী ইবনুল ইমাম মুহাম্মাদ তাক্বী ইবনুল ইমাম আলী রেযা ইবনুল ইমাম আল কাযিম ইবনুল ইমাম আস সাদিক, ইবনুল ইমাম আল বাক্কির ইবনুল ইমাম যায়নুল আবেদীন আলী ইবনুল ইমাম আল হোসাইন, ইবনুল ইমাম আলী ইবনে আবিতালিব (আঃ)। তাঁর নাম রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামে হবে। মুসলমানরা তাঁর হাতে বাইয়াত হবে রুক্ত ও মাকামের মাঝখানে...।

ইমাম মাহদী (আঃ) ইমাম হাসান আল আসকারী (আঃ)-এর সন্তান। তিনি ২৫৫ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর থেকে তাঁর পিতা তাঁকে শত্রুর ভয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখে ছিলেন। ২৬০ হিজরীতে শত্রুরা তাঁর পিতাকে গ্রেফতার করে হত্যা করে। এসময় আল্লাহ ইমাম মাহদী (আঃ)-কে রক্ষা করার জন্য তাঁকে অদৃশ্য করে ফেলেন। তিনি ২৬০ হিজরী থেকে ৩২৯ হিজরী পর্যন্ত স্বল্পকালীন অন্তর্ধানে ছিলেন। এই সময় তিনি একাদিক্রমে ৪ জন বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। অতঃপর ৩২৯ হিজরী থেকে এখনো পর্যন্ত তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় দীর্ঘ মেয়াদী অন্তর্ধানে বিরাজ করছেন। যখন আল্লাহর আদেশ হবে তখন তিনি মানবজাতিকে উদ্ধারের জন্য আবির্ভূত হবেন।

তাঁর এ দীর্ঘ জীবন কোনো আশ্চর্যজনক ও নতুন বিষয় নয়। বিশ্বাসীদের মধ্যে হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত খিজির (আঃ) এবং ইলিয়াস (আঃ) এবং ঈসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন লাভ করেছেন। আর অবিশ্বাসীদের মধ্যে ইবলিস (শয়তান) আর দাজ্জাল দীর্ঘ জীবন লাভ করেছে।

এ ধরনের হাদীস যাহাবী তাঁর 'সিআরু আলামুন নুবালা', খন্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৪১, শিবলাঞ্জী তাঁর 'নুরুল আবসার', পৃষ্ঠা ১৮৬ এবং সিত্ত ইবনে জওযী তাঁর 'তাক্বীরাতুল খাওয়াস' গ্রন্থের পৃষ্ঠা ৩৬৩ তে উল্লেখ করেছেন।

শিবলাঞ্জী ও ইবনে সাব্বাঘ মালিকী বলেছেন: "যখন মাহদী (আঃ) আত্মপ্রকাশ করবেন তখন তিনি কাবাগৃহে স্বীয় পিঠ ঠেকিয়ে অবস্থান নিবেন, আর তাঁর ৩১৩ জন পুরুষ তাঁকে আনুগত্য করবেন। সর্বপ্রথম তিনি এই আয়াতটি পাঠ করবেন: 'বাক্বিয়াতুল্লাহি খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম মুমিনীন' (হুদ: ৮৬) এবং বলবেন, 'আমিই বাক্বিয়াতুল্লাহ, আল্লাহর খলিফা এবং তোমাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কর্তৃত্বকারী।' যে কেউ তাকে সালাম করবে বলবে 'আসসালামু আলাইকা ইয়া বাক্বীয়াতুল্লাহি ফীল আরদ।' (নুরুল আবছার, পৃষ্ঠা ১৭২, আল-ফুসুলিল মুহিম্মা, অধ্যায় ১২)

ইমাম মাহদী (আঃ) অতঃপর তাঁর ৩১৩ জন বিশ্বস্ত সেনাপতি ও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তাঁর সাহায্যকারীদের দ্বারা এই পৃথিবীকে অন্যায় অত্যাচার থেকে মুক্ত করে পবিত্র করে দিবেন। এ সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) বলেছেন: 'মাহদী আমার আহলে বাইত থেকে হবে এবং পৃথিবীকে সেরূপে ন্যায় ও সাম্যে পূর্ণ করে দিবে যেরূপে অন্যায় ও অত্যাচারে তা পূর্ণ হয়ে পড়বে। (মুসনাদে আহমাদ, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩২৭)

ইমাম মাহদী (আঃ) এর আগমনের আলামত সম্পর্কে যে হাদীসগুলো রয়েছে তা পাঠ করার পর বুঝা যায় যে তাঁর আগমন অত্যাসন্ন। যেমন রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, "একদল লোক পূর্ব দিক থেকে বের হবে যারা তাঁর আগমনকে লক্ষ্য রেখে সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করবে।" (সুনানে ইবনে মাযা, খন্ড-২, হাদীস নং-৪০৮৮)

বর্তমান কালেও এর দুটো আলামত দেখা যাচ্ছে: ১. তাঁকে যারা বিশ্বাস করে এবং সাহায্য করতে চায় তাঁরা তাঁর আগমন ত্বরান্বিত হবার জন্য প্রতিদিন দোয়া করছে। 
২. তাঁকে সাহায্য করবে এমন এক সৈন্যবাহিনীও মধ্যপ্রাচ্যে তৈরী হচ্ছে।

এভাবে আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ হুজ্জাতের মাধ্যমে সকল দীনের ওপর তাঁর নিজের দীনকে বিজয়ী করবেন "তিনিই তাঁর রাসুলকে পথ-নির্দেশ ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন যেন তাকে সকল দীনের ওপর বিজয়ী করতে পারেন, মুশরিকরা তা যতই অপ্রীতিকর মনে করুক।" (তওবা: ৩৩)

__________________________________________

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর পেয়গাম (বার্তা) : অনুবাদ


ইমাম মাহ্দী (আঃ) থেকে একাধিক পেয়গাম শীয়াদের কাছে পৌঁছেচে। এই পেয়গামগুলির মধ্যে বেশির ভাগ প্রশ্ন-উত্তর হিসাবে স্থান পেয়েছে। বিভিন্নি সময় 'নওয়াবে আরবাআ'রা' মানুষের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা নিয়ে ইমাম মাহদী (আঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলে ইমাম (আঃ) একটি লেখা নকশা তৈরী করেন। আর ঐ লেখা নকশাটি কামালুদ্দিন শেখ ছোদুক (৩৮১ হিজ্বরী) এবং ইহুতেজাজে শেখ ত্বাবরেসীর (৫৮০ হিজ্বরী) পুস্তকে স্থান পেয়েছে। ঐ লেখাগুলি ছাড়াও ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর একাধিক উক্তি ও কথা পাওয়া যায়,যা হয়ত শীয়াদের কাছে পৌঁছেচে তাঁর শিশু বয়সে সাক্ষাতের মাধ্যমে কিম্বা গাইবাত কালে সাক্ষাতের মাধ্যমে। ইমাম মাহদী (আঃ)-এর তাওহীদ ও তাফসীরে কোরআন বিষয়ে, ইমামত এবং আহলেবায়েতের স্থান বিষয়ে, বেদ্বীন ও পথভ্রষ্টদের আক্বীদার পরিবর্তন বিষয়ে, ইমাম মাহ্দী হওয়ার মিথ্যাদাবীকারী ও প্রতিনিধি হওয়া বিষয়ে, বিভিন্ন মাসলা-মাসায়েলের ইমাম (আঃ) কর্তৃক ব্যাখ্যা বিষয়ে, দোয়া ও যকর বিষয়ে, চরিত্র ও ফিক্বহ্ বিষয়ে যে সমস্ত আদেশ-আশ্বাস, কথা ও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তা শীয়া মাযহাব সম্পর্কে পরিচিত  হওয়ার অতুলনীয় সম্পদ স্বরূপ। এ অধ্যায়ে আমি ইমাম আঃ এর কতকগুলি উপদেশ তুলে ধরছি,--


(ক) মানুষকে নিরর্থক সৃষ্টি করা হয়নি:

" কোনো সন্দেহ নেই, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সৃষ্টিকূলকে বেকার সৃষ্টি করেন নি। আর কোনো উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা ব্যতীত পৃথিবীতে ছাড়েনি" (অনুবাদ)।

(খ) প্রত্যেকটি যুগে আল্লাহ্ র প্রতিনিধি প্রয়োজন:

"কখনও জমীন আল্লাহর হুজ্জাত ব্যতীত শুন্য থাকবে না,তা সেটা প্রকাশ্যে থাক অথবা গোপনে"।

(গ) ইমামতের অধিকার:

"হক্ক আমাদের সঙ্গে; আর আমাদের ব্যতীত কেউ দাবী করলে সে মিথ্যাবাদী"।

(ঘ) গাইবাতের যুগে মানুষের উপকার:

"আমার গাইবাতের যুগে আমার থেকে মানুষ উপকৃত হবে, এটা নিশ্চিত। যেমন সূর্য মেঘের আড়ালে অন্তর্হিত হওয়ার পরেও সূর্য থেকে মানুষ উপকৃত হয়”।

(ঙ) সর্বশেষ ওছি:

"আমি ওছি গণদের মধ্যে শেষতম ওছি। আল্লাহ্ আমার থেকে আমার বংশ এবং শীয়াদের উপর থেকে বালা মঙ্গীবত দূরে রাখবেন"।

(চ) আহলেবায়েতই যথার্থ জ্ঞানের ভান্ডার:

আহলে বায়েতের পথ ব্যতীত অন্য কোনো পথে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা আমাদের আহলে বায়েতকে অস্বীকার করা।

(ছ) অনুসন্ধিৎসু হওয়া:

যদি তোমরা হেদায়েতের অন্বেষণ কর, তবে হেদায়েত পাবে; আর যদি হক্কের অন্বেষণ কর, তবে হক্ক পাবে।

(জ) মাহ্দী (আঃ)-এর সাক্ষাৎ না পাওয়ার কারণ:

আমাকে আমার শীয়াদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাদের খারাব আমল। কারণ, খারাব আমল আমার অপছন্দ; আর আমি তাতে অসন্তুষ্ট।

(ঝ) গাইবাতের যুগে শীয়াদের দায়িত্ব:

তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এমন আমল করা, যাতে তোমরা আমার নিকটবর্তী হতে পারো। আর ঐ সমস্ত আমল থেকে দূরে থাকা-যা আমার নিকট অপছন্দ।

(ঞ) নামাজের ফজীলাত:

সমস্ত প্রকার আমলের মধ্যে নামাজ হল সর্ব শ্রেষ্ঠ আমল। এই আমলের ফলে শয়তান লজ্জিত হয় ও অপমানিত হয়।

(ট) ইমাম (আঃ)-এর সম্পদ:

যে ব্যক্তি আমাদের সম্পদ থেকে (হক্ক ব্যতীত) কিছু খেলো, সে জাহান্নামের আগুন দিয়ে পেট ভরালো। 
হে আল্লাহ্ আমাদের নিকট আপনার  পুস্তক, দ্বীন এবং ওলী (আঃ)-কে বেশি থেকে বেশি পরিচিতি করান এবং অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন ইয়া রব্বুল আ'লামীন।

__________________________________________
গায়বাতে থাকা ইমামের উপকারিতা


মহান আল্লাহ্‌ প্রতিটি যুগের মানুষের হেদায়েতের জন্য একজন করে হাদী রেখেছেন। বর্তমান যুগেও আমাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ্‌ একজন হাদী রেখেছেন। আমাদের শিয়া ধর্মের অনুসারীদের আকীদা হল বর্তমান যুগের হাদী হলেন আমাদের ১২তম ইমাম - ইমাম মাহদী (আঃ)।যিনি বর্তমানে এই পৃথিবীতেই আছেন, জীবিত আছেন, আল্লাহর ঐশী দায়িত্ব সম্পাদন করছেন;কিন্তু গায়বাতে (বা অদৃশ্যে বা লোকচক্ষুর অন্তরালে) রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই শিয়াদের সম্পর্কে যারা খারাপ ধারণা পোষণ করে তারা সঠিকটা না জেনে,না বুঝেই শিয়াদেরকে এই বিষয়ে বিদ্রুপ করে। তারা অভিযোগ করে বলে যে,শিয়ারা এমন একজন ইমামের অনুসরণ করে,যাকে তারা দেখেনি এবং যিনি সামনে এসে তাদেরকে কোনো উপকার করে না।‌ 
শিয়াদের বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপনকারীরা অস্বীকারে নিমজ্জিত এবং তারা শিয়াদের যে কোনো বিষয়েই উপহাস করে। এই বিষয়ে যদি আমরা সামান্য আলোচনা করি তাহলে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে,তাদের ধারণা কতটা দূর্বল এবং শিয়াদের এই বিষয়ে অভিযোগ করার মাধ্যমে আসলেই তারা ঐশী একটি পদকে (ইমামাতের পদ) অস্বীকার করছে,যা সম্পর্কে মহান নবী (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশায় মুসলমানদেরকে বহুবার সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছেন।

১. অদৃশ্য ইমাম এবং দৃশ্যমান ইমাম একইঃ

একজন দৃশ্যমান ইমাম এবং একজন অদৃশ্য ইমামের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কেননা আল্লাহ্‌ চাইলে তাঁর সৃষ্টিজগত উভয় ক্ষেত্রেই উপকার পেতে পারে। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় যে, গায়বাতে (অদৃশ্যে বা লোকচক্ষুর অন্তরালে) থাকার অর্থ লুকানো নয়; যেমনভাবে কেউ একজন কোনো নির্জন আশ্রয়ে বা জঙ্গলে বা গুহাতে কিংবা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের ভিতরে লুকিয়ে থাকে। আমাদের ইমাম গায়বাতে থাকার পরেও সকলের দৃষ্টির সামনেই থাকেন। পার্থক্য হল যতক্ষণ না তিনি নিজেকে পরিচয় দেন ততক্ষণ অন্যরা তাকে চিনতে পারে না। গায়বাত আমাদের জন্য একটি অসুবিধা, কিন্তু যুগের ইমামের ঐশী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর জন্য গায়বাত কোনো অসুবিধাই নয়। যেমনভাবে ইউসুফ নবী মিশরীয়দের সাহায্য করে গেছেন,যদিও তাঁর পরিচয় তাদের কাছে গোপন ছিল। তিনি তার ভাইদেরকেও সাহায্য করেছেন, যদিও তারা তাকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছিল। একইভাবে ইমামের অনুগ্রহ, দিকনির্দেশনা এবং অন্যান্য উপকারিতা গোপন বা অজ্ঞাত থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
আল্লাহ্‌ পবিত্র কুরয়ানে বর্ণনা করেছেন, "আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি" (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ১০৭)। আল্লাহর নবী (সাঃ) তাঁর সারাটি জীবন হয় মক্কায় নতুবা মদিনায় কাটিয়েছেন। কিন্তু তারপরও তিনি সমস্ত বিশ্বের জন্য ঐশী রহমত ও অনুগ্রহের কেন্দ্র ছিলেন। কারণ তিনি নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তেমনই তাঁর বংশধারা থেকে ইমাম মাহদী (আঃ)-ও সমস্ত বিশ্বের জন্য ঐশী রহমত ও অনুগ্রহের কেন্দ্র। এটি অসম্ভব কিছু নয়;কারণ ইমাম মাহদী (আঃ) গায়বাতে আছেন, কিন্তু কোনও অঞ্চল বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। এইজন্য আমরা ইমাম মাহদী (আঃ)-এর অসংখ্য ঘটনা জানতে পারি,যেখানে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর একনিষ্ঠ অনুসারীদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদের সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। 

২. অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্তিঃ

আল্লাহ্ কর্তৃক নিযুক্ত‌ ইমামের উপর বিশ্বাস রাখা এবং তার আনুগত্য করা (এমনকি যখন তিনি জনগণের কাছ থেকে অন্তরালে থাকেন) অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি দেয়। এটি একজনের ঈমানের হেফাজাত হিসাবে কাজ করে। নবীকরীম (সাঃ) এরশাদ করেছেন: "যে ব্যক্তি তার যুগের ইমামকে না চিনে মারা যায়, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করে।" অর্থাৎ একজন ইমাম তা তিনি লোকচক্ষুর সম্মুখে থাকুক কিংবা অন্তরালে - মুসলমানদের দায়িত্ব হল তাঁকে স্বীকার করা এবং তাঁর মারেফাত অর্জন করা। সুতরাং অদৃশ্য ইমামের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা হল তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে ইসলাম-পূর্ব জাহিলিয়াত যুগের ভ্রান্ত আকীদা বিশ্বাস থেকে রক্ষা করে সত্য ও ঐশী পথে চালিত করছেন।

৩. মুসলিম জাতির ঐশ্বরিক শাস্তি থেকে নিরাপত্তাঃ

যতক্ষণ না নবী মুহাম্মদ (সাঃ) বা তাঁর পবিত্র বংশধর থেকে আল্লাহর একজন হুজ্জাত এই পৃথিবীতে রয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানরা ঐশ্বরিক শাস্তি থেকে নিরাপদ থাকে। যেমনটি পূর্ববর্তী অনেক নবীদের যুগে ঘটেছিল (যেমন হজর নূহ (আঃ), হজরত মুসা (আঃ)-এর জাতিদের উপর আযাব নেমে এসেছিল)। কোনো এক বর্ণনাকারী ইমাম মুহাম্মদ বাকির (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করেন, একজন নবী বা ইমামের প্রয়োজন কেন? উত্তরে ইমাম (আঃ) বলেন, বিশ্বকে সঠিক অবস্থায় টিকে থাকার জন্য নবী বা ইমামের প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত নবী বা ইমাম উপস্থিত থাকেন, আল্লাহ পৃথিবীতে শাস্তি নামানো বন্ধ করে দেন । যেমন আল্লাহ পবিত্র কুরয়ানে ঘোষণা করেছেন: "এবং আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার ছিলেন না যখন আপনি তাদের মধ্যে ছিলেন।" (সূরা আনফাল, আয়াত ৩৩)
এবিষয়ে মহান নবী (সাঃ)-এর এই হাদিসটিও প্রণিধানযোগ্য,-- “তারকারা আকাশের বাসিন্দাদের জন্য নিরাপত্তা, এবং আমার আহলে বাইত (আঃ) পৃথিবীর বাসিন্দাদের জন্য নিরাপত্তা। সুতরাং, যখনই তারকারা অদৃশ্য হয়ে যায়, আকাশের বাসিন্দাদের কাছে এমন কিছু আসে যা তারা অপছন্দ করে এবং যখন আমার আহলে বাইত (আঃ) চলে যায়, পৃথিবীর বাসিন্দাদের কাছে এমন কিছু আসে যা তারা অপছন্দ করে”। (বিহার আল-আনওয়ার খণ্ড ২৩ পৃ ১৯)

স্পষ্টতই, একজন ইমামের উপর বিশ্বাস স্থাপনের একাধিক উপকারিতা রয়েছে, চাই সে ইমাম গায়বাতে থাকুন বা দৃশ্যমান এবং এর পরিমাণ এত বেশি যে সেগুলি কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং যারা ইমামাতের উপর বিশ্বাস রাখে না তাদের জন্যও উপকার বহন করে। গায়বাতে থাকার পরও ইমাম মাহদী (আঃ) এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বরং আমাদের উপর তাঁর যে অনুগ্রহ, দয়া ও দিকনির্দেশনা বজায় আছে তার জন্যই এই বিশ্ব টিকে আছে এবং তাঁর স্বীকৃতিদান ও তাঁর মারেফাত অর্জনলাভের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তির দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা সম্ভব হবে।

__________________________________________

সুন্নি আলিমদের মত: ইমাম মাহদী (আঃ) ই দ্বাদশ ইমাম


হজরত ইমাম মাহদী (আ.) হচ্ছেন দ্বাদশ ইমাম। এটিকে প্রতিষ্ঠিত এর করার জন্য শিয়া ইশনা-আশারিদের গ্রন্থগুলি তে অসংখ্য রেওয়ায়েত রয়েছে। এই অধ্যায়ে, এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুন্নি এবং আগা খানি ইসমাইলি বই থেকে সংক্ষিপ্ত নির্যাসগুলি পুনরুত্থাপন করা হয়েছে। মহানবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসের সত্যতা সম্পর্কে সকল মুসলমান একমত যে, তাঁর পরে বারো জন প্রকৃত উত্তরসূরী হবেন।

1. সুন্নি লেখক আবদুল ওয়াহাব তার ‘আল-ইয়াওয়াকিত ওয়া জাওয়াহির’ গ্রন্থে বলেছেন, "যখন পৃথিবীতে অত্যাচার ও ধর্মহীনতা প্রবল হয়ে উঠবে, তখন হজরত মাহদী (আ.) আবির্ভূত হবেন। তিনি ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর পুত্র।তিনি 15 শাবান, 5 হিজরি সনের প্রাক্কালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি 15 ই শাবান পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিলেন।"

2. শায়খুল ইসলাম, সুন্নি পন্ডিত আহমদ জামী তার ফারসি গ্রন্থ ‘নাফসাতুল আনাস’-এ কাব্যিক ভাষায় বারোজন ইমামের সমস্ত নাম বর্ণনা করার পর লিখেছেন যে, "হযরত ইমাম আসকারী (আ.) বিশ্ব এবং সমস্ত মানুষের জন্য পথপ্রদর্শকের আলো এবং তাঁর পুত্র হযরত মাহদী (আ.)-এর মতো পৃথিবীতে কোন অনুরূপ নেই।"

3. মৌলভী জাল্লালুদ্দিন রুমি, তার ‘দেওয়ান আয়াত’এ বারো ইমামের নাম উল্লেখ করে স্পষ্টভাবে দ্বাদশ ইমাম হিসেবে হযরত মাহদী (আ.)-এর নাম উল্লেখ করেছেন।

4. মৌলভী শাহ মুহাম্মাদ কবিরের ‘তাজকিরাতুল কিরাম’ এর 270 পৃষ্ঠায়, প্রামাণিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, প্রকাশ্য ও গোপন দুই ধরনের উত্তরাধিকার রয়েছে।ইমাম হাসান (আ.)-এর সময় পর্যন্ত, দুটি প্রকার একত্রিত হয়েছিল, কিন্তু তারপর থেকে শিয়ারা বারো ইমামকে অনুসরণ করেছিল।

5. আহয়াউল উলূমে শাহ আবদুল আজিজ দেহলভী এবং ইমাম গাজ্জালী, দিরাস্তুল লাবীবে মুল্লা মঈন এবং ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর রচনায়, ফাতহুল বারী- সকল প্রখ্যাত সুন্নী আলেমগণ সর্বসম্মতিক্রমে লিখেছেন যে বারো ইমামের জ্ঞান স্বয়ং আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত। রাসুল (সা.) এবং তাঁর কন্যা ফাতিমা (সা.) সহ বারোজন ইমাম মিলে চৌদ্দটি মাসুমিন (নিষ্পাপ) গঠন করেন এবং চৌদ্দজন সম্পর্কে সকল মুসলমানের মধ্যে একমত যে তাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তারা কোনো প্রকার পাপ করেনি। (তারিখে ইসলাম, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২৯)।

6. আগা খানের রচনায় ‘কানজুল মাসাইব’ শিরোনামে মহামান্য হাসানালি শাহ সাহেব, পৃষ্ঠা 9 এবং 10 এ এবং 22 এবং 23 পৃষ্ঠায়ও বারো ইমামের বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আরও প্রমাণ রয়েছে মহুয়া কমিশনে বিদগ্ধ পার্সি বিচারকের দেওয়া রায়ে যেখানে এটি 56 পৃষ্ঠায় রিপোর্ট করা হয়েছে।

7. ‘ইবরাতুল আফজা’ প্রথম আগা খানের একটি ফারসি আত্মজীবনী। ফার্সি সংস্করণটি 1865 খ্রিস্টাব্দে বাওয়া করিম দাদাজি দ্বারা গুজরাটি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল এবং বোম্বেতে ওরিয়েন্টাল প্রেস দ্বারা মুদ্রিত হয়েছিল। পৃষ্ঠা 19-এ তিনি বলেছেন, "অনেক প্রজন্ম ধরে, আমার পূর্বপুরুষরা মিশরীয় সরকারে মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তারা জাফরি বিশ্বাসের কোড এবং দ্বাদশ ইমাম ইত্যাদি দ্বারা বর্ণিত আইন অনুসরণ করেছিলেন।"

8. আগা খান প্রথমের পুত্র আগা জাহাঙ্গীর শাহ ফার্সি ভাষায় তাঁর ধর্মীয় বিধানের উদ্ধৃতি প্রকাশ করেন। এটি 1313 হিজরিতে বোম্বেতে দাতপ্রসাদ প্রিন্টার্স দ্বারা মুদ্রিত হয়েছিল, এতে তিনি বলেছেন: “আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে হজরত আলী মুর্তজা (আ.) এবং তাঁর এগারোজন পুত্রের প্রত্যেকেই নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উত্তরসূরি এবং তাদের প্রত্যেকেই একজন সত্যিকারের ইমাম৷”

9. আগা খান দ্বিতীয়, মহামান্য আগা আলিশাহ, সিন্ধি ভাষায় নামাজ ও উপবাসের নিয়ম সম্পর্কে তাঁর উদ্ধৃতি জারি করেন। 15 পৃষ্ঠায়, মহুয়া কমিশন রিপোর্টের 17 নম্বর লাইনে, দ্বাদশ ইমামকে (আ.) সালাম পাঠ করার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে, 34 পৃষ্ঠার 17 নং লাইনে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর প্রতি সালাম পাঠ করার নির্দেশ রয়েছে। একইভাবে, 35 পৃষ্ঠার 6 নং লাইনে, দ্বাদশ ইমাম (আ.)-এর প্রতি সালাম পাঠ করার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। একই পৃষ্ঠায়, ১০ নম্বর লাইনে, "মুহাম্মদ, আলী, ফাতিমা, হাসান, হুসায়েন- এই পাঁচ পঞ্জতন এবং চৌদ্দ মাসুমিন" নামে প্রার্থনা করার আদেশ রয়েছে। আর কী প্রমাণের দরকার আছে?
     
        সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ যে দ্বাদশ ইমাম,তা একাধিক গ্রন্থের বর্ণনা য় প্রমাণিত।


মূল গ্রন্থ : IMAME ZAMAN HAZRAT MAHDI (A.S) 
লেখক : Murtaza a. Lakha

__________________________________________
 
ইমাম মাহদী আঃ:দ্বীন ইসলামের সর্বশেষ প্রতিনিধি


إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
''নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে যাচ্ছি'' ( সুরাহ বাকারা, 30 নম্বর আয়াত)

আল্লাহ রব্বুল আলামীন কোরান মজিদে বলছেন যে,আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে যাচ্ছি। উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির প্রথমে হজরত আদম আঃ কে প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।অতঃপর আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর দ্বীনকে পৃথিবীর বুকে প্রচার ও প্রসারের জন্য একে একে নবুওয়াতি প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছেন।যার শেষ হলেন হজরত মহম্মদ মোস্তফা (স:)। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণতার লক্ষ্যে তাঁর সর্বশেষ নবুয়াতি প্রতিনিধি দ্বারা ইমামতের সূচনা করেন এবং প্রত্যেকটি যুগে একজন করে প্রতিনিধি বা হাদী যে রাখবেন ,তাও স্পষ্ট করেছেন--"সেদিন আমরা প্রত্যেক ব্যক্তিকে কে তার ইমাম সহ ডাকবো" (সুরা বনি ইসরাইল:৭১)। সুতরাং বলা যায়, আল্লাহ রব্বুল আলামীন দুনিয়াকে  হুজ্জাত ব্যতীত খালি রাখেন নি। প্রত্যেক যুগের জন্য একজন করে হেদায়াত কারী রেখেছেন।

শিয়া আকিদা এবং গবেষণা অনুযায়ী অনুযায়ী , বর্তমান সময়ে এই দুনিয়ার হাদী বা পরিচালক হলেন দাদ্বশ ইমাম হজরত ইমাম মেহেদী আখেরী যামান (আ:)।অনেক মুসলমানের আকিদা আছে যে,ইমাম মাহদী (আ:) এর জন্ম হয় নি।তাদের এ ধারণা একেবারেই ভুল।কারণ আল্লাহ রব্বুল আলামীন প্রতিনিধি ছাড়া তাঁর দ্বীনকে ছাড়েন নি। কোরানে কারীমে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ওয়াদা অনুযায়ী প্রত্যেক যুগের জন্য তিনি এক একজন হাদী বা প্রতিনিধি রেখেছেন।আর এ যুগের হাদী  হলেন আল্লাহ র রাসুল সাঃ এর সন্তান ইমাম মাহদী আঃ।
         ইমাম মেহেদী (আ:) এর জন্ম হয়েছিল ১৫ই সাবান ২৫৫ হিজরী ইরাকের সামরা শহরে।
২৬০ হিজরী, তাঁর গাইবাতে বা পর্দার আড়ালে যেতে হয় খোদার নির্দেশনায়। ইমামের দুটি গাইবাত রয়েছে।যথা--
১. গাইবাতে  ছোগরা (সময় কাল- ২৬০ হিজরী থেকে ৩২৯ হিজরী) এবং
২. গাইবাতে কোবরা (৩২৯ থেকে বর্তমান সময় যত দিন না তিনি আসছেন)
বর্তমানে  আমারা গাইবাতে কোবরার যুগে আছি।এই সময় 
ইমামে যামানা আঃ সর্বদা আমাদের সহযোগীতা করে যাচ্ছেন ।
        ইমামে যামানার সাক্ষাত লাভের জন্য বিভিন্ন হাদীসে দোয়া ও আমলের পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। একাধিক আলিমে দ্বীন, সাধারন মানুষ ইমামে সাথে সাক্ষাত করেছেন এবং করছেন।
শেইখ সাদুক, শেইখ মুফিদ ও শেইখ তুসী-র মত বড় বড় মনীষী নিজেদের গ্রন্থসমূহ দ্বাদশ ইমামের সাক্ষাত লাভকারীদের নাম উল্লেখ করেছেন। 

অর্থাৎ উপরিউক্ত আলোচনায় এটাই বোঝা যায় যে,বর্তমানে মহা পৃথিবীর পরিচালক বা প্রতিনিধি হলেন ইমামে যামানা(আঃ)। তাঁর জহুর তাড়াতাড়ি হোক এবং তিনি দুনিয়াকে ন্যায় বিচারে পরিপূর্ণ করুন,এটাই আমাদের সকলের দোয়া হওয়া প্রয়োজন।



__________________________________________


ইমাম মাহদী (আঃ) জন্য অপেক্ষা: গভীরতা ও গুরুত্ব


"অপেক্ষা" শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো আশা করা বা চেয়ে থাকা। কারো আশায় বা কোনো জিনিসের আশায় বসে থাকাই হলো অপেক্ষা করা।কোনো কিছুর  আশায় পথ চেয়ে থাকা আমাদের জীবনের একটি সাধারণ বিষয়। অর্থাৎ বাস্তব জীবনে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি বা জিনিসের জন্য অপেক্ষা করে থাকি । কিন্তু এই অপেক্ষা যদি মানুষ বা কোনো জিনিসের জন্য না হয়ে যুগের ইমাম আঃ এর জন্য হয়ে থাকে  ,তবে তা সর্বোচ্চ মাত্রাপ্রাপ্ত হয়। এ কারণেই আল্লাহর রাসুল সাঃ বলেছেন--
"উত্তম এবাদাত হলো ইমাম মাহদী আঃ এর আবির্ভাবের অপেক্ষা করা"(ফারাইদুস 
 সিমতাইন)।
     শিয়া আক্বীদা অনুযায়ী ইমাম মাহদী আঃ জন্মগ্রহণের পর "গায়বতে ছোগরা"র যুগ অতিবাহিত করে বর্তমান "গায়বতে কুবরা"তে অবস্থান করছেন।এই গায়বতের মধ্যে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের বিশেষ নেয়ামত ও উদ্দেশ্য রয়েছে।আর এ কারণেই ইমাম মাহদী আঃ এর পবিত্র গায়বতী অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের প্রখর সচেতনতা থাকতে হবে।তাঁর অস্তিত্ব কে স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি অবিচল ভালোবাসা আমাদের আখেরাতের সুসংবাদ।আর তাঁর প্রকাশ্য অনুপস্থিতির যুগেও তাঁর অপেক্ষা করা যে, প্রত্যেক যুগের মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড,তা একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে--
"নিশ্চয় তাঁর (ইমাম মাহদী আঃ) গায়বতের যুগের লোকেরা,যারা তার গায়বতকে বিশ্বাস করে এবং জহুরের জন্য অপেক্ষা করে,তারা প্রত্যেক যুগের মানুষের চেয়ে উত্তম (কামালুদ্দীন )।
  সুতরাং ইমাম মাহদী আঃ এর অপেক্ষা কারীরাই উত্তম ব্যক্তি এবং মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যে অন্বিত। 
     অপেক্ষা দুই রকমের ।একটি হলো অল্প সময় বা সীমাবদ্ধ সময়ের জন্য ;অপরটি দীর্ঘ সময় বা সীমাহীন সময়ের জন্য।যুগের ইমাম আঃ এর জন্য এই দ্বিতীয় প্রকার অপেক্ষা টি প্রযোজ্য।আর এই অপেক্ষা টিই শ্রেষ্ঠ অপেক্ষা।কারণ এক্ষেত্রে সংযম এবং ধৈর্যের প্রয়োজন হয়।ইমাম মাহদী আঃ"গায়েতে কুবরাতে" থাকার কারণে তাঁর আবির্ভাব সম্পূর্ণ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের মর্জির উপর।তাই ইমাম মাহদী আঃ এর অনুসারী দের  অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ সময়।যিনি প্রকাশ্যে নেই,তাঁর উদ্দেশ্যে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করার মতো গূঢ় বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি উত্তম এবাদাত হিসাবে পরিগণিত।

     এই সমস্ত কারণে ইমাম মাহদী আঃ এর আর্বিভাবের অপেক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।তাঁর অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এবাদাতের পূর্ণতা।অপেক্ষার গুরুত্ব বোঝানো র জন্য হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি ইমাম আঃ এর অপেক্ষা করতে করতে মারা যান,তবে তিনি মারা যান নি ইমাম আঃ এর সঙ্গী এবং শহীদ হয়েছেন। সুতরাং ইমাম আঃ এর জন্য প্রতীক্ষা করার অর্থ হলো ইমামের প্রতি মহব্বতের দিন অতিবাহিত করা, কিংবা শাহাদাত বরণ করা এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভ করা।

__________________________________________





__________________________________________
------------------------------------------------
            |||      কবিতা য় দ্বীনি বার্তা     |||
------------------------------------------------
__________________________________________


💐💐 শহীদের স্মরণে 💐💐

কুফাতে হযরত আলীর শাহাদত
হৃদয় জখম করে আছে,
এই বেদনা ভরা স্মৃতি আজও ভাসে
ইমামে যামানার কাছে।।

ফাতেমা যাহরার পাঁজর ভাঙ্গার
ব্যাথিত অন্তরকে কাঁদায়,
বিচার হয়নি আজও
আছি মোরা বিচারের অপেক্ষায়।।

দাফন করতে দেয়নি 
তীর মেরেছে জানাযায়,
ইমাম হাসানের শহীদের আর্তনাদ
পর্দার অন্তরালে শোনা যায়।

কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে
আজও কারবালায়,
শহিদ হুসায়েনের বদলার জন্য
শেষ হুজ্জাত আছেন অপেক্ষায়।

কাউকে কয়েদখানায়  
কাউকে শহিদ করেছে বিষ দিয়ে,
ইমামে জামানার রক্ত অশ্রু
আজও ঝরছে অঝরে।

ইমাম জাফর সাদিক মাটিতে
লুটিয়ে পড়তো যার শোকে,
না জানি কেমন দুঃখে আছেন তিনি
হে! রব সমাপ্ত করে তার দুঃখকে।।

__________________________________________

      💐💐 ইচ্ছা 💐💐
             রাজা আলী 

হৃদয়ের প্রচ্ছন্ন ইচ্ছা ফুল হয়ে ফোটে
চারিদিকে র পৃথিবী সুন্দর হয়ে ওঠে
হে ইমাম,তোমাকে প্রাণভরা শুকরিয়া
খুশিতে ভরেছে আজ আমাদের হিয়া।

এখনো অনেক পথ চলা রয়েছে বাকি
খোলা থাকুক তোমার প্রতি মোর আঁখি 
তুমি ই বিশ্বের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ শক্তি 
মরণ আসুক তোমার প্রতি নিয়ে ভক্তি।

জীবনের গলিঘুচি 'মাহদী' নামে সুন্দর
ওই নামে বেজে উঠুক হৃদয়ের অন্দর
প্রতিজন অনুসারী হয়ে উঠুক মুনতাজার
'মাহদী' নামে ছুটে যাক সকল হৃদয় ভার।

__________________________________________

💐💐 আধ্যাত্মিক জ্ঞানী 💐💐

খুশি, আকাশ- বাতাস- তাবৎ ভূমণ্ডল
যার আগমনে বইবে- আনন্দ হিন্দোল,
অশান্তিকে করবে- শান্তি মশালে উজ্জল
মানুষে- মানুষে- ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রাঞ্জল।

তাঁর আগমনি বার্তা দেবে সিয়াম মাস
একই মাসে চন্দ্র-সূর্য- গ্রহণ উচ্ছ্বাস,
হবে চল্লিশ বছরে ‘নূরালোর' প্রকাশ
মেটাবেন- ভবের যত শান্তির পিয়াস।

গড়বেন- স্রষ্টার সাথে- সৃষ্টির সম্পর্ক
ভাঙবেন এজিদি বিশ্বাস- হয়ে সতর্ক,
ফাসেকদের লালিত লেলিহান ঐ ঘাঁটি
ভেঙে হবে চুরমার- রবে ঈমান খাঁটি।

ক্বালবি শিক্ষায় শিক্ষিত আধ্যাত্মিক জ্ঞানী
রাসূল নূরে- নূরান্বিত- তার মুখ খানি,
তাঁর নূরেতে ভেগে যাবে যত কৃষ্ণ-কালো
উঠবে জ্বলে রাসূলের দ্বীনি প্রভা আলো।

ইসলামের শত্রু আজ- উন্মত্ত- ঔদ্ধত্য
মোনাফেক মুসলিমরা- যত নত, তত,
অধির আগ্রহে অপেক্ষমান- সত্যবাদী
কখন এসে ধরবে হাল- ‘ইমাম মাহদী'।
__________________________________________

আল-হুজ্জাত মাসিক পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ) || রমযান সংখ্যা ||

আরবি : রমযান, ১৪৪৭ হিজরী ইংরেজি : মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ __________________________________________               সম্পাদক  :  ম...